Saturday, December 5, 2015

গল্প তবু গল্প নয়- 'মহাপ্রভু'


গল্প তবু গল্প নয়।

মহাপ্রভু।


'রাজা বললেন, যে আমার মেয়ের মুখে কথা ফোটাতে পারবে তার সাথেই আমার মেয়ের ‘বিয়ে দেব‘- রামাই বলল। পরমুহূর্তেই তার অনুযোগ, ‘দেখুন ঠাকুর কেষ্টা হুঁ দিচ্ছে না!’
- ‘ওরে কেষ্টা, হুঁ বলরে ব্যাটা’, মহাপ্রভু কেষ্টাকে মৃদু ভর্ত্‌সনা করায় কেষ্টা অস্ফুট-স্বরে ‘হুঁ’ বলল। গল্প আবার শুরু হল।
তবে গল্পেরও গল্প থাকে। কে এই মহাপ্রভু? কারাই বা রামাই আর কেষ্টা- জানতে হলে আমাদের একটু কাশীপুর-পঞ্চকোট রাজবাড়ির ইতিহাসের পাতায় উঁকি দিতে হবে। তবে প্রসঙ্গতঃ জানাই যে এ ইতিহাস কোনও বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ অবস্থায় হয়ত পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন স্থানীয় লোকের স্মৃতিচারণে আর ১৯২৮ সালে পাটনার প্রকাশিত একটি সরকারি গেজেটের সূত্র ধরেই এ কাহিনীর অবতারণা।

মানভূম-পুরুলিয়ার পঞ্চকোট রাজাদের কথা বাংলার ইতিহাসে আছে। সেখানে গৌড়বঙ্গের প্রাচীনতম শিখর-বংশীয় রাজত্বের পত্তন হয় ২১০০ বছর আগে পুরুলিয়ার ঝালিদহ বা ঝালদা গ্রামে মধ্যভারতের ধার রাজ্যের মহারাজা জগদ্দেওয়ের ভ্রমবশতঃ পরিত্যক্ত ও অনার্য সর্দারদের দ্বারা পালিত পুত্র দামোদর শেখর দ্বারা। তারপরের ১৯০০ বছর কাল ধরে রাজধানীই স্থানান্তরিত হয় সাতবার, ৮১ জন রাজপুরুষ সিংহাসনে আসীন হন। মহারাজ কীর্তিনাথ শিখর ৯২৮ খৃষ্টাব্দে পঞ্চকোট পাহাড়ের তলদেশে রাজধানী স্থাপনা করেন ও উনবিংশ শতাব্দীতে বর্গীদের আক্রমণে সে গড় ধ্বংস হলে রাজধানী নিয়ে আসা হয় কাশীপুরে।

আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কাঞ্চীর আয়েঙ্গারবংশীয় ত্রিলোচন আচার্য নামে এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ তীর্থ-ভ্রমণকালে পঞ্চকোট পাহাড়ের তলে একটি মন্দিরে কিছুদিন বিশ্রাম করেন। তাঁর শরীর থেকে নির্গত দিব্য-জ্যোতির কথা লোকমুখে শুনে পঞ্চকোটের তখনকার রাজা শত্রুঘ্ন ওরফে গরুড় নারায়ণ সিংহদেও তাঁকে দর্শন করতে আসেন ও তাঁর শিষ্যত্ব নিতে চান। আচার্য রাজী না হলেও তাঁর ভাইকে একাজের জন্যে মনোনীত করেন। এভাবেই ১৬৫১ সালে কাঞ্চীর আয়েঙ্গারবংশের শ্রী রঙ্গরাজ রাজগুরু হিসেবে পঞ্চকোট আসেন। অচিরেই তিনি পরিবার ও বেশ কিছু আত্মীয়-স্বজন তামিলনাডু থেকে পাঞ্চেত নিয়ে আসেন। নিকটস্থ বেরো পাহাড়ের পাদদেশে বেরো বা গদিবেরো নামক ৫৭ ১/২ খানি মৌজা নিয়ে তৈরি গ্রামটি দেবোত্তর স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদেরকে থাকার জন্যে উৎসর্গ করা হয় ও তাঁরা এখানে অধিষ্ঠিত দেবতা কেশব রায় জিউর সেবাইত নিযুক্ত হন। এই বংশের পুরুষরা মহাপ্রভু নামে বংশানুক্রমে বেরো গ্রামে থেকে আসছেন ও ঠাকুর কেশব রায় জিউর মন্দিরে মোহান্তরূপে কাজ করে আসছেন।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন মহারাজা নীলমণি সিংদেও পঞ্চকোট থেকে কাশীপুরে রাজধানী নিয়ে আসেন তখন মহাপ্রভু বংশের মহান্ত রাজগোপাল আচারি গোস্বামী ছিলেন গুরুদেব। ইনি পরোপকারি, দয়ালু ও আত্মভোলা মানুষ হিসেবে অঞ্চলে প্রসিদ্ধ ছিলেন, তিনিই বেরোয় প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনা করেন ও পরবর্তীকালে মেয়েদের শিক্ষারও প্রসার ঘটান। আমাদের এই কাহিনী মহাপ্রভু রাজগোপাল আচারিকে নিয়েই, না উনি গভর্ণর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারির কেউ হতেন না। বরং ততদিনে আয়েঙ্গার গুরুবংশের এই বাহ্মণ পরিবার ও চল্লিশেরও বেশী তাদের আত্মীয়স্বজনের পরিবার তামিল ভাষা ভুলে মানভুমের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছেন। শুধু তাঁদের যাজ্ঞিক ক্রিয়াকর্ম, পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান এখনও কাঞ্চীর বৈদিক নিয়মমতে হয়ে থাকে। এমনকি বিয়ের কনেও আসে তামিলনাডু থেকে যিনি হয়ত একবর্ণও বাংলা বা মানভুমের ভাষা বোঝেন না, চরম নিগ্রহ ভোগ করতে হয় তাঁকে তার ফলে।

