Wednesday, March 8, 2017

গল্প- গীতিময়ের গীতিকথা (অফিসের গল্প - ৬)

গীতিময়ের গীতিকথা।।

স্থান- পণ্ডিচেরি রাজ্যের এক অখ্যাত জেলা-শহর।
কাল- ছাব্বিশে জানুয়ারির প্রাতঃকাল।
পাত্র- তিনিই ত নায়ক এই গীতিকাব্যের, ক্রমশ প্রকাশ্য।

পতাকা উত্তোলন হয়ে গেছে। জেনারেল ম্যানেজারের ভাষণও। এরপর সাধারণতঃ মিষ্টির প্যাকেট বিলি করা হয়, সেই সঙ্গে কিছু গানবাজনা, হাল্কা মনোরঞ্জন।
এমন সময় শুনতে পেলাম মাইক হাতে নিয়ে কেউ একজন মর্মান্তিক করুণ সুরে ইনিয়ে-বিনিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। ভাষা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, তবে একটা বুকফাটা আর্তনাদের মত শোনাচ্ছে। 'আরে মাইক মে কৌন রো রহা হ্যায়?' বলে আমি আশেপাশে জবাবের জন্যে তাকালাম।
- দাদা, জি-এম গান গাইছে। মাইকটা বোধহয় একমিনিটের জন্যে খালি পড়েছিল, ওটা হাতিয়ে নিয়েছে। এবার তাহলে কেটে পড়ি- ভাস্কর বিশ্বাস খবরটা জানাল।
আমি নতুন এসেছি প্রজেক্টে, কিছুই বুঝলাম না। 'এখানকার জেনারেল ম্যানেজার গান গেয়ে শোকপালন করেন?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করি। এতক্ষণে বুঝতে পারছি যৎপরোনাস্তি বেসুরো গলায় 'অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ' গানটা গাওয়া হচ্ছে।
- না দাদা, ইনি জি-এম মানে গীতিময়। পারচেজ অফিসার জি এম সোম। ফাটাফাটি ওস্তাদ। একাই পুরো টাউনকে মাতিয়ে রেখেছেন।

ঘণ্টাখানেক চরম অস্বস্তিতে কাটিয়ে টাকমাথা সদাহাস্যময় গীতিময়বাবুর সাথে বলতে গেলে নিজের স্বার্থেই গিয়ে আলাপ করলাম। বললাম 'দেখুন, গানবাজনা আমরাও একটু-আধটু করে থাকি। তা, আপনি যে একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, তা তো ওই গলা শুনেই বুঝেছি। গানটা আপনি ভালই করেন। তবে রেয়াজ করবেন নিয়মিত। তাহলে গলায় সুরটা অন্ততঃ আসবে।'
আমার খোঁচাটুকু মাঠে মারা গেল। উনি বরং উৎসাহিত হয়ে বললেন-'আরে আপনি ড্রিলিং অফিসে নতুন এসেছেন না! ওই ত আপনাদের পেছনের ব্যাচেলার ফ্ল্যাটে আমি থাকি। ফ্যামিলি আনতে পারিনি, বুঝলেন কিনা, ছেলেমেয়ে কলকাতায় পড়াশুনা করে। তাই ওই গানবাজনা করেই সময় কাটাই। তা আপনার ওখানে যাব একদিন, বৌদির সঙ্গে আলাপ করে আসব।'

