Wednesday, November 26, 2014

বাংলা অণু গল্প ৩২ - চিরন্তনী

চিরন্তনী ।।

অহল্যা উদাস হয়ে বাতায়নপ্রান্তে বসেছিলেন। তাঁর প্রতি কঠিন শাস্তি আরোপ করেছেন তাঁর পতিদেব ঋষি গৌতম। প্রস্তররচিত কারার অভ্যন্তরে তাঁকে থাকতে হবে যতদিন না স্বয়ং ঈশ্বর সে কারাগার ধ্বংস করে তাঁকে মুক্তি না দেন। তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ এবং তা যে মিথ্যা নয় তা ঋষিও অনুমান করেন, যদিও তাঁর মনে বিশ্বাস যে এর জন্যে দেবরাজই একা দায়ী, গুরুর ছদ্মবেশে......।
চমক ভাঙ্গল পরিচিত কণ্ঠস্বরে। ‘এ কি, ইন্দ্র তুমি! কি সাহসে আবার এসেছ এখানে? আর তোমার শরীরে সহস্র লোচন আঁকা কেন?’
‘ধীরে, অহল্যে, ধীরে। গুরুদেব এখন প্রস্তর-কারাগার নির্মানে ব্যস্ত, এ মুহূর্তে তাঁর এখানে আসার সম্ভাবনা নেই। আর এগুলো লোচন নয়, যোনি-চিহ্ন, গুরুদেবের অভিশাপ।‘
‘তার মানে ঋষির শাপে ফল হয়!’
‘পাগল!’ ইন্দ্র হাসলেন। ‘তোমার নারীত্বের দাবী আমি মিটিয়েছি, করেছি পুরুষের কর্তব্য। কিন্তু সমাজের চোখে আমি অপরাধী, নৈতিকতার দিক দিয়েও। তাই ঋষির মান রাখতে ওগুলো শরীরে আমি নিজেই এঁকে নিয়েছি।‘
‘সে কি! আর অন্য অভিশাপ?’
‘সে তো আর পোষাকের আড়ালে বোঝা যাবে না, লোকে যা খুশী কল্পনা করে নেবে। এখন বল, আমার প্রতি তোমার কোনও অভিযোগ নেই তো?’
‘হে দেবরাজ, তুমি আমাকে পূর্ণ করেছ। দিয়েছ নারীর মর্যাদা। বিশ্বাসহনন আর চরিত্রহীনতার সমস্ত দায় তুলে নিয়েছ নিজের উপর। দোষ তো আমারও কম ছিল না। তোমার ঐ ছদ্মবেশও আমি মুহূর্তেই ধরে ফেলেছিলাম। আর কি করতে চাও তুমি!’
‘দেখ আমি দেবতাদের অধিপতি। স্বর্গমর্তের শৃংখলা রক্ষার ভার আমার উপরে, আর ঋষি গৌতমের হাতে আছে সমাজধর্ম রক্ষার দায়িত্ব। শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে। তাই আমি দেবর্ষিকে পাঠিয়েছি ঋষি বাল্মিকীর কাছে। তিনি ইক্ষাকুকুলপতি রামের জীবনকাহিনী রচনা করবেন। তিনি তোমার এই পতিরূপে উপপতিসেবার বৃত্তান্তটাই উল্লেখ করবেন এই কাব্যে।‘

‘তবে আমার ধারণা’, ইন্দ্র বলে চললেন, ‘বিশ্বের লোক একসময় নারীর চোখ দিয়ে সব কিছু বুঝতে সক্ষম হবে, তাই সেই সময়ের নিরিখে আমার সাধনা হবে ভবিষ্যতের নারী যেন আপন ভাগ্যকে জয় করবার অধিকার পায়, আপন মানসিক ও শারীরিক দাবী যেন মুখ ফুটে বলতে পারে, অহোরহ সেই প্রচেষ্টায় রত থাকা।‘
এই বলে দেবরাজ ইন্দ্র বিদায় নিলেন।

মুম্বাই ২৯শে আগস্ট, ২০১৪।

বাংলা অনু গল্প ৩১ - একটি মিথ-থা প্রেমের গল্প

একটি মিথ-থা প্রেমের গল্প ।।

নাঃ, আর পারা যাচ্ছে না। সেই সাড়ে ছটায় অফিস থেকে ফিরেছে উমা। তারপর রান্না শেষ হতে আটটা। দুজনের কাজ, কতটুকু আর! কিন্তু অনিমেষের ফিরতে প্রতিদিন অন্ততঃ এগারটা। তাও বুঝত যদি অফিসে কাটায় সময়টা। ফিরবে তো সেই আকণ্ঠ গিলে। ছেলেকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবার পর আর একা একা সময় কাটে না। অথচ ব্যাপারটা লজ্জার, সবাইকে বলাও তো যায় না! উমা কি ভেবে শেষে শ্যামাকেই ফোন করল। কিছুটা তো সময় কাটুক।
শ্যামা উমার পিঠোপিঠি ছোট বোন। সত্যিই সে শ্যামাঙ্গী, উমার ঠিক উলটো। অথচ ওদের এরকম কোনও জ্বালা নেই। ও আর বর দীপ্তেন্দু দুজনেই একই স্কুলে পড়ায়, একমাত্র মেয়েকেও ভর্তি করেছে সেখানে। খুব উচ্চাশা না থাকলেও নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার। শ্যামা একটু অবাকই হল, দিদি এসময় ফোন করায়। 'হ্যাঁ, ভাল আছি, তোরা? জামাইবাবু কোথায়? সে কি, এখনও ফেরেনি! আচ্ছা?...
কথা চলল আধঘণ্টার মত। 'ঠিক আছে, জামাইবাবুকে একটা ফোন করছি। আর শোন, যা বললাম, তেমনটি করবি, কেমন? দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে।' শ্যামা ওদিক থেকে লাইন কেটে দিল।
রাত দশটা নাগাদ অনিমেষ ঘরের বেল বাজাল। ভেতর থেকে শুনল উমার গলা, 'আসছি, এত দেরী করতে হয়, এদিকে অনিমেষের আসার সময় হয়ে গেল।' বলতে বলতে দরজা খুলল উমা। 'ওমা, তুমি!' যেন জোর করে খুশী হবার নাটক করল সে।
'কেন, তুমি কাকে ভেবেছিলে?' গলায় ঝাঁঝ নিয়ে বলে অনিমেষ।
'আমি! কাকে আবার? আমার আর কে আছে কোন চুলোয়? একটা বোন আছে, তারও তো সময় নেই, নিজের ফ্যামিলি নিয়েই ব্যস্ত!'
'কেন, শ্যামা নাকি কল করেছিল, তুমি ফোন তোলনি!'
'কি জানি, আমি তো শুনিনি, হয়ত বাথরুমে ছিলাম।'
আর কথা না বাড়িয়ে চেঞ্জ করতে গেল অনিমেষ। পরদিন থেকে জানিনা কেন ঠিক সাতটার মধ্যে ঘর ফিরতে লাগল অনিমেষ।

উমাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কাল অফিস থেকে আসার পথে একটা কাজ করতে হবে। এক বোতল ভাল স্কচ আনতে হবে, ব্যাপারটা মহিলাদের পক্ষে শোভন না হলেও। ও হ্যাঁ, আর একটা ফোন, শ্যামাকে, থ্যাঙ্কস জানিয়ে।

কুয়েত, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৪।

অণু গল্প ৩০ - বাপের বাড়ি

বাপের বাড়ি ।।

'তপা রে, তোর শ্বশুরবাড়ি ঘুরে এলাম। উঃ, একটা দুর্ভাবনা কাটল', তরুণ ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই কথাগুলো বলল। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে বলা, সে যেন কিছু শুনতেই পায়নি এমন ভান করে যাচ্ছে। 'কি রে, কিছু বলছিস না যে?'
'আমি আবার কি বলব! তোরা ঘাড় থেকে আইবুড়ো বোনকে নামাচ্ছিস, খুশী তো তোদেরই হবার কথা'- তপা ছদ্ম ঝাঁঝের সাথে বলল।
'না রে। তোর বরটা খুব ভালমানুষ, শ্বশুর-শ্বাশুড়িও তথৈবচ। ভাবছিলাম তুই ঝগড়া করবিটা কার সাথে। তা আজ তোর ননদ কুটিলাদিকে দেখে সে চিন্তাটা ঘুচল। আস্ত খাণ্ডারনী একটি!'
'আহা, আমি যেন ঝগড়া করতেই ও বাড়িতে যাচ্ছি! কিন্তু হ্যাঁরে দাদা, সত্যি ওর নাম কুটিলা?'
'দূর বোকা, ঠাট্টাও বুঝিস না! তবে সাবধান, বিবাহিতা হলেও উনি প্রায় সারাক্ষণই বাপের বাড়িতে। সেখানে আবার নিজের বাপের বাড়ির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে যেও না সবসময়।' তরুণের সাবধান-বাণী।

