Wednesday, November 26, 2014

বাংলা ছোট গল্প - ডাক্তার

 ডাক্তার 


- এই যে তোমরা বল, 'রোগ সারাতে পারে না, সে আবার কেমন ডাক্তার', কথাটা কতটা ভুল, তা জানো?
- মানে কি বলতে চাও, রোগ সারাবে না, অথচ তাকে ভালো ডাক্তার বলতে হবে! মগের মুল্লুক নাকি?

কথা হচ্ছিল ডাঃ উপল রায়, আসানসোলের এক নামকরা ডেন্টাল সার্জনের সঙ্গে, যিনি আবার বৈবাহিক সুত্রে আমার আত্মীয়। আসানসোলের নিউ রোডে আমার বোনের বাসায় সেদিন সন্ধেয় কী কারণে যেন ওদের নিমন্ত্রণ ছিল। খাওয়াদাওয়ার পর ছাতে বসে আড্ডা দিচ্ছি চারজনে, বাকি দুজন আমার ভগ্নিপতি অভি ও তার ভাই অসি। ডাক্তাররা কিভাবে সরল রোগীদের ঠকিয়ে ব্যবসা করে সেই নিয়েই কথা হচ্ছিল। উপল আমাদের বিপক্ষে। আমাদের সাধারণ জ্ঞানের বাইরেও যে একটা জগৎ আছে সেইটে প্রমান করতেই সে বদ্ধপরিকর।

- মানে? 'দেয়ার আর মেনি থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ' জাতীয় কোন ব্যাপার আছে নাকি এর মধ্যে? আমার তরফে সারকাজম শুনে হাসে উপল। 
- ওই তো! সব কিছুর মধ্যেই তোমরা অলৌকিকত্ব টেনে আনতে চাও। বেশ, তোমাদের তাহলে একটা সত্য কাহিনী বলি, তাহলে ব্যাপারটা বোধগম্য হবে। এই যে আসানসোল-বরাকর-চিত্তরঞ্জনের মধ্যেকার ত্রিভুজাকৃতি অঞ্চল, এটা কিন্তু নামেই বাংলা, এখানে প্রায় ৩০-৪০% বিহারী ও ঝাড়খন্ডি আদিবাসী বাস করে। তারা যে সবাই গরিব তা নয়, কিন্তু শিক্ষিত লোক হাতে গোনা যায়। আবার শিক্ষিতদের মধ্যেও বিদ্যার প্রকাশটুকু বাইরে, চারদেয়ালের মধ্যে কিন্তু তারা সেই বউ-ঠ্যাঙানো মধ্যযুগটাকেই আঁকড়ে আছে। এই চিত্তরঞ্জনেই থাকে আমার এক বন্ধু, কলকাতা থেকে ডাক্তারি পাস করে বিলেতে গিয়ে MRCOG বা সংক্ষেপে গাইনি করে এলো। তারপর মিহিজামে নিজের ক্লিনিক আর ডিস্পেন্সারী খুলল।
- কিন্তু, মিহিজাম কেন?
- আরে, দুটো একই শহর, গা ঘেঁসাঘেঁসি। চিত্তরঞ্জন বেঙ্গলে, মিহিজাম বিহার ছিল, এখন ঝাড়খন্ডে। চিত্তরঞ্জনে কিছু শুরু করতে গেলে নানা পলিটিক্যাল সমস্যা, আর মিহিজামে হোমিও আর বায়ো কেমিকদের রমরমা। দুটিই চ্যালেঞ্জিং, তা প্রবীর, সঙ্গত কারণেই আসল নামটা বলছিনা, দ্বিতীয়টাকেই বেছে নিল। অঞ্চলে নামী ডাক্তারের অভাব, তাই পসার জমতেও দেরী হলো না। কিন্তু কিছু লোকের দেহাতি মনোভাবের জন্যে ওকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল মাঝে মাঝে।
- সেটা কিরকম, অভির প্রশ্ন। এরপরের গল্পটা উপলের ভাষাতেই বর্ণনা করছি।

সেবার এক বিহারী মাইনিং সর্দার, বোধ হয় ভিক্টোরিয়া কোলিয়ারী বা ওদিকে কোথায় কাজ করে, তার কাছে এলো বৌকে দেখাতে, কি না বিয়ের তিন বছর হয়ে গেল, ছেলেপুলে হচ্ছে না। তা প্রবীর যথারীতি ভদ্রলোককে সিমেন টেস্ট আর বৌটির একটা আল্ট্রাসনিক আর সার্ভিক্যাল স্মিয়ার টেস্ট করাতে বলল, ওর ক্লিনিকেই ব্যবস্থা ছিল, হয়ে গেল। দু-দিন পরে বৌকে নিয়ে শাশুড়ি হাজির রিপোর্ট নিয়ে। বললাম, মাজি, তোমার বৌমা ত ঠিকই আছে, তা ছেলের রিপোর্টে একটু খুঁত আছে, তোমাকে বলে তো হবে না, ছেলেকে পাঠিয়ে দিও। মা-টি তো চরম গাঁইয়া অথচ ধড়িবাজ, বলে, 'কা বোলত হো ডাগদর বাবু, মরদমে খোট! দিমাগ ঠিকানে মে বা নু?' প্রবীর দেখল ওকে বোঝানোর চেষ্টা করা বৃথা, বলল বৌ-এর চিকিৎসা করতে গেলেও তো তার মরদের সাথেই কথা বলতে হবে, নচেৎ সম্ভব নয়।

 তা দু-চারদিন পরে লোকটি এল, এবার একা। প্রবীর ওকে বুঝিয়ে বলল, তার স্পার্ম কাউন্ট অ্যাবনর্মালি লো, মোটালিটিও অনেক কম, তাই বেশ কিছুদিন চিকিৎসা করাতে হবে। ও তো রেগে অস্থির, ডাক্তার কিছু জানেনা। কে কবে কোথায় শুনেছে যে পুরুষের দোষে বাচ্চা হয় না। 'মর্দ মে খোট! ই কোনহ বিলায়তি মজাক বা!' এইবার ডাক্তারবাবুর হুঁশ হয়েছে যে কাদের পাল্লায় তিনি পড়েছেন। পুরুষতন্ত্র যে এখানে কত গভীরে শিকড় গেড়ে বসে আছে, তার একটা আভাস পেল এবার। কলকাতার লোক হলে হয়ত তার বিশ্বাস হত না, কিন্তু প্রবীর ওই অঞ্চলের মানুষ, son of the soil। ওর বুঝতে দেরী হলো না এরপর তর্ক চালাতে গেলে লোকটি দলবল নিয়ে আসবে, মারপিট শুরু হবে, হয়ত ক্লিনিকই বন্ধ হয়ে যাবে। আর তা না হলেও, বদনাম, ব্যবসার ক্ষতি। আর এ লোকটি যদি ভালো হয়, কিছুই না করে, তবু সে আর ফিরে ওর কাছে আসছে না, এটা নিশ্চিত। এখন যে তার মনের মত কথা বলবে তার কাছেই সে ছুটবে। অগত্যা প্রবীর এবার একটু নমনীয় হলো।

- আরে ঐসা কুছ নেহি। বিবিজি কা ইলাজ তো করবো পড়ি, পর আপকো ভি থোড়া মজবুত বনাইকে খাতির থোড়া দওয়া-দারু.... এই বলে ম্যানিক্স নামে আয়ুর্বেদিক গুলি লিখে দিলো তাকে, রোজ সকালে দশটা ট্যাবলেট দুধ, মধু আর বাদামের সাথে খাবার জন্যে। অনুপান দেখে ব্যাটা বেশ খুশি, বুঝলো, তাগড়া ব্যাটা বানাবার জন্যে ওর পুরুষত্ব বাড়াতে এই ওষুধ, আর কিছু নয়।
- কিন্তু সত্যি কি এতে কাজ হয়? এবার আমার প্রশ্ন উপলকে।
- কিছুটা হয়। বিশেষত: যদি কোনো সাময়িক অসুস্থতার কারণে কাউন্ট বা মোটালিটি কমে গিয়ে থাকে। তা নইলে পুরুষের কোনো খুঁত থাকলে কৃত্রিম গর্ভাধান ছাড়া কোনো গতি নেই, অবশ্য মেয়েটি যদি নরম্যাল থাকে।
- হুঁ, তারপর কি হলো?

তারপর যথারীতি নাম-কে-ওয়াস্তে চিকিৎসা শুরু হলো মেয়েটির। শুধু নানাধরনের ভিটামিন পিল আর মাঝে মাঝে একটা করে সনোগ্রাফি। সেটাও না করলে সন্দেহ হবে তাই। এই ভাবে দু-বছর চালানো হলো। তারপর একদিন সে ওদেরকে বলল, 'দ্যাখো, আমি চিকিৎসা করে প্রায় সুস্থ করে এনেছি তোমার বৌকে। কিন্তু সমস্যা এতটা বড়, যে কলকাতায় একজন নামী ডাক্তারের কাছে যেতে হবে তোমাদের, খরচা আছে। প্রায় লাখ-দুয়েক খরচ করতে পারবে?
- বেটোয়া কে খাতির ই কোন বড়ি বাত বা। খরচা-পাতি করব। আপনি ডাক্তারকে সব বুঝিয়ে লিখে দিন।

