Wednesday, October 4, 2017

কোজাগরী- এক অন্য পাঁচালী।।Miscellaneous- Bengali

কোজাগরী- এক অন্য পাঁচালী।।


পুরাণে কথিত আছে লক্ষ্মী ছিলেন দেবরাজ ইন্দ্রের রাজপুরীতে অধিষ্ঠাত্রী দেবী আর তাঁর সব সম্পদের উৎস। দুর্বাসার দেওয়া পারিজাতের মালার অনাদর করায় মুনির শাপে তিনি লক্ষ্মীছাড়া হন। মানে অন্যায় করলেন ইন্দ্র আর শাস্তি পেলেন লক্ষ্মী, স্বর্গচ্যুত হলেন, ইন্দ্র হলেন বৈভব-হারা। যাই হোক, দুর্বাসা মুনির শাপ দেওয়ার ব্যাপারে বড়ই কুখ্যাতি ছিল, তাই পুরাণে কিছু উল্টোপাল্টা কাণ্ড ঘটাতে হলেই টানাটানি হত ঋষি দুর্বাসাকে নিয়ে, মূলতঃ শুধুমাত্র অভিশাপ দেয়ানোর জন্যেই।

এদিকে লক্ষ্মী দেবী তো মর্তে এসে পড়লেন, কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে বিশ্ব যখন নিদ্রামগন, 'কোথায় আলো, ওরে কোথায় আলো' বলে খুঁজে চলেছেন রাতের আশ্রয়, তখন কে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল? এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর পুরাণে নেই, তবে জানা যায় ধন-সম্পত্তির দেবী লক্ষ্মীর শেষ আশ্রয়লাভ হয় রত্নাকর সমুদ্রের গভীরে। 'শ্রী' নামে সেখানে তিনি থাকেন বহুযুগ ধরে। পরে সমুদ্রমন্থনের সময় দেব-দানবে মিলে তাঁকে উদ্ধার করেন, বিষ্ণু তাঁকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন। তবে সেই স্মৃতিকে অক্ষয় করে রাখতে বছর-বছর লক্ষ্মীদেবী মর্তে আসেন কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে, একটু আশ্রয়ের আশে। পার্থিব ধন-বৈভবলাভের সেটুকু আশাই আমাদের জাগিয়ে রাখে সে রাত্রে, শ্রী-সম্পদের আরাধনায়। পুজোর মন্ত্র সেই একই-
নমামি সর্বভূতানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে
যা গতিস্ত্বৎপ্রপন্নানাং সা মে ভূয়াৎ ত্বদর্চনাৎ |
অর্থাৎ ‘হে হরিপ্রিয়ে,তুমি সকল প্রাণীকে বরদান করিয়া থাক, তোমাকে প্রণাম করি | যাহারা তোমার শরণাগত হয়, তাহাদের যে গতি, তোমার পূজার ফলে আমারও যেন সেই গতি হয় |’

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আদতে বাংলার মেয়েদের একান্ত হৃদয়ের আটপৌরে ব্রত-পার্বনের মত, মানে আলিম্পন- সজ্জা, ঘট-স্থাপন আর মূর্তিপূজো দিয়ে শুরু, ব্রতকথা ও পাঁচালিতে তার শেষ। সে পাঁচালিও বহুপঠিত-বহুশ্রুত, 'দোল-পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ। মৃদুমৃদু বহিতেছে মলয়-বাতাস।। লক্ষ্মী-নারায়ণ বসি বৈকুণ্ঠ মাঝারে। আনন্দ অন্তরে তাঁরা আলাপন করে।।' এমন সময় চির-কোঁদুলে নারদের আবির্ভাব, মর্তের দুরাচারের সংবাদ নিয়ে। তারপর কিভাবে লক্ষীদেবী মর্তে গিয়ে নিজের পূজার প্রচার করে এসে সবার দুঃখ দূর করে তাদের সম্পদশালী করে তুললেন, সেই বিবরণ। তবে এখন যেটা আমি বলতে চলেছি তা সম্পূর্ণ আলাদা, এ বিবরণ বহুশ্রুত হলেও কোন পাঁচালী বা মঙ্গলকাব্যে লিপিবদ্ধ হয় নি।