যাক, বিয়েটা ভালয় ভালয় চুকে গেল, ফুলশয্যাও। তারপর একদিন ননদ জয়া ধরেছে তপাকে। 'এই যে দত্তবাড়ির মেয়ে, ওয়েলকাম টু সরকারবাড়ি- এখন থেকে তোমারও বাড়ি এটাই। আমি কিন্তু সে ধরনের মেয়েদের দু-চক্ষে দেখতে পারিনা যারা বিয়ের পরেও বাপের বাড়ির মেয়ে হয়ে থেকে যায়, সারাক্ষণ শুধু বাপের বাড়ির গল্পই করতে থাকে। আমি নাহয় একটু পষ্টো কথা বলি তাই লোকে অনেক কিছু বলে, কিন্তু আমার ভাইটি একেবারে হীরের টুকরো ছেলে, সে যেন কখনও কিছু ফীল না করে। আর মা-বাবা বলতে এখন শুধু তোমার বরের মা-বাবা, এমনকি তোমার কুকুর-বেড়াল বলতেও এ-বাড়ির কুকুর-বেড়াল, বুঝেছ?'
'একশোবার!' তপা একটু অস্বাভাবিক জোর দিয়েই বলল। 'আমিও এগ্‌জাক্টলি তাই মনে করি দিদিভাই। এই দেখ না আমার বৌদিকে। ছিল তো একটা অজ পাড়া-গাঁয়ে। আর আমার দাদা তো কে না জানে চেহারায় গুণে রাজপুত্তুর। বৌদি যা শ্বশুর-শ্বাশুড়ি পেয়েছে, আগেকার দিনের লোক হলে বলত দশরথ-কৌশল্যা- দু'বেলা চন্নামেত্তর খেত। কিন্তু বৌদির সেই এক কথা- আমার বাপের বাড়ি এই, বাপের বাড়ি সেই- তিন বছর বিয়ে হয়ে গেল, এখনও শুধরালো না...।'
'ন্যাকামো দেখে আর বাঁচিনে....অসহ্য.....' কোনমতে রাগ চেপে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এল জয়া!

সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৪; মুম্বাই।

বাংলা অণু গল্প ২৯ - কেউ ফেরে না

কেউ ফেরে না ।।

খাণ্ডোয়ায় ট্রেনটা থামতেই নেমে পড়লেন পুনর্বসু ভট্টাচার্য। এদিক ওদিক তাকালেন একবার। ঐ তো, অর্জুন গাছটা ঠিকই আছে প্ল্যাটফর্মের এককোণে, কিন্তু না আছে সেই ময়না পাখিটা, না গাছের তলার সেই কুকুরটা। তপনই বা কোথায় গেল? এসি কামরাটা দাঁড়ায় প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষে, একটা চা-ওলা শুদ্ধু মেলেনা সেখানে। আর থাকবেই বা কেন? বাবুরা ঠাণ্ডায় ঘুমোবেন বেলা পর্যন্ত, তার পর কেটারিং-এর বাসি স্যান্ডুইচ আর ঠাণ্ডা চা খাবেন আরাম করে। এই পুনর্বসুবাবুর মত দু-চারটে পাগলাটে লোকের জন্যেই তপনের দোকান চলত।

