Friday, February 24, 2017

বং মুলুকের ঝাপসা রাতে (ছড়া)

বং-মুলুকের ঝাপসা রাতে,স্টিং ক্যামেরার আবছায়াতেকি দেখলামরে ঘুমের ঘোরে,রাজ্য ভরে যায় যে চোরে।হেথায় নিষেধ নেইকো দাদা,যাই খেতে চাও কালো-সাদা,জনগণেশের কাঁধে বসে,খাও না তাদের রক্ত চুষে!লুটলে টাকা থামায় কে,আজকে আমায় নামায় কে?আজকে আমার মনের মাঝেসব পেয়েছি-র মাদল বাজে,নেত্রী দিলেন অবাধ ছুটআনন্দেতেই করছি লুট।আজকে দাদা ভোটের আগেচিত্ত-পরাণ জ্বলছে রাগে,খাচ্ছি টাকা, তোদের কি?তুললি ছবি অতর্কিত!আদিম কালের কায়দা স্টিং,ঠিক যেন শয়তানের কিং।দেখবি যবে কাটবে ঘোর-দেশ জুড়ে সব চোর-ছ্যাঁচোড়!

স্বপ্নমঙ্গল

স্বপ্নমঙ্গল।।১।।


কাল রাতে শোবার আগে চশমাটা খুলতে ভুলে গেছিলাম। ভাগ্যিস! হঠাত ঘুম ভেঙে দেখি একটা ন্যাড়ামাথা ক্যাবলাকান্ত ছেলে খোলা জানলার বাইরে থেকে গান গেয়ে হাতছানি দিচ্ছে- 'আয়রে ভোলা, খেয়াল খোলা, স্বপন দোলা নাচিয়ে আয়। আয়রে...।'
কি ভেবে ওর পিছুপিছু বেরিয়ে এলাম। এসেছি ত একটা ফাঁকা মাঠে। আরে! অনেক লোকের ভীড় জমেছে দেখি এত রাতে। আর সবাই ত আমার চেনা! একদিকে দাঁড়িয়ে আছে আহ্লাদীরা তিন বোন, চন্দ্রবিন্দু নামের বেড়ালটা, হ্যাংলাথেরিয়াম, কাতুকুতু বুড়ো, পান্ত ভূতের জ্যান্ত ছানা, জগাই ক্ষ্যাপা, পাগলা দাশু আরো অনেকে- দলের শিবিরের মাথায় লেখা- 'হাসির ফোয়ারা'। ওদের ক্যাপ্টেনের নাম হিজিবিজবিজ, না না, তকাই। অন্য দিকে দেখি সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গোমড়াথেরিয়াম, চিল্লানোসেরাস, হুঁকোমুখো হ্যাংলা, ট্যাঁস গরু (না কি পাখি?), কিম্ভূত, নন্দখুড়ো- ওমা, বুথ সায়েবের ওইটুকু বাচ্চাটাও রয়েছে দেখছি। ওদের নেতা রামগরুড়ের ছানা আর দলের নাম 'কান্নাসাগর'।
কি করছে ওরা এত রাতে? শুনলাম টাগ অফ ওয়ার খেলা হবে নাকি দু দলের মধ্যে। দড়ি কই? দড়ি কই? যাঃ চলে। শেষে দড়ির অভাবে খেলা হবে না নাকি! একটা চশমা পরা সুন্দর চেহারার ভদ্দরলোক, নাম বললে তাতাবাবু, রেফারি হয়েছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ওহে হাড়িম্ব মুখ দাড়িম্ব, তোমাদের ছাদের কাপড় টাঙ্গানো দড়িটা নিয়ে এস ত। আমি এই নতুন নামকরণে আপত্তি করতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় ভূতের বাচ্চাটা আমাকে চুপিচুপি বলল- ওঁর কথায় কিছু মনে কোর না, উনি না, আমাকেও অন্ধবনের গন্ধগোকুল বলে ডাকেন। গন্ধগোকুল মানে জান ত, ছুঁচো। আমি কি ছুঁচো?
আমি বুঝলাম, আপত্তি করা বৃথা। তাছাড়া, খেলাটা দেখারও খুব ইচ্ছে ছিল। তাই আবার বাসায় ফিরে ছাদে এলাম। তারপর কাপড় মেলার দড়িটা সন্তর্পণে খুলে নিয়ে গেছি সেখানে।
তারপর?
তারপর আর কি, ঘুম ভেঙে গেল। আজ আবার ঠিক করেছি চশমা পরে শোব। খেলাটা শেষ পর্যন্ত দেখতেই হবে।