মারোয়াড় রাজ্যের নাগোর শহরের বাসিন্দা হীরালাল সাহু, যাঁর পূর্বপুরুষ গিরিধর সিং গেহলোট একসময় শ্বেতাম্বর জৈনের ধর্ম গ্রহণ করেন, ১৬৫২ খ্রীষ্টাব্দে ঘটনাক্রমে দেশ ছেড়ে পাটনায় চলে আসতে বাধ্য হন, ও সেখানেই ব্যবসা বিস্তার করেন। তাঁরই এক পুত্র মানিকচাঁদ ছিলেন বাংলার নবাবদের দ্বারা 'জগৎশেঠ' উপাধি দিয়ে সম্মানিত বংশের পূর্বপুরুষ, যিনি বাংলার তৎকালীন রাজধানী ঢাকায় বসবাস করতে শুরু করেন। তখন মুর্শিদকুলি খান ছিলেন বাংলার শাসক আজিম-উষ-শানের (ঔরঙ্গজেবের দৌহিত্র) দেওয়ান, মানিকচাঁদের সঙ্গে তাঁর ভালরকম 'দোস্তি' হয়। তাই যখন মুর্শিদকুলির আজিমুষশানের সঙ্গে একটি বিবাদে জড়িয়ে পড়ে প্রাণসংশয়ের উপক্রম হয়, মানিকচাঁদের সাহায্যে তিনি সম্রাট ঔরঙ্গজেবের হস্তক্ষেপে ঢাকা ছেড়ে চলে আসেন গঙ্গার তীরে মকসুদাবাদে। মানিকচাঁদও বন্ধুকে অনুসরণ করে সেখানে চলে আসেন ও দুজনে মিলে মুর্শিদাবাদ নামে শহরটিকে গড়ে তোলেন।

এবার আসা যাক, কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর কথায় | ‘কো জাগরী’ অর্থাৎ ‘কে জাগে |’ এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী বরদান করার উদ্দেশে জগৎ পরিক্রমা করে দেখেন, কে নারকেল জল পান করে সারারাত জেগে আছেন |
কথিত, দেবী এও বলে থাকেন,’আজ রাতে যে ব্যক্তি জেগে থেকে পাশাখেলা করবে তাকে আমি ধনবান করব।’ তাই ভক্তিপূর্ণ চিত্তে এদিন লক্ষ্মীর পুজো করার পরে প্রথমে বালক, বৃদ্ধ ও আতুরদের আহার করাতে হয়| পরে ব্রাহ্মণ ও বন্ধুবান্ধবদের নারকেল জল ও চিঁড়ে আহার করিয়ে তবে তা নিজে গ্রহণ করতে হয়|

মুর্শিদাবাদকে গড়ে তোলাই শুধু নয়, বাংলা অঞ্চল থেকে দু'কোটি মুদ্রা খাজনা আদায় করার পেছনে মানিকচাঁদের কৃতিত্বই বেশি ছিল, পরে মুর্শিদাবাদে টাঁকশাল স্থাপিত হলে শেঠ পরিবারই তার পরিচালনার দায়িত্ব পান। এইসব কৃতিত্বের খবর দিল্লীশ্বর জানতে পারলে তিনি মানিকচাঁদকে দেখতে চান | এরপর মানিকচাঁদ দিল্লি গেলে রাজা তাঁর কথাবার্তায় খুশি হয়ে তাঁকে বলেন,তোমার উপর আমি অত্যন্ত প্রীত| তুমি যা চাইবে আমি দান করব| তখন মানিকচাঁদ বাড়ি ফিরে মাকে সব বলেন| বুদ্ধিমতী জননী পুত্রের মঙ্গলের জন্য বলেন, সম্রাটকে দিয়ে আদেশ জারি করিয়ে নিতে যে কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে শহরে কোনও গৃহস্থ বাড়িতে যেন আলো না জ্বালায়| সম্রাটের নির্দেশে ওই রাতে কেউ আলো জ্বালালো না| শেঠ মানিকচাঁদের মা ঘি-এর প্রদীপ জ্বেলে ঘর আলো করে দরজা খুলে বসে থাকলেন| যথাসময়ে দেবী এলেন এবং বললেন, আমি খুব পরিশ্রান্ত| আমাকে একটু আশ্রয় দেবে? মা দেবীর ছলনা বুঝতে পারলেন| তিনি দেবীকে ঘরে আশ্রয় দিলেন এবং বললেন, আমি নদীতে স্নান করতে যাচ্ছি| কথা দিন, আমি ফিরে না আসা অবধি আপনি এখানে থাকবেন| দেবী তাতে রাজি হলেন| এবার মা নদীতে স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে প্রাণত্যাগ করলেন| ফলে সেদিন থেকে দেবী জগৎশেঠদের ঘরে থেকে গেলেন| অবশ্য অনেকের মতে এ ঘটনাটি ঘটেছিল মানিকচাঁদের ভ্রাতুষ্পুত্র ও দত্তক-সন্তান ফতেচাঁদের সঙ্গে, তিনি দিল্লীশ্বর মহম্মদশাহের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তবে জৈনধর্মাবলম্বী জগৎশেঠরা কেন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর উপাসনা করলেন তার কোন ব্যাখ্যা আমি পাইনি।
 
