Friday, May 6, 2016

পানের অভিলাষ ।। প্যারডি কবিতা

পানের অভিলাষ।।
পল্লব চট্টোপাধ্যায়


কোন হাটে তুই বিকোতে চাস, ওরে আমার পান,
কোনখানে তোর স্থান?
যাত্রীগণের আনাগোনা ব্যস্ত ইস্টিশনে
ভিড়ভাট্টায় হাজার ঠেলা, তাহারই এক কোণে
হিন্দুস্থানী পানওয়ালার ছোট্ট দোকানখানা-
দেশোয়ালি ভাই, রেল-বাবুদের সদাই আনাগোনা,
লাল পিকে আর চুনের ছোপে রাঙা দেয়ালখান-
পাবি সেথায় মান?
পান তা শুনে সবুজ মাথা নেড়ে নেড়ে কয়
নয়, কখনো নয়!
কোন গলিতে থাকবি রে তুই, ওরে আমার পান,
কোথায় পাবি মান?
আলো-আঁধার পথের মাঝে ব্যস্ত বাড়িগুলো
পথিক চলে নেশার ঘোরে চরণ টলোমলো।
নূপুরধ্বনি হাওয়ায় ভাসে সঙ্গে চটুল সুর
সুরায়-সুরে-গন্ধে মাতাল রূপের মধুপুর
হাজার মজা লুটবি সেথা, যাবি কি? পান কয়-
ছি ছি ছি, কভু নয়!
কোনখানে তুই বাঁধবি ডেরা, ওরে আমার পান,
কে দেবে সন্ধান?
গাইছে গজল গুলাম আলি মস্ত্‌ মেজাজখানা
মৌশিকীর সে আশিয়ানায় হামেশা দেয় হানা
বোল-তারানার মাঝে-মাঝে তান ও তরন্নুম
লখনওঈ জর্দা, হাসিনাদের তবস্সুম।
যাবি সেথায়? মেজাজখানা হয়েই যাবে তর্!
বহুত খুব ওস্তাদ, তাও লাগছে বেজায় ডর-
পান কেঁদে কয়, ভাই,
ক্যাম্‌নে সেথা যাই!
কোন হাটে তুই দিবি হৃদয়, ওরে আমার পান,
ধন্য হবে প্রাণ?
লোলচর্ম গলদঘর্ম বৃদ্ধা যেথায় বসে,
বৃদ্ধটিরে বাক্যবানের ঘা মারছেন কষে -
হঠাৎ যেন পড়ল মনে স্মৃতির চাদর খসে
ষাটটি বছর আগের কোনো তাম্বুলেরই রসে
সিক্ত মধুর রাত্রিখানা, পাবি সেথায় মান?
হঠাৎ খুশী ঝলকে ওঠে, কহে সবুজ পান,
সেইখানে মোর স্থান!
MARCH 8

একটি ছোট্ট ঘটনা ও বিভিন্ন কবিদের মতামত।।


মাইকেল মধুসূদন দত্ত
(মেঘনাদ-বধ কাব্য়)

বিপাকে পড়িয়া যবে চৌর্য-শিরোমণি
রাজন পড়িল ধরা পুলিশের হাতে
সিংগাপুরে। মিডিয়া, কি হৈল তার পরে?
কহ, কোন কেসে ফেলি পুলিশ তাহারে
পেশিল ন্যায়ের হাতে? নহে তাহা? তবে
সি-বি-আই লয়ে তারে অতি সঙ্গোপনে
লুকাতে চাহে কি তারে দাউদের ভয়ে-
এমতি কহিছে সবে।মুম্বাই পুলিশ
দাউদের ভৃত্য সবে, তাই রাজনেরে
দিল্লি রাখা হল বুঝি! বা এ সরকার
নতুন জামাতা এক পেল এতদিনে,
কাসভের পর। তবে তাই হোক, সখে,
দাউদ থাকুক সুখে পাকিস্তানে। হেথা
রাজন পালিত হোক জামাই-আদরে।।


সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
(ঝর্ণা)

বল মোরে মিডিয়া, সুন্দরি মিডিয়া!
ধরলরে সিবিআই রাজনকে কি দিয়া?
সিংগাপুরে আলোড়ন, দিল্লি কম্পমান
দাউদ পড়বে ধরা এইবার বুঝি বা!

মুম্বাই পুলিশ কি দাউদের টাকা খায়!
তাই সেথা যেতে নাকি রাজন ভয়ে মরে,
তাই বুঝি সিবিআই দিল্লিতে রেখে ভাই,
রাজনে পুষতে চায় জামাইয়ের আদরে?


কাজী নজরুল ইসলাম
(কাণ্ডারী হুঁশিয়ার)

দুর্গম গিরি কান্তার মরু পেরিয়ে সিংগাপুর
রাজনকে যেথা ধরে সিবিআই সে দেশ বহুত দূর!
বলরে মিডিয়া কিভাবে হল এ রূপকথা বাস্তব?
এবার কি তবে দাউদকে ধরা হবে আজ সম্ভব।
ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছে কাসভ  জেহাদের জয়গান
জাতীয় জামাই হবার স্বপ্ন ভেঙ্গে তার খানখান,
দাউদের ভয়ে মুম্বাই ছেড়ে দিল্লিতে সে রাজন-
দেখি কতকাল জামাই আদরে কাটে তার দিনক্ষণ!!


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(এবার ফিরাও মোরে)

সংসারে সবাই যবে আখের গুছোতে নিজ রত
তুই সেথা সিবিআই দু:সাহসী বালকের মত
অতি দূরে সিংগাপুরে বলত কিভাবে ছুটে গেলি,
চৌর্য চূড়ামনি সেই রাজনেরে পাকড়াও করিলি
মিডিয়া দেখাও মোরে। এ কিভাবে হয়েছে সম্ভব
এবার কি তবে। দাউদ পড়িবে ধরা, কিভাবে ও কবে?
কোন পাকিস্তান মাঝে দাউদ রয়েছে বসে সুখে,
সেসব কি বলা যায়? জানোনা কি, মুম্বাই পুলিশ
দাউদের কেনা সবে? তার চেয়ে ললিপপ মুখে
দিল্লিতে ঘুমোও শুয়ে, জানি তুমি নওকো ফুলিশ।


যোগীন্দ্রনাথ সরকার 
(দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল)

গিয়ে বহুদুর সেই সিংগাপুর
পৌঁছিয়ে হেসে,
চোরাকারবারি ছোটো রাজনেরি
দুয়ারেতে এসে।
পাকড়াও করে লক আপেতে পুরে
দেখাই সবারে,
সিবিআই বলে এই ধরাতলে
কিছুতো আছে রে!
রোগে মৃতপ্রায় রাজন হেথায়
ধরা দিয়েছে যে,
তুই রে মিডিয়া সব বলি দিয়া
ফেলে দিলি লাজে!
জামাই আদরে পুষব তাহারে
দিল্লিতে রেখে,
পাবলিক জালি, দাউদকে কালই
ভুলে যাবে লোকে।


রূপচাঁদ পক্ষী
("Let me go ওরে দ্বারী")

লেট মি সে মিডিয়া ওরে
আই ওয়েন্ট টু সিংগাপুরে
গেছিলাম ইন্ডিয়া হতে
আমি সিবিআই টু মাচ ঘুরে।
সিটিং দেয়ার ইস্মল রাজন
স্টেইং বসে আর কতক্ষণ
আই অ্যাম অল স্মাগলারের যম,
রাজনকে আজ ফেলছি ধরে!
দাউদ ওদের সবারি হেড
পুলিশকে ঢের টাকাও হি পেড
ফর হুম মুম্বাই পিপ্‌ল্‌ ডেড,
দাউদ এবার যাবেই উড়ে।।


শক্তি চট্টোপাধ্যায়
(অবনী, বাড়ি আছো?)

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে সিঙ্গাপুর,
সিবিআই হাঁকে, তখন রাতদুপুর-
রাজন কি বাড়ি আছো?

ঝাঁ-চকচকে রাস্তা চারিধার
তবু এখানে অপরাধীরা ঘোরে,
ছোটা রাজন লুকিয়ে আছে হেথা
যে করে হোক, ধরতে হবে তারে।
ও রাজন, বাড়ি আছো?

দাউদ আছে কোথা পাকিস্তানে
রাজন নাকি সব খবরই জানে,
ধরে ব্যাটাকে দিল্লী নিয়ে গিয়ে
ভাল করে মোচড় দেব কানে।
রাজন হে, বাড়ি আছো??


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ।।
(সত্যবদ্ধ অভিমান)

এই হাত খেয়েছে কত শাসকদলের ঘুষ
আমি কি এ হাতে রাজনকে ধরতে পারি?
সিংগাপুরের সেই অভিশপ্ত হোটেলে
তার মুখে পড়েছিল পাঁচ সেল টর্চের আলো
মুহূর্তের মাঝে পড়েছিল হাতে হাতকড়া,
তখনি তাকে চার্টার্ড প্লেনে করে
নিয়ে যেতে চেয়েছি মুম্বাই।
সবে বলেছিল, রাজন ভুগছে রোগে
পলাতক অভিশপ্ত জীবনের থেকে বন্দীদশা ভাল
তাই সে দিয়েছে ধরা, সে যা খুশি বল
শুনতে তা বয়ে গেছে।
কি ভেবেছিলে মিডিয়া আমাকে?
এই হাত খেয়েছে কত শাসকদলের ঘুষ
এ হাতে কি সিবিআই রাজনকে ধরতে পারে!

মনে রেখো মিডিয়া, রাজনের মুখে
ফুটে উঠেছিল ভয়, মুম্বাইয়ের নামে,
সেখানে পুলিশ সবে দাউদের চর। যে হাতে তারা
খেয়েছে তার টাকা, সে হাতে কি তারা
দাউদকে ধরতে পারে? তাই আজ রাজনকে
দিল্লী নিয়ে যাব, সেখানে থাকবে সুখে জামাই আদরে।
যে হাত ধরেছে ছোটো রাজনকে, সে হাতে কি
সিবিআই আর ঘুষ নিতে পারে?!

