Wednesday, November 26, 2014

বাংলা অণুগল্প ২৮ - হিন্দু

হিন্দু ।।
স্বদেশ ও স্বরাজ, এই দুই মরাঠি বন্ধুর হাত ধরে মনসিজ দত্ত প্রথম এসেছিল এই সঙ্ঘে। শাখার কার্যবাহী সুভাষচন্দ্র অগ্রবালকে প্রথম দেখেই চমকে উঠেছিল সে। এই ত নেতাজি! খাকী হাফপ্যান্ট, সাদা শার্ট আর কালো টুপি পরে অবিকল তাই মনে হচ্ছিল তার, যদিও পরমুহূর্তেই সে তার ভুল বুঝতে পেরেছিল। 'দাদা, হা আমচা বঙ্গালি মিত্র আহে', স্বদেশ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাকে সবার সাথে।
তাহলে আজ মনসিজের খাতিরে একটা বাংলা দেশবন্দনা হয়ে যাক, এই বলে সুভাষদা সবাইকে নিয়ে কোরাসে ধরলেন-
'ওই শোন, জননী ডাকে সবারে।
শঙ্খ বেজেছে বজ্র স্বরে।।
ঝড় উঠেছে দেখ আকাশ জুড়ে
আর কে ঘরে থাকতে পারে...।।'

মনসিজ অভিভূত, এইরকম কোনও প্রতিষ্ঠানের কথা তার জানা ছিল না। প্রত্যেকটি কথায় শুদ্ধ হিন্দী বা সংস্কৃতের প্রয়োগ, ব্যায়াম, খেলাধূলা, গান ও তর্কবিতর্কের অনুষ্ঠান, ইস, এতদিন সে জানতে পারেনি কেন!
সেদিন বিন্দুদা প্রশ্ন তুলেছিলেন, হিন্দু শব্দের অর্থ নিয়ে। প্রায় সকলেই বলল, 'সনাতন ধর্মই হিন্দুধর্ম, যা আগে ভারতবাসীমাত্রেরই ধর্ম ছিল। বিজাতীয় মুসলমান ও খৃষ্টানদের প্রভাবে কালে কালে তা অনেকাংশে হারিয়ে যায়, এবং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তাকে উদ্ধার করার'। তবে মনসিজ বেশ কিছু পড়াশোনা করেছে এ বিষয়ে। সে বলল, ' সিন্ধুনদের বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে একসময় যে সভ্যতার বিকাশ হয় তার নামই কালে হয়ে দাঁড়ায় সিন্ধু বা হিন্দু সভ্যতা, তা থেকেই হিন্দুধর্ম। অতএব, যাঁরা নিজেদেরকে এই সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারাবাহক বা অঙ্গস্বরূপ মনে করেন, তাঁরাই হিন্দু, তাঁর পৈতৃক ধর্ম যা খুশী হোক না।'
'এই পরিভাষা তুমি কোত্থেকে পেলে?' ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র মিলিন্দের প্রশ্ন। 'আমি ডাঃ কেশব হেডগেওয়ারের লেখা পড়েছি', উত্তর এল।
সন্ধ্যে হতে চলেছে। পুরো মাঠে কারো মুখে কোনও কথা নেই। শুধু একটানা ঝিঁঝিঁ ডেকে চলেছে। প্রার্থনা শেষে বেরিয়ে আসতে আসতে আলগোছে কানে এল সুভাষজি, বিন্দুদাদের কণ্ঠস্বর-'না না, এখন কেউ কিছু বলবে না। খুব সতর্কভাবে এগোতে হবে, নয়ত নাগপুরের সন্মেলনে কি জবাব দেব...'
ঝিঁঝিঁপোকাদের দাপটে পরের কথাগুলো আর শুনতে পায় না মনসিজ। আর শোনবার প্রয়োজনও মনে করে না।
১০ই নভেম্বর, ২০১৪।

