Monday, August 17, 2020

সলিলের গানে দুঃখ-বিরহ। প্রবন্ধ ও আলোচনা

সলিলের গানে দুঃখ-বিরহ।

(প্রবন্ধ ও আলোচনা)


(১)
প্রস্তাবনা।।
ফেসবুকেই সলিল চৌধুরির গানের কিছু বিশেষ দিক নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম একদিন। বিষয় ছিল সলিলের গানের গতিময়তা। না, গতিময়তা বলতে এক্ষেত্রে দ্রুতলয় বা চটুল-ছন্দ বা ভাষার লঘুতার কথা বলছি না, সলিল গানের প্রতিটা বিভাগে রেখেছেন নিজস্বতার স্বাক্ষর। জীবন যে চলার নাম, তা কখনও থেমে থাকে না, দুঃখ-মৃত্যু-বিরহ আসে দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়মেই এই জিনিষ কথায় আর সