New

Wednesday, January 21, 2015

বিশেষ রচনা - নীরস জীবন কিছুদিনের

।। নীরস জীবন কিছুদিনের ।।




(১)

যখনকার ঘটনা বলছি, তখন পশ্চিমবঙ্গে সূর্যটা একটু বাঁ দিকে হেলে উঠত। গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রৈকার জন্ম হয়নি, পশ্চিমবঙ্গের আসল রাজধানী ছিল মস্কো আর দু’জন দাস ছিলেন বিখ্যাত, কেসি দাস আর ‘দাস কাপিটাল’। আমি বিহারের একটি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ফাইনাল ইয়ারে উঠেছি, মাঝে মাঝেই টেস্ট আর ইন্টারভ্যু দিতে কলকাতা ছুটতে হয়। আর তখনও ছাত্রজীবন। বাবারও অত টাকা নেই কলকাতায় হোটেলে উঠতে দেবার। তবে হ্যাঁ, তখনকার দিনে আত্মীয়স্বজনরা ভাল ছিলেন। সবারই বড় সংসার, কে একজন এল না গেল, তাতে করো কিছু যায়-আসতো না। তাই মাসি-মামা-জ্যাঠা জিন্দাবাদ বলে কলকাতার ট্রেনে চেপে বসতাম।

একদিন এরকমই জম্মু-তাওই থেকে নামছি শেয়ালদায়, একটা বাস ধরে বেহালায় জ্যেঠুর বাড়ি যাব, হঠাৎ পিঠে কার একটা হাত পড়তেই তাকিয়ে দেখি আমার পিসতুত ভাই লাটাই।
লাটাই ওরফে বোধিসত্ব তখন নীল রতন মেডিক্যাল কলেজে সেকেণ্ড ইয়ারে। বাঁকুড়ার ক্রিশ্চান কলেজে পড়ার সময়ই মার্কামারা ছাত্রনেতা ছিল, আর এই বাঁদিক ঘেঁসে চলার অভ্যেস ওরা বংশপরম্পরায় পেয়েছে, বলতে গেলে ওদের রক্তে আছে। এদেরই এক জ্যেঠতুত ভাইয়ের কথা একবার বলেছিলাম, মানবাজারে ছাতে লাল পতাকা দেখে যাদের বাড়ি চিনেছিলাম, অবশ্য পরে জেনেছিলাম ওর ছাতে মেলা লুঙ্গিটা হাওয়ায় উড়ে অ্যান্টেনায় আটকে গেছিল।
‘কিরে, তুই এখানে? অবশ্য তোর তো কলেজ কাছেই, ষ্টেশনে বেড়াতে এসেছিলি বুঝি’, আমি শুধোই।
‘না রে, সন্ধ্যে হয়ে গেছিল, এসেছিলাম ক্লাসের একটা মেয়েকে কৃষ্ণনগর লোকালে তুলে দিতে’ অম্লানবদনে ও বলল। আমার থেকে বয়সে কিছুটা ছোট হলেও আমাদের মধ্যে ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। অবশ্য মেয়ে বন্ধুদের ব্যাপারে ওর সংকোচ কোনকালেই ছিল না। উদারপন্থী বাবা-মা, এ ব্য়াপারে যথেষ্ট ছাড় ছিল। কিন্তু লাটাই আর আমাকে ছাড়ল না, পরপর দু’দিন ছুটি, জোর করে হোস্টেল নিয়ে এল।

‘জাস্ট একটা কথা এখানে মনে রাখিস, আমি এখানে লাটাই নই, বোধিসত্ব ব্যানার্জি। যতীন চক্রবর্তী, বিমান বসু আমাকে ছোট ভাইএর মত দেখে, আমার বাবা বাঁকুড়া জেলা কমিটির সিনিয়ার মেম্বার- এগুলো সব আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে, আর উটকো লোকের সাথে একদম কথা না।‘ নীলরতনে ঢোকার আগেই লাটাই আমাকে বেশ করে বুঝিয়ে দিল।
‘কিন্তু কেন বল তো, যদিও কথাগুলো অন্ততঃ পঞ্চাশ ভাগ সত্যি, সেটা আমি জানি।‘
‘হোস্টেলে যেতে যেতেই দেখতে পাবি’ ওর সংক্ষিপ্ত উত্তর।
কলেজের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই একটা পোস্টার চোখে পড়ল। ‘বোধিসত্বকে মানছি না, মানব না’, ‘এস-এফ-আই-এর কালো হাত গুঁড়িয়ে দাও’। হোস্টেলের বাইরের দেয়ালে আরেক চমক যেটার জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না- ‘এস-এফ-আই’এর গুণ্ডা বোধিসত্ব ব্যানার্জির মাথা চাই।‘ এবং একটা নয় দু-পাশের দেয়ালে এই পোস্টার অজস্র।
আমি ততক্ষণে বেশ ভালরকম ঘাবড়ে গেছি। আমাদের ওখানেও আছে বামঘেঁসা ছাত্র ইউনিয়ন বি-এস-এ বা বিহার স্টুডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন, আমি তার দু-একটা মীটিঙএও গেছি, কিন্তু তাতে কোনও ভয়াবহতা নেই, খুনখারাপির ধমকি তো নয়ই। কিন্তু আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই লাটাই হোস্টেলে না ঢুকে তার বাঁ-দিকে ল্যাবোরেটরি সংলগ্ন একটা ছোট রুমে তালা খুলে ঢুকল। কি আশ্চর্য! দেখি তালাবন্ধ ঘরের ভিতর একটি ছেলে একমনে পোস্টার এঁকে চলেছে। ‘একি রে, ওর দরকার পড়লে বাইরে যাবে কি করে?’ আমি জিগ্যেস করলাম। ‘বাথরুমের ভেতর দিয়ে দরজা আছে’, সংক্ষিপ্ত উত্তর পেলাম। পাঁচ মিনিট পরে ছেলেটি উঠে চলে গেল।

‘বাঃ, তোর রুম টা তো বেশ! তবে হোস্টেলের বাইরে কেন?’ আমার প্রশ্ন।
‘আসলে আমার সিংগল সীট পাওয়ার কথা নয় সেকেণ্ড ইয়ারে। এই রুমটা ছিল লাশকাটার স্পেশ্যাল টিউটরিয়াল ক্লাশ, সেটা এখন উঠে যাওয়ায়, এটা খালি তালামারা অবস্থায় পড়ে ছিল। আমার রুম কাম এস-এফ-আই গোপন অফিস করার জন্যে দাদারা জবরদখল করে দিয়েছে এটা আমার জন্যে। তোর চিন্তা নেই, খাটিয়াটা আমার হাইটের হিসেবে ছোট পড়ে বলে আমি ডিসেকশন টেবিলটাতেই শুই।‘ কি সাংঘাতিক কথা, আতঙ্কে আমার লোম খাড়া হয়ে উঠল, লাটাইএর কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নাই।
যাক, হোস্টেলেই খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা রুমে এসে বসলাম। লাটাই শুরু করল ওর ছাত্রনেতা হয়ে ওঠার বিস্তারিত কাহিনী। ছাত্র পরিষদ অধ্যুষিত কলেজে ঢুকেই কিভাবে প্রায় জোর করে বড় একজন বামপন্থী নেতাকে ধরে সংগঠনটাকে ঢেলে সাজানো হল। চে গুয়েভারা, হো-চি-মিন্‌হ্‌ আর বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কবিতার আবৃত্তি ক্লাসে-ক্লাসে শোনাতে গিয়ে একটা বিশ্রী মারামারিতে জড়িয়ে পড়া, তারপর পুলিশ কাস্টডি ও সেখান থেকে অলৌকিকভাবে ছাড়া পাওয়ার পর সিপির ছেলেমেয়েরা ক্ষেপে যায়। তখনি ঐ ‘মুণ্ডু’ চাই এর পোস্টার পড়ে দেয়ালে দেয়ালে।
- তার পরেই বুঝলি, হঠাৎ করে আমি হিরো হয়ে গেলাম। এমনকি ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রছাত্রীরাও দেখি বেশ সমীহ করতে লেগেছে।
- কিন্তু এসব করে পড়ার ক্ষতি হচ্ছে না?
- হয়, আবার পুষিয়েও নিতে হয়। তখন রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের পড়ার স্টাইলটা কাজে আসে। ভয় একটাই, যদি কোনও সিপির হাতে পরীক্ষার কোনও খাতা যায়। মার্কামারা হয়ে গেছি কিনা!
- সে কি? প্রফেসারদের স্টুডেন্ট ইউনিয়ানের সাথে কি সম্পর্ক? তাদের তো নিরপেক্ষ থাকার কথা।
- বিশাল। পক্ষপাতিত্বের বহরটা ক্লাস করার সময়ই টের পাওয়া যায়। যাক, এখন শুয়ে পড়, কাল তো তোর আবার ইন্টারভ্যু আছে।
- ইন্টারভ্যু না, রিটেন টেস্ট। ঠিক আছে, গুডনাইট।


(২)
পরদিন সকালে চা-জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম মোয়রা স্ট্রিটে হিন্দী বয়েস হাই স্কুলে। ওখানেই হবে টেস্ট। সব শেষ হতে বিকেল চারটে। নীলরতনে ফিরতে পাঁচটা বাজল। ফিরে দেখি দরজা ভেজানো, আর আমার ভাই কমরেড লাটাই ডিসেক্‌শন টেবিলের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। আমার চেয়ে বয়েসে ছোট হলেও কলকাতার অলিগলি ওর চেনা, আর কম্যুনিজমের পাঠে আমার গুরু, যদিও জানি বঙ্গে না থাকলে এ শিক্ষা আমার কোনও কাজেই লাগবে না। আমার জ্ঞান ছিল দাস কাপিটালের সোসিও-ইকনোমিক ও সারপ্লাস ভ্যালু থিওরি থেকে কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো পর্যন্ত, অর্থাৎ যেটুকু ইকোনমিক্স আর ফিলসফিতে পড়তে হয়েছিল। সেখনেও হেগেলের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (dialectic materialism) নিয়ে এমন জগাখিচুড়ি পাকানো হয়েছিল, যে পুরো ব্যাপারটার থেকে ইন্টারেস্টটাই চলে যায়। লাটাই ওদের গ্রাসরুট কর্মী হলেও দেখি তাত্বিক ব্যাপারগুলো বেশ বোঝে, এখনকার পশ্চিমবাংলার কম্যুনিস্টদের মত শুধু যেমন-তেমন ভাবে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মাতত না। বাঁকুড়ায় থাকতে ওদের সিনিয়ার ছাত্রনেতা কমঃ শ্যামলদা, শীলাদিদের সাথে পরিচয় হয়েছিল, খুব একটা ব্যবহারিক না হলেও বেশ কিছু উচ্চস্তরের কথাবার্তার চাষ হত সেখানে, বিশেষ কিছু না বুঝলেও ভালই লাগত।
- কিরে, এই সময় ঘুমোচ্ছিস, আমার প্রশ্ন।
- না, রাতে মীটিং আছে, অনেকক্ষণ জাগতে হতে পারে, তাই একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছি- ওর উত্তর।
- আমি তাহলে রাত্রের বম্বে মেল বা দুন ধরে বেরিয়ে পড়ি, ভোরের আগেই ধানবাদ পৌঁছে যাব।
- আরে তুই এখন যাবি কোথায়? ভাবলাম, দু-বছর পরে দেখা, কোথায় বেশ ভাল করে আড্ডা হবে......কলেজ নেই তো?
- না, একটা গোলমালে কলেজ এখন বন্ধ, ‘সাইনে ডাই’- জানিনা কবে খুলবে।
- তাহলে আর কি? মামুকে একটা টেলিগ্রাম করে দিচ্ছি, থাক এখন কদিন।
- কিন্তু আমি তো বেশী টাকাও আনি নি।
- তাহলে তো আরো ভাল। লিমিটেড টাকা দিয়ে আমরা হোস্টেলের স্টুডেন্টরা কিভাবে মাসের শেষদিনগুলো চালাই, সেটাও তোর দেখা হয়ে যাবে।
- সেকি! পিসেমশাই তোকে এত কম টাকা দেন? আমার কথায় অবিশ্বাসের ঝলক।
- না তা নয়। তবে যতই দিক, ২৩-২৪ তারিখে পকেট অবধারিতভাবে গড়ের মাঠ। তারপরেই শুরু হয় কৃচ্ছ্রসাধনের পালা - কথাটা ঠিক বললাম তো? একবার ঠেকায় পড়ে একটা ট্যুশনও ধরেছিলাম, রাজাবাজারের কাছে একটা ক্লাশ নাইনের মেয়েকে। ভাল লাগত না, পড়ানোর সময়ে একটা ভোঁদাগোছের চাকর আগাগোড়া পাহারা দিত। কিন্তু পকেটে এক্সট্রা পয়সা আসামাত্র আমার খরচাও বেড়ে গেল। তাই দুম করে ওটা দিলাম ছেড়ে। আর এখন তো এমন ব্যস্ত ট্যুশনির কথা ভাবতেও পারিনা। চল আজকে পদ্মায় ইলিশ খেয়ে আসি।
- কলকাতায় পদ্মা? ঠাট্টা করছিস!
- আরে সে পদ্মা নয়। শেয়ালদার পদ্মা হোটেল। দারুণ বানায়। তবু আমাদের হোস্টেলের মেসের থেকে বেশী খরচ পড়েনা।
- মেসে তবু তো পয়সা দিতে হবে !
- আগের থেকে বলে রাখলে লাগে না। এখন থেকে জানুয়ারির বাকি কটা দিন বাইরে খাওয়া যাবে। আরে.........বলেই কিছুক্ষণ ‘পজ’ দিয়ে ওর মনে পড়ল-‘তুই যাবি কোথায়? আজ বইমেলা শুরু হয়েছে......থেকে যা দুটো দিন’।