আপাততঃ তাহলে ফিরি আমাদের গল্পে। আমাদের এই আপনভোলা মহাপ্রভুটির দুটি নেশা ছিল, এক আফিমের ও দুই গল্প শোনার। প্রতি সন্ধ্যায় ঈশ্বরনাম শেষে শুরু হত তাঁর মৌতাত। কেষ্টা নামে ভৃত্যের দায়িত্ব ছিল আফিম আর অনুপান হিসেবে ঘন করে জ্বাল দেওয়া সর-পূর্ণ দুধের বাটির যোগান দেওয়ার। তেলেঙ্গানা থেকে আমদানি করা ধূর্ত ভৃত্য রামাইএর কাজ ছিল প্রভুর মনোরঞ্জনের জন্যে প্রতি সন্ধ্যায় গল্প শোনানোর। সে গল্প হয়ত এভাবেই শুরু হত।
- ‘নে রামাই, এবার ধর। খবর্দার, একগাদা দুক্‌খু-টুক্‌খু আনবি নে কিন্তু বলে দিচ্ছি।‘ প্রভু বলতেন।
- ‘না আজ্ঞে, তাই কি করি! তবে কেষ্টাকে বলে দিন যেন প্রতি কথার শেষে হুঁ দেয়। না হলে আমার গল্প-বলার মেজাজ আসবে না কিন্তু, বলে দিচ্ছি।‘
- ‘সে ভাবিস নে। কেষ্টার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে যে হুঁ দেবে না!’
গল্প শুরু হয়। এক অজানা দেশের রাজার সবরকম সমৃদ্ধির মাঝে থেকেও এক অদ্ভুত বেদনার উপাখ্যান। রাজার একমাত্র মেয়ের অতুল রূপরাশি, শিক্ষা-দীক্ষাতেও অসামান্যা, অথচ কথা বলতে পারেন না। রাজা কী করেননি মেয়ের মুখে কথা ফোটাতে! ডাক্তার-বদ্যি, সাধু-সন্ন্যিসি, তাগা-তাবিজ, জলপড়া-মন্ত্রপড়া কিছুই বাদ দেন নি । তবু সবই বৃথা।
-‘এইবার তুই মার খাবি রামাই। মানা করলেম না এমন দুঃখের গল্প বলতে।‘ রামাই দেখে প্রভুর দুচোখে জল।
-‘তা যদি বলেন, মহাপ্রভু, অন্য গল্প বলি?’
-‘তা কি হয় রে ব্যাটা! শুরু করেছিস যখন শেষ তো করতেই হবে। তা হ্যাঁরে, রাজা আমাদের কেশব জিউএর থানে মানত করে নাই?’
-‘তা তো জানি না ঠাকুর, কি জানি ওরা হয় তো কেশব জিউএর নামই শোনে নি।‘
- ‘দাঁড়া একটু’, এই বলে প্রভু ঘরের ভেতর থেকে পাঁচটি সিকি এনে দেন রামাইএর হাতে ‘যা তো কাউকে পাঠিয়ে দে, এক্খুনি একটা পুজো দিয়ে মানত করে আসুক বাবার মন্দিরে।‘ ধূর্ত রামাইএরই লাভ, যদিও কেষ্টাটাকে চার আনা বখরা দিতে হবে, সে জানে।
- ‘তারপর কি হল রে, রামাই?’ প্রভুর আদেশে রামাইকে আবার গল্প শুরু করতে হয়।
- ‘তারপর হুজুর, বহু চিকিৎসা, বহু পুজো-আচ্চা করেও যখন কিছু হল না, মহারাজ একটা পুরস্কার ঘোষণা করলেন। যে রাজকন্যের মুখে কথা ফোটাতে পারবে তার সাথে রাজকন্যার বিয়ে দেওয়া হবে। দেখুন ঠাকুর, কেষ্টা হুঁ দিচ্ছে না, কিন্তু!’
- ‘হুঁ, হুঁ,’ কেষ্টা চোখ রগড়ে বলে ওঠে, রামাই খুশি।
- ‘বহু লোক এল, গেল, অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু ফল কিছুই হল না। রাজকন্যে অমনি উদাস দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে। শেষে একদিন রাজার বাড়িতে একটা চোর ঢুকল।‘
-‘বলিস কি রে, রাজবাড়িতে চোর! পাহারা ছিল না?’
- ‘সে আমি কি জানি। পাহারাদার হয়ত আফিম খেয়ে ঝিমোচ্ছিল’- বলেই জিভ কাটল রামাই। ভাগ্যিস প্রভু কথাটা খেয়াল করেন নি। ‘না না, চোর ব্যাটা ছিল মহা ধূর্ত। সবার চোখ এড়িয়ে সে সিঁধ কেটে ঢুকল রাজকন্যার শোবার ঘরে।‘
- ‘কেন, রাজকন্যের শোবার ঘরে কেন? ওরে রামাই, তোর পেটে পেটে শয়তানি আমি জানি। রাজার মেয়ের যদি কোনও ক্ষতি হয়, নীলমণিকে বলে তোকে তাড়াব আমি।‘
- ‘তার আমি কি জানি ঠাকুর। চোর কি আমায় বলে ঢুকেছে!’
- ‘হেই নে বাপ, আমার এই আংটিখান। চোরকে বল এটুকু নিয়ে সরে পড়তে। দেখিস বাবা রাজকন্যের যেন কোনও ক্ষতি না হয়।‘
রামাইয়ের তো আজ পোয়াবারো, তার লাভের পর লাভ।

- ‘ঠিক আছে ঠাকুর। তা আপনার আশীর্বাদে চোর রাজকন্যাকে কিছু করল না। তার শোবার ঘরের লাগোয়া ছিল ঠাকুর ঘর, ও সেদিকেই এগিয়ে গেল। এদিকে রাজকন্যার ঘুম ভেঙে গেছে কিন্তু সে কিছু বলতে পারছে না। তার সামনে দিয়েই চোর ঢুকে গেল ঠাকুরঘরে। তারপর ধীরে ধীরে - ও ঠাকুর, কেষ্টা চুপ করে আছে, আমি আর বলব না’- রামাই চেঁচিয়ে ওঠে।
- ‘কেষ্টা, তুই এবার মার খাবি হারামজাদা! হুঁ দিস না ক্যানে?’ অনেক হাতে পায়ে ধরে এ যাত্রা উদ্ধার পেল কেষ্টা।
- ‘চোর তারপর গৃহদেবতার সোনার মুকুটখানি খুলে নিয়ে পালাতে গেল রাজকুমারীকে পার করে।‘
-‘তারপর’- রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করেন মহাপ্রভু।
- ‘তারপর হঠাৎ কোত্থেকে কি হয়ে গেল রাজকন্যা চোর চোর বলে চিৎকার করে উঠল।‘
- ‘বলিস কি রে! তারপর?’
- ‘তারপর তো লোকজন ছুটে এল। তারা তো প্রথমেই চোরকে ধরে বাঁধতে গেল। তারপর অবাক হয়ে দেখে রাজকন্যা কথা বলছেন। রাজা-রানী ছুটে এলেন। সবার চোখে আনন্দে জল চলে এল।‘
- ‘ভগবান আছেন, বুঝলি রে রামাই, ভগবান আছেন। বড় জাগ্রত ঠাকুর আমাদের কেশব রায় জিউ।‘ মহাপ্রভু পরম বিশ্বাসে বললেন।
- ‘কিন্তু ঠাকুর, একটা সমিস্যে হল তারপর, সেটা কেউ সমাধান দিতে পারছে না। কথা হল রাজা কি এখন চোরকে শাস্তি দেবেন না তাকে নিজের জামাই করবেন? ওনারা এখনও ভাবছেন গুরুজি! এখন আপনি যদি এর একটা বিহিত করেন।‘
- ‘তাই তো রে, আমি পূজারি পণ্ডিত, আমি এসব সামাজিক সমিস্যের কি জানি। ঠিক আছে, কাল সকালে রাজা নীলমণিকে একবার তলব দিস তো, দেখা যাক কি বলেন।‘
পাঠকরা জেনে রাখুন গুরুদেবের ডাকে রাজার না এসে থাকার ক্ষমতা ছিল না, যতই তিনি শিশুর মত আপনভোলা মানুষ হন না কেন। পরদিন সকালে রাজা এসে মহাপ্রভুকে প্রণাম করলেন। গুরুদেবের প্রশ্নের উত্তরে সমস্যার একটা সমাধানও তিনি দিলেন। তাঁর মতে চোর যখন চুরির উদ্দেশ্যে রাজবাড়িতে ঢুকেছে ও হাতেনাতে ধরা পড়েছে, শাস্তি তার পাওনা। তবে চুরি করতে পারেনি বলে তাকে মোটামুটি দু-বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়াই উচিৎ।
-‘তার পরে?’
- ‘তার পর কথামত সেই চোর হবে রাজার জামাতা। চোর বলে রাজা তো তাঁর কথার খেলাপ করতে পারেন না।

