Tuesday, July 14, 2015

Light Comedy- Bengali

নীচের লেখাটা একটা জোকের গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম। সেখানে যখন লোকের ভাল লেগেছে, 'আড্ডা'র বন্ধুরা আশা করি এটা পড়বেন।
" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মমাস বৈশাখ। অনেকে অনেক রকম চর্চা করছে তাঁর সম্বন্ধে। আমি একটা নতুন তথ্য পেলাম, সবাইকে না জানিয়ে শান্তি পাচ্ছি না। গান্ধীজী, চিত্তরঞ্জন ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সাথে ওনার ঘনিষ্ঠতার কথা প্রায় সবাই জানে। তবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ যে তাঁর বন্ধু ছিলেন সেটা সম্প্রতি জানা গেল। একটা গানে আছে-
"তব নন্দনবন-অঙ্গনদ্বারে, মনোমোহন বন্ধু-
আকুল প্রাণে পারিজাতমালা সুগন্ধ হানে।।"

কোনও একসময় মনমোহন হয়ত রবি ঠাকুরের রুমমেট ছিলেন, রোজ সকালে মর্নিং-ওয়াক করতেন একসাথে! বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে কি কবিগুরু শুধু শুধুই লিখে গেছেন-
"মনোমোহন, গহন যামিনীশেষে
দিলে আমারে জাগায়ে।।"
শুধু কি তাই? কখনও কখনো এমনিতে ঘুম না ভাঙলে সেতার বা সরোদ বাজিয়েও শোনাতেন মনমোহন। তারও প্রমাণ আছে, আমি বিনা প্রমাণে কিছু বলি না-
"কী রাগিনী বাজালে হৃদয়ে, মোহন, মনোমোহন,
তাহা তুমি জান হে, তুমি জান।।"
উপরোক্ত গানের এই মোহনটি কে তা নিয়ে আমাদের একটু সংশয় আছে। ইনি কি মোহনদাস গান্ধী না মনোমোহনেরই ডাকনাম? এ নিয়ে ভবিষ্যতে কিছু রিসার্চ করা যাবে, কেমন?"

Bengali Poem- কোনিক

কোনিক ।।


আমি ছিলাম একটি বিন্দুর সঞ্চারপথ।
জীবনের কেন্দ্রে ছিল আর একটি বিন্দু, তিনিই বুঝি ঈশ্বর!
অর্ধেক জীবন আবর্তনে কেটে গেল,
ঈশ্বরের থেকে আমার দূরত্ব কিন্তু একই রয়ে গেল।

তারপর কেন্দ্রবিন্দু হল দুখানা, নাম দিলাম ফোকাস
দুটি রেখা, তাদেরকে বলা হল ডাইরেক্‌ট্রিক্স ।
ধর্মের চেয়ে আমি ঈশ্বরের বেশী কাছে এসেছি
দুই ঈশ্বরকে সূর্য মনে করে প্রদক্ষিণ করে চলেছি
এক উপবৃত্তীয় পথে। বুঝতে পারি না,
কোনটা জীবনের ধর্ম, আর কোনটা পাপ-পুণ্যের ।

তাই শেষে সরিয়ে দিলাম একটি করে বিন্দু ও রেখাকে।
ভাবি বুঝি এবার দেখা মিলবে কাঙ্ক্ষিতের ।
তা হল না, আমি চলতে থাকলাম-
ধর্ম ও ঈশ্বরের সাথে সমান দূরত্ব রেখে।
আমার নতুন নামকরণ হল 'প্যারাবোলা',
ঈশ্বর ও ধর্ম দুইই থাকল অধরা হয়ে।

ক্রমে ঈশ্বর থেকে আমার ব্যবধান বাড়তে থাকে।
নাস্তিকেরা উল্লসিত হতে থাকে-
বিশ্বাসীরা টিটকিরি দেয়্
ঐ যায় 'হাইপারবোলা' বলে।
তাই বুঝি আমি অনন্তেই মিলিয়ে গেলাম,
আর কখনও ফিরব না, মিলব না কারো সাথে।
কেউ কি পেয়েছ খুঁজে কেন্দ্রাভিমুখী পথটিকে?
আমায় তার ঠিকানা দিতে পার?

মুম্বাই, ১১ই মে, ২০১৫

Bengali Story- সবটা মোটেও গল্প না

সবটা মোটেও গল্প না (১)

