Wednesday, May 6, 2020

ছোটনাগপুরের আদিবাসী বিদ্রোহ। প্রবন্ধ


জঙ্গল-মহাল ও ছোটনাগপুরের আদিবাসী বিদ্রোহ।



"সিদু কানু চাঁদ ভৈরব চারি ভাই ছিল।
ভাগলা দিহি গ্রামে উদের জনম হঞে ছিল ।।
মহেশ দারোগা আসে জঙ্গল মহালে।
নানা অত্যাচার তারা করে সাঁওতালে ।।
এক দিন সিদু কানু ঘরে শুঞে ছিল।
সাদা রঙা ভগবান আইসে দেখা দিল ।।
দশখানা আঙুল  ছিল তাঁর প্রতি হাতে।

বিশটি কাগজ টুকরা ধরা ছিল তাতে ।।
তাহাতে রয়েছে লিখা দেবতার বাণী।
গ্রামে গ্রামে ইহা ক্রমে জানাজানি ।।
সিদু বলে শুন সবে ছাড়িও না হাল।
স্বাধীন করিতে হবে জঙ্গল মহাল ।।"(স্বপ্নময় চক্রবর্তী)

মানভূম সহ সমস্ত জঙ্গলমহলের (মতান্তরে 'মহাল') আদিবাসী সম্প্রদায়ের বন্য-সরল-অশিক্ষিত মানুষরা যে প্রয়োজনে প্রাণকে তুচ্ছ করে স্বাধীনতা বা কোন আদর্শের জন্যে কিভাবে লড়াই করতে পারে তার উদাহরণ জঙ্গলমহাল-মেদিনীপুর-বাঁকুড়া-মানভূমের চুয়াড় বিদ্রোহ, মানভূম-ছোটনাগপুরের কোল বিদ্রোহ বীরভূম-সাঁওতাল পরগণার সাঁওতাল বিদ্রোহ
১৭৯৮-৯৯ মেদিনীপুর, বাঁকুড়া মানভূমের জঙ্গলমহলের অধিবাসী আদিম অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষদের স্থানীয় জমিদারশ্রেণী অবজ্ঞাভরে চুয়াড় নাম দিয়েছিল। তাদের জমি কেড়ে নেয়ায় বা সাধ্যাতীত মাত্রায় নতুন কর ধার্য করায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। ওয়ারেন হেস্টিংস ব্যর্থ হন বিদ্রোহ দমনে। ১৭৯৯ সালে বড়লাট ওয়েলেসলি চুয়াড় বিদ্রোহের নেতাদের ফাঁসি দিয়ে বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে আনেন
সুপ্রচীনকালেইকোলনামে এক আদিম উপজাতি বর্তমান বিহারের সিংভূম, মানভূম সমেত সারা ছোটোনাগপুর অঞ্চলে বসবাস শুরু করে কোলরা হো, মুন্ডা, ওরাওঁ ইত্যাদি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল অন্যান্য আদিম জাতিগুলির মতো কোলরাও ছিল কৃষিজীবী নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার অঙ্গ হিসাবে ইংরেজ সরকার বহিরাগত লোকদের কোল সম্প্রদায়ের জমিদার হিসাবে নিযুক্ত করেন। তাঁরা চড়া হারে রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিচার আইন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে কোল সমাজের ওপর আঘাত হানে, এইসব শোষণ বঞ্চনা থেকেই ১৮৩১ সালে কোল বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়।
রাঁচি, হাজারিবাগ, সিংভূম, পালামৌ প্রভৃতি অঞ্চলে কোল বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। সিংরাই, বুদ্ধ ভগৎ, জোয়া ভগৎ প্রভৃতি নেতাগণ এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কোল বিদ্রোহের পাশাপাশি মানভূমের ভূমিহীন জনসাধারণ বিদ্রোহী হয়ে সরকারি কাছারি পুলিশ ঘাঁটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত সৈন্যবাহিনী নিয়োগ করে এই বিদ্রোহ দমন করতে হয়। কোল বিদ্রোহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে কোলদের ঐক্যবদ্ধ রূপ। তাছাড়া বিদ্রোহীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইংরেজ বহিরাগত জমিদারবর্গ চার্লস মেটকাফের মতে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটানো
উপরের যে কবিতাটি দেওয়া হয়েছে তা সাঁওতাল বিদ্রোহের অসমসাহসী নেতা দুই ভাই সিদ্ কান্হর পাঁচালির অংশবিশেষ ১৮৫৫ সালে হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ সিদ্হ, কান্হ, ভৈরব প্রমুখের নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল ইংরেজ শাসনের অবসান স্বাধীন সাঁওতাল রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সংকল্পে কলকাতা মার্চ করে। সংঘর্ষে ২৩ হাজার সাঁওতালকে হত্যা করে ইংরেজরা সিদ্-কান্হর ফাঁসি হয়