গুরুদেব অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ডাকলেন, ‘মহারাজ’।
- ‘আজ্ঞা করুন গুরুদেব।‘
- ‘আমি যদি বেতাল হতাম, তোমাকে আজ বিক্রমাদিত্যের উপাধি দিতাম। তা যখন হবার নয়, আপাততঃ মন্দিরেই এসো, কেশবজিউএর পূজার প্রসাদ খেয়ে যাও।

আজ আর মহাপ্রভু নেই, নেই পঞ্চকোট বা কাশীপুরের সিংদেও রাজারা। রাজবংশের ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ও রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বিভিন্ন পরিচয়ে। মহাপ্রভু বংশ ও কুটুম্বের লোকজনদের মধ্যে কেউ হয়েছেন পাটনা মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল (ডাঃ গোবিন্দাচারি), বা কেউ বিখ্যাত নিউরো-সার্জন (ডাঃ এন কে আচারি), বা স্বাধীনতা-সংগ্রামী (শ্রী রাঘব আচারি) কিংবা সাংসদ (শ্রী বাসুদেব আচারি) ইত্যাদি। সব ঘটনার সাক্ষী পঞ্চকোট পাহাড় তো সদাই নীরব- শুধু দামোদর নদ কুলুকুলু শব্দে একমনে বয়ে চলেছে পশ্চিম থেকে পূর্বে।

মুম্বাই, ২৯শে অক্টোবর, ২০১৫।
-

বাংলা বিবিধ- যাচ্ছেতাই (২)

#বিশুমামা_জিন্দাবাদ

(গুল্প)

পরিচয়-পর্ব।

বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী ওরফে আমাদের বিশুমামার একটা প্রাথমিক পরিচয় আগের পর্বে (উলানবাটোরের ওস্তাদ) দিয়েছি। এবার একটু বাস্তব প্রসঙ্গে আসি। আমার বিশুমামা একটি রহস্যময় মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন অকৃতদার, এবং পৃথিবীর যাবতীয় অর্থকরী কাজেই অকৃতকার্য। তবে তার জন্যে তাঁর মনে কোনও ক্ষোভ ছিল না। তিনি যখন তখন লোকালয় থেকে উধাও হয়ে যেতেন, কখনও পন্ডিচেরির অরবিন্দ-আশ্রমে, কখনও অযোধ্যা আবার কখনও বা হরিদ্বারের কনখলে মা আনন্দময়ীর আশ্রমে গিয়ে খুঁটি গেড়ে বসে থাকতেন পাঁচ-ছয় মাস। আবার ফিরে আসতেন অভিজ্ঞতার ঝুলিটি ভরে নিয়ে। সে সব দিনগুলো ছিল আমাদের কাছে বড় আনন্দের। তাঁর একটা বিশেষ গুণ ছিল গানের গলাটি। বিশ্বভারতী সংগীতবিভাগে ডিপ্লোমা নিয়ে এখানে ওখানে বেশ কিছুদিন ক্লাস করে যখন বেশ খ্যাতি লাভ করেছেন, তখনই হঠাৎ নিরুদ্দেশ যাত্রা করলেন। ফিরে এসে কিছুদিন আমাদের বাড়িতে থাকলেন। জিজ্ঞেস করলে পলাতকের গান গেয়ে উত্তর দিতেন-
'খেয়াল-পোকা যখন আমার মাথায় নড়ে-চড়ে
আমার তাসের ঘরের বসতি যে অমনি ভেঙে পড়ে।
তখন তালুক ছেড়ে মুলুক ছেড়ে হই যে ঘরের বার, বন্ধু রে......।'

সেদিন বিকেলে কানু-সুজয় আসাতে প্রথম উনি এবার মুখ খুললেন।
- উঃ, এবার পণ্ডিচেরি আশ্রমে কাদের দেখলাম, তোরা বললে বিশ্বাস করবি না!
- বিশ্বাস করেছি কখনও? সুজয়ের উত্তরটা একটু বাঁকা শোনাল।
- একত্রে তিনমূর্তি- দিলীপ রায়, সাহানা দেবী আর নলিনীকান্ত।
- নলিনী গুপ্ত? আমি জানতে চাইলাম।
- না রে বোকা, ইনি সরকার। নজরুল, দিলীপ রায়দের বন্ধু, দাদাঠাকুরের জীবনী লিখেছিলেন। বন্ধু সজনী দাসের আগ্রহে ‘শনিবারের চিঠি’তে রেগুলার লিখতেন।
ভাবি, যে লোকটার এত জ্ঞান, তার গুল দেওয়ার কি প্রয়োজন থাকতে পারে।
তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত সেই নমস্য ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ নিয়ে। মুখে জর্দাপান নিয়ে দিলীপবাবু ‘মহাসিন্ধুর ওপার থেকে’ বা ‘আজি এসেছি বঁধু হে’ কিভাবে গাইতেন, হুবহু নকল করে শোনাতেন বিশুমামা। সাহানা দেবী রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্রী- রবীন্দ্রসংগীতের একজন দিক্‌পাল হয়েও কিভাবে দিলীপ রায়ের বন্ধু ও ভক্ত হয়ে উঠলেন, শোনাতেন সেসব অজানা কথা। জানিনা এর মধ্যে কতটা সত্যি থাকত। আমি মুম্বাইয়ে চাকরি করতে যাবার আগে উনি একজনের সাথে দেখা করতে বলেছিলেন। ভদ্রমহিলা ব্যালার্ড পিয়ারে থাকেন, হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল গানের শিক্ষিকা। আমি রাজী হতে বললেন, গিয়ে আমার নাম করবি, তবে ফোন করে যাস, লতাজি-আশাজিরাও তাঁর কাছে শেখেন কিনা!
বোঝো ব্যাপারখানা! আমি কিন্তু পরে খবর নিয়ে জেনেছিলাম যে সত্যিই ঐ নামে এক মহিলা থাকেন সেখানে, লতা-আশা অনেকেই তাঁর কাছে ক্লাসিকাল শেখেন। কিন্ত আমি আর ভয়ে সেদিক মাড়াইনি। যদি গিয়ে শুনতাম যে উনি বিশুমামাকে চেনেন, বোধহয় ততটা আশ্চর্য হতাম না, যেভাবে সারপ্রাইজ দিতে দিতে তার ‘প্রাইজ’টাই নষ্ট করে দিয়েছিলেন তিনি।
পরে বিশুমামা বিশ্বভারতী থেকে গানের ডিপ্লোমা নিয়ে ফেরেন ও দুর্গাপুরে একটি স্কুলে গান শেখাতে শুরু করেন। তবে বোহেমিয়ান জীবনযাপনের জন্যে বেশ কয়েকবার বিতাড়িত হয়েছেন, আবার দুটো মিথ্যে কথা বলে ফিরে এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। বাচ্চাদের গান শেখানোর ওনার একটা সহজাত প্রতিভা ছিল। উনি ‘সাউণ্ড অফ ম্যুজিক’ স্টাইলে সা-রে-গা-মা শেখাতেন যেমন- সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা/ সা-নি-ধা-পা-মা-গা-রে-সা ‘র সুরে গেয়ে শোনাতেন- ‘ন-মো-ন-মো বী-না-পা-ণি/ ন-মো-বা-ণী-না-রা-য়-ণী’। একদিন এসেছেন শান্তিনিকেতনে ভিজিটিং প্রফেসার ডাঃ ভূপেন হাজারিকার কাছে একটা ওয়ার্কশপ করে। তারপর বলাকওয়া নেই, আমাদের ভাই-বোনদের নিয়ে উঠে পড়ে লাগলেন কলাবতী রাগ নিয়ে। গেয়ে শোনালেন ভূপেনের অপ্রকাশিত গান-
‘দু-দিনের জীবনে কি পাই কে জানে,
তাই সুরে-বেসুরে, তালে-বেতালে
গান গেয়ে আনন্দ পাই-
সা-ণি-ধা-পা, ণি-ধা-পা, ধা-পা-গা রে,
গেয়ে যাই।- এই দ্যাখ, কলাবতী জানিস না! সা-গা-পা-ধা-ণি-ধা-পা-র্সা, র্সা-ণি-ধা-পা, গা-পা-গা-সা-ণি্‌-ধা্‌-সা.....'.বলে শুরু করতেন ধনঞ্জয় স্টাইলে সলিলের গান - 'জানিনা কখন কোথায় তুমি থাক, জানিনা মনে রাখ কি না রাখ...'
-'জানিস, সলিলের সুরে সত্যেন দত্তের ‘পাল্কির গান’ এর আগে বেরিয়ে যায় ভূপেনজির ‘দোলা’ – অসমীয়া ভাষায়, সাড়া জাগায় কাব্যগীতি হিসেবে।' বলেই হারমোনিয়ম টেনে নিয়ে গেয়ে উঠতেন-
“হে দোলা,
অ্যাঁকাব্যাঁকা বাটে রে, করিআঁহু করিআঁহু
বর বর মানুহর দোলা।
হে আপোন করিলো বনুয়ার জিয়নক
দেহা ভাগোরাই তোলা হে দোলা।
হেই রেইয়া না, রেইয়া না, রেইয়া না।।‘
এই বিশুমামার সেই স্বতঃস্ফুর্ত উচ্ছ্বাসটা একদিন প্রায় হারিয়ে গেল একটা বিশ্রী দুর্ঘটনায়। বারান্তরে সেসব বলা যাবে।