রাজ্যারোহনের সাঁইত্রিশ বছর পরে প্রভাস থেকে খবর এল যে পাণ্ডবদের মামাতো ভাই আর পরম শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু কৃষ্ণ-বলরাম দুজনেই দেহরক্ষা করেছেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ‘আর কেন ভাইসব, অনেক তো রাজ্যভোগ হল, চল এবার আমরাও যাই। সত্যি বলতে কি, কৌরবরা নেই, জরাসন্ধ-শিশুপাল-কীচকের মত বীরও আর দেখা যায় না। যুদ্ধ কার সাথে করি আর এই ঐশ্বর্য দেখাই বা কাকে! তা তোমার কি মত, বৃকোদর।‘ ভীম বসে থেকে থেকে আর রাজভোগ খেয়ে পেল্লায় একটি ভুঁড়ি বানিয়েছেন এতদিনে। তিনি পেটে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘দাদা, ইচ্ছে ছিল কেসি দাস বা হলদিরামের মত একটা জমাটি দোকান খুলে বসি হস্তিনাপুরে, তা আর হল না। আগ্রা থেকে আনানো পঞ্ছীর মোরব্বা খেয়ে সন্তুষ্ট থাকার চেয়ে মনে হয় স্বর্গে যাওয়াই ভাল। শুনেছি ওখানকার পারিজাতের মধু থেকে তৈরি মাধ্বী নাকি দারুন, একবার চেখে দেখতেই হচ্ছে!’
অর্জুন অবাক। ‘বল কি মেজদা, তুমি এখনও ওসব ছাইপাঁশ হজম করতে পার? আমার তো অম্লশূল শুরু হয়েছে। স্বর্গবৈদ্য অশ্বিনীকুমারদের ছেলে মানে আমাদের ছোট ভাই নকুল-সহদেবের তৈরি ক্ষারক-চূর্ণ না থাকলে এমনিতেই আমার স্বর্গপ্রাপ্তি হত। তা, বড়দা যখন বলছেন, আমার আপত্তি নেই। তবে হ্যাঁ, দ্রৌপদীকে ছেড়ে আমি কোথাও নড়ছি নে।‘ নকুল তো বরাবরই চুপচাপ। আর পাশাখেলার সময় দ্রৌপদীর অপমান দেখে সহদেব একবার চিৎকার করে উঠেছিলেন, সেই তাঁর শেষ প্রতিবাদ। দ্রৌপদী আড়াল থেকে সব শুনছিলেন। তিনি মহা উৎসাহে চুল বাঁধতে গেলেন। তারপর অর্জুনের নাতি পরীক্ষিৎকে সিংহাসনে বসিয়ে শুভদিন দেখে একদিন পাঁচভাই-বৌ মিলে রওনা হয়ে গেলেন মহাপ্রস্থানের পথে। সে পথের বর্ণনা তো মহাভারতেই ভাল আছে, তাই তার আর পুনরাবৃত্তি করলাম না, আমাদের গল্প তাই নিয়ে যা মহাভারতে নেই।
(২)
পাণ্ডবরা হস্তিনাপুর থেকে হিমালয়ের পথ ধরলেন। ভীমের ইচ্ছেয় পাণ্ডবরা ভীমদত্ত, পশুপতিনগর হয়ে কৈলাস-মানসের পথ ধরলেন। এই ভীমদত্ত একসময় বৃকোদর ভীমের রাজত্ব ছিল। জতুগৃহ পুড়ে যাবার পর পাণ্ডবরা যখন চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেই সময় কুমায়ূন অঞ্চলের উপজাতীয় রাক্ষসবংশীয় সর্দার হাড়িম্বকে ঘটনাচক্রে মেরে তাঁর বোন হাড়িম্বাকে বিয়ে করেছিলেন ভীম। তারপর বছরখানেক সেই অঞ্চলেই থেকে রাজত্ব চালান তিনি। পুত্র ঘটোৎকচের জন্মের পর হাড়িম্বা(তিনি আদর করে বলতেন হিড়িম্বা, আমরাও তাই বলব)কে রাজ্যভার দিয়ে তিনি চলে এসেছিলেন ভাইদের কাছে। রুদ্রপুর পেরিয়েই ভীমের রাজ্য শুরু হল। পথে পড়ল ভীমতাল সরোবর, যেটা তিনি পাহাড়ের একদিক থেকে বেঁধে জল ধরে রাখার জন্যে তৈরি করিয়েছিলেন। সেখানে স্নানাদি সেরে তাঁরা ভীমদত্ত শহরে এসে হিড়িম্বার দেখা পেলেন।
হিড়িম্বা তো ভীমকে কিছুতেই ছাড়বেন না। মহাপ্রস্থানে যাবার জেদ ধরে বসে আছেন। ‘কৃষ্ণাদি যেতে পারে, আর আমি গেলেই দোষ! কেন, দিদি কি আমার চেয়ে বেশি ফর্সা? আমি পাহাড়ি মেয়ে, তোমাদের থেকে ভাল এসব পারি, তা জান? নন্দনকাননের রাস্তা চেন তোমরা?’ অনেক কষ্টে, অনেক ভুজুং-ভাজাং দিয়ে তাঁকে কাটান হল। তিনি কচি মোষের কলজে ভাজা অনেকটা আর সেই সাথে সেদ্ধ-ভুট্টা গেঁজানো মদ দিতে চেয়েছিলেন সাথে, শরীর গরম থাকবে বলে। ‘আমরা তো মরতেই যাচ্ছি, তার আগে কি ওই ছাই-পাঁশগুলো না খেলেই নয়’, এই বলে অর্জুন কাটিয়ে দিলেন। ওঁরা এগিয়ে গেলেন। ‘মন দিয়ে প্রজাদের দেখাশুনো কর, আর খুব ক্ষিদে না পেলে তাদের মাংস খেয়ো না’ এই উপদেশ দিয়ে ভীম ভাইদের পিছু নিলেন। গোয়ালা দুধ দিতে এসেছিল, রাগের চোটে তাকেই ফুটন্ত দুধের মধ্যে ফেলে হিড়িম্বা পায়েস বানাতে লেগে গেলেন।