বাংলা অণুগল্প- ২৭ - ক্ষিদ্দা ২.০

ক্ষিদ্দা ২.০ ।।

১লা ডিসেম্বর, ২০০৪। ৪৯.১৩ সেকেন্ড। ছেলেটির মুখের দিকে আর-পি-এফের বড়কর্তারা তাকিয়ে আছেন। না, ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে বিশ্বরেকর্ড বা জাতীয় রেকর্ড, এমনকি রাজ্য রেকর্ডও হয়ত নয়, তবে একছুটে ওয়াগন ব্রেকার বা রেল-ডাকাত ধরতে তা যথেষ্ট ভাল, অর্থাৎ বিনয় মণ্ডলের সিলেকশন হয়ে গেল। সেদিনই সে জানতে পারল যে তার তিনমাস আগেই এথেন্স ওলিম্পিকে ৪৫.৪৮ সেকেণ্ড করে ভারতের নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়েছেন কে একজন বিনু। নাঃ, বয়েস হচ্ছে, আর বোধহয় এ রেকর্ড ছোঁয়া হবেনা এ জীবনে।
রবি ঠাকুরের কোনও একটা গানে চমৎকার একটা কথা ছিল, কি কথা মনে পড়ছেনা এখন - তারকেশ্বর স্টেশনের ফুট ওভার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ভাবছিল বিনয়। হঠাৎ নজরে পড়ল গুটিকয় বাচ্চা ছেলে তাসের জুয়া খেলছে সিঁড়ির তলায়। ব্রিজ থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বিনয়। কি সর্বনাশ! দলে একটা ন-দশ বছরের ফ্রক পরা মেয়েও আছে। তাকে দেখেই পুলিশ- বলে ছুটে এদিক ওদিক লুকিয়ে পড়ল সবকটা, আর মেয়েটা কি ভেবে ছুটে পালাতে লাগল। ছুটুক, বিনয় ভাবল, তার হাত এড়িয়ে যাবে কোথায়!
কিন্তু বিনয় যা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি তাই ঘটল। তাকে দৌড়ে হারিয়ে মেয়েটি কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখোঁজ। সামান্য একটা বস্তির মেয়ে হয়ে খালিপায়ে দৌড়ে হারিয়ে দিল আর-পি-এফের চ্যাম্পিয়ানকে! অন্য কেউ হলে কি হত জানিনা, কিন্তু বিনয় শান্তভাবে তাকিয়ে থাকল মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে। তার চোখে এক দুরূহ, দুঃসাধ্য স্বপ্ন।
পাঁচ বছর পরের ঘটনা। কোচিনের জাতীয় জুনিয়ার এথলেটিক্স মীটে হৈহৈ কাণ্ড। ৪০০ মিটারে মেয়েদের সিনিয়ার রেকর্ড মনজিত কাউরের ৫১.০৫ টি প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে বাংলার কোন অখ্যাত ছুটকি কোনার। বাংলারই আর একটি বাচ্চা ছেলে দাশু বাউরি, ছেলেদের ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে সগর্বে দাঁড়িয়ে মেডেল নিচ্ছে, সবাই তাকে ডাকছে 'মাস্টার বোল্ট'। সে আজ ভেঙ্গেছে দুটি জাতীয় জুনিয়ার রেকর্ড, ১০০ ও ২০০ মিটারের। কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছে তাদের কোচ বিনয় মণ্ডল, চোখে তার আজ আনন্দাশ্রু। পাঁচ বছর আগে পুলিশের ভয়ে পলাতকা একটি বালিকাকে নিয়ে যে বীজটি সে বপন করেছিল, সে গাছে আজ ফল ধরতে শুরু করেছে। ওই গরিব-দুঃখী ছেলেমেয়েগুলোর মাঝে সে তার স্বপ্নকে সাকার হতে দেখতে শুরু করেছে, ওদের মাঝে সে খুঁজে পেয়েছে নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্বাকে।
এ পৃথিবীতে সবই নশ্বর। তবু তো চলা থেমে থাকে না। বিশ্বাত্মা এক থাকে, শুধু নিত্য নূতন মাধ্যমের পরিবর্তন ঘটে, মনে পড়ে যায় ভুলে যাওয়া গানের চরণ-
'তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে, কুসুম ফোটে।'
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
মুম্বাই, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৪।

Thursday, November 20, 2014

বাংলা অণু-গল্প- ২৬- 'সমস্যা'

সমস্যা ।।


'এসো, এসো, বিভাস', স্বামী লোকহিতানন্দের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল বিভাস মহারাজ, ওরফে স্বামী পীতাম্বরানন্দকে দেখে, 'তারপর, পশ্চিম ভারতের খবর কিরকম?'
'সব ভাল, মহারাজ', বিভাস বললেন, 'এবার মুম্বাই-পুনে-নাশিক মিলিয়ে রেকর্ড কালেকশন হয়েছে। কাশ্মীরের বন্যাপীড়িতদের জন্যে আরেকটা কিস্তি পাঠাতে পারেন।'
পূর্বাশ্রমের নাম পরিত্যাগ করে বিভাস মহারাজের সদ্য নতুন নামকরণ হয়েছে নিয়ম অনুযায়ী সঙ্ঘে যোগ দেওয়ার বারো বছর পরে। গত বারো বছর ধরে তিনি মুম্বাই ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে সংঘের জন্যে চাঁদা তোলার কাজ সাফল্যের সাথে করে আসছেন। এবার তাঁদের লক্ষ্য পুণেতে আশ্রমের একটি শাখা খোলার।

'পুণের খবর কি, বিভাস', স্বামীজির ডাকে চমক ভাঙে বিভাস মহারাজের, 'কর্পোরেশনের মেয়রের সাথে দেখা হয়েছিল?'
'হ্যাঁ মহারাজ। জমি মাস ছয়েকের মধ্যেই পাবার সম্ভাবনা আছে। তবে পাষান রোডে এন-সি-এলের কিছুটা উদ্‌বৃত্ত জমি আছে, আরো কিছুদিন অপেক্ষা করলে সেটাই পাওয়া যেতে পারে।'
'হুঁঃ, সুখবর সন্দেহ নেই। চিন্তা তারপর কি হবে তাই নিয়ে। ওখানে বসাব কাকে? কেদারনাথ আর গৌরীকুণ্ডের ধ্বসে তিনজন সিনিয়ার স্বামীজী নিহত হয়েছেন। কাশ্মীরে লোক পাঠাতে গিয়ে কেদারনাথের পুনর্নির্মাণের কাজে ঢিলে পড়ে গেছে। তোমাকে পুণের দায়িত্ব দিলে টান পড়বে কালেকশনে। নতুন সন্ন্যাসী প্রায় আসছেই না যে।'
'সে কি মহারাজ,' এবার বিভাসকেও চিন্তিত দেখাল। 'সবাই কি বস্তুবাদী হয়ে পড়ল, না কি এন-জি-ও গুলো টেনে নিচ্ছে সবাইকে? যাই বলুন, বিজ্ঞাপন আর বিপণনের জৌলুষে আমাদেরই এ বয়সে মাথা ঘুরে যায়, আর তারপর ঈশ্বরে বিশ্বাসও কমে আসছে মানুষের মধ্যে।'
'দেখো, ভোগবাদের মধ্য থেকেই মহাপুরুষেরা বেরিয়ে আসেন। আর তোমাকে বলতে বাধা নেই, আমিও নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু লোকহিতকেই নিজের ধর্ম মনে করি। সমস্যাটা অন্যত্র। এর জন্য দায়ী ভাল পরিবারগুলোর মধ্যে সফল জন্মনিয়ন্ত্রণ।'
'তার মানে', এবার বিভাস সত্যিই অবাক হলেন।
'আর কি, সব বাড়িতেই এখন একটি কি দুটি সন্তান। দুই বা তার বেশী পুত্র আর কোথায় যে বাপ-মা এক ছেলের সন্ন্যাসী হওয়া মেনে নেবে। সেদিন একটি ছেলে এসেছিল, যাদবপুরের ইঞ্জিনীয়ার। তারপরেই তার মা-বাবা এসে হাজির, ওকে ফিরিয়ে দিন স্বামীজী, আমাদের ওই একটি ছেলে - বলে সে কি কান্না! ছেলেটিকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি ফেরত পাঠালাম।'