Monday, August 31, 2015

Translation- Bengali to Hindi

"বলছি ওরে ছাগলছানা,
উড়িসনে রে উড়িসনে,
জানিসনে তোর উড়তে মানা-
হাত-পাগুলো ছুঁড়িস নে !"

(সুকুমার রায়)

ए बकरी का बच्चा,
उड़ना मत रे उड़ना मत,
पंख नहीं हैं तेरे
क्यों फेंकता है पांव-हाथ?

Bengali Humor- যাচ্ছেতাই ।।

যাচ্ছেতাই ।।
(১)


কিছু কিছু লোক আছেন যাঁরা মুখটাকে যথাসম্ভব গম্ভীর করে এমন অনেক কথা বলে যাবেন, শুনে মনে হবে সেসব বিশ্বের গভীরতম রহস্য ও তার সন্ধান একমাত্র তিনিই জানেন। পরে একটু চিন্তা করলেই সব ভড়ং বোঝা যায় কিন্তু সেই মুহূর্তে অন্য কিছুই আর মাথায় আসেনা। এরকম একজন ছিলেন আমার বিশ্বেশ্বর ওরফে বিশুমামা।
বিশুমামার গানবাজনার খুব শখ ছিল। নিজে কতটা বুঝতেন জানি না, তবে আনকোরাদের ভড়কি দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। 'সেবার রাজাভাতখাওয়া সংগীত উৎসবে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা'- এইরকম একেকটা চমক দিয়ে শুরু হত তাঁর গল্প। আমি হয়ত রাজাভাতখাওয়া জায়গাটা কোথায় তা জানতে চেয়েছি, কথাটা ঘুরিয়ে দিয়ে মামা বলতেন- 'সে এক মজার জায়গা। পৃথিবীর সব রাজাদের অন্নপ্রাশন হত সেখানেই। তা এরকম একটা জায়গার সংগীত সম্মেলন বলে কথা। ওস্তাদ আর পণ্ডিতদের বিশাল জমায়েত হয়েছে।'
- আচ্ছা মামা, এই ওস্তাদ আর পণ্ডিতের মধ্যে তফাৎ কি? দুজনেই তো গান গায়!
- হ্যাঁ, তফাত তো সুকুমারবাবুই বুঝিয়ে গেছেন, পড়িসনি? 'ওস্তাদেরা লেপমুড়ি দেয় কেন মাথায় ঘাড়ে,/ টাকের পরে পণ্ডিতেরা ডাকের টিকিট মারে?' ইতিমধ্যে কানু আমাকে বোঝাতে লেগেছে যে মুসলমান গায়কদের ওস্তাদ আর হিন্দু গায়কদের পণ্ডিত বলে। ব্যাপারটা বিশুমামার নজর এড়ায় নি। 'হ্যাঁরে কানু, ওস্তাদি করছিস, না পণ্ডিতি ফলাচ্ছিস? দুটোই কিন্তু এখানে নিষিদ্ধ।' যাক, ব্যাপারটা শেষমেষ ভালয়-ভালয় মিটে গেল। বিশুমামার গল্প আবার শুরু হল।
- সে অনুষ্ঠানে লোকজন কিন্তু ভালই হত। গায়ক-বাদকরা দূর দূর থেকে আসতেন। শুধু হিন্দুস্থানী নয় কর্ণাটকি পণ্ডিতরাও আসতেন দক্ষিণ দেশ থেকে।
আমি আবার জিগ্যেস করতে যাচ্ছিলাম কর্ণাটকি নিয়ে কিছু একটা। সুজয় কানে কানে বলল, 'আরে করিস কি! এখনি বলে দেবে যারা নাটক করে তারাই কর্ণাটকি।' শুনে আমি চুপ করে গেলাম।
- সেবার এক পণ্ডিত এসেছেন উলানবাটোর থেকে। এদেশের শাস্ত্রীয়সংগীতে তাঁর বেজায় দখল। বলেন, ওঁদের গ্রামটা নাকি ধারোয়ারের কাছে, কর্ণাটকি আর হিন্দুস্থানী দুই ধারাই সমান চলে সেখানে। এতগুলো গায়ক-বাদক দেখে তো তিনি রেগে কাঁই। বলেন, 'আজীব বাত হ্যায়। একা আমিই তো রাতভর টানতে পারি, বাকিরা তবে কি করবে, হাঁ? এক-আধ ঘন্টে মে ক্যা হোতা হ্যায়? আরে ভাই শাস্ত্রীয় সংগীত কো ক্যা সমঝ রাখা হ্যায় তুমলোগ!'
এই শুনেই তো অর্গানাইজারদের হয়ে গেছে। সর্বনাশ! বিসমিল্লা, করিম খাঁ, শিবকুমারের মত তারকারা রয়েছেন আজ রাত্রে। তাঁরা তাহলে কি করবেন? যথারীতি বিনয়ের সাথে একটু ভেবে দেখতে বললেন তাঁরা। জবাবে পণ্ডিত কি বললেন ঠিক বোঝা গেল না। উনি শুধু বললেন, আমি রাগরাগিনী ঘড়ি ধরে গাই। সন্ধ্যার পূরবী দিয়ে শুরু করব, আর সেই রাগের সময় পেরিয়ে গেলে আর সেটা গাইব না। এই বলে তিনি পূরবীতে আলাপ শুরু করলেন।
- তারপর? আমরা তিনজন শ্রোতা একত্রে বলে উঠলাম।
- তারপর পূরবীর আলাপ শেষে ধরলেন ইমনকল্যাণ, মালকোশ। তারপর খাম্বাজে একটা বন্দিশ শেষ করে যখন বেহাগে তারানা ধরেছেন তখন রাত্রি দুটো। শেষপাতে যখন ভৈরবের পর আশাবরীর একটা তান দিয়ে শেষ করলেন, তখন সূর্য উঠে গেছে আর উদ্যোক্তারা মাথার চুল ছিঁড়ছেন।
- সে কি, আর অন্য ওস্তাদেরা?
- আরে সেটাই তো কেউ বুঝতে পারছে না যে সবাই এত শান্ত কেন। শেষে ওস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ তাঁর সানাইটা মাথায় ঠেকিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'সমবেত শ্রোতাগণ, গত দু-ঘণ্টায় উলানবাটোরের পণ্ডিতজি আমাদের সন্ধ্যে থেকে সকালের চার প্রহরের আটটা বিভিন্ন রাগ গেয়ে শুনিয়েছেন। অাল্লাহ কা করিশ্মা দেখিয়ে, জেইসা রাগ ওইসা সময় দিখাই দিয়ে হামারি আউর আসমান কি ঘড়ি মেঁ।' সত্যি সবাই তাকিয়ে নিজের নিজের ঘড়িতে দেখে রাত্রি ন'টা বাজছে মাত্র। হল হাততালিতে ফেটে পড়ে।
হঠাৎ কি যেন একটা জরুরি কাজ মনে পড়ায় বিশুমামা চটপট উঠেই পিট্‌টান দিলেন।
আমরা তখনও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে আছি, কানু বলে উঠল, 'ইয়ার্কি পেয়েছে! একটা রাগের আলাপ থেকে অন্য রাগের মুখড়া, মালকোষের অন্তরার পরে খাম্বাজের তা্রানা। মালকোষ পঞ্চম বর্জিত রাগ, তবলা-তানপুরা সব মধ্যমে বাঁধতে হয়- ততক্ষণ পাবলিক হিপনোটাইজড হয়ে বসে থাকবে!'
- 'উলানবাটোর থেকে ওস্তাদ! উলানবাটোর ধারোয়ারের কাছে! গুল মারার আর জায়গা পায়নি। উলানবাটোর মঙ্গোলিয়ার ক্যাপিটাল- যেন আমরা জানিই না।' সুজয় বলে উঠল, ও আমাদের মধ্যে একটু সিরিয়াসলি পড়াশুনা করে।
- 'যদি জানতেই তবে বলতে পারলে না কেন, চাঁদ? নাকি তোমরাও হিপ্নোটাইজড হয়ে গেছিলে' - বলার পালা এবার আমার।
- 'হয়তো তাই'- আমরা সবাই একসাথে বলে উঠি।

