Sunday, August 13, 2017

ছড়া- অদ্ভুতুড়ে বিয়ে।

"অদ্ভুতুড়ে বিয়ে"
শ্যাওড়াফুলির ক্যাওড়াতলায় থাকত সে এক পেত্নি,
সম্পর্কে বেতাল ভাটের হত সে যে নাতনী।
পড়শি ছিল কারিয়া পিরেত
মাথাটি তার নয়কো নিরেট
স্বপ্ন দেখে একদিন সে করবে তাকে পত্নী।
সংকল্পখানা সে যে রেখেছিল প্রায় গুপ্ত,
ক্রমে ক্রমে ইচ্ছেটা তার রইল না আর সুপ্ত।
ভাবতে থাকে কিভাবে সে তার
কার্যখানা করে উদ্ধার,
পেত্নিরে সে পত্নী করে হবেই অবলুপ্ত!
ছিরামপুরের গাঙ্গের ধারে মস্ত ছিল খামার
সেইখানে তার বন্ধু ছিল রমাকান্ত কামার
উল্টোলে তার নামের আদল
একই থাকে, হয়না বদল,
ভূত হয়ে তাই রইল মানুষ মতন তোমার-আমার।
এক সন্ধ্যেয় পেত্নিটা যার নামটি ছিল ন্যাকা
কারশেডের ওই নোংরা ডোবায় ধুচ্ছিল গা একা।
এমন সময় রমাকান্ত
ভূত হয়ে যে ছিল জ্যান্ত,
চাপল ঘাড়ে, বুঝল না কেউ, যায় না তাকে দেখা।
কি হল ছাই কেউ বোঝেনা, রমাকান্ত কামার
ন্যাকার ঘাড়ে চড়ে কেবল গাইতে থাকে ধামার,
সবাই বলে কাণ্ডটা কি?
ন্যাকার হল বিকার নাকি!
ভূতের দেশে আমদানি কে করল সারেগামার?
কি যে হল ন্যাকারানীর কেউ পারেনা বুঝতে
গেছো-মেছো-মামদো-নিশি ব্যস্ত সবাই খুঁজতে।
হাফ-ভূতকে যায়না দেখা,
পিঠের ব্যথায় মরছে ন্যাকা,
কাণ্ডটা কি জানলে তবেই পারবে কি না যুঝতে!
এমন সময় কারিয়া পিরেত হাজির চেপে প্যাঁচায়,
বললে, ওহে মেয়েভূত কি এমনি করে চেঁচায়?
মানুষ কাঁধে ভর করেছে,
ন্যাকা বুঝি প্রায় মরেছে,
আমি ছাড়া আর কে আছে পেত্নিকে আজ বাঁচায়!
সবাই মিলে ধরল তাকে, ‘কারিয়া প্রেত ওরে,
জানিনা এই পেত্নিটাকে কে রয়েছে ধরে।
তুই যদি তোর বিদ্যে দিয়ে
ন্যাকাকে আজ দিস বাঁচিয়ে
তোর সাথে ওর দেবই বিয়ে, দেখি কে কি করে!’
কারিয়া শুনে বুক ফুলিয়ে বললে ‘ওরে কামার,
শোনরে ব্যাটা, আদেশ দিলাম ঘাড় থেকে ওর নামার।‘
মুচকি হেসে আসলো নেমে
দেখল সবাই শ্বাসটি থেমে,
রমাকান্ত বলল ‘ওরে, ন্যাকা এখন আমার’।
কাণ্ড দেখো, ন্যাকা এখন হেসেই কুটিকুটি
রমাকান্তের সাথে কেমন করছে সে খুনসুটি।
বললে, ‘ওগো কারিয়া প্রেত,
বন্ধু তোমার মানুষটা গ্রেট,
মোদের হল মালা বদল, তোমার এবার ছুটি’।

Thursday, August 10, 2017

বাংলা অণুগল্প- শিশুতীর্থ।

শিশুতীর্থ।।
((অণুগল্প)
'আবার সেই পাগলিটা এসেছে স্যার', গগৈ চিৎকার করে, 'ভাত চাইছে'।
'বেশ্যা মাগী!' ঘেন্নার সাথে নাক কুঁচকোন ফীল্ড ইনচার্য অনুপ কর্মকার। 'যা ভাগ, এখান থেকে।'
পাগলি নড়ে না। হয়ত নড়তে পারে না।
'যাবে কি করে', ডেটোনেটার-ম্যান মুন্সী বলে, 'ওর ত এখন দুটো খাবার লোক', বলে পাগলির পেটের দিকে ইশারা করে একটা অশ্লীল ইঙ্গিত করে সে।
'কোন হারামির কাজ এটা?' এবার সত্যিই রেগে ওঠে্ন অনুপ। যদিও তিনি জানেন যে পাগলিটার অসহায়তার সুযোগ নিয়েছে অনেকেই দু'মুঠো ভাত আর দু-এক বোতল হাঁড়িয়ার বিনিময়ে। কিন্তু এখন সে কথা কে আর স্বীকার করবে। রাগে ঘেন্নায় ক্যাম্প ছেড়ে জীপ নিয়ে ফিল্ড অফিসের দিকে বেরিয়ে পড়েন অনুপ।
আসামের কাছাড় অঞ্চলের সোনাই নদীর তীরের জঙ্গলে ঘেরা দুর্গম অঞ্চলে তাঁবু পেতেছে সরকারি সিস্মিক সার্ভের দলটি। দীর্ঘকাল ধরে স্ত্রী-সংসর্গ বহির্ভূত লোকগুলি মাঝে মাঝে একটু উচ্ছৃংখল হয়ে পড়ে, সমর্থন না করলেও কিছু করার থাকে না অনুপের। তবে এবার একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে ওরা। একটা মানসিক সন্তুলনহীন মেয়েকে, তায় আবার জাত-পাঁতের ঠিক নেই, ছি ছি।
মাসদুই পরে কিন্তু অবস্থা সঙ্গীনের দিকে মোড় নিল। 'স্যার পাগলিটা মরতে বসেছে'- ক্যাম্প-বস গগৈ খবর দিল। 'গ্রামে ধাই আছে কেউ? চলতো আমার সাথে', জীপে গগৈকে বসিয়ে রওনা দিলেন অনুপ।