(আপাততঃ অনেক হল, কবিদের ভুত বিদায় নিয়েছে- এবার জ্যান্ত কবিরাও আসতে পারেন।)

বালক সংগীত ।। স্মৃতিকথা

বালক সংগীত।।

(১)

'এই, দুগ্‌গামেলায় বালক-সংগীত হবেক,যাবি ত? লব-কুশ পালা।' সন্ধ্যের মুখে মিন্টুর ডাক শুনতে পেলাম বাড়ির পাঁচিলের ওপার থেকে। ছোট গ্রাম। কাউকে কিছু বলতে হলে একটু উচ্চস্বরে বললেই চলে, ঠিক তার কানে যাবে। তবে মুস্কিল হল গ্রামের প্রায় সবাই দরকার না থাকলেও শুনে ফেলবে সে কথা। নন্দকাকার খোঁজে এসেছেন এক ভদ্রলোক, গাঁয়ে ঢোকার আগেই সেজজ্যেঠি দিল তাকে তাড়িয়ে- 'এ বাবা, নন্দকে এখন কুথাকে পাবে, উ গেইছে হাঁসাপাথর, বিটির সম্বন্ধ কইরতে!' কে বলল? কেন, নন্দ নিজেই। যাবার সময় পাশের বাড়িতে ভাইকে ডাক দিয়ে বলে গেলেন না- 'দুলাল্যা রে, হাঁসাপাথরের সম্বন্ধট যদি লাগ্যে যায় কিছু টাকা ধার লিব তর কাছে।' ব্যস, গোটা গ্রামকে তা জানানো হয়ে গেল।
দূর, কি যে ধান ভানতে শিবের গাজন শুরু করে দিলাম! হচ্ছিল বালক সংগীতের কথা, সেটি যে কি বস্তু আমার ৬-৭ বছর বয়সের বিশাল অভিজ্ঞতায় তার কোনও ধারণাই ছিল না। তবে মিন্টু যাচ্ছে যখন তখন ভালই হবে। সে বড় নাক-উঁচু ছেলে। একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে আর ক্লাসে বছর বছর ফার্স্ট হয় বলে ও আমার সমকক্ষতা দাবী করে। অবশ্য আমি পড়ি তখন শহরের স্কুলে আর ফার্স্ট কাকে বলে তখনো ঠিক বুঝতাম না, সে খবর আর মিন্টু কিভাবে জানবে! তবে আমার ছুটি-ছাঁটায় গ্রামের বাড়িতে আসা অতি অবশ্য ছিল। না, আমি কিন্তু আত্মজীবনী লিখছি না। সে সময়ের গ্রাম্য জীবনযাত্রা আর সমাজ-সংস্কৃতিকে একটা বাচ্চা ছেলে কি চোখে দেখতে পারে, তাই জানাবার চেষ্টা করছি মাত্র। এর মধ্যে সত্যি আর কল্পনা মিলেমিশে জগাখিচুড়ি হয়ে আছে, সে জট ছাড়ানো আমারই কম্মো নয়, তাই পাঠক যেন তার চেষ্টাও না করেন।

আমার ভরসা ছিল মিন্টু যখন ডেকেছে ঠাকুমা শুনলে না করবেন না। দাদু ত খেয়ালই করবেন না। উনি তখন মানভূমের সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণাতেই ব্যস্ত। তাঁর কাজের মাঝে ডুবে থাকার ব্যাপারটা নিয়ে ভয়ানক সব কাণ্ড ঘটে গেছে। গ্রামে ছিল খুব বাঁদরের উপদ্রব। বিশাল বিশাল লেজওলা মুখপোড়া হনুমান। একবার এক হনুমানের পায়ের ঠোকর লেগে মস্ত একটা ইঁটের টুকরো ছাত থেকে পড়েছে ঠাকুমার মাথায়। রক্তারক্তি কাণ্ড। দাদু তখন উপরতলায় গবেষণা করছেন। ঠাকুমা চেঁচাচ্ছেন- 'ওগো শিগ্‌গির এসো, বাঁদরের কাণ্ড দেখে যাও, ইঁট ফেলে দিয়েছে মাথায়।' দাদু পুঁথি থেকে মুখ না তুলেই পালটা প্রশ্ন করলেন- 'কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড না লঙ্কাকাণ্ড? যত বাঁদরামো ঐ দুটোতেই পাবে।' ভাগ্যিস আমাদের বাড়িতে ভাড়াটে একজন ডাক্তারকাকু ছিলেন, তিনিই সে যাত্রা সামলান।

সেই দাদু যে হঠাৎ আমাকে ডেকে জিগ্যেস করবেন- 'দাদুভাই, সন্ধের মুখে গুটিগুটি চললে কোথায়?'- এরকমটা ভাবিনি। সত্যি বলছি, মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেছিলাম। সব শুনে তিনি বললেন, 'যেতে পার একটা শর্তে। কি দেখলে, কেমন দেখলে, কাল আমার কাছে লিখে আনবে।' আমি বাধ্য হয়ে ঘাড় নাড়তেই একটা সিকি দিলেন আমার হাতে- 'ওদেরকে চাঁদা দিও'।

আমার কাছে তখন একটা আস্ত সিকি মানে অনেক। ভাবছিলাম কি কি খাওয়া যায় তা দিয়ে। যাকগে, ঠাকুমার বাড়ানো দুধের বাটিটা কোনোমতে শেষ করেই ছুট দিয়েছি দুর্গামেলার দিকে, মিন্টুকে খুঁজে বের করে ওর পাশে গিয়ে বসেছি। ও বাবা, দেখি দাদু আগেভাগেই স্টেজের মাঝখানে একটা চেয়ার পেতে বসেছেন, সাথে সজলের দাদু আর আমাদের ডাক্তার কাকু। আর একজন থুত্থুরে বুড়োকে সবাই মিলে ধরাধরি করে স্টেজে নিয়ে বসাল, দাদু আবার তাঁকে প্রণামও করলেন। শুনলাম ইনিই নাকি ঝুমুরগানের বিখ্যাত কবি শ্রীপতি দত্ত, দাদুর মাস্টারমশাই। বালক সঙ্গীতের কর্মকর্তারা গ্রামের মাতব্বরদের দিব্যি মালা-টালা পরাল, তারপর ওঁরা স্টেজ থেকে নেমে এলেন। দাদুকে তারপর আর দেখতে পেলাম না, বোধহয় বাড়ি চলে গেলেন। হঠাৎ একটা বাঁশী আর হারমোনিয়ম বেজায় বেসুরে বেজে উঠল, বুঝলাম এবার পালা শুরু হবে।

(২)

জমকালো স্টেজের পেছনে আঁকা হয়েছে সীন- তমসা নদী বয়ে চলেছে, দূরে চিত্রকূট পাহাড় দেখা যাচ্ছে, তার একপাশে ঋষি বাল্মীকির আশ্রম। একমুখ পাকা দাড়ি নিয়ে বাল্মীকি যোগাসনে বসে আছেন, জানি খুব কষ্ট হয় ওভাবে একটানা বসে থাকতে- কিন্তু তিনি নির্বিকার। সীতা একটা বঁটি আর একটা বেগুন নিয়ে বসে আছেন, কিন্তু কুটছেন না- পরে ভেবে দেখেছিলাম ভালই করছেন, একবার কুটলেই তো ফুরিয়ে যাবে, অত বেগুন তিনি পাবেন কোথায়? দুটো বাচ্চা ছেলে, আমার থেকে কিছুটা বড়- বোঝা গেল ওরাই লব-কুশ, রামায়ণ গান গেয়ে শোনাচ্ছে। লক্ষ্মণের হাতে সূর্পনখার হেনস্থার গান শুনে সীতা তো হেসেই কুটিকুটি।
হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বাল্মীকি আর সীতা ভেতরে চলে গেলেন আর তাদের জায়গায় হুপ-হাপ করতে করতে ঢুকল হনুমান। এসেই সে লব-কুশকে ধমক দিয়ে বলল- 'এই ছোঁড়ারা, ঘোড়া কোথায় লুকিয়েছিস, ভালয় ভালয় দিয়ে দে বলছি। এমনভাবে বলছে, যেন হারিয়ে যাওয়া পানের ডিবে খুঁজছে। কিন্তু লব-কুশ মস্ত বীর, বলে- 'সাধ্য থাকে ত আমাদেরকে যুদ্ধে পরাজিত করে ঘোড়া নিয়ে যাও'। একটা বাচ্চা ছেলে বলে উঠল, 'বাবা, পরাজিত কে বটে?'- অন্য দর্শকরা 'চুপ চুপ' করে তাকে থামিয়ে দিল। তারপর লব-কুশ আর হনুমানে কি ভীষণ যুদ্ধ! যাচ্চলে, হনুমান ত হেরে গেল। দুই ভাই খুশীমনে তাকে স্টেজের মুখের কাছে একটা খুঁটিতে বাঁধতে যাচ্ছিল, তার আগে সে হাত দেখিয়ে 'উব্বু' চেয়ে নিল। তারপর স্টেজের ধারের হ্যাজাকটাতে কয়েকবার পাম্প করে এসে আবার ধরা দিল। হনুমানকে বাঁধা হতেই আমরা সবাই পটাপট হাততালি দিয়ে উঠলাম।

হনুমান কিন্তু এই হাততালিতে খুশি নয়। আমাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে কট্‌মটিয়ে বলল, ‘খুব তালি দিচ্ছ। কালকে লঙ্কা-দহন পালায় এমন পার্ট করব না, লব-কুশ কেন, রাম-লক্ষ্মণের দিকেও তাকাতে ভুলে যাবে। মিন্টু আমাকে একটা চিমটি কেটে বলে-‘ওরে, তবে কালকেও আসব’। অন্যদিকে মন চলে গেছিল, হঠাত দেখি লব-কুশ ‘মা খিদে পেয়েছে, খেতে দাও’ বলে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। ‘বাড়িতে চাল-ডাল নেই, একটিমাত্র বেগুন পড়ে আছে- খেতে দেব কি ছাই’- সীতার গলা শোনা যায় ব্যাকস্ক্রীনের আড়াল থেকে। ছেলেদুটো তাতে না দমেই বলল,’ঠিক আছে, আমরা ততক্ষণ কিছু ভিক্ষা করে নিয়ে আসি’ বলে স্টেজ ছেড়ে দর্শকদের মাঝে নেমে পড়ল। পালার দলের অধিকারী কোথা থেকে ছুটে এসে একটা বাটি ধরিয়ে দিয়ে গেল কুশের হাতে, ওরা তাই নিয়েই ‘ভিক্ষা দাও গো, পুরবাসী’ বলে গান গেয়ে পয়সা সংগ্রহ করতে শুরু করে দিল। সবাই দেখি পাঁচ-দশ নয়া পয়সা করে ঠুং-ঠাং ফেলছে বাটিতে। এ ত ভাল জ্বালা! দাদুর কানে যদি খবর যায় যে আমি কিছু দিইনি, তবে আর রক্ষা থাকবে না। অগত্যা আস্ত সিকিটা হাতছাড়া করতে হল।
তখনো পালার ব্রেক চলছে। আমি উঠে গিয়ে ড্রেসিংরুমের ধারে একটু উঁকি মেরে এলাম। দেখি আহা কি অপরূপ দৃশ্য! সীতা আর বাল্মীকি সেখানে বসে বিড়ি খাচ্ছে। আর একপাশে অধিকারী লব-কুশকে ধমক দিচ্ছে- ‘মাত্র চার টাকা তেরো আনা! এতে বালক সংগীত হয়? এবার থেকে আর লব-কুশ পালা নামাবই না।‘ লব মিনমিন করে বলল-‘এ গাঁয়ের লোকেরা কিপ্‌টে!’ ‘থাম তো’, অধিকারী ধমক দিয়ে বলল, ‘যেখানে শ্রীপতি দত্ত, ভোলু ঠাকুরের মত লোক থাকে তারা কিপ্‌টে নয়, ভাল জিনিষের কদর বোঝে। ঐ নাকি কান্না চলবে না, সত্যিকারের ভাল গান গাইতে হবে।‘ আমি মনে মনে ভাবলাম, এদেরকে একবার দাদুর কাছে নিয়ে গেলে কেমন হয়, দু-একটা ভাল ঝুমুর তো শিখতে পারত। এদিকে সীতা বাল্মীকিকে তাড়া দিচ্ছে- ‘চাঁড়ে বিড়িট ফুঁকে লে- ঘন্টি বাজছে।‘ সাথে সাথে ওরা বিড়ি ফেলে ছুটলো। আমিও ফিরে এলাম নিজের জায়গায়।