দুর্গাপুরের তপন চক্রবর্তী নিঃস্ব অবস্থায় খান্ডোয়া স্টেশনে কিভাবে এল সে এক অন্য গল্প। বুড়ো ঠেলাওয়ালা বুধন কুশোয়াহার দয়ায় তারই সাথে পাঁউরুটি সেঁকার কাজে লেগে পড়েছিল, সেও প্রায় সাত বছর হল। অপুত্রক বুধনের ঠেলাগাড়ি এখন তপনেরই, বুধনের বিধবা তার আম্মা। আগে এই বোম্বে মেলের শেষ বগিটা ছিল ভীড়ে ঠাসা জেনারেল, একদিন ছক বদলে এসি কামরাগুলো দিয়ে দেওয়া হল সেখানে, ঝপ করে সেল কমে গেল তপনের। তখন সে শুরু করল অমলেট বানানো, তাতে কিছুটা অন্ততঃ সুরাহা হল।

কিন্তু হল কি ছেলেটার, পুনর্বসুর একটু চিন্তা হয় বৈকি! তিনি জব্বলপুরে রেলের ইঞ্জিনিয়ার, তিন কুলে কেউ নেই, অকৃতদার, শখের মধ্যে ব্রিজ খেলা আর বংশসূত্রে পাওয়া সংস্কৃত-চর্চা। বারবার অফিসের কাজে ভুসাওয়াল যেতে-আসতে প্রতিবার দেখা এই নিঃসহায় ছেলেটার প্রতি একধরণের মায়া পড়ে গেছিল। তাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতেও চেয়েছেন, তপনই রাজী হয়নি। এদিকে গাড়ি ছাড়ছে। উনি কি ভেবে কামরা থেকে ব্যাগটা নামিয়ে গাড়ি ছেড়ে প্ল্যাটফর্মের উপর এগিয়ে গেলেন।

ঠিক ট্রেন ছাড়তেই দেখা গেল তপনের ঠেলা। 'ওরে অকাল-কুষ্মাণ্ড, কুঞ্জকুঞ্জর, বন্যবরাহ, দস্যু-বর্বর!' বলতে বলতে পুনর্বসু তপনের হাতদুটো ধরলেন। 'আমি তোর খোঁজে গাড়ি ছেড়ে দিলুম, আর তুই ব্যাটা স্কন্ধকাটা আমাকে ফাঁকি দিতে এখানে এসে বসেছিস!'
'কি করছেন জ্যাঠাবাবু, লোকে দেখছে। এখন আর গাড়ি নেই, চলুন পুরোন জায়গায় গিয়ে বসি'- ওরা এলো সেই অর্জুন গাছটির নীচে। 'আচ্ছা জ্যাঠাবাবু, আপনার কখনও জানতে ইচ্ছে হয়নি কিসের নেশায় আমি স্টেশনের এই এককোণায় এসে ঠেলা লাগিয়ে বসে থাকতাম'?
'কি আবার, তুই তো আমার ব্যাটা, আমারই মত পাগল!'
'অনেকটা তাই বলতে পারেন। এখানে এসেই আমার চোখে পড়ে এই গাছটা, ওই ময়না পাখিটা যে মাঝেমধ্যেই মিষ্টি গলায় শিস দিয়ে উঠত আর গাছের তলায় নেড়িকুত্তাটা সারাক্ষণ মুগ্ধ হয়ে পাখিটাকে দেখত। আপনাকে আবার বলছি, জ্যেঠাবাবু, আমি ওদের কেউ নই, কিন্তু ওই দুটিকে ছেড়ে বেশিক্ষণ কোথাও গিয়ে টিকতে পারতাম না। পাখিরা কদ্দিন বাঁচে জানি না, একদিন ময়নাটা ফট করে মরে গেল। কুকুরটা তিন-চারদিন কোথাও নড়ে নি, আমি পাঁউরুটি দিলে খেত না, তারপর জানিনা কোথায় চলে গেল। তারপর আম্মাও গেল দু'মাস আগে, এখন আর শহরে আমার নিজের বলতে কেউ নেই'- একটু যেন রুক্ষ শোনাল তপনের গলা।
'তবে আর দেরী কিসের? আমার সাথে চল, পড়াশুনা করবি, তারপর রেলে ঢুকিয়ে দেব, কেমন?'
'যাব, জ্যাঠাবাবু। তবে একবার বাড়ি গিয়ে মাকে দেখে আসি। তারপর নিশ্চয়ই যাব।'