মুম্বাই- ২৭শে আগস্ট, ২০১৫।

Wednesday, July 29, 2015

Bengali Poem- "আজব ভূগোল"

আজব ভূগোল ।।


'হিংলাজে' হিং চেয়ে লজ্জা কি কম বা?
'সিকিমে'তে টু সি কিম্‌? অষ্টটি রম্ভা!
'পণ্ডিচেরি'তে নাকি চেরি খুব সস্তা?
'জামনগরে'তে জাম দশ টাকা বস্তা!

আজব ভূগোলে ভাই লেখা আছে 'ভুটানে'
পা দুখানি ওঠে না, ভূ-অভিকর্ষ টানে।
'রাজাভাতখাওয়া' গিয়ে রাজা ভাত খায় কি?
মাল-দার সবলোক থাকে 'মালদা'য় কি!

শীতকালে গাছ থেকে পাতা যায় ‘ঝরিয়া’,
ভারতকে হকিতেও হারাল কী 'কোরিয়া’?
চিনি যদি নাই চিনি যাব কি 'চিন'-পানে,
‘যা পান আনগে’ বলে পাঠাবে কি 'জাপানে'?
লঙ্কায় ঝাল নেই, ঝাল কি 'শ্রীলঙ্কা'য়
'সিঙ্গাপুরে' সিঙা ফুঁকে মরে ভয়ে-শঙ্কায়।
'খাইবার পাস' থেকে পাশটি করে এসে
'পুরী' গিয়ে ভুরিভোজ খায় লুচি পায়েসে।

আর্মানি হার মানি জার্মানি ছোটে রে
কাতারে কাতারে লোক কাতারেই জোটে যে!
 'নাই রবি', তবু তা যে আঁধার নগরী নয়
'কে নিয়া' গেল বলে সে দেশ উদাস হয়। 
শহরেতে বাস করে ‘বন’বাসী কাহারা?
বে-সাহারা মরুভূমি, নাম তবু 'সাহারা'!
পুত্রের দেশ বলে 'পো-ল্যান্ড' কে জানি গো
জামাতার বলে তবে 'জামাইকা' মানি তো? 
যাও আর এসো শুনে গিয়ে দেখি 'গোআ'তে-
গেছে- জেনে পিণ্ডি কে দিয়ে এল 'গয়া'তে।।

(মুম্বাই, ৩০শে আগস্ট, ২০১৫)

Bengali From Diary - 'Smriti Satatai'



।। স্মৃতি সততই ।।



শিলচরে 'রাবিন্দ্রিকী' গোষ্ঠীর অন্যতম কর্ণধার শ্রীমতী মৈত্রেয়ী দামের কাছে আমার স্ত্রী তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতেন। স্বামী রূপক ও কন্যা সোহিনীকে নিয়ে বেশ একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল গুরুচরণ কলেজ রোডের ঐ বাড়িটিতে। ওখানেই দেখেছি সাহিত্যিক দেবেশ রায়কে, 'তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত' উপন্যাসের জন্যে সদ্য তিনি তখন আকাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। দেখেছি গৌরী ঘোষকে, সাংবাদিক অশোক দাশগুপ্ত ও ঢাকার প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞা প্রফেসর সন্‌জিদা খাতুনকে। ১৯৯১র মে মাসের এক বৃষ্টির দিনে রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকীর প্রস্তুতির ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা জমেছিল। রূপকদা ও কিশোর শিল্পী রাহুল দত্ত গেয়ে চলেছে একের পর এক বর্ষার গান। তখনই মৈত্রেয়ীদি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বলে উঠলেন- 'রবি ঠাকুর কি সব একেকটা বর্ষাঋতুর উপর গান লিখেছেন, কিন্তু আমাদের ভাগ্যে জুটেছে একটিই'।
- 'সে আবার কি?' সবাই হৈ হৈ করে উঠি। 'আমাদের ভাগ্যে মানে?'
- 'আর কিতা! ওই 'ঝর ঝর বরিষে বারিধারা। হায় পথবাসী, হায় গতিহীন, হায় গৃহহারা।' '
সবাই হো হো করে হেসে উঠলেও কথাটা যে কতটা সত্যি তা বোঝা গেল ২৫শে বৈশাখের অনুষ্ঠানের দিনেই। 'প্রভু আমার, প্রিয় আমার' নামে একটা গীতি-আলেখ্য চলছিল। রবি ঠাকুরের গানে যে প্রভু আর প্রিয়র মধ্যে বিশেষ ভেদ নেই, প্রেম আর পূজা পর্যায় কোথায় যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে, গানে গানে সেটাই যেন বোঝানো হচ্ছিল ইনিয়ে-বিনিয়ে। গিন্নী এই অনুষ্ঠানে নেই, তিনি বাপের বাড়িতে, আর আমি বসে দর্শক আসনে। এমন সময় রূপকদা হন্ত-দন্ত হয়ে এসে বল্লেন- 'ব্যস, কাম সারসে। শিলচরের দ্যাবতা হাতে-নাতে দেখাইয়া দিসেন- তাইনের 'প্রেমে আঘাত আছে, নাইক অবহেলা।'
- তার মানে?
- বরাক নদীর বাঁধ ভাঙিয়া বন্যা ছুটেছে......আইজকার প্রোগ্রামের এখানেই ইতি।
ব্যস, দশ মিনিটে হল খালি। জল ঢুকতে লাগলো হু হু করে। কোনোমতে স্কুটার চালিয়ে বাড়ি পৌছলাম। বাসায় শুধু মা ছিলেন, তাঁকে আর সে রাত্রে কিছু বললাম না।
পরদিন সকালে উঠেই দেখি ধুন্ধুমার কাণ্ড। সামনের রাস্তায়, তখনো ঠিক পাকা হয় নি, মোরাম-ঢালা ছিল, এক হাঁটু জল ও ক্রমশঃই বর্ধমান। পঞ্চায়েত রোডে আমাদের ভাড়া-বাড়ি, মালিক ব্যাঙ্কের অফিসার, নরসিংটোলায় থাকেন। সযত্নে বানানো বাড়ি্র বাগানটি রাস্তার লেভেল থেকে অনেকটা উঁচুতে, তারও আড়াই ফুট উঁচু বাড়ির প্লিন্থ। খুব বড়সড় বন্যা না হলে অতদূর জল ওঠা অসম্ভব, তাই বেশ নিশ্চিন্ত ছিলাম। কিন্তু এর একটা অন্য দিক ছিল, সেটা এবার টের পেলাম। পনের মিনিটের মধ্যেই হুড়মুড় করে এসে পড়ল আমার ঠিকে ঝি, কাচ্চা-বাচ্চা, তোলা উনুন, কাপড়-চোপড় নিয়ে একেবারে সপরিবারে। এক্ষেত্রে না বলা সঙ্গত নয়, এটাই কাছাড়ের দস্তুর। তারপর বন্ধুবান্ধবরা স্কুটার রাখতে আসতে লাগলো। ধীরে ধীরে আটটি স্কুটার নিয়ে আমার বাড়িটি অচিরাত একটি স্কুটার গ্যারেজে পরিণত হল।