তারপর হনুমানকে দেখে সীতার দুই ছেলেকে খানিক ধমক-ধামক চলল। রাম-লক্ষ্মণের সাথে লব-কুশের যুদ্ধও খুব জমেছিল। এরপর বাল্মীকির মধ্যস্থতায় ঘোড়া নিয়ে রাম-লক্ষ্মণের ফিরে যাওয়ার কথা, কিন্তু কোথায় ঘোড়া? একটা রং-চটা কাঠের ঘোড়া নিয়ে ওরা ফিরে গেল দেখে একটু হতাশই হলাম। তবে শেষ দৃশ্যে সীতার পাতাল প্রবেশটা দারুন জমেছিল। অভিনবত্ব আনতে সীতা পা দুটো রামচন্দ্রের সিংহাসনের পাশ দিয়ে সীনের তলায় ঢুকিয়ে দিলেন আর পেছন থেকে কারা যেন ওনাকে পেছনে টেনে নিল। তবে হল কি, আস্ত সীতাটা ধীরে ধীরে ড্রপসীনের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেও মাথার চুলটা কিন্তু স্টেজেই পড়ে রইল। হনুমান বুদ্ধি করে ওটা কুড়িয়ে নিয়ে উইংসের আড়ালে চলে গেল।

যাক, পালা তো শেষ, তবে এবার শুরু হল আসল ঝামেলা। দাদু রোজই মনে করাতে থাকেন- ‘ভাইটু, কই কি লিখলে দেখাও।‘ আমি অগত্যা পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। একদিন বন্ধুদের সাথে দাঁদার জঙ্গলে গিয়ে অনেক লাল লাল টোপাকুল খেয়ে এসে খুসখুসে কাশি বাধালাম। ভালই হল, কয়েকদিন নিশ্চিন্তি।

(৩)

আমাদের গ্রামের ছেলে হারাধন বা হারা আমার থেকে বছর তিনেকের বড় হবে, চাসরোডের কাছে বড়গ্রামে থেকে পড়াশোনা করত। ওর ঠাকুমা আর মা-মরা মাসতুতো ভাই ডুডুন এই গ্রামে থাকত বলে প্রতি ছুটিতেই হারা গ্রামে এসে হাজির হত। কি অনুষ্ঠানে মনে নেই একবার গ্রামে এসে ওর সখের ভিখারির দল নিয়ে মাধুকরীতে বেরিয়ে পড়ল। চেলা-চামুণ্ডাদের নিয়ে বাড়ি-বাড়ি চলল ভিক্ষা চাওয়া আর সাথে ওর মিষ্টি গলায় গান-

'‘বিদায় দে গো শচীমাতা আমি সন্ন্যাসেতে যাই,
আমি এইত ভিক্ষা চাই।
পরের মা-কে মা বলিব, পরের দ্বারে ভিক্ষা নিব
যখন যাহা পাই।
তুমি মনেরে বুঝাইয়া রাখ্যো গো,
তোমার নিমাই নাই।।‘'

কতযে গান হারার স্টকে থাকত! ওর প্রিয় গান যার হরিবোলের সাথে খুব নাচ জমত-

"হরিবোল হরিবোল নাম এই বদনে বোল রে।
এই বদনে বোল হরিনাম এই শ্রবণে শোন রে।।
হরিনামের লাগি মহাদেব হলেন যোগী-
ওরে শ্মশানে মশানে ঘোরে হইয়া পাগল রে।।"

আমিও গ্রামে থাকলে বিনা আমন্ত্রণেই হারার দলের সাথে সাথে ঘুরতাম গ্রামের পথে পথে, গলিতে গলিতে। অবশ্য ওর গলার সাথে গলা মেলাতে কখনও সাহস হত না। দেখতাম কাকী-জ্যেঠি-বউদিরা চাল-ডাল, বাগানের ফল-মূল-তরকারি ঢেলে দিচ্ছে হারার ঝোলাতে, গান শুনে সবারই চোখে জল। আমার যে হিংসে হতনা তা নয়, তবে বেলা দুটো নাগাদ জোড়ের ধারের মাঠে ডুডুন আর ঝাবুকাকার ছেলে তরুন মিলে যা খিচুড়ি-লাবড়া রান্না করত তা খাবার পর মনে আর কোনও ক্ষোভ বা খেদ থাকত না। আশ্চর্য হতাম, আমার ওইটুকু বয়সের বোহেমিয়ানা দেখেও ঠাকুমা-দাদু কিছু বলতেন না, শুধু চাইতেন যেন আমি সন্ধ্যের আগে ঘরে ফিরে আসি।

এই হারার কথাতেই মনে পড়ল, দুবছর আগে দুর্গাপূজোর মুখে গ্রামের সব ছেলেরা এসে আমার দাদুকে ধরেছে একটা নাটক মঞ্চস্থ করার জন্যে। দাদু তখন পুরুলিয়ার ওকালতি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে গ্রামে বাস করতে চলে এসেছেন, এবার ত উনি সময় দিতেই পারেন। দুলালকাকু দাদুর মহাবীর কর্ণকে নিয়ে লেখা নাটক ‘দানবীর’ পড়ে উচ্ছ্বসিত, বলে ‘জ্যেঠাবাবু উটোই করান’। দাদু বললেন, ‘নাটক ত বাংলাভাষায় লেখা। ‘উটো’-বললে ত চলবে না, ‘ওটা’ বলতে হবে'। তবে উনি বললেন, দুর্গাপূজার মধ্যে হবেনা, সময় কোথায়? হ্যাঁ, চেষ্টা করলে কালীপূজায় নামানো যেতে পারে। সবাই তাতেই খুশী। তবে বুড়ো সতীশদাদু কাশতে কাশতে বললেন- ‘ভোলু গাঁয়ের ছেল্যাগুলার মাথা খাছ্যে, ইটো ভাল লয়’। তা কে আর উনাকে পাত্তা দেয়! এই দানবীরে দুটি মেয়ে চাই, কর্ণের মহিষী পদ্মাবতী আর লক্ষ্মীঠাকুর। তখন গাঁয়ে-ঘরে মেয়েদের অভিনয় করার রেওয়াজ ছিল না, অগত্যা নারুদা লক্ষ্মী আর পরাণদা পদ্মা করতে রাজী হয়ে গেল। কয়েকটি বাচ্চাও পাওয়া গেল। কিন্তু কর্ণপুত্র বৃষকেতু পাওয়া যাচ্ছে না। সেই সময় হারা এসেছে ছুটিতে। বয়স একটু বেশি হলেও হাইট ছোট, সুন্দর চোখমুখ আর রিনরিনে মিষ্টি গলার জন্যে দাদুর ওকে খুব পছন্দ হয়ে গেল। কিন্তু হারার বাবার ওর স্কুল কামাই পছন্দ নয় মোটেই। নিশীথদা বললেন, ‘লে লে, কেলাস থিরির আবার পড়া! উ আমিই পঢ়াঞ দিব’। নিশীথদা নারায়ণ সাজছে, ওর কথা ফেলনা নয়। আর হারার বুড়ি ঠাকুমা তো ওকে কাছে রাখতে পারলে আর কিছুই চায় না। কাজেই হারা বৃষকেতু হয়ে থেকে গেল। আমিও কালীপূজোর আগে গ্রামে এসে দেখি পালা জমে উঠেছে। আমাদের উঠোনে রোজ রিহার্সেল হচ্ছে। তবে আমার সবচেয়ে ভাল লাগল আমার বাহাত্তুরে দাদুর উৎসাহ আর উদ্দীপনা দেখে, যেন হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছেন। মুখুজ্যেদের দুলাল মস্ত কন্ট্রাক্টার, ওনার দৌলতে হ্যাজাকও (আমরা বলতাম ডে-লাইট) জুটে গেল। রিহার্সেল চলতে লাগল পুরোদমে।

(৪)

‘দানবীর’ মহাভারতের বিতর্কিত চরিত্র সূতপুত্র কর্ণকে নিয়ে একটা পৌরাণিক নাটক, যার মধ্যে আখ্যানভাগ কম আর লেখকের কল্পনাই বেশি ছিল। বন্ধু দুর্যোধনের কাছে অঙ্গরাজ্য উপহার পেয়ে রাজা হয়েছেন কর্ণ, কিন্তু দরিদ্র সারথির ছেলে বলে তিনি মানুষের দুঃখ বোঝেন। তাই প্রতিজ্ঞা করেছেন যে তাঁর দরবারে কোনও প্রার্থীকে তিনি বিমুখ করবেন না, নিজের সর্বস্ব দিয়েও তার চাহিদা মেটাবেন। এদিকে দেবর্ষি নারদ ত হাঙ্গামা বাধাবার জন্যে মুখিয়েই আছেন। তাঁর ধারণা, মানুষের ধন থাকলে সে দান করতেই পারে, তাতেই কি প্রকৃত দাতা বা দানবীর হওয়া যায়। বৈকুণ্ঠে গিয়ে তিনি আবদার রাখলেন নারায়ণের কাছে যে কর্ণ প্রকৃত বা আদর্শ দাতা কিনা তার বিচার করতে হবে। ভক্তের ইচ্ছাপূরণ করতে অগত্যা নারায়ণ চললেন মর্তে। লক্ষ্মী আর একা একা বসে কি করবেন, তিনিও পিছে পিছে নেমে এলেন।

তারপর হল কর্ণের আসল পরীক্ষা। এক বুড়ো বামুন একদিন রাজা কর্ণের কাছে এসে ইচ্ছেমত ভালমন্দ কিছু খাবার খেতে চাইলেন। তার আগে আবার তামা-তুলসী দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেন যে তিনি যা খেতে চাইবেন আর যেমনভাবে চাইবেন ঠিক তেমনভাবেই যেন তাঁকে খাওয়ানো হয়। রাজা প্রতিজ্ঞা করতেই তিনি বললেন তিনি নরমাংস খেতে চান। অতএব রাজা-রানী মিলে যেন তাঁদের শিশুপুত্র বৃষকেতুকে বলি দিয়ে তার মাংস রান্না করে খাওয়ান। রাজা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। রাজধানীতে কান্নার রোল উঠল। কিন্তু কর্ণ তাঁর প্রতিজ্ঞা রাখলেন। শেষে অনেক মেলোড্রামা ঘটল, দেখা গেল রাজপুত্র পাঠশালার মাঠে অন্য ছেলেদের সাথে খেলা করছে। সবাই বুঝতে পারল যে ওই বুড়োলোকটিই নারায়ণ, একটা পাগলি কোথা থেকে এসে পড়েছিল- তাকে নিয়ে ছেলেরা খেপাত, তিনিই ছিলেন লক্ষ্মী। শেষ পর্বে লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগলমিলনের দৃশ্য দিয়ে পালা শেষ হয়।

এখানে রাজার বয়স্য মদনমিশ্রের রোলে ছিলেন গগনকাকু, হাসিয়ে মাত করে দিতেন। তাই দেখে দাদু ওনাকে পাঠশালার গুরুমশায়ের রোলটাও করতে দিলেন। সেখানে আরো মজা। গুরু প্রস্ফুটিত বানান করতে দিয়েছেন গোবিন্দকে। সে মাথা চুলকে বলল- প’য়ে র-ফলা-অস্‌- তাতে একটা ফুটি আর ত। গুরুমশাই রেগে উঠে বৃষকেতুকে জিগ্যেস করতেই সে ঠিক বানান বলে দিল। ‘দেখলি ত, একটা পাঁচ বছরের বাচ্চাও জানে, আর তুই পারলি না’-তার জবাবে গোবিন্দ বলে-‘ওযে রাজার বাড়ির ইঁদুর, শুওরের চাইতেও বড়’!