যাই হোক, আজও ধন সম্পদের দেবী লক্ষ্মীকে পাওয়ার জন্য গৃহস্থ বাড়িতে সারারাত ঘি-এর প্রদীপ জ্বালানো হয় | তবে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই ওই রাতে জুয়া খেলে থাকেন, জানিনা এ অনাচার ধর্মের স্বীকৃতি পায় কি করে |

 

Monday, August 14, 2017

জিলিপি-রসকাব্য।।

জিলিপি-রসকাব্য।।

বহুদিন ধরে ফেসবুক পরে ছিনু আমি তব ভরসায়,
দিল টিম সুকুমার রায়।
যে রাজা বাদামভাজা খেতো শুধু
প্রখর তপনে বুক করে ধূ-ধূ,
সে পায় যখন প্যাঁচে প্যাঁচে মধু
আর থাকে সে অপেক্ষায়?
আজ শুধু সে জিলিপি খায়।

লিখতে যখন হবেই তখন কেন আর মিছে ভাবব,
জিভে জল নিয়ে তাই লিখে চলি জিলিপির মহাকাব্য।
নাকপুর থেকে কানপুর
রসে রসে টইটম্বুর,
শিশি আঁটি ছিপি ভরি মিসিসিপি লিখি জিলিপির লিপি তাই
এ জিনিষ খাঁটি দিশি ভাই।

ময়রা-পাচক নিতাই-গৌর বলেছেন কবি নজরুল
Knows rule, তাই জানেন তো তিনি সব রুল।
ঠাকুর পরমহংস
নরদেহে দেব-অংশ,
অতি সাদা মন, নেই কোনও প্যাঁচ, তবু এ প্যাঁচালো রসধর
'লাটসাহেবের গাড়ি' বলে তারে দিয়েছেন নব সমাদর। 