(২)

এইবার চিন্তা হল অফিস যাব কি ভাবে। ছুটি ডিক্লেয়ার না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কর্মীরই দায়িত্ব হল যেনতেনপ্রকারেন দপ্তরে পৌঁছিয়ে কাজ বন্ধ করাবার জন্যে দরবার করা। তারপর যদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ দেখিয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে ছুটি পাওয়া যায় তবে দুর্যোগ আর উপভোগে তফাৎ কতটুকু? এদিকে পাজামা গুটিয়ে বাজারের দিকে একটু এগিয়ে দেখে এলাম চ্যাং-কুড়ি রোডের কাঠের পুলটুকু বাকি আছে বটে, তবে দুপাশের রাস্তা জলমগ্ন। তাকিয়ে দেখি পাশের বাড়ি প্রফেসর রঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়ির বারান্দায় তিনি প্রফেসার বন্ধু শ্যামলদার সাথে বসে চা খাচ্ছেন। আজ কলেজ ছুটি, ওঁরা জানালেন। 'সে কি, আপনাদের কলেজ তো টিলার উপরে, জলে ডোবার তো কথা নয়' আমি বলি।

- আরে ভাইটি, গরু-বাছুরগুলো না আসতে পারলে আমরা চরাব কাদের?' শ্যামলদা বললেন। প্রসঙ্গতঃ জানাই যে গুরুচরণ কলেজকে ছাত্র-শিক্ষক নির্বিশেষে 'গরু-চরানো' কলেজ বলতেন মজা করে এবং ছাত্রেরা সেটা ঠিক পছন্দ না করলেও অধ্যাপকেরা নিজেদেরকে ব্রজের সেই রাখালরাজার সাথে তুলনা করে যারপরোনাস্তি আনন্দ পেতেন। কিম্বা হয়ত সিলেটিরা স্বভাবতঃই খুব বুদ্ধিমান প্রাণী, অন্ততঃ মানুষের থেকে তো বটেই, তাই কথাটার অসম্ভবতা অনুমান করেই মজা পেতেন। আমি তাঁদের দলে যোগ দেব কিনা ভাবছিলাম, এমন সময় দেখি, অঙ্কের অধ্যাপক যাদব ভট্টাচার্য ধুতিখানা গুটিয়ে সেদিকপানেই আসছেন। তিন ভট্টাচার্যের ত্র্যহস্পর্শ থেকে ত্রিপাদদোষ লেগে যেতে পারে ভেবে আমি আর সেদিকপানে এগোলাম না।
হঠাত মনে হল কেউ যেন গেট খুলছে। তাকিয়ে দেখি আমাদের সহকর্মী গৌরীশংকর দত্ত গুটিগুটি পায় ঘরে ঢুকছে। 'কি রে, তুই এখনও ঘরে বসে', দত্ত আমাকে দেখে হৈ হৈ করে উঠল। 'কেন, তুই কি অফিস যাবার জন্যে নৌকো ভাড়া করে এনেছিস?' আমি জানতে চাই।
- ঠিক ধরেছিস তো! ডিঙ্গি নৌকোটা কাঠের পুলে বেঁধে রেখে এসেছি। সকালে জি-এমের ফোন এসেছে বাড়িওলা মারফত, বন্ধুবান্ধবরা বন্যায় কে কেমন আছে তার খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে। তাই বেরিয়ে পড়েছি। তুই তো এখন ঝাড়া হাত পা, চল আমার সাথে।
আমি তো একপায়ে খাড়া। মাকে জানিয়ে ওর সাথে নৌকো করে বেরিয়ে পড়লাম।
প্রথমে কলেজ রোডে আশিস বিশ্বাসের বাড়ি। ঘরের একতলায় জল থৈ থৈ। ও থাকে দোতলায়। মালিক একতলায় ছিল, জল ঢুকতেই তিনিও উঠে পড়েছেন ওপরে। আমরা হাঁক-ডাক করতেই বিশ্বাস দোতলার বারান্দা থেকে মই ঝুলিয়ে দিল, আমরা তাই বেয়ে বাসায় ঢুকলাম। ওর চিন্তা ছিল স্কুটারখানা নিয়ে, গৌরি বলল, 'চ্যাটার্জির বাগানে অন্ততঃ সাতটা স্কুটার দেখে এলাম। চল সেখানেই রেখে আসি, চিন্তা নেই, কোনও ভাড়া লাগবে না'। 'ভাড়া কেন, কুলি খরচও লাগবে না, আমরা আছি তো, শিক্ষিত কুলি', আমি আশ্বস্ত করলাম। তারপর তিনজনে মিলে ধ্বস্তাধস্তি করে স্কুটারকে নৌকোয় চাপিয়ে আমার বাড়িতে নিয়ে এসে রাখা হল।
ফেরার সময় আবার একই পথ ধরলাম। এবার আমরা তিনজন। হঠাৎ খেয়াল হল, নীহারের খবর তো নেওয়া দরকার, ওর জ্বর ছিল দু-তিনদিন ধরে। যদিও ওরা থাকে কলেজের পেছনে টিলার ঢালু অংশটিতে, সেখানে কোনদিনই বন্যা আসবে না। তবু ওরা কেমন আছে খবরটা নেওয়া প্রয়োজন মনে করে আমরা রাস্তার ধারে নৌকো 'পার্ক' করে নীহার ব্যানার্জির বাসার কড়া নাড়ালাম।


 (৩)