এরপর তো আমার আর চলে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কলকাতা সম্বন্ধে একটা ‘ফোবিয়া’ ছিল মনে মনে, কখনও থাকতে চাইতাম না। কিন্তু এখন লাটাই আছে, ভয় কি? ন’টা নাগাদ পদ্মা হোটেল থেকে গরম গরম ভাপা ইলিশ-ভাত খেয়ে এলাম। বাজারে এখন ইলিশ দুষ্প্রাপ্য, তবু ওরা কোত্থেকে জোটায় কে জানে! শেয়ালদা স্টেশন থেকে আচার্য জগদীশ বসু বা লোয়ার সার্কুলার রোড পার হয়ে ঘিঞ্জি বাজার, সেখানেই গঙ্গা-মেঘনা-পদ্মা-ইস্টবেঙ্গল-অশোক নানা নামের ছোট-বড় ভাতের হোটেল আর অজস্র সস্তার লজ ছিল, এখনও আছে। তখন রাজাবাজার-থেকে শেয়ালদা হয়ে পার্ক সার্কাসের ট্রামলাইন বন্ধ, অথচ ফ্লাইওভারটাও চালু হয় নি। বিশ্রী অবস্থা একেবারে। তবু ভাগ্যিস বর্ষাকাল ছিলনা।
ঠিক সাড়ে নটায় এস-এফ-আইএর মেম্বাররা আসতে শুরু করল লাটাইএর রুমে, বেশী নয়, কোর কমিটি (আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম পলিটব্যুরো)র ছ-সাতজন মোটে। দুরূহ কার্যপ্রণালী নিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় তুমূল তর্কবিতর্ক চলল ঘণ্টাদুয়েক ধরে। যেটুকু বোঝা গেল, লাটাইকে ওরা জি-এসের জন্যে দাঁড় করাতে চায়, আর নতুন যে ছাত্রছাত্রীর দলটা এসেছে তাদের ব্রেনওয়াশটা কিভাবে হবে তার প্ল্যানিং করতে হবে। উপায়ান্তর ছিল না, আমিও নির্লিপ্ত মুখ করে শুনে গেলাম।


(৩)

মেম্বারদের যেতে যেতে প্রায় বারোটা। ভাবলাম এবার ঘুমনো যাবে। হঠাৎ লাটাই বলল, তোর তো বাংলা হাতের লেখা ভালই, ছবিও আঁকতিস ছোটতে, ক’টা পোস্টার আঁকতে পারবি না। হায়রে, হাতের লেখা ভাল হওয়ার শেষে কিনা এই পুরস্কার! কি আর করা যায়, পড়েছি মোগলের হাতে! রাত্রি বারোটায় এস-এফ-আইএর পোস্টার আঁকতে বসলাম দুজনে।। দেড়টা নাগাদ খুব ঘুম পেতে লাগল। লাটাই প্রস্তাব দিল, চ, চা খেয়ে আসি।


চা- রাত দেড়টায়? মেট্রো লাইফ কাকে বলে তখনও আমার ঠিক জানা ছিল না। গেটের বাইরে এসে দেখি, নীরসের কম্পাউণ্ড ওয়াল ঘেঁষে অজস্র চা-পাউঁরুটি-ফলের দোকান, খেয়াল পড়ল, আরে এটা তো বড় হাসপাতালও বটে। হস্টেলের ছাত্র, নাইট শিফ্‌টের হাউস-স্টাফ, রোগীদের আত্মীয়স্বজন, শেয়ালদার প্যাসেঞ্জার, হকার- কারা চা খাচ্ছে না।
তবু বেশীক্ষণ জাগা গেল না। আড়াইটে নাগাদ কাজ যেটুকু পারা গেল করে আমরা শুয়ে পড়লাম, সাথে সাথেই ঘুম।
পরদিন আটটায় ঘুম ভাঙল। খিদেও পেয়েছিল। একে গঙ্গার হাওয়া, তায় গোটাদিন টো-টো। গেটের সামনের হোটেল থেকে দুজনে চা-সিঙ্গাড়া-জিলিপি খেয়ে এলাম।
-
এখন তো এখানে কোনও কাজ নেই। চ’ বইমেলা ঘুরে আসি।
-
কিন্তু কি বই কিনব, তাছাড়া টাকাও তো গোনাগুনতি।
-
আরে, বইমেলা যাওয়ার সাথে বইকেনার কি সম্বন্ধ। গতবছর থেকে জাস্ট শুরু হয়েছে, অল ইণ্ডিয়ায় এরকম আর কোথাও পাবিনা।
-
ঠিক আছে।
-
তাহলে চানটা সেরে নে, আমি পোস্টার যে কটা হয়েছে, ডিসপ্লের জন্যে দিয়ে আসি।
লাটাই পোস্টারগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেল।


ময়দানের মেলায় সেবার বা সেদিনের জন্যেই বুঝি এন্ট্রি ফ্রী ছিল। রবিবার বলে বিশাল ভীড়। পেছন পেছন আসছে একটা মেয়েদের দঙ্গল। একটা চেনা গলা মনে হতেই পেছন ফিরে দেখি আমার আরেক কাজিন, পিসতুত বোন সুজয়া। লেডি ব্রাবোর্ণে বিএ পড়ে হোস্টেলে থেকে। ওর কথা আমার মাথাতেই ছিল না, হোস্টেলের বান্ধবীদের সাথে ছুটির দিনে বইমেলা বেড়াতে এসেছে, খুব খুশী আমাদের দেখতে পেয়ে। তখন শুধু আমার কেন, কলকাতারও বেশীরভাগ বাসিন্দার কাছেই বইমেলার ঠিক স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তবু ভীড় হয়েছিল দেখবার মত। যাঁরা বই লেখেন, তাঁরা যে রক্তমাংসের মানুষ এবং তাঁদেরও যে চর্মচক্ষে দেখা যায় এ ধারণাই তখনও হয়নি। এর আগে নামকরা সাহিত্যিকদের মধ্যে শুধু আশুতোষ আর শংকরকে দেখেছিলাম। এবার তো গীল্ডের টেন্টে গিয়ে দেখি চাঁদের হাট বসে গেছে। আশাপূর্ণা দেবীকে জ্ঞানপীঠ (যদিও সেটা উনি ৭৬এই পেয়েছিলেন) পাওয়া নিয়ে সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, সুনীল-বুদ্ধদেব গুহ আছেন, বোধহয় বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবি-সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায় ছিলেন সভাপতি। আমাদের হাতে অত সময় ছিলনা, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম কফি খাওয়ার জন্যে। একফাঁকে খাওয়া-দাওয়াটাও আমরা সেরে নিলাম বইমেলার ক্যাণ্টিন থেকে। গণশক্তির একজন সহ-সম্পাদকের সাথে লাটাই খুব জমে গেছে দেখলাম, তিনিই আমাদের দোসা খাইয়ে দিলেন নিজের পকেট থেকে খরচা করে। কিছু বইও কেনা হল, বিশেষ করে লিট্‌ল ম্যাগাজিন জিনিষটা আমার খুব ভাল লেগে গেছিল। বেশ উচ্চস্তরের লেখা, দামও কম, অথচ লোকে দেখে চলে যাচ্ছে, খুব একটা কিনছে না। বুঝলাম, নামী লোকেদের দামি বইই বাজারে কাটে, বাকি সব পোকায়।

সেখান থেকে আকাদেমি হলে নাটক। কি একটা লেফ্‌টি গ্রুপের করা ইবসেনের ‘ডলস্‌ হাউস’ ছিল বলে এন্ট্রি ফ্রী ছিল, অথচ তেমন ভীড় ছিল না। বুঝলাম বঙ্গে বামপন্থীদের পায়ের তলার জমি ক্রমশঃই শক্ত হচ্ছে।
রাত্রে ফেরার সময় আমরা ফতুর। একটা বাসে উঠে পড়লাম ও কণ্ডাক্টার ভাড়া চাইবার আগেই ধর্মতলা-ওয়েলিংটনে নেমে পড়লাম। ‘বীফ খাস’, লাটাই জানতে চাইল। ‘না রে, ওইটা এখনও অভ্যেস করিনি। তুই খাস নাকি?’ আমি বললাম।
-
এখনও শুরু করিনি। বাঁকুড়ায় সুযোগ ছিল না। কিন্তু বীফ না খেলে পাকা কম্যুনিস্ট হওয়া যায় না বলে শুনেছি, দেখি একদিন শুরু করব। যে কোনও মাংসের থেকে অনেকটা শস্তা পড়ে। চল আজ ফুটপাথের রুটি খাওয়া যাক।
মাত্র দেড় টাকায় ছটা রুটি, ডাল আর আলু-পেঁয়াজের তরকারি । তার পরেও বিহারি স্টল ওয়ালাটি নিজের লাভ রাখে, ভাবা যায়? আর ক্ষিধের মুখে অসাধারণ স্বাদ- মশলা বলতে তো শুধু একটুকরো হিং আর পাঁচফোড়ন।

অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে পরদিন সকালে ধানবাদ ফিরে গেলাম।


(৪)

আরেকটা পর্ব না লিখলে আমার নীরস অধ্যায় শেষ হয়না। সে বছর, অর্থাৎ ১৯৮১র গরমের ছুটিতে লাটাই এসেছিল আমাদের বাড়ি। আমাকে যাবার সময় বার বার করে বলে গেল কলকাতা গেলেই ওর হোস্টেলে যেন উঠি। এবার ও জি-এস হয়ে গেছে, আর পোস্টার লিখতে হবে না। আমার অবশ্য পোস্টারে নয়, ভয় ছিল ওর মড়া কাটা তক্তপোষটিতে, যদি একা ও ঘরে কখনও শুতে হয় তাহলেই গেছি!