এইবার দুটো দীর্ঘশ্বাস একসাথে পড়ল।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
মুম্বাই, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৪।

Friday, August 22, 2014

কবিতা (সংকলিত) ।। কৃষ্ণের ফল খাওয়া ।।

কৃষ্ণের ফল খাওয়া ।।
দ্বিজহরি দাস

অবগতি শুন কিছু নিবেদন করি,
গোকুলে আনিল ফল এক মাগী বুড়ি
একটা ঝুড়ি হাতে ।
একটা ঝুড়ি হাতে, বসল পথে ফল গুচ্ছেক ঢেলে
ফল খাওসে, ফল খাওসে, ডাকে যত গোপের ছেলে

বাপু তোরা দৌড়ে আয়, বুড়ি তায় ডাকছে ঘনে ঘন-
শ্রীদাম বলে সুদাম ভায়া, বুড়ি ডাকছে কেন
কিছু তার বৃত্তান্ত -
কিছু তার বৃত্তান্ত বলে আনত, শোনরে গুণের ভাই,
বুড়ি কেন ডাকছে চল গুটি গুটি যাই,
চলিলেন সবে মিলে ।
চলিলেন সবে মিলে, গোপের ছেলে, মণ্ডা মুখের হাসি
পথের মাঝে ঝুড়ি হাতে যেথায় বুড়ি বসি
ধর গো ধর মুখে ।
ধর গো ধর মুখে, খাও সুখে, খেয়ে পাবে তার
মায়ের কাছে বুঝে আনবে ধার ।

চল মা আমার সাথে, ব্রজের পথে কিনে দিবি সে ফল,
দিবি কি না দিবি রানী তুই সত্যি করে বল
নতুবা তার উপায় করি -
নতুবা তার উপায় করি, ভাঙব হাঁড়ি, ভাঙব দুধের হালা
দুধ গড়িয়ে যাবে যখন তখন পাবি জ্বালা
এই বলে কাঁদেন হরি ।
এই বলে কাঁদেন হরি, দাও মা কড়ি, কাঁদেন যাদব রায়,
লোকের ছেলে মাকে বলে কত কিনে খায় ।

বাবা তুমি কেমন কথা বললে হেথা আমায় দিয়ে দোষ-
পাকা পাকা ফল আনিবেন ঘরকে আসুন ঘোষ,

আসুন নন্দ, কৃষ্ণচন্দ্র, ফল আনিবেন পাড়ি-
কেন বাবা গোপের ঘরের মজাইবে কড়ি ?
খাওসে ক্ষীরননী ।
খাও সে ক্ষীরননী, যাদুমণি, খেলি ডাক, সবে কর খেলা,
ঘর রইল, দুয়ার রইল, ধান রইল মেলা ।
আমি তো যাব জলে-
আমি তো যাব জলে, রানী বলে, কুম্ভ হাতে, যমুনাতে আনতে যাব জল-
দ্বিজহরি দাসে গাহে, ঠাকুর খাবেন ফল ।
* * *
লয়ে দুটি ধান্যকণা চলেন হরি যেথায় বুড়ির থান,
সন্তুষ্ট হল বুড়ি দেখে ভগবান ।
বাবা তুমি কাদের ছেলে, কাছে এলে এমন চাঁদের কণা,
যতগুলি ধান্য দিলে, সকলি হল সোনা ।
তুমি মানুষ নও, দেবতা হও, সকল দেবের সার,
পূর্ণব্রহ্ম গোপের ঘরে হলেন অবতার ।।