এদিকে কালীপূজোর দুদিন আগে বাবাও এসে পড়েছেন সিন্দ্রি থেকে। ফ্যাক্টরিতে পাওয়া একটা সেফটি শু পায়ে বড় হয়েছিল, কিন্তু ছোট সাইজ স্টকে ছিল না বলে ওটা নিয়ে এসেছেন, যদি কারও কাজে লাগে। কর্ণের লম্বা-চওড়া চেহারা, পায়ে ফিট করে গেল, উনি বাড়ি নিয়ে গেলেন। তাই দেখে নিশীথদার কি রাগ! ‘দুলাল জুতা পাবেক ক্যানে? উ যদি রাজা হয় আমিও নারায়ণ বটি’। অনেক কষ্টে তাঁকে ঠান্ডা করা হল। পালা কিন্তু জমেছিল। আমি স্টেজের একধারে দাদুর সাথে বসে নাটক দেখলাম মনের আনন্দে। একটু আধটু ঝামেলা যে হয়নি তা নয়। বৃষকেতুকে কর্ণ আর পদ্মাবতী মিলে কাটল, বুড়ো বামুনকে খাওয়াবার প্রতিজ্ঞা করেছেন বলে। কাটার অ্যাকটিং করার পরে কথা ছিল লাইট কমে যাবে আর সেই ফাঁকে বৃষকেতু পালাবে। কিন্তু লাইটম্যান সময়ে গেছে সব ভুলে। হঠাৎ দর্শকদের মধ্যে বাচ্চার দলের চিৎকার শোনা গেল- ‘হারা পালাল রে, হারা মরে নাই- হা ভাল, ঐ তো পালাল।‘ কি কাণ্ড। তবে পালা শেষ হবার পর সবার হাততালিতে বোঝা গেল নাটক সত্যি সবাই বুঝেছে আর সবার ভালও লেগেছে।

(৫)

নাটকের অসামান্য সাফল্যের পর দাদুর নিজের লেখা ও সুর বসানো ‘দানবীর’এর গানগুলো গ্রামের ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। দুটো গান তার এখনও কিছুটা মনে আছে, কথাগুলো সেকেলে হলেও নাটকও ত একালের নয়! তার একটা হল কর্ণের রাজসভার বন্দনা গান-

“তুমি ভারত-গগনে তরুণারুণ নবোদিত গরিমায়,
বিতরিছ কৃপা-করুণাচ্ছটা তব নিজ মহিমায়।।
আছ মন্দ্রিত যথা অতল বারিধি দূর দিগন্ত চুমি
আছ গম্ভীর যথা অটল-শৃঙ্গ পরশি স্বর্গভূমি,
তুমি অম্বর সম উদার মহান,
প্রেমে বিগলিত তটিনী সমান-
তুমি ভাস্বর যেন ধ্রুবজ্যোতিসম ঘনঘোর তমসায়।
মোদের জড়িত কণ্ঠ তব জয়গান ব্যাকুলি গাহিতে চায়,
ভাষা না মিলে যে তায়-
আশা না মিটে যে তায়।।“

আর একটা ছিল শেষ গান, লক্ষ্মী-নারায়ণের স্তব-

“এস এস সুন্দর, যুগল-মূরতি ধর, নব নটবর নবরঙ্গে
চাঁচর-চিকুর কেশে রঞ্জিত মৃদু হেসে, বঙ্কিম নয়ন ভ্রূভঙ্গে।।
এস হে প্রবীন এস, হে চির নবীন এস, বাহুপাশে বাঁধা রাধা সঙ্গে-
মধুর মূরলী-স্বর, জরজর অন্তর, অঙ্গ জড়িত দোঁহা অঙ্গে।।...“

গানগুলোর মধ্যে বেশ একটা রজনীকান্ত-রজনীকান্ত ভাব ছিল, এখন বেশ বুঝতে পারি, তাই বোধহয় ওগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।

কিন্তু এসব কি? স্বপ্ন, না কল্পনা, না গতজন্মের কাহিনী, কে জানে? মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, এসব কি সত্যিই ঘটেছিল!

না, দাদু যে তখনও ধরাছোঁয়ার মধ্যেই ছিলেন, তা তাঁর ডাকে চিন্তার ঘোর ভাঙ্গতেই টের পেতাম, ‘ভাইটু কই, কি লিখলে, দেখালে না তো!’ সর্বনাশ! বালক সংগীত আমি ভুলে গেলেও দাদু ভোলেন নি দেখছি। বুঝলাম আর পালিয়ে বেড়ানো যাবে না, অগত্যা ‘বালক-সংগীতে লব-কুশের গল্প’ নামে একটা কিছু কোনওমতে খাতায় লিখে তাঁকে ভয়ে ভয়ে গিয়ে দেখালাম। দাদু খুশি হয়ে দু-চারজনকে ডেকে দেখালেনও সে হাস্যকর লেখাটা, কিন্তু আমার তখন যে লজ্জায় ছুটে পালাতে ইচ্ছে করত। দাদুর ঐ একটা দোষ ছিল। আমাদের তখন বিহারের স্কুলে হিন্দীও পড়তে হত। বাড়িতে একটু শিক্ষিত লোক বা হিন্দীভাষী কেউ এলেই- ‘ভাইটু’ বলে ডাক দিতেন দাদু। এবার লজ্জার মাথা খেয়ে তাদেরকে শোনাতে হত আবৃত্তি করে-
“হুয়া সবেরা, হুয়া সবেরা,
অব তো ভাগা দূর অন্ধেরা।
ছোড় ঘোঁসলা পঞ্ছী ভাগে,
যো সোয়ে থে, ওয়ে সব জাগে।......”

কাঁহাতক আর এ ভালবাসার অত্যাচার ভাল লাগে? তাই সুযোগ পেলেই একছুটে পালাতাম শক্তিদাদুর দোকানে, দোকান-দোকান খেলতে হত না, সত্যিকারের মুদী হয়ে চাল-ডাল-নুন তেল বিক্রি করতে তাঁকে সাহায্য করতাম- অর্থাৎ সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার করে দিতাম দোকান ঘর। তাও যে শক্তিদাদু বা তাঁর স্ত্রী ভক্তিঠাম্মা আমাকে কিছু বলতেন না, উপরন্তু কেন আরও বেশী করে ভালবাসতেন, তা আমার মাথায় তখন কিছুতেই ঢুকত না। হ্যাঁ আজ বুঝতে পারি, নিঃসন্তান দম্পতির বুকের ফাঁকা যায়গার ব্যথা কিসে জুড়োত। তাঁরা দুজনেই বহুকাল গত হয়েছেন, তাই সে কথা আজ না হয় থাক।

(৬)

শক্তিদাদু আর তাঁর সামনের বাড়ির নিতাইজ্যেঠুর মধ্যে সম্বন্ধ ছিল আদায়-কাঁচকলায়। নিতাইজ্যেঠুরও ছিল মুদীর দোকান আর সেই দোকানের পাশ দিয়েই যেতে হত শক্তিদাদুর বাড়ি। দেখতে পেলে নিতাইজ্যেঠুও ছাড়তেন না, ডাকাডাকি শুরু করে দিতেন। কিন্তু ওনার দোকানে তামাক থাকত বলে আমি পারতপক্ষে ঢুকতাম না। তবে দোকান ছাড়িয়েই ছিল বাড়ির উঠোন দরজা, সেখানে কিন্তু আমার ছিল অবারিত দ্বার। নিতাইজ্যেঠুর ছোট ছেলে রণু ছিল আমার বন্ধু, যাকে আজকাল আমরা বলি বেস্ট ফ্রেণ্ড। বাড়িতে লোক আসছে দেখতে পেয়েছি, এইবার হয়ত ডাক পড়বে কবিতা শোনানোর জন্যে। আমি কিন্তু ততক্ষণে পগার পার, হয় শক্তিদাদুর দোকানে গুড় ওজন করছি কিংবা রণু আর ওর কাকার মেয়ে ঝুনুর সাথে ক্যারাম বা অন্য কিছু খেলছি।

হ্যাঁ, টানা টানা চোখ নাক, সুন্দর আকর্ষণীয় চেহারা ছিল রণুর। আজও ওর চেহারাটা মনে না করতে পারলে ‘ডাকঘর’এর অমল বা ‘পথের পাঁচালী’র অপুর কথা ভাবি। তবে ওদের বাড়ি ঘন ঘন ছুটে যাওয়ার মূল কারণ কি ছিল রণু না ঝুনু তা কিছুতেই ঠিক করতে পারতাম না। ঝুনু ছিল খুব মিষ্টি মেয়ে আর পাকা কথার ঝুড়ি। আবার যেদিন ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখতাম রণু নেই, একা ঝুনু, সেদিন কিন্তু ওর মুখ থেকে কথা টেনেও বের করা যেত না। ওর এই দুর্বোধ্য আচরণের কারণ আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না। এখন ভাবি, মেয়েদের কি বিধাতাপুরুষ একটা বিশেষ অনুভূতি দিয়েই মর্তে পাঠান?

একদিন কথায় কথায় দানবীরের গল্প হচ্ছিল, কি আশ্চর্য, রণু গ্রামে থেকেও নাটক দেখে নি। আমি বলি, বলত,
‘কর কিরে পাজী বেটা নচ্ছাড় নিষ্ঠুর তা,
মেষ বৃষ ছাগ যাহা, তুমিও যেন তা’
কথাটার মানে কি? ও বলতে পারল না। আমি বোঝালাম, দানবীরে গুরুমশায় পড়াচ্ছেন আর একটা ছেলে তার উচ্চারণটা ওভাবে করছে। আসল কবিতাটা ছিল-
‘কর কৃপা জীবে টান, ছাড় নিষ্ঠুরতা,
মেষ বৃষ ছাগ যাহা তুমিও জেনো তা।‘
রণু-ঝুনু তাই শুনে ত হেসে আকুল। রণু বলে, ‘দেখিস আমি যখন স্কুলে ভর্তি হব, কক্‌খনও ওরকম ভুলভাল উচ্চারণ করব না’। বলেই হঠাৎ সে গম্ভীর হয়ে গেল। সেদিন আর খেলা জমলই না।

তখনই ব্যাপারটা খেয়াল করলাম আর সত্যিই আশ্চর্য হলাম ভেবে, তাইত আমার বয়সী হয়েও রণু কখনও ত স্কুলে যেত না। গ্রামে অনেকেই দেরীতে লেখাপড়া শুরু করে বটে, তবে সেটা ব্রাহ্মণ-কায়স্থদের বাড়িতে হবার জো ছিল না। এমনকি ওর থেকে প্রায় বছরখানেকের ছোট ঝুনুও স্কুল যেত। জ্যেঠিকে জিগ্যেস করলে উত্তর পেতাম,’ওর শরীরটা ভাল নেই তো, সুস্থ হয়ে উঠলেই স্কুল যাবে। একদিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখি আমাদের ভাড়াটে ডাক্তারকাকুর বারান্দায় বসে নিতাইজ্যেঠু রণুকে নিয়ে। ওনার মুখ গম্ভীর থমথমে দেখে আমি ভয়ে কিছু জিগ্যেস করতে পারলাম না। আর রণুই বা কিরকম? এত গরমেও বসে আছে একটা চাদর-মুড়ি দিয়ে।