একজালা পায়েস খেয়ে হিড়িম্বার ক্ষুধা আর রাগ মিটলেও তাঁর মন শান্ত হল না। ‘দূর ছাই’ বলে তিনি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে উলটোপথে হাঁটা দিলেন ও বেশ কদিন পরে ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় গঙ্গোত্রী-গোমুখে এসে হাজির হলেন। নাম শুনে ভেবেছিলেন, বেশ হৃষ্ট-পুষ্ট কিছু গোবৎস পাওয়া যাবে সেখানে, পেট ভরে খাওয়া জুটবে বহুদিন পরে। কিন্তু দেখলেন কি? গরুর হাঁ-এর মত একটা গুহা, সেখান থেকে ভীষণ বেগে বেরিয়ে আসছে বরফ-জলের স্রোত, আর তার পাশেই এক ছাগল-দাড়িওলা মুনিঠাকুর চোখ বুজে বসে আছেন। হিড়িম্বা ভাবলেন আজ এটাকে দিয়ে জলখাবার খেলে কেমন হয়! বেচারা, তিনি কি করে জানবেন যে ঐ মুনিঠাকুরটি আর কেউ নন, মানুষে তাড়ানো দেবতায় খেদানো পরম নাস্তিক জাবালি ঋষি।
(৩)
জাবালি মুনির পরিচয় কিছু দিতে হবে কি? তিনি ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মেছিলেন, বিধিমত পৈতেও হয়েছিল। তারপর অন্য মুনি-ঋষিদের মত একজায়গায় বসে ধ্যান-টান করার বদলে দুনিয়ার সারসত্যটা জানার তাঁর খুব ইচ্ছে হল। ঈশ্বর বলে কেউ আছে কিনা, থাকলেও তাঁর বাসা কোথায়, দেবতারা কি অমর, তাঁরা কি সত্যিই ভগবান? স্বর্গ-নরক কোথায়, আত্মা কি বস্তু, পুনর্জন্ম সত্যি আছে কিনা এসব প্রশ্ন সবাইকে শুধিয়ে বেড়াতে লাগলেন। লোকে বিরক্ত হয়, আরে বাবা ব্যাদ পড় না কেন, ব্যাদেই তো সব পাবে, তাঁরা বোঝান। কিন্তু উনি দেখলেন বেদ মানে স্বতঃসিদ্ধ কিছু ধারণা মাত্র, এগুলো সব সত্যি বলে মেনে নিয়েই তা লেখা হয়েছে, আসলে তার কোন প্রমাণ নেই। ব্রাহ্মন, আরণ্যক আর উপনিষদে বেশ সুন্দর সুন্দর কিছু গল্প-গাথা আর শ্লোক আছে, তবে সেগুলো নিছক নীতিশাস্ত্র আর মন্ত্র-তন্ত্র, যদিও কাব্যমাধুর্য তাদের ভালই। তখন উনি খুঁজে খুঁজে দেবতাদের ঠিকানা জোগাড় করে ছদ্মবেশে সব ঘুরে-টুরে দেখে এলেন। তারপর ফিরে এসে পৈতে ছিঁড়ে ফেললেন, আর প্রচার করতে লাগলেন- দেবতা-টেবতা সব ফাঁকিবাজি। একদল ফর্সা লোক, চেহারা ভাল, হিমালয়ের ওপারে কৈলাসপাহাড়ের তলায় মানসসরোবরের তীরে নন্দনকাননে থাকে, তারাই নিজেদেরকে দেবতা বলে। তাদের মধ্যেও জন্মমৃত্যু-আহার-নিদ্রা-মৈথুন সব আছে। ইন্দ্র-অগ্নি-বরুণ এগুলো শুধু তাদের পদনাম, ইন্দ্র মরলে আর একজন ইন্দ্র হয়, বরুণ মরলে তার ছেলে বা অন্য কেউ বরুণ হয়। এঁদের আসলে অস্ত্র-বল আর চাতুর্য যথেষ্ট পরিমাণে আছে, তাই দিয়ে এরা ব্রাহ্মণদের দিয়ে বেদ লিখিয়েছেন আর ক্ষত্রিয়দের দিয়ে ক্রিয়াবিধিগুলো করিয়ে তাতে করে নিজেদের ভাবমূর্তি বজায় রেখে সবার উপরে ছড়ি ঘোরাতে থাকেন। স্বর্গ-নরক বলে মারা যাবার পরে আলাদা করে কিছু নেই, যা আছে তা এই জীবনেই আছে। ভগবান যদি থাকেনও তাঁর সম্বন্ধে মানুষ যা জানে, দেবতারা তার বেশি কিছু জানে না। তাঁর কথা শুনে কেউ কানে আঙুল দিল, কেউ বা ঝাঁটা হাতে তেড়ে এল। দেবতা আর অন্য ঋষিমুনিরা মিলে তাঁকে একঘরে করে দিল।