।।২।।
আমাদের এখানে ঠাণ্ডা খুব একটা পড়ে না, কিন্তু শুয়ে শুয়ে একটা বিলেতি বই পড়ছিলেম কিনা, তাই বেশ শীত করছিল। বইটা রেখে লেপমুড়ি দিয়ে সবে শুয়েছি, একটা ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ শব্দে চমকে উঠলাম। দেখি জানলার ওপর একটা বেড়াল আমার দিকে তাকিয়ে বিশ্রীরকম হাসছে। বেশ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলাম- 'হাসচ কেন খোকা, এটা কি নাট্যশালা?' সে হাসতে হাসতেই বলল, 'আমায় খোকা বলছ যে বড়! জান, আমি তোমার ঠাকুরদার বয়সী? আর শীত করে তো পম্পাই গেলেই পার।ভিসুভিয়াসের আঁচে গরম হয়ে যাবে। তবে ঠিকানাটা কিন্তু বলছি না, হুঁ হুঁ।'
বুঝলাম, ইনিই সেই স্বনামধন্য রুমাল, থুড়ি চন্দ্রবিন্দু। আমি একটু অন্যমনস্ক হতেই দেখি তিনি হাসতে হাসতেই জানলা গলে পার।
আমি আবার শোবার তোড়জোড় করছি, এমন সময় আবার একটা অলৌকিক হাসি। চন্দ্রবিন্দু? কই না ত, এ দেখি অন্য একটা বেড়াল। 'তুমি আবার কোত্থেকে উদয় হলে হে? তুমি ত চন্দ্রবিন্দু নও।'
'নইই ত। দেখছ না আমি খাস বিলিতি পেডিগ্রির চেশায়ার বিল্লী, খোদ রানীর বাড়ির থেকে এসেছি। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে শোনো', বলে সে স্কুলের বাচ্চাদের মত দুলে দুলে নার্সারি রাইম বলতে লাগল-
'Pussy cat, pussy cat, where have you been?
I have been in London to meet the queen.
Pussy cat, pussy cat, what did you there?
I frightened a mouse under the queen's chair.'
আমি কিছু বলবার জন্যে জানলার দিকে তাকাতেই দেখি চেশায়ার বেড়াল ধীরে ধীরে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে। পুরো শরীরটা অ্দৃশ্য হয়ে যাবার পরেও কিন্তু রয়ে গেল তার মুচকি হাসিটা, পরে সেটাও মিলিয়ে গেল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম সেই দিকে।
এবার একটু শান্তিতে ঘুমোবার জোগাড় করছি, হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল দুই বেড়ালের তুমুল ঝগড়া আর ফ্যাঁসফ্যাসানি, আর ঠিক তখনি কে যেন আড়াল থেকে সুন্দর গলায় আবৃত্তি করতে লাগল-
'খিলখিল্লীর মুল্লুকেতে থাকত নাকি দুই বেড়াল,
একটা শুধোয় আরেকটাকে, তুই বেড়াল না মুই বেড়াল?......'
তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি পেজ-মার্ক দিয়ে মুড়ে রাখা আছে একটা ইংরেজি বই, কাল শুয়ে শুয়ে পড়ছিলাম- 'Alice's Adventures in Wonderland' by Lewis Carroll.

Wednesday, February 15, 2017

Bengali Story- ঘটোৎকোচ (অফিসের গল্প- ৫)