তবে অদৃষ্টে যোগ একটা ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে একটা ইন্টারভিউ পড়ল কলকাতায়। লাটাইকে লিখতেই ও আগের দিনের জম্মু- তাওয়াইয়ে যেতে লিখে দিল। বলল, চলে অ্যায় একটা সারপ্রাইজ আছে।
পরদিন জানা গেল কি সেই সারপ্রাইজ। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের আই-এফ-এ শীল্ডের ফাইনাল। ময়দানে মোহনবাগান-এরিয়ান্স মাঠে বিকেল সাড়ে চারটে থেকে। আমার ইন্তারভিউ ছিল ক্যামাক স্ট্রীটের ইন্ডাস্ট্রি হাউসে। ঠিক হল, ও তিনটে নাগাদ থিয়েটার রোডের মুখে চলে আসবে, সেখান থেকে আমরা একসাথে যাব।
সেটা বোধহয় ২৬শে সেপ্টেম্বর ছিল। আমার বেরোতে বেরোতে সাড়ে তিনটে হয়ে গেল। থিয়েটার রোডের মুখে লাটাইএর সাথে দেখা। ছোট, ছোট। খেলা সাড়ে চারটে থেকে আর এখন জাস্ট সাড়ে তিন। এত তাড়ার কি আছে? আমি যতদূর জানি পার্টিরই এক দাদা দুটো কমপ্লিমেন্টারি টিকিট দিয়ে গেছে ওকে, সুতরাং টিকিট কাটারও কোনও ঝামেলা নেই।
- বুঝতে পারছিস না, মোহনবাগান স্ট্যাণ্ড ভরে গেলেই বিপদ, তখন বসতে হবে ইষ্টবেঙ্গলের সাপোর্টারদের সাথে। এবং যেখানে বাঘের ভয় ঠিক সেখানেই সন্ধ্যেটা হল।

বিপদটা তখনও আমার মাথায় ঢোকেনি ঠিকমত। ঠিক আছে, আমরা দুজনেই নাহয় মোহনবাগানের সাপোর্টার, নাহয় ইস্টবেঙ্গলের লোকেদের সাথে বসলামই। খেলা দেখার কি অসুবিধে তাতে? তবে ব্যাপারটা টের পেলাম খেলা শুরু হতেই। মোহনবাগান একটা ভাল মুভ করছে- চেঁচাবার উপায় নেই! শ্যাম থাপা একটা বাইসাইকেল করেছে, কি প্রদীপ চৌধুরী একটা দারুণ শট নিয়েছে। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছি, পেছন থেকে এক ঠেলা। ‘করছিস কি, বসে পড়। মনে রাখ, তুই এখন ইস্টবেঙ্গল’, লাটাই আমাকে চুপি-চুপি জ্ঞান দিল।
ইতিমধ্যে মোহনবাগানের অরূপ দাস একটা গোল করল। দেখি মোহনবাগান গ্যালারিতে সবাই নাচানাচি করছে, কিন্তু আমাদের উপায় নেই- মুখ গোমড়া করে বসে থাকতে হচ্ছে। কলকাতার ক্রিকেটের দর্শকদের স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের এত প্রশংসা করে সবাই, কিন্তু ফুটবলে, বিশেষ করে তিন প্রধানের খেলা থাকলে তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পাওয়া যেত না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইস্টবেঙ্গলের সোমনাথ ব্যানার্জি গোল শোধ দিল, আর হাফ-টাইমের পরেই চন্দ্রবাহাদুর থাপা চমৎকার বানানা কিকে ওদেরকে এগিয়ে দিল। আমার খেয়াল ছিল না, লাটাই ইশারা করল, দেখছিস কি, নাচ। না নাচলেই ধাক্কা মেরে গ্যালারি থেকে ফেলে দেবে হয়ত। অগত্যা অনিচ্ছাসত্বেও ধেই ধেই করে কিছুক্ষণ লাফাতে হল। হঠাৎ দেখি সামনে দিয়ে একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোককে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হল। একটি ছেলে কিছুক্ষণ আগেই নাচছিল, হঠাৎ ‘বাবা’ বলেই গ্যালারি থেকে নেমেই পড়ি কি মরি করে ছুটল ওদের পেছনে। ব্যাপারটা জানা গেল পরদিনের কাগজ পড়ে। নগেন দে নামে এক মধ্যবয়স্ক মোহনবাগান সাপোর্টার ইস্টবেঙ্গল এক গোলে এগিয়ে যাওয়া মাত্র শোকের ধাক্কায় করোনারি অ্যাটাকে মারা যান, ছেলে ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার তখন অন্য গ্যালারিতে নাচছে! এই ছিল কলকাতার ফুটবল। মফঃস্বলের মানুষ আমি, এ উন্মাদনা কোথায় পাব!
তবে আমাদিগকেও হতাশ হয়ে ফিরতে হয় নি । মোহনবাগানের ফ্রান্সিস ডিসুজা শেষ মুহূর্তের গোলে সমতা ফিরিয়ে আনেন ও টাই ব্রেকারের সিস্টেম না থাকায়, দু-দলকেই যুগ্ম বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বেচারা নগেনবাবু জেনে গেলেন না যে তাঁর মোহনবাগান হারে নি।


- কি রে আজ কোথায় খাবি, লাটাই যেতে যেতে শুধোয়। আমার তো মাসের শেষ সপ্তাহ, ধর্মতলা না শেয়ালদা?
- আজকে চাং হোয়া, আমার পকেট বোঝাই আজ। কয়েকমাস একটা ট্যুশনি করেছিলাম, বাবার হোটেলে খাই, প্রায় সব টাকাটাই জমেছে।
- হুররে, ডি লা গ্রাণ্ডি মেফিস্টোফিলিস......বলে একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিল লাটাই, না, টেনিদা ধারে কাছে নেই।
- ইয়াক ইয়াক। আমি বলে উঠলাম।
আমরা দুজনেই হঠাৎ ভুলে গেছি যে আমরা হাইস্কুলের নই, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র।


(শেষ)

Posted by Pallab Chatterjee at 1:42 AM No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest

বাংলা অণুগল্প ৩৮ - মহাজন

মহাজন ।।


'অমাবস্যার রাতে হ'ল চাঁদের পোয়াবারো,
ধর ধর ত বলে সবাই, সাধ্য থাকলে ধরো!'
আরে না না, এটা মোটেও কোনও পাগলের প্রলাপ নয়। এ হল কেওটিয়া গ্রামের প্রচলিত স্থানীয় ছড়া, কোনও অজানা গ্রাম্য কবির রচনা। কেওটিয়া হল কেওট অর্থাৎ কৈবর্তপ্রধান গ্রাম, তাদের মধ্যেই শ্রীমান চন্দ্রবদন ধর ওরফে চাঁদ ধর কিভাবে জানিনা পারিবারিক ব্যবসা ছেড়ে নিশিকুটুম্বিতাকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে তার জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তী পর্যায়ে উঠে গেছিল। রাতের, বিশেষ করে অমাবস্যার অন্ধকারে নেংটি পরা তেল চুপচুপে কালো শরীরটাকে দেখার ভাগ্য আশপাশের পাঁচটা গ্রামের লোকেদের খুব একটা না হয়ে উঠলেও তার হাতের কাজের প্রশংসা বা নিন্দা লুণ্ঠিত গৃহকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশের বড়কর্তা পর্যন্ত করতে বাধ্য হতেন।
তা এই স্বনামধন্য চন্দ্রবদন একটি জায়গায় এখনও সুবিধে করে উঠতে পারেনি, সে হল কালবোসে গ্রামের বণিকপ্রধান অতুল্য সাহার বাসা। সাহামশায়ের মহাজনী কারবার, টাকার লেখাজোখা নেই। স্বামী-স্ত্রীর সংসার, শোনা যায় খাওয়ার মুখ বাড়বে বলে ছেলেপুলের ঝামেলাতেই যাননি অতুল্য সাহা। তাই আশেপাশের দশটা গ্রামে হাড়কঞ্জুষ আর অপয়া বলে তিনি বিখ্যাত, তবে বিচলিত নন একফোঁটাও। বলা বাহুল্য বাড়ীতে চাকর-বাকরের সংখ্যাও অপ্রতুল। তাই এক অমানিশার শুভলগ্ন দেখে কালবোসে গ্রামের সাহাবাড়িতে পড়ল চাঁদের পায়ের ধূলো। এ অঞ্চলের প্রাচীন প্রবাদ অনুযায়ী চাঁদের সিঁদকাঠি আলাদিনের জিনের থেকেও দ্রুত ও নিঃশব্দে কাজ করে। আধঘণ্টার মধ্যেই সে বাইরে থেকে সটান ঢুকে পড়ল সাহামশায়ের পালংকের তলায়। কিন্তু একি! সাহামশাই আর তাঁর স্ত্রী দুজনেই জেগে, এত রাতে- এমনটাতো সে আশা করেনি। কি আর করা যায়, চুপচাপ সে গর্তের মধ্যে শরীরটা ঢুকিয়ে রেখে অপেক্ষা করতে করতে তাদের কথা শুনতে লাগল।
- হ্যাঁগা, আমি বলচি তুমি আরেকটা বিয়ে কর। আমার আর কিচু হবেনা বুজতে পেরেচি, তোমার পরকালের তো একটা হিল্লে হোক। তাছাড়া এতো সম্পত্তি আমরা ম'লে আর কোন কাজে লাগবে? সাহা-গিন্নীর সকরুণ উক্তি শুনতে পায় চাঁদ। এরপরেই আসে সাহামশায়ের উত্তর।
- সে চেষ্টা কি আমি করিনি, তুমি মনখারাপ কোরনা গিন্নি। ডাক্তার দেখিয়েছি শহরে গিয়ে। দোষটা ত তোমার নয়, আমারই। কি লাভ, আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে?
- তাইলে একটা দত্তক নাও। তোমায় লোকে হাড়-কিপ্টে, অপয়া বলে, আমার মোটেও ভাল্লাগে না।
- তাহলে তোমাকে লোকে বাঁজ বলবে, গিন্নি। আর সেটা শুধু তোমার কেন, আমারও কি শুনতে ভাল লাগবে? মরদের দোষে ছেলেপুলে হচ্ছেনা, এ কথা গাঁয়ের লোকে বিশ্বাস করবে ভেবেছ বুঝি!
- কিন্তু এই বিষয়-আশয় আমরা গেলে আর কি কাজে আসবে শুনি, ও ত পাঁচ ভূতে লুটে খাবে!
- সম্পত্তি কি গো! একটু যেন কাষ্ঠহাসি হাসলেন সাহামশাই। কলকেতায় যে ডাক্তারের কাছে গিছলাম, বুঝলে গিন্নি, সে নাকি মস্ত রিসাচ করছে যাতে কিনা বাঁজা মাগ-ভাতারেরও ছেলেপুলে হবে। তার কাজটি আমার বড় ভাল লাগল, তবে এই রিসাচ না কি যেন- বড় খরচের কাজ। কাউকে বোলোনা তাকে আমি মাসে মাসে পাঁচশো টাকা বরাদ্দ করে এসেছি। আমাদের যা হয় হবে, আহা, ভবিষ্যতের বাঁজা বউদের একটা হিল্লে হোক।
ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে চাঁদ। সে তস্কর হয়েও মানব-চরিত্রের বৈচিত্র্য সম্বন্ধে আজ মহাজ্ঞানী। আর তার চোখে অতুল্য সাহা আজ সত্যিকারের মহাজন, মনে মনে তাঁকে প্রণাম জানাল চন্দ্রবদন। আজ আকাশে চাঁদও নেই, তাই এ ঘটনার কোনও সাক্ষী রইল না।