নীহার বেরিয়ে এল, মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। আমরা ওকে স্মোক করতে কখনো দেখিনি। 'বুলা, তুমি নীহারকে সিগারেট ধরিয়েছ?' গৌরী হাঁক পাড়ল অন্তরালবর্তিনীর উদ্দেশ্যে।
'ওহ্‌, আমার কি ক্ষমতা ওকে কিছু ধরাই বা ছাড়াই! ওর ধারণা একটানা সিগারেট খেলে জল তাড়াতাড়ি নেমে যাবে'- বুলা দেবী এবার সরোষে প্রকট হলেন, হাতে ধূমায়িত কাপের ট্রে।
- আসলে আমার জলে একটা আতঙ্ক আছে...না, না কুকুরের কামড় থেকে নয়, ছোটবেলায় খড়গপুরে দেখা একটা ভয়াবহ বন্যার ঘটনা থেকে। পরের বছরও যদি এরকম দেখি, আমি এখান থেকে ট্রান্সফার নিয়ে চলে যাব- নীহারের বক্তব্য।
আমি ছোটনাগপুরের পাহাড়ি শহরে মানুষ, বর্ষায় তোড়ে জল বয়ে যেতে দেখেছি। সেই সময় সাধারণ অবস্থায় লাফ দিয়ে পার হওয়া যায় এমন এক নালার জলের স্রোতে শুধু মানুষ নয়, আস্ত একটা বাস ভেসে যেতে দেখেছি চোখের সামনে দিয়ে। পুরো ঘটনাটা হৃদয়-বিদারক, তবে এটুকু বলতে পারি যে বাস ড্রাইভার ভাল অঙ্ক জানত না, ভেলোসিটি প্যারালেলোগ্রামের ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। যাক সে কথা। তবু একবার আরেক পাহাড়ি শিল্প-শহর জামসেদপুরের সোনারি অঞ্চলে বন্যা দেখেছিলাম সে কোন ১৯৭৪ সালে। সেও নেহাৎ শহুরে বাবুদের শখ-চরিতার্থের বন্যা। সুবর্ণরেখা-খড়কাই-এর সঙ্গমস্থলে হঠাৎ জল বেড়ে এক কাণ্ড, অপ্রস্তুত গৃহবাসীদের অবাক করে ফ্রীজ-সোফাসেট-আলমারি সব ভাসিয়ে নিয়ে এসেছিল ঘরের বাইরে, সে এক দেখবার মতো দৃশ্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুজুগে দর্শনার্থীদের ভীড় লেগে গেল শহরের একপ্রান্তের এই অঞ্চলটিতে। সেই শ্রাবণে অনেকে পৌষমাস দেখে ফেলল, যেমন ফুচকা-অলা, বেলুন-বাঁশীওলা ইত্যাদি। রথ দেখা আর কলা-বেচা একসাথে চলতে থাকল। শুনেছিলাম একটা নাগরদোলাও নাকি এসেছিল, ভেজা মাঠে সাহস করে খুঁটি পুঁততে পারেনি বলে ফিরে যেতে হয়েছিল তাদের!
সেই আমার চোখের সামনে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জল শুধু জল। আমার তো ভালই লাগছিল দেখতে, জানিনা নীহারের চিত্ত কেন হয়েছে বিকল। ওকে অনেক বলেও বাড়ি থেকে বের করা গেল না। অগত্যা আমরা এবার সৎসঙ্গ আশ্রমের জলপথ ধরলাম, সেখানে আছে দুই গুজরাটি পরিবার, হরিয়ানি আর উকিল। দুজনের নামেরই কোনও ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। ভরতভাই হরিয়ানির সাথে হরিয়ানার কোনো সম্বন্ধ নেই, আর মিঃ উকিল ছিলেন একজন সিভিল ইঞ্জিনীয়ার। যাই হোক, তাঁরা সপরিবারে ভালই আছেন, গুজুভাইদের বাসায় সর্বদা অন্ততঃ একমাসের চাল-ডাল-নুন-তেল স্টক করাই থাকে, তাই ওদের বিশেষ চিন্তা নেই। তবে ছেলেমেয়েরা কান্নাকাটি করছে, গুজরাটে একসাথে এত জল দেখা যায় না কিনা! আমরা অগত্যা ফিরলাম। এরপর আমাদের গন্তব্য বিবেকানন্দ রোড, স্বপন দাস এণ্ড কোং।


(৪)

শিলচরের বিবেকানন্দ রোড তখন ত্রিশ ফুট চওড়া একটি নদী। একপ্রান্তে রামকৃষ্ণ মিশন রোড ও তারাপুরের দিক থেকে ঢাল নেমেছে, অন্যদিকে অনুকুল ঠাকুরের সত্সঙ্গ আশ্রম রোড আর উত্তরে কলেজ রোড ঢালু হয়ে বিবেকানন্দ রোডের সাথে মিশেছে যে তেমাথায়, সেখানে একটি মাছ-সবজির বাজার বসে। আজ সেখানে বিশ বাঁও জলের আনুকূল্যে আর মরা নয়, জ্যান্ত মাছ ধরছে পাড়ার দুঃসাহসী ছেলেরা। সেখান থেকে নৌকোয় বিবেকানন্দ রোডে ঢুকেই বাঁদিকে প্রথমে পড়ল প্রদীপ মন্ডলের বাড়ি। ওর বিয়ের তখনও বর্ষপূর্তি হয় নি, বলতে গেলে হানিমুন কাপল। ওর বাড়িওলা জানালেন, কাল রাতে জল বাড়তে দেখেই প্রদীপ আজ ভোরে সস্ত্রীক এয়ারপোর্ট রওনা হয়ে গেছে, টিকিট পেলেই সোজা কলকাতা। বেচারা, একটা থ্রিলিং হনিমুন অন এ রিভার ক্রুজের চান্স মিস করলো! তার ওপাশের বাড়িতে থাকে আশিস বসাক। হুজুগে মানুষ, একটু ডাকাডাকি করতেই বৌয়ের গজগজানি কর্ণপাত না করে আমাদের 'বজরা'য় এসে বসল।
উল্টোদিকের একটা গলিতে একতলা বেশ বড় একখানা বাড়িতে স্বপন দাস থাকে বউ-বাচ্চা ও বাবা-মাকে নিয়ে। ওদের বাড়ি গিয়ে দেখি একতলার অর্ধেকের উপর জলের তলায়। ওরা গেল কোথায়? তখনই যেন স্বর্গ থেকে দৈববাণী হলো- 'নৌকোর মুখটা সোজা সিঁড়িঘরে ঢুকিয়ে দে'। ওপরে তাকিয়ে দেখি স্বপন নির্দেশ দিচ্ছে ছাদ থেকে। অগত্যা সেইভাবেই সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদে এলাম।
স্বপনদের ছাদের উপরে এসে দেখি এলাহী কান্ড! তিনখানা তাঁবু পাতা হয়েছে বিশাল ছাদ জুড়ে। তার একটাতে তিন পরিবারের বারোয়ারী রান্না চড়েছে, খিচুড়ি আর ইলিশের ঝাল। পাওয়ার নেই বটে, তবে স্ট্যান্ড-বাই জেনারেটারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেশ পিকনিকের মেজাজ।ইতিমধ্যে বাড়িওয়ালার বড়ছেলে সাইকেলে করে গোটা চার-পাঁচ ভিডিও ক্যাসেট নিয়ে এলো, রাতের খোরাক হিসেবে। রিমি আর স্বপন খেয়ে যাবার জন্যে অনুরোধ করছিল বার বার, লোভ যে হয়নি তাও নয়, কিন্তু আমরা তো কেউ একা নই, তাছাড়া বাসায় খবর যে পাঠাব, তখন এমন ঘরে ঘরে ফোন ছিলনা, মোবাইল তো দুরের কথা। অগত্যা সবিনয়ে তাদের প্রত্যাখ্যান করতে হল। মেসোমশাই অবশ্য অন্য একটা লোভ দেখাচ্ছিলেন। আমি থাকলে চারজন পার্টনার হয়ে যেত আর তাহলে বেশ ব্রিজ খেলা যেত খেয়ে-দেয়ে। কদিনের রসদ আর কদিনেরই বা আনন্দ! তবু ওদের মানিয়ে নেওয়া দেখে বেশ ভাল লাগলো। চা আর পকোড়ি খেয়ে ওখান থেকে বিদায় নিলাম।
'আজকের মত অনেক ঘোরা হল', এই বলে গৌরী আমাকে আর বসাককে যথাস্থানে নামিয়ে দিয়ে নৌকো নিয়ে মালুগ্রামে নিজের বাসায় রওনা দিল। আমার বাড়ির উল্টোদিকের দোতলা বিল্ডিংটা হল সরকারী বন্যা-নিয়ন্ত্রণ বিভাগের আঞ্চলিক হেড অফিস। দেখি সেখানে আলোর মালা সাজানো হচ্ছে। ওদের ইলেকট্রিসিয়ান দত্তগুপ্ত তদারকি করছে। জিজ্ঞেস করলাম- 'কি ভাই, আপনাদের এখন পৌষমাস নাকি?' ব্যঙ্গের খোঁচাটুকু মাঠে মারা গেল। উত্তর পেলাম- 'না দাদা, আমরার এনুয়াল ডে হইত আজ সৈন্ধায়, আইয়েন নিশ্চয়'।
এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ অফিসটি বরাক-অববাহিকায় বন্যা প্রতিরোধ ও তত্কালীন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছিল কয়েকবছর আগে। কিন্তু দেখা গেল প্র্যাকটিক্যালি সেটি হয়ে দাঁড়িয়েছে 'বন্যা-আমন্ত্রণ বিভাগ' আর সেটা যে অমূলক নয় বন্যার সময় কর্মচারীদের মুখ-চোখের উদ্দীপ্ত ভাব থেকেই তা বোঝা যেত। ৯১-৯৩-৯৪ এর ক্রমবর্ধমান বন্যার থেকে শিক্ষা নিয়ে শুনেছি নাকি ১৯৯৫ সালে এই অফিসটি তুলে দেওয়া হয়। আমি শিলচরের পাট উঠিয়ে বদলি হয়ে পন্ডিচেরি চলে আসি ১৯৯৪-এ। বন্ধুদের মুখে শুনেছি তার পরে নাকি বরাকে তেমন উল্লেখনীয় বন্যা আসেনি- আজ পর্যন্ত !