ঘটোৎকোচ ।।

'বানানটা ভুল লিখলাম, তাই না? উপায় নেই, ইনি তো ভীমপুত্র ঘটোৎকচ নন। সুজন ঘটককে অনায়াসে দুর্জন বলে গালাগাল দেওয়া যেতে পারত, তাহলে এই ঘটোৎকোচ নামটা কেন? তাও যখন কিনা তাঁর ঘটে বা মাথায় কচ, মানে চুল যথেষ্টই আছে!'
আমাদের তেল কোম্পানীর ক্যান্টিনে আড্ডা হচ্ছিল সহকর্মীদের মধ্যে। আড্ডার মধ্যমণি হলেন সিন্‌হাদা। এই সিন্‌হাদার জন্ম বিদেশে, মানে দিনাজপুরে। সেখান থেকে সত্তরে ম্যাট্রিক পাশ করে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে ইংলিশবাজারে চলে আসেন ও পরে উত্তরবঙ্গ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। এই দুই দেশের অভিজ্ঞতার জোরে তাঁর গল্পের ঝুলি পূর্ণ, তাই সময় আর সুযোগ পেলেই ঝুলি উপুড় করে হামেশাই কিছু দিয়ে থাকেন। সেদিন কথা হচ্ছিল সরকারি কাজে ঘুষ আর দুর্নীতি নিয়ে। এই জিনিষটাকে যে শিল্পের উৎকর্ষে পৌঁছে দেওয়া যায় তারই প্রসঙ্গে সুজন ঘটক ওরফে ঘটোৎকোচের নাম উঠে এল।
'সেই ঘুষখোর কেরানিবাবুর গল্পটা শুনেছ? লোকটা উপরি না নিয়ে কোন কাজই করত না, মানে করতে পারতই না। কর্তৃপক্ষ থেকে কতবার তাঁর মাইনে আটকে দেয়া হয়েছে, তাও তিনি নিয়মিত অফিস গেছেন, আর বছর শেষে একখানা মোটরগাড়ি কিনে ফেলেছেন। তখন সাহেবি আমল, ইংরেজ উপরওয়ালা শেষে বিরক্ত হয়ে তাঁকে সমুদ্রতীরের এক জনশূন্য গ্রামে, যেখানে শুধু কিছু মৎস্যজীবি আছে, বদলি করে দিলেন, তাঁকে কাজ দেওয়া হল উদয়াস্ত শুধু সমুদ্রের ঢেউ গোনার। ভাবলেন বুঝি খুব শাস্তি দেওয়া হল।'
'ঠিক এক বছর পরে বড়সাহেব গেছেন কেরানিবাবুর খোঁজ নিতে। গিয়ে দেখেন, সমুদ্রতীরে ধু ধু বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে আছে এক চমৎকার দোতলা বাড়ি আর তার বাগানে ইজিচেয়ারে বসে তিনি দু'শ বার, দু'শ তের করে ঢেউ গুনে যাচ্ছেন। সাহেব তো থ। স্থানীয় মহলে খোঁজ নিয়ে জানা গেল তিনি তাঁর কাজের পরোয়ানা দেখিয়ে মাছধরার নৌকোগুলোকে নোটিস দিয়েছেন যে তাদের জন্যে তাঁর ঢেউ গোনার কাজের ব্যাঘাত ঘটছে, অতএব সবরকম নৌকোচলাচল সেখানে নিষিদ্ধ করা হল। শেষে গরীব জেলেদের সাথে নৌকাপ্রতি প্রতিক্ষেপে পাঁচটাকা করে রফা হল। বড়সাহেব বুঝলেন যে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও সে ধানই ভানবে।'
'আমাদের ঘটকমশাইও ছিলেন তেমনি এক গুণী ব্যক্তি। পেশায় ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনীয়ার বলে আমাদের পণ্ডিচেরি অফিসে ওকে দেওয়া হয়েছিল ড্রিল-সাইটের এয়ার-কন্ডিশনারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্ব নেবার পরেই সব এসি-গুলো একধার থেকে বিগড়ানো শুরু করল, আর প্রায় প্রতিটার কম্প্রেশার বদলানো হতে লাগল। সেখান থেকে সরিয়ে কলোনীর টাউন মেন্টেনান্সে পোস্টিং দিতেই রাস্তার নিয়নলাইটগুলো ঘনঘন খারাপ হলে লাগল। প্রজেক্ট ম্যানেজার আর কি করেন? অগত্যা ড্রিলসাইটের ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন বিভাগে তাকে পাঠানো হল। কাজ হচ্ছে সিস্মিক অনুসন্ধান পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে মাটির নীচে যেখানে তেল থাকতে পারে, সেই জমি সরকারি পয়সায় ইজারা নেওয়ার কাজ। ইলেকট্রিকের সঙ্গে কোনও সম্বন্ধ নেই, তাছাড়া এখানে পার্টিকে টাকা দিতে হবে, খাওয়ার প্রশ্নই নেই।'
'পরের বছর ঘটক একদিন বিশাল এক অডি গাড়ি নিয়ে অফিস এল। প্রজেক্ট ম্যানেজারকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেই সন্ধ্যায় তাঁকে একটা বারে পানাহারের নিমন্ত্রণ জানাল। দেখে ত সবাই হাঁ।'
আমরাও এতক্ষণ হাঁ হয়ে শুনছিলাম। কাপের চা কখন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। 'কিন্তু দাদা, আমরা কিছুই ত বুঝলাম না, গ্রামের জমির মালিকেরা শুদুমুদু তাঁকে জমির টাকার ভাগ দিতে যাবে কেন?' আমি শুধোলাম।
'তোমাদের দোষ নেই, ফীল্ডে গিয়ে তদন্ত না করলে আমিও বুঝতাম না। যে জমি লিজ নেওয়া হবে তার মালিককে সুজন আগেভাগে গিয়ে বুদ্ধি দিয়ে আসত শ'দুই নারকেল গাছের চারা লাগাতে সেই জমিতে। চারাপ্রতি পঞ্চাশ টাকা করে সে নিজে অগ্রিম দিয়ে আসত। এরপর জমির ইন্সপেকশনের সময় চাষের জমি দেখিয়ে প্রতি গাছের জন্যে পাঁচশো টাকা দাবি করার কথাও সে শিখিয়ে দিত, ফিফটি-ফিফটির কড়ারে।'
- দাদা, বানান ভুলের কথা কি যেন বলছিলেন, ভীমের ছেলের সাথে সুজন ঘটকের কি সম্পর্ক?
না হে, তোমাদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না। যে কোম্পানিতে সুজন ঘটকের মত মহাপুরুষ আছে সেই একই কোম্পানিতে তোমরাও কাজ কর ভাবতেও লজ্জা লাগছে। ঘটোৎকোচের সন্ধিবিচ্ছেদ হল ঘটা + উৎকোচ, অর্থাৎ ঘটা করে যে উৎকোচ গ্রহণ করে, বহুব্রীহি সমাস। এবার কি উৎকোচ মানেটাও বলে দিতে হবে!

Tuesday, February 7, 2017

বাংলা কবিতা- অ-কবি

অ-কবি ।।
দূর ছাই, এটা কি একটা কবিতা হল !
প্রতিটা লাইন-ই ত বেশ বোঝা যাচ্ছে ,
বক্তব্যগুলো অতিমাত্রায় সহজ ।
ক্লাস ফোরের টেক্সটবইএ ঢুকিয়ে দিলে-
না খেয়ে মরবে মানে-বই-এর লেখকরা ।
সমালোচক-এর খোরাক না দিতে পারলে
আর কলম ধরা কেন, ছিঃ !
কি আর করি, সমস্যাগুলো যে দুর্বোধ্য, কঠিন-
তাকে কি আরও দুরূহ করে তুলব
শব্দকল্পদ্রুমের তলায় হাত পেতে ?
পূর্ণিমার চাঁদ হয়ত ঝল্‌সানো রুটি নয়,
আজ তা জেনে গেছে সব্বাই,
কিন্তু তার আলোয় তো আজকাল
রুটি সেঁকা হচ্ছে হামেশাই ।
অগত্যা, হে সমালোচক ভাই,
আমিও গিয়েছি চাঁদে রুটি ঝল্‌সাতে ।
কিন্তু যখন ফিরে এসেছি-
দেখেছি স্নিগ্ধ শীতল জ্যোৎস্না
ছড়িয়ে গেছে ধরার দিগন্ত জুড়ে ।
যা দেখেছি তাই লিখেছি ভুল করে,
পারলে ক্ষমা করে দিও হে বন্ধুরা ।।
মুম্বাই, ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

Saturday, February 4, 2017

মনের মণিকোঠা থেকে - ৯

মনের মণিকোঠা থেকে- ৯।।


আমার স্কুলের গল্প নিয়ে আমার নবম লেখা। আমি নিজেও তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। সেই সময় আমাদের স্কুলে এসেছেন জীববিজ্ঞানের নতুন টিচার শ্রী কে এন রায়। ভাগ্যের দোষে সে সময় আমাদের অঙ্কের মাস্টারমশাই দাস স্যার মাসখানেকের ছুটি নিলেন। প্রিন্সিপাল ভেবেছিলেন, নাইনের আর কি এমন অঙ্ক থাকে, ও ত যে কেউ পারবে, ভেবে তিনি রায় স্যারকে আমাদের ক্লাস নিতে পাঠিয়ে দিলেন। উনি ঠিক করেছিলেন, না ভুল সে কথায় পরে আসছি।

আমরা কিন্তু বায়োলজির শিক্ষককে, তাও আবার নতুন, অঙ্কের ক্লাস নিতে আসাটা ভাল মনে নিইনি। কিন্তু কি বা করা যায়? জানি ত, এসেই একটা সোজা প্রশ্ন সমাধান করে কয়েকটা কঠিন কঠিন টাস্ক দিয়ে চলে যাবেন। আমাদের বন্ধু অসীম কি ভেবে একটু নড়েচড়ে বসল। স্যার এই অঙ্কটা হচ্ছে না, একটু দেখাবেন? কালিপদ বসুর আলজেব্রা বই থেকে একটা সমীকরণ বের করে সে দেখাল।

সে কি, এটা পারছ না তোমরা! দেখ, এভাবে করতে হয় সাইমল্টেনিয়াস ইকোয়েশনের অঙ্ক, উনি x আর y এর পেছনে লেগে পড়লেন চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডের উপর। তারপর আধ ঘণ্টা ধরে চলে টানাহেঁচড়া, x মেলে ত y মেলেনা, y এর value বের করে বসালে x মেলে না। বুঝলে, ডিটারমিন্যান্ট মেথডে সহজ হয়, কিন্তু তোমাদের কোর্সে নেই ত। এই করতে করতে ঘণ্টা বেজে গেল।
দু দিন পরে আবার ক্লাস। স্যার বেশ উ√ৎফুল্ল হয়ে ঢুকেই আগের দিনের অঙ্কটা শুরু করে দিয়েছেন। স্যার ওটা আমরা পেরে গেছি- সমস্বরে চিৎকার। আবার অসীম। স্যার, এটা দেখুন না, ঘোড়া-ঘোড়া, ঘাস-ঘাসের অঙ্কটা। সে দিনটা গেল।

তার পরের ক্লাস। অসীমের কাছ থেকে কালিপদ বোস আবার বেরিয়ে পড়েছে। এবারের অঙ্কটা মনে হচ্ছে বেশ সোজা।
1+ 1/(1+1/(1+1/(.........এর শেষ নেই। একি, এটা কিরকম অ্যালজেব্রা, a-b-x-y কিচ্ছু নেই। না না, কোথাও কিছু ভুল আছে। স্যার টেক্সট বইয়ে ভুল হবে কি করে? এটা ত সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক! রায় স্যার রেগেমেগে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন সোজা প্রিন্সিপালের অফিসে। ততক্ষণে অসীম সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে পুরো expression টাকে x ধরে নিলে সমীকরণটা হবে x = 1+ 1/x, এটা একটা দ্বিঘাত সমীকরণ (quadratic equation), যার উত্তর হবে (1±√5)/ 2.  কিছুক্ষণ পরে প্রিন্সিপাল এলেন, একা। ছড়িটা এই প্রথম নামিয়ে কথা বললেন আমাদের সাথে- আমারই ভুল হয়েছিল। সবাই উমানাথ ঝা বা হরিদাসবাবু নন, হত পারেন না। কাল থেকে রায়বাবু শুধু বায়োলজিই পড়াবেন।

মাস্টারমশায়ের সাথে এরকম ব্যবহার আমাদের অনেকেরই ভাল লাগছিল না, কিন্তু আমাদের নিজেদের স্বার্থেই আমাদেরকে সব মেনে নিতে হচ্ছিল। তবে সেদিন থেকে অসীম বোসের নাম আমরা দিলাম কেপি বোস 'জুনিয়ার'।