পরদিন রণুদের বাসায় গিয়ে ওকে পেলাম না, শুনলাম কলকাতা গেছে বাবার সাথে। আমার খুব রাগ হল। আমি কিনা স্কুল ছুটি হতেই চলে এসেছি মা-বাবাকে ছেড়ে রণুর সাথে খেলব বলে, আর উনি মনের আনন্দে কলকাতা ঘুরে বেড়াচ্ছেন! ঝুনু অনেক ডাকাডাকি করছিল, কিন্তু আমি ওর দিকে ভাল করে না তাকিয়েই রেগেমেগে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম সেদিন।

একসপ্তাহ পরে নিতাইজ্যেঠু একাই ফিরে এলেন কলকাতা থেকে। শুনলাম, রণু আর ফিরবে না। ওর লিউকোমিয়া হয়েছিল। কলকাতা থেকে নাকি স্বর্গের ট্রেন ছাড়ে, ওর বাবা ওকে সেই ট্রেনে বসিয়ে দিয়ে এসেছেন।

আর লেখা যাচ্ছে না। দাদুরও বয়স হচ্ছে, নানা রোগ-বালাই লেগেই আছে। বাবা একদিন প্রায় জোর করেই দাদু-ঠাকুমাকে নিয়ে এলেন গ্রাম থেকে। আমিও পড়াশুনার চাপে বা অন্য যে কারণেই হোক, গ্রামে আসা-যাওয়া কমিয়ে দিলাম। পারতাম না। নিতাইজ্যেঠুর বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে গেলেই কেবলই মনে হত দুটো বড় বড় চোখ যেন ইশারায় ডাকছে। বালক সংগীতের পালা শেষ করে হঠাৎ যেন আমি বড় হয়ে গেলাম।

(শেষ)

Monday, December 28, 2015

Jachchhetai-3

যাচ্ছেতাই।।
(৩)

আমি, সুজয় আর কানু তিনজনে একত্রে আড্ডায় বসলেই কিভাবে জানি না কিছুক্ষণের মধ্যেই আড্ডা অবধারিতভাবে বিশুমামার প্রসঙ্গে মোড় নিত। সেদিন এমনি বসে আছি যাদবের চা-এর দোকানে, কানুর হাতে একটা ট্রানজিস্টার রেডিও। খবর পেয়েছি একটা বাস দুর্ঘটনায় বিশুমামা গুরুতর আহত হয়েছেন। 'খবরটা কি এইমাত্র রেডিওতে জানান হল- ওটা নিয়ে মুখ গোমড়া করে বসে আছিস যে!'- সুজয়ের প্রশ্নে কানু গোমড়া-মুখেই হেসে ফেলল।
-না রে, অত ফেমাসও নয় আমাদের বিশুমামা। তবে বছর দশেক আগে এই রেডিওতেই ওর সাথে আমাদের ভালভাবে পরিচয় হবার কথা ছিল।
- গল্পটা কি রে সলিল, সুজয় জিগ্যেস করল। ও পরে এসেছে পাড়ায়, বিশুমামার গোড়ার দিকের গল্পগুলো তেমন জানে না।
- কি আর, বিশুমামা তখন বিশ্বভারতী সংগীতভবনে শেখে। একদিন একটা পোস্টকার্ড এল মায়ের কাছে-'দিদি, অমুক তারিখে সন্ধ্যে আটটায় আমাদের একটা প্রোগ্রাম দেবে কলকাতা-ক থেকে, শান্তিদেবের পরিচালনায়। গানের দলে আমিও আছি, পারলে শুনিস। তারপর নির্দিষ্ট দিনে আমরা রেডিও খুলে বসে আছি, কোনও অনুষ্ঠানই নেই। গুলবাজ বলে তখন ইতিমধ্যেই একটু খ্যাতি ছড়িয়েছে বিশুমামার, সেটাই কায়েম হয়ে গেল বলে মনে হচ্ছে। তখন রেডিও সবার বাড়িতে থাকত না, অনেকেই ভীড় করেছেন আমাদের বাসায়। সবাই মিলে মামার পিণ্ডি চটকানো হচ্ছে, এমন সময় সুশীলকাকুর প্রবেশ। ঢুকেই বলেন, 'উঃ, কি গলা হয়েছে রে আমাদের বিশুর, শান্তিদেবকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে, এমন হেঁড়ে। তবে অনুষ্ঠান কিন্তু জমেছিল।' এদিকে আমরা সবাই অবাক। জিগ্যেস করলাম 'কাকু, আমরা তো তাই শুনতেই বসে আছি, কই হল, কখন?' জানা গেল ওটা সকাল আটটায় হয়ে গেছে। তখন রেডিওতে সব প্রোগ্রাম লাইভ হত, আর রিপিট হওয়ার ত প্রশ্নই ছিল না।

সত্যই তখন বিশুমামা বাড়িতে এলে উৎসব লেগে যেত। রবিবার হলে বাবা চলে যেতেন মাংস আনতে। দাদু বারান্দায় বসে আছেন, বিশুমামা তাঁকে গিয়ে প্রণাম করত। সেখানে মামার আবার অন্য রূপ। আমার দাদু ছিলেন সর্বশাস্ত্রে পণ্ডিত, কিন্তু খুবই কম কথা বলতেন। আমরা অবাক হয়ে দেখতাম বিশুমামা এলে দাদুও কেমন উচ্ছল, প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন। নানারকমের প্রশ্ন করতেন মামা।
- মেসোমশাই, টপ্পা নিয়ে একদিন আমাদের খুব তর্ক হচ্ছিল। টপ্পা নামটা কিভাবে এল একটু বোঝাবেন?
- ঘোড়া যখন ছোটে, তার পায়ের 'টপ-টপ' শব্দ অস্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর বা তার উল্টোটা যেমন হয়, মূলতঃ পাঞ্জাবের এই গায়ন-রীতিতে গমক ও বিস্তারগুলো তালের সাথে সংগতি রেখে সেভাবেই ছুটে চলে বলে একে টপ্পা বলে ।
- তাহলে টপ্পায় তাল থাকে? কিন্তু টপ্পা-অঙ্গের রবীন্দ্রসংগীত তো কেউ তালে গান না!
- টপ্পার তাল বেশিরভাগই মধ্যমান বা আড়াঠেকা হয়। কেন, দিনু ঠাকুর, শান্তিদেব, রাজেশ্বরী, কানা কেষ্ট- এঁরা তো তালেই টপ্পা গাইতেন। তবে রবি ঠাকুর শেষ বয়েসে টপ্পা-জাতীয় গান বিনা তবলাসংগতে গাইতে স্বচ্ছন্দ-বোধ করতেন, সেই থেকেই বোধহয় রীতিটা চালু হল। তাছাড়া টপ্পা ও টপ-খেয়াল তালে গাওয়া খুব কঠিনও বটে।
- টপ্পা পঞ্জাবী গান বলছেন, তাকে বাংলায় আমদানী করলেন কি রবীন্দ্রনাথ?
- তোমার কাছে এ প্রশ্ন আশা করিনি বিশু। নিধুবাবু বা রামনিধি গুপ্তই প্রথম বাংলায় টপ্পা লেখেন ১৭৮০ সাল নাগাদ। তাঁর বানীই ছিল-'নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা?'

বলা বাহুল্য, এ সংলাপের অধিকাংশই তখনও বুঝবার বয়স আমার হয়নি। তাই যতশীগ্‌গির সম্ভব মামাকে দাদুর কবল থেকে ছাড়িয়ে আমরা দখল করে বসাতাম। শুরু হত গান নিয়ে গান গান খেলা। 'ওরে ওরে আমার মন মেতেছে', 'ভালমানুষ নইরে মোরা', 'বেড়াল কয় মাছ খাবো না', 'আমার হরিনামে রুচি- কারণ পরিনামে লুচি' - মামার এসব গানের সাথে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়তাম।

- কি হল, কোথায় হারিয়ে গেলি আবার? কি হয়েছে বিশুমামার, খুলে বলবি? বেঁচে আছে তো?
- মামার একটা দোষ আছে, যাকে তাকে যা তা কথা দিয়ে বসার। এক ছাত্রীর আকাশবাণীতে অডিশান ছিল। ছাত্রীর বাবাকে জব্বর এক আশ্বাস দিয়ে বসেছে বিশুমামা- 'আরে ভাববেন না, দ্বিজেনদাকে বলা আছে, অডিশানের দিনে সন্তোষ সেনগুপ্তকে একটা চিঠি দিয়ে দেব, সব ঠিক হয়ে যাবে।' গতকাল মেয়েটার বাবা চিঠি আনতে রানীগঞ্জ থেকে দুর্গাপুর আসছেন আর মামা তাঁকে দেখতে পেয়েই অন্য একটা চলন্ত বাসে উঠে পালাতে গেছে।
- তারপর?
- তারপর সে এক কাণ্ড, স্লিপ করে পড়ে বাসের পেছনের চাকায় কোমরে ধাক্কা লেগে সাংঘাতিক অবস্থা। আজ সকালে দুর্গাপুর স্টীলের হাসপাতালে একটা অপারেশন হওয়ার কথা।

মামা পরে বেঁচে ওঠেন ঠিকই, তবে প্যানক্রিয়াসে আর ইউরেথ্রাতে একটা স্থায়ী বিকৃতি থেকে যায়। হারিয়ে যায় বিশুমামার সেই নায়কোচিত চেহারা আর গুল দেওয়ার সেই স্বতঃস্ফুর্ত ক্ষমতা।

Saturday, December 5, 2015

বাংলা ছোটগল্প- হা ঈশ্বর

হা ঈশ্বর ।।
(সব চরিত্র কাল্পনিক)



-‘বাবা, দেখেছ আজকের নবজীবন টাইমসে ডাঃ গোডবোলের লেখাটা? লিখেছেন, ‘হে ঈশ্বর, আমার অপরাধ নিয়ো না। যদি তুমি থেকেই থাক কোথাও, আমার এ বিদ্যে-বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার-বিবেচনা সব তোমারই দান। সেই বিদ্যে-বুদ্ধি দিয়ে আমি তোমার অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে পারছি না, সে অক্ষমতার দায় কিন্তু তোমার।‘ একেবারে নতুন ধরণের কথা, তাই না?’