এই সেই জাবালি মুনি যিনি পিতৃসত্য রক্ষা করতে বনবাসে যাওয়ার সময় রামকে বেশ দামী-দামী উপদেশ দিয়েছিলেন, যেগুলো বাল্মীকিমুনি চক্ষুলজ্জার খাতিরেও বাদ দিতে পারেন নি। উনি পষ্টোভাষায় বলেছিলেন-‘দেখ বাপু, রাজার কাজ হল মন দিয়ে রাজ্যশাসন করা। প্রজা সুখে থাকলেই রাজার সার্থকতা, এই শুধু তার নৈতিক দায়িত্ব। তা না রাম, তুমি চলেছ বনে, কি না পিতৃসত্য পালন করবে। আরে বাবা, ভেবে দেখ কে তোমার মা-বাবা? একটি শুক্রকীট আর একটি ডিম্বানুই তোমার মা, তোমার বাবাও। আর তুমি যেহেতু ক্ষত্রিয়, শত্রুশাসনই তোমার ধর্ম। তুমি রাজা, প্রজারঞ্জনই তোমার কর্ম- এর বাইরে তোমার কোন দায়-দায়িত্ব নেই। তাছাড়া যে মরেছে তাকে পিণ্ডদান করেই বা কার কি লাভ? মরা মানুষকে যদি তুমি ভাত খাওয়াতে পার তাহলে তো বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়েও আমার খাওয়া-পরার কোন চিন্তা থাকবে না, বৌ আমাকে ঘরে বসেই রোজ খাইয়ে দেবে!‘ রাজা দশরথ যতদিন বেঁচেছিলেন, জাবালির রুজিরুটির কোনও অভাব হয় নি, তিনি মুচকি হেসে সব শুনতেন, তর্কও জুড়তেন মাঝে মাঝে। রাম কিন্তু এসব শুনে চড়াত করে রেগে উঠলেন। তিনি মুনিকে যা নয় তাই বলে গালাগাল দিলেন। পারিষদদলে বলে তার শতগুণ! অগত্যা অন্য মুনিরা তাঁকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে একেবারে সরযূ-গোমতী পার করিয়ে দিয়ে এলেন।
এখন জাবালি কি করেন? হৃষিকেশে গঙ্গাতীরে বসে তিনি আবার বেদ পড়তে শুরু করলেন। ঋষিপত্নী আগেই গত হয়েছেন, ঝামেলা ঝঞ্ঝাট নেই, দু-চারটে গাঁজাখোর শিষ্য জুটতেও দেরি হল না। তা একদিন জাবালি ঋগ্বেদে চার্বাক বা চারুবাক বলে এক তার্কিক পণ্ডিতের সম্বন্ধে পড়লেন। কি আশ্চর্য, তিনিও তো সেই একই কথা বলছেন-
‘যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ
ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পীবেৎ।
ভস্মীভূতস্য দেহস্য
পুনরাগমনম্‌ কুতঃ।।‘
ইতিমধ্যে পিপ্পলাদ বলে তাঁর একটি শিষ্য জুটেছে। তাকে তিনি মহা উৎসাহে এই নতুন খুঁজে পাওয়া দর্শন বোঝাতে লাগলেন। মাসছয়েক শাস্ত্র-আলোচনার পর তিনি এই নতুন দর্শনটি পিপ্পলাদকে প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে গঙ্গোত্রী ছাড়িয়ে গোমুখে অলকানন্দার তীরে আরাম করছেন, এমন সময় খবর পেলেন শিষ্যটি ব্রাহ্মণ আর ঋষিদের চাপে পড়ে জাবালি-উপনিষদ নামে একখানা বই লিখে ফেলেছে। তাতে আবার তত্ব, জীব, আত্মা আর বিভূতি নিয়ে জ্ঞান গম্ভীর বিশ্লেষণ ঢুকিয়েছে একগাদা। ঈশ্বর আর মোক্ষ নিয়েও নাকি অনেক এঁড়েমি করেছে ব্যাটা। নাস্তিকের নীতিজ্ঞান জিনিষটা অবশ্য জাবালিরও পছন্দের। নাস্তিক যদি বিবেক বিসর্জন দেয় তবে তার আর পশুর মধ্যে তফাৎটা আর রইল কোথায়। তবু তিনি কোথায় ভেবেছিলেন চার্বাকের দর্শনকে আরো কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাবেন, পিপ্পলাদ দিল সব তপস্যার ফল নষ্ট করে।
তাই তিনি ইদানীং আর কারো সাথে কথাবার্তা বলেন না বিশেষ। শুনেছেন নেপালের তরাই অঞ্চলে নাকি বোধিসত্ব বা তথাগত বলে একদল নব্য সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটেছে যারা বেদ সত্য নয় বলে প্রচার চালাচ্ছে। যাকগে, বয়স একশো পেরিয়ে গেছে, এই বয়সে না তো তাঁর বুদ্ধ-বোধিসত্ব হবার দেহবল আছে আর না নতুন করে ঈশ্বর-ভজনা শুরু করতে পারবেন। এখন তাঁর অলস প্রহর কাটে এই অলকানন্দার তীরের ছোট্ট বাসাখানায় বসে বসে আর ক্বচিৎ দু-একটা পাখির ডাক শুনে। কিন্তু সামনে যে এই বিশাল জন্তুটি, দেখে অবশ্য কোন পাহাড়ি উপজাতির মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে, বিশাল হাঁ করে এগিয়ে আসছে, তার কি করা
যায় এখন!
(৪)
‘আহা, আজ যেন অসময়ে চাঁদ উঠল, তাও এই মর্ত্যলোকে, বরফের উপত্যকায় যেন পারিজাত ফুটল। কে গো মা তুমি?’ ঋষি নাস্তিক হলেও তাঁর রাক্ষসীর পেটে যাবার ইচ্ছে নেই, আর প্রাণ বাঁচাতে মিথ্যে কথা কে না বলে।
