Friday, May 1, 2015

বাংলা অণুগল্প ৪১ ।। মরুবিজয় ।।

মরুবিজয় ।।

পুরুলিয়ার দাঁদা গ্রামের রূপলাল মাঝি ছিল আমাদের ভাগীদার। না, সে অঞ্চলে অনাবাসী জমিদার খুব একটা না থাকায় তেভাগার আঁচ সেরকম লাগে নি, মালিক-ভাগীদার সম্পর্ক ভালই ছিল। তাছাড়া খাটতে পারত বলে দাদু তাকে গোবিন্দপুর পাঠশালার বাগানের দায়িত্বও দিয়েছিলেন, তাতে খানিকটা হলেও অতিরিক্ত একটা আয় থাকত। এছাড়া আরেকটা বিশেষ গুণ ছিল রূপলালের। প্রহ্লাদ বাউরির ঝুমুর গানের সাথে তার মাদলে সঙ্গত সেইসময় আর পাঁচটা গ্রামে নাম কুড়িয়েছিল। একদিন বন মহোৎসবের উপলক্ষ্যে ওদের ডাক পড়ল শান্তিনিকেতনে। নিতান্ত ঘরোয়া অনুষ্ঠান, কিন্তু রূপলালের মনে তার প্রভাব পড়েছিল।
আমরা আজ যাদেরকে 'পেগানিস্ট' বলে বিশেষ সম্মান করি, আবার গালাগালও দিই, এই দেশেরই কিছু উপজাতির মানুষরা কিন্তু বংশ-বংশান্তরে, হয়ত অবচেতনাতে প্রকৃতিদেবীর একনিষ্ঠভাবে উপাসনা করে আসছে। ওখানে প্রহ্লাদের ঝুমুর বেশ জনপ্রিয় হয় বটে, তবে ফিরে আশার পর রূপলালের প্রথম প্রশ্নটা দাদুকেও বিস্মিত করে তোলে। ও জানতে চেয়েছিল-'মরুবিজয়ের কেতন' মানে কি? তারপরেই ও মাঝে মাঝে শহরে চলে আসত আমার বাবার কাছে 'মাটি পরীক্ষা', 'সয়েল প্রিজার্ভেশান' ইত্যাদি সম্বন্ধে গভীরভাবে জানতে। বাবা তাকে সয়েল টেস্টিং ল্যাবে নিয়ে গিয়ে লোম ও অ্যালুভিয়াল সয়েলের বিশেষত্ব, টপ সয়েল নষ্ট হবার কারণ ও তার পরিণতি, কম্পোস্ট, ইউরিয়া, সুপার ফসফেট ইত্যাদি সারের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার বেশ যত্নসহকারে বোঝাতেন।
তারপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। বহুকাল পরে এসেছি গ্রামে। সঙ্গে কাকা, সদ্য ইটালি থেকে ফিরেছেন, হাতে একটা নতুন ধরণের যন্ত্র- একটা স্পুল টেপ-রেকর্ডার। খবর পেয়েই প্রহ্লাদ আর রূপলাল এসে হাজির, বেশ কিছু ঝুমুর গান রেকর্ড করা হল। বিকেলে রূপলাল আমাদের নিয়ে বেরোল। কি আশ্চর্য সবুজ চারিদিকে! দাঁদার মরা জঙ্গল থেকে যে টাঁড় জমি লালপুর হয়ে মৌতোড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সব সবুজ হয়ে গেছে গাছে গাছে। এত গাছ কে লাগাল? উত্তরে শুধু মৃদু হাসে রূপলাল মাঝি। 'ফরেস্টের রেঞ্জার সায়েব বাধা দিয়েছেন, কিন্তু খুড়ার ধমক শুনে আর কিচ্ছুটি কইতে পারেনি। তবে জঙ্গলটা চেলিয়ামা রেঞ্জের দখলে এখন, আমাকে অবশ্য আর কিছু বলার সাহস পায় না ওরা।' বুঝলাম শান্তিনিকেতনের মরুবিজয়ের কেতন ওড়ান দেখেই এই রূপলালের নবজন্ম। বিস্তীর্ণ হাজার একর জমিকে সবুজ করে তুলে ওর নাম ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে।
গতকাল মৃত্যু ঘটেছে পদ্মশ্রী রূপলাল মাঝির। আমি নিজে গিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে এসেছি। এবার থেকে তিনি বসবেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ, পরিবেশ মন্ত্রকের উপমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। তবে মহীরূহ মরলেও তার শেকড় থেকে জন্ম নেয় আরো অসংখ্য তরুলতা, তাই ক্ষীণ হলেও কিছুটা আশা রাখি পরবর্তী প্রজন্মের উপর।

২৪শে এপ্রিল, ২০১৫, কুয়েত।

বাংলা অণু-গল্প ৪০ ।। এ কি প্রেম নয়!

এ কি প্রেম নয়!
অণু-গল্প


'শোনো, তুমি বরং চাকরিটা ছেড়েই দাও। চুল-দাড়ি গেলে আর শিখদের কি রইল, শুনি?' অনুযোগের সুরে বলল সুরিন্দর। শুনে ঈশ্বর একটু মুচকি হাসল শুধু।
' না, তবু সিরিয়াসলি ভাব একটু। ধর্ম বেচে রুটি খাওয়ার কথা কি আমাদের জাতে কেউ কোনদিন শুনেছে? অন্য কোথাও কিছু পাওয়া যায় না কি?' এবার একটু ঝাঁঝ পাওয়া গেল সুরিন্দরের কথায়।

ঈশ্বরের বাবা উত্তম সিংহ গিল কাজ করতেন ওমানের তেলের খনিতে, ওয়ার্কওভার অপারেশনস বিভাগে। সেদিনও রুটিনমত টিম নিয়ে বেরিয়েছিলেন ওয়েল ইন্সপেকশনএ। সোহারের ৩১২ নম্বর কুপের একটা লিকেজের রিপোর্ট ছিল। উত্তম সেলার পিটের উপর থেকেই গেজে ৩০০০ কিলোপাস্কলের মত প্রেসার দেখতে পাচ্ছেন। 'দেখা যাক, ব্লিড করা যায় কিনা' এই বলে তিনি ব্রিদিং মাস্ক পরতে লাগলেন।
'স্যার আপনি কেন নাবছেন, আমি গিয়ে দেখছি'- সর্বনা বলে ওঠে।
'আরে ছড ইয়ার, পাঞ্চ মিটার থললে হি তো জানা হ্যায়, অভি হো আতা হুঁ।' বলে নেমে পড়লেন উত্তম।
ভালভ খুলে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তো আছেনই, কি হলো স্যারের- সর্বনা আর গুপ্তে হাঁ করে ভাবছে। হঠাত কি ভেবে গুপ্তে বলল, 'ম্যায় জাতা হুঁ, তু ভি আ'.......মাস্ক পরে তৈরী হয়ে নিল তারা।
আজ ঘটনাটার ছয় বছর হয়ে গেল, ভাবছিল ঈশ্বর। সেই সকালে উত্তমের অচেতন দেহটাকে দুজনে মিলে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছিল, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। প্রচুর পরিমানে হাইড্রোজেন সালফাইড নি:শ্বাসের সাথে রক্তে মিশে মৃত্যু ঘটে তাঁর। লম্বা চুল-দাড়ি থাকায় ব্রিদিং মাস্ক সীল করেনি, এই হলো সেফটি কমিটির রিপোর্ট। ওরা অবশ্য অম্রুতা অর্থাত উত্তমের স্ত্রীকে একটা কেরানির চাকরি দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ঈশ্বর তখন স্কুলের পরীক্ষায় ভাল ফল করে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ঢুকে পড়ায়, তিনি পরিবর্তে ছেলের ভবিষ্যতে উপযুক্ত চাকরির কথাটা আদায় করে নিয়েছিলেন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। আজ অম্রুতাও ইহলোকে নেই। ক্যানসার ধরা পড়তেই অপরিণত বয়েসেই ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সংসারী দেখে তিনি গেছেন।

ঈশ্বরের সাথে ছেলেবেলা থেকে প্রেম সুরিন্দরের। বিয়ের পর থেকে ওরা কাছছাড়া হয়নি কখনো। এই চাকরিটা সে নিয়েছে কারণ শুধু মাইনে বেশি বলেই নয়, সুরিন্দর সাথে থাকতে পারবে।তাছাড়া মায়ের চিকিত্সায় বেশ কিছু ধারও হয়ে গেছে. যদিও অয়েল-ফিল্ডে কাজ বলে কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী তাকে দাড়ি কেটে 'মোনা' হতে রাজি হতে হয়েছে। তারপর আজ গিয়ে চুল-দাড়ি কেটে, মাস খানেকের মধ্যেই যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

পরদিন সকাল থেকেই মন খারাপ সুরিন্দরের। 'আরে বাবা আজই তো যাচ্ছি না। আর তাছাড়া তুমিও ত যাবে সাথে, তাই না', সান্ত্বনা দেয় ঈশ্বর। আজ সকাল সকাল স্নান সেরে নিয়েছে সে। চুল শুকনো, বাঁধার বালাই নেই, ফটাফট তৈরী, এবার ভিসার জন্যে ফটো তুলতে যাবে সে। পাসপোর্টে যদিও একজন শিখ যুবকের ছবি আছে, তবু ভিসা পেতে অসুবিধা হবেনা, ওরা জানিয়েছে। কিন্তু সুরিন্দর একটানা কেঁদেই চলেছে, তাকে বোঝায়, কার সাধ্যি!
কথায় বলে মেয়েদের মনের কথা স্বয়ং ঈশ্বরও বুঝতে পারেন না, আর ইনি তো নামেই ঈশ্বর। ও কি করে জানবে, কাল পর্যন্ত যে সুরিন্দর কাছে না থাকলে তার চুল ধোয়া, শুকোনো, পরিপাটি করে আঁচড়ে দেওয়া, পাগড়ি পাট করতে সাহায্য করা কিছুই হত না, আজ সে কর্মহীনা। সে যে দশ মিনিটে একা একাই তৈরী হয়ে বেরিয়ে গেল, এটা সুরিন্দর মাত্র দু-বছরের বিবাহিত জীবনে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

(একটি পাঞ্জাবি গল্পের ছায়া অবলম্বনে)

Thursday, January 22, 2015

বাংলা অণু-গল্প- ৩৯ ।। কস্তে পুত্রঃ ।।

কস্তে পুত্র: ||
(গল্প)


রিটায়ার করার পর মানুষটা বড় একা হয়ে গেছেন।

অবশ্য আগেও যে খুব একটা মিশুকে ছিলেন ছাতুবাবু তা নয়। হ্যাঁ, ছাতুবাবু নামেই তাঁকে ডাকে পাড়ার লোক। আসল নাম সত্যেন পান্ডে লোকে বোধহয় ভুলেই গেছে। বিয়ে করেননি বলে যে তাঁর খুব একটা একাকিত্ব বোধ ছিল তা মনে হয় না, তবু কি অপত্য-স্নেহবঞ্চিত বুকের কোথাও একটু ফাঁকা-ফাঁকা লাগেনা কখনো জীবনের এই সন্ধিস্থলে এসে দাঁড়িয়ে? উত্তর প্রদেশের বালিয়া জেলার মানুষ, সেই কোনকালে মহাজনের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। শেয়ালদা স্টেশনে কুলিগিরি করে আর অবসর সময়ে পড়াশুনা করে প্রাইভেটে মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন সে যুগে। তারপর হাওড়ার বি-এন-আরের শালিমার ইয়ার্ডে ছোট্ট একটা চাকরি। ঘুরতে ঘুরতে শেষে মুম্বাই। সেন্ট্রাল রেলের প্যারেল ইয়ার্ডে ইয়ার্ড-মাস্টারি করেই তো কেটে গেল চাকরি জীবনের শেষ বারোটা বছর। ভোজপুরি আর হিন্দি ছাড়াও বাংলাটা ভালই শিখেছিলেন, এখন কিছুটা ইংরেজি আর মরাঠিও বলতে পারেন। তবে রিটায়ার করেও একটা নেশা যায়নি। সকালে ছিঁড়ে-ছাতু সহযোগে জলপান সেরে হিন্দু কলোনির ছোট্ট ফ্ল্যাট বাড়িটা থেকে রোজ বেলা দশটায় হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন দাদার স্টেশনে। সেখানে দেশোয়ালি কুলিদের সাথে বসে টানা একঘন্টা তাদেরকে তুলসীর রামায়ণ আর দোহা শোনান, এমন মুগ্ধ শ্রোতা মুম্বাইয়ে পয়সা দিলেও পাওয়া যায় না!

কিন্তু তারপর? সারা দিনটা যে পড়ে থাকে কর্মহীন অবসরের জন্যে, তার তো অভ্যেস ছিল না তাঁর। ওয়াডালা স্টেশনের ধারে বাচ্চাদের একট স্কুল আছে, বলা বাহুল্য, অবৈতনিক- ভিখারী-কুলি-মজুর আর কিছু নিম্নশ্রেনীর বারাঙ্গনাদের ছেলেমেয়েরা পড়ে সেখানে। তিনি কদিন গিয়ে তাদেরকে বিনা পারিশ্রমিকে হিন্দি পড়াতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু স্থানীয় নেতার ভয় হল, তিনি বুঝি ভোটে দাঁড়াতে চান- তাই গুন্ডা দিয়ে ভয় দেখিয়ে তাঁকে তাড়ানো হলো। নেতাকেও দোষ দেওয়া যায় না, বিনা স্বার্থে কেউ কিছু করতে চায়, এই সত্যি কথাটা এযুগে বসে তাঁর হজম হবে কেন? তাছাড়া তিনি আবার সে স্কুলের বোর্ড প্রেসিডেন্ট!

সেদিন সকাল থেকে ঝির ঝির বৃষ্টি পড়লেও ছাতুবাবুর রুটিনের অন্যথা হয়নি। কিন্তু এগারোটা বাজতে চলল, কুলিভাইদের কারো দেখা নেই কেন? একটু খোঁজ নিতেই বোঝা গেল ব্যাপারটা। তিন নম্বর আপ কলকাতা-এলাহাবাদ-মুম্বাই মেল এক নম্বরের জায়গায় চারে আসছে, তাই সব ব্যাটা দৌড় দিয়েছে সেদিকে। ওই তো গাড়ি ঢুকছে চার নম্বরে, তিনিও কি ভেবে ফুট ওভারব্রিজে উঠে পড়লেন। ছাতুবাবু রিটায়ার করেছেন বটে, তবে তাঁর কাছে প্ল্যাটফর্ম টিকিট চায় এমন রেলকর্মী কেউ নেই এ স্টেশনে।
গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে চলেও গেছে। এখানে কেউ খামোখা বসে থাকে না। 'সময় হল, সময় হল, যে যার আপন বোঝা তোলো' বলে কুলিরা কেটে পড়েছে। কিন্তু যারা প্যাসেঞ্জার পায়নি তারা আবার ওই হুইলারের স্টলটার সামনে দাঁড়িয়ে কিসের জটলা করছে? এরকম তো কথা ছিল না। ছাতুবাবু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। হায় রাম, এই কান্ড! এক ষাটোর্ধ্ব বুড়ো-বুড়ি নেমেছে ট্রেন থেকে, তারা কুলিদের মুখের সামনে একটা কাগজ নেড়ে ক্রমাগত কি যেন বোঝাবার চেষ্টা করছে। কুলিদের কাজ কাগজ নিয়ে মাথা ঘামানো নয়, তারা মাল তুলতে পারলেই খুশি। তিনি এগিয়ে যেতেই ওরা সসম্ভ্রমে জায়গা ছেড়ে দিল। তাঁকে দেখেই বুড়ো-বুড়ি কেঁদে ফেলল। বুড়ো লোকটি হাউমাউ করে বাংলায় যা বলতে লাগলো তার অর্থ মোটামুটি এই বোঝা গেল যে, তাদের বড় ছেলে তাদেরকে বর্ধমানে ট্রেনে চাপিয়ে দিয়েছে। ছোট ছেলে বোম্বাইএ কাজ করে, তার দাদার স্টেশনে মা-বাপকে নিতে আসার কথা, কিন্তু এখানে নেমে অবধি কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। তাদের ভাষাও কেউ বোঝে না, ওরা নিজেরাও গাঁয়ের মানুষ, বাংলা ছাড়া কিছু জানে না।

'রুকিয়ে, রুকিয়ে, বাবুজি, আপনার হাথে উটা কিসের কাগজ?' ছাতুবাবু জানতে চাইলেন।
'এই দেখো, এটাই তো দেখাতে চাইছিলাম আপনাদের এতক্ষণ। আমার ছোটছেলে ব্যস্ত মানুষ, যদি না আসতে পারে, এই ভেবে বড় ছেলে ওর ঠিকানাটা লিখে দিয়েছিল আমার হাতে। তা আমরা মুখ্যুসুখ্খু মানুষ, ইংরেজি কি পড়তে পারি! একটু দেখুন না সায়েব, কি লেখা আছে', বুড়ো লোকটি কাতরভাবে অনুরোধ করলেন।
উনি কৌতূহল-বশত: চিঠিটা পড়েই চমকে উঠলেন। তারপর গলাটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে বললেন, 'বাবুজি, যে বস্তির ঠিকানা এখানে দেওয়া আছে তা তো কবে উঠে গেছে। সেখানে এখন মস্ত হোটেল। তা, আপনার যদি আর কুনো জায়গা না থাকে আমার সাথেই চলুন না আমার বাসায়, তারপর ধীরে-সুস্থে আপনার ছেলেটাকে খুঁজা যাবে। কি বোলেন?' বুড়ো-বুড়ি হাঁ করে তাকিয়েই আছে, তাদের যেন কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না। কুলিরা তা বুঝে তাড়া ও ভরসা দিল-' আরে মাজি, সোচনে কা নেহি, হামারা সত্তুবাবু রামজি কা অবতার আছেন, আপ বিন্দাস যাইয়ে।' শুধু বলেই ক্ষান্তি নয়, দুজন কুলি সাথে সাথে তাদের জিনিসপত্র তুলে হাঁটা দিতে লেগেছে হিন্দু কলোনির দিকে।
'আপনাকে খুব কষ্ট দিলাম। আপনার স্ত্রী ছেলে-পুলে......'
'কুছু ভাববেন না। হামার কেউ নেই। এখন আপনি আমার বড়া ভাই, আর ইনি আমার ভাভী আছেন। আপনার ছেলেটাকে না পাওয়া অব্দি বাড়ির রান্না খাওয়া যাবে। কি ভাভিজি, বাঙালি রান্না খাওয়াবেন তো?'

এতদিনে ছাতুবাবুর বোধহয় ছেলেপুলে না থাকার দু:খ ঘুচলো। কাগজটাতে যে পষ্ট ইংরেজিতে এই কথাটা লেখা ছিল- 'এই বুড়ো-বুড়িকে দয়া করে কোনো দাতব্য বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তি করে দেবেন'।

এপ্রিল ৩, ২০১৫, কুয়েত।

Wednesday, January 21, 2015

বিবিধ প্রসঙ্গ ।। ১-৩

(১)
বিভীষণ

কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলেই আমরা কথায় কথায় বলে থাকি, 'ঘরভেদী বিভীষণ'। এই বিভীষণ কি অন্যায় বা অনৈতিক কাজ করেছিলেন দেখা যাক। তিনি সীতাকে বন্দী করে রাখার ব্যাপারটা সমর্থন না করে চেয়েছিলেন রাবণ সীতাকে রামের কাছে ফিরিয়ে দিক। এই নিয়ে তর্কাতর্কি চলাকালীন রাবণ রাগের চোটে ছোট ভাইকে লাথি মেরে বসেন। এই অপমান সহ্য না করতে পেরে বিভীষণ রাবণকে ছেড়ে চলে এসে রামের দলে যোগ দেন।
এছাড়া বিভীষণের কি আর কোনও উপায় ছিল না? ছিল। যদি তিনি রাবণের সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হতেন, তাহলে তিনি রাবণের পরাজয় চাইতেন, কিন্তু নিজে তার কারণ হয়ে উঠে রামের দলে যোগ দিতেন না। তিনি বরং নিরপেক্ষ হয়ে থাকতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি, কারণ তাঁর রাজ্যের লোভ ছিল। লঙ্কার অধীশ্বর হতে গেলে পুত্রপৌত্রাদিসহ রাবণের মৃত্যু জরুরী ছিল আর বিভীষণ এও জানতেন যে তাঁর সাহায্য ছাড়া রামের প্রসঙ্গ কাজ করা অসম্ভব হত।
আজ এ দেশের রাজনীতিতে এ খেলা অবিরত চলে আসছে। মমতার সাথে চার বছর সুখে ঘর করার পর যখন মনে হল দিদির এবার জেতার আশা কম, অমনি বনগাঁর ঠাকুরের খেয়াল হল পদ্মফুলের গন্ধ ঘাসফুলের চেয়ে মিষ্টি, ফলে তিনি দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করলেন। দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী হবার লোভে কেজরীওয়াল ছেড়ে কিরণ বেদিও ভাজপার পতাকাতলে এলেন। এঁরা কিন্তু নির্লোভ হলে দলত্যাগ করে নিরপেক্ষও থাকতে পারতেন, আর সেটাই হত অন্যায়নীতির বিরুদ্ধে সঠিক প্রতিবাদ। যদি নীতিগত প্রশ্নে বিভেদ ঘটে, নির্দলীয় হয়ে দাঁড়ালেই হয়!
তবে আমাদের দেশের জনতা চিরকাল বিভীষণকেই ভোট দিয়ে এসেছেন, এবং এবারও দেবেন, কারণ তিনি ভগবান রামের দলে এসেছেন যে! আর রামের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি বিভীষণের চরিত্রটিকে নিখুঁতভাবে অধ্যয়ন করে তাঁর কাছ থেকে নিজের ছেলে তরণীসেনকে মারার ট্রিকটুকুও বলিয়ে নিয়েছেন কথায় কথায়। তাই তো তিনি ভগবান!


(২)
কর্ণ


নাঃ, খুব ভালগার হয়ে গেল শীর্ষকটি। কিন্তু কিছু করার নেই। যে হারে সুবিধাবাদী ও বিক্ষুব্ধ নেতারা নিজের নিজের দল ছেড়ে অন্য দলে গিয়ে সাইন করছেন, হয়ত সেখানে গিয়ে শাইনও করবেন, সে সব দেখে দৈনন্দিন মলত্যাগে অভ্যস্ত সাধারণ জনতাও অস্বস্তি ফীল করছেন। মাতুয়া শিরোমণি শ্রীমঞ্জুল বা প্রাক্তন রেলমন্ত্রী দীনেশবাবু বা সাধন পাণ্ডেরা এতদিনে বুঝতে পারলেন-
কিসের মাটি, কিসের মানুষ, কিসের তৃণমূল,
কাল যে ছিল নয়নমণি, আজ সে চক্ষুশূল।
কেউ কেউ বলছেন, জনতার অপমান আর অভিশাপ বয়ে আর ও দলে থাকা যায় না। সত্যিই যায় না। আসল কারণ অবশ্য টাকা রোজগারের কায়দা হিসেবে সারদার পর নতুন কোনও ইনোভেটিভ আইডিয়ার উদ্ভব না করতে পারা, দু-নম্বর ভাজপা-কে কংগ্রেস ভেবে মমতার ভুল করে সভার মাঝে মোদিকে আজেবাজে কথা বলা (উপায় নেই, অভ্যাস হয়ে গেছে, মুখ খুললেই ওগুলো বেরিয়ে পড়ে) আর তিন নম্বর- তৃণমূল নেত্রীর সঠিক সময়ে একটু নত হয়ে কংগেসের সাথে জোট না করতে পারা। এরপরও লোকে থেকে যেতেন, যদি দলের কোনও আদর্শ থাকত- মনে করে দেখুন দল থেকে বিতাড়িত নেতা সোমনাথবাবুকে, যিনি অনায়াসে সেসময় কংগ্রেস বা অন্য দলে যোগ দিতে পারতেন। কিন্তু বাম আদর্শ যাঁর মজ্জাগত হয়ে গেছে তিনি কি তা করতে পারেন! কম্যুনিষ্ট পার্টির দুর্ভাগ্য, এরকম একটা মানুষ থাকতে হরকিষেন বা কারাটের মত লোকেরা পলিটব্যুরোর শীর্ষে থাকেন বা বুদ্ধদেববাবুর মত দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ বঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী হন!