ব্যস, খাল কেটে কুমীর ডাকার কাজটা আমি সুসম্পন্ন করে ফেললাম। এই কাজটা না করলে আমি গানবাজনা এত শিগ্‌গির ভুলতাম না বোধহয়।
গীতিময়বাবু রেয়াজ করেন না তাঁর অতিবড় শত্রুও বলবেন না। সকাল থেকে শুরু হয় তাঁর কাক তাড়ানো, অবশ্যই এক অনৈচ্ছিক প্রক্রিয়ায়। আবার সন্ধ্যের পর বসে আসর, অনেকেই আসেন কানে তুলো লাগিয়ে, ক্যান্টিন থেকে আনানো চা আর চপ-সিঙ্গাড়ার সদ্‌ব্যবহার করে কেটে পড়েন। ফলে আমার রাত জেগে বইপড়া বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভোরবেলায় উঠে পড়তে হয়, আর গুরুদেব যতই বলুন, এই সুর শুনায়ে ভাঙা ঘুমটা আমার মোটেই রমণীয় হয় না।
ইতিমধ্যে আমাদের অফিসার ক্লাবের বাৎসরিক অনুষ্ঠানের দিন এসে পড়ল। 'আমাকে কুড়িমিনিটের মত সময় দেবেন, ভাই', গীতিময়বাবু আমাকে সলজ্জভাবে অনুরোধ করলেন। 'দেখি, কতটা দেওয়া যায়', আমি কালচারাল সেক্রেটারি হিসেবে নিজের দায়িত্বের কথা মনে করে বললাম, 'অনেক নাচিয়ে-গাইয়েই আছেন কিনা! তাছাড়া মিসেস বিশ্বাস, ট্রান্সপোর্টের ভটচাযদা আছেন, এঁরা একটা গীতিনাট্য টাইপের করছেন। মিসেস তিওয়ারির ঠুমরি-দাদরা, ডাঃ দাসের গজলেও ত বেশ খানিকটা সময় যাবে।'

ভেবেছিলাম ফাংশানের দিন ব্যস্ততার ভান করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াব, সেখানেও বিধি বাদ সাধলেন। 'আরে ভাই, সোমবাবুকো ভি কোই গানা গানে বোলো, ইতনা বড়া মেহফিল উনকে বগের থোড়ে জমেগা!'- নকল জি-এমের জন্যে দরবার করলেন আসল জি-এম সৈনী স্বয়ং। ভাবখানা এই যে মজাটা দেখাই যাক। গীতিময়বাবুকে আর পায় কে! অর্কেস্ট্রাকে ইশারা করে মাইক টেনে নিলেন তিনি। সৈনীসায়েব একটা চিকেন কাবাবের টুকরো মুখে নিয়ে কানের তুলোটা গুঁজে নিলেন ভাল করে।

'স্যার, একটু তুলোটা খুলে শুনুন, কিশোরের গানটা ভালই গাইছেন দাদা।' একজন পারিষদ পাশ থেকে বললেন।
'ইস গলতফহমি মে না রহিও। লগতা হ্যায় তুমলোগোঁকে কানোঁ কো সোমবাবুকা গানা শুননে কা আদত পড় গয়া হ্যায়। 'জিন্দগী' বোল রহা হ্যায় ইয়া 'গন্দগী'!'

বলছেন। আবার একটা গান শেষ হতেই 'আউর এক, আউর এক' বলে চিৎকারও করে যাচ্ছেন। আমি এই কথাটাই এবার সাহস করে তাঁকে বললাম।
'আরে মুখর্জি, ইধর বইঠো, তুমকো সমঝাতা হুঁ।' আজ স্যার বেশ ভাল মুডে আছেন মনে হচ্ছে।
তারপর ওঁর কাছে যা জ্ঞানলাভ করলাম তাঁর নিজের ভাষাতেই বাংলা করে দিচ্ছি।

' জান ত আমি একজন সিভিল ইঞ্জিনীয়ার। আমরা মাটি খোঁড়ার যে বরাত কন্ট্রাকটারদের দিই তার রেট হয় ভলিউম হিসেবে। তা এরিয়া তো সহজেই মাপা যায়। তার সঙ্গে ডেপ্‌থ গুণ করলে এক্সক্যাভেটেড ভল্যুম বেরোয়। খোঁড়ার গভীরতা মাপার জন্যে ওরা কি করে, একটা ছোট্ট অংশকে না খুঁড়ে যেমনকার তেমনি রেখে দেয় ডেটাম বা বেঞ্চ মার্ক হিসেবে, পরে আমরা সেটার উচ্চতা মেপে সেই অনুযায়ী পেমেন্ট করি।'
'তা বুঝলে, এই সোমদাদার গানটাও তাই। আমার কন্যা পাঁচ বছর আগে গান শিখতে শুরু করেছিল, তার আগে ওকে সোমের গান শুনিয়েছিলাম। আজ ওর কলেজের ছুটিতে এসেছে, আবার সোমের গান শুনছে। এখন একটা কম্পারিসন করলে ওর কতটা উন্নতি হয়েছে সেটা বুঝতে পারবে, কারণ সোম তো সুরোঁ কা বেঞ্চ মার্ক হ্যায়, পেহলে জাহাঁ থা পাঁচ সাল কে বাদ ভি ওহিঁ হ্যায় আউর বিশ সাল বাদ ভি ওয়সা হি রহেগা।'

'স্যার, আপনি জানেন না, সোমবাবুর গান শুনে শুনে আমি চেনা গানগুলোরও সুর ভুলে যাই আজকাল। ইয়ে খতরা ভি হ্যায়', আমি সবিনয়ে বলি।
'অ্যাঁ, তাই নাকি?' এবার চমকানোর পালা সৈনী সাহেবের। 'ওরে, কে আছিস, সোমবাবুকে একটু ধরাধরি করে স্টেজ থেকে নামা বাবা!'

Friday, February 24, 2017

কবিতা- "জঙ্গলমহলের ভূত"

জঙ্গলমহলের ভূত।

কাটাই ক'দিন নিজের মনে
জঙ্গলমহলের বনে
ছাড়িয়ে পরে ঝাড়গ্রাম,
নেইকো মনে গাঁয়ের নাম,
পেরিয়ে গেলাম অনেকদূর
লোধাশুলি-মোহনপুর

চৌকিদার সনাতন মুড়া
মানুষটা থুত্থুরে-বুড়া,
বুঝিয়ে দিল 'দিকু* বটিস,
কাগমারাদের সমঝে চলিস।
বিটিছিলা দেখলে একা
করিস্‌না ঢের মিলা-মিখা।'

দিইনি তাকে পাত্তা মোটেই
খেয়ে-দেয়ে কাজ বুঝি নেই?
হঠাৎ দেখি উলঙ্গিনী
সামনে খাড়া লুটিয়ে বেণী
গভীর বনে মানুষ কোথা?
এমন তো ছিল না কথা!

কঙ্কালসার কালো শরীর
পায় না ঢাকা ছেঁড়া শাড়ির
মুণ্ডু কোথায়, করোটি-সার
চক্ষুদুটি কোটরে তার;
শরীর ঝোলে শূন্যে তারি
স্পষ্ট বুঝি অশরীরী।

কাকমারাদের মেয়েই বোধহয়
যার কথা চৌকিদারে কয়,
দেহটা মোর আটকে গেছে
পালাই সে হিম্মৎ কি আছে?
হঠাৎ দেখি পেছন ফিরে
ছুট লাগাল পেত্নিটা রে!

ও জঙ্গলের অশরীরী শোন,

ওরে ও কালো পেত্নি রে শোন,
তোকে দেখে তো আমিই ভয়ে 
ছুটতেছিলেম ঝোঁপ মাড়িয়ে-
তোর কি হল, হুড়মুড়িয়ে
পালাস ছুটে আগ বাড়িয়ে?

তুই যে অবাক করলি আমায়,
মানুষ দেখে ভূত কি পালায়?
তোর কি আছে? হাড্ডি তো সার,
ছেঁড়া কাপড় ঢাকবে কি আর!
হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল,
গল্প বুঝি এমনি ছিল-

কোন্‌ ভদ্দর বাবুর সনে
ভিড়েছিলিস সরল মনে? 
তারপরে যে হলি জবাই,
তুই ছাড়া তা জানে সবাই।
পেত্নি- উঠে পড়রে গাছে
পুরুষকে কি ভরসা আছে!

* দিকু = যারা আদিবাসী নয়

গান

কোরাণ পড়িতে দিয়োগো আমারে
নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে।
বয়েত বলিতে না যদি বা পারি,
ফেলোনা আমারে মরায়ে।।

গলিত পচা এই সমাজের ভার
ধরম বেচিয়া টানি কত আর
নিজ হাতে তুমি কষে দিও মার
দোজখের বেড়া যাই পারায়ে।।

ক্ষমতাপিয়াসী পুরোহিত-মোল্লা
ভাগাও তাদেরে মারিয়ে,
নিজে এসে বোস নিজের দোকানে
খেদাও সবারে তাড়িয়ে।

বিকায়ে তোমারে তারা লাভ পায়
তোমার লাভের গুড় পিঁপড়াতে খায়,
মোর আর্জি তোমার কানেতে না যায়,
দালালের দেয়াল পারায়ে।।

গল্প তবু গল্প নয়- "অপয়া"

অপয়া।

(গল্প, তবু গল্প নয়)