পুরুলিয়া-পশ্চিম মেদিনীপুরসহ ছোটনাগপুরের পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলের
 মানুষ, তাদের জীবন-সংগ্রাম আর সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, সামাজিক পরিকাঠামো আর শাসন-ব্যবস্থার সাথে। এই  অঞ্চল দিয়ে বয়ে চলা দামোদর, বরাকর, কোয়েল, সুবর্ণরেখা কাঁসাইএর মত বেশ কিছু পাহাড়ি নদী থাকলেও বর্ষাকাল বাদে তাদের জল কম, আর বর্ষায় তীব্র স্রোত থাকায় উর্বরা পলি-মাটি জমে কম, তাই মাটির উর্বরাশক্তিও নিম্নমানের
এসব থেকে বোঝাই যাচ্ছে যে কৃপণা বসুধরা এখানে মাথার ঘাম পায়ে না ফেললে শস্যকণা দিতে চান না। তবু কৃষিনির্ভর আদিবাসি সম্প্রদায় প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক সময় (precolonial era) পর্যন্ত নিজেদের স্থানীয় পরিবেশ জ্ঞান, সমাজ-সংস্কৃতি আর ধর্মীয় বিশ্বাস-এর ওপরে ভিত্তি করে সচেতনভাবে তাদের গ্রাম-ভূচিত্র বজায় রেখেছিল। একইভাবে, বন্য আদিবাসি তাদের স্বাভাবিক দক্ষতা দিয়ে জৈব-প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ আর পুনরুৎপাদন করেছে। কিন্তু, ঔপনিবেশিক সময়ে পরিস্থিতির বদল ঘটেছে। ব্রিটিশ শাসক বানিজ্যিক কারণে অস্বাভাবিকভাবে পণ্য উৎপাদন-এর সম্প্রসারণ-এর জন্যে জমি অধ্যুষিত করেছে কৃষিজমি অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে। গ্রা্মের ঔপনিবেশিকীকরণ আদিবাসীদের সামাজিক সংহতি চূর্ণবিচূর্ণ করেছে। রেলওয়েতে স্লীপার পাততে শালবন ধ্বংস হয়েছে। রেলপথের বিস্তারের জন্যে পরিকল্পনাহীনভাবে জঙ্গল কাটা হতে থাকায় ভূমিক্ষয় (soil erosion) বেড়ে গেছে  - বর্ষায় সেই মাটি বাহিত হয়ে কাঁসাই, সুবর্ণরেখা দামোদরে এসে পড়াতে নদীতে চড়া পড়ে তাদের জলধারণক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। গাছ ধ্বংস হওয়ায় সারা অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রাঁচী সংলগ্ন অঞ্চল, যার ফলে ওই অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে এক নতুন বিপ্লব-চেতনার জন্ম দিয়েছিল যে ঘটনা সমস্ত আদিবাসী আর ভূমিপুত্র বাঙ্গালিদের জীবনসংগ্রামের ইতিহাস থেকে আলাদা নয়
আমার অরণ্য মাকে কেউ যদি কেড়ে নিতে চায়, আমার সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে কেউ যদি অন্য সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়, আমার ধর্মকে কেউ যদি খারাপ বা অসভ্য ধর্ম বলে, আমাকে কেউ যদি শুধু শোষণ করে নিতে চায় তবে আমি বিদ্রোহ করবই।১৮৯৫-১৯০০ সালের মুন্ডা বিদ্রোহের নায়ক বিরসা মুন্ডার এমন চিন্তাচেতনা থেকেই সে সময় উলগুলানের (বিদ্রোহের) জন্ম হয়। উলগুলান আদিবাসীদের দেখিয়েছিল জমিদার, মিশনারি, ইংরেজ শাসকদের হাত থেকে মুক্তির স্বপ্ন
মুন্ডা জনগণের কাছে বিরসা আজ কিংবদন্তি। বর্তমানের রাঁচি জেলার উলিহাটুতে ১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। বিরসার জন্ম নিয়ে আজো মুন্ডারা গান গায়
হে ধরতি আবা! জন্ম তোমার চালকাদেতে ভাদ্র মাসে,অন্ধজনের চোখ মিলল ভাদ্র মাসে
চলো যাই ধরতি আবাকে দেখি; বড়ো আনন্দ হে, তাঁকে প্রণাম করি-
আমাদের শত্রুদের তিনি হারিয়ে দিবেন ভাদ্র মাসে।‘