*    *     *     *
'বাবা, একটা পাগলি এসেছে বাইরের রাস্তায়। হি হি, কেমন নাচছে ধেই ধেই করে।' ছেলে তীর্থ বাইরে থেকে এসে বলে। ভারি আমোদ তার।
'তীর্থ!' ধমকে ওঠে অনুপ। নিষ্পাপ শিশু, কাকে কি বলতে হয় জানেনা। তাঁর মনে পড়ে যায় দশ বছর আগেকার আর এক মৃত্যুপথযাত্রী পাগলির আকুল মিনতি, 'ছাহেব, আমার পোলাডারে দ্যাহেন'।তখন তার কথায় পাগলামির আর কোনও লক্ষণ নেই। নরকের জীব বলে ঘৃণা করলেও অসহায় মেয়েটির কথা ফেলতে পারেননা তিনি!

বিয়ে আর করা হয়ে ওঠেনি। বিশ্বের বিষ কণ্ঠে নিয়ে নীলকণ্ঠ হয়েছেন অনুপ কর্মকার, শিশুতীর্থে অবগাহন করে তবু তিনি তৃপ্ত

Pallab Kumar Chatterjee
8th October, 2017

হাল্কা রঙ্গরস।

রবি ঠাকুরের দুঃখ।।
হাঁদা।। বুঝলি ভোঁদা, রবি ঠাকুরের কিছু গানের না কোন মানেই হয় না।
ভোঁদা।। সেকি রে, কোন গানের কথা বলছিস?
হাঁদা।। এই দেখ না, 'ও কেন চুরি করে চায়?' যদি চাইবেই তবে চুরি করবে কেন? না চেয়ে নিলে তবেই না চুরি করা হয়!
ভোঁদা।। দূর বোকা, এ চাওয়া সে চাওয়া নয়। চাওয়া মানে তাকানো। একটা গান আছে না-'আমার পানে চেয়ে চেয়ে সুখী থাকো'।
হাঁদা।। বলছিস! তাহলে এটা কি? 'ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন!' এ্রর দিকে তাকিয়ে বেদুইন হতাম?
ভোঁদা।। না রে বোকা, ওটা তুলনা বোঝায়, বা comparison।
হাঁদা।। তাই কি? আবার চীন দেশ যাবার সময় লিখেছিলেন- 'যেতে যেতে চায়না যেতে, ফিরে ফিরে চায়'। যাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না বোধহয়।
ভোঁদা।। না রে হাঁদা। আমার মনে এসব গান তিনি চায়ের তেষ্টায় লিখেছিলেন। মস্ত চা-খোর ছিলেন কিনা! ভেবে দেখ, বেলা ফুরোয়- চা আসে না। উনি লিখলেন- 'ফুরাতে চায় না বেলা, তাই সুর গেঁথে খেলা'। কিম্বা 'প্রাণ চায়, চক্ষু না চায়'- প্রাণ চা খাবে, চোখে দেখা নেই চায়ের।
সেই দুঃখ মেটাতেই তো বিষ্ণুর চায়-ওয়ালা অবতার ধারণ!!!