(শেষ)

Saturday, July 25, 2015

New: Translated rhyme- Bengali to Hindi

New: Translated rhyme- Bengali to Hindi

"मान न मान"
सुकुमार रॉय  

सुनरे भैया गांव में मेरे ऐसा आदमी दीखा,
खाते समय वह दाल-चावल को मुंह के अंदर फेंका।   
सुना है उसे भूख भी लगती दिनभर जो न खाएं,  
आँखें बंद हो अपने आप ही नींद जैसे आये।  
चलते समय दो पैर उसके पड़ते हैं धरती पे, 
आँखों से वह देखता है सब, सुनता है कानों से।
मान न मान, वह सोता है सर सिरहाने पे रखके 
 ऐसा भी होता है क्या भला, चल आते हैं देखके!   

(मेरा अनुवाद, मूल बंगाली से)

"আরে ছি ছি রাম রাম কলকেতা শহরে
লাল ধুতি পরে মুদি তিন হাত বহরে।
মখমলে জামা গায় ঝকঝকে টোপরে,
খায় দায় গান গায় রাস্তার ওপরে।"

(সুকুমার রায়)


अरे छी छी राम राम का कहूँ रे भैया
कोलकाता जाके देखा हमार रमैया ।
मख़मली लाल धोती-कुर्ता टोपी सर पे
खाए-पिए-नाचे-गाये सड़कवा के मोड़ पे!


"কহ ভাই কহরে, আঁকাচোরা শহরে
বদ্যিরা কেন কেউ আলুভাতে খায় না?
লেখা আছে কাগজে, আলু খেলে মগজে
ঘিলু যায় ভেস্তিয়ে, বুদ্ধি গজায় না।"
(সুকুমার রায়)


जानते हो मेरे भाई, जाके देखा मुंबई
वहां के हकीम कोई आलू नहीं खाता है!
लिखा है किताबों में, आलू से खोपड़ी में
दिमाग न उपजे रे, भेजा सुख जाता है ।



क्या कहूं मैं गया था हुगली
किसी से ना यह कहना,
दीखा मुझे तीन ऐसे सूअर
टोपी न किसीने पहना!



खामखा कुत्ते क्यों चिल्लाएं रात भर-
दांत के कीड़े रहे न टूटे दांत पर?
किसकी गलती से है पृथ्वी के दबे सर?
चल यार सोचते हैं छाओं में बैठकर !
(सुकुमार रॉय)
Original in Bengali:
'কেন সব কুকুরগুলো খামখা চেঁচায় রাতে-
কেন বল দাঁতের পোকা থাকেনা ফোক্‌লা দাঁতে?
পৃথিবীর চ্যাপ্টা মাথা কেন, সে কাদের দোষে?
এসো ভাই চিন্তা করি দুজনে ছায়ায় বসে ।'


पता क्या कह गया सीताराम मेहता-
आसमाँ मंहके जैसा खट्टा सा रायता ।
खटाई रहती नहीं, होने पर वर्षा,
चखकर देखा तब मीठा शक्कर सा ।


ए बकरी का बच्चा,
तू उडने काहे को चला?
पंख कहाँ रे तेरे -
कूदता-फिरता क्यों भला !


नन्द घोष की काली गाय भाग के गयी कहाँ-
गाँव-मुहल्ला नन्द घूमे, खोजता सारा जहाँ।
आधी रात को बेखबर
लौट अधमरा सा थककर,
अपने आंगन पहुँचके देखा गाय सोयी है वहाँ।


आसमान में सात रंगों के इन्द्रधनुष खिले बेजोड़
कितने लोग देखने को आये सारे काम काज को छोड़.
एक था बुड्ढा भला किसीका न देखे वह आदत से-
कहने लगा- 'रंग कच्चा है, टिकाऊ नहीं, पूछो मुझसे!'

जंगला गांव का पगला बुड्ढा मुझसे आकर उलझे,
ढाई बिघाभर समुन्दर में कटहल कितने उपजे?
मैंने भी कहा उसी अंदाज़ में सच कहूँ मैं कितने-
एक एकड़ मूली के खेत में झींगा फले हैं जितने।

आंगन में रक्खा था डब्बा, खीर था उसमें पड़ा,
कौए ने उसके लिए बूढे से जोर का लड़ा। 
जीत लड़ाई खुशी से कौए ने मुड़कर देखा क्या-
जाने कब खीर साफ कर गयी छोटी सी एक चिड़िया।   

बुड्ढे तुम हो आदमी अच्छे,
दिल से भी लगते हो सच्चे,
फिर भी क्यों तुम मुझे पसन्द आते नहीं?
कारण इसका मुझे क्या पता
सोचूं भी तो समझ न आता 
वजह न कोई तो भी दिल भाते नहीं।