সদ্য জার্নালিজমে দীক্ষিত মেয়ের সঙ্গে ভাল তর্ক করতে পারেন না বরোদার অবধেশ মন্দিরের পুরোহিত প্রধান কৈলাশপতি ত্রিবেদী। তাই তিনি সোজা কথা বলে দিলেন- ‘পিপীলিকা পক্ষ ধরে মরিবার তরে। এই ঔদ্ধত্যের শাস্তি ঈশ্বরই তাকে দেবেন।‘
-‘বাবা, কথাটা কিন্তু ওরিজিনালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাঁর ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসের নাস্তিক নায়কের উক্তি। তবে একটা কথা, ডাঃ গোডবোলে কিন্তু নাস্তিক নন। তিনি ঈশ্বর মানেন। কিন্তু মানেন না দেবতা, স্বর্গ-নরক, পুনর্জন্ম, পাপ-পুণ্য বা এ বিষয়ে বেদ-উপনিষদে যা বলা হয়েছে সে সব। তিনি কলকাতার বিখ্যাত দার্শনিক ডাঃ সুকুমারী ভট্টাচার্যের ছাত্র ছিলেন। তাই মনে করেন যে বেদ-বেদান্তে যে অসংখ্য দেবতার বর্ণনা আর যজ্ঞ-প্রণালীর বর্ণনা আছে তা মানুষের খাদ্য ও অন্যান্য জাগতিক সমস্যা বা সৃষ্টি রহস্যের একটা কাল্পনিক সমাধান।’
-‘দেখো মা, দর্শন-টর্শন আমিও একটু-আধটু পড়েছি। শঙ্করের অদ্বৈতবাদের আমি বিরোধী নই। তবে ঐ নাস্তিক বাঙ্গালিগুলোর সাথে থেকে একজন মারাঠা ব্রাহ্মণের মতিচ্ছন্ন হবে একথাও মেনে নেওয়া যায় না।‘
-‘কিন্তু বাবা, উনি প্রতিটি কথার যুক্তি দিয়ে...'
- ‘থামো’, এবার গর্জে উঠলেন কৈলাশপতি। ‘ওই বিধর্মীগুলোকে আমার জানতে বাকি নেই। জানো, টেগোর ব্রাহ্ম ছিলেন আর সুকুমারী খৃষ্টান? ওরা তো সনাতন ধর্মের কুৎসা করবেই। তাছাড়া বাঙালি জাতটার তো কোনকালেই বর্ণভেদ, খাদ্যাখাদ্য নিয়ে কোনও সংস্কার ছিল না। ওরা গোমাংস খায়, ওদের ব্রাহ্মণরা, বিধবারা পর্যন্ত আমিষ খায়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর আর ডিরোজিও সাহেব এদের মাথাটি খেয়েছেন। ওরা আবার সনাতন হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে কী কথা বলবে! আমি বলছি গোডবোলে শাস্তি পাবে, বিধাতার চরম শাস্তি অপেক্ষা করছে ওর জন্যে।‘
বাবার মেজাজ দেখে আর কথা বাড়াল না শৈলজা। ভয়েই চুপ করে গেল।

ইদানীং কদিন ধরে মন্দিরের গুপ্তকক্ষে মাথায় লাল কাপড় বাঁধা কিছু উগ্র আর গোঁড়া হিন্দুভক্তের আসা-যাওয়া, বাবার সঙ্গে দিনের পর দিন তাদের পরামর্শ কিন্তু শৈলজার নজর এড়ায় না। ইতিমধ্যে গোডবোলে নবজীবন পত্রিকা ও মহারাষ্ট্র টাইমসে লিখে ফেলেছেন আরো গোটাতিনেক বলিষ্ঠ রচনা, সবই ধর্মের ধ্বজাধারী দালালদের উদ্দেশ্যে। তাতে বাদ যায়নি ভণ্ড সাধুদের কাণ্ডকারখানা, ধার্মিক সংগঠনগুলোর কালো টাকার পরিমাণ, গণেশ-মূর্তির দুগ্ধপান থেকে মাহিমে সমুদ্রের জলের মিষ্টতার রহস্য বা মক্কায় হজযাত্রীদের স্ট্যাম্পীডের ঘটনা- কোন কিছুই।

সাপের লেজে পা দিলে সাপ কি ছেড়ে কথা কয়? একদিন সকালে জগিং-এ বেরিয়েছিলেন ডাঃ গোডবোলে, ঘরে ফিরল তাঁর মৃতদেহ পুলিশের গাড়ি চড়ে। দুজন মোটোর-বাইক আরোহী পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে তাঁর কপালে।

সেদিন বিকেলে নবজীবনের সম্পাদকের ফোন এল শৈলজার কাছে। ‘মিস ত্রিবেদী, এই ঘটনাটার উপর একটা স্পেশ্যাল রিপোর্ট চাই। পরপর তিনজন রেশনালিস্ট খুন হলেন দেশের বিভিন্ন জায়গার, প্রকাশ্য দিবালোকে। ডাঃ দাভোলকার, ডাঃ কালবুর্গি, ডাঃ গোডবোলে তো বটেই, প্রয়োজনে বাংলাদেশের সম্প্রতি-নিহত ব্লগারদের আর শ্রীলঙ্কার যুক্তিবাদী ডাঃ কোভুরের কেসটাও তুলনায় নিয়ে এসো। পারলে কলকাতার যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষের সাথেও কথা বলে দেখো।‘ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে এডিটার ফোন রাখলেন।

উত্তেজিত শৈলজা নিজেও। অল্প দিনের সাংবাদিক জীবনে এরকম হাই-প্রফাইল কেস সে কখনও হ্যান্ডেল করেনি। সেই সন্ধ্যেতেই সে ছুটল সয়াজীবাগের ধার ঘেঁষে ডাঃ গোডবোলের বাসায়। তাকে অভ্যর্থনা জানালেন এক সৌম্য সুদর্শন যুবক, নাম জানা গেল মুকুন্দ গোডবোলে। তিনি নিজেই জানালেন যে তিনি মহারাজা সয়াজীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক স্বর্গত ডাঃ মধুসূদন গোডবোলের কনিষ্ঠ পুত্র, বছর তিন হল এম-এস-ইউ তে সংখ্যাতত্বের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেয়েছেন।

-‘বাবার পরিচয় তো নিশ্চয় আপনার অজানা নয়’, সোজাসুজি মূল প্রশ্নে এসে পড়লেন মুকুন্দ, ‘আর তদন্ত যা করার সে তো পুলিশেই করবে। তাহলে আপনার ভূমিকাটা এখানে কিসের?’
-‘আপনার কথা ঠিক। আমার কাজ খুনের তদন্ত করা নয়, যদিও সেটা জানা বা লোককে জানানোটা আমাদের নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তবে আমাদের মেন কনসার্ন হল যেভাবে একের পর এক যুক্তিবাদী যিনি ধর্মান্ধতা বা অন্ধবিশ্বাস, তথাকথিত ধর্মগুরুদের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দেওয়ার কাজে ব্রতী হয়েছেন তাঁদেরকে এক এক করে খুন করা হচ্ছে- এ আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? আমরা কি এখনও নিজেদেরকে সভ্য-পরিচয় দেওয়ার যোগ্য আছি, না প্রস্তর-যুগের অসভ্য-বর্বরতার দিকে ফিরে যাচ্ছি?’
-‘না মিস ত্রিবেদী, নিওলিথিক-চ্যাল্কোলিথিক মানুষদের অসভ্য-বর্বর বলার কোনও অধিকার আমাদের নেই। তারা হত্যা করত নিতান্তই জৈব প্রয়োজনে। তাদের ধর্ম বলে কিছু ছিল না, তাই ধর্মান্ধতার কোনও প্রশ্নই আসে না। জানেন, আমার বাবা টেগোর থেকে পড়ে শোনাতেন-
‘ধর্মের বেশে মোহ এসে যারে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।.......
পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা-
দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা!‘ ‘

-‘তবু কারা আপনার বাবাকে মেরেছে বলে আপনার মনে হয়?’
- ‘তা বলতে পারব না, তবে দুজনেরই মাথায় লাল ফেট্টি আর কপালে সিঁদুরের টিপ ছিল।‘
চকিতে চমকে ওঠে শৈলজা। মনে পড়ে মন্দিরে কিছু সন্দেহজনক লোকের আনাগোনা। মুহূর্তে সবকিছু যেন পরিষ্কার হয়ে যায় চোখের সামনে। কোনমতে একগ্লাস জল চায় সে মুকুন্দের কাছে।
- ‘আমি স্ট্যাটিস্টিক্সের কিছুই বুঝিনা, প্রফেসার গোডবোলে, কিন্তু সামান্য পরিচয়ে আপনাকে যেটুকু দেখলাম তাতে মনে হল আপনি আপনার বাবার একজন যোগ্য উত্তরসূরী, গর্ব করতে পারেন তাঁকে নিয়ে। আমার কিন্তু সে সৌভাগ্য হল না‘- শৈলজা কথাটা বলেই ফেলল।
- ‘ তা কেন, আপনি একজন শিক্ষিতা মহিলা, সঙ্গত কারণেই আপনার যুক্তিবাদী হওয়ার, গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে ওঠার অধিকার আছে। আর এ ব্যাপারে আমি যদি বিন্দুমাত্র সাহায্য করতে পারি, সে আমার সৌভাগ্য বলে মনে করব। আপনি প্লীজ এ ব্যাপারে কোনও দ্বিধা রাখবেন না।‘

বাড়িতে ফিরে ভারাক্রান্ত মনে শুয়ে পড়ল শৈলজা। পরদিন ঘুম ভাঙ্গল রোজকার মত বাবার গলায় সন্ত নরসি মেহেতার রচিত ভজন শুনে-
“বৈষ্ণব জন তো ত্যয়ন কহিয়ে জে
পীড় পরায়ে জানে রে -
পরদুখে উপকার করে তোয়ে
মন অভিমান না আন রে।।“

আজ কিন্তু বাবার গলায় এই গান তার কাছে ভণ্ডামির নামান্তর বলেই মনে হল। প্রবলপ্রতাপ পুরোহিত কৈলাশপতি ত্রিবেদী এখনও জানেন না যে দৈত্যকূলে প্রহ্লাদের জন্ম হয়েছে তাঁরই অজ্ঞাতসারে, তাঁরই চোখের সামনে। আর ক'দিন পরে বুঝি বা তার জন্যেও কিছু শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, কারণ ঈশ্বরকে বিধর্মীদের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব তো তাঁরই।

গল্প তবু গল্প নয়- 'মহাপ্রভু'


গল্প তবু গল্প নয়।

মহাপ্রভু।


'রাজা বললেন, যে আমার মেয়ের মুখে কথা ফোটাতে পারবে তার সাথেই আমার মেয়ের ‘বিয়ে দেব‘- রামাই বলল। পরমুহূর্তেই তার অনুযোগ, ‘দেখুন ঠাকুর কেষ্টা হুঁ দিচ্ছে না!’
- ‘ওরে কেষ্টা, হুঁ বলরে ব্যাটা’, মহাপ্রভু কেষ্টাকে মৃদু ভর্ত্‌সনা করায় কেষ্টা অস্ফুট-স্বরে ‘হুঁ’ বলল। গল্প আবার শুরু হল।
তবে গল্পেরও গল্প থাকে। কে এই মহাপ্রভু? কারাই বা রামাই আর কেষ্টা- জানতে হলে আমাদের একটু কাশীপুর-পঞ্চকোট রাজবাড়ির ইতিহাসের পাতায় উঁকি দিতে হবে। তবে প্রসঙ্গতঃ জানাই যে এ ইতিহাস কোনও বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ অবস্থায় হয়ত পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন স্থানীয় লোকের স্মৃতিচারণে আর ১৯২৮ সালে পাটনার প্রকাশিত একটি সরকারি গেজেটের সূত্র ধরেই এ কাহিনীর অবতারণা।