মুম্বাই, ১৪ই জানুয়ারি, ২০১৫।
Posted by Pallab Chatterjee at 1:25 AM No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest

বাংলা অণুগল্প ৩৭ - ঘোগ (অফিসের গল্প- ৪)

ঘোগ


সবে এসে বসেছি অফিসে, চিফ ইঞ্জিনিয়ার বনিক সায়েবের ফোন। 'মুখার্জি, তোমার ওয়ার্কশপের কয়েকটা কন্টিঞ্জেন্ট ছেলেকে পাঠিয়ে দাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, জি-এম ড্রিলিঙএর বাংলোয়, আর্জেন্ট।'
জানতাম এই কাজটাও করতে হবে। রেগুলার ওয়ার্কাররা পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকে, সমস্ত হ্যাপা পোয়াতে হয় ওই জনা পাঁচ-ছয় অস্থায়ী কর্মীদেরকে। তার উপর এই সব বরাত। কেউ গাড়ি নিয়ে আসে ধোওয়াবার জন্যে, কখনও ক্রিসমাস পার্টির জন্যে ক্লাব সাজানোর লোক চাই। সবাইকে খুশী করে সাইটের থেকে আসা যন্ত্রপাতিগুলো সারানোর দায়িত্ব, একেবারে থ্যাঙ্কলেস জব!
- দাদা, আজ ষোলো নম্বরে টুল পাঠাতে হবে, নইলে শাট ডাউন। আমি বারোটা নাগাদ নিজে ওদের নিয়ে পৌঁছে যাব, চিন্তা নেই- আমাকে বলতেই হল।

এসে দেখি এলাহি কাণ্ড। জি-এম দত্তসাহেব মাস-দুই হল বদলি হয়ে পণ্ডিচেরির এই অফিসে এসেছেন। প্রচণ্ড রাগী মানুষ, আমরা আড়ালে 'রয়াল বেঙ্গল টাইগার' বলেই ডাকতাম। এর আগে যাঁরা ছিলেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর চক্কোরে তাঁদের কেউই পরিবার নিয়ে আসেননি। ইনিও মাস দুই একাই ছিলেন, তবে বাঙালির পেট তো, ক্যাণ্টিনের আর হোটেলের মাদ্রাজি খাবার টানতে পারলেন না বেশিদিন, আজ ওঁর স্ত্রী এসে পৌঁছেছেন, সাথে বেশ কিছু মালপত্র। এতদিনের ব্যাচেলার রেসিডেন্সে ফ্যামিলি নিয়ে থাকতে হলে যা হয়, যাবতীয় অনাবশ্যক আবর্জনা ক্লিয়ার করতে হবে এখন, ছেলেরা লেগে পড়ল। আমিও সুযোগ বুঝে লাঞ্চ সারতে বাসায় চলে এলাম।
ফিরে এসে দেখি বণিকও এসে পড়েছেন, ছেলেরা হল, বেডরুম পরিষ্কার করে লফ্‌টের উপর উঠেছে। দেখি মিঃ ও মিসেস দত্ত দুজনের মুখই হাঁড়ি। কি হল আবার কে জানে! এদিকে লফ্‌টের উপর থেকে বেরোচ্ছে একের পর এক খালি বোতল, নানা ব্র্যাণ্ডের নানা মালের। আমি আর বণিক সাহেব মুগ্ধ হয়ে বোতল দেখছি, 'এত বোতল', বণিক অবাক হয়ে বললেন। হঠাৎ কি ভেবে নিজের অসামান্য জেনারেল নলেজের পরিচয় দিতে আমি বলে উঠলাম, 'দেখুন স্যার, ওই ওয়াইনের বোতলগুলো ডিমেলো সায়েবের, ওঁর গোয়ার পোর্ট ছাড়া চলত না। ভাল স্কচগুলো চোপড়া সাহেবের আর ওই দেশীগুলো করুণাকরণের। কয়েকটা বিয়ারের বোতলও দেখছি, ওগুলো নিশ্চয় মিঃ নাম্বুদ্রিপাদের, তবে উনি খেতেন না, বোধহয় গেস্টদের জন্যে আনাতেন। আমি তো পেছনের বাড়িতেই থাকি, সবই প্রায় দেখা যেত।'
এইবার দত্তসায়েবের মুখে কথা ফুটল। বেশ ঝাঁঝের সাথে উনি শ্রীমতিকে বললেন, 'দেখ, এবার বিশ্বাস হল? বলছি, আমি সবে দু'মাস এসেছি, এর মধ্যে হার্ডলি ছ-সাতটা শনিবার ড্রিঙ্ক করেছি। বোলোনা, মুখার্জিকে আমি শিখিয়ে দিয়েছি এসব বলতে!' 'তোমার প্রমোশন এবার আটকায় কে'- বণিক একফাঁকে চুপিচুপি আমাকে বললেন।
কি বললেন, প্রমোশন হয়েছিল কিনা? সে এক অন্য কাহিনী, পরে শোনানো যাবে।

কুয়েত, ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৪।
Posted by Pallab Chatterjee at 1:22 AM No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest

বাংলা অণুগল্প ৩৬ - স্বর্গীয় ব্যাপার

স্বর্গীয় ব্যাপার ।।


শিবঠাকুরের অসম্ভব মাথাব্যথা। ব্রেনে শর্ট-সার্কিট হয়েছে, অশ্বিনীকুমাররা মত দিলেন, ব্রেন অপারেশন করতে হবে। তবে সে তো আর স্বর্গের হাসপাতালে হবে না, সেখানে একটা স্টেথো আর প্রেসার মাপার যন্ত্র ছাড়া যে আর কিছুই নেই। 'এই, যা তো রে, মর্ত্য থেকে একটা ভাল ডাক্তার ধরে নিয়ে আয়', শিবঠাকুর নন্দীকে আদেশ দিলেন। 'কিন্তু গুরুদেব, ভাল ডাক্তার চিনব কি করে', নন্দীর প্রশ্ন। 'আরে ব্যাটা রুগীর ভীড় দেখলেই বুঝবি, কি গুরু, ঠিক বলিনি', ভৃঙ্গি শুধোয়।
- তোরা দুটোই গাড়ল। দাঁড়া, আমি তোকে একটা দিব্যদৃষ্টি দিচ্ছি। গিয়েই ডাক্তারের চেম্বারের কোনাটা দেখবি, ওর হাতে যে রোগীরা মরেছে তাদের ছায়াশরীর দেখতে পাবি সেখানে। সেই দেখে হিসেবেমত একটা ডাক্তার নিয়ে আসিস।

ঘন্টাদুয়েক পরে নন্দী ফিরল একটি ছোকরামত ডাক্তারকে নিয়ে। 'একিরে, এ কাকে নিয়ে এলি', শিবঠাকুর শুধোন, 'এর গায়ে তো এখনও মেডিক্যাল কলেজের স্টাফ নার্সদের জামায় লাগা পারফিয়ুমের গন্ধ লেগে! কি হে, ইন্টার্নশিপ শেষ করেছ তো?'
- গুরু সব ডাক্তারের চেম্বারেই দেখি মরা রুগীদের ভীড়। এর ওখানে মাত্র দুটো ছিল- নন্দী বলে।
- আজ্ঞে, কালকেই ইন্টার্নি শেষ করে ডাক্তারি শুরু করেছি, তাই এখনও বেশী রুগী মারতে পারিনি- ডাক্তারের সলজ্জ উত্তর। তা মশায়ের নামটা.....অদ্ভুত ড্রেস করেছেন, যাত্রাপালায় অভিনয় করতে যাচ্ছিলেন বুঝি?
- অ্যাই, চোপরাও। আমি শিব।
- চোখ রাঙাবেন না, আমি নীরস মেডিক্যাল কলেজে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সেক্রেটারি ছিলাম। কি আমার ভি-আই-পি রে, ওইটুকু নামেই চিনবে লোকে। আপনি কি মদন-মুকুল-মমতা যে একডাকে চিনবে সবাই? পুরো নাম বলুন।
- মদন? সে তো পুড়ে ছাই কোনকালে। আমার পুরো নাম শিবচন্দ্র দেবাদিদেব মহাদেব মহেশ্বর।
- বাপ্‌স্‌, এ যে রেলগাড়ি! মাথার কোথায় ব্যথা? ব্রহ্মতালুতে? প্রেসার তো অ্যাবনর্মালি হাই! হুম যা ভেবেছি। এ ঠিক ড্রাগের রি-অ্যাকশন। কি খান? চণ্ডু, চরস না ব্রাউন সুগার?
- ক্যানো, তাতে তোমার কি হে ছোকরা, নিজের পয়সায় খাই।
- আমার যা মনে হচ্ছে গাঁজার ধোঁয়া ব্রহ্মতালুতে উঠে আটকে গেছে, বেরোবার রাস্তা পাচ্ছে না। এই যে শিববাবু, শুনুন, ওসব নিষিদ্ধ ড্রাগ বন্ধ করুন। নতুন সরকার আসায় সাধু-সন্ন্যাসিদের তো এখন পোয়াবারো। যা খুশী তাই চলছে খুলে-আম! এই যে, ছ'মাস এ সব বন্ধ না রাখলে কিন্তু তালু ফটাস! আমার হাতে তখন তিন নম্বর হয়ে যাবেন।
- আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে। ওরে ভিরিঙ্গি, ব্যাটা ওকে ভিজিটটা দিয়ে এবার বিদেয় কর।
খানিকক্ষণ পরে শিব তখনও ফুঁসছেন। হুঁ, ডাক্তার না আরো কিছু! এসেছে আমাকে মদনার গল্প শোনাতে যাকে আমি কোনকালে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছি, তা নিয়ে কুমারসম্ভব-টম্ভভ কি সব লেখাও হয়ে গেল মর্ত্যে! যাকগে, মাথাটা ছেড়েছে মনে হচ্ছে। ওরে নন্দি, এক ছিলিম সাজা বাপ আমার!