তবে কাজ হল তাতে। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও হিড়িম্বা থমকে দাঁড়ালেন। ‘আরে এ তো একটা চিম্‌সে বুড়ো! দূর ছাই, চিবোনোই যাবে না, দাঁতেরই গুষ্টিনাশ হবে শুধু’, তিনি ভাবলেন। যদিও বুড়োর কথাবার্তা ভাল, অনেকদিন নিজের সম্বন্ধে এরকম সত্যি কথা শোনেন নি, তবু ভাবলেন, ‘নাঃ, যখন এগিয়ে এসেছি, একটু তো ভয় দেখাতেই হবে- নইলে মান থাকে না।‘ কিন্তু তার আগেই জাবালি বলে উঠলেন, ‘উঃ কত বছর ধরে এই দেহভার থেকে মুক্তি পাবার আশায় এখানে বসে আছি। আজ মনে হয় আমার ইচ্ছে পূর্ণ হল। এখানে যে আসে সেই কিছু না কিছু বর চায়। আমিও বর দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠেছি। এখন তুমি আমাকে খেয়ে উদ্ধার করলেই আমি বাঁচি।‘
বরের নামে হিড়িম্বা এবার থমকে দাঁড়ালেন। তারপরেই হঠাৎ ‘আমার বর, আমার বর’ বলে কেঁদে উঠলেন। ‘কি হল মা, তোমার বুঝি ক্ষিদে নেই এখন?’ মুনি বললেন। ‘না না, মুনিঠাকুর বলছিলাম কি আমার বর, মানে মধ্যমপাণ্ডব ভীমসেন আমায় ফেলে মহাপ্রস্থান করতে চলে গেছেন। এবার আমার কি হবে!’
‘সে কি গো কন্যে? না না, এ বর আমি তো দিতে পারব নি। তবে অন্য কিছু ইচ্ছে থাকে তো বল। যদিও ভগবানের সঙ্গে আমার আড়ি, তবু বলা যায় না, লেগে যেতেও পারে।‘
‘ঠাকুর, কত কি ভেবেছিলাম করব, তা আর এ জন্মে হল না। গান গাইতে, কাব্য লিখতে, ছবি আঁকতে, তা আর হল কই! বৃকোদর চলে যাওয়ায় একা রাজ্য চালাতে হল। ছেলেটাও অকালে মরে গেল, দাদার তো বিয়েই হয়নি, বংশরক্ষাও হলনা। আর কি এ জন্মে সেসব পাব?’
‘এ জন্মে হবে না তো কি আছে, পরের জন্মে হবে’ মুনি বলছেন আর মনে ভাবছেন- এরকম অবস্থায় পড়েই তো মানুষ হয় গাদাগুচ্ছেক মিথ্যে বলে বা ভগবানকে ডাকে। ভগবান বা পুনর্জন্ম না মানার ভাল শাস্তি পাচ্ছি আজ, বাধ্য হয়ে সব মানতে হচ্ছে। ‘আমি দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছি পরের জন্মে তুমি রাজ্যশাসন করছ। ভীম তোমাকে এ জন্মে কষ্ট দিয়েছে তাই পরজন্মে তুমি অনূঢ়া থাকবে। ভাইয়ের বংশরক্ষা হয়নি বলছ, নাহয় একটি ভাইপোও থাকবে। আর কি চাও?’
‘আর অন্য ইচ্ছেগুলো?’
‘আরে, আমাকে কি ভূতের রাজা পেয়েছ! হবে হবে, সব হবে’ বলে জাবালি একটু মুচকি হাসলেন। ‘বৎসে, আমার বরে পরজন্মে তুমি গলা খুল্লেই মিঞা তানসেন, রঙের তুলি ধরলেই দা-ভিঞ্চি আর কলম ধরলেই শেক্ষপীয়ার বা কালিদাস হবে। এবার যাও দেখি, আমার ঘুম পেয়েছে।‘
‘আর কোথায় যাব, ঋষিঠাকুর? তোমার এখানেই থাকি না, তোমার পদসেবা করেই জীবনের বাকি কটা দিন কাটিয়ে দিই।‘
‘ওরে বাবা!’ জাবালি আঁতকে উঠলেন। ‘না না এখানে নয়। এখানে কি মানুষ থাকে? তুমি বরং আরো উত্তর পশ্চিমে চলে যাও বিতস্তা নদীর তীর ধরে। মানালি নামে সেখানে একটা গ্রাম আছে, যেখানে একসময় বৈবস্বত মনু থাকতেন। ওখানকার রাক্ষসজাতির মধ্যে কোন বড় নেতা নেই, সবাই খাওয়া-খাওয়ি করে মরছে। সেখানে তুমি তোমার নতুন রাজধানী বসাও। পরজন্মে নেতৃত্ব করার প্রাথমিক পাঠটাও সেখানেই হয়ে যাবে।
(৫)
এরপরের ঘটনা মহাভারতে নেই বটে, তবে হিড়িম্বা যে মনুলীলাভূমি বা মানালিতে গিয়ে একজন নামজাদা শাসক হয়ে উঠেছিলেন তা সেখানকার হিড়িম্বা আর ঘটোৎকচ মন্দির দেখলেই বোঝা যায়। আর জাবালির বর? যে ভদ্দরলোক পুনর্জন্মেই বিশ্বাস রাখেন না তাঁর বর যে ফলতেই হবে তার কোনও মানে আছে নাকি? তবে এ দুনিয়ার অনেক জায়গাতে অনেক কিছুই তো ঘটে থাকে। তাই যদি কাকতালীয়ভাবে কোথাও কিছু ঘটতে দেখাও যায়, তবে তা কি জাবালির দোষ?