পুনর্বসু প্রতিবার ভুসাওয়াল যাওয়া-আসার পথে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকেন খাণ্ডোয়া স্টেশনের দিকে। নাঃ, তপনের চিহ্নমাত্র নেই সেখানে- সাক্ষী থাকে নীরব একটি অর্জুন গাছ।

মুম্বাই, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৪।

বাংলা অণুগল্প ২৮ - হিন্দু

হিন্দু ।।
স্বদেশ ও স্বরাজ, এই দুই মরাঠি বন্ধুর হাত ধরে মনসিজ দত্ত প্রথম এসেছিল এই সঙ্ঘে। শাখার কার্যবাহী সুভাষচন্দ্র অগ্রবালকে প্রথম দেখেই চমকে উঠেছিল সে। এই ত নেতাজি! খাকী হাফপ্যান্ট, সাদা শার্ট আর কালো টুপি পরে অবিকল তাই মনে হচ্ছিল তার, যদিও পরমুহূর্তেই সে তার ভুল বুঝতে পেরেছিল। 'দাদা, হা আমচা বঙ্গালি মিত্র আহে', স্বদেশ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাকে সবার সাথে।
তাহলে আজ মনসিজের খাতিরে একটা বাংলা দেশবন্দনা হয়ে যাক, এই বলে সুভাষদা সবাইকে নিয়ে কোরাসে ধরলেন-
'ওই শোন, জননী ডাকে সবারে।
শঙ্খ বেজেছে বজ্র স্বরে।।
ঝড় উঠেছে দেখ আকাশ জুড়ে
আর কে ঘরে থাকতে পারে...।।'

মনসিজ অভিভূত, এইরকম কোনও প্রতিষ্ঠানের কথা তার জানা ছিল না। প্রত্যেকটি কথায় শুদ্ধ হিন্দী বা সংস্কৃতের প্রয়োগ, ব্যায়াম, খেলাধূলা, গান ও তর্কবিতর্কের অনুষ্ঠান, ইস, এতদিন সে জানতে পারেনি কেন!
সেদিন বিন্দুদা প্রশ্ন তুলেছিলেন, হিন্দু শব্দের অর্থ নিয়ে। প্রায় সকলেই বলল, 'সনাতন ধর্মই হিন্দুধর্ম, যা আগে ভারতবাসীমাত্রেরই ধর্ম ছিল। বিজাতীয় মুসলমান ও খৃষ্টানদের প্রভাবে কালে কালে তা অনেকাংশে হারিয়ে যায়, এবং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তাকে উদ্ধার করার'। তবে মনসিজ বেশ কিছু পড়াশোনা করেছে এ বিষয়ে। সে বলল, ' সিন্ধুনদের বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে একসময় যে সভ্যতার বিকাশ হয় তার নামই কালে হয়ে দাঁড়ায় সিন্ধু বা হিন্দু সভ্যতা, তা থেকেই হিন্দুধর্ম। অতএব, যাঁরা নিজেদেরকে এই সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারাবাহক বা অঙ্গস্বরূপ মনে করেন, তাঁরাই হিন্দু, তাঁর পৈতৃক ধর্ম যা খুশী হোক না।'
'এই পরিভাষা তুমি কোত্থেকে পেলে?' ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র মিলিন্দের প্রশ্ন। 'আমি ডাঃ কেশব হেডগেওয়ারের লেখা পড়েছি', উত্তর এল।
সন্ধ্যে হতে চলেছে। পুরো মাঠে কারো মুখে কোনও কথা নেই। শুধু একটানা ঝিঁঝিঁ ডেকে চলেছে। প্রার্থনা শেষে বেরিয়ে আসতে আসতে আলগোছে কানে এল সুভাষজি, বিন্দুদাদের কণ্ঠস্বর-'না না, এখন কেউ কিছু বলবে না। খুব সতর্কভাবে এগোতে হবে, নয়ত নাগপুরের সন্মেলনে কি জবাব দেব...'
ঝিঁঝিঁপোকাদের দাপটে পরের কথাগুলো আর শুনতে পায় না মনসিজ। আর শোনবার প্রয়োজনও মনে করে না।
১০ই নভেম্বর, ২০১৪।