Monday, September 26, 2016

প্রবাসে স্মৃতির পুজো।। প্রবন্ধ

(১)

আমি ১৯৮৩ সাল থেকেই ছিন্নমূল প্রবাসী। অবশ্য তার আগেও কখনও ঠিক বাংলায় থাকিনি, তবে বিহার (অধুনা ঝাড়খণ্ড) হলেও তাকে ঠিক প্রবাস বলা যায়না। ধানবাদ, বোকারো, রাঁচী, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, আসানসোল ও কালেভদ্রে কলকাতার পূজো দেখেছি জন্ম থেকে, সেগুলোকে সে অর্থে প্রবাসের পুজো বলতে চাই না। ৮৩ সালে চাকুরিসূত্রে মুম্বাই (তখন বোম্বে) এসে পড়লেও ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পুজোয় প্রতিবার বাড়ি ফিরে গেছি, ৮৯এ প্রথম দেখি বোম্বের পূজা।

তখন বোম্বাই শহরে বাঙ্গালিরা অধিকাংশই ছিলেন খানদানী ও উচ্চশিক্ষিত, কারণ পশ্চিমবঙ্গে তখনও শিল্পোদ্যমে ভাঁটা পড়েনি, বঙ্গের সব ক্ষেত্রের সেরা বাঙ্গালিদের টেনে নিয়ে যেত ভারতের অন্য বড় শহরগুলি। অল্পশিক্ষিতদের মধ্যে ফিল্মের টেকনিসিয়ান লাইনে আর সোনা-চাঁদী-হীরের কারিগরদের বড় কিছু দল ছিল সেখানে। তাদের হাত ধরেই বোম্বাই দুর্গাবাড়ি প্রথম দুর্গোৎসব শুরু করে ১৯৩০ সালে, ঝাবেরি বাজারে, সেখান থেকে ১৯৭১এ তা স্থানান্তরিত হয় কেম্পস কর্ণারের তেজপাল হলে। আমার সেটা বিয়ের বছর, স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি বেঙ্গল ক্লাবের পুজো দেখতে, দাদারের শিবাজী পার্কে। হঠাৎ কানে এল পাশের স্টেজে কেউ যেন মান্না দের নকল করে 'ও আমার মন যমুনার' গানটি গাইছেন। একজনকে শুধোতে তিনি বললেন, মান্না দের মত নয়, দাদা, মান্না দেই গাইছেন। মফঃস্বলে মানুষ, আমি তখনও ভাবতে পারতাম না যে হেমন্ত-কিশোর-লতা-মান্নাদেরও টিকিট না কেটে গাইতে দেখা যায়। আমাদের ছোট শহরেও একবার মান্না দে গেয়ে গেছেন, টিকিটের জন্যে সে কি হুড়োহুড়ি-মারামারি। যাই হোক, সেদিন প্রাণ ভরে মান্না দের সেরা বাংলা গানগুলো শুনেছিলাম।

না, কিশোর-লতা-আশাজীরা বারোয়ারি পুজোয় এভাবে গাইতেন না, তাছাড়া কিশোরজী তখন গত হয়েছেন কয়েক বছর আগে। ১৯৮৪ সালে মুম্বাইয়ের ব্রাবোর্ণ স্টেডিয়ামে কিশোর-লতার শেষ যুগ্ম অনুষ্ঠান হয়েছিল, উচ্চদরের টিকিট থাকা সত্ত্বেও অতবড় স্টেডিয়ামে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ভাল গান শুনতে চাও ত শক্তি সামন্তের পুজোয় ঘুরে এস, এক বন্ধু বললেন। শক্তি সামন্ত-প্রমোদ চক্রবর্তী-বাসু চ্যাটার্জি-শচীন ভৌমিক সবাই মিলে পুজো করে আসছেন বহু বছর ধরে, বম্বের সিনেমা জগতের বাঙালীদের সেটা প্রথম বারোয়ারি প্রয়াস। তার আগে প্রবাদপুরুষ শশধর মুখার্জি ও অশোককুমাররা নিজেদের বিশাল পরিবারকে একত্র করে সান্তাক্রুজে শুরু করেন শারদীয়া পূজা, যা এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন কাজোল, রানী, দেবশ্রী, অমিতকুমার- বাপি লাহিড়ীরা, এখন শুধু ভেন্যু বদলে হয়েছে বহু বছর ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা জুহুর সাহারা টিউলিপ স্টার হোটেলে।  