মানভূম-পুরুলিয়ার পঞ্চকোট রাজাদের কথা বাংলার ইতিহাসে আছে। সেখানে গৌড়বঙ্গের প্রাচীনতম শিখর-বংশীয় রাজত্বের পত্তন হয় ২১০০ বছর আগে পুরুলিয়ার ঝালিদহ বা ঝালদা গ্রামে মধ্যভারতের ধার রাজ্যের মহারাজা জগদ্দেওয়ের ভ্রমবশতঃ পরিত্যক্ত ও অনার্য সর্দারদের দ্বারা পালিত পুত্র দামোদর শেখর দ্বারা। তারপরের ১৯০০ বছর কাল ধরে রাজধানীই স্থানান্তরিত হয় সাতবার, ৮১ জন রাজপুরুষ সিংহাসনে আসীন হন। মহারাজ কীর্তিনাথ শিখর ৯২৮ খৃষ্টাব্দে পঞ্চকোট পাহাড়ের তলদেশে রাজধানী স্থাপনা করেন ও উনবিংশ শতাব্দীতে বর্গীদের আক্রমণে সে গড় ধ্বংস হলে রাজধানী নিয়ে আসা হয় কাশীপুরে।

আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কাঞ্চীর আয়েঙ্গারবংশীয় ত্রিলোচন আচার্য নামে এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ তীর্থ-ভ্রমণকালে পঞ্চকোট পাহাড়ের তলে একটি মন্দিরে কিছুদিন বিশ্রাম করেন। তাঁর শরীর থেকে নির্গত দিব্য-জ্যোতির কথা লোকমুখে শুনে পঞ্চকোটের তখনকার রাজা শত্রুঘ্ন ওরফে গরুড় নারায়ণ সিংহদেও তাঁকে দর্শন করতে আসেন ও তাঁর শিষ্যত্ব নিতে চান। আচার্য রাজী না হলেও তাঁর ভাইকে একাজের জন্যে মনোনীত করেন। এভাবেই ১৬৫১ সালে কাঞ্চীর আয়েঙ্গারবংশের শ্রী রঙ্গরাজ রাজগুরু হিসেবে পঞ্চকোট আসেন। অচিরেই তিনি পরিবার ও বেশ কিছু আত্মীয়-স্বজন তামিলনাডু থেকে পাঞ্চেত নিয়ে আসেন। নিকটস্থ বেরো পাহাড়ের পাদদেশে বেরো বা গদিবেরো নামক ৫৭ ১/২ খানি মৌজা নিয়ে তৈরি গ্রামটি দেবোত্তর স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদেরকে থাকার জন্যে উৎসর্গ করা হয় ও তাঁরা এখানে অধিষ্ঠিত দেবতা কেশব রায় জিউর সেবাইত নিযুক্ত হন। এই বংশের পুরুষরা মহাপ্রভু নামে বংশানুক্রমে বেরো গ্রামে থেকে আসছেন ও ঠাকুর কেশব রায় জিউর মন্দিরে মোহান্তরূপে কাজ করে আসছেন।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন মহারাজা নীলমণি সিংদেও পঞ্চকোট থেকে কাশীপুরে রাজধানী নিয়ে আসেন তখন মহাপ্রভু বংশের মহান্ত রাজগোপাল আচারি গোস্বামী ছিলেন গুরুদেব। ইনি পরোপকারি, দয়ালু ও আত্মভোলা মানুষ হিসেবে অঞ্চলে প্রসিদ্ধ ছিলেন, তিনিই বেরোয় প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনা করেন ও পরবর্তীকালে মেয়েদের শিক্ষারও প্রসার ঘটান। আমাদের এই কাহিনী মহাপ্রভু রাজগোপাল আচারিকে নিয়েই, না উনি গভর্ণর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারির কেউ হতেন না। বরং ততদিনে আয়েঙ্গার গুরুবংশের এই বাহ্মণ পরিবার ও চল্লিশেরও বেশী তাদের আত্মীয়স্বজনের পরিবার তামিল ভাষা ভুলে মানভুমের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছেন। শুধু তাঁদের যাজ্ঞিক ক্রিয়াকর্ম, পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান এখনও কাঞ্চীর বৈদিক নিয়মমতে হয়ে থাকে। এমনকি বিয়ের কনেও আসে তামিলনাডু থেকে যিনি হয়ত একবর্ণও বাংলা বা মানভুমের ভাষা বোঝেন না, চরম নিগ্রহ ভোগ করতে হয় তাঁকে তার ফলে।

আপাততঃ তাহলে ফিরি আমাদের গল্পে। আমাদের এই আপনভোলা মহাপ্রভুটির দুটি নেশা ছিল, এক আফিমের ও দুই গল্প শোনার। প্রতি সন্ধ্যায় ঈশ্বরনাম শেষে শুরু হত তাঁর মৌতাত। কেষ্টা নামে ভৃত্যের দায়িত্ব ছিল আফিম আর অনুপান হিসেবে ঘন করে জ্বাল দেওয়া সর-পূর্ণ দুধের বাটির যোগান দেওয়ার। তেলেঙ্গানা থেকে আমদানি করা ধূর্ত ভৃত্য রামাইএর কাজ ছিল প্রভুর মনোরঞ্জনের জন্যে প্রতি সন্ধ্যায় গল্প শোনানোর। সে গল্প হয়ত এভাবেই শুরু হত।
- ‘নে রামাই, এবার ধর। খবর্দার, একগাদা দুক্‌খু-টুক্‌খু আনবি নে কিন্তু বলে দিচ্ছি।‘ প্রভু বলতেন।
- ‘না আজ্ঞে, তাই কি করি! তবে কেষ্টাকে বলে দিন যেন প্রতি কথার শেষে হুঁ দেয়। না হলে আমার গল্প-বলার মেজাজ আসবে না কিন্তু, বলে দিচ্ছি।‘
- ‘সে ভাবিস নে। কেষ্টার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে যে হুঁ দেবে না!’
গল্প শুরু হয়। এক অজানা দেশের রাজার সবরকম সমৃদ্ধির মাঝে থেকেও এক অদ্ভুত বেদনার উপাখ্যান। রাজার একমাত্র মেয়ের অতুল রূপরাশি, শিক্ষা-দীক্ষাতেও অসামান্যা, অথচ কথা বলতে পারেন না। রাজা কী করেননি মেয়ের মুখে কথা ফোটাতে! ডাক্তার-বদ্যি, সাধু-সন্ন্যিসি, তাগা-তাবিজ, জলপড়া-মন্ত্রপড়া কিছুই বাদ দেন নি । তবু সবই বৃথা।
-‘এইবার তুই মার খাবি রামাই। মানা করলেম না এমন দুঃখের গল্প বলতে।‘ রামাই দেখে প্রভুর দুচোখে জল।
-‘তা যদি বলেন, মহাপ্রভু, অন্য গল্প বলি?’
-‘তা কি হয় রে ব্যাটা! শুরু করেছিস যখন শেষ তো করতেই হবে। তা হ্যাঁরে, রাজা আমাদের কেশব জিউএর থানে মানত করে নাই?’
-‘তা তো জানি না ঠাকুর, কি জানি ওরা হয় তো কেশব জিউএর নামই শোনে নি।‘
- ‘দাঁড়া একটু’, এই বলে প্রভু ঘরের ভেতর থেকে পাঁচটি সিকি এনে দেন রামাইএর হাতে ‘যা তো কাউকে পাঠিয়ে দে, এক্খুনি একটা পুজো দিয়ে মানত করে আসুক বাবার মন্দিরে।‘ ধূর্ত রামাইএরই লাভ, যদিও কেষ্টাটাকে চার আনা বখরা দিতে হবে, সে জানে।
- ‘তারপর কি হল রে, রামাই?’ প্রভুর আদেশে রামাইকে আবার গল্প শুরু করতে হয়।
- ‘তারপর হুজুর, বহু চিকিৎসা, বহু পুজো-আচ্চা করেও যখন কিছু হল না, মহারাজ একটা পুরস্কার ঘোষণা করলেন। যে রাজকন্যের মুখে কথা ফোটাতে পারবে তার সাথে রাজকন্যার বিয়ে দেওয়া হবে। দেখুন ঠাকুর, কেষ্টা হুঁ দিচ্ছে না, কিন্তু!’
- ‘হুঁ, হুঁ,’ কেষ্টা চোখ রগড়ে বলে ওঠে, রামাই খুশি।
- ‘বহু লোক এল, গেল, অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু ফল কিছুই হল না। রাজকন্যে অমনি উদাস দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে। শেষে একদিন রাজার বাড়িতে একটা চোর ঢুকল।‘
-‘বলিস কি রে, রাজবাড়িতে চোর! পাহারা ছিল না?’
- ‘সে আমি কি জানি। পাহারাদার হয়ত আফিম খেয়ে ঝিমোচ্ছিল’- বলেই জিভ কাটল রামাই। ভাগ্যিস প্রভু কথাটা খেয়াল করেন নি। ‘না না, চোর ব্যাটা ছিল মহা ধূর্ত। সবার চোখ এড়িয়ে সে সিঁধ কেটে ঢুকল রাজকন্যার শোবার ঘরে।‘
- ‘কেন, রাজকন্যের শোবার ঘরে কেন? ওরে রামাই, তোর পেটে পেটে শয়তানি আমি জানি। রাজার মেয়ের যদি কোনও ক্ষতি হয়, নীলমণিকে বলে তোকে তাড়াব আমি।‘
- ‘তার আমি কি জানি ঠাকুর। চোর কি আমায় বলে ঢুকেছে!’
- ‘হেই নে বাপ, আমার এই আংটিখান। চোরকে বল এটুকু নিয়ে সরে পড়তে। দেখিস বাবা রাজকন্যের যেন কোনও ক্ষতি না হয়।‘
রামাইয়ের তো আজ পোয়াবারো, তার লাভের পর লাভ।