বাংলা কবিতা ।। গদি-কাহিনী ।।

গদি-কাহিনী ||


খিলখিল্লির মুল্লুকে আজ থাকত দু'খানা রাজগদি,
একখানা নিত কেজরিওয়ালা, আরেকখানায় ওই মোদী ।
তারপর এমন লাগত দুটোয়, তুই রাজা, না কি মুই রাজা !
দেশটা আমিই করব শাসন, তুই হোথা বসে ঢোল বাজা ।
সব ব্যাটাকেই হাড়ে হাড়ে চিনি, সবগুলো সেম, করাপ্টেড,
সব থানাতেই ঝুলছে তোদের নাম, নিচে লেখা 'ওয়ান্টেড' ।

আরে যা যা, আর তুই কিরে ব্যাটা, সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকিস,
কে কবে কোথায় চড় মেরে বসে, তাই মাফলারে মুখ ঢাকিস -
আমি পালোয়ান, গায়ে আলোয়ান, স্বামীজি শিষ্য, চায়-ওলা,
ঝোল ধরে তুই রাহুলের কাছা, তখতে বসবে এই পোলা ।
তারপরে জোর ধাঁই-ধপাধপ, আঁচড়কামড়, গালি-গালাজ-
শেষে দেখি দুটো গদি আছে পড়ে, নেই একটাও রাজাধিরাজ !
১৪ই মে, ২০১৪ ।