এই প্রসঙ্গে ভেবে দেখলে মহাভারতের যুদ্ধের আগের দল-বদল পর্ব এখনও প্রাসঙ্গিক। মদ্ররাজ শল্য নকুল-সহদেবের মামা হলেও যেহেতু দুর্যোধনের অনুরোধ আগে পান, তাঁর দলেই যোগ দেন। কৃষ্ণকে নিয়ে হেড-টেল টস হয়, ও অর্জুন যেতেন। বলদেবের আশীর্বাদ প্রিয়শিষ্য দুর্যোধনের পক্ষে থাকলেও, ভাইএর কথায় তিনি থাকেন নির্দলীয় হয়ে। তবে রগড় শুরু হয় যুদ্ধ শুরু হবার পর। কর্ণের শৌর্য-বীর্যের কাছে পেরে না উঠে কৃষ্ণ তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলতে তাঁর বংশ-পরিচয় দিয়ে আসেন আর তার পরেই কুন্তী-মা গিয়ে তাঁকে দল-বদলের আহ্বান জানিয়ে আসেন। তিনিও তখন অনায়াসে বেরিয়ে আসতে পারতেন, এলে বেঁচে যেতেন, রাজাও হতেন হয়ত। কিন্তু সেই কবে বন্ধু দুর্যোধন অপমানিত অবহেলিত মায়ে তাড়ানো বাপে খেদানো একটি সূত-পুত্রকে রাজার মর্যাদা দিয়েছিলেন, সেই কৃতজ্ঞতাবশে তিনি দলত্যাগ করলেন না। এ যুগের পরিপ্রেক্ষিতে এ যে কত বড় স্বার্থত্যাগ, তা বলে বোঝানো যাবে না।
যাক গে, তৃণমূল ভাঙ্গুক, আআপ ভেঙে কিরণ বেদী বেরিয়ে এসে দিল্লীর বিধানসভার দিকে হাত বাড়ান বা নাই বাড়ান, ভাজপার বৃহস্পতি এই মুহূর্তে তুঙ্গে। যে দলই জিতুক কিছু যায় আসে না, শুধু চাইব তারা যেন জনতাকে 'বনলতা সেন'এর মত 'দু দণ্ড শান্তি' দিতে পারে।


(৩)

ঈশ্বর

সদ্য দেখা 'পি কে' ছবিতে একটা খুব জনপ্রিয় উক্তি ছিল। তপস্বী-বাবা বলছেন, 'বিধর্মীদের হাতে চুড়ান্ত অপমানের হাত থেকে আমরা ঈশ্বরকে রক্ষা করব'। তার উত্তরে ভিন-গ্রহ থেকে আসা লোকটা বিন্দুমাত্র উৎসাহিত না হয়ে প্রকারান্তরে বলেই ফেলল- 'যে ভগবান বিশ্ব-সৃষ্টি করেছেন তাঁকে রক্ষা করবে তুমি, তোমার স্পর্ধা তো কম নয়! চিন্তা কোরো না, ঈশ্বরের নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা ঠিকই আছে, তার জন্যে তোমার চিন্তার প্রয়োজন হবে না।'
আজ একালের ঈশ্বর বারাক ওবামা নিজের হাতে নিজের রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে এ গাঁয়ের মোড়লমশাইকে অশেষ দুশ্চিন্তার হাত থেকে মুক্ত করেছেন। মোড়লমশাই তাঁর মোড়লজীবনের প্রথম গণতন্ত্রদিবসের সমারোহে প্রতিবেশী দেশের ছিঁচকে গুণ্ডাদের নিয়ে বড্ড চিন্তায় ছিলেন। এদিকে আধুনিক ঈশ্বরের কাছে স্বমহিমা প্রচারের এরকম সুযোগ ছাড়তেও পারছিলেন না। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের ছিঁচকে উৎপাত থেকে তাঁকে রক্ষা করবে কে? আমাদের অশেষ সৌভাগ্য যে এ দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহণ করলেন। প্রতিবেশী দেশের মোড়লমশাইকে একটি বার্তায় তিনি স্পষ্টরূপে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর উপস্থিতিতে দিল্লী বা তার আসেপাশে কোনরকম অশান্তি বা নাশকতামূলক কাজকর্ম তিনি চাননা। আমরা অগত্যা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললাম। কিন্তু এই একটা ঘটনা কি কি প্রমাণ করল দেখা যাক্‌-
১- ঈশ্বরকে মানিনা ইত্যাদি বলে গালাগাল দিলেও তাঁকে খুশী রাখতে রাম ও রাবণ দুজনেই চায়। তাই কুরুক্ষেত্রের প্রাক্কালে অর্জুন আর দুর্যোধন দুজনেই কৃষ্ণকে নিজের নিজের দলে টানতে দ্বারকা পৌঁছে গেছিলেন।
২- নিজেকে রক্ষার ভার ঈশ্বর নিজেই নিতে পারেন। তাই তাঁর রক্ষার জন্যে চিন্তিত না হয়ে তাঁকে নিয়ে এসো নিজের কাছে, এতে করে তুমি নিজেও সুরক্ষিত থাকবে।
৩- এই গ্রহে যাবতীয় নাশক-অনাশক, শুভাশুভ কর্মকাণ্ডের নায়ক তিনিই। তিনি না চাইলে কাশ্মীরের এক ইঞ্চিও ভারত পায় না, আবার আল-কায়দাও কোনও কায়দা-কানুন দেখাতে পারে না।
৪- এটাও জানা গেল যে বিভিন্ন সংগঠিত-অসংগঠিত, ন্যায্য-অন্যায্য নাশক-শ্রেণীর গুপ্তচক্রগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিবেশী দেশের মোড়লের হাতে আছে, আর এটা স্বয়ং ভগবানও জানেন।
৫- সুতরাং দু-দেশের মোড়লেরই উচিৎ হ্যান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা বলে নিজেদের মধ্যে লাফালাফি না করে ঈশ্বরের ইচ্ছাটি কি তা জানার দিকেই নজর কেন্দ্রিত রাখা। অবশ্য জনতাকে ভাঁওতা দিতে একটু চেঁচামেচিরও দরকার আছে, মানতে হবে।
তাহলে টুইন টাওয়ারে কি হয়েছিল। কেন, ছেলেপুলেরা কি বাপ-মায়ের অবাধ্য হয়না মাঝে মাঝে? তার ফলও তারা পায় হাতে-নাতে।
অলমিতি বিস্তারেন!