- ‘ঠিক আছে ঠাকুর। তা আপনার আশীর্বাদে চোর রাজকন্যাকে কিছু করল না। তার শোবার ঘরের লাগোয়া ছিল ঠাকুর ঘর, ও সেদিকেই এগিয়ে গেল। এদিকে রাজকন্যার ঘুম ভেঙে গেছে কিন্তু সে কিছু বলতে পারছে না। তার সামনে দিয়েই চোর ঢুকে গেল ঠাকুরঘরে। তারপর ধীরে ধীরে - ও ঠাকুর, কেষ্টা চুপ করে আছে, আমি আর বলব না’- রামাই চেঁচিয়ে ওঠে।
- ‘কেষ্টা, তুই এবার মার খাবি হারামজাদা! হুঁ দিস না ক্যানে?’ অনেক হাতে পায়ে ধরে এ যাত্রা উদ্ধার পেল কেষ্টা।
- ‘চোর তারপর গৃহদেবতার সোনার মুকুটখানি খুলে নিয়ে পালাতে গেল রাজকুমারীকে পার করে।‘
-‘তারপর’- রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করেন মহাপ্রভু।
- ‘তারপর হঠাৎ কোত্থেকে কি হয়ে গেল রাজকন্যা চোর চোর বলে চিৎকার করে উঠল।‘
- ‘বলিস কি রে! তারপর?’
- ‘তারপর তো লোকজন ছুটে এল। তারা তো প্রথমেই চোরকে ধরে বাঁধতে গেল। তারপর অবাক হয়ে দেখে রাজকন্যা কথা বলছেন। রাজা-রানী ছুটে এলেন। সবার চোখে আনন্দে জল চলে এল।‘
- ‘ভগবান আছেন, বুঝলি রে রামাই, ভগবান আছেন। বড় জাগ্রত ঠাকুর আমাদের কেশব রায় জিউ।‘ মহাপ্রভু পরম বিশ্বাসে বললেন।
- ‘কিন্তু ঠাকুর, একটা সমিস্যে হল তারপর, সেটা কেউ সমাধান দিতে পারছে না। কথা হল রাজা কি এখন চোরকে শাস্তি দেবেন না তাকে নিজের জামাই করবেন? ওনারা এখনও ভাবছেন গুরুজি! এখন আপনি যদি এর একটা বিহিত করেন।‘
- ‘তাই তো রে, আমি পূজারি পণ্ডিত, আমি এসব সামাজিক সমিস্যের কি জানি। ঠিক আছে, কাল সকালে রাজা নীলমণিকে একবার তলব দিস তো, দেখা যাক কি বলেন।‘
পাঠকরা জেনে রাখুন গুরুদেবের ডাকে রাজার না এসে থাকার ক্ষমতা ছিল না, যতই তিনি শিশুর মত আপনভোলা মানুষ হন না কেন। পরদিন সকালে রাজা এসে মহাপ্রভুকে প্রণাম করলেন। গুরুদেবের প্রশ্নের উত্তরে সমস্যার একটা সমাধানও তিনি দিলেন। তাঁর মতে চোর যখন চুরির উদ্দেশ্যে রাজবাড়িতে ঢুকেছে ও হাতেনাতে ধরা পড়েছে, শাস্তি তার পাওনা। তবে চুরি করতে পারেনি বলে তাকে মোটামুটি দু-বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়াই উচিৎ।
-‘তার পরে?’
- ‘তার পর কথামত সেই চোর হবে রাজার জামাতা। চোর বলে রাজা তো তাঁর কথার খেলাপ করতে পারেন না।

গুরুদেব অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ডাকলেন, ‘মহারাজ’।
- ‘আজ্ঞা করুন গুরুদেব।‘
- ‘আমি যদি বেতাল হতাম, তোমাকে আজ বিক্রমাদিত্যের উপাধি দিতাম। তা যখন হবার নয়, আপাততঃ মন্দিরেই এসো, কেশবজিউএর পূজার প্রসাদ খেয়ে যাও।

আজ আর মহাপ্রভু নেই, নেই পঞ্চকোট বা কাশীপুরের সিংদেও রাজারা। রাজবংশের ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ও রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বিভিন্ন পরিচয়ে। মহাপ্রভু বংশ ও কুটুম্বের লোকজনদের মধ্যে কেউ হয়েছেন পাটনা মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল (ডাঃ গোবিন্দাচারি), বা কেউ বিখ্যাত নিউরো-সার্জন (ডাঃ এন কে আচারি), বা স্বাধীনতা-সংগ্রামী (শ্রী রাঘব আচারি) কিংবা সাংসদ (শ্রী বাসুদেব আচারি) ইত্যাদি। সব ঘটনার সাক্ষী পঞ্চকোট পাহাড় তো সদাই নীরব- শুধু দামোদর নদ কুলুকুলু শব্দে একমনে বয়ে চলেছে পশ্চিম থেকে পূর্বে।

মুম্বাই, ২৯শে অক্টোবর, ২০১৫।
-

বাংলা বিবিধ- যাচ্ছেতাই (২)

#বিশুমামা_জিন্দাবাদ

(গুল্প)

পরিচয়-পর্ব।

বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী ওরফে আমাদের বিশুমামার একটা প্রাথমিক পরিচয় আগের পর্বে (উলানবাটোরের ওস্তাদ) দিয়েছি। এবার একটু বাস্তব প্রসঙ্গে আসি। আমার বিশুমামা একটি রহস্যময় মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন অকৃতদার, এবং পৃথিবীর যাবতীয় অর্থকরী কাজেই অকৃতকার্য। তবে তার জন্যে তাঁর মনে কোনও ক্ষোভ ছিল না। তিনি যখন তখন লোকালয় থেকে উধাও হয়ে যেতেন, কখনও পন্ডিচেরির অরবিন্দ-আশ্রমে, কখনও অযোধ্যা আবার কখনও বা হরিদ্বারের কনখলে মা আনন্দময়ীর আশ্রমে গিয়ে খুঁটি গেড়ে বসে থাকতেন পাঁচ-ছয় মাস। আবার ফিরে আসতেন অভিজ্ঞতার ঝুলিটি ভরে নিয়ে। সে সব দিনগুলো ছিল আমাদের কাছে বড় আনন্দের। তাঁর একটা বিশেষ গুণ ছিল গানের গলাটি। বিশ্বভারতী সংগীতবিভাগে ডিপ্লোমা নিয়ে এখানে ওখানে বেশ কিছুদিন ক্লাস করে যখন বেশ খ্যাতি লাভ করেছেন, তখনই হঠাৎ নিরুদ্দেশ যাত্রা করলেন। ফিরে এসে কিছুদিন আমাদের বাড়িতে থাকলেন। জিজ্ঞেস করলে পলাতকের গান গেয়ে উত্তর দিতেন-
'খেয়াল-পোকা যখন আমার মাথায় নড়ে-চড়ে
আমার তাসের ঘরের বসতি যে অমনি ভেঙে পড়ে।
তখন তালুক ছেড়ে মুলুক ছেড়ে হই যে ঘরের বার, বন্ধু রে......।'

সেদিন বিকেলে কানু-সুজয় আসাতে প্রথম উনি এবার মুখ খুললেন।
- উঃ, এবার পণ্ডিচেরি আশ্রমে কাদের দেখলাম, তোরা বললে বিশ্বাস করবি না!
- বিশ্বাস করেছি কখনও? সুজয়ের উত্তরটা একটু বাঁকা শোনাল।
- একত্রে তিনমূর্তি- দিলীপ রায়, সাহানা দেবী আর নলিনীকান্ত।
- নলিনী গুপ্ত? আমি জানতে চাইলাম।
- না রে বোকা, ইনি সরকার। নজরুল, দিলীপ রায়দের বন্ধু, দাদাঠাকুরের জীবনী লিখেছিলেন। বন্ধু সজনী দাসের আগ্রহে ‘শনিবারের চিঠি’তে রেগুলার লিখতেন।
ভাবি, যে লোকটার এত জ্ঞান, তার গুল দেওয়ার কি প্রয়োজন থাকতে পারে।
তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত সেই নমস্য ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ নিয়ে। মুখে জর্দাপান নিয়ে দিলীপবাবু ‘মহাসিন্ধুর ওপার থেকে’ বা ‘আজি এসেছি বঁধু হে’ কিভাবে গাইতেন, হুবহু নকল করে শোনাতেন বিশুমামা। সাহানা দেবী রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্রী- রবীন্দ্রসংগীতের একজন দিক্‌পাল হয়েও কিভাবে দিলীপ রায়ের বন্ধু ও ভক্ত হয়ে উঠলেন, শোনাতেন সেসব অজানা কথা। জানিনা এর মধ্যে কতটা সত্যি থাকত। আমি মুম্বাইয়ে চাকরি করতে যাবার আগে উনি একজনের সাথে দেখা করতে বলেছিলেন। ভদ্রমহিলা ব্যালার্ড পিয়ারে থাকেন, হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল গানের শিক্ষিকা। আমি রাজী হতে বললেন, গিয়ে আমার নাম করবি, তবে ফোন করে যাস, লতাজি-আশাজিরাও তাঁর কাছে শেখেন কিনা!
বোঝো ব্যাপারখানা! আমি কিন্তু পরে খবর নিয়ে জেনেছিলাম যে সত্যিই ঐ নামে এক মহিলা থাকেন সেখানে, লতা-আশা অনেকেই তাঁর কাছে ক্লাসিকাল শেখেন। কিন্ত আমি আর ভয়ে সেদিক মাড়াইনি। যদি গিয়ে শুনতাম যে উনি বিশুমামাকে চেনেন, বোধহয় ততটা আশ্চর্য হতাম না, যেভাবে সারপ্রাইজ দিতে দিতে তার ‘প্রাইজ’টাই নষ্ট করে দিয়েছিলেন তিনি।
পরে বিশুমামা বিশ্বভারতী থেকে গানের ডিপ্লোমা নিয়ে ফেরেন ও দুর্গাপুরে একটি স্কুলে গান শেখাতে শুরু করেন। তবে বোহেমিয়ান জীবনযাপনের জন্যে বেশ কয়েকবার বিতাড়িত হয়েছেন, আবার দুটো মিথ্যে কথা বলে ফিরে এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। বাচ্চাদের গান শেখানোর ওনার একটা সহজাত প্রতিভা ছিল। উনি ‘সাউণ্ড অফ ম্যুজিক’ স্টাইলে সা-রে-গা-মা শেখাতেন যেমন- সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা/ সা-নি-ধা-পা-মা-গা-রে-সা ‘র সুরে গেয়ে শোনাতেন- ‘ন-মো-ন-মো বী-না-পা-ণি/ ন-মো-বা-ণী-না-রা-য়-ণী’। একদিন এসেছেন শান্তিনিকেতনে ভিজিটিং প্রফেসার ডাঃ ভূপেন হাজারিকার কাছে একটা ওয়ার্কশপ করে। তারপর বলাকওয়া নেই, আমাদের ভাই-বোনদের নিয়ে উঠে পড়ে লাগলেন কলাবতী রাগ নিয়ে। গেয়ে শোনালেন ভূপেনের অপ্রকাশিত গান-
‘দু-দিনের জীবনে কি পাই কে জানে,
তাই সুরে-বেসুরে, তালে-বেতালে
গান গেয়ে আনন্দ পাই-
সা-ণি-ধা-পা, ণি-ধা-পা, ধা-পা-গা রে,
গেয়ে যাই।- এই দ্যাখ, কলাবতী জানিস না! সা-গা-পা-ধা-ণি-ধা-পা-র্সা, র্সা-ণি-ধা-পা, গা-পা-গা-সা-ণি্‌-ধা্‌-সা.....'.বলে শুরু করতেন ধনঞ্জয় স্টাইলে সলিলের গান - 'জানিনা কখন কোথায় তুমি থাক, জানিনা মনে রাখ কি না রাখ...'
-'জানিস, সলিলের সুরে সত্যেন দত্তের ‘পাল্কির গান’ এর আগে বেরিয়ে যায় ভূপেনজির ‘দোলা’ – অসমীয়া ভাষায়, সাড়া জাগায় কাব্যগীতি হিসেবে।' বলেই হারমোনিয়ম টেনে নিয়ে গেয়ে উঠতেন-
“হে দোলা,
অ্যাঁকাব্যাঁকা বাটে রে, করিআঁহু করিআঁহু
বর বর মানুহর দোলা।
হে আপোন করিলো বনুয়ার জিয়নক
দেহা ভাগোরাই তোলা হে দোলা।
হেই রেইয়া না, রেইয়া না, রেইয়া না।।‘
এই বিশুমামার সেই স্বতঃস্ফুর্ত উচ্ছ্বাসটা একদিন প্রায় হারিয়ে গেল একটা বিশ্রী দুর্ঘটনায়। বারান্তরে সেসব বলা যাবে।