২৯শে নভেম্বর, ২০১৪।
Posted by Pallab Chatterjee at 1:20 AM No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest

বাংলা অণুগল্প ৩৫ - সন্দেহ

সন্দেহ ।।

বুকের ব্যথাটা বাড়ছেই অধিরথবাবুর । এই সময়টা যদি মনুকে কাছে পাওয়া যেত। অধিরথ জানেন যে তার উপায় নেই। মনু, মানে মনোরমা তাঁকে আর ভালবাসে না, সে এখন অন্য ঘরে বসে উপন্যাস পড়ছে। ছেলে হস্টেলে চলে যাবার পর স্ত্রীকে যতটা কাছে পাবেন ভেবেছিলেন, হয়েছে ঠিক তার উলটো। তাঁর ধারণা, একজন তৃতীয় ব্যক্তি নিশ্চয় এসেছে তাঁদের মাঝে যার জন্যে মনু তাঁকে আজকাল এড়িয়ে চলে। ওই লোকটাকে হাতে নাতে না ধরা পর্যন্ত শান্তি নেই অধিরথের।
এইত, এখন মনে হচ্ছে ব্যথাটা অনেকটা কমেছে। নাঃ, সরবিট্রেট ছাড়াই কাজ হয়েছে। রাত খুব একটা বেশী হয়নি, যাই চারপাশটা একটু বেড়িয়ে আসি, অধিরথ ভাবলেন। একটু পায়চারি করলে শরীর-মন দুটোই ভাল থাকবে। মনু বই রেখে বেডরুমের দিকে গেল, বাইরে যেতে যেতেই তিনি দেখলেন।
রাস্তাঘাট ফাঁকাই ছিল, দ্রুত এক চক্কর মেরে আধঘণ্টার মধ্যেই তিনি বাসায় ফিরলেন। শোবার ঘরে গিয়ে দেখেন, একি! তাঁর বিছানায় কে শুয়ে আছে? মনোরমা লোকটার মুখের উপর ঝুঁকে পাগলের মত তাকে ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে! এইত, আজ বাছাধন ধরা পড়েছ, এইবার দেখ কি করি। সামান্য কিছুক্ষণের জন্যে বাইরে গেছি, এরই ফাঁকে...বলিহারি সাহস মনোরমার! দাঁড়াও, আগে চাঁদমুখটি দেখি অতিথি মহাশয়ের ।

ঐ ত, মনু লোকটার বুক থেকে উঠে পড়েছে, ফোনে ডায়াল করে কাকে যেন ধরার চেষ্টা করছে। আরে যাচ্চলে, লোকটা ত তার বিছানায় ধুমিয়ে পড়েছে, একেবারে নিঃসাড়। মুখটা কিন্তু খুব চেনা চেনা লাগছে। বাঁদিকে ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা চোখে পড়ল। যা ভেবেছিল, কোন প্রতিবিম্বই নেই তাতে।

মুম্বাই, ২৮শে নভেম্বর, ২০১৪ ।
Posted by Pallab Chatterjee at 1:14 AM No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest

Monday, December 8, 2014

লাউডগা ।।
(গল্প)

ছোটবেলায় আমরা থাকতাম বিহারের একটি সুন্দর ছোট শহরে। পাকাবাড়ি, বাঁধানো রাস্তাঘাট, ইলেক্ট্রিকের আলো-পাখা আর বাজার-হাট-ক্লাব-হাসপাতাল-কারখানা ছিল বলেই শহর, তা নইলে প্রকৃতি ও নির্জন পরিবেশের দিক দিয়ে দেখতে গেলে তাকে গ্রাম বলাই ভাল। সে শহরে যেমন ছিল সার ও সিমেন্টের নামকরা কারখানা, ভাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, তেমনি ছিল একদিক দিয়ে কুলুকুলু করে বয়ে চলা দামোদর নদ, অজস্র মাঠ, পুকুর ও গাছপালা-ঝোপঝাড়। পুটুস বলে একরকম খুব ছোট-ছোট ফল ফুটে থাকত বাগানের বেড়ার গায়ে গায়ে, পাকলে ওগুলো কালো হয়ে যেত আর কি মিষ্টি লাগত খেতে। অবশ্য বাবা-মাকে লুকিয়ে খেতে হত, কারণ তাঁদের মতে ওগুলো ছিল অখাদ্য নিষিদ্ধ ফল। এছাড়া গোপাল বলে নলখাগড়া জাতীয় একরকমের অসংখ্য আগাছা ছিল চারপাশে। কারো কোনও কাজে না লাগলেও আমরা তার নরম অথচ মজবুত ডাল ভেঙে গোবর-ডান্ডা বলে একরকমের খেলা খেলতাম। মোটকথা নাম-কে-ওয়াস্তে শহরে বাস করলেও পুকুর-মাঠ-নদী-গাছপালা এরাও ছিল আমাদের খেলাধুলার অন্যতম সঙ্গী।

আমরা কারখানার অফিসার কলোনিতে থাকলেও প্রত্যেককে বাগান করার জন্যে যথেষ্ট জমি দেওয়া হয়েছিল কোয়ার্টারের লাগোয়া। অনেকে তাতে করতেন ফুলের চাষ, কেউ বা সুন্দর ঘাসের লন। আমাদের বাসার সামনের দিকে ফুল ও লন থাকলেও বাগানের পেছন দিকে ছিল বেশ কিছু বড় গাছ, যেমন সজনে, আম, পেয়ারা আর টোপাকুল। বলা বাহুল্য, আমাদের ছোটবেলাটা মাটিতে কম আর গাছে গাছেই বেশী কেটেছে। আমার এক পিসতুত দাদা খোদনদা ডাক্তারি পড়ত, মাঝে মাঝে বেড়াতে এলেই শাসিয়ে যেত। বলত, জানিস, ডারউইন সাহেব বলেছেন মানুষ আগে বাঁদর ছিল, গাছে গাছে ঘুরে বেড়াত। তারপর যখন সভ্য হয়ে গাছ থেকে নেমে এল, অমনি লেজ পড়ল খসে, ওরা মানুষ হয়ে গেল। আমার তাই শুনে একটাই ভয় হত। মাঝে মাঝে পেছনে হাত দিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে নিতাম কি জানি অজান্তে লেজ বেরিয়ে গেল কিনা। 

পেয়ারাগাছ। কুলগাছের কথাও বলেছি, কিন্তু কাঁটা ছিল বলে তাতে চড়া যেত না, তাই আমি আর গণেশ ঢিল ছুঁড়েই কুল পাড়তাম। সেদিকে ছিল আর এক বিপদ। ঢিল প্রায়ই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পেছনের নিন্নিদের বাসায় চলে যেত আর নিন্নি এসে রেগেমেগে পাঞ্জাবি ভাষায় ঝগড়া করত। তাই বিশাল পেয়ারাগাছটাই ছিল আমাদের বন্ধুদের দলের শীতের দুপুরের আড্ডা। আমাদের গাছটাতে প্রায় সারাবছরই মিষ্টি পেয়ারা ফলত, তবে গরমকালে তার স্বাদই হত আলাদা। পাকা পেয়ারার লোভে উড়ে এসে জুড়ে বসত যতরাজ্যের টিয়াপাখি, আমাদের কম্পিটিশন ছিল তাদের সাথে। আর ছিল শুঁয়োপোকা, গায়ে লাগলে আর রক্ষে নেই, জ্বালিয়ে মেরে দেবে। আবার তারা কদিন পরেই ছোট্ট কাঠের টুকরোর বাক্স বানিয়ে তার ভেতর ঢুকে পড়ত, আমরা জানতাম, ছমাস পরে তারা বেরিয়ে আসবে সুন্দর  সুন্দর রংচঙ্গে প্রজাপতি বা মথ হয়ে। তবে সেই পেয়ারাগাছেই ছিল আরেকজাতের অতিথি, যাদেরকে প্রায় দেখাই যেত না, অথচ তাদের উপস্থিতি দস্তুরমত টের পেয়েছিলাম একবার, আসছি সে কথায়। 

দেখা যেত না শুনে কি তোমরা ভাবছ ভূত? আরে না না। দেখা না যাওয়ার আরেকটা প্রাকৃতিক কারণ আছে যাকে ইংরেজিতে বলে 'ক্যামুফ্লেজ' (camouflage)। জন্তু-জানোয়ারদের শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে বা শিকার ধরার সুবিধের জন্যে এটা একটা প্রকৃতির দেওয়া বিশেষ সুবিধা। যেমন বাঘের হলুদ-কালো ডোরা ঝোপেঝাড়ের রঙের সাথে খাপ খাওয়ায় বাঘ সবার সামনে থেকেও লুকিয়ে থাকতে পারে। বহুরূপী গিরগিটিরা তো পরিবেশের রঙের সাযুজ্যে নিজের গায়ের রঙই বদলাতে থাকে তাই তাদের chameleon বলা হয় ইংরেজিতে। তা এতসব আগে জানা থাকলে কি এরকম হত সেদিন আমার সাথে? অন্যদিনের মতো পেয়ারাগাছে চাপার পর দেখি উপরের ডালে মস্ত একটা ডাঁশা! পেয়ারার গুণগ্রাহীরা জানবে সত্যিকারের ডাঁশা পেয়ারার স্বাদ পেতে দেবতারাও মানুষ হয়ে জন্ম নিতে চাইবে। অগত্যা আমিও তরতরিয়ে উপরের ডালে উঠতে থাকলাম। পেয়ারার ডালের বিশেষতঃ এই যে ওগুলো বাশ চিমড় হয়, একটা সরু ডালের উপরও উঠে দাঁড়ান যায়, ভেঙে পড়ে না। কিন্তু বিপদ এলো অন্য দিক থেকে। হঠাৎ যেন একটা সবুজ বিদ্যুৎ চোখের উপর ঝলসে উঠল, আর তার পরেই বাঁ হাতের কব্জির ওপর অসহ্য ব্যথা। গাছের উপর থেকে কোনও মতে পড়ে যাওয়া থেকে সামলে নিয়ে ওই সবুজ বস্তুটা নিয়েই তরতরিয়ে নেমে এলাম। তখন চোখে পড়ল জিনিনান।গাছের ডালের সাথে রং এমন ভাবে মিলিয়ে ছিল যে এতও কাছে থেকেও চোখে পড়ে নি। একটা লাঊডগা সাপ! ব্যস, মুহূর্তেই আমি অজ্ঞান।

বন্ধুরা তো ভাবল আমি মরেই গেছি। ভাগ্যিস সেই সময় খোদনদা গরমের ছুটিতে এসেছিল, এক বন্ধু বুদ্ধি করে তাকেই ডেকে নিয়ে এল। সাপটাকে ততক্ষণে সাহসী বন্ধুরা মেরে ফেলেছে। দেখে খোদনদা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ও, Vine snake. চিন্তার কিছু নেই, কিছু হবেনা। না, না, বাঁধন দেওয়ারও দরকার নেই। স্পিরিট দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছি, আর এককাপ গরম দুধ- ওতেই সেরে যাবে। আহা, তোরা নিরীহ সাপটাকে মেরে ফেললি, আরে ওদের বিষ থাকে না। দাঁড়া তোদের একদিন food chain system টা বোঝাতে হবে, তবে যদি কিছুটা শিক্ষা হয়!
- তাহলে ও অজ্ঞান হয়ে গেছল কেন, খোদনদা, তোতোন জিগ্যেস করল।
- সে তো ভয়ে, যখন বুঝতে পারল ওকে সাপে কামড়েছে। কি রে, ঠিক বলি নি? শেষ প্রশ্নটা আমাকে, ততক্ষণে উঠে বসেছি। আর যদি বিষ থাকতোই, তোদের ঐ বাঁধনে কাজ হত কচু।
- কেন আমরা তো কামড়ের জায়গার দু-তিন ইঞ্চি ওপরেই বাঁধছিলাম, একজন উত্তর দিল।
- দূর বোকা, বাঁধন যদি শিরায়চেপে না বসে কি লাভ তাতে। কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত এক জোড়া হাড় গেছে, তাদের নাম ulna আর radius, বিষাক্ত রক্তের শিরা যদি অবস্থান দুটোর মাঝে থাকে, তবে যত চেপেই বাঁধো, শিরায় চাপ পড়বেনা কিছুতেই।
- তাহলে কি উপায়?
- উপায় আছে। কনুই থেকে কাঁধ পর্যন্ত গেছে একটি মাত্র হাড়, humerus, অতএব সেখানে বাঁধন দিলে হাতের যে কোনও শিরায় চাপ পড়তে বাধ্য। যাক্‌ গে সাপ মরল, লাঠিও ভাঙ্গল না, কিন্তু আমার ফী কে দেবে?
- আমার কাছে তো পয়সা নেই, বাবাকে বলব।
- ওরে বাবা, মামার কাছে চাইবি আমার ফী, তুই আমার মামাবাড়ি আসা বন্ধ করবি দেখছি। যা, যেটা দেখেছিলি, ওই পেয়ারাটা পেড়ে এনে আমায় খাওয়া, তাহলেই হবে।
- আবার চাপব গাছে? আমি ভয়ে ভয়ে শুধোলাম।
- আলবাত চাপবি, একশোবার চাপবি...দেখলি তো লাউডগা সাপের কোনও বিষ নেই। তাছাড়া ওই কবিতাটা আছে না, 'কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে...' , তারপরের লাইনটা কি যেন? কই, বলনারে!