বাংলা অণুগল্প- ২৭ - ক্ষিদ্দা ২.০

ক্ষিদ্দা ২.০ ।।

১লা ডিসেম্বর, ২০০৪। ৪৯.১৩ সেকেন্ড। ছেলেটির মুখের দিকে আর-পি-এফের বড়কর্তারা তাকিয়ে আছেন। না, ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে বিশ্বরেকর্ড বা জাতীয় রেকর্ড, এমনকি রাজ্য রেকর্ডও হয়ত নয়, তবে একছুটে ওয়াগন ব্রেকার বা রেল-ডাকাত ধরতে তা যথেষ্ট ভাল, অর্থাৎ বিনয় মণ্ডলের সিলেকশন হয়ে গেল। সেদিনই সে জানতে পারল যে তার তিনমাস আগেই এথেন্স ওলিম্পিকে ৪৫.৪৮ সেকেণ্ড করে ভারতের নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়েছেন কে একজন বিনু। নাঃ, বয়েস হচ্ছে, আর বোধহয় এ রেকর্ড ছোঁয়া হবেনা এ জীবনে।
রবি ঠাকুরের কোনও একটা গানে চমৎকার একটা কথা ছিল, কি কথা মনে পড়ছেনা এখন - তারকেশ্বর স্টেশনের ফুট ওভার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ভাবছিল বিনয়। হঠাৎ নজরে পড়ল গুটিকয় বাচ্চা ছেলে তাসের জুয়া খেলছে সিঁড়ির তলায়। ব্রিজ থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বিনয়। কি সর্বনাশ! দলে একটা ন-দশ বছরের ফ্রক পরা মেয়েও আছে। তাকে দেখেই পুলিশ- বলে ছুটে এদিক ওদিক লুকিয়ে পড়ল সবকটা, আর মেয়েটা কি ভেবে ছুটে পালাতে লাগল। ছুটুক, বিনয় ভাবল, তার হাত এড়িয়ে যাবে কোথায়!
কিন্তু বিনয় যা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি তাই ঘটল। তাকে দৌড়ে হারিয়ে মেয়েটি কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখোঁজ। সামান্য একটা বস্তির মেয়ে হয়ে খালিপায়ে দৌড়ে হারিয়ে দিল আর-পি-এফের চ্যাম্পিয়ানকে! অন্য কেউ হলে কি হত জানিনা, কিন্তু বিনয় শান্তভাবে তাকিয়ে থাকল মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে। তার চোখে এক দুরূহ, দুঃসাধ্য স্বপ্ন।
পাঁচ বছর পরের ঘটনা। কোচিনের জাতীয় জুনিয়ার এথলেটিক্স মীটে হৈহৈ কাণ্ড। ৪০০ মিটারে মেয়েদের সিনিয়ার রেকর্ড মনজিত কাউরের ৫১.০৫ টি প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে বাংলার কোন অখ্যাত ছুটকি কোনার। বাংলারই আর একটি বাচ্চা ছেলে দাশু বাউরি, ছেলেদের ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে সগর্বে দাঁড়িয়ে মেডেল নিচ্ছে, সবাই তাকে ডাকছে 'মাস্টার বোল্ট'। সে আজ ভেঙ্গেছে দুটি জাতীয় জুনিয়ার রেকর্ড, ১০০ ও ২০০ মিটারের। কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছে তাদের কোচ বিনয় মণ্ডল, চোখে তার আজ আনন্দাশ্রু। পাঁচ বছর আগে পুলিশের ভয়ে পলাতকা একটি বালিকাকে নিয়ে যে বীজটি সে বপন করেছিল, সে গাছে আজ ফল ধরতে শুরু করেছে। ওই গরিব-দুঃখী ছেলেমেয়েগুলোর মাঝে সে তার স্বপ্নকে সাকার হতে দেখতে শুরু করেছে, ওদের মাঝে সে খুঁজে পেয়েছে নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্বাকে।
এ পৃথিবীতে সবই নশ্বর। তবু তো চলা থেমে থাকে না। বিশ্বাত্মা এক থাকে, শুধু নিত্য নূতন মাধ্যমের পরিবর্তন ঘটে, মনে পড়ে যায় ভুলে যাওয়া গানের চরণ-
'তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে, কুসুম ফোটে।'
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
মুম্বাই, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৪।