12/june/2015

Friday, May 1, 2015

বাংলা ছড়া - পেটুকের বারমাস্যা ।।

পেটুকের বারোমাস্যা ।।


বৈশাখে শাঁখ বাজে বৈকালে শোন তা
ঝড়ে পড়া আম খাই দিয়ে ঝাল নোনতা।
জৈষ্ঠেতে জষ্টির মধু খাই টাটকা  
সাথে কাঁঠালের কোয়া কিছু আল-টপকা।

আষাঢ়ে অসাড় দেহে বসে খাই মিষ্টি
ঝরঝর বরিষণ, একটানা বৃষ্টি।
শ্রাবণে বনের মাঝে ময়ুরের নৃত্য
আনারস রসধারে ভরে ওঠে চিত্ত।

ভাদ্রটা অভদ্র প্যাচপেচি গরমে
তালবড়া নাহি পেলে রাগ ওঠে চরমে।
আশ্বিনে অশ্বটা ছুটিয়ে বাজার ধাই
পুজোয় খিচুড়ি ভোগ চুটিয়ে দেদার খাই।

কার্তিকে কার দিকে ছুটব তা বল না
দেওয়ালির লাড্ডু সে শুধুই কি ছলনা?
অঘ্রাণে কার ঘ্রাণে ভুলি সব চিন্তা!
নলেন গুড়ের টানে নাচে মন ধিন তা।

পৌষে আউশ কাটি, মাতি পিঠে পরবে
উঠোনে মরাই বাঁধা, বুক ফোলে গরবে।
মাঘেতে শীতের ভয়ে পালায় পালাক বাঘ
লেপমুড়ি মাখা-মুড়ি-- কি খাওয়ার অনুরাগ।

ফাল্গুনে কালগুনে দেখি যে সময় নাই
বসন্ত জাগ্রত যাহা পাই, তাহা খাই।
চৈত্রের রাত্রের কি বাহার ভাব রে,
মহুয়ার নেশা ভাঙ্গে নববর্ষ ভোরে।


নববর্ষ, ১৪২২ সাল।

বাংলা কবিতা - আজাদী ।।

আজাদী ।।

আজাদী-স্বরাজ সব জেনে গেছি, তার মানে ভাত নুন,
আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা, ওরে তাকে বলে পোড়া বেগুন।
এলো গেল কত পনের আগস্ট, ছাব্বিশে জানুয়ারী,
দু-দিনই আমরা রাস্তার মোড়ে পতাকা বিক্রি করি।
আমি আর ভাই তিনশ বেচেছি, ফারুক-আসিফ দুশ,
সাত দিন পেট ভরে তো খেয়েছি, যতই মোদের দূষ।
তাকেই তো বলে স্বাধীনতা যাতে মেটে এ পেটের আগুন,
দু'বেলা দু থালা ভাত-ডাল, কিছু নুন আর পোড়া বেগুন!