Sunday, August 13, 2017

ছড়া- অদ্ভুতুড়ে বিয়ে।

"অদ্ভুতুড়ে বিয়ে"
শ্যাওড়াফুলির ক্যাওড়াতলায় থাকত সে এক পেত্নি,
সম্পর্কে বেতাল ভাটের হত সে যে নাতনী।
পড়শি ছিল কারিয়া পিরেত
মাথাটি তার নয়কো নিরেট
স্বপ্ন দেখে একদিন সে করবে তাকে পত্নী।
সংকল্পখানা সে যে রেখেছিল প্রায় গুপ্ত,
ক্রমে ক্রমে ইচ্ছেটা তার রইল না আর সুপ্ত।
ভাবতে থাকে কিভাবে সে তার
কার্যখানা করে উদ্ধার,
পেত্নিরে সে পত্নী করে হবেই অবলুপ্ত!
ছিরামপুরের গাঙ্গের ধারে মস্ত ছিল খামার
সেইখানে তার বন্ধু ছিল রমাকান্ত কামার
উল্টোলে তার নামের আদল
একই থাকে, হয়না বদল,
ভূত হয়ে তাই রইল মানুষ মতন তোমার-আমার।
এক সন্ধ্যেয় পেত্নিটা যার নামটি ছিল ন্যাকা
কারশেডের ওই নোংরা ডোবায় ধুচ্ছিল গা একা।
এমন সময় রমাকান্ত
ভূত হয়ে যে ছিল জ্যান্ত,
চাপল ঘাড়ে, বুঝল না কেউ, যায় না তাকে দেখা।
কি হল ছাই কেউ বোঝেনা, রমাকান্ত কামার
ন্যাকার ঘাড়ে চড়ে কেবল গাইতে থাকে ধামার,
সবাই বলে কাণ্ডটা কি?
ন্যাকার হল বিকার নাকি!
ভূতের দেশে আমদানি কে করল সারেগামার?
কি যে হল ন্যাকারানীর কেউ পারেনা বুঝতে
গেছো-মেছো-মামদো-নিশি ব্যস্ত সবাই খুঁজতে।
হাফ-ভূতকে যায়না দেখা,
পিঠের ব্যথায় মরছে ন্যাকা,
কাণ্ডটা কি জানলে তবেই পারবে কি না যুঝতে!
এমন সময় কারিয়া পিরেত হাজির চেপে প্যাঁচায়,
বললে, ওহে মেয়েভূত কি এমনি করে চেঁচায়?
মানুষ কাঁধে ভর করেছে,
ন্যাকা বুঝি প্রায় মরেছে,
আমি ছাড়া আর কে আছে পেত্নিকে আজ বাঁচায়!
সবাই মিলে ধরল তাকে, ‘কারিয়া প্রেত ওরে,
জানিনা এই পেত্নিটাকে কে রয়েছে ধরে।
তুই যদি তোর বিদ্যে দিয়ে
ন্যাকাকে আজ দিস বাঁচিয়ে
তোর সাথে ওর দেবই বিয়ে, দেখি কে কি করে!’
কারিয়া শুনে বুক ফুলিয়ে বললে ‘ওরে কামার,
শোনরে ব্যাটা, আদেশ দিলাম ঘাড় থেকে ওর নামার।‘
মুচকি হেসে আসলো নেমে
দেখল সবাই শ্বাসটি থেমে,
রমাকান্ত বলল ‘ওরে, ন্যাকা এখন আমার’।
কাণ্ড দেখো, ন্যাকা এখন হেসেই কুটিকুটি
রমাকান্তের সাথে কেমন করছে সে খুনসুটি।
বললে, ‘ওগো কারিয়া প্রেত,
বন্ধু তোমার মানুষটা গ্রেট,
মোদের হল মালা বদল, তোমার এবার ছুটি’।

Thursday, August 10, 2017

বাংলা অণুগল্প- শিশুতীর্থ।

শিশুতীর্থ।।
((অণুগল্প)
'আবার সেই পাগলিটা এসেছে স্যার', গগৈ চিৎকার করে, 'ভাত চাইছে'।
'বেশ্যা মাগী!' ঘেন্নার সাথে নাক কুঁচকোন ফীল্ড ইনচার্য অনুপ কর্মকার। 'যা ভাগ, এখান থেকে।'
পাগলি নড়ে না। হয়ত নড়তে পারে না।
'যাবে কি করে', ডেটোনেটার-ম্যান মুন্সী বলে, 'ওর ত এখন দুটো খাবার লোক', বলে পাগলির পেটের দিকে ইশারা করে একটা অশ্লীল ইঙ্গিত করে সে।
'কোন হারামির কাজ এটা?' এবার সত্যিই রেগে ওঠে্ন অনুপ। যদিও তিনি জানেন যে পাগলিটার অসহায়তার সুযোগ নিয়েছে অনেকেই দু'মুঠো ভাত আর দু-এক বোতল হাঁড়িয়ার বিনিময়ে। কিন্তু এখন সে কথা কে আর স্বীকার করবে। রাগে ঘেন্নায় ক্যাম্প ছেড়ে জীপ নিয়ে ফিল্ড অফিসের দিকে বেরিয়ে পড়েন অনুপ।
আসামের কাছাড় অঞ্চলের সোনাই নদীর তীরের জঙ্গলে ঘেরা দুর্গম অঞ্চলে তাঁবু পেতেছে সরকারি সিস্মিক সার্ভের দলটি। দীর্ঘকাল ধরে স্ত্রী-সংসর্গ বহির্ভূত লোকগুলি মাঝে মাঝে একটু উচ্ছৃংখল হয়ে পড়ে, সমর্থন না করলেও কিছু করার থাকে না অনুপের। তবে এবার একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে ওরা। একটা মানসিক সন্তুলনহীন মেয়েকে, তায় আবার জাত-পাঁতের ঠিক নেই, ছি ছি।
মাসদুই পরে কিন্তু অবস্থা সঙ্গীনের দিকে মোড় নিল। 'স্যার পাগলিটা মরতে বসেছে'- ক্যাম্প-বস গগৈ খবর দিল। 'গ্রামে ধাই আছে কেউ? চলতো আমার সাথে', জীপে গগৈকে বসিয়ে রওনা দিলেন অনুপ।

*    *     *     *
'বাবা, একটা পাগলি এসেছে বাইরের রাস্তায়। হি হি, কেমন নাচছে ধেই ধেই করে।' ছেলে তীর্থ বাইরে থেকে এসে বলে। ভারি আমোদ তার।
'তীর্থ!' ধমকে ওঠে অনুপ। নিষ্পাপ শিশু, কাকে কি বলতে হয় জানেনা। তাঁর মনে পড়ে যায় দশ বছর আগেকার আর এক মৃত্যুপথযাত্রী পাগলির আকুল মিনতি, 'ছাহেব, আমার পোলাডারে দ্যাহেন'।তখন তার কথায় পাগলামির আর কোনও লক্ষণ নেই। নরকের জীব বলে ঘৃণা করলেও অসহায় মেয়েটির কথা ফেলতে পারেননা তিনি!

বিয়ে আর করা হয়ে ওঠেনি। বিশ্বের বিষ কণ্ঠে নিয়ে নীলকণ্ঠ হয়েছেন অনুপ কর্মকার, শিশুতীর্থে অবগাহন করে তবু তিনি তৃপ্ত

Pallab Kumar Chatterjee
8th October, 2017

হাল্কা রঙ্গরস।

রবি ঠাকুরের দুঃখ।।
হাঁদা।। বুঝলি ভোঁদা, রবি ঠাকুরের কিছু গানের না কোন মানেই হয় না।
ভোঁদা।। সেকি রে, কোন গানের কথা বলছিস?
হাঁদা।। এই দেখ না, 'ও কেন চুরি করে চায়?' যদি চাইবেই তবে চুরি করবে কেন? না চেয়ে নিলে তবেই না চুরি করা হয়!
ভোঁদা।। দূর বোকা, এ চাওয়া সে চাওয়া নয়। চাওয়া মানে তাকানো। একটা গান আছে না-'আমার পানে চেয়ে চেয়ে সুখী থাকো'।
হাঁদা।। বলছিস! তাহলে এটা কি? 'ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন!' এ্রর দিকে তাকিয়ে বেদুইন হতাম?
ভোঁদা।। না রে বোকা, ওটা তুলনা বোঝায়, বা comparison।
হাঁদা।। তাই কি? আবার চীন দেশ যাবার সময় লিখেছিলেন- 'যেতে যেতে চায়না যেতে, ফিরে ফিরে চায়'। যাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না বোধহয়।
ভোঁদা।। না রে হাঁদা। আমার মনে এসব গান তিনি চায়ের তেষ্টায় লিখেছিলেন। মস্ত চা-খোর ছিলেন কিনা! ভেবে দেখ, বেলা ফুরোয়- চা আসে না। উনি লিখলেন- 'ফুরাতে চায় না বেলা, তাই সুর গেঁথে খেলা'। কিম্বা 'প্রাণ চায়, চক্ষু না চায়'- প্রাণ চা খাবে, চোখে দেখা নেই চায়ের।
সেই দুঃখ মেটাতেই তো বিষ্ণুর চায়-ওয়ালা অবতার ধারণ!!!

সত্য ঘটনা অবলম্বনে। জয়সীয়ারাম স্কুল।।

জয়সীয়ারাম স্কুল।।
হরিদ্বার বা প্রয়াগের কুম্ভমেলায় যখন দলে দলে সম্পূর্ণ নগ্ন বা সামান্য কৌপীনধারী সাধু-সন্ন্যাসিদের মিছিল চলে, দেখে মন নিমেষের জন্যে সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতি আবেগে ভরে ওঠে। পরক্ষণেই খেয়াল হয়, মনুষ্যশক্তির কি অপব্যবহার! এঁরা সংসারহীন সর্বত্যাগী, চাইলে নিরর্থক ঈশ্বরসেবার ফল মোক্ষলাভের বদলে সবাই মিলে দেশের হালটাই বদলে দিতে পারতেন। এঁদের মধ্যে আবার গা-ঢাকা দিয়ে অনেক ফেরারি অপরাধীও লুকিয়ে থাকে, কারণ এ দেশে সন্ন্যাসী সেজে অনায়াসে পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়া যায়।
আজ আমি যে কথা ভাবছি, আজ থেকে প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগেই সেরকম কিছু একটা ভেবেছিলেন এক দলছুট সন্ন্যাসী শ্রী রাঘবানন্দ বা রামসাধু। উনি একদা উপলব্ধি করেন যে নিজের মুক্তিতে প্রকৃত আনন্দ নেই, যদি না অন্যকেও সে ফলের ভাগ দেওয়া যায়। কিন্তু কিভাবে? উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন এসে উপস্থিত হন পুরুলিয়া জেলার ঝালদা থানার তুলিন গ্রামে। এই তুলিন পুরুলিয়া-রাঁচী রোডের উপর এখন একটি ছোটখাটো শহরের মতো মনে হলেও ১৯৫২-৫৩ সালে এটি ছিল একটি দারিদ্র্য-নিষ্পীড়িত অজ পাড়াগাঁ। তবু সন্ন্যাসী গ্রামের এক কোনে ধুনী জ্বেলে বসলেন। মুখে তাঁর রামনাম, উদ্দেশ্য সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের গ্রামে গ্রামে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করার। সবার মধ্যে তিনি দেখতে পান ঈশ্বরকে, সবাই ভগবান। সন্ন্যাসী এসেছেন খবর পেয়ে গ্রামের লোকেরা মাঝে মাঝেই এসে ফল-মূল, টাকাটা-সিকেটা দিয়ে যান। নিজে নাকি নিমপাতা ছাড়া আর কিছুই খেতেন না, কিন্তু সাধুবাবা সবাইকে আহ্বান জানাতেন, 'আও আও, গাঁওবালে ভগবান, জয় সীয়ারাম'। কুশল শুধোতেন- 'ভোজন কিয়া না ভগবান? ইয়াদ রাখো, পহলে অপনা শরীর, ফির সাধু-মহাত্মা কি সেবা।' তারপর শোনাতেন রহিমের দোহা-
'সাঁই, ইতনা দীজিয়ে, জামাই কুটুম সমায়,
ম্যয় ভী ভুখা না রহুঁ, সাধু না ভুখা যায়।'
অশিক্ষিত গ্রামবাসী কি বোঝে তুলসী আর কি রহিম! তারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। 'কিছু বুঝলে ভগবান?'- তারা হাতজোড় করে ক্ষমা চায়- 'মুরখ বটি ঠাকুর'।
তাইত! রামসাধু ভাবেন, এরা তো লেখাপড়া কিছুই শেখে নি। বয়স্কদের নাহয় জীবনের শেখার সময় অনেকটা পার হয়ে এসেছে, তাই বলে শিশুরা পড়াশোনা করবে না, তা কি করে হয়। গ্রামে তো একটা পাঠশালাও নেই। তিনি সময় করে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ডেকে অ-আ-ক-খ পড়ান, যেটুকু বাংলা জানেন। 'বাচ্চা ভগবান, পঢ়াই করো, তবে তো অসলি ভগবান কো জানবে।' সন্ধ্যার পর বয়স্ক ভক্তেরা এলে তাদের শোনাতেন তুলসী রামায়ণ, সুরদাসের পদ আর কবীরের দোহা, গিরিধরের কুণ্ডলী। ধীরে ধীরে রাঘবানন্দ বা রামসাধু ঐ অঞ্চলের একটি চলমান কিংবদন্তীতে পরিণত হলেন।
সাধুবাবার মনে তবু সুখ নেই। এই অঞ্চলে যদি একটা স্কুল খোলা যেত! কিন্তু কপর্দকশূন্য সন্ন্যাসীর কাছে এ স্বপ্ন বোধহয় অধরাই থেকে যাবে চিরদিন। তিনি অবশ্য হাল ছাড়েন না, বিডিও, কালেকটার, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ছুটে ছুটে যান। তাঁরা মুখে আশার কথা শোনালেও বাস্তবে কেউ কিছু করেন না। তখন মানভূম জেলা পুরোটাই বিহারে, তবু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এসেছেন মানভূমের অধিবাসী বাঙ্গালিপ্রধান অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করতে, সাধুবাবা খবর পেয়ে ঝালদায় ছুটে গেছেন তাঁর কাছে। 'মন্ত্রী ভগবান, বাচ্চোঁ কে লিয়ে কুছ করো।' মুখ্যমন্ত্রী বললেন, 'সাধুবাবা, বাংলায় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ চলছে, আমি নিজেই ত্রাণের জন্যে টাকা সংগ্রহ করছি। তাছাড়া, আমি তো পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী, বিহারে স্কুল খুলব কিভাবে?' তখন রামসাধু নিজস্ব ভিক্ষালব্ধ সঞ্চয় উজাড় করে দিলেন ডাঃ রায়ের হাতে- 'তব ইয়ে ভি লে যাও ভগবান! জনতা ভগবান কা ত্রাণ করো।' ঐ সামান্য টাকায় কি আর বিদ্যালয় স্থাপনা হবে!
১৯৫৬তে পুরুলিয়া বাংলায় আসার পর আবার তুলিন সফরে এসেছেন ডাঃ রায়। জনতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেছে রাঘবানন্দের কুটিরে। মন্ত্রী এসেছেন, বাবার তো খুশী আর ধরে না। 'মন্ত্রী ভগবান, অবতো স্কুলঠো কর দো' আর্জি জানালেন এবার। আর না করতে পারলেন না মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষাসচিব ডিএম সেনকে যথাবিধি নির্দেশ দেওয়ায় তুলিনে বছরখানেকের মধ্যেই চালু হল- 'জয়সীয়ারাম উচ্চ বিদ্যালয়।'
কে এই সন্ন্যাসী, কোথায় তাঁর বাসা, কি তাঁর আসল পরিচয় কিছুই আমরা জানিনা- শুধু জানি যে একটি স্ফুলিঙ্গ যদি যথাস্থানে গিয়ে পড়ে তবে তার থেকে দাবানল ঘটানোও সম্ভব। তাই তিনি এই দরিদ্র জেলার পশ্চাৎপদ একটি গ্রামের শিক্ষার বিকাশের জন্যে যা করেছেন, তার জন্যে তাঁকে, তাঁর অবদানকে একবার স্মরণ করতেই পারি।
(তথ্যসূত্রঃ শ্রী দিলীপকুমার গোস্বামী)

Friday, May 5, 2017

বিশুমামার গল্প - ৫

বিশুমামার মালকোশ।।


বিশুমামা তখন আমাদের শহরেই থাকে। এখানকার স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবে গান শেখায়। তার তখন অনেক ছাত্রছাত্রী, শেষে এমন অবস্থা যে গুল দেওয়ার সময়ও নেই। আমরা যেখানে আড্ডা দিই, মানে যাদবচন্দ্রের চায়ের দোকানের সামনের রাস্তাটা আগে মামার গুলের খুশবুতে ম ম করত, আমরা তার নাম দিয়েছিলাম গুল্মার্গ।ইদানীং মনে হচ্ছে সে রাস্তাও তার খ্যাতি হারাতে চলেছে।
'ওরে এর থেকে ত ভাল ছিল বিশুমামা যখন দুর্গাপুরে ছিল, ছুটিছাঁটায় তবু দর্শন পাওয়া যেত, এখন ত তাঁর সাধনা করতে হচ্ছে।' কানু বলে।
'তাহলে নিজের নামটা বদলে দিই, কি বলিস! দেবদুর্লভ চক্রবর্তী নামটা কেমন হবে?' চমকে তাকিয়ে দেখি বিশুমামা কখন এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে।
'আরে তুমি! কই ছিলা এদ্দিন?' খুশীতে সুজয়ের মুখ থেকে তার দেশোয়ালী ঢাকাই ভাষা বেরিয়ে আসে।
'আর বলিস কেন! গেছিলাম দুর্গাপুর। সে এক কাণ্ড। খবর পেলাম আমার মেজদা শীর্ষেশ্বর ওরফে শিশু এক শিশুসুলভ কাজ করে ফেলেছেন।'

শিশুমামার সঙ্গে আমার বিলক্ষণ পরিচয় থাকলেও ওঁর আমাদের বাসায় আসা যাওয়া না থাকায় কানু বা সুজয় তাঁকে চেনেনা। তিনিও আরেক ওস্তাদ, স্বয়ং ভীষ্মদেবের শিষ্য ছিলেন, কিন্তু কার দাদা দেখতে হবে ত-  শখের ওস্তাদ হয়েই থেকে গেলেন। মৌশিকিতে ম্যহফিলে নাম হল প্রচুর, কিন্তু ছাত্রছাত্রী ত দূরের কথা, নিজের ছেলেমেয়েদেরকে গান শেখাবার কথাও তাঁর মাথায় আসেনি কোনোদিন। এহেন মানুষ আবার কি শিশুর মত কাণ্ড করে থাকতে পারেন? আমরা ত কিছু ভেবে পাইনা। শিশুরা কি করে, এক হিসু ছাড়া!

সংকট থেকে উদ্ধার করলেন বিশুমামা স্বয়ং। হয়েছে কি? আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বাইরে বৃষ্টি শুরু হতে দেখে মেঘরাগে 'তিমিরময় নিবিড় নিশা, নাহি রে নাহি দিশা' গাইতে গাইতে তিনি বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন। জলে ভেজা বারান্দা, দিশা হারিয়ে পা পিছলে পপাত ধরণীতলে! তারপর পা ভেঙে হাসপাতালে- বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বিশুমামা।
'সেকি গো, তাহলে ওদের চলছে কি করে? ছেলেদুটোই ত ছোট, খাবার-দাবার পৌঁছনো, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ, এসব করছে কে?'
'বৌদি সামলাচ্ছে কিছুটা। তাছাড়া বন্ধুবান্ধব আছে। তোদের পড়াশুনা আছে, তাই আর খবর দেয় নি। তা পারিস যদি যা না দেখে আয়। তবে আগামী সপ্তাহে বোধহয় ছেড়ে দেবে।'

আমি ঠিক করলাম একবার ঘুরেই আসি দুর্গাপুর। বহুদিন আগে একবার গেছিলাম, তবু মনে আছে জায়গাটা। সেই শুক্রবারদিন কলেজের শেষ দুটো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ব্ল্যাক ডায়মণ্ডে চেপে বসলাম। পরদিন শিশুমামাকে ছেড়ে দিল হাসপাতাল থেকে, তবে পায়ে প্লাস্টার করে। এখন তিন সপ্তাহ ঝাড়া রেস্ট। শিশুমামা বাড়ি ফিরে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েস করে তানপুরা টেনে নিলেন কোলে।

রবিবার রাত্রে আমি কোলফিল্ডে ফিরেছি। পরদিন বিকেলে যাদবের দোকানে যেতেই দেখি সুজয় আর কানু হা-পিত্যেশ করে বসে আছে আমার আশায়। তিনটে চা নিয়ে যাদব আসতেই শুনলাম পেছন থেকে হেঁড়ে গলার আওয়াজ- 'আরেকটা চা দিয়ে যা রে।' বিশুমামা আজ একটু সকাল সকাল ফিরেছে ট্যুইশন সেরে।
'কিরে কেমন দেখলি মেজদাকে? ছাড়া পেয়েছে?' বিশুমামার প্রশ্ন।
'হ্যাঁ, বিশুমামা, পরশুই ছেড়েছে। এখন তিন সপ্তাহ প্লাস্টারে রাখবে।'
'তা কেমন আছে এখন? আমাকে কি যেতে হবে একবার?'
'তুমি মালকোশ নিশ্চয় জান। কিন্তু হিন্দোল? কিম্বা ললিত কিম্বা, কি যেন, হ্যাঁ, সোহিনী রাগ?'- আমার প্রশ্ন।
'কি পাগলের মত বকছিস?' এবার সুজয় ধমকে ওঠে আমাকে, 'শিশুমামার শরীরের সঙ্গে এসবের কি সম্পর্ক?'
'হয়ত আছে। তা নইলে শিশুমামা বাড়ি ফেরার পর থেকে ওই রাগগুলো শুধু গেয়ে চলেছে কেন?'

হঠাৎ হো হো করে হেসে ওঠে বিশুমামা। 'ওঃ মেজদা একটা আস্ত পাগল' বলেই চায়ের পয়সা না দিয়েই সাইকেল নিয়ে কেটে পড়ে। আমাদের হাঁ মুখটা আরো বড় হয়ে যায়।
'ব্যাপারটা কি ঘটল বল ত?' এবার সুজয়ের প্রশ্ন। 'তোরা কি কিছু বুঝলি?'
কানু মুচকি মুচকি হাসছিল। 'আমি কিছু বলি?' ও শুধোল। কানু একটু গান-টান শিখেছে, সুতরাং রহস্যের উদ্ধারে ওরই শরণাপন্ন হই আমরা।
'শিশুমামার পা ভেঙেছে বললি না! তাহলে জেনে রাখ- মালকোশ, হিন্দোল, ললিত বা সোহিনী সবই পঞ্চম বর্জিত রাগ, একটাও গাইতে পা লাগে না। 'পা' ব্যবহার না করে আর কি গাইবে?'

আমাদের দুজনের হাঁ মুখটা সেসময় যদি কেউ দেখত!