Thursday, November 20, 2014

বাংলা অণু-গল্প- ২৬- 'সমস্যা'

সমস্যা ।।


'এসো, এসো, বিভাস', স্বামী লোকহিতানন্দের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল বিভাস মহারাজ, ওরফে স্বামী পীতাম্বরানন্দকে দেখে, 'তারপর, পশ্চিম ভারতের খবর কিরকম?'
'সব ভাল, মহারাজ', বিভাস বললেন, 'এবার মুম্বাই-পুনে-নাশিক মিলিয়ে রেকর্ড কালেকশন হয়েছে। কাশ্মীরের বন্যাপীড়িতদের জন্যে আরেকটা কিস্তি পাঠাতে পারেন।'
পূর্বাশ্রমের নাম পরিত্যাগ করে বিভাস মহারাজের সদ্য নতুন নামকরণ হয়েছে নিয়ম অনুযায়ী সঙ্ঘে যোগ দেওয়ার বারো বছর পরে। গত বারো বছর ধরে তিনি মুম্বাই ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে সংঘের জন্যে চাঁদা তোলার কাজ সাফল্যের সাথে করে আসছেন। এবার তাঁদের লক্ষ্য পুণেতে আশ্রমের একটি শাখা খোলার।

'পুণের খবর কি, বিভাস', স্বামীজির ডাকে চমক ভাঙে বিভাস মহারাজের, 'কর্পোরেশনের মেয়রের সাথে দেখা হয়েছিল?'
'হ্যাঁ মহারাজ। জমি মাস ছয়েকের মধ্যেই পাবার সম্ভাবনা আছে। তবে পাষান রোডে এন-সি-এলের কিছুটা উদ্‌বৃত্ত জমি আছে, আরো কিছুদিন অপেক্ষা করলে সেটাই পাওয়া যেতে পারে।'
'হুঁঃ, সুখবর সন্দেহ নেই। চিন্তা তারপর কি হবে তাই নিয়ে। ওখানে বসাব কাকে? কেদারনাথ আর গৌরীকুণ্ডের ধ্বসে তিনজন সিনিয়ার স্বামীজী নিহত হয়েছেন। কাশ্মীরে লোক পাঠাতে গিয়ে কেদারনাথের পুনর্নির্মাণের কাজে ঢিলে পড়ে গেছে। তোমাকে পুণের দায়িত্ব দিলে টান পড়বে কালেকশনে। নতুন সন্ন্যাসী প্রায় আসছেই না যে।'
'সে কি মহারাজ,' এবার বিভাসকেও চিন্তিত দেখাল। 'সবাই কি বস্তুবাদী হয়ে পড়ল, না কি এন-জি-ও গুলো টেনে নিচ্ছে সবাইকে? যাই বলুন, বিজ্ঞাপন আর বিপণনের জৌলুষে আমাদেরই এ বয়সে মাথা ঘুরে যায়, আর তারপর ঈশ্বরে বিশ্বাসও কমে আসছে মানুষের মধ্যে।'
'দেখো, ভোগবাদের মধ্য থেকেই মহাপুরুষেরা বেরিয়ে আসেন। আর তোমাকে বলতে বাধা নেই, আমিও নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু লোকহিতকেই নিজের ধর্ম মনে করি। সমস্যাটা অন্যত্র। এর জন্য দায়ী ভাল পরিবারগুলোর মধ্যে সফল জন্মনিয়ন্ত্রণ।'
'তার মানে', এবার বিভাস সত্যিই অবাক হলেন।
'আর কি, সব বাড়িতেই এখন একটি কি দুটি সন্তান। দুই বা তার বেশী পুত্র আর কোথায় যে বাপ-মা এক ছেলের সন্ন্যাসী হওয়া মেনে নেবে। সেদিন একটি ছেলে এসেছিল, যাদবপুরের ইঞ্জিনীয়ার। তারপরেই তার মা-বাবা এসে হাজির, ওকে ফিরিয়ে দিন স্বামীজী, আমাদের ওই একটি ছেলে - বলে সে কি কান্না! ছেলেটিকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি ফেরত পাঠালাম।'

এইবার দুটো দীর্ঘশ্বাস একসাথে পড়ল।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
মুম্বাই, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৪।