কে বলবে? আমি তো ততক্ষণে গাছের মগডালে!

৮ই ডিসেম্বর, ২০১৪।
 


Posted by Pallab Chatterjee at 5:16 AM No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest

Saturday, December 6, 2014

বিশেষ রচনা- ট্রৈনন্দিন ১-৫ ।।

ট্রৈনন্দিন- ১ ।।


অনেকদিন আগের ঘটনা। পিসেমশাইএর সাথে এসেছি তাঁর বেয়াই বাড়ি অশোকনগরে, শেয়ালদা-বনগাঁ লাইনে। বিকেলে পিসেমশাই বললেন তাঁর এক বাল্যবন্ধু অবস্থার বিপাকে পড়ে কিছু টাকা ধার চেয়েছিলেন, তিনি গোবরডাঙ্গা গিয়ে টাকাটা সেই বন্ধুর হাতে দিয়ে আসতে চান- আমি সাথে গেলে ভাল হয়। আমি বসে থেকে কি করব, এক পায়ে খাড়া যাবার জন্যে। ভ্যান-গাড়িতে করে হাবড়া স্টেশনে এলাম, বনগাঁ আপ লোকাল ধরতে।

স্টেশনে আসতেই দেখি পিসেমশাই হড়বড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে ব্যস্ত, টিকিট না কেটেই। আমি একবার মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করলে ইশারায় আমাকে চুপ করিয়ে দিলেন। উনি কোনও গরিব বা কিপ্টে মানুষ নন, আরবে থেকে ভালই রোজগার করেন। আমি তাঁর এই ব্যবহারের মাথামুণ্ডূ বুঝলাম না।
যা হোক, ট্রেন এল, আমরা উঠলাম এবং যথারীতি গোবরডাঙ্গা এলে নেমেও পড়লাম। স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটছি, পিসেমশাই নিজেই মুখ খুললেন।

- জানি, তোর মনে খটকা লেগে আছে, তাই খুলেই বলছি ব্যাপারখানা। এই লাইনের বাসিন্দারা বারাসত বা শেয়ালদা না গেলে কেউ টিকিট কাটে না, এখানকার এটাই দস্তুর। এখন আমি যদি কাউন্টারে গিয়ে বলতাম, দুটো গোবরডাঙ্গা দিন, দাদা, পকেটমার বা ছিন্‌তাই পার্টি বুঝে যেত আমি এই অঞ্চলে নতুন। পকেটে পাঁচ হাজার নিয়ে বেরিয়েছি, রিস্ক হয়ে যেত রে, বুঝলি না......

আমি আর কি করি? তাই বললাম মনে মনে যা দু-আড়াই হাজার বছর আগে আলেকজাণ্ডার বলে গিয়েছিলেন সেনাপতি সেলুকাসকে!



ট্রৈনন্দিন- ২ ।।


৪ নং ডাউন কলকাতা মেল দাদারে এসে দাঁড়াতেই দেখি ফুলের মালা ইত্যাদি নিয়ে হৈ-হৈ কাণ্ড, রৈ-রৈ ব্যাপার। কি, না সি-আরের একজন চীফ ইঞ্জিনিয়ার সদ্য ডিজিএমে প্রমোটেড হয়ে চলেছেন চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভের দায়িত্ব নিতে। গাড়িতে ফার্স্ট এসি ছিলনা, তাই উনি এসি টু টায়ারেই চলেছেন আমাদের সঙ্গে।
তারপর ত প্রতি স্টেশনে মাল্যার্পণ ও অভিনন্দন, ভদ্রলোকও দেখলাম অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। আমার টিকিট ছিল ধানবাদের, চাপার আগেই খবর পেয়েছিলাম বাড়ির লোকজন সবাই গেছে আসানসোল, আমার মামাবাড়িতে কি একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। অগত্যা টিকিটখানা আসানসোল পর্যন্ত এক্সটেন্ড করাতে মনোযোগ দিলাম। ইতিমধ্যে আরেকজন রেলের অফিসার উঠেছেন জব্বলপুরে। তিনি বাঙালি, আসানসোলে কমার্শিয়াল সুপার। এদিকে আমি যতবার টিটিইকে ধরছি, তিনি কোনও না কোনও বাহানা করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। শেষে চেপে ধরতে বললেন, 'মোগলসরাইয়ে ইস্টার্নের টিটিই চাপবে, তাঁকে বলুন'। অগত্যা অপেক্ষা করতে লাগলাম।
এদিকে মোগলসরাইএ একজন বাঙালি টিটিই চাপাতে একটু আশা জাগল, কিন্তু তিনিও হতাশ করলেন আমাকে। বললেন, 'আমার কাছে ত এক্সট্রা টিকিটের রসিদবই নেই, আপনি বরং ধানবাদে নেমে একটা আসানসোলের টিকিট কেটে নিন, ওখানে দশ মিনিট দাঁড়াবে'।
সে ত আমি জানিই। কিন্তু এক্সটেনশানে লাগবে দশ টাকা, আর ফ্রেশ টিকিট নিলে পঁচাত্তর। তাছাড়া, সময় অল্প, যদি ট্রেন ছেড়ে দেয়! ধরলাম ভি-আই-পি ভদ্রলোককে। উনি তখন ঘুমোবার তোড়জোড় করছেন, বললেন, 'দেখুন, আমি ত টেকনিক্যাল লোক, এ সব ব্যাপার ঠিক বুঝি না। আপনি বরং এনাকে ধরুন', দেখিয়ে দিলেন উনি কমার্শিয়াল সুপারিন্টেন্ডেন্ট ভদ্রলোককে। উনি বললেন, 'হেঁ হেঁ, কোই পরোয়া নেই। আমি আসানসোলেই নামব কাল সকাল ন'টায়। আপনি আমার সাথে নেমে পড়বেন।'
ডিজিএম সাহেব বরাকরেই নেমে পড়েছিলেন। আসানসোল এল, আমরা দুজনেই নামলাম। 'হেঁ হেঁ, আপনি লোকো শেড হয়ে হাটন রোড বা গির্জা মোড়ের রাস্তা চেনেন ত। আমি হ্যাঁ বলতেই 'দেন ফলো মি' বলে লাইন ধরে এগিয়ে গেলেন । আমরা স্টেশন অতিক্রম করে লোকো শেডের ভেতর এসে পড়লাম।

'আপনার টিকিট জার্নি এক্সটেণ্ড করে টিটিইর ত কোনও লাভ নেই, হেঁ হেঁ', যেতে যেতে ভদ্রলোক কৈফিয়ৎ দিতে শুরু করলেন, 'তাছাড়া আমাদের সামনে সে কিছু চাইতেও পারবে না। কিন্তু টিসি-টিটিইদের ধর্মই হোল, হেঁ হেঁ, বুঝলেন কিনা, উপরি ছাড়া কোনও কাজ করা মানা, আমিও তো টিসি ছিলাম এক কালে। তাই সবদিক বজায় রাখতে মধ্যপন্থা বেছে নিলাম, হেঁ হেঁ, ঠিক করিনি?'



ট্রৈনন্দিন- ৩ ।।

শেষ দিন পর্যন্ত সবকটা রিজার্ভেশন কনফার্ম হল না। তবে যখন ব্যাণ্ডেল স্টেশনে কামরূপ এসে দাঁড়াল, দেখি আমারটা কনফার্ম, আমার স্ত্রী আর মায়ের টিকিট দাঁড়িয়েছে আর-এ-সিতে। তাও ভাল, কোচে ওঠা যাবে, নামিয়ে দেওয়ার অধিকার নেই কারও। খোঁজাখুঁজি করে নির্দিষ্ট সীটে বসে জিনিষপত্র রাখতে রাখতেই গাড়ি ছেড়ে দিল।

'হবে, হবে, অত অধৈর্য হচ্ছেন কেন?' মৃদু ধমক দিলেন কোচ কণ্ডাক্টার। দুটো এসি থ্রী-টায়ারের জন্যে একজন সিসি। বাঙালি, তবে নামটা আজ আর মনে পড়ছে না। 'আরে মশাই, আপনার তবু একটা কনফার্ম, দুটো আরেসি। অনেকের ত ওয়েটিংই ক্লিয়ার হয়নি। তাদের দেখতে হবেনা!' আমি ত হতভম্ব। বলে কি? ওয়েট-লিস্টেড প্যাসেঞ্জারের ত রিজার্ভ কামরায় ঢোকাই বে-আইনি। উনি দেখলাম অম্লানবদনে বাঁ-হাতে টাকা নিচ্ছেন আর ডান হাতে রিজার্ভেশন স্লিপ দিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক, আমার কোনও কথা কানে না তুলে।

 এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। নবদ্বীপঘাট না কাটোয়া কি যেন একটা স্টেশন গেল। এবার একটু ফাঁকা পেয়ে ধরলাম ভদ্রলোককে। 'দেখুন, আপনি কিন্তু আর-এ-সি ক্লিয়ার না করে ওয়েট-লিস্ট কনফার্ম করে যাচ্ছেন। জানেন এটা বে-আইনি?' বললাম আমি। 'আমি জানি, তবে পরোয়া করি না', তাচ্ছিল্যের সাথে তিনি বললেন। 'তবু আপনি বাঙালি বলেই বলছি, আমি একটু ধর্মসংকটে পড়েছি।'
'লেন-দেন ছাড়া কাজ করলে অধর্ম হবে, তাই তো? ঠিক আছে, কত চান বলুন? যদিও আপনি কোনও ফেবার করছেন না, কিছু দেওয়ার কথাও নয়। তবু আমার মায়ের বার্থ বলেই দিচ্ছি' বলে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিলাম। 'আপনি এখনও পুরোটা বোঝেননি', কণ্ডাক্টার বললেন। 'ধর্মসংকটের একদিকে আছে আমার চাকরি, অন্যদিকে মা। টাকা না নিয়ে কাজ করলে আমার শুধু লসই নয়, এ লাইনে অনেষ্ট বলে বদনামও হবে- কলিগদের কাছে মুখ দেখাতে পারব না। না না, আইন দেখাবেন না, আইনকানুন শুধু প্যাসেঞ্জারদের জন্যে, আমাদের জন্যে নয়। কিন্তু আমার মা আমাকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছেন, ওরে কোনও মহিলার কাছে কখনও উপরি নিস নে। সে কথাও ত অমান্য করতে পারি না।'