প্রবীরের এক বন্ধু, ডাঃ চ্যাটার্জি টেস্টটিউব বেবি খ্যাতিসম্পন্ন ডাঃ বৈদ্যনাথ চক্রবর্তীর সহকারী ছিলেন এককালে, এখন নিজেই ফার্টিলিটি ক্লিনিক খুলেছেন কলকাতায় ও বেশ নাম করেছেন। তাঁকে সব কিছু লিখে লোকটিকে ছেড়ে দিল প্রবীর। তারপর দু'টো বছরও যায় নি, ছেলে কোলে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে এসে হাজির বিহারী-দম্পতি। বৌটি পায়ে পড়ে আর কি। বলে, ‘নেহি ডাগদর সাব, ইয়ে বেটা নেই হোতা তো সৌতন কা মুহ দেখনা পড়তা, হমরে লিয়ে তো আপহি ভগবান হো’। ভাবো তো মজা! যেখানে সে ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিল, সেখান থেকে একেবারে সোজা দেবতার আসনে!

- কিন্তু তাতে কি প্রমান হলো উপলদা, অসি এবার মুখ খুলল, তাদের যদি শেষমেষ বাচ্চা না হত?
- কিন্তু তার উল্টো দিকটা দ্যাখো। প্রবীর তো ডাক্তার হিসেবে ঠিক কাজই করতে গেছিল, কিন্তু তাতে ওর বদনামই হত, অথচ প্রমান হতনা যে সে খারাপ ডাক্তার। নাঃ, অনেক গল্প হলো, এবার উঠতে হবে, বলে আমাদিগকে ভ্যাবাচ্যাকা করে রেখে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল উপল।

২৮শে জুন, ২০১৪

বাংলা অণু গল্প ৩৪ - সূক্ষ্ম-শরীর (অফিসের গল্প-২)

সূক্ষ্ম শরীর ।।

আজ অনেকদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল...তা বছর দশেক তো হবেই। আমাদের রিগের ইনস্ট্রুমেন্টেশন সেকশানে রবিবাবু বলে একটি তেলুগু ছোকরা ইঞ্জিনিয়ার কাজ করত। কাজে-কর্মে ও মন্দ ছিল না, কিন্তু ওর জনপ্রিয়তা ছিল অন্য একটা কারনে যেটা নিয়ে বাকি রিগগুলোর মধ্যে তাকে নিয়ে বেশ টানাটানি ছিল। সেটা ছিল ওর কাঠির মতো শরীর। অফশোর রিগের বেশ কিছু ইলেক্‌ট্রনিক সার্কিট, প্যানেল বা সেন্সারে ঠিকভাবে কাজ করতে গেলে ম্যানহোল বা ক্যাবিনেটের ঢাকনা খুলে তার ভিতরে ঢুকে যেতে হয়, নয়ত ভাল কাজ হয় না। আর দেহের সূক্ষ্মতার কারনে এ কাজে রবিবাবুর জুড়ি ছিল না।
একদিন হয়েছে এক কান্ড। ইউনিট চালু করার আগে কুলিং ওয়াটার পাম্প অন করতে আমি সাব-বেসে নামছি, সিঁড়ি থেকেই দেখতে পাচ্ছি রবিবাবু হিট-এক্সচেঞ্জারে কিছু একটা করছে। হঠাৎ চোখের পলক ফেলার মধ্যেই দেখি সে গায়েব। গেল কোথায়? প্রায় ১০০ ফুট নীচে উত্তাল সমুদ্র। রেলিঙের ফাঁক দিয়ে পড়ে গেল না তো! একটু দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলাম। মাই গড! ছয় ইঞ্চি ব্যাসের সী-ওয়াটার ডিসচার্জ লাইনের পাশ থেকে বেরিয়ে এলো রবিবাবু, সশরীরে, নাকি সূক্ষ্ম-শরীরে! তার পর থেকে ওর নামকরণই হয়ে গেল ইউডি (ইউনিডাইমেনশনাল বা একমাত্রিক)।
হঠাৎ একদিন রবিবাবু আমার অফিসে হাজির। 'গারু, একটা কথা ছিল, কিন্তু বলতে সংকোচ হচ্ছে।' জানা গেল, ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে, এক বিশাল অংকের পণের বিনিময়ে। কিন্তু ভাবী শ্বশুরের একটি শর্ত, সমুদ্রের কাজ ছাড়তে হবে। 'আরে তুমিও যেমন, রবি', আমি বললাম, 'চাকরি ছেড়ে দাও, এত টাকা পাচ্ছো, তারপর ব্যবসা কর'। 'না গারু, আমার চাকরির জন্যেই এই বিয়ে, দেখুন না কাউকে বলে কিছু করা যায় কিনা', তার সকরুণ অনুরোধ। কাজটা কঠিন ছিল, নেহাৎ প্রসেসে একজন ইঞ্জিনিয়ার সেই মুহূর্তে দরকার ছিল বলে গ্যাস কম্প্রেশন প্ল্যান্টে ও বদলি পেয়ে, সুরাট জয়েন করতে চলে গেল।
আজ এতদিন পরে তার কথা কেন উঠল? বান্দ্রা থেকে বোরিভিলি শেয়ার ট্যাক্সিতে বসে আছি, ওরা পিছনে চারজন, সামনে দুজন সওয়ারি নেয়। দেখি ড্রাইভার আমায় অনুরোধ করছে সামনের সীটে গিয়ে বসার জন্যে, এক দম্পতি পিছনে বসবেন চারজনের ভাড়া দিয়ে। রবিবাবু আমাকে ঠিক চিনেছে কিন্তু আমি চিনতে পারি নি, কারণ সে তো তখন রীতিমত থ্রী-ডি! শ্বশুর আর তার মেয়েতে মিলে আর চান্স নেয়নি, রবিবাবুর চেহারা এখন আর হাতির আড়ালেও ঢাকা পড়বে না।
১০ই জুলাই, ২০১৪