বাংলা ছোট গল্প ।। ছাগল বাবা ।।

ছাগল-বাবা ।।
(ছোট গল্প)
মাটির নীচ থেকে ড্রিল করে কোল-বেড মিথেন উৎপাদন প্রজেক্টের কাজে এসেছি ঝাড়খন্ডের ধানবাদ জেলার নিরসাতে । ২নং ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে যে রাস্তা শালুকচাপরা গ্রামের ভিতর দিয়ে বালিয়াপুর গেছে তার থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রিগ-রোড বানানো হয়েছে । মোরাম ঢালা কাঁচা রাস্তা, ফাঁকাই পড়ে থাকার কথা । অথচ রুট সার্ভে করতে এসে আমার তো মাথায় হাত । দলে দলে গ্রাম্য লোকেরা চলেছে ওই পথ ধরে, অন্ততঃ শ-দেড়েক তো হবেই । এদের পাশ দিয়ে জীপ নিয়ে যেতে হলেই তো দিন কাবার ! একটু নেমে খোঁজ নিলাম । ওরা যাচ্ছে ছাগল-বাবার কাছে আশীর্বাদ নিতে । অদ্ভুত নাম তো! তিনি আবার নাকি সাক্ষাৎ অশ্বিনীকুমারের অবতার- একেবারে ধন্বন্তরী । সর্দি-জ্বর-ম্যালেরিয়া-টাইফয়েড হেন রোগ নেই যা তাঁর বশ মানে নি । বোঝ ব্যাপারখানা ! নিরীহ গ্রাম্য লোকগুলোকে ঠকিয়ে ভালই জোচ্চুরির ব্যবসা ফেঁদেছে দেখছি লোকটা।
যাক্‌গে আমাদের কাজ তো শুরু হল । কিন্তু শুরুতেই ইচ্ছের বিরুদ্ধে একটা কাজ করতে হল আমাকে । একদিন রাত্রে আমাদের একটি লেবারকে কামড়াল পাহাড়ী বিছায় । মেডিকটি নতুন, তার আছে শুধু ফার্স্ট-এড সার্টিফিকেট, আর রিগের সামান্য স্টকে তেমন ওষুধ-বিষুদও নেই । নিকটস্থ হাসপাতাল অন্ততঃ ৫০ কিমি দূরে । এই অবস্থায় লোকজনেরা বলল, নেই মামা থেকে কানা মামা ভাল; আপনি ওকে একটু ছাগল-বাবার কাছে নিয়ে যান না- এই তো জীপে মিনিট পনের ।
অগত্যা তাই সই । বাবার ছোট্ট কুঁড়েয় গিয়ে দেখি বাইরে দুজন শিষ্য হামান-দিস্তা নিয়ে ওষুধ তৈরী করছে, বাবা ভিতরে । একজন গিয়ে ডেকে আনতে একটি অদ্ভুত-দর্শন মানুষ বেরিয়ে এল, যার মুখখানা ছাগলের মত, অর্থাৎ ছাগ-মুখোশধারী । কোন কথা না বলে উনি রোগীকে নিয়ে পড়লেন । কিছুক্ষণ ধোওয়াধুয়ি আর ঘষাঘষির পর আমাকে অবাক করে দিয়ে উনি দুটো ইঞ্জেকশন দিয়ে বললেন- টিটেনাস আর এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিলাম । বিষটাও এনেস্থেটিক ব্লীচ দিয়ে ধুয়ে দিয়েছি । তবে মনে হচ্ছে বার্ক স্কর্পিওন, তাই ২৪ ঘন্টা কিছু বলা যাবে না । এখন ও ঘুমোক, সকালে একটা আইবুপ্রুফেন দিতে হবে । আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি আমাকে কুঁড়ের ভিতরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন । তারপর মুখোশটা সরিয়ে নিতেই আমি 'অজামিল' বলে চেঁচিয়ে উঠলাম । আমাদের বন্ধু ডাঃ অজামিল দত্ত । শুনে গেলাম তার বিস্তারিত উপাখ্যান, সব শেষে ও মন্তব্য করল-
-ভুল চিকিৎসা করে নেতার মেয়েকে মারার অপরাধে আমার মেডিক্যাল লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হল । অথচ ভুল যে আমি করিনি তা আর কাউকে বোঝাতে পারলাম না । তাই 'হিপোক্রিটিক ওথের' মান রাখতে এই পথ বেছে নিয়েছি । এদেশে বুক ফুলিয়ে বেআইনি কাজ করতে গেলে হয় সাধু নয় নেতা সাজতেই হবে ।
-আর 'অজামিল'এর সাথে মিল রাখতে 'অজ' অর্থাৎ ছাগলের মুখোশ, তাই তো ? আমি হাসলাম ।
- তা তো বটেই, আসলে identity হারাতে তো আমি চাইনি ।
সে এক যুগ ছিল, যখন মহাপাপী অজামিল বুদ্ধি করে ছেলের নাম রাখে নারায়ণ । মৃত্যুকালে ছেলেকে ডাকার ছলে সেই নারায়ণের নাম করেই সে বৈকুণ্ঠলাভ করেছিল । জানিনা আমাদের এযুগের অজামিল পাপ করছে না পুণ্য, সে কি নিজের কর্মবলে স্বর্গলাভ করবে, না ঈশ্বরও শেষে নামগানের ঘুষ চেয়ে বসবেন !
মুম্বাই, ৭ই জুন, ২০১৪ ।