'আপনার সাধুতা দেখে মুগ্ধ হলাম মশাই! সে কথা তো আগে বললেই পারতেন। ভালই হল, আমার মাও আমাকে অসৎ কাজ করতে মানা করেন।' এবার আমার বলার পালা, 'আপনার পকেটের ঐ এক্সট্রা  কলমটার দাম কত? আমাকে দিন না? এমনি দিতে হবে না, পঞ্চাশ টাকা অফার করছি। কলমটা আর কত হবে, পাঁচ টাকা?  আপনি অফিসে সগর্বে বলতে পারবেন পঁয়তাল্লিশ টাকা বাঁহাতে কামিয়েছেন। আর মা জানবেন পেন বিক্রি করেছেন।'

'আমি পাঁচ টাকার কলম পঞ্চাশ দিয়ে নিচ্ছি কেন? কেন, পাঁচকে মানুষ ভুল করে পঞ্চাশ পড়ে না? একটা শূন্যেরই তো হেরফের। এবার সীট দুটো লিখে দেবেন কি দয়া করে, ঘুম পেয়েছে...।'



ট্রৈনন্দিন- ৪ ।।

না, গল্পটা আমার নয়। আমি জ্ঞান হবার পর শুধু পুরুলিয়া-কোটশিলা ন্যারো গেজ লাইনই দেখেছি, তবে বাবার মুখেই শোনা যে ১৯১০ সালে চালু হবার পর পুরুলিয়া-রাঁচি-লোহারদাগা পুরো সেকশানটাই ছিল ন্যারো গেজ যার উপর দিয়ে কু-ঝিক-ঝিক করে যে রেলগাড়ি চলত তাকে বলা হত টয়-ট্রেন। বাবারা তাঁদের জ্যেঠু অর্থাৎ আমার বড়দাদুর বাসা রাঁচিতে ছুটিছাঁটায় যেতেন ঐ গাড়ীতে চেপে।
আমার ঠাকুমা আমাদের ছেলেবেলায় একটা ছড়া শোনাতেন-
'গড়গড়-গড়গড়ি চলিছে রেলের গাড়ি, জানালায় দিয়ে সারি রমণীরা দেখিছে-
ধন্য ধন্য সুকৌশল, পরিতপ্ত করি জল, বার করি বাষ্পানল বেগে কল ছুটিছে।'
জানিনা এটা এই ট্রেনের উদ্দেশ্যেই লেখা কিনা। বেগে ছোটার নমুনা সম্বন্ধে বাবা বলতেন-'এর জানলার পাশ দিয়ে, ওর বেগুন-ক্ষেতের বেড়ার গা ঘেঁসে, ছেলেদের ফুটবল খেলার মাঠের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। খেলাগাড়ি বলে পাছে কেউ পাত্তা না দেয় তাই মাঝে মাঝেই সশব্দে বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে ড্রাইভার। মাঝে মাঝে তো এমন স্পীড তুলছে যে যখন-তখন নেমে পড়তেও ভয় লাগে। নামতে হয় কেন? বা রে, ট্রেনে বাথরুম নেই যে! স্টেশনে নেমে তো সবার সামনে করা যায় না।'
তা একদিন জোনা ষ্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরে অনেকে খেয়াল করল- একি, গাড়ি পেছনে যায় কেন? কিছুটা খাড়াই আছে বলে মুরী-রাঁচি সেকশনে ডবল ইঞ্জিন লাগানো হয়, তবে কি একটা ইঞ্জিন কাজ করছে না? কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, সবাই যেমন খুশি কল্পনা করে নিচ্ছে। সবছেয়ে ভয়ের ব্যাপার, যদি পাহাড় ঠেলে উঠতে না পারে আর ব্রেক ফেল করে, শেষে থামতে পারবে তো!
কিছুক্ষণের মধ্যেই সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গাড়ি থামল। গার্ড-সায়েব (সত্যিকারের সাহেব) নেমে গিয়ে নিজের টুপিখানা কুড়িয়ে নিয়ে এলেন, গাড়ি আবার সমুখপানে রওনা হল।



ট্রৈনন্দিন- ৫ ।।

পুরুলিয়া থেকে চেলিয়ামার পথে রুকনী-গোবিন্দপুর একজোড়া গা-লাগোয়া গ্রাম, যুগ্ম-গ্রাম যাকে বলে। গ্রাম ছোট হলেও বিখ্যাত, তবে এই খ্যাতি- না, পুলিশ-সুপার কাম জমিদার তেজচন্দ্র (আমার ঠাকুর্দার বাবা), রাঁচির পুলিশ সুপার হরিপদ (তাঁর বড় ছেলে), ট্রিপ্ল এম-এ, বিএল উকিল ভোলানাথ (আমার ঠাকুর্দা), ঝুমুর-কবি শ্রীপতি দত্ত, লেপ্রসির ডাক্তার সত্যনারায়ণ সরকার- এঁদের কারো জন্যে নয়। সত্যি বলতে কী, আশেপাশের পাঁচটা গ্রামের মানুষের চোখে এ গ্রামের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষটি ছিলেন রেলের আদ্রা ডিভিশনের গার্ডসাহেব শান্তি চক্রবর্তী। জানি, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু কথাটা সত্যি। তাহলে বরং একটা নমুনাই দিই।
গ্রামের মানুষ আমার বাবা, মটর কাকু (ডাঃ সরকার, যাঁর কথা আগেই বলেছি) আর সুবল ঘোষাল ছিলেন ছোটবেলাকার বন্ধু, যাকে বলে হরিহর-আত্মা। বাবা আর সুবলজ্যেঠু ছিলেন সিন্দ্রি সার কারখানায় আর মটরকাকু বাঁকুড়ার গৌরীপুর লেপ্রসি হাসপাতালের ডাক্তার, পরে সুপারিন্টেন্ডেন্ট হয়ে অবসর নেন। কয়েকদিনের ছুটি ছিল, বাবা পুরুলিয়া গেছিলেন, সেখান থেকে আদ্রা এসেছেন, মটর কাকু বাঁকুড়া থেকে আদ্রা। খবর পেয়ে সুবল জ্যেঠু সাইকেল নিয়েই দামোদর নদ পেরিয়ে চেলিয়ামা হয়ে পৌঁছে গেছেন আদ্রা জংশন, এবার একসঙ্গেই সকাল এগারোটার আদ্রা-গোমো প্যাসেঞ্জার ধরে দুই স্টেশন পরের রুকনী রওনা হবেন।
এটুকু ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড। ট্রেন এসে দু'নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। সুবলজ্যেঠুর সাইকেল ট্রেনের কামরায় তুলে দিয়ে আরাম করে বসেছেন তিনবন্ধু মিলে। খুব আড্ডা জমেছে বহুদিন পরে তিনজন একত্তর হওয়াতে। কিন্তু এগারোটা বেজে গেল, গাড়ি ছাড়ে না কেন? একজন রেলের খালাসিগোছের কেউ ছুটে ইঞ্জিনের দিকে যাচ্ছিল, জিগ্যেস করায় বলে- শান্তিঠাকুর সিন্হা‌নে গেছেন!
তার মানে? শান্তিঠাকুর মানে গোবিন্দপুর গ্রামের শান্তি চক্কোত্তি রেলের গার্ড, সেটুকু সকলে জানে, বাকিটা বোঝা গেল না। কী ব্যাপার জানতে এঁরা তিনজনে এঞ্জিনের দিকে এগিয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে আর একটি ছোকরা হন্তদন্ত হয়ে ড্রাইভারকে এসে জানাল- শান্তিঠাকুর খেতে বসেছেন। বোঝো কাণ্ড! প্রতি পাঁচ মিনিটে একজন করে ভগ্নদূত আসে আর খবর দিয়ে যায়- ঠাকুর আঁচাচ্ছেন, ঠাকুর জুতা পরলেন। শেষে প্রতীক্ষার সমাপন, শেষ দূত এসে খবর দিল, শান্তি ঠাকুর আসছে-এ-এ-ন! শান্তি ঠাকুর (গ্রামের দিকে ব্রাহ্মণকে সম্মানার্থে ঠাকুর সম্বোধন করা হত) পান চিবোতে চিবোতে গার্ডের কেবিনে উঠলেন, ট্রেন ছাড়ল।
ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু কিছু নাটক তখনও বাকি ছিল। তিন বন্ধুর গল্প আর শেষ হয় না, রুকনী স্টেশনে নেমেও কথা বলতে বলতে এগিয়েছেন তিনজনে। গাড়ি ছেড়ে সাঁওতালডি অভিমুখে রওনা হল। গাড়ির শেষ কামরা পেরিয়ে গেল। হঠাৎ যেন সুবলজ্যেঠুর চমক ভাঙল। উনি দু'হাত তুলে 'থামাবে হে, থামাবে হে', বলে পাগলের মত ছুটতে থাকলেন গাড়ির পিছু পিছু। 'কী হে, ঘোষালঠাকুরের মাথাটাথা বিগড়ে গেল নাকি' বাবা অবাক হয়ে শুধোলেন মটর-কাকুকে। তিনি নিরুত্তর, তারপর ঘাড় নেড়ে বললেন, 'কিছু একটা হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু ওভাবে ছুটলে কি ট্রেন থামে, হলেই বা প্যাসেঞ্জার গাড়ি?'
কিন্তু গাড়ি থামল। ধীরে সুস্থে নেমে এলেন গার্ড-সাহেব। তাঁকে কিছু একটা বলে জ্যেঠু এগিয়ে গেলেন। তারপর হড়বড় করে কামরা থেকে নামালেন নিজের সাইকেলটি!
গাড়ি ছেড়েছে। 'এইবার বুঝলি তো সুব্লা‌, গাঁয়ের খুড়া-জ্যাঠা গার্ড হলে কত সুবিধা?'- চলন্ত ট্রেনের গার্ডের কামরা থেকে মুখ বাড়িয়ে কথাটা ছুঁড়ে দিলেন শান্তি চক্কোত্তি।



ট্রৈনন্দিন- ৬ ।।

কেউ ফেরে না
খাণ্ডোয়ায় ট্রেনটা থামতেই নেমে পড়লেন পুনর্বসু ভট্টাচার্য। এদিক ওদিক তাকালেন একবার। ঐ তো, অর্জুন গাছটা ঠিকই আছে প্ল্যাটফর্মের এককোণে, কিন্তু না আছে সেই ময়না পাখিটা, না গাছের তলার সেই কুকুরটা। তপনই বা কোথায় গেল? এসি কামরাটা দাঁড়ায় প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষে, একটা চা-ওলা শুদ্ধু মেলেনা সেখানে। আর থাকবেই বা কেন? বাবুরা ঠাণ্ডায় ঘুমোবেন বেলা পর্যন্ত, তার পর কেটারিং-এর বাসি স্যান্ডুইচ আর ঠাণ্ডা চা খাবেন আরাম করে। এই পুনর্বসুবাবুর মত দু-চারটে পাগলাটে লোকের জন্যেই বোধহয় তপনের দোকান চলত।