বাংলা অনুগল্প ৩৩ - সত্যি হলেও গল্প (অফিসের গল্প-১)

সত্যি হলেও গল্প ।।

অনেকদিন আগেকার কথা। প্রজেক্ট অফিসে উচ্চ পর্যায়ের মীটিং চলছে। রিজিওন্যাল ম্যানেজার বেজায় খাপ্পা। কোনও মেসিন ফুল এফিসিইয়েন্সি তে রান করছে না। বিশেষ করে ইলেকট্রিক সেকশানে। পাওয়ার ফ্যাক্টার এত কম কেন? এই যে মিঃ মণ্ডল, চুপ করে কেন, প্লীজ সে সামথিং!
মণ্ডল সাহেব সেকশানের হেড। উনি টাকমাথা চুলকে যাচ্ছেন দেখে পাশে বসা এসিস্টান্ট চন্দ্র কানে কানে কি যেন বলল। আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল মিঃ মণ্ডলের চোখমুখ। উনি উঠে বললেন, 'স্যার, আমাদের ট্রান্স্‌ফর্মারগুলো দেখুন। ৪৪০ ভোল্টকে ৬৫০এ কনভার্ট করে দিচ্ছে, একেবারে ১৫০ পারসেন্ট এফিসিয়েন্সি!' এই বলে সগর্বে হলের চারদিকে একবার তাকিয়ে নিলেন। দু মিনিট চুপচাপ, যেন কোনও নেতার মৃত্যুতে শোকপালন হচ্ছে। তারপরেই রাগে ফেটে পড়লেন আর-এম। 'গেট আউট, গেট আউট......' পাগলের মতো চেঁচাতে থাকলেন যতক্ষন না মন্ডল সায়েব হল থেকে বেরিয়ে গেলেন।
পরে ক্যান্টিনে আমরা জুনিয়ার মহলে এ নিয়ে হাসাহাসি করছি। স্টেপ-আপ ফ্যাক্টার হয়ে গেল ট্রান্সফর্মারের এফিসিয়েন্সি, কোথাকার ইঞ্জিনিয়ার উনি! সিন্‌হাদা আমাদের মধ্যে একটু বয়স্ক, ৭০ সালে ঢাকা থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে উনি ৭১এর দাঙ্গার সময় রায়গঞ্জে চলে আসেন ও বাকী পড়াশোনা ভারতেই করেন। সিনহাদা বললেন, 'মণ্ডলের গল্প শুনতে চাও তো আমায় জিগ্যেস কর।' আমরা হ্যাঁ হ্যাঁ করে উঠতেই উনি শুরু করলেন।
- '১৯৭১এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে তখনও ভারতের সাড়া পাওয়া যায়নি সাহায্যের। খানসেনা আর তাদের বাংলাদেশী চামচেদেরি রমরমা। হিন্দুরা দলে দলে পালাচ্ছে ইন্ডিয়ার দিকে, পেছনে জামাত-ই-ইসলামের দল তাড়া করে যাচ্ছে, ধরতে পারলেই লুট-অত্যাচার-ধর্ষণ-খুন। একটা দল তখন তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে যশোর থেকে বেনাপোলের দিকে। জামাতিদের ধাওয়া করা দলটাতে একটি ছোকরা ছিল নুরুল হুদা নামে। সরষার কাছে ও একটু পিছিয়ে পড়েছিল দলছুট হয়ে। হঠাৎ একটা গোঙানির আওয়াজ শুনে দেখে একটা লোক পড়ে আছে রাস্তার ধারে ঝোঁপের ভিতর, মাথায় ভারী কিছুর চোট। নুরুল যেতে লোকটা ততক্ষণে মরে গেছে। পকেট হাতড়ে দেখে পয়সাকড়ি কিছু নেই, শুধু প্লাস্টিক মোড়া একটা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমার সার্টিফিকেট, নাম লেখা নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডল। সেই মুহূর্তেই ভাবনাটা মাথায় এল। কি হবে ছাই বাংলাদেশে ফিরে, আর ধর্ম বা জামাত যে গোটা জীবন খাওয়াবে তার গ্যারান্টি কি? আত্মীয়স্বজন বলতেও কেউ নেই, অগত্যা...।
- 'অগত্যা বেনাপোল। বেনাপোল জান তো, যশোর আর চব্বিশ পরগনার মাঝে বাংলাদেশ বর্ডার, গোলেমালে বর্ডার পার হয়ে নুরুল চলে এল পেট্রাপোল, ইন্ডিয়া। এখন তার নাম হল নারায়ণচন্দ্র মণ্ডল।'
- 'বলেন কি দাদা!' আমরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম। এই মণ্ডল সায়েবই......
- 'তবে আর বলছি কি। তারপর কলকাতায় এসে উনি ঝটপট করে ফেললেন একটা ইলেকট্রিসিয়ানের কোর্স, নামে মণ্ডল ছিল, পেয়ে গেলেন কাস্ট সার্টিফিকেট। সরকারি চাকরি পেতে আর কি চাই!' চা শেষ করে এবার উঠলেন সিন্‌হাদা, পিছনে আমরা সবাই।
মাস দুই পরে সিন্‌হাদা ধরেছেন আমাকে। 'কি হে মুখার্জি, আমার গল্পটা দিব্যি ছাপিয়ে দিলে যে পত্রিকায়! নেহাত গুলের ওপর কপিরাইট থাকেনা, নয়ত আমি খেসারৎ দাবী করতাম', সিন্‌হাদা হাসলেন দাঁত বের করে।
আমি আর কি করি? বললাম, 'দাদা, আপনার স্টাইলটা যদি বাগাতে পারতাম, আমার গল্পটাকেও সত্যি বলে ধরত লোকে। কিন্তু জানি সেটা আমি এ জন্মে পারবনা'।
কুয়েত, ১৯শে আগষ্ট, ২০১৪।

বাংলা অণু গল্প ৩২ - চিরন্তনী

চিরন্তনী ।।

অহল্যা উদাস হয়ে বাতায়নপ্রান্তে বসেছিলেন। তাঁর প্রতি কঠিন শাস্তি আরোপ করেছেন তাঁর পতিদেব ঋষি গৌতম। প্রস্তররচিত কারার অভ্যন্তরে তাঁকে থাকতে হবে যতদিন না স্বয়ং ঈশ্বর সে কারাগার ধ্বংস করে তাঁকে মুক্তি না দেন। তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ এবং তা যে মিথ্যা নয় তা ঋষিও অনুমান করেন, যদিও তাঁর মনে বিশ্বাস যে এর জন্যে দেবরাজই একা দায়ী, গুরুর ছদ্মবেশে......।
চমক ভাঙ্গল পরিচিত কণ্ঠস্বরে। ‘এ কি, ইন্দ্র তুমি! কি সাহসে আবার এসেছ এখানে? আর তোমার শরীরে সহস্র লোচন আঁকা কেন?’
‘ধীরে, অহল্যে, ধীরে। গুরুদেব এখন প্রস্তর-কারাগার নির্মানে ব্যস্ত, এ মুহূর্তে তাঁর এখানে আসার সম্ভাবনা নেই। আর এগুলো লোচন নয়, যোনি-চিহ্ন, গুরুদেবের অভিশাপ।‘
‘তার মানে ঋষির শাপে ফল হয়!’
‘পাগল!’ ইন্দ্র হাসলেন। ‘তোমার নারীত্বের দাবী আমি মিটিয়েছি, করেছি পুরুষের কর্তব্য। কিন্তু সমাজের চোখে আমি অপরাধী, নৈতিকতার দিক দিয়েও। তাই ঋষির মান রাখতে ওগুলো শরীরে আমি নিজেই এঁকে নিয়েছি।‘
‘সে কি! আর অন্য অভিশাপ?’
‘সে তো আর পোষাকের আড়ালে বোঝা যাবে না, লোকে যা খুশী কল্পনা করে নেবে। এখন বল, আমার প্রতি তোমার কোনও অভিযোগ নেই তো?’
‘হে দেবরাজ, তুমি আমাকে পূর্ণ করেছ। দিয়েছ নারীর মর্যাদা। বিশ্বাসহনন আর চরিত্রহীনতার সমস্ত দায় তুলে নিয়েছ নিজের উপর। দোষ তো আমারও কম ছিল না। তোমার ঐ ছদ্মবেশও আমি মুহূর্তেই ধরে ফেলেছিলাম। আর কি করতে চাও তুমি!’
‘দেখ আমি দেবতাদের অধিপতি। স্বর্গমর্তের শৃংখলা রক্ষার ভার আমার উপরে, আর ঋষি গৌতমের হাতে আছে সমাজধর্ম রক্ষার দায়িত্ব। শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে। তাই আমি দেবর্ষিকে পাঠিয়েছি ঋষি বাল্মিকীর কাছে। তিনি ইক্ষাকুকুলপতি রামের জীবনকাহিনী রচনা করবেন। তিনি তোমার এই পতিরূপে উপপতিসেবার বৃত্তান্তটাই উল্লেখ করবেন এই কাব্যে।‘