১৮ই এপ্রিল, ২০১৫, কুয়েত।

বাংলা অণুগল্প ৪১ ।। মরুবিজয় ।।

মরুবিজয় ।।

পুরুলিয়ার দাঁদা গ্রামের রূপলাল মাঝি ছিল আমাদের ভাগীদার। না, সে অঞ্চলে অনাবাসী জমিদার খুব একটা না থাকায় তেভাগার আঁচ সেরকম লাগে নি, মালিক-ভাগীদার সম্পর্ক ভালই ছিল। তাছাড়া খাটতে পারত বলে দাদু তাকে গোবিন্দপুর পাঠশালার বাগানের দায়িত্বও দিয়েছিলেন, তাতে খানিকটা হলেও অতিরিক্ত একটা আয় থাকত। এছাড়া আরেকটা বিশেষ গুণ ছিল রূপলালের। প্রহ্লাদ বাউরির ঝুমুর গানের সাথে তার মাদলে সঙ্গত সেইসময় আর পাঁচটা গ্রামে নাম কুড়িয়েছিল। একদিন বন মহোৎসবের উপলক্ষ্যে ওদের ডাক পড়ল শান্তিনিকেতনে। নিতান্ত ঘরোয়া অনুষ্ঠান, কিন্তু রূপলালের মনে তার প্রভাব পড়েছিল।
আমরা আজ যাদেরকে 'পেগানিস্ট' বলে বিশেষ সম্মান করি, আবার গালাগালও দিই, এই দেশেরই কিছু উপজাতির মানুষরা কিন্তু বংশ-বংশান্তরে, হয়ত অবচেতনাতে প্রকৃতিদেবীর একনিষ্ঠভাবে উপাসনা করে আসছে। ওখানে প্রহ্লাদের ঝুমুর বেশ জনপ্রিয় হয় বটে, তবে ফিরে আশার পর রূপলালের প্রথম প্রশ্নটা দাদুকেও বিস্মিত করে তোলে। ও জানতে চেয়েছিল-'মরুবিজয়ের কেতন' মানে কি? তারপরেই ও মাঝে মাঝে শহরে চলে আসত আমার বাবার কাছে 'মাটি পরীক্ষা', 'সয়েল প্রিজার্ভেশান' ইত্যাদি সম্বন্ধে গভীরভাবে জানতে। বাবা তাকে সয়েল টেস্টিং ল্যাবে নিয়ে গিয়ে লোম ও অ্যালুভিয়াল সয়েলের বিশেষত্ব, টপ সয়েল নষ্ট হবার কারণ ও তার পরিণতি, কম্পোস্ট, ইউরিয়া, সুপার ফসফেট ইত্যাদি সারের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার বেশ যত্নসহকারে বোঝাতেন।
তারপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। বহুকাল পরে এসেছি গ্রামে। সঙ্গে কাকা, সদ্য ইটালি থেকে ফিরেছেন, হাতে একটা নতুন ধরণের যন্ত্র- একটা স্পুল টেপ-রেকর্ডার। খবর পেয়েই প্রহ্লাদ আর রূপলাল এসে হাজির, বেশ কিছু ঝুমুর গান রেকর্ড করা হল। বিকেলে রূপলাল আমাদের নিয়ে বেরোল। কি আশ্চর্য সবুজ চারিদিকে! দাঁদার মরা জঙ্গল থেকে যে টাঁড় জমি লালপুর হয়ে মৌতোড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সব সবুজ হয়ে গেছে গাছে গাছে। এত গাছ কে লাগাল? উত্তরে শুধু মৃদু হাসে রূপলাল মাঝি। 'ফরেস্টের রেঞ্জার সায়েব বাধা দিয়েছেন, কিন্তু খুড়ার ধমক শুনে আর কিচ্ছুটি কইতে পারেনি। তবে জঙ্গলটা চেলিয়ামা রেঞ্জের দখলে এখন, আমাকে অবশ্য আর কিছু বলার সাহস পায় না ওরা।' বুঝলাম শান্তিনিকেতনের মরুবিজয়ের কেতন ওড়ান দেখেই এই রূপলালের নবজন্ম। বিস্তীর্ণ হাজার একর জমিকে সবুজ করে তুলে ওর নাম ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে।
গতকাল মৃত্যু ঘটেছে পদ্মশ্রী রূপলাল মাঝির। আমি নিজে গিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে এসেছি। এবার থেকে তিনি বসবেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ, পরিবেশ মন্ত্রকের উপমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। তবে মহীরূহ মরলেও তার শেকড় থেকে জন্ম নেয় আরো অসংখ্য তরুলতা, তাই ক্ষীণ হলেও কিছুটা আশা রাখি পরবর্তী প্রজন্মের উপর।

২৪শে এপ্রিল, ২০১৫, কুয়েত।

বাংলা অণু-গল্প ৪০ ।। এ কি প্রেম নয়!