আমি কিন্তু এখনও ৮৯তেই পড়ে আছি। বন্ধুর কথা শুনে ট্যাক্সি নিয়ে যখন বান্দ্রার পটবর্ধন পার্কের কাছে নতুন পল্লী সার্বজনীনে পৌঁছলাম তখন অনুষ্ঠানের শেষ গান ধরেছেন তরুন গায়ক শৈলেন্দ্র সিংহ- 'ম্যয় শায়র ত নেহি'। এই ফাঁকে বলে রাখি, প্রবাসের শহরগুলোতে, এমনকি দিল্লি-বোম্বাইয়েও তখনও কেউ দেবী-মূর্তি বা তার ডেকোরেশন, লাইটিং কেমন হল তা নিয়ে অত মাথা ঘামাত না, থীম নামক বস্তুটির কথা ত ছেড়েই দিলাম। সবাই মিলে আড্ডা-সহ খাওয়া ও খাওয়ানো আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- এই দুটোই ছিল প্রধান বিচার্য। তাছাড়া জানতাম- জুহু স্কীমের জগন্ময়-বিশ্বজিতের পুজোতে ওঁদের দুজন গাইবেন। আন্ধেরি ওয়েস্টের প্রগতি সংঘ মানে মুম্বাইয়ের আরেক পুরনো অথচ বেশ ঘরোয়া পুজো, মহিলারাই সেখানে অগ্রণী ভূমিকায়। সান্তাক্রুজ সেন কলোনীর পুজো মানে মুম্বাইয়ের ওয়েস্টার্ণ রেলে যত বাঙালী কর্মী আছেন তাঁদের পুজো, যদিও প্রভাত কলোনী, ভাকোলা, কালিনা, গোলিবার- এই সমস্ত অঞ্চলের প্রায় সব বঙ্গবাসীই থাকেন এ পুজোর সাথে। আমরা দু-দিন ধরে ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। এছাড়া সেবার দেখেছিলাম এয়ারপোর্ট কলোনীর পুজো 'ঐকতান', চেম্বুর, অণুশক্তিনগর, ভাসি, সিবিডি বেলাপুর আর নিউ পানভেলের পুজো। সেই সময় আমি পানভেল ওএনজিসি কলোনিতে থাকতাম বলে আমাদের কোনও পাড়ার পুজোয় ইনভলভমেন্ট ছিল না। তবে প্রায় প্রতি পুজো প্যান্ডালেই পেয়েছি আন্তরিকতা ও আপ্যায়ন।

পরের বছর আমার বদলি হয় কাছাড় জেলার শিলচরে। বাঙ্গালিপ্রধান এলাকা, বাংলার যে কোনও জেলা শহরের সাথেই তুলনীয়, পুজোটাও মনে হয়নি প্রবাসের পুজো বলে। ১৯৯৪ থেকে ৯৯ ছিলাম দক্ষিণের পন্ডিচেরি রাজ্যের কারাইকালে, কাছাকাছি বলতে দুর্গাপূজা হত চেন্নাই-পন্ডিচেরিতে। একবার কলকাতা আসা হয়নি, দুই জায়গার পুজো দেখে এলাম, তবে চেনাশোনা কেউ ছিল না বলে কেউ কোনোরকম অন্তরঙ্গতা বা আন্তরিকতা দেখায়নি সেখানে। তবে থাকতে থাকতে পণ্ডিচেরির বাঙ্গালিসমাজের সাথে কিছুটা চেনা-শোনা হয়ে যায়, তাই ১৯৯৯ সাল থেকে আমাদের কারাকাল অঞ্চলের বাঙ্গালিদের যোগদান বেড়ে যায়। '৯৯তে আমাদের বাচ্চারা মিলে অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর নাটক 'হীরু ডাকাত' মঞ্চস্থ করে অষ্টমীর সন্ধ্যেয়, সবার বেশ পছন্দ হয় নাটকটি। ২০০০এ বদলী হয়ে আমি ফিরে আসি মুম্বাই।


(২)

২০০০ সালে আর মুম্বাইকে চেনা যায় না। পূর্ব আন্ধেরীর যে মহাকালী অঞ্চলে পাহাড়-গুহা-জঙ্গলের মাঝে কেউ থাকতে চাইত না, সে জায়গা এখন জমজমাট। জায়গাটা আমার এত ভাল লেগে গেল যে ২০০১ সালে আমি একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেললাম সেখানে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাঙ্গালীর সাথে আলাপ হয়েছে। একদিন কথাটা পাড়লাম কয়েকজনের মধ্যে। কাছাকাছি পুজো পাঁচ কিলোমিটার দূরের ঐকতান বা ছয় কিলোমিটারে প্রগতি। মহাকালী অঞ্চলে এত বাঙালী, এখানে একটা দুর্গাপুজো নামে না! ব্যাপারটা নিয়ে ইতিমধ্যে ভাবতে শুরু করেছেন অঞ্জন চ্যাটার্জী, তপন দাশগুপ্ত, মলয় চক্রবর্তী, হাজরা মাসিমা, ডাঃ মণিদীপা রায় প্রমুখ স্থানীয় বিশিষ্ট বাঙালিরা। সে বছরই পত্তন হল 'মহাকালী সার্বজনীন দুর্গোৎসব সেবা সমিতি' বা MSDSSএর। ইতিমধ্যে ১৯৯৬ সালে শুরু হয়েছে লোখণ্ডওয়ালা বা অভিজিতের পুজো- বিশাল জাঁকজমকের সাথে। গোরেগাঁও ওয়েস্টে কল্লোল কালীবাড়িতে শুরু হয়েছে শুদ্ধাচারে পুজো। এছাড়া কান্দিবলি, মালাড, ভায়েন্দরের বঙ্গসঙ্ঘ, গোরেগাঁওএর গোকুলধামে অল উইমেন্‌স্‌ পুজো- দেখি বৃহত্তর মুম্বাই সব মিলিয়ে পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে। যদি বা কিছু কম ছিল, পরের বছর, মানে ২০০২ তে শুরু হল পাওয়াই হীরানন্দানির 'এলিট' পুজো, আর চার বছর আগে সেটা ভেঙে হল দুটো। অনুরূপ ঘটনা ঘটল থানে, ভাসি, কান্দিবলির ঠাকুর ভিলেজ সর্বত্র- জানি না তা ভাল হয়েছে না মন্দ। তবে আমার আনন্দ বাড়ির কাছেই নিজেদের পুজো শুরু করতে পেরে।