সত্য ঘটনা অবলম্বনে। জয়সীয়ারাম স্কুল।।

জয়সীয়ারাম স্কুল।।
হরিদ্বার বা প্রয়াগের কুম্ভমেলায় যখন দলে দলে সম্পূর্ণ নগ্ন বা সামান্য কৌপীনধারী সাধু-সন্ন্যাসিদের মিছিল চলে, দেখে মন নিমেষের জন্যে সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতি আবেগে ভরে ওঠে। পরক্ষণেই খেয়াল হয়, মনুষ্যশক্তির কি অপব্যবহার! এঁরা সংসারহীন সর্বত্যাগী, চাইলে নিরর্থক ঈশ্বরসেবার ফল মোক্ষলাভের বদলে সবাই মিলে দেশের হালটাই বদলে দিতে পারতেন। এঁদের মধ্যে আবার গা-ঢাকা দিয়ে অনেক ফেরারি অপরাধীও লুকিয়ে থাকে, কারণ এ দেশে সন্ন্যাসী সেজে অনায়াসে পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়া যায়।
আজ আমি যে কথা ভাবছি, আজ থেকে প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগেই সেরকম কিছু একটা ভেবেছিলেন এক দলছুট সন্ন্যাসী শ্রী রাঘবানন্দ বা রামসাধু। উনি একদা উপলব্ধি করেন যে নিজের মুক্তিতে প্রকৃত আনন্দ নেই, যদি না অন্যকেও সে ফলের ভাগ দেওয়া যায়। কিন্তু কিভাবে? উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন এসে উপস্থিত হন পুরুলিয়া জেলার ঝালদা থানার তুলিন গ্রামে। এই তুলিন পুরুলিয়া-রাঁচী রোডের উপর এখন একটি ছোটখাটো শহরের মতো মনে হলেও ১৯৫২-৫৩ সালে এটি ছিল একটি দারিদ্র্য-নিষ্পীড়িত অজ পাড়াগাঁ। তবু সন্ন্যাসী গ্রামের এক কোনে ধুনী জ্বেলে বসলেন। মুখে তাঁর রামনাম, উদ্দেশ্য সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের গ্রামে গ্রামে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করার। সবার মধ্যে তিনি দেখতে পান ঈশ্বরকে, সবাই ভগবান। সন্ন্যাসী এসেছেন খবর পেয়ে গ্রামের লোকেরা মাঝে মাঝেই এসে ফল-মূল, টাকাটা-সিকেটা দিয়ে যান। নিজে নাকি নিমপাতা ছাড়া আর কিছুই খেতেন না, কিন্তু সাধুবাবা সবাইকে আহ্বান জানাতেন, 'আও আও, গাঁওবালে ভগবান, জয় সীয়ারাম'। কুশল শুধোতেন- 'ভোজন কিয়া না ভগবান? ইয়াদ রাখো, পহলে অপনা শরীর, ফির সাধু-মহাত্মা কি সেবা।' তারপর শোনাতেন রহিমের দোহা-
'সাঁই, ইতনা দীজিয়ে, জামাই কুটুম সমায়,
ম্যয় ভী ভুখা না রহুঁ, সাধু না ভুখা যায়।'
অশিক্ষিত গ্রামবাসী কি বোঝে তুলসী আর কি রহিম! তারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। 'কিছু বুঝলে ভগবান?'- তারা হাতজোড় করে ক্ষমা চায়- 'মুরখ বটি ঠাকুর'।
তাইত! রামসাধু ভাবেন, এরা তো লেখাপড়া কিছুই শেখে নি। বয়স্কদের নাহয় জীবনের শেখার সময় অনেকটা পার হয়ে এসেছে, তাই বলে শিশুরা পড়াশোনা করবে না, তা কি করে হয়। গ্রামে তো একটা পাঠশালাও নেই। তিনি সময় করে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ডেকে অ-আ-ক-খ পড়ান, যেটুকু বাংলা জানেন। 'বাচ্চা ভগবান, পঢ়াই করো, তবে তো অসলি ভগবান কো জানবে।' সন্ধ্যার পর বয়স্ক ভক্তেরা এলে তাদের শোনাতেন তুলসী রামায়ণ, সুরদাসের পদ আর কবীরের দোহা, গিরিধরের কুণ্ডলী। ধীরে ধীরে রাঘবানন্দ বা রামসাধু ঐ অঞ্চলের একটি চলমান কিংবদন্তীতে পরিণত হলেন।
সাধুবাবার মনে তবু সুখ নেই। এই অঞ্চলে যদি একটা স্কুল খোলা যেত! কিন্তু কপর্দকশূন্য সন্ন্যাসীর কাছে এ স্বপ্ন বোধহয় অধরাই থেকে যাবে চিরদিন। তিনি অবশ্য হাল ছাড়েন না, বিডিও, কালেকটার, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ছুটে ছুটে যান। তাঁরা মুখে আশার কথা শোনালেও বাস্তবে কেউ কিছু করেন না। তখন মানভূম জেলা পুরোটাই বিহারে, তবু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এসেছেন মানভূমের অধিবাসী বাঙ্গালিপ্রধান অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করতে, সাধুবাবা খবর পেয়ে ঝালদায় ছুটে গেছেন তাঁর কাছে। 'মন্ত্রী ভগবান, বাচ্চোঁ কে লিয়ে কুছ করো।' মুখ্যমন্ত্রী বললেন, 'সাধুবাবা, বাংলায় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ চলছে, আমি নিজেই ত্রাণের জন্যে টাকা সংগ্রহ করছি। তাছাড়া, আমি তো পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী, বিহারে স্কুল খুলব কিভাবে?' তখন রামসাধু নিজস্ব ভিক্ষালব্ধ সঞ্চয় উজাড় করে দিলেন ডাঃ রায়ের হাতে- 'তব ইয়ে ভি লে যাও ভগবান! জনতা ভগবান কা ত্রাণ করো।' ঐ সামান্য টাকায় কি আর বিদ্যালয় স্থাপনা হবে!
১৯৫৬তে পুরুলিয়া বাংলায় আসার পর আবার তুলিন সফরে এসেছেন ডাঃ রায়। জনতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে রাঘবানন্দের কুটিরে। মন্ত্রী এসেছেন, বাবার তো খুশী আর ধরে না। 'মন্ত্রী ভগবান, অবতো স্কুলঠো কর দো' আর্জি জানালেন এবার। আর না করতে পারলেন না মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষাসচিব ডিএম সেনকে যথাবিধি নির্দেশ দেওয়ায় তুলিনে বছরখানেকের মধ্যেই চালু হল- 'জয়সীয়ারাম উচ্চ বিদ্যালয়।'
কে এই সন্ন্যাসী, কোথায় তাঁর বাসা, কি তাঁর আসল পরিচয় কিছুই আমরা জানিনা- শুধু জানি যে একটি স্ফুলিঙ্গ যদি যথাস্থানে গিয়ে পড়ে তবে তার থেকে দাবানল ঘটানোও সম্ভব। তাই তিনি এই দরিদ্র জেলার পশ্চাৎপদ একটি গ্রামের শিক্ষার বিকাশের জন্যে যা করেছেন, তার জন্যে তাঁকে, তাঁর অবদানকে একবার স্মরণ করতেই পারি।
(তথ্যসূত্রঃ শ্রী দিলীপকুমার গোস্বামী)