বরাকরের বেগুনিয়া মোড়ে নেমে ডিসেরগড়ের পথে পড়ে ছোট্ট টাউনশিপ ঝালবাগান। সেখানকার ইউনাইটেড ক্লাব JUC ফুটবলের দুর্ধর্ষ দল। ওদেরকে হারাতে পারে ডিসেরগড় কয়লাঞ্চলে এ হেন টীম নেই।তবে এবার কুলটি বন্ধুমহল আর নিরসা এসসি ক্লাব তাদের ভাল চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। ঝালবাগান ইউনাইটেড ক্লাবের মাঠে ঝালবাগান বনাম নিরসার ফাইনাল। দ্বিতীয়ার্ধের ৩৫ মিনিট পর্যন্ত খেলা গোলশূন্য। ঝালবাগানের গোলকীপার ছাড়া পুরো টীম মরিয়া হয়ে উঠে এসেছে নিরসার পেনাল্টি বক্সে। এমন সময় একটা ভুল পাস থেকে কাউন্টার করল নিরসার ফরোয়ার্ড ছেলেটি। এগিয়ে আসা গোলরক্ষককে কাটিয়ে এগিয়ে গেল সে, ছ'গজ দূরেই ফাঁকা গোল। গোলে শট নেবার মুহূর্তে একজনের কানফাটানো আওয়াজ ভেসে এল- 'দিগম্বর ষাঁ------ড়'। কি হল কে জানে, ছ'গজ থেকে ফাঁকা গোলের বল উড়ে গেল বারের বহু উপর দিয়ে। অবিশ্বাস্য ঘটনা! তারপরই খেলার মোড় ঘুরে যায় আর শেষ মিনিটের গোলে জিতে যায় ঝালবাগান ক্লাব।

এই অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হিসেবে আমার প্রথম কাজ হল এই দিগম্বর ষাঁড়ের খোজ নেওয়া- কে এই স্বনামধন্য মহাপুরুষ। কিন্তু যাকেই শুধোই সেই কানে হাত দিয়ে কেটে পড়ে। কাছাকাছি সাঁকতোড়িয়ায় পিসির বাড়িতে উঠেছি, ছুটি কাটাতে এসে। পিসতুত দাদা ঝালবাগান ক্লাবে খেলেছে সেদিন। ওর কাছে, আর দুই ছোট ভাইয়ের কাছে জানতে পারলাম দিগম্বরের বিবরণ। তখনও শীর্ষেন্দুর 'পাতালঘর' বইটা বেরোয়নি, আমরা জানিনে 'অপয়া গোবিন্দে'র কাহিনী। পরে ছবিটা দেখে বুঝেছিলাম অপয়া গোবিন্দ আর দিগম্বর ষাঁড়ের মধ্যে কোনও বিশেষ তফাৎ নেই। তফাতের মধ্যে গোবিন্দ নিজের অপয়া স্টেটাস নিয়ে গর্বিত ছিল, এইটুকু।
একটুও বাড়িয়ে বলছি না, বরাকর স্টেশন থেকে শেয়ারের অটোয় সাঁকতোড়িয়া আসছি, এমন সময় অটোওলার সাথে এক যাত্রীর ভাড়া নিয়ে বচসা শুরু হল। ভাড়ায় কিছুতেই বনছে না দেখে গ্রাম্য লোকটি রেগে বলল, 'দু'টাকা লিবি নাই? লে তবে, দিগম্বর ষাঁ...', এটুকু বলতেই ফটাস্‌- একটা টায়ার ফেটে গেল। গাড়ি কোনমতে রাস্তার ধারের নয়ানজুলির মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। মিথ্যে বলছি না, মহাশয়টি চিরকুণ্ডা থেকে আসানসোল পর্যন্ত একসময় নিজের নামেই বিখ্যাত ছিলেন, ওনার ছেলেমেয়েরা আমার পরিচিত, তাদের মুখ চেয়ে গল্পে ভদ্রলোকের নামটা শুধু বদলে দিলাম। তাছাড়া আমাদের প্রিয় জুকেরবার্গ-সৃষ্ট এই মুখগ্রন্থটির কোনও ক্ষতি হোক তাও আমি চাইনা।
আজ্ঞে হ্যাঁ, দিগম্বরবাবুর ছেলে আমার থেকে বেশ খানিকটা বড় ছিল বলে আমার সাথে মুখচেনা আলাপ থাকলেও বন্ধুত্ব ঠিক ছিল না। তবে ওঁর মেয়ে সবিতা আমার পিসতুতো বোনেদের বান্ধবী, সেই সূত্রে আমারও বন্ধু। সবিতা তখন কলেজে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে, একদিন ওদের অ্যাম্বাসাডার গাড়ি নিয়ে সকাল সকাল এসে হাজির পিসীর বাড়ি। এসেই দিদিকে ধরেছে, চল না প্রিয়াদি, বরাকর বাজারে একটা হারমোনিয়ম কিনতে হবে। দিদি আবার দুষ্টুমি করে বলল, আমার মামাতো ভাই এসেছে, ওকেও নিয়ে যাই, জানিস তো, ও ভাল হারমোনিয়াম চেনে। ভাবটা এই, চল্‌ না আমাদের সাথে, মজাটা দেখবি!
ও বাবা, এ যা শুনলাম, দিগম্বরবাবু মেয়েকে যন্তোরটা কেনার জন্যে যা টাকা দিয়েছেন, তাতে হয়ত ক'খানা রীড আসবে মাত্র। সবিতা বলল, দ্যাখ, বাবা আমার সম্বন্ধ করছেন। এই অঞ্চলে বাবার সুনাম তো সবাই জানে। তাই আমাকে কিছুটা গান শিখতেই হবে। অন্ততঃপক্ষে দুটো করে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, ভক্তিগীতি, লোকগীতি আর আধুনিক হলেই হবে। বাদ্যযন্ত্রের দোকানে গিয়ে বললাম- সাঁকতোড়িয়ার শ্যামাপতিবাবু আমার পিসেমশাই, ওঁর মেয়ের জন্যে একটা হারমোনিয়াম কিনতে চাই। পিসেমশায়ের নামে ভদ্রলোক বিগলিত হয়ে একটা সেকেণ্ড হ্যান্ড হারমোনিয়াম প্রায় জলের দরে দিয়ে দিলেন। হারমোনিয়াম নিয়ে খুশিতে নাচতে নাচতে সবিতা বাড়ি ফিরে গেল। পরে শুনেছিলাম, সবিতার ভাল বিয়ে হয়েছে, তবে কলকাতা গিয়ে বাসাভাড়া নিয়ে সব আয়োজন করতে হয়েছে।


আজ আর দিগম্বরবাবু এ জগতে নেই, জানিনা ডিসেরগড় অঞ্চলে এখনও তাঁর নামে হাঁড়ি ফাটে কিনা। পরে জেনেছিলাম উনি ছিলেন মারোয়াড়ি, জীন-ধর্মগুরু ঋষভদেবের ডাকনাম 'ষাঁড়' উপাধি গ্রহন করেছিলেন তাঁরা- অবশ্য ওখানে থেকে থেকে বাঙ্গালিই হয়ে গেছিলেন। তবে বাবার উপাধি ছেলে নেয়নি, জৈন লিখত সে। তার কারণ কি বাপের সুনামের প্রতি ঘৃণা, না অন্য কিছু?তা জানিনা, তবে এটুকু জানি বসতবাড়ি আর ঝালবাগান মোড়ের মুদীর দোকানটুকু ছাড়া ছেলে আর কিছুই পায়নি, বাকি সব অস্থাবর সম্পত্তি দিগম্বরবাবু দান করে গেছেন একটা চ্যারিটেবল মিশনকে।

গল্প- "মেয়ে-ছেলে"

মেয়ে-ছেলে।


এপ্রিলে স্কুলের নতুন সেশন শুরু হল। ফোর্থ স্ট্যান্ডার্ডের ক্লাসে সেকশান বি তে ঢুকেই ক্লাস টিচার মিস তপাদারের চক্ষুস্থির। কো-এড স্কুল হলেও এখানে ছেলে আর মেয়েদের আলাদা সেকশন, কখনও তার অন্যথা হয় না। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের একটু গোঁড়ামি রয়ে গেছে আজকের দিনেও। কিন্তু ফার্স্ট বেঞ্চের বাঁ-দিকে যে দুজন বসে আছে তারা কি ধরণের মেয়ে? স্কুল ইউনিফর্মই পরেছে, তবে প্যান্ট-শার্ট। 'এ কি, তোমরা এখানে কেন? এ-সেকশানে যাও।' তিনি ভাবলেন, ভুল করে এসে পড়েছে, সেশনের গোড়ার দিকে এরকম হয়েই থাকে। 'সেকশন-এ খুঁজে পাবে কি, নয় আমি পৌঁছে দিচ্ছি, চল।'

'মিস্‌, আমার নাম বি-সেকশানে আছে, এই দেখুন।' ভাইস প্রিনসিপালের সই করা কাগজ দেখাল একজন । 'হুঁ, ফাল্গুনী রায়। মেয়েদের নাম রেখেছে মা-বাবা, ভিপি আর কি করবেন!'
'মিস্‌, অর্জুনের নাম ছিল ফাল্গুনী।' ছেলেটি ব্যাখ্যা করে। নিজের অজ্ঞতায় লজ্জা পেলেও মুখে সেটা প্রকাশ করেন না মিস্‌ তপাদার। উলটে অন্য ছেলেটিকে নাম জিগ্যেস করেন।'সবিতা, মিস্‌, সবিতা সিন্‌হা। সূর্যের এক নাম সবিতা'- অন্যজন জ্ঞান জাহির করে।
'ঠিক আছে, ঠিক আছে', পরিস্থিতিটা সামাল দেবার চেষ্টা করেন শিক্ষিকা। 

রোল কল করার পর কিছুক্ষণ গল্পগাছা চলল এই নিয়ে। ঠিকই ধরেছেন তিনি। খালি সীটগুলো ভরার জন্যে প্রতিবছর একটা ইন্টারভ্যু হয়, বেশ কিছু আবেদন পড়ে। সবিতা আর ফাল্গুনী সেলেক্ট হবার পর ভিপি ওদের নাম দেখে মেয়ে ভেবে পাঠিয়ে দেন বি-সেকশানে, আর সেখান থেকেই গোলযোগের শুরু। যাক গে, পরে প্রিন্সিপালকে বলে শুধরে নেওয়া যাবে, মিস তপাদার পড়ানো শুরু করলেন।

রিসেসে প্রিন্সিপালকে কথাটা জানাতেই তিনি ত হাঁ। ভাইস প্রিন্সিপাল মিসেস পানওয়ালাকে ডেকে পাঠালেন। ইনি আবার পার্শি সম্প্রদায়ের মানুষ, তবে বাঙলা লেখাপড়া ভালই জানেন। কিন্ত হিন্দু পুরাণের ইনি আর কতটুকু জানবেন, হিন্দুরাই অত খবর রাখেনা যেখানে। তিনি বুঝলেন, একটা বড় ভুল হয়ে গেছে, কিন্তু ছেলেদের সেকশান ত ফুল- অতিরিক্ত ছাত্র নিতে ম্যানেজমেন্টই আপত্তি করবে। তাছাড়া ব্যাপারটা নিয়ে জল ঘোলা হলে সবারই বদনাম। অগত্যা প্রিন্সিপাল বললেন, 'মিস্‌ তপাদার, যতদিন না মেয়েরা বা তাদের গার্জেনরা অভিযোগ করছে, ততদিন এরকম চলতে দিন। সেকশন-এ তে সীট খালি হোক, তখন দেখা যাবে।

যাদেরকে নিয়ে এত কাণ্ড, এদিকে তারা কিন্তু গোকূলে বেড়েই চলেছে। মেয়েরা কয়েকদিনের মধ্যেই আবিষ্কার করল যে সবিতার মাথা অঙ্কে খুব পরিষ্কার, আর ফাল্গুনী খুব মজার ছেলে- জোক আর মজার গল্পের ভাণ্ডারী। মেয়েদের মধ্যে অনেকেরই মাথায় অঙ্কের কচকচি ঢুকত না, সবিতা ধৈর্যধরে তাদের সব বুঝিয়ে দেয়। টিচারও অবাক, গাধা মেয়েগুলোও প্রতিটা হোমটাস্ক করে আনছে কি করে আজকাল। আর টিফিনের সময়টা অল-ফাল্গুনী'স টাইম। সেদিন ও সুকুমার রায়ের 'অসি-লক্ষণ পণ্ডিত' গল্পটা বলছে, গলা নাকি করে 'তঁলোয়াঁরটাঁ কেঁমন ছিঁঁল' বলতেই মেয়েরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ছে। দেখা গেছে টিচাররাও কদিন দরজার বাইরে থেকে আড়ি পেতে পাগলা দাশুর গল্প শুনছে।

এভাবেই একটা বছর কেটে গেল। পরের বছর চেষ্টা-চরিত্র করে ছেলেদের সেকশানে দুটো সীট খালি রাখা হল। ঠিক হল, ফাল্গুনী-সবিতা এবার থেকে সেকশান-এ তে বসবে। সব ঠিক ছিল, বাদ সাধল ক্লাসের মেয়েরা। সবাই তখন ওদের ফ্যান। দু-চারজনের আবার বাড়ি থেকেও রিকোয়েস্ট এল। এবার অবাক হওয়ার পালা প্রিন্সিপালের। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষিকা-জীবনে অনেক রকম সমস্যার সমাধান করেছেন তিনি, কিন্তু এ যে একেবারে নতুন ধরণের। তড়িঘড়ি বোর্ডের মিটিং কল করলেন তিনি।

আজ স্কুলে একটা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার থেকে আর ছেলে-মেয়ের আলাদা বিভাগ থাকবে না। অর্ধেক সংখ্যক মেয়েকে পাঠিয়ে দেওয়া হল সেকশন-এ তে, সেখান থেকে ছেলেদের আনা হল বি-তে। কি আশ্চর্য, অভিভাবকরাও কেউ আপত্তি করলেন না। আর এ সব সম্ভব হল দুটি ছেলের জন্যে, যাদেরকে সবাই মেয়ে ভেবেছিল!

ইনসোমনিয়া

ইনসোমনিয়া।।

অনেকেই একটা বয়েসের পর অনিদ্রা রোগে ভোগেন। বর্ষাকাল হলে নাহয় কবির সাথে জেগে থাকা যায় এই বলে-
'অশ্বথ পল্লবে বৃষ্টি ঝরিয়া
নিশীথের অনিদ্রা দেয় যে ভরিয়া মর্মর শব্দে।'
অনেকে আবার ভাবেন জেগেই ত আছি, তাহলে বরং ফেসবুক বা একটা গল্পের বই নিয়ে বসা যাক। দুটোই সমান ক্ষতিকর মশাই। ফেসবুকের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম, ভুলক্রমে যদি হাতে শরদিন্দু, সত্যজিৎ বা সুনীল চলে এসেছে, আর রক্ষা নেই। আমার মনে আছে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'পূর্ব-পশ্চিম' একরাত্রে পড়ে ফেলেছিলাম, ভাগ্যিস পরদিন অফিস ছিল না। 

মানুষ ভুল থেকেই শিক্ষা নেয়। তারপর কোত্থেকে জানিনা হাতে এল দুখানা বই- অন্নদাশঙ্কর রায়ের 'সাহিত্যে সঙ্কট' আর খান আব্দুল গফফর খানের 'খুদা-ই খিদমৎগার আন্দোলন' (বঙ্গানুবাদ)। বললে বিশ্বাস করবেন না, আজ পর্যন্ত বইদুটোর চারপাতার বেশী পড়তে পারিনি, শুরু করলেই ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসে- এত প্রচণ্ড বোরিং। তবে এটা ঠিক যে একটা বই চাই, ঘুমের ওষুধের বিকল্প হিসেবে। এই বিষয়ে একটা মজার গল্প পড়েছিলাম, সম্ভবতঃ শিব্রামবাবুর লেখা, সংক্ষেপে শোনাই।

এক ভদ্রলোক, ঘুমের ব্যাপারে আমার থেকে এককাঠি ওপরে। কিছু না পড়লে তাঁর ঘুমই হবে না, সারারাত জেগেই কাটিয়ে দেবেন। তাঁর স্ত্রীও এই অভ্যেসটা জানেন বলে ভদ্রলোক কোথাও গেলে তাঁর ব্যাগে অন্ততঃ একটা ম্যাগাজিন ভরে দেন। তবু ভুল হয়। একটি অফিসিয়াল ট্যুরে প্রায় মাঝরাতে হোটেলে পৌঁছে ভদ্রলোক আবিষ্কার করলেন, গিন্নি তাঁর ব্যাগে বই কেন, একটা খবরের কাগজও রাখেননি। হোটেলের কর্মচারিরা কেউ জেগে নেই, কাকে ডাকবেন? শেষমেষ রুমের ড্রয়ারের মধ্যে একটা সাদা প্যাড আর পেনসিল পেলেন। তারপর যত্ন করে সাদা কাগজে লিখলেন- 'জল পড়ে, পাতা নড়ে'।

এবার ভদ্রলোক নাইট ড্রেস পরে বিছানায় এলেন, হাতে সেই কাগজটি। আরাম করে শুয়ে বেড ল্যাম্প জ্বালিয়ে কাগজটি পড়া শুরু করলেন।

'জল প.........'

তত্ত্বকথা

"তত্বকথা"

ধূমপান।।

ধূমপান ছেড়েছি অনেকদিন হল। তাই সেসব সম্বন্ধে লেখবার অধিকার আমার কিছুটা জন্মেছে বললেই চলে। ধূমপান যে করে সে যদি নাও বা মরে, আশেপাশের লোকজনদের বিরক্ত করে বৈকি। জানিনা তার সুফল আছে কিনা, তবে রবি ঠাকুরের 'ক্যামেলিয়া' কবিতার নায়ক একটা সুযোগ অবশ্যই পেয়েছিল, নায়িকা কমলাকে ইমপ্রেস করার। খুব আদর্শ পরিবেশ, তবু সে পারেনি- দরকার হয় কবিতাটা পড়ে দেখুন। 

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল। কলকাতার একটি মিনি বাসের মধ্যে বসা এক ভদ্র-সভ্য যুবক লক্ষ্য করলেন যে সামনের সীটে বসে একজন সিগারেট খাচ্ছে। না, তিনি আপত্তি করলেন না, বরং তাই দেখে (ভুক্তভোগীমাত্রেই জানেন, ধূমপানের ইচ্ছে নামক রোগটা কতটা সংক্রামক) তাঁরও 'সিগারেট' পেল। আগেই বলেছি, তিনি ভদ্রলোক, তাই কন্ডাক্টারকে ডেকে সবিনয়ে জিগ্যেস করলেন- 'দাদা একটা সিগারেট খেতে পারি?'
'না', কন্ডাক্টারের কড়া উত্তর, 'দেখছেন না, NO SMOKING লেখা আছে বড় বড় করে বাসের গায়ে?' 'তাহলে ওই সামনের ভদ্রলোক খাচ্ছেন কি করে?' যুবকের প্রশ্ন।
'তিনি কি আমাকে জিগ্যেস করেছেন?!'

ধূমপানের অনুমতির ব্যাপারে আরেকটা বাজে গল্প আছে। তবে এটাও পুরনো। গুরুকুলের প্রার্থনাসভায় এক শিষ্যের খুব 'ধূমপান' পায়। সে একদিন সাহস করে বলেই ফেলল- 'গুরুদেব, আমি কি প্রার্থনা করতে করতে ধূমপান করতে পারি?' গুরু খেপে গিয়ে এক ধমক দিলেন। 
পরের দিন শিষ্যটি লক্ষ্য করল আরেকটি শিষ্য সেখানে মনের আনন্দে হুঁকো টেনে যাচ্ছে, অথচ গুরুদেব কিছু বলছেন না। প্রার্থনাশেষে প্রথম শিষ্যটি ধরেছে দ্বিতীয়টিকে- 'ভাই আমাকে ত গুরু ধমকে দিলেন। তা তুই কিভাবে অনুমতি আদায় করলি শুনি।'

'আমি ত তোর মত বোকা নই', দ্বিতীয়জন বলে, আমি জিগ্যেস করেছিলাম, 'গুরুদেব, আমি কি ধূমপান করতে করতে প্রার্থনা করতে পারি? তাই শুনে গুরুদেব খুশি হয়ে বললেন, বৎস, তোমার মত ধার্মিক দেখা যায় না, তুমি ধূমপান করতে করতেও প্রার্থনা করতে চাও? এমন শিষ্য পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার! স্বচ্ছন্দে করতে পার।'

এবার একটি ছেলে ভুলোনো ধাঁধাঁ। সব জিনিষ ত টানলে বাড়ে। তা কি এমন আছে, যা টানলে কমে?
এর উত্তরটাও কি বলে দিতে হবে!