এখন আমাদের শারদোৎসব শুরু হয় মহালয়ার ভোর থেকে শারদপ্রভাতের পুণ্য শঙ্খধ্বনির সাথে পুজো-প্যান্ডালে সভ্য-সভ্যারা একত্রিত হয়ে রেডিওতে 'মহিষাসুরমর্দিনী' শুনে। সাথে আনুষঙ্গিক থাকে চা-সিঙ্গাড়া-জিলিপি গরমাগরম।
চতুর্থীর সকালে হয় সত্যনারায়ণ পূজা, সেদিনই দেবীমূর্তি এনে স্থাপন করা হয় পূজামণ্ডপে। পঞ্চমীতে আনন্দমেলা- সদস্যরা কিছু মুখরোচক রান্না করে নিয়ে আসে, তা বিক্রী করা হয়, লাভ নয়, নিছক আনন্দের জন্যে। মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী পুজো হয় যথারীতি। বিজয়াদশমীতে সিঁদুর খেলা হয় দেখবার মত, তারপর প্রতিমা বিসর্জিত হয় জুহুর সমুদ্রে। ফিরে আসার পর শান্তিজল, বন্ধুদের মধ্যে কোলাকুলি, তারপর শেষপাতে থাকে সবার জন্যে মিষ্টি।

আমাদের এখনও 'থীম' বস্তুটি ঠিক হৃদয়ঙ্গম না হলেও একটা না একটা বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে থাকে প্রায় সব পুজোর সাথে। স্টার দেখতে চাও- চলে যাও অভিজিতের লোখণ্ডওয়ালায় (এবার নাকি হচ্ছে না পুজোটা- প্রায় ৩ কোটি টাকার পুজো, এবার মেজর স্পনসর নেই), নাহয় শশধর মুখার্জিদের, নয় জুহু বিশ্বজিতের পুজোয়। গান শুনতে হলে, বান্দ্রা শক্তি সামন্তের বা অভিজিতের বা সেন কলোনী। এমনি নামকরা স্থাপত্যের নিদর্শন দেখা যাবে পাওয়াই বা চেম্বুরের পুজোয়, শুদ্ধ সাত্বিক মতে পুজো দেখতে হলে কল্লোল কালীবাড়ি বা খার রামকৃষ্ণ মিশন। আরে বাবা রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গাপূজোতে একটা দিন অন্ততঃ না কাটালে, সেখানে লাইন দিয়ে অমৃতসমান ডোঙ্গাভর্তি খিচুড়ি ভোগ না দেখলে আর মুম্বাইয়ের পুজো দেখলেন কি? আর আমাদের মহাকালী অঞ্চলের পুজোর বৈশিষ্ট্য? 'আনন্দ পাবলিশার্স' আর 'উদ্বোধন প্রকাশন; থেকে বইপত্র এনে একটা স্টল খুলে বসি শুধুমাত্র আড্ডার খাতিরে, হ্যাঁ, পুরোটাই কমিটির খরচায়, লভ্যাংশও পুজোর খাতাতেই যায়। এছাড়া বাঙ্গালি-রসনার তৃপ্তির জন্যে স্পনসর্ড ফুড-স্টল ত থাকবেই, কলকাতা-মুম্বাই থেকে নামী-দামী লোকেরা এসে নেচে-গেয়েও যান। এছাড়া আর কিছু না---কিচ্ছু না, নো পম্প অ্যান্ড শো- শুধু জীবে প্রেম আর জিভে প্রেম। খাও আর গরীব-বড়লোক-ভিখারি-মধ্যবিত্ত-নির্বিশেষে নির্বিচারে তিনদিন ধরে পেট পুরে খাইয়ে যাও। আমরা স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের একটি কুকুরকেও অভুক্ত রাখতে চাইনা পুজোর এই তিনটে দিন!