Friday, May 5, 2017

বিশুমামার গল্প - ৫

বিশুমামার মালকোশ।।


বিশুমামা তখন আমাদের শহরেই থাকে। এখানকার স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবে গান শেখায়। তার তখন অনেক ছাত্রছাত্রী, শেষে এমন অবস্থা যে গুল দেওয়ার সময়ও নেই। আমরা যেখানে আড্ডা দিই, মানে যাদবচন্দ্রের চায়ের দোকানের সামনের রাস্তাটা আগে মামার গুলের খুশবুতে ম ম করত, আমরা তার নাম দিয়েছিলাম গুল্মার্গ।ইদানীং মনে হচ্ছে সে রাস্তাও তার খ্যাতি হারাতে চলেছে।
'ওরে এর থেকে ত ভাল ছিল বিশুমামা যখন দুর্গাপুরে ছিল, ছুটিছাঁটায় তবু দর্শন পাওয়া যেত, এখন ত তাঁর সাধনা করতে হচ্ছে।' কানু বলে।
'তাহলে নিজের নামটা বদলে দিই, কি বলিস! দেবদুর্লভ চক্রবর্তী নামটা কেমন হবে?' চমকে তাকিয়ে দেখি বিশুমামা কখন এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে।
'আরে তুমি! কই ছিলা এদ্দিন?' খুশীতে সুজয়ের মুখ থেকে তার দেশোয়ালী ঢাকাই ভাষা বেরিয়ে আসে।
'আর বলিস কেন! গেছিলাম দুর্গাপুর। সে এক কাণ্ড। খবর পেলাম আমার মেজদা শীর্ষেশ্বর ওরফে শিশু এক শিশুসুলভ কাজ করে ফেলেছেন।'

শিশুমামার সঙ্গে আমার বিলক্ষণ পরিচয় থাকলেও ওঁর আমাদের বাসায় আসা যাওয়া না থাকায় কানু বা সুজয় তাঁকে চেনেনা। তিনিও আরেক ওস্তাদ, স্বয়ং ভীষ্মদেবের শিষ্য ছিলেন, কিন্তু কার দাদা দেখতে হবে ত-  শখের ওস্তাদ হয়েই থেকে গেলেন। মৌশিকিতে ম্যহফিলে নাম হল প্রচুর, কিন্তু ছাত্রছাত্রী ত দূরের কথা, নিজের ছেলেমেয়েদেরকে গান শেখাবার কথাও তাঁর মাথায় আসেনি কোনোদিন। এহেন মানুষ আবার কি শিশুর মত কাণ্ড করে থাকতে পারেন? আমরা ত কিছু ভেবে পাইনা। শিশুরা কি করে, এক হিসু ছাড়া!

সংকট থেকে উদ্ধার করলেন বিশুমামা স্বয়ং। হয়েছে কি? আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বাইরে বৃষ্টি শুরু হতে দেখে মেঘরাগে 'তিমিরময় নিবিড় নিশা, নাহি রে নাহি দিশা' গাইতে গাইতে তিনি বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন। জলে ভেজা বারান্দা, দিশা হারিয়ে পা পিছলে পপাত ধরণীতলে! তারপর পা ভেঙে হাসপাতালে- বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বিশুমামা।
'সেকি গো, তাহলে ওদের চলছে কি করে? ছেলেদুটোই ত ছোট, খাবার-দাবার পৌঁছনো, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ, এসব করছে কে?'
'বৌদি সামলাচ্ছে কিছুটা। তাছাড়া বন্ধুবান্ধব আছে। তোদের পড়াশুনা আছে, তাই আর খবর দেয় নি। তা পারিস যদি যা না দেখে আয়। তবে আগামী সপ্তাহে বোধহয় ছেড়ে দেবে।'

আমি ঠিক করলাম একবার ঘুরেই আসি দুর্গাপুর। বহুদিন আগে একবার গেছিলাম, তবু মনে আছে জায়গাটা। সেই শুক্রবারদিন কলেজের শেষ দুটো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ব্ল্যাক ডায়মণ্ডে চেপে বসলাম। পরদিন শিশুমামাকে ছেড়ে দিল হাসপাতাল থেকে, তবে পায়ে প্লাস্টার করে। এখন তিন সপ্তাহ ঝাড়া রেস্ট। শিশুমামা বাড়ি ফিরে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েস করে তানপুরা টেনে নিলেন কোলে।