বিরসার নেতৃত্বে মুন্ডাদের উলগুলান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। পৃথিবী যখন তথাকথিতভাবে সভ্য হয়ে এসেছে, ঠিক সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের আদি জনগোষ্ঠী আদিবাসীদের অসভ্য বলে, নীচ বলে ঘৃণা করা হয়েছে। আদিবাসীরা বহুদিন চুপ করে এসব সহ্য করেছে। যখন অন্যায়-নির্যাতন সীমা ছাড়িয়েছে, তখন তারা করেছে বিদ্রোহ। এই উলগুলান সেই সময় ইংরেজ শাসকদের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন ছোটনাগপুরের জেলাগুলোয় মুন্ডাসহ অন্য আদিবাসীদের ঘনবসতি ছিল। ১৮৩১-৩২ সালের কোল বিদ্রোহ, ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের পরও ভারতের আদিবাসী অধ্যুষিত জায়গাগুলোয় আদিবাসীদের ওপর জমিদারদের অত্যাচার চলতে থাকে। আদিবাসীদের শুধু ঠকিয়ে, তাদের ওপর অত্যাচার করে, তাদের বেগার খাটিয়ে ইংরেজরা-জমিদাররা ক্ষান্ত হয়নি। আদিবাসী মুন্ডাদের মধ্যে তারা খ্রিস্টধর্ম প্রচার করে তাদের ধর্মচ্যুত করে। এতে মুন্ডাসহ অন্য আদিবাসীদের সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি বিপন্ন হতে শুরু করে। অনেক মুন্ডাসহ অন্য আদিবাসীরা নিজেদের ধর্ম-সংস্কৃতি বিলিয়ে দিয়েও ধর্মান্তরিত হয়েছিল, তারাও রক্ষা পায়নি। বিরসা মুন্ডার বাবা সুগানা মুন্ডা খ্রিস্টান হয়েছিলেন কিন্তু যখনই মুন্ডারা তাদের অধিকারের কথা বলেছে, তখনই কী ইংরেজ সাহেব, কী জমিদার, আর কী মিশনারি, কেউ তাদের অধিকারের বিন্দুমাত্র দেয়নি। তাইতো বিরসা বলেছিলেন, ‘মিশনের সাহেব আর অফিসার সাহেব সবাই এক জাতের। সাহেব সাহেব এক টোপি হ্যায়।