কবিতা - মন চায়

মন চায়
(রোমান্টিক কবিতা)

গরমের বিষন্ন বিকেলে-
মাঝে মাঝে মনে হয় ডালহৌসি থেকে
বাসের লাইন ছেড়ে ভেগে পড়ি
শুধু তুমি আর আমি,
চলে যাই জনতার ভীড় ঠেলে ইডেন গার্ডেনে,
কিম্বা বাবুঘাটে।
চক্ররেল পিছে ফেলে আমরা দুজনে
বসি মুখোমুখি।
সম্মুখেতে স্রোতস্বিনী ভাগিরথী, সেদিকে না চেয়ে
তাকাই পেছনে, বড়ই মধুর দৃশ্য, হাতে হাত রেখে

দুজনে সেখানে যাই-
প্রেমপূর্ণ স্বরে
কানের লতির কাছে অধর ছুঁইয়ে
মৃদুকন্ঠে শুধোই তোমাকে-
'ডার্লিং, ফুচকা খাওয়াবে?'


মনে করে দেখ প্রায় শতবর্ষ আগে
এমনই মধুর এক দিনে,
বসে ছিল মুখোমুখি লাবণ্য,
শোভনলাল সাথে।
মধুকণ্ঠে বলেছিল,
'শোভন, ফুচকা খাওয়াবে?
ছিল সেই কনে দেখা আলো
সেই হিন্দুস্থানি ফুচকাওলা,
সেই হাঁড়ি লাল শালু ঢাকা, সেই গঙ্গাতীর।
সবই ছিল, ছিলনাক শুধু
দুটি টাকা শোভনলালের মানিব্যাগে।
ফিরে গেল লাবণ্য মুখ হাঁড়ি করে
বহুদূরে, শিলং পাহাড়ে।
অমিত রায়ের সাথে হয়েছিল দেখা,
বিত্তশালী বাপের ব্যাটা সে,
কিন্তু কি মুশকিল,
সে শোনায় শুধুই কবিতা,
কথায় কথায় আনে ডন, নিবারণ,
কে বোঝাবে তাকে
আলুকাবলি আর তেঁতুলজলের স্বাদ!

এমন সময় কোথা থেকে
হাজির শোভনলাল
পকেট বোঝাই টাকা, গোঁফ ধরে টেনে আনে
বিহারী সে ফুচকাওলাকে।
কণ্ঠে মধু ঢেলে বলে তারে-
'এ ভাইয়া, ফুচকা খিলাও।'

তাই বলি, প্রিয়তম, এ পৃথিবী মাঝে
যতদিন আছে সেই লাল-শালু মোড়া
হাঁড়ি আর তেঁতুলের জল
আর বীটনুন, ঝাল লঙ্কার গুঁড়ো,
হেলা কোরোনাক তারে,
প্রেমিকার হাত ধরে ময়দানে যখনি যাবে
বা মেমোরিয়ালে, শুধাবে তাকে
প্রেম-মাখা স্বরে,
'ডার্লিং, ফুচকা খাবে??'

১৫ই জানুয়ারি, ২০১৫।

অবসরে প্রকাশিত রচনা- পশিত আকাশবাণী শ্রবণে http://www.abasar.net/radioissuepallab.html

http://www.abasar.net/radioissuepallab.html

বিবিধ আলোচনা- ১- ৬

(১)

নীল-সাদাতে সোনার বাংলা করল আবার যে ছারখার
মদ না খেয়েই মদনা গেল হাসপাতালেই মাস কাবার,
নীল মানে যে শূন্য, দিদির মাথায় সেটা ধরল না,
মা-মাটি-মানুষের মাঝে ফাঁকটিও তাই ভরল না।
সেই ফাটলের গহ্বরেতে ডুবল বুঝি ঘাসের মূল,
পচা-পানার খানাডোবায় মারছে উঁকি পদ্মফুল!