রবিবার রাত্রে আমি কোলফিল্ডে ফিরেছি। পরদিন বিকেলে যাদবের দোকানে যেতেই দেখি সুজয় আর কানু হা-পিত্যেশ করে বসে আছে আমার আশায়। তিনটে চা নিয়ে যাদব আসতেই শুনলাম পেছন থেকে হেঁড়ে গলার আওয়াজ- 'আরেকটা চা দিয়ে যা রে।' বিশুমামা আজ একটু সকাল সকাল ফিরেছে ট্যুইশন সেরে।
'কিরে কেমন দেখলি মেজদাকে? ছাড়া পেয়েছে?' বিশুমামার প্রশ্ন।
'হ্যাঁ, বিশুমামা, পরশুই ছেড়েছে। এখন তিন সপ্তাহ প্লাস্টারে রাখবে।'
'তা কেমন আছে এখন? আমাকে কি যেতে হবে একবার?'
'তুমি মালকোশ নিশ্চয় জান। কিন্তু হিন্দোল? কিম্বা ললিত কিম্বা, কি যেন, হ্যাঁ, সোহিনী রাগ?'- আমার প্রশ্ন।
'কি পাগলের মত বকছিস?' এবার সুজয় ধমকে ওঠে আমাকে, 'শিশুমামার শরীরের সঙ্গে এসবের কি সম্পর্ক?'
'হয়ত আছে। তা নইলে শিশুমামা বাড়ি ফেরার পর থেকে ওই রাগগুলো শুধু গেয়ে চলেছে কেন?'

হঠাৎ হো হো করে হেসে ওঠে বিশুমামা। 'ওঃ মেজদা একটা আস্ত পাগল' বলেই চায়ের পয়সা না দিয়েই সাইকেল নিয়ে কেটে পড়ে। আমাদের হাঁ মুখটা আরো বড় হয়ে যায়।
'ব্যাপারটা কি ঘটল বল ত?' এবার সুজয়ের প্রশ্ন। 'তোরা কি কিছু বুঝলি?'
কানু মুচকি মুচকি হাসছিল। 'আমি কিছু বলি?' ও শুধোল। কানু একটু গান-টান শিখেছে, সুতরাং রহস্যের উদ্ধারে ওরই শরণাপন্ন হই আমরা।
'শিশুমামার পা ভেঙেছে বললি না! তাহলে জেনে রাখ- মালকোশ, হিন্দোল, ললিত বা সোহিনী সবই পঞ্চম বর্জিত রাগ, একটাও গাইতে পা লাগে না। 'পা' ব্যবহার না করে আর কি গাইবে?'

আমাদের দুজনের হাঁ মুখটা সেসময় যদি কেউ দেখত!

Friday, March 10, 2017

অনুবাদ- সেরা পুরস্কার

সেরা পুরস্কার।।

জেস ওয়েন্স
অনুবাদঃ পল্লব চট্টোপাধ্যায়

১৯৩৬এর গ্রীষ্মকাল। ওলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আসর বসেছে সেবার জার্মানির রাজধানী বার্লিনে। এবারের আসরে সর্বত্র চর্চার বিষয় ছিল একটাই, অ্যাডলফ হিটলারের শিশুসুলভ 'মাস্টার রেস' সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ তাঁর জাতির লোকেরা বর্ণশ্রেষ্ঠ আর্যবংশোদ্ভুত আর তথাকথিত অনার্যদের থেকে সব কিছুতেই এগিয়ে। তাই খেলার মাঠেও একটা হীন-সংকীর্ণ জাতিভেদ-প্রথার মনোভাব ঘুরে বেড়াচ্ছে সবসময়।

অবশ্য আমার এ নিয়ে বিশেষ চিন্তা ছিল না। ছ'বছর কঠোর অনুশীলন আর অনুশাসনের মধ্যে থেকে আমার ট্রেনিং শেষ হয়েছিল। জাহাজে আসতে আসতে কেবল একটা কথাই চিন্তা করতাম কিভাবে দু-একটা সোনার পদক আনা যায়। আমার বিশেষ দক্ষতা ছিল লং জাম্পে। বছরখানেক আগেই আমি ছাব্বিশ ফুট সাড়ে-আট ইঞ্চি লাফিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলাম। তাই আমার জয় সম্বন্ধে প্রায় প্রত্যেকেই নিঃসন্দেহ ছিল। কিন্তু অবাক করল একটা লম্বামতন ছেলে- ট্রায়ালেই লাফ দিল ছাব্বিশ ফুট। ছেলেটি ছিল জার্মান, নাম লুৎজ্‌ লঙ। সবাই বলাবলি করছিল যে হিটলার নাকি ওকে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলেন, একেবারে ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে দেখাবেন বলে।

আমি ভাবছিলাম যদি লঙ যেতে তাহলে ত আর্য-শ্রেষ্ঠতা সিদ্ধান্তের অনুকূলে আর একটা দৃষ্টান্ত বাড়বে। যতই হোক, আমি একজন নিগ্রো। তাই একটা বিজাতীয় রাগ হল হিটলারের উপর, ভাবলাম Der Fuhrer (অধিনায়ক)কে আর তার সুপার রেসকে একবার দেখিয়ে দিতে চাই কে শ্রেষ্ঠ!