‘তবে আমার ধারণা’, ইন্দ্র বলে চললেন, ‘বিশ্বের লোক একসময় নারীর চোখ দিয়ে সব কিছু বুঝতে সক্ষম হবে, তাই সেই সময়ের নিরিখে আমার সাধনা হবে ভবিষ্যতের নারী যেন আপন ভাগ্যকে জয় করবার অধিকার পায়, আপন মানসিক ও শারীরিক দাবী যেন মুখ ফুটে বলতে পারে, অহোরহ সেই প্রচেষ্টায় রত থাকা।‘
এই বলে দেবরাজ ইন্দ্র বিদায় নিলেন।

মুম্বাই ২৯শে আগস্ট, ২০১৪।

বাংলা অনু গল্প ৩১ - একটি মিথ-থা প্রেমের গল্প

একটি মিথ-থা প্রেমের গল্প ।।

নাঃ, আর পারা যাচ্ছে না। সেই সাড়ে ছটায় অফিস থেকে ফিরেছে উমা। তারপর রান্না শেষ হতে আটটা। দুজনের কাজ, কতটুকু আর! কিন্তু অনিমেষের ফিরতে প্রতিদিন অন্ততঃ এগারটা। তাও বুঝত যদি অফিসে কাটায় সময়টা। ফিরবে তো সেই আকণ্ঠ গিলে। ছেলেকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবার পর আর একা একা সময় কাটে না। অথচ ব্যাপারটা লজ্জার, সবাইকে বলাও তো যায় না! উমা কি ভেবে শেষে শ্যামাকেই ফোন করল। কিছুটা তো সময় কাটুক।
শ্যামা উমার পিঠোপিঠি ছোট বোন। সত্যিই সে শ্যামাঙ্গী, উমার ঠিক উলটো। অথচ ওদের এরকম কোনও জ্বালা নেই। ও আর বর দীপ্তেন্দু দুজনেই একই স্কুলে পড়ায়, একমাত্র মেয়েকেও ভর্তি করেছে সেখানে। খুব উচ্চাশা না থাকলেও নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার। শ্যামা একটু অবাকই হল, দিদি এসময় ফোন করায়। 'হ্যাঁ, ভাল আছি, তোরা? জামাইবাবু কোথায়? সে কি, এখনও ফেরেনি! আচ্ছা?...
কথা চলল আধঘণ্টার মত। 'ঠিক আছে, জামাইবাবুকে একটা ফোন করছি। আর শোন, যা বললাম, তেমনটি করবি, কেমন? দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে।' শ্যামা ওদিক থেকে লাইন কেটে দিল।
রাত দশটা নাগাদ অনিমেষ ঘরের বেল বাজাল। ভেতর থেকে শুনল উমার গলা, 'আসছি, এত দেরী করতে হয়, এদিকে অনিমেষের আসার সময় হয়ে গেল।' বলতে বলতে দরজা খুলল উমা। 'ওমা, তুমি!' যেন জোর করে খুশী হবার নাটক করল সে।
'কেন, তুমি কাকে ভেবেছিলে?' গলায় ঝাঁঝ নিয়ে বলে অনিমেষ।
'আমি! কাকে আবার? আমার আর কে আছে কোন চুলোয়? একটা বোন আছে, তারও তো সময় নেই, নিজের ফ্যামিলি নিয়েই ব্যস্ত!'
'কেন, শ্যামা নাকি কল করেছিল, তুমি ফোন তোলনি!'
'কি জানি, আমি তো শুনিনি, হয়ত বাথরুমে ছিলাম।'
আর কথা না বাড়িয়ে চেঞ্জ করতে গেল অনিমেষ। পরদিন থেকে জানিনা কেন ঠিক সাতটার মধ্যে ঘর ফিরতে লাগল অনিমেষ।

উমাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কাল অফিস থেকে আসার পথে একটা কাজ করতে হবে। এক বোতল ভাল স্কচ আনতে হবে, ব্যাপারটা মহিলাদের পক্ষে শোভন না হলেও। ও হ্যাঁ, আর একটা ফোন, শ্যামাকে, থ্যাঙ্কস জানিয়ে।

কুয়েত, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৪।

অণু গল্প ৩০ - বাপের বাড়ি

বাপের বাড়ি ।।

'তপা রে, তোর শ্বশুরবাড়ি ঘুরে এলাম। উঃ, একটা দুর্ভাবনা কাটল', তরুণ ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই কথাগুলো বলল। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে বলা, সে যেন কিছু শুনতেই পায়নি এমন ভান করে যাচ্ছে। 'কি রে, কিছু বলছিস না যে?'
'আমি আবার কি বলব! তোরা ঘাড় থেকে আইবুড়ো বোনকে নামাচ্ছিস, খুশী তো তোদেরই হবার কথা'- তপা ছদ্ম ঝাঁঝের সাথে বলল।
'না রে। তোর বরটা খুব ভালমানুষ, শ্বশুর-শ্বাশুড়িও তথৈবচ। ভাবছিলাম তুই ঝগড়া করবিটা কার সাথে। তা আজ তোর ননদ কুটিলাদিকে দেখে সে চিন্তাটা ঘুচল। আস্ত খাণ্ডারনী একটি!'
'আহা, আমি যেন ঝগড়া করতেই ও বাড়িতে যাচ্ছি! কিন্তু হ্যাঁরে দাদা, সত্যি ওর নাম কুটিলা?'
'দূর বোকা, ঠাট্টাও বুঝিস না! তবে সাবধান, বিবাহিতা হলেও উনি প্রায় সারাক্ষণই বাপের বাড়িতে। সেখানে আবার নিজের বাপের বাড়ির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে যেও না সবসময়।' তরুণের সাবধান-বাণী।

যাক, বিয়েটা ভালয় ভালয় চুকে গেল, ফুলশয্যাও। তারপর একদিন ননদ জয়া ধরেছে তপাকে। 'এই যে দত্তবাড়ির মেয়ে, ওয়েলকাম টু সরকারবাড়ি- এখন থেকে তোমারও বাড়ি এটাই। আমি কিন্তু সে ধরনের মেয়েদের দু-চক্ষে দেখতে পারিনা যারা বিয়ের পরেও বাপের বাড়ির মেয়ে হয়ে থেকে যায়, সারাক্ষণ শুধু বাপের বাড়ির গল্পই করতে থাকে। আমি নাহয় একটু পষ্টো কথা বলি তাই লোকে অনেক কিছু বলে, কিন্তু আমার ভাইটি একেবারে হীরের টুকরো ছেলে, সে যেন কখনও কিছু ফীল না করে। আর মা-বাবা বলতে এখন শুধু তোমার বরের মা-বাবা, এমনকি তোমার কুকুর-বেড়াল বলতেও এ-বাড়ির কুকুর-বেড়াল, বুঝেছ?'
'একশোবার!' তপা একটু অস্বাভাবিক জোর দিয়েই বলল। 'আমিও এগ্‌জাক্টলি তাই মনে করি দিদিভাই। এই দেখ না আমার বৌদিকে। ছিল তো একটা অজ পাড়া-গাঁয়ে। আর আমার দাদা তো কে না জানে চেহারায় গুণে রাজপুত্তুর। বৌদি যা শ্বশুর-শ্বাশুড়ি পেয়েছে, আগেকার দিনের লোক হলে বলত দশরথ-কৌশল্যা- দু'বেলা চন্নামেত্তর খেত। কিন্তু বৌদির সেই এক কথা- আমার বাপের বাড়ি এই, বাপের বাড়ি সেই- তিন বছর বিয়ে হয়ে গেল, এখনও শুধরালো না...।'
'ন্যাকামো দেখে আর বাঁচিনে....অসহ্য.....' কোনমতে রাগ চেপে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এল জয়া!

সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৪; মুম্বাই।

বাংলা অণু গল্প ২৯ - কেউ ফেরে না

কেউ ফেরে না ।।

খাণ্ডোয়ায় ট্রেনটা থামতেই নেমে পড়লেন পুনর্বসু ভট্টাচার্য। এদিক ওদিক তাকালেন একবার। ঐ তো, অর্জুন গাছটা ঠিকই আছে প্ল্যাটফর্মের এককোণে, কিন্তু না আছে সেই ময়না পাখিটা, না গাছের তলার সেই কুকুরটা। তপনই বা কোথায় গেল? এসি কামরাটা দাঁড়ায় প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষে, একটা চা-ওলা শুদ্ধু মেলেনা সেখানে। আর থাকবেই বা কেন? বাবুরা ঠাণ্ডায় ঘুমোবেন বেলা পর্যন্ত, তার পর কেটারিং-এর বাসি স্যান্ডুইচ আর ঠাণ্ডা চা খাবেন আরাম করে। এই পুনর্বসুবাবুর মত দু-চারটে পাগলাটে লোকের জন্যেই তপনের দোকান চলত।