দুর্গাপুরের তপন চক্রবর্তী নিঃস্ব অবস্থায় খান্ডোয়া স্টেশনে কিভাবে এল সে এক অন্য গল্প। বুড়ো ঠেলাওয়ালা বুধন কুশোয়াহার দয়ায় তারই সাথে পাঁউরুটি সেঁকার কাজে লেগে পড়েছিল, সেও প্রায় সাত বছর হল। অপুত্রক বুধনের ঠেলাগাড়ি এখন তপনেরই, বুধনের বিধবা তার আম্মা। আগে এই বোম্বে মেলের শেষ বগিটা ছিল ভীড়ে ঠাসা জেনারেল, একদিন ছক বদলে এসি কামরাগুলো দিয়ে দেওয়া হল সেখানে, ঝপ করে সেল কমে গেল তপনের। তখন সে শুরু করল অমলেট বানানো, তাতে কিছুটা অন্ততঃ সুরাহা হল।

কিন্তু হল কি ছেলেটার, পুনর্বসুর একটু চিন্তা হয় বৈকি! তিনি জব্বলপুরে রেলের ইঞ্জিনিয়ার, তিন কুলে কেউ নেই, অকৃতদার, শখের মধ্যে ব্রিজ খেলা আর বংশসূত্রে পাওয়া সংস্কৃত-চর্চা। পুনর্বসু ভট্টাচার্যের সম্বন্ধে আমার এত কিছু জানার কথা নয়, কিন্তু ঘটনাক্রমে জেনে ফেলেছি, একই ট্রেনের একই কামরায় বার তিনেক দেখা হওয়ার পর। তখন আমি মুম্বাইয়ের সমুদ্রে পেট্রোলিয়াম রিগে কাজ করি, দুই সপ্তাহ একটানা হাড়ভাঙা খাটুনির পর ধানবাদে বাড়ি ফিরি ওই ট্রেনের এসি টু-টায়ারে। বলা বাহুল্য, তেল কোম্পানি এই টিকিটটুকু কেটে দেয়। একদিন ট্রেনের বগিতে বসে ভাসরচিত 'মধ্যমব্যায়োগ'এর বাংলা অনুবাদ পড়ছি, উনি দেখে বললেন, 'মূল সংস্কৃতে পড়লে আরো ভাল লাগত।' বললাম, 'স্বীকার করছি, কিন্তু উপায় নেই। গীতগোবিন্দম বা মেঘদূত পড়ে তবু কিছু বোঝা যায়, ভাসের ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি। নেহাৎ পরশুরামের গল্পের ভীম আর হিড়িম্বার পুনর্মিলনের আসল ঘটনাটা পড়ার ইচ্ছে ছিল, তাই।'

উনি হাসলেন। বোঝা গেল আমাকে মনে ধরেছে। আলাপ হল। ব্রিজে আমারও খুব আগ্রহ, যদিও রেগুলার পার্টনারের অভাবে আজকাল আর খেলা হয়না। তারপর আমরা স্টেম্যান আর ব্ল্যাকউড নিয়ে মেতে উঠলাম। দেখলাম গোরেন আর ডরোথি হেডেন ট্রাসকটের লেখা বইগুলো ওঁর গুলে খাওয়া।

'আচ্ছা, আপনি গোমাংশ খেয়েছেন?' হঠাৎ প্রশ্নে আমি ঘাবড়ে গেলাম। 'আমি গোমাংশ খাই, এমনকি নরমাংসও।' বলাতে আমি কথা বন্ধ করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম। পুনর্বসু হো হো করে হেসে উঠলেন। 'ভিরমি খাবেন না। ভাটপাড়ার বামুন আমি, 'স' ওলা গোমাংস খাওয়ার প্রশ্নই নেই। তবে অপভ্রংশ ভাষায় 'গোমাংশ' বলে একটা শব্দ আছে যার মানে ভাঙা গম বা দালিয়া- সংস্কৃত গোধূম থেকে বাংলায় গম হবার আগে 'গোম' হয়েছে, তারই 'অংশ'।'

'আর নরমাংস?' আমি ভয়ে ভয়ে বললাম।
'ওটা আর বললাম না। আপনার লেখাপড়ার শখ আছে, নিজেই খুঁজে নিন।' আর কিছু সেদিন বলেননি তিনি।
পুনর্বসু ভট্টাচার্যের সম্পর্কে এত কিছু বলার প্রয়োজন ছিলনা, শুধু মানুষটা খ্যাপাটে হলেও যে সম্পূর্ণ রীতি-বহির্ভূত একজন মানুষ, তা বোঝাতেই এত কথা।

তপনকে আমিও দেখেছি প্ল্যাটফর্মের একপ্রান্তে ঠেলা নিয়ে পাঁউরুটি-ওমলেট বেচতে। নামটা বুকের ব্যাজে জামার উপর লাগানো ছিল বলেই সেটা জেনেছি। হ্যাঁ, সুদূর খান্ডোয়ায় হঠাৎ একটা বাঙালি ছেলে দেখে আমিও অবাক হয়েছি একটু। তবে ভেবেছিলাম নিশ্চয় ব্যাটা কিশোরকুমারের ফ্যান, এসেছিল দেখা করতে, আর ফিরতে পারেনি। এরকম তো অনেক হয়। তবে পুনর্বসু মানুষটাই আলাদা। বারবার অফিসের কাজে ভুসাওয়াল যেতে-আসতে প্রতিবার দেখা এই নিঃসহায় ছেলেটার প্রতি ওঁর একধরণের মায়া পড়ে গেছিল। ওকে নিজের সাথে নিয়ে যেতেও চেয়েছেন, তপনই রাজী হয়নি। এদিকে গাড়ি ছাড়ছে। উনি কি ভেবে কামরা থেকে ব্যাগটা নামিয়ে গাড়ি ছেড়ে প্ল্যাটফর্মের উপর এগিয়ে গেলেন।

ঠিক ট্রেন ছাড়তেই দেখা গেল তপনের ঠেলা। 'ওরে অকাল-কুষ্মাণ্ড, কুঞ্জকুঞ্জর, বন্যবরাহ, দস্যু-বর্বর!' বলতে বলতে পুনর্বসু তপনের হাতদুটো ধরলেন। 'আমি তোর খোঁজে গাড়ি ছেড়ে দিলুম, আর তুই ব্যাটা স্কন্ধকাটা আমাকে ফাঁকি দিতে এখানে এসে বসেছিস!'

'কি করছেন জ্যাঠাবাবু, লোকে দেখছে। এখন আর গাড়ি নেই, চলুন পুরোন জায়গায় গিয়ে বসি'- ওরা এলো সেই অর্জুন গাছটির নীচে। 'আচ্ছা জ্যাঠাবাবু, আপনার কখনও জানতে ইচ্ছে হয়নি কিসের নেশায় আমি স্টেশনের এই এককোণায় এসে ঠেলা লাগিয়ে বসে থাকতাম'?

'কি আবার, তুই তো আমার ব্যাটা, আমারই মত পাগল!'
'অনেকটা তাই বলতে পারেন। এখানে এসেই আমার চোখে পড়ে এই গাছটা, ওই ময়না পাখিটা যে মাঝেমধ্যেই মিষ্টি গলায় শিস দিয়ে উঠত আর গাছের তলায় নেড়িকুত্তাটা সারাক্ষণ মুগ্ধ হয়ে পাখিটাকে দেখত। আপনাকে আবার বলছি, জ্যেঠাবাবু, আমি ওদের কেউ নই, কিন্তু ওই দুটিকে ছেড়ে বেশিক্ষণ কোথাও গিয়ে টিকতে পারতাম না। পাখিরা কদ্দিন বাঁচে জানি না, একদিন ময়নাটা ফট করে মরে গেল। কুকুরটা তিন-চারদিন কোথাও নড়ে নি, আমি পাঁউরুটি দিলে খেত না, তারপর জানিনা কোথায় চলে গেল। তারপর আম্মাও গেল দু'মাস আগে, এখন আর শহরে আমার নিজের বলতে কেউ নেই'- একটু যেন রুক্ষ শোনাল তপনের গলা, কান্না শুকিয়ে গেলে যেমনটা হয় মানুষের।

'তবে আর দেরী কিসের? আমিও একা, তুইও একা। আমার সঙ্গে চল, পড়াশুনা করবি, তারপর রেলে ঢুকিয়ে দেব, কেমন?'

'যাব, জ্যাঠাবাবু। তবে একবার বাড়ি গিয়ে মাকে দেখে আসি। তারপর নিশ্চয়ই যাব।'

মাসছয়েক পরে পুনর্বসুর সঙ্গে আবার দেখা, সেই একই কামরায়, তবে ডাউন ট্রেনে, খান্ডোয়ায় চাপলেন এসে। 'স্যার, নরমাংস নিশ্চয় মানুষের মাংস নয়। ভেবে দেখলাম নরম আর অংস, মানে কাঁধ, সন্ধি হয়েও তা হয়, ছাগলের নরম কাঁধ খাওয়াও যায়।'
তবে এত কিছু বলা পরেও ওঁর কোন ভাবান্তর দেখলাম না। 'স্যার, তপনের কী খবর?' শুধোলাম, 'ওর ঠেলা আজকাল দেখিনা!'

'নাঃ কোন খবর নেই। কেউ কথা রাখে না, কেউ ফেরে না।' নিস্পৃহ কণ্ঠে বললেন উনি।


পুনর্বসু প্রতিবার ভুসাওয়াল যাওয়া-আসার পথে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকেন খাণ্ডোয়া স্টেশনের দিকে। নাঃ, তপনের চিহ্নমাত্র নেই সেখানে- সাক্ষী থাকে নীরব একটি অর্জুন গাছ।

Posted by Pallab Chatterjee at 3:56 AM No comments:
Email ThisBlogThis!Share to XShare to FacebookShare to Pinterest
Newer Posts Older Posts Home
Subscribe to: Posts (Atom)

Blog Archive

  • ▼  2022 (8)
    • ▼  June (3)
      • অথ তেলাপোকা-ঘটিত - বাংলা গল্প
      • মন-দর্পণ- গল্প
      • हर एक बात पे कहते हो तुम की तू क्या है, तुम्ही कहो...
    • ►  May (1)
    • ►  April (3)
    • ►  March (1)
  • ►  2021 (11)
    • ►  July (2)
    • ►  June (2)
    • ►  May (4)
    • ►  March (3)
  • ►  2020 (20)
    • ►  December (2)
    • ►  November (1)
    • ►  October (1)
    • ►  August (2)
    • ►  July (3)
    • ►  June (1)
    • ►  May (5)
    • ►  April (4)
    • ►  January (1)
  • ►  2019 (40)
    • ►  December (2)
    • ►  November (5)
    • ►  October (11)
    • ►  September (4)
    • ►  August (16)
    • ►  January (2)
  • ►  2018 (12)
    • ►  November (2)
    • ►  October (1)
    • ►  April (9)
  • ►  2017 (25)
    • ►  December (3)
    • ►  October (2)
    • ►  August (5)
    • ►  May (1)
    • ►  March (2)
    • ►  February (12)
  • ►  2016 (10)
    • ►  September (1)
    • ►  July (1)
    • ►  May (8)
  • ►  2015 (30)
    • ►  December (4)
    • ►  August (2)
    • ►  July (10)
    • ►  May (4)
    • ►  January (10)
  • ►  2014 (45)
    • ►  December (2)
    • ►  November (15)
    • ►  August (4)
    • ►  June (2)
    • ►  April (12)
    • ►  February (10)
  • ►  2013 (41)
    • ►  December (5)
    • ►  October (36)

About Me

Pallab Chatterjee
View my complete profile
Simple theme. Powered by Blogger.