*                       *                       *                     *

১৮৯৫ সালের দিকে ২০ বছরের যুবক বিরসা বুঝতে পারেন আর চুপ করে থাকা চলবে না। মুন্ডাদের আদি ধর্ম থেকে কুসংস্কার বাদ দিয়ে তাদের নতুন ধর্ম শেখাতে হবে। মিশন, সরকারি কর্মচারী, জমিদার, মহাজন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ধর্ম শেখাতে হবে। বিরসা বলেছিলেন, ‘আমি বিরসা নই, আমি ধরতি আবা। এই পৃথিবী আমার সন্তান। আমি মুন্ডাদের নতুন ধর্ম শেখাব। আমি তোদের কোলে নিয়ে ভোলাব না, দোলাব না। আমি মুন্ডাদের মরতে আর মারতে শেখাব।বিরসা তার এই নতুন ধর্মে মুন্ডাদের দীক্ষিত করতে শুরু করেছিলেন। কানে কানে খবর পেয়ে রাঁচির ডেপুটি কমিশনার বিরসাকে ধরতে হুকুম দিলেন। এদিকে মুন্ডারি ভাষার পণ্ডিত পাদ্রি হফম্যান ইংরেজ সরকারকে জানান যে, বিরসা স্থির করেছে মিশনারিদের হত্যা করবে। রাতের আঁধারে অভিযান চালিয়ে ধরা হয় বিরসাকে। ইংরেজদের একতরফা সাজানো বিচারে বিরসার দু'বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়
দু বছর হাজারিবাগ জেলে থেকে বিরসা মুক্তি পান। বিরসার মুক্তিতে মুন্ডাসহ আদিবাসী সমাজে উৎসবের আমেজ বসে। গ্রামে গ্রামে নাচ-গান নাকাড়া বেজে ওঠে। বিরসা আবার তার নতুন ধর্মে সবাইকে দীক্ষিত করতে শুরু করেন। বিরসার নতুন ধর্মে যারা যোগ দিয়েছিল, তাদেরকে বিরসাইত বলা হত। বিরসাইতরা নানা রকম কাজের ভার পেল। শুরু হলো বিদ্রোহের প্রস্তুতি। সভা হতে লাগল মুন্ডা এলাকার গ্রামে গ্রামে। তামাড় খুঁটির পর্বতমালা থেকে কিছু দূরে ডোম্বা বা সাইকোর বনে ঢাকা উপত্যকা ডোম্বারি এলাকায় বিরসা তাঁর প্রধান ঘাঁটি বানিয়ে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ১৮৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি, তার পর ১৮৯৯ সালের অক্টোবর বা নভেম্বরে ডোম্বারি পাহাড়ে বিরসাইতরা সভা করে। সভায় বিরসা ব্রিটিশ রাজের লাল নিশান দেখিয়ে মুন্ডাদের বলে, ‘দিকু (যারা আদিবাসি নয়দের সঙ্গে যুদ্ধ হবে। এই নিশানের মত লাল রক্ত বইবে মাটিতে।
১৮৯৯ সালের ডিসেম্বরে সাহেবদের বড়দিন উৎসবের ওপর বিরসা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সিংভূম রাঁচির ছ'টি থানায় ২৪ ডিসেম্বর বিরসাইতরা মিশনগুলোয় আক্রমণ করে। বহু মিশন, গির্জায় আগুন জ্বলতে থাকে। বেশকিছু ইংরেজ সাহেব, মিশনারি, চৌকিদার আহত-নিহত হয়। ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে। রাঁচির ডেপুটি কমিশনার স্ট্রিটফিল্ড বিরসাকে ধরার জন্য পুলিশ নিয়ে আসে। কিন্তু বিরসাকে ধরা যায় না। ১৯০০ সালের জানুয়ারি ৫০-৬০ জন বিরসাইত বিদ্রোহীরা গয়া মুন্ডা নামক এক বিরসাইতের বাড়িতে মিলিত হয়। খবর পেয়ে সেখানে রাঁচির খুঁটি থানার হেড কনস্টেবল তার দুজন কনস্টেবল তিন চৌকিদারকে নিয়ে গয়া মুন্ডার বাড়িতে পৌঁছলে বিদ্রোহীরা দুই কনস্টেবল জয়রাম বুদুকে হত্যা করে, অন্যরা পালিয়ে যায়। ঘটনার পর দুমকা রাঁচি থেকে পুলিশ বাহিনী, ডোরানডা থেকে সেনাবাহিনী এনে সিংভূম রাঁচির কমিশনার বিরসাকে ধরার জন্য সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। সৈলরাকাব পাহাড়ে অভিযান চালায় ইংরেজ বাহিনী। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয় পাহাড়টি। স্ট্রিটফিল্ড বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান করেন, কিন্তু বিদ্রোহীরা তার জবাবে শুরু করে এক অসম যুদ্ধ। একদিকে চলে ঝাঁকে ঝাঁকে বন্দুকের গুলি, অন্যদিকে মুন্ডাদের তীর। অবশেষে বাস্তবতা, আধুনিক অস্ত্র বন্দুকের কাছে তীর পেরে ওঠে না। বিরসা তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এই অসম যুদ্ধে অনেক মুন্ডা নারী-পুরুষ শিশু নিহত হয় বিরসাকে ধরার জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এদিকে বিরসা গোপনে গ্রামে গ্রামে সভা করতে থাকেন। ১৯০০ সালের ফেরুয়ারির ১৩ তারিখে সেনত্রা জঙ্গলে মনমারু জারকাইল গ্রামের কিছু মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করে বিরসাকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়। তাঁকে এবং ৫৮১ জন বিরসাইতকে বন্দি করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার শুরু হয়। এর মধ্যে তিনজনের ফাঁসি হয় এবং ৭৭ জনের দ্বীপান্তরসহ নানা মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। বিদ্রোহীদের রাঁচি জেলখানায় রাখা হয়েছিল শেকল দিয়ে বেঁধে। ১৯০০ সালের জুন বিরসা অসুস্থ হয়ে পড়েন জুন রক্ত বমি করতে করতে বিরসা মুন্ডার মৃত্যু হয়। বিরসার মৃত্যুতে হাহাকার করে ওঠে মুন্ডারা। মৃত্যুর কারণ হিসেবে কলেরা বলা হলেও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তার মৃত্যুর পূর্ব লক্ষণের সঙ্গে কলেরা রোগের মিল পাওয়া যায়নি। অনেক অভিজ্ঞ ডাক্তার মনে করেন বিরসাকে অর্সেনিক বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল
বিরসা মুন্ডা আদিবাসীদের কাছে আজো বিরসা ভগবান হয়ে বেঁচে আছেন। বিরসার উলগুলান আধুনিক অস্ত্রের কাছে পরাজিত হলেও আদিবাসী সমাজ তাঁর পরাজয়ে লজ্জিত নয় বরং গর্বিত। তিনি দেখিয়ে গেছেন অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে এমনকি আজও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য বিরসার মতো লড়ে প্রয়োজনে জীবন দিতে হয়। আজো অনেকে সেবার নামে, ধর্ম প্রচারের নামে জনসংখ্যায় কম আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিজ পায়ে দাঁড়াতে না দিয়ে পঙ্গু করার চেষ্টা করছে। সময় হয়েছে প্রত্যেক আদিবাসী এক একজন বিরসা ভগবান হয়ে আদিবাসীদের সংস্কৃতি আর অরণ্যের অধিকার রক্ষার যুদ্ধে শামিল হবে


Wednesday, April 29, 2020

আমার যে দিন...। স্মৃতিচারণ

Image may contain: 4 people, including Dilip Kumar Sachdeva, people standing, tree, plant, flower, house, sky, outdoor and nature

Image may contain: 4 people, including Swarup Ratan Ghosh and Pallab Kumar Chatterjee, people standing, shoes and outdoor

আমার যে দিন...।


বন্ধুরা অনেকে নিজের বাগানের ফুল-ফল-গাছের ছবি পোস্ট করে, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, মুগ্ধ হয়ে দেখে যাই শুধু। এখানে মুম্বাইয়ের একচিলতে ফ্ল্যাটবাড়িতে টবে কিছু শৌখিন গাছপালা পুঁতে ফুল-টুল ফোটান বটে আমার গিন্নি, ভাল লাগে, কিন্তু নস্টালজিক মন ছেলেবেলার কথা মনে করে তেমন নাড়া খায় না তা দেখে।
আমার ছেলেবেলা কেটেছে বিহারের (এখন ঝাড়খণ্ড) দামোদর-তীরের ছোট্ট এক আধা-শহরে। এ এক এমন জায়গা যে গুগল ম্যাপে চেষ্টা করেও বাড়ি-ঘর খুঁজে পাবে না সেখানে, মনে হবে যেন গভীর জঙ্গল। হবে না কেন? বেশির ভাগ বাড়িই একতলা নয় দোতলা, অবশ্য ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কয়েকটা তিনতলা হোস্টেল বাদে। ছিল গোটা দুই মস্ত কারখানা- সার আর সিমেন্টের, দ্বিতীয়টা আজও আছে, সারের কারখানা সরকার, শিল্পপতি আর ইউনিয়নের মিলিত চক্রান্তে বন্ধ হয়ে গেছে সতের বছর আগে। কিন্তু কলোনি ছিল চোখ জুড়োন, চৌকো রাস্তা, প্ল্যানমাফিক সাজানো কোয়ার্টার্স আর বাংলোগুলো, আর ছিল সবুজের সমারোহ রাস্তার দুপাশ, বাড়ির বাগান জুড়ে। অজস্র মহীরূহের মাঝে চোখে আর নাকে পড়ার মত ছিল পলাশ-কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া-ছাতিম আর কদম। বসন্তে চারপাশ রঙিন হয়ে উঠত আর বর্ষার মুখে কদমের ডালে মেলা লাগত হলুদ-গোলাপি ফুলের। বর্ষা শেষ হতে না হতেই পুজো আসার অগ্রিম সংবাদ জানা যেত থোকায় থোকায় ফুটে থাকা সপ্তপর্ণী (ছাতিম) ফুলের তীব্র গন্ধে। আমাদের স্কুল ছিল বাসা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। বাস ছিল, কিন্তু এই ফুলগুলোর লোভে প্রায়ই বাস ছেড়ে দিয়ে সবান্ধবে হাঁটা দিতাম, বৃষ্টির প্রথম ধারায় স্নান করাটা ছিল উপরি পাওনা। কদমের ফুল গাছে চেপে পাড়ার ক্ষমতা হত না, তবে যে পরিমাণ পড়ে থাকত গাছের তলায় তলায়, সেগুলোই কুড়িয়ে জমাতাম, অকারণেই। তখন আমাদের প্রথম কদম ফুল দান করার কেউ ছিল না, হয়ত সে বয়সও হয়নি, তাই নিজের ফুল নিজেকেই কুড়োতে হত। অবশ্য দু-চারটে মেয়েও যে থাকত না সে দলে তা নয়, তারই কোন একটিকে দেখে হয়ত জসীমউদ্দীন লিখেছিলেন-
"কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্‌ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।"
একেবারে নিখুঁত ছবি, যদিও উনি এ শহরে কোনদিন এসেছেন বলে শুনিনি।
তবে আসল মজাটা পেলাম হাইস্কুলে যাবার পর। সেখানে দুটো বিল্ডিংএর মাঝে ছিল একটা বিশাল মহুয়া গাছ। আমাদিগকে তখন একটা পেপার হিন্দি আর একটা বাংলা পড়তে হত। হিন্দিভাষী ছেলেদের পড়তে হত দুটো হিন্দির পেপার। তা ওদের হিন্দি-২ এর সময় আমাদের বাংলা থাকত। কিন্তু ক্লাসরুম অত না থাকায় হরিদাস স্যার বা দাস স্যার আমাদের কয়েকজন বঙ্গসন্তানদের নিয়ে পড়াতে বসতেন বাইরে গাছতলায়, একেবারে শান্তিনিকেতনী স্টাইলে। কিন্তু পড়ব কী? 'সেদিন চৈত্রমাস'। সর্বনাশ হওয়ার বা ঘটানোর বয়স আমাদের না হলেও একটা জিনিষ দস্তুরমত টের পাচ্ছি সেটা সবজে কমলা রঙের মহুয়ার ফুল- প্রচুর পড়ে আছে গাছের তলায়। কী মিষ্টি গন্ধ- ঠিক যেন গোবিন্দভোগ চালের পায়েস, ভুর ভুর করছে চারপাশ। বাংলা পড়তে পড়তে অন্যমনস্কভাবে একটা মুখে তুলে নিতাম, এ হে হে- কিছুটা টক, আর বেশ তিতকুটে। এর চেয়ে বরং পাকা নিমফল ভাল! তখনও কি জানতাম এর মাদকতার কথা যেটা না চেখেই হয়ত কবিগুরু এন্তার কথা লিখে গেছেন-
"চৈত্রদিনে তপ্ত বেলা তৃণ-আচঁল পেতে
শূণ্যতলে গন্ধভেলা ভাসায় বাতাসেতে-
কপোত ডাকে মধুকশাখে বিজন বেদনায়।।"
(মধুক মানে যে মহুয়া সেটা তখন জানতাম না)
ঠিক এই গন্ধে ভরা দুপুরগুলোকে আজও মিস করি। ইতিহাস রাখি নি, 'তবু উড়েছিনু, এই মোর উল্লাস'। বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে কারখানা আবার চালু হতে চলেছে- সেই ছেলেবেলার বন্ধ স্কুলে আজ সেই কন্সট্রাকশন শ্রমিকদের ডেরা, সেই স্কুল, সেই শহর আর আমার নয়। তবু সুযোগ পেলেই এখনকার খাঁচার পাখি তখনকার বনে-জঙ্গলে ছুটে যাই।
আজ করোনাভাইরাসের আতঙ্কে গৃহবন্দী হয়ে এইসব কথাই চিন্তা করছিলাম। তবে না, কদমফুলের সঙ্গে নভেল ভাইরাসের চেহারার মিলটা সেই মুহূর্তে মাথায় আসে নি, এটা নিছক একটা সমাপতন!
মুম্বাই, ১৪২৭।
সঙ্গে ফটো- বুড়োবয়সে আবার দেখতে গেছি বাল্যের শহরকে, সবান্ধবে

Tuesday, April 28, 2020

টু ফর জয়।। অণুগল্প

টু ফর জয়!
(অণুগল্প)
-এই যে, তুই এখানে! আমি খুঁজে খুঁজে হয়রান।
- কেন রে বাবা, সাতসকালে কিসের কাজ পড়ল? এক মিনিট, ফড়িংটাকে তাক করেছি, নড়াচড়া করলেই ফস্কে যাবে।
- এই রাক্কস! সকাল সকাল এত খিদে কিসের? ফড়িংগুলো দিব্যি খেলছে, কিছুক্ষণ আনন্দে খেলতে দে না বাপু।
- তা কোথায় যেতে হবে? খাবার পাওয়া যাবে?
- হ্যাঁ রে পেটুক! তিন্নিদের বারান্দায়। অনেক গম ছড়িয়ে রেখে মেয়েটা চোখ বুজে দুই শালিক, দুই শালিক করে যাচ্ছে।
- সে কি রে, ফাঁদ নয় তো? আরে আমরা তো আর শালিক নই!
- আমরা শালিক না ময়না সে আর তিন্নি কি বুঝছে? ও দুটো পাখি দেখতে পেলেই খুশি। আজকে ওর স্কুলে পরীক্ষা যে!
- এই, তুই মানুষের বাচ্চাদের এত খবর কোথায় পাস রে? দিনরাত গমের লোভে হাউসিং সোসাইটিগুলোতে ঘোরাঘুরি করিস। কোন দিন জালে ধরা পড়বি সেদিন বুঝবি! খাঁচার মধ্যে রাধেকৃষ্ণ গেয়েই জীবন যাবে। চল, দেখি কোথায় তোর তিন্নি।
দুটি ময়না উড়ে গিয়ে এসে বসল তিন্নিদের ব্যালকনির ধারিতে।
তিন্নি ব্যাগ হাতে চোখ বুজে অপেক্ষা করছিল। ওর মা পাখিদুটোকে দেখে ওর মাথায় একটা টোকা মারতেই ও চোখ খুলল। 'টু ফর জয়! টু ফর জয়!' হাততালি দিয়ে নেচে উঠল তিন্নি।
ময়না দুটো তখন একমনে গম খুঁটে যাচ্ছে।

মহিমা।। অণুগল্প

মহিমা ।।

ভৈরব ঘোষালের বিধবা রাজু বুড়ি মারা গেছেন। একমাত্র পুত্রসন্তান বলরাম ঘোষাল শ্রাদ্ধ করছেন। বলাইবাবু একটু হিসেবি বটেন, তবে তাঁর মিষ্টি কথার গুনে কৃপণ বলে বদনাম রটেনি কখনো। তাই দানসাগর না করলেও বেশ ষোড়শোপচারে মায়ের শ্রাদ্ধ করার মনস্থ করলেন তিনি। তাঁর প্রাণের বন্ধু ভবতোষ শ্রাদ্ধে থাকতে না পারায় তাঁর আক্ষেপ জীবনে যাবে না এমনটি শোনা গেল। তাই পরের সপ্তাহে কাজে যোগদান করে বন্ধুকে সেই গল্প সাড়ম্বরে শোনাতে শুরু করলেন।
- তারপরে বুঝলি ভবা, ঠিক করলাম মায়ের কাজে ত্রুটি রাখব না কোনোকিছুর। সাত গাঁয়ের না হলেও গ্রামের সবাইকে নাপিত পাঠিয়ে নেমন্তন্ন করলাম। মোটা মোটা লুচি, বুটের (ছোলার) ডাল, ডিংলার (কুমড়োর) ছক্কা, বঁদে আর মিষ্টি দই। সব তো ঠিকই ছিল, তা দইয়ের আর অর্ডার দেওয়া হয়নি, একদম ভুলে মেরে দিয়েছিলাম। শেষে যখন মনে পড়ল দোকানে মাত্তর একভাঁড়ই পড়ে ছিল।
- কি কাণ্ড! সারা গাঁয়ের লোক আর একভাঁড় মোটে দই! কিভাবে সামাল দিলি?
- তবে আর বলছি কি? আমি ভাঁড়টা নিয়ে সোজা আলমারিতে তুলে তালা দিয়ে দিলাম। বললাম, মাগো তোমার ছেলের সম্মানরক্ষার ভার তোমার হাতেই গো মা, দেখো যেন বদনাম না হয়!
- তারপর কি হল?
- আর কি বলব ভবা, সবই মায়ের মহিমে রে, ভাবলেই এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। পেরায় হাজার খানেক লোক খেয়ে চলে গেল, বিশ্বাস করবি না, ওই একভাঁড় দই যেমনকার তেমনি রয়ে গেল!
পাশ দিয়ে অবিনাশ ঘোষাল যাচ্ছিল, বলরামেরই ভায়াদ, অতএব চিরশত্রু। সে খানিকটা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে ফুট কেটে গেল - তা তোমার যেমন কান্ড বলাইদা। লোককে না খাওয়ালে সে দই খরচ হবে কোত্থেকে শুনি?
- তুই চুপ কর অবু। তোকে বলেছি কিছু?

Saturday, April 25, 2020

পুতুল। অণুগল্প

পুতুল।।

রেহানার বিয়ে আজ, হাসনাবাদ হাই মাদ্রাসার নবম শ্রেণীর ছাত্রী রেহানা। মাদ্রাসা থেকে ফিরে বান্ধবী পরভিনের সঙ্গে পুতুল খেলছিল রেহানা। এমন সময় আম্মির আবির্ভাব, ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে! খেলার আসর থেকে জোর করে তুলে নিয়ে এসে ফ্রক ছাড়িয়ে একটা নতুন রঙচঙে শালোয়ার-কামিজ পরিয়ে দেওয়া হল তাকে। আব্বু ভ্যান-রিক্সা চালায়, দেখা গেল দুল্‌হা আর তার পরিবারকে নিয়ে আসছে তাঁরই ভ্যানে, পাড়ার ছেলে আনোয়ার। খুব সামান্য সাজসজ্জা হলেও উৎসবের পরিবেশ।

রেহানার আব্বা সেলিম নতুন কুটুমদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রেহানার আম্মি বলছিল বটে ও নাকি পড়াশুনায় খুব ভাল, মাদ্রাসার মাস্টারমশায়-দিদিমণিরা অনেক আশা রাখেন তার উপর। কিন্তু মেয়েমানুষকে বেশি পড়িয়ে হবে কী, বিশেষ যখন একটা সাধা রিশতা হাতে এসেছে? না না, এই রোজগারে এর বেশি কিছু আশা করা যায় না। স্ত্রীর বিয়েতে তেমন মত না থাকলেও সেলিমের জেদাজেদিতে রাজি হতে হয়েছে।
সাক্ষী, অতিথিরা এসে গেছে, নিকটস্থ মসজিদ থেকে ইমাম সাহেবও মেহেরবানী করে আসতে রাজি হয়েছেন। দেনমোহরের কথাবার্তা হয়ে গেছে, শুধু নিকাহের কাজটুকু বাকি। কিন্তু দেরি হচ্ছে কেন? রেহানা অবশ্য সকাল থেকেই খুব কান্নাকাটি করছিল, তা মেয়ে যখন পরের বাড়ি যাবার আগে তো কাঁদবেই। সেলিম মিঞা ভেতরে সাকিনাবিবিকে তাগাদা দিতে গেল।

কিন্তু রেহানা কই? সাকিনা এদিক-ওদিক, খাটের তলা আলমারির পেছনে খুঁজে বেড়াচ্ছে, রেহানা কোথায়? 'ও গো কী হবে, রেহানাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না'- কেঁদে ফেলে সাকিনা। আক্রোশে ওর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকায় সেলিম, 'বল হারামজাদি, কোথায় ভাগিয়েছিস মেয়েটাকে?' সাকিনা উত্তর না দিয়ে কাঁদতে থাকে।
ভেতরে একচিলতে উঠোন আর গোসলখানা, তার এককোণে রেহানার খেলাঘর। পাশেই খিড়কি দরজা খোলা, পালিয়েছে রেহানা। খেলনার বাক্সের পাশে পড়ে আছে গত সপ্তাহে শবেবরাতের মেলায় কেনা ওর নতুন পুতুলখানা- তার ধড়খানা পড়ে একদিকে, গলাটা ছুরি দিয়ে কাটা- মাথা পড়ে আছে অন্য একদিকে। উদ্‌ভ্রান্তের মত ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল সেলিম। একি, পুলিশ কেন?

'শোন হে সেলিম!' দারোগা শাসায়, 'তোমার মেয়ে বসে আছে হাসনাবাদ থানায়, দারোগা বললেন। তোমরা মাইনর মেয়ের বিয়ে দিচ্ছিলে, শালা জেল খাটতে হবে সেটা জানো? বিয়ে হবার আগেই রেহানা ওর এক দিদিমণির সাথে এসে থানায় রিপোর্ট করেছে বলে তুমি বেঁচে গেলে। আঠারোর আগে আর মেয়ের রজামন্দি ছাড়া বিয়ে দেবে না লিখে মুচলেকা দিলে তবেই তুমি রেহাই পাবে, এখন কী করবে তুমিই ঠিক কর।'
তদন্ত করতে একবার ভেতরে এলেন দারোগা সাহেব। গলাকাটা পুতুল আর পাশে পড়ে থাকা ধারালো ছুরি দেখে শিউরে উঠলেন তাঁর মত একজন পোড়খাওয়া মানুষ।

গল্পটা আমার শেষ হয় নি। রেহানাদের গল্প শেষ হয় না, চলতেই থা্কে, চলতেই থাকে যে পর্যন্ত না এরকমই নৃশংসভাবে খুন হয় আরেকটি রেহানার কৈশোর, তার পুতুল খেলার বয়স। আপনারা দেখুন না যদি গল্পটাকে একটা শেষ পরিণতি দিতে পারেন।     

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

Tuesday, January 7, 2020

নয়া শিবালয়।। ইকবাল (বাংলা অনুবাদ)

नया शिवाला / इक़बाल

सच कह दूँ ऐ बिरहमन गर तू बुरा न माने
तेरे सनमकदों के बुत हो गये पुराने।

अपनों से बैर रखना तू ने बुतों से सीखा
जंग-ओ-जदल सिखाया वाइज़ को भी ख़ुदा।

तंग आके मैंने आख़िर दैर-ओ-हरम को छोड़ा
वाइज़ का वाज़ छोड़ा, छोड़े तेरे फ़साने।

पत्थर की मूरतों में समझा है तू ख़ुदा है
ख़ाक-ए-वतन का मुझ को हर ज़र्रा देवता है।

आ ग़ैरियत के पर्दे इक बार फिर उठा दें
बिछड़ों को फिर मिला दें नक़्श-ए-दुई मिटा दें।

सूनी पड़ी हुई है मुद्दत से दिल की बस्ती
आ इक नया शिवाला इस देस में बना दें।

दुनिया के तीरथों से ऊँचा हो अपना तीरथ
दामान-ए-आस्माँ से इस का कलस मिला दें।

हर सुबह मिल के गायें मन्तर वो मीठे- मीठे
सारे पुजारियों को मय प्रीत की पिला दें।

शक्ती भी शान्ती भी भक्तों के गीत में है
धरती के वासियों की मुक्ती पिरीत में है।


নব দেবালয়।।
অল্লামা ইকবাল

অভয় দাও তো সত্য কথাটি বলি ওগো ব্রাহ্মণ,
তব দেবালয়ে বিগ্রহ আজ হল বহু পুরাতন।

এই সে দেবতা শেখালেন যিনি ভুলিতে আপনজন
হিংসা-দ্বেষের বিষবৃক্ষটি এ খোদা করে রোপন।

জ্বলে-পুড়ে শেষে ত্যজিনু সকল ধর্ম ও মজহব
ধর্মগুরুর বাণী ও যজন-পূজন মহোৎসব।

পাথর-মূরতি মাঝারে কোথায় খুঁজে ফের ঈশ্বর?
দেশের মাটির প্রতি কণামাঝে আছে তাঁর স্বাক্ষর।

এস হে বারেক ছিঁড়ে ফেল যত বিদ্বেষ-যবনিকা
বিভেদ-গরল ফেলিয়া পরাও মিলনের জয়টিকা।

যুগ যুগ ধরে শূন্য রয়েছে হৃদয়ের এ নিলয়
বারেক আসিয়া গড়ে তোল নব মিলনের শিবালয়।

বিশ্বের মাঝে শ্রেষ্ঠ তীর্থ হয় যেন সে মহান
শীর্ষ-কলস যেন রে ঊর্ধ্বে চুম্বে সে আসমান।
মহামন্ত্রের ধ্বনিটি ছড়াক আকাশ বাতাস জুড়ে
ভকত হৃদয় ভরিয়া উঠুক প্রেমের মধুর সুরে।

শান্তি, শক্তি, প্রেম ও ভক্তি সে মহাধ্বনির মাঝে
বিশ্বজীবের আত্মায় যেন মুক্তিমন্ত্র বাজে।।