এ কি প্রেম নয়!
অণু-গল্প


'শোনো, তুমি বরং চাকরিটা ছেড়েই দাও। চুল-দাড়ি গেলে আর শিখদের কি রইল, শুনি?' অনুযোগের সুরে বলল সুরিন্দর। শুনে ঈশ্বর একটু মুচকি হাসল শুধু।
' না, তবু সিরিয়াসলি ভাব একটু। ধর্ম বেচে রুটি খাওয়ার কথা কি আমাদের জাতে কেউ কোনদিন শুনেছে? অন্য কোথাও কিছু পাওয়া যায় না কি?' এবার একটু ঝাঁঝ পাওয়া গেল সুরিন্দরের কথায়।

ঈশ্বরের বাবা উত্তম সিংহ গিল কাজ করতেন ওমানের তেলের খনিতে, ওয়ার্কওভার অপারেশনস বিভাগে। সেদিনও রুটিনমত টিম নিয়ে বেরিয়েছিলেন ওয়েল ইন্সপেকশনএ। সোহারের ৩১২ নম্বর কুপের একটা লিকেজের রিপোর্ট ছিল। উত্তম সেলার পিটের উপর থেকেই গেজে ৩০০০ কিলোপাস্কলের মত প্রেসার দেখতে পাচ্ছেন। 'দেখা যাক, ব্লিড করা যায় কিনা' এই বলে তিনি ব্রিদিং মাস্ক পরতে লাগলেন।
'স্যার আপনি কেন নাবছেন, আমি গিয়ে দেখছি'- সর্বনা বলে ওঠে।
'আরে ছড ইয়ার, পাঞ্চ মিটার থললে হি তো জানা হ্যায়, অভি হো আতা হুঁ।' বলে নেমে পড়লেন উত্তম।
ভালভ খুলে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তো আছেনই, কি হলো স্যারের- সর্বনা আর গুপ্তে হাঁ করে ভাবছে। হঠাত কি ভেবে গুপ্তে বলল, 'ম্যায় জাতা হুঁ, তু ভি আ'.......মাস্ক পরে তৈরী হয়ে নিল তারা।
আজ ঘটনাটার ছয় বছর হয়ে গেল, ভাবছিল ঈশ্বর। সেই সকালে উত্তমের অচেতন দেহটাকে দুজনে মিলে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছিল, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। প্রচুর পরিমানে হাইড্রোজেন সালফাইড নি:শ্বাসের সাথে রক্তে মিশে মৃত্যু ঘটে তাঁর। লম্বা চুল-দাড়ি থাকায় ব্রিদিং মাস্ক সীল করেনি, এই হলো সেফটি কমিটির রিপোর্ট। ওরা অবশ্য অম্রুতা অর্থাত উত্তমের স্ত্রীকে একটা কেরানির চাকরি দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ঈশ্বর তখন স্কুলের পরীক্ষায় ভাল ফল করে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ঢুকে পড়ায়, তিনি পরিবর্তে ছেলের ভবিষ্যতে উপযুক্ত চাকরির কথাটা আদায় করে নিয়েছিলেন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। আজ অম্রুতাও ইহলোকে নেই। ক্যানসার ধরা পড়তেই অপরিণত বয়েসেই ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সংসারী দেখে তিনি গেছেন।

ঈশ্বরের সাথে ছেলেবেলা থেকে প্রেম সুরিন্দরের। বিয়ের পর থেকে ওরা কাছছাড়া হয়নি কখনো। এই চাকরিটা সে নিয়েছে কারণ শুধু মাইনে বেশি বলেই নয়, সুরিন্দর সাথে থাকতে পারবে।তাছাড়া মায়ের চিকিত্সায় বেশ কিছু ধারও হয়ে গেছে. যদিও অয়েল-ফিল্ডে কাজ বলে কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী তাকে দাড়ি কেটে 'মোনা' হতে রাজি হতে হয়েছে। তারপর আজ গিয়ে চুল-দাড়ি কেটে, মাস খানেকের মধ্যেই যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

পরদিন সকাল থেকেই মন খারাপ সুরিন্দরের। 'আরে বাবা আজই তো যাচ্ছি না। আর তাছাড়া তুমিও ত যাবে সাথে, তাই না', সান্ত্বনা দেয় ঈশ্বর। আজ সকাল সকাল স্নান সেরে নিয়েছে সে। চুল শুকনো, বাঁধার বালাই নেই, ফটাফট তৈরী, এবার ভিসার জন্যে ফটো তুলতে যাবে সে। পাসপোর্টে যদিও একজন শিখ যুবকের ছবি আছে, তবু ভিসা পেতে অসুবিধা হবেনা, ওরা জানিয়েছে। কিন্তু সুরিন্দর একটানা কেঁদেই চলেছে, তাকে বোঝায়, কার সাধ্যি!
কথায় বলে মেয়েদের মনের কথা স্বয়ং ঈশ্বরও বুঝতে পারেন না, আর ইনি তো নামেই ঈশ্বর। ও কি করে জানবে, কাল পর্যন্ত যে সুরিন্দর কাছে না থাকলে তার চুল ধোয়া, শুকোনো, পরিপাটি করে আঁচড়ে দেওয়া, পাগড়ি পাট করতে সাহায্য করা কিছুই হত না, আজ সে কর্মহীনা। সে যে দশ মিনিটে একা একাই তৈরী হয়ে বেরিয়ে গেল, এটা সুরিন্দর মাত্র দু-বছরের বিবাহিত জীবনে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

(একটি পাঞ্জাবি গল্পের ছায়া অবলম্বনে)