জান ত, সব বড় কোচরাই বলে থাকেন যে অ্যাথলীট রেগে গেলেই ভুল করে। আমার বেলায় বা ব্যতিক্রম হবে কেন? তিনটে কোয়ালিফাইং জাম্পের প্রথমটাতে তাই আমার পা টেক-অফ্‌-বোর্ড থেকে বেশ কয়েক ইঞ্চি এগিয়ে গেল, অর্থাৎ ডিসকোয়ালিফায়েড! দ্বিতীয়বার অবস্থা হল আরো খারাপ। এরই জন্যে কি আমি তিনহাজার মাইল ছুটে এলাম, নিজেকেই ধিক্কার জানালাম- এইভাবে ট্রায়ালেই মার খেয়ে ফিরে আসা! পিট থেকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আমি ক্ষোভে আত্মধিক্কারে মাটিতে সজোরে একটা লাথি কষালাম। হঠাৎ কাঁধের উপর একটা সহৃদয় হাতের স্পর্শ। চেয়ে দেখি কোমল বন্ধুত্বপূর্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সেই লম্বা জার্মান ছেলেটি, লং-জাম্পার লঙ। সে তার উষ্ণ হাত করমর্দনের জন্যে বাড়িয়ে দিল আমার দিকে।

- Hello Jesse, I am Luz Long- আমার মনে হয়না এর আগে আমাদের আলাপ হয়েছে- কিছুটা জার্মান মোচড় থাকলেও ইংরেজিটা ভালই বলছিল সে।
- আলাপ করে খুব খুশি হলাম, আমি বললাম। তারপর নিজের নার্ভাসনেসটাকে ঢাকবার জন্যে একটু সহজ হবার চেষ্টা করলাম- তারপর, কেমন আছ বল?
- চমৎকার। তুমি?
- মনে হচ্ছে কিছু যেন বলতে চাও!
- কিছু মনে কোরো না, আমার মনে হয় তুমি যেন কোন দুশ্চিন্তায় ভুগছ, মানে কোন কিছু তোমাকে কুরে খাচ্ছে। মানে তোমার ত চোখ বুজে কোয়ালিফাই করার কথা।
- বিশ্বাস কর, সেটা আমিও জানি......ব্যাকুলভাবে কথাটা বলে ফেলে যেন আমি বাঁচলাম।

তারপর বেশ কয়েকমিনিট ধরে আমাদের কথাবার্তা চলল। তাকে বলিনে কিসে আমায় খাচ্ছে, তবে লুৎজ বোধহয় ব্যাপারটা খানিক আন্দাজ করেছিল, অন্ততঃ আমার রাগের কারণটা। আমার ব্যথার কিছুটা অংশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই সে নিল। যদিও সে নাৎসি যুব-আন্দোলনে দীক্ষিত, কিন্তু আর্য-শ্রেষ্ঠতা সম্বন্ধে তার বিশ্বাস আমার চেয়ে কম বই বেশি ছিল না। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমরা নিজেদের মধ্যেই খুব একচোট হেসে নিলাম। আমার থেকে ইঞ্চিখানেক লম্বা, সুগঠিত দেহ, স্বচ্ছ নীল চোখ, ঘন চুল আর চিত্তাকর্ষক সুন্দর মুখ- ওই মুখের দিকে তাকিয়া আমার উষ্মা একমুহূর্তেই তরল হয়ে গেল, হাসিমুখে পা বাড়ালাম টেক-অফ বোর্ডের দিকে।

- দেখ, লুৎজ্‌ আমাকে ডেকে বলল, তুমি বোর্ড থেকে খানিকটা পেছনে একটা দাগ টেনে দিয়ে দেখনা চেষ্টা করে। তাহলে নিশ্চয় আর ভুল হবে না। ট্রায়ালে নাহয় ফার্স্ট না-ই হলে!
তার কথার সত্যতা উপলব্ধি করে আমার মন থেকে যেন একটা বিরাট বোঝা নেমে গেল। দৃঢ়তার সঙ্গেই আমি একটা দাগ দিলাম- সেখান থেকেই লাফালাম। নিম্নসীমা থেকে প্রায় একফুট এগিয়ে থেকে যোগ্যতা অর্জন করলাম।

সে রাত্রে আমি হেঁটে গেলাম ওলিম্পিক গ্রামের রাস্তা ধরে জার্মান শিবিরের দিকে, লুৎজ লঙকে ধন্যবাদ জানাতে। জানতাম আমার ফাইনালে লাফাবার যোগ্যতা লাভের পথে এটা তারই পাওনা ছিল। আমরা কোয়ার্টারে বসে ঘণ্টাদুয়েক ধরে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করলাম। খেলাধূলা, নিজেদের কথা, সাময়িক ঘটনাবলি - এইসব বিভিন্ন বিষয়ের চর্চা চলল। শেষে যখন উঠে দাঁড়ালাম, বুঝতে পারলাম আমাদের মধ্যে একটা সত্যিকারের বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। লুৎজ তার পরদিন স্টেডিয়ামে গিয়ে আমাকে হারাবার সাধ্যমত চেষ্টা নিশ্চয়ই করবে, কিন্তু এও জানতাম যে আমি জিতলে সবচেয়ে খুশিও সে-ই হবে।

পরদিন স্টেডিয়াম। যথারীতি লুৎজ তার আগেকার রেকর্ড ভেঙে ফেলল। ফলে আমাকে নজর দিতে হল আমার সাধ্যের শীর্ষবিন্দুটিতে। মনে আছে, সেদিন আমার পা যখন উড়ে এসে মাটি স্পর্শ করে, তখন আমার নামের পাশে তৈরি হয়ে গেছে আরও কটি শব্দ- '২৬ ফুট ৫-৫/১৬ ইঞ্চি- ওলিম্পিকেও লঙ জাম্পের রেকর্ড সৃষ্টিকারী'। ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে আমার পাশে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে লুৎজ। অবশ্যই অধিনায়ক হিটলার স্ট্যান্ড থেকে শতাধিক গজ দূর দিয়েই রেগেমেগে চলে গিয়েছিলেন। লুৎজ কিন্তু হ্যান্ডশেক করল আমার সঙ্গে আর তার উষ্ণ আন্তরিক হাসির মধ্যে ভগ্ন-হৃদয় জাতীয় কোনও আভাস ছিল না, এ আমি হলফ করে বলতে পারি।

লুৎজের চব্বিশ ক্যারাটের নিখাদ বন্ধুত্ব সেদিন আমি যেমনটি পেয়েছিলাম, আমার ওলিম্পিকে জেতা সবকটা মেডেল আর কাপ গলিয়েও তার উপর বোধহয় একটা আবরণ চড়ানোও সম্ভব হবে না, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এও বুঝেছিলাম যে লুৎজ লঙ ছিল আধুনিক ওলিম্পিকের জনক পিয়ের-ডি-কুবার্তিনের স্বপ্নের অলিম্পিক খেলোয়াড় যার আদর্শ বোঝায় এই কথা কটি-
" অলিম্পিক খেলার প্রধান লক্ষ্য অংশগ্রহণ করা, জেতা নয়। জীবনের মূলনীতিই হল লড়াই করে যাওয়া, জয় নাহয় নাই মিলল।"  

Wednesday, March 8, 2017

গল্প- গীতিময়ের গীতিকথা (অফিসের গল্প - ৬)

গীতিময়ের গীতিকথা।।

স্থান- পণ্ডিচেরি রাজ্যের এক অখ্যাত জেলা-শহর।
কাল- ছাব্বিশে জানুয়ারির প্রাতঃকাল।
পাত্র- তিনিই ত নায়ক এই গীতিকাব্যের, ক্রমশ প্রকাশ্য।

পতাকা উত্তোলন হয়ে গেছে। জেনারেল ম্যানেজারের ভাষণও। এরপর সাধারণতঃ মিষ্টির প্যাকেট বিলি করা হয়, সেই সঙ্গে কিছু গানবাজনা, হাল্কা মনোরঞ্জন।
এমন সময় শুনতে পেলাম মাইক হাতে নিয়ে কেউ একজন মর্মান্তিক করুণ সুরে ইনিয়ে-বিনিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। ভাষা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, তবে একটা বুকফাটা আর্তনাদের মত শোনাচ্ছে। 'আরে মাইক মে কৌন রো রহা হ্যায়?' বলে আমি আশেপাশে জবাবের জন্যে তাকালাম।
- দাদা, জি-এম গান গাইছে। মাইকটা বোধহয় একমিনিটের জন্যে খালি পড়েছিল, ওটা হাতিয়ে নিয়েছে। এবার তাহলে কেটে পড়ি- ভাস্কর বিশ্বাস খবরটা জানাল।
আমি নতুন এসেছি প্রজেক্টে, কিছুই বুঝলাম না। 'এখানকার জেনারেল ম্যানেজার গান গেয়ে শোকপালন করেন?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করি। এতক্ষণে বুঝতে পারছি যৎপরোনাস্তি বেসুরো গলায় 'অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ' গানটা গাওয়া হচ্ছে।
- না দাদা, ইনি জি-এম মানে গীতিময়। পারচেজ অফিসার জি এম সোম। ফাটাফাটি ওস্তাদ। একাই পুরো টাউনকে মাতিয়ে রেখেছেন।

ঘণ্টাখানেক চরম অস্বস্তিতে কাটিয়ে টাকমাথা সদাহাস্যময় গীতিময়বাবুর সাথে বলতে গেলে নিজের স্বার্থেই গিয়ে আলাপ করলাম। বললাম 'দেখুন, গানবাজনা আমরাও একটু-আধটু করে থাকি। তা, আপনি যে একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, তা তো ওই গলা শুনেই বুঝেছি। গানটা আপনি ভালই করেন। তবে রেয়াজ করবেন নিয়মিত। তাহলে গলায় সুরটা অন্ততঃ আসবে।'
আমার খোঁচাটুকু মাঠে মারা গেল। উনি বরং উৎসাহিত হয়ে বললেন-'আরে আপনি ড্রিলিং অফিসে নতুন এসেছেন না! ওই ত আপনাদের পেছনের ব্যাচেলার ফ্ল্যাটে আমি থাকি। ফ্যামিলি আনতে পারিনি, বুঝলেন কিনা, ছেলেমেয়ে কলকাতায় পড়াশুনা করে। তাই ওই গানবাজনা করেই সময় কাটাই। তা আপনার ওখানে যাব একদিন, বৌদির সঙ্গে আলাপ করে আসব।'

ব্যস, খাল কেটে কুমীর ডাকার কাজটা আমি সুসম্পন্ন করে ফেললাম। এই কাজটা না করলে আমি গানবাজনা এত শিগ্‌গির ভুলতাম না বোধহয়।
গীতিময়বাবু রেয়াজ করেন না তাঁর অতিবড় শত্রুও বলবেন না। সকাল থেকে শুরু হয় তাঁর কাক তাড়ানো, অবশ্যই এক অনৈচ্ছিক প্রক্রিয়ায়। আবার সন্ধ্যের পর বসে আসর, অনেকেই আসেন কানে তুলো লাগিয়ে, ক্যান্টিন থেকে আনানো চা আর চপ-সিঙ্গাড়ার সদ্‌ব্যবহার করে কেটে পড়েন। ফলে আমার রাত জেগে বইপড়া বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভোরবেলায় উঠে পড়তে হয়, আর গুরুদেব যতই বলুন, এই সুর শুনায়ে ভাঙা ঘুমটা আমার মোটেই রমণীয় হয় না।
ইতিমধ্যে আমাদের অফিসার ক্লাবের বাৎসরিক অনুষ্ঠানের দিন এসে পড়ল। 'আমাকে কুড়িমিনিটের মত সময় দেবেন, ভাই', গীতিময়বাবু আমাকে সলজ্জভাবে অনুরোধ করলেন। 'দেখি, কতটা দেওয়া যায়', আমি কালচারাল সেক্রেটারি হিসেবে নিজের দায়িত্বের কথা মনে করে বললাম, 'অনেক নাচিয়ে-গাইয়েই আছেন কিনা! তাছাড়া মিসেস বিশ্বাস, ট্রান্সপোর্টের ভটচাযদা আছেন, এঁরা একটা গীতিনাট্য টাইপের করছেন। মিসেস তিওয়ারির ঠুমরি-দাদরা, ডাঃ দাসের গজলেও ত বেশ খানিকটা সময় যাবে।'

ভেবেছিলাম ফাংশানের দিন ব্যস্ততার ভান করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াব, সেখানেও বিধি বাদ সাধলেন। 'আরে ভাই, সোমবাবুকো ভি কোই গানা গানে বোলো, ইতনা বড়া মেহফিল উনকে বগের থোড়ে জমেগা!'- নকল জি-এমের জন্যে দরবার করলেন আসল জি-এম সৈনী স্বয়ং। ভাবখানা এই যে মজাটা দেখাই যাক। গীতিময়বাবুকে আর পায় কে! অর্কেস্ট্রাকে ইশারা করে মাইক টেনে নিলেন তিনি। সৈনীসায়েব একটা চিকেন কাবাবের টুকরো মুখে নিয়ে কানের তুলোটা গুঁজে নিলেন ভাল করে।

'স্যার, একটু তুলোটা খুলে শুনুন, কিশোরের গানটা ভালই গাইছেন দাদা।' একজন পারিষদ পাশ থেকে বললেন।
'ইস গলতফহমি মে না রহিও। লগতা হ্যায় তুমলোগোঁকে কানোঁ কো সোমবাবুকা গানা শুননে কা আদত পড় গয়া হ্যায়। 'জিন্দগী' বোল রহা হ্যায় ইয়া 'গন্দগী'!'

বলছেন। আবার একটা গান শেষ হতেই 'আউর এক, আউর এক' বলে চিৎকারও করে যাচ্ছেন। আমি এই কথাটাই এবার সাহস করে তাঁকে বললাম।
'আরে মুখর্জি, ইধর বইঠো, তুমকো সমঝাতা হুঁ।' আজ স্যার বেশ ভাল মুডে আছেন মনে হচ্ছে।
তারপর ওঁর কাছে যা জ্ঞানলাভ করলাম তাঁর নিজের ভাষাতেই বাংলা করে দিচ্ছি।

' জান ত আমি একজন সিভিল ইঞ্জিনীয়ার। আমরা মাটি খোঁড়ার যে বরাত কন্ট্রাকটারদের দিই তার রেট হয় ভলিউম হিসেবে। তা এরিয়া তো সহজেই মাপা যায়। তার সঙ্গে ডেপ্‌থ গুণ করলে এক্সক্যাভেটেড ভল্যুম বেরোয়। খোঁড়ার গভীরতা মাপার জন্যে ওরা কি করে, একটা ছোট্ট অংশকে না খুঁড়ে যেমনকার তেমনি রেখে দেয় ডেটাম বা বেঞ্চ মার্ক হিসেবে, পরে আমরা সেটার উচ্চতা মেপে সেই অনুযায়ী পেমেন্ট করি।'
'তা বুঝলে, এই সোমদাদার গানটাও তাই। আমার কন্যা পাঁচ বছর আগে গান শিখতে শুরু করেছিল, তার আগে ওকে সোমের গান শুনিয়েছিলাম। আজ ওর কলেজের ছুটিতে এসেছে, আবার সোমের গান শুনছে। এখন একটা কম্পারিসন করলে ওর কতটা উন্নতি হয়েছে সেটা বুঝতে পারবে, কারণ সোম তো সুরোঁ কা বেঞ্চ মার্ক হ্যায়, পেহলে জাহাঁ থা পাঁচ সাল কে বাদ ভি ওহিঁ হ্যায় আউর বিশ সাল বাদ ভি ওয়সা হি রহেগা।'

'স্যার, আপনি জানেন না, সোমবাবুর গান শুনে শুনে আমি চেনা গানগুলোরও সুর ভুলে যাই আজকাল। ইয়ে খতরা ভি হ্যায়', আমি সবিনয়ে বলি।
'অ্যাঁ, তাই নাকি?' এবার চমকানোর পালা সৈনী সাহেবের। 'ওরে, কে আছিস, সোমবাবুকে একটু ধরাধরি করে স্টেজ থেকে নামা বাবা!'