ঠাট্টা নয়, আলোক-সজ্জা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে খরচ করতে চাইলে কোটি টাকাও কম, অথচ মুম্বাইয়ের মত মহানগরের কেন্দ্রস্থলে আমরা দেখতে পাই প্রতি বছর ২০% থেকে ২৫% ছাত্র বেসরকারি স্কুলগুলি ছেড়ে কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ছে, দরিদ্র বাবা-মা পড়ার খরচ জোগাতে পারছেন না। এদিকে আমরা ত সুখে আছি, আমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল-কলেজে পড়ছে, মেধা কম থাকলেও কোচিং বা ডোনেশনের দৌলতে তারা ভাল ভাল ওপেনিং পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু 'যারে তুমি পিছে রাখ সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে'- সবাইকে একসাথে টেনে নিয়ে না চললে সত্যি কি এগোন যায়, তাকে কি চলা বলে? তাই আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার উদ্দেশ্যপূরণের জন্যে এই দুর্গোৎসব সমিতির শক্ত ভিতের উপর আমরা একদিন শুরু করলাম 'শিক্ষা কি আশা', আশেপাশের আন-এইডেড স্কুলগুলিতে ড্রপ-আউট যাতে না হয়, মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যেন শেষ পর্যন্ত তাদের যোগ্যতানুযায়ী পড়ার সুযোগ পায় এবং বিশেষ করে, কোনও ছাত্রীকে যেন দারিদ্র্য বা অন্য কারণে পড়া না ছাড়তে হয় মাঝপথে। আমাদের এই কার্যক্রম ২০০৯ থেকে শুরু হয়েছিল দুটি বিদ্যালয়ের দশটি ছাত্রকে অনুদান দিয়ে, এখন তার পরিধি প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য ও সহৃদয় বন্ধুদের একান্ত সহযোগিতায়। জানি এসবের সাথে আমার প্রবাসে পূজা দেখার অভিজ্ঞতার কোনও সম্বন্ধ নেই, তবে মুম্বাই যে শুধুমাত্র 'বানিয়া' দের শহর নয়, এর একটা হৃদয় আছে জানতে পারি যখন আমাদের সাহায্য পেয়ে পরীক্ষায় সফল কোনও ছাত্রীর বাবা বা সেই স্কুলের হেডমাস্টার এসে ধন্যবাদ জানিয়ে যায়। প্রত্ত্যুত্তরে তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে বলি মা আনন্দময়ীকে, যাঁর আগমনে আনন্দে দেশ ছেয়ে গেছে। তাঁর পুজো ত তখনই সার্থক হবে যখন কোনও কাঙালির মেয়ে শুধুমাত্র মুষ্টিভিক্ষার জন্যে ধনীর দুয়ারে এসে আর দাঁড়াবে না।        

Wednesday, July 6, 2016

কবির স্বপ্ন- বাংলা কবিতা





কবির স্বপ্ন।।
পল্লব চট্টোপাধ্যায়

কোন হাটে তুই বিকোতে চাস
ওরে আমার কবি,
কতটা তুই লোভী?

যেথায় পাঠক 'ফেসবুকে'তে চক্ষু রেখে আছে
ব্যস্ততাতে চোখ পড়ে না কে যায় দূরে-কাছে,
'তরুণ কবি' নামের 'গ্রুপে' হুমড়ি খেয়ে পড়ে
উৎসাহেতে 'কমেন্ট' করে কিম্বা 'লাইক' মারে।
পয়সাকড়ি নেইকো বটে, পাস ত ভালবাসা
পাঠিকাদের হৃদয় মাঝে, নিতে কি চাস বাসা?
শুনিয়ে কবি প্রবলবেগে ঘাড়টি নেড়ে কহে-
নহে, নহে, নহে!

কোন হাটে তুই বিকোতে চাস
ওরে আমার কবি,
বলনা, কি তোর 'হবি'?

কলেজ স্ট্রীটে একটি কোণে ছোট দোকানখানা
মাঝবয়সী লোকটি রাখে সব বইয়ের ঠিকানা।
কলেজ-পড়া প্রেমী-যুগল এসে দাঁড়ায় কাছে,
আগ্রহেতে শুধায়, 'দাদা, অমুকের বই আছে'?
'অমুক'টি কে, বলতে হবে? দেখ ভেবে কি চাই,
হাফ-দামেতে ভক্তসভায় চাস কি পেতে ঠাঁই?
লোভ ত হয়, কিন্তু খালি পেটে মরব নাকি?
সবটুকু যে ফাঁকি!

কোন হাটে তুই বিকোতে চাস
ওরে আমার কবি,
ঝোলাব তোর ছবি?

মাঠ জুড়ে যে 'বইয়ের মেলা' লাগছে দেদার স্টল,
তার একটাতে শোভা পেতে চাস কি, মোরে বল।
রং-বেরঙের মলাটখানা দেখছে সবাই মিলে,
সুন্দরীরা ব্যস্ত পড়ায় বুকের কাছে মেলে।
তবু কবি, রয়ালটিতে হয়না বাড়ি-গাড়ী,
দেখ ভেবে, নয় বৌ-এর তরে একটা নিলি শাড়ি!
কবি বলে, মন্দ কি তা, ছুটব এরই পিছু,
আরো কি আছে কিছু?

কোন হাটে তুই বিকোতে চাস
ওরে আমার কবি,
কোথায় পাবি সবি?

নেতারা সব ভোটের আগে আসছে তোরই দ্বারে,
নোটের থালা, পদক মালা সাজিয়ে ভারে ভারে।
কবিতা চায় আনুগত্যের কিস্তি-পরে-কিস্তি
সঙ্গে যেন বিরোধীদের জন্যে থাকে খিস্তি।
কাব্যি লিখে কি পাওয়া যায়? ভবিষ্যতের চিন্তা,
থাকবে না আর, যাবি সেথায়, নাচবে রে মন ধিন্‌ তা!
হঠাৎ কবি লাফিয়ে উঠে বললে, দিদি, সেলাম!
এটাই ত চাইছিলাম।