দুর্গাপুরের তপন চক্রবর্তী নিঃস্ব অবস্থায় খান্ডোয়া স্টেশনে কিভাবে এল সে এক অন্য গল্প। বুড়ো ঠেলাওয়ালা বুধন কুশোয়াহার দয়ায় তারই সাথে পাঁউরুটি সেঁকার কাজে লেগে পড়েছিল, সেও প্রায় সাত বছর হল। অপুত্রক বুধনের ঠেলাগাড়ি এখন তপনেরই, বুধনের বিধবা তার আম্মা। আগে এই বোম্বে মেলের শেষ বগিটা ছিল ভীড়ে ঠাসা জেনারেল, একদিন ছক বদলে এসি কামরাগুলো দিয়ে দেওয়া হল সেখানে, ঝপ করে সেল কমে গেল তপনের। তখন সে শুরু করল অমলেট বানানো, তাতে কিছুটা অন্ততঃ সুরাহা হল।

কিন্তু হল কি ছেলেটার, পুনর্বসুর একটু চিন্তা হয় বৈকি! তিনি জব্বলপুরে রেলের ইঞ্জিনিয়ার, তিন কুলে কেউ নেই, অকৃতদার, শখের মধ্যে ব্রিজ খেলা আর বংশসূত্রে পাওয়া সংস্কৃত-চর্চা। বারবার অফিসের কাজে ভুসাওয়াল যেতে-আসতে প্রতিবার দেখা এই নিঃসহায় ছেলেটার প্রতি একধরণের মায়া পড়ে গেছিল। তাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতেও চেয়েছেন, তপনই রাজী হয়নি। এদিকে গাড়ি ছাড়ছে। উনি কি ভেবে কামরা থেকে ব্যাগটা নামিয়ে গাড়ি ছেড়ে প্ল্যাটফর্মের উপর এগিয়ে গেলেন।

ঠিক ট্রেন ছাড়তেই দেখা গেল তপনের ঠেলা। 'ওরে অকাল-কুষ্মাণ্ড, কুঞ্জকুঞ্জর, বন্যবরাহ, দস্যু-বর্বর!' বলতে বলতে পুনর্বসু তপনের হাতদুটো ধরলেন। 'আমি তোর খোঁজে গাড়ি ছেড়ে দিলুম, আর তুই ব্যাটা স্কন্ধকাটা আমাকে ফাঁকি দিতে এখানে এসে বসেছিস!'
'কি করছেন জ্যাঠাবাবু, লোকে দেখছে। এখন আর গাড়ি নেই, চলুন পুরোন জায়গায় গিয়ে বসি'- ওরা এলো সেই অর্জুন গাছটির নীচে। 'আচ্ছা জ্যাঠাবাবু, আপনার কখনও জানতে ইচ্ছে হয়নি কিসের নেশায় আমি স্টেশনের এই এককোণায় এসে ঠেলা লাগিয়ে বসে থাকতাম'?
'কি আবার, তুই তো আমার ব্যাটা, আমারই মত পাগল!'
'অনেকটা তাই বলতে পারেন। এখানে এসেই আমার চোখে পড়ে এই গাছটা, ওই ময়না পাখিটা যে মাঝেমধ্যেই মিষ্টি গলায় শিস দিয়ে উঠত আর গাছের তলায় নেড়িকুত্তাটা সারাক্ষণ মুগ্ধ হয়ে পাখিটাকে দেখত। আপনাকে আবার বলছি, জ্যেঠাবাবু, আমি ওদের কেউ নই, কিন্তু ওই দুটিকে ছেড়ে বেশিক্ষণ কোথাও গিয়ে টিকতে পারতাম না। পাখিরা কদ্দিন বাঁচে জানি না, একদিন ময়নাটা ফট করে মরে গেল। কুকুরটা তিন-চারদিন কোথাও নড়ে নি, আমি পাঁউরুটি দিলে খেত না, তারপর জানিনা কোথায় চলে গেল। তারপর আম্মাও গেল দু'মাস আগে, এখন আর শহরে আমার নিজের বলতে কেউ নেই'- একটু যেন রুক্ষ শোনাল তপনের গলা।
'তবে আর দেরী কিসের? আমার সাথে চল, পড়াশুনা করবি, তারপর রেলে ঢুকিয়ে দেব, কেমন?'
'যাব, জ্যাঠাবাবু। তবে একবার বাড়ি গিয়ে মাকে দেখে আসি। তারপর নিশ্চয়ই যাব।'

পুনর্বসু প্রতিবার ভুসাওয়াল যাওয়া-আসার পথে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকেন খাণ্ডোয়া স্টেশনের দিকে। নাঃ, তপনের চিহ্নমাত্র নেই সেখানে- সাক্ষী থাকে নীরব একটি অর্জুন গাছ।

মুম্বাই, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৪।