মনের মণিকোঠা থেকে ।।৭।।


জানুয়ারী মাস। নতুন বছরের নতুন সেশন শুরু হয়েছে। স্কুলের টিফিনের পরের প্রথম পিরিয়ডের ঘন্টা বাজলো। অনেকে যারা ক্লাসরুমে বসেই টিফিন খাই, বা চ্যাঁচামেচি, গান-বাজনা, টেবিলঠোকা, হই-চৈ, গল্পগুজব করি, চালিয়ে যাচ্ছি যথারীতি। এমন সময় পান মুখে বাংলা শিক্ষক হরিদাস স্যারের আবির্ভাব। জোরালো চুম্বকের উপস্থিতিতে লোহার চূর্ণগুলো যেমন ছোটাছুটি করে মুহূর্তের মধ্যে একভাবে একদিকে মুখ করে সেজে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখেছি ফিজিক্স ল্যাবে, ঠিক সেইভাবে আমরা যে যার জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কয়েকজন বাইরে রোদ খাচ্ছিল, তারাও ছুটে এসে ক্লাসে ঢুকে পড়ল। স্যার একবার খুশি হয়ে সবদিকটা দেখে নিলেন, তারপর নিজে বসে সবাইকে বসতে বললেন।
'তারপর, বাইরের রোদটা বেশ আরামের তাইনা?' উনি শুরু করলেন, 'ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হয় তো! আমারও হয়'। বলতে বলতে 'আসব স্যার?', শংকর, জিতু, তপেনের দলটা দরজায় এসে দাঁড়ালো।
'আসুন স্যার, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন?' স্যারের তির্যক খোঁচাটুকু গায়ে না মেখেই ওরা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ক্লাসরুমে।
'হাঁ, তা কি যেন বলছিলাম? রোদ্দুরের আরামের কথা। বুঝলে, টিফিন শেষ করে একটা পান মুখে নিয়ে আর কি টিচার্স রুমে ঢুকতে ভালো লাগে। হলের বাইরে বাঁধানো গাছ্তলাটিতে কিছুক্ষণ গিয়ে বসতেই হয়। শিক্ষকদের আড্ডাটা আজকাল সেখানেই জমে কিনা! আহা নরম রোদ্দুরে বসে কি আরাম। তা করতে করতেই টিফিন শেষ হবার ঘন্টা বাজে।' এটুকু বলে আমাদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেন হরিদাস স্যার। আমরা আজ ওনার কথার কোনো খেই পাচ্ছি না।
'তারপর ঘন্টা বাজানেওলা দারোয়ানটাকে হাঁক দিই, ক্যা রে হরিয়া, ঘন্টি মারনে কা বহুত জলদি হ্যায় তুঝে!'
সর্বনাশ, এ কথাগুলো তো কাল জিতু বলছিল দারোয়ানকে। তাকিয়ে দেখি, জিতুর মুখ ভয়ে চুন হয়ে গেছে। স্যার কিন্তু নিজের গল্প বলেই চলেছেন। 'তারপর ভাবলাম, দূর, এত তাড়াতাড়ি ক্লাসে গিয়ে কি হবে, ছেলেগুলো খামোখা আমাকে দেখে বিরক্ত হবে। ভেবে একটা সিগারেট ধরাই। খবরদার, মাস্টারমশায়দের নকল করতে হয় কর, তা বলে এই অভ্যাসটুকু তোমরা ধরো না দয়া করে। তা তার খানিক পরেই দেখি প্রিন্সিপাল বেরোচ্ছেন রাউন্ড দিতে। অগত্যা সিগারেটটিতে একটা সুখটান দিয়ে ওটা ফেলে আসি ক্লাসরুমে। ততক্ষণে দশ মিনিট দেরী হয়ে গেছে।'
'কিন্তু স্যার, আপনি তো ঠিক সময়েই আসেন ক্লাসে, কখনো তো দেরী হয় না!' শ্রীমান শংকরের উক্তি। ও কেন জানিনা স্যরের কথাগুলোর মধ্যে একটা বিপদের গন্ধ পাচ্ছে।
'কিন্তু শ্রীমদশঙ্করাচার্য, সেকথা তোমার তো জানার কথা নয়!' এবার তিনি নিজের রূপে এলেন। 'তোমাদের তো তখন গুলিডান্ডা নয় পিট্টুখেলা চলছে। সময়ে ঘন্টা বাজানোর জন্যে দারোয়ানকে ধমকানো, বা পানদোকানের পেছনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানা, সে যেই করে থাকুক, আজ না হোক কাল প্রিন্সিপালের নজরে পড়বেই। এ শহরে, এই স্কুলে বাঙালিদের যেটুকু সুনাম আছে তাও কি থাকতে দিবিনা তোরা!'
উফ, এতক্ষণে স্যর 'তুমি' থেকে 'তুই' তে ফিরে এসেছেন। কি ভালই যে লাগলো শুনতে!

২৭শে জুন, ২০১৪