মূল কবিতাটি উনবিংশ শতাব্দীর কোনও অখ্যাত কবির লেখা, প্রথম লাইন দুটো দিচ্ছি। যদি কেউ পুরোটা জানেন বা কবির নাম জানাতে পারেন, খুব ভাল হয়।
'নীল বানরে সোনার বাংলা করল যে আজ ছারখার,
অকালেতে হরিশ ম'ল, লং-এর হল কারাগার।' (হরিশ- বাগ্মী হরিশ মুখার্জি, লং- রেভারেণ্ড জেম্‌স্‌ লং- যিনি 'নীলদর্পণ' এর ইংরাজি অনুবাদের দায় নিজের উপর নিয়েছিলেন)

(২)

দম নেই কলিজায়, জিভ তবু চাঙ্গা-
রে বাঙালী, কত আর হবি তুই নাঙ্গা!
অমৃতসর-হাওড়া ট্রেন চলেছে পাটনার দিকে। এক বাঙালী যাত্রী চলেছেন কলকাতা সপরিবারে, মোগলসরাইয়ে জল নিয়ে যখন উঠলেন, দেখেন এক ষণ্ডামার্কা বিহারি বসে আছে তাঁর সীট জুড়ে। 'এ হামার জায়গা, নামো তুম', বলায় লোকটি বলল, সে আরায় নেমে যাবে, ততক্ষণ একধারে তিনি বসে পড়ুন না। তাতে বাঙ্গালিবাবুর রাগ বেড়ে গেল। 'এক থাপ্পড় মারকে তুমরা দাঁতকপাটি ভাঙ্গেগা' ইত্যাদি বলায় উলটে বিহারি বাবুই তাকে এক চড় মেরে বসল।
'এতনা সাহস, গায়ে হাত তুলতা হ্যায়! আচ্ছা, মেরা জানানা কো মারকে দেখাও'- বাবুটির হুমকি।
'ইমে কঊন বড়ি বাত বা? লো, অভিয়ে মার দেত'- বলেই মহিলাটিকেও এক চড়।
'বহুত অসভ্য আদমি হ্যায়, আউরত কো মারতা। আচ্ছা হামরে বাচ্চাদুটোকো মারকে দেখাও তো!'
বলা বাহুল্য, বাচ্চারাও চড় খেল। 'আচ্ছা, কলকাতা আও, তুমকো দেখেগা' বাবুটি গজগজ করতে থাকলেন। ইতিমধ্যে আরা এসে পড়ল, লোকটি নেমে গেল।

'মশায়, নিজে চড় খেলেন, খেলেন, ঘরগুষ্টি সবাইকে না খাওয়ালে চলছিল না', এক সহযাত্রী জিজ্ঞেস করলেন।
'আরে মশায়, বোঝেন না কেন', বাবুটি তাঁর কানের কাছে মুখ এনে বল্লেন, 'এসব না করলে কাল সারা পাড়া রাষ্ট্র হয়ে যেত- বাবা মার খেয়েছে, বাবা মার খেয়েছে!'

(৩)

এ তো বড় রঙ্গ যাদু, এ তো বড় রঙ্গ,
চারজন এয়ার দিতে পারো, যাব তোমার সঙ্গ।
সুদীপ্ত হ্যায়, কুণাল ভি হ্যায়, আভি গয়া সৃঞ্জয়,
দাদা-দিদি কাতার মে হ্যায়, ফালতু তোদের এই ভয়!
দু-জোড়া তাস ভেজিয়ে দেবো, খেলিস টোয়েন্টি-নাইন,
ফিকর না কর, একলা না তুই, পিছে লম্বা লাইন!!


(৪)


একটা পুরাতনী গান শুনছিলাম রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কোনও শিষ্যের গলায় -
"শুক বলে আমার কৃষ্ণ মদনমোহন,
সারি বলে আমার রাধা বামে যতক্ষণ
- নইলে শুধুই মদন।"
মদন আর মদনমোহনের পার্থক্যটা তখনই বুঝতে পারলাম।

(৫)

কাক-দর্পণ
কেমন করে বললি কাগা,
দিদি পিকাসো, দা ভিঞ্চি?
সে ছবি শিশুর করা আঁকিবুকি
তার বাড়া নয় এক ইঞ্চি!

তোর কাক বেচে তো চলত ভালই,
সারদায় কি প্রয়োজন,
গখ-রাফায়েল কিনছে চ্যানেল
শুনেছে কেবা কখন?
ব্যাটা আঁকবি ছবি, পয়সা নিবি-
কেন খোসামুদি অকিঞ্চিৎ!
কেমন করে বললি কাগা,
দিদি পিকাসো, দা ভিঞ্চি?
(কবিয়াল ভোলা ময়রার অনুসরণে)





(৬)

আমায় প্রশ্ন করে ওই গোয়েন্দারা
বল কতদিন জনতার টাকা মারা
চলে এই ধারা?
জবাব তেমন কিছু দিতে পারি নি বলে
বরণ আমায় করে নিল এই কারা ।।
কারা যেন সারদাকে ভাল বলেছিল
তাই শুনে লোকে সেথা টাকা ঢেলেছিল।
সারদা ছড়ায় নোট, জনতা বিলোয় ভোট
এইভাবে হল সুদীপ্ত সর্বহারা !।
আমি ভুল করিনি দিদির কথা শুনে
কে আর আপন আছে দিদি তুমি বিনে,
আমার চোখের পাশে কত মাল যায় আসে
ও দিদি, কেমনে বাঁচি লাল পানি ছাড়া ।।
(সলিল চৌধূরির কাছে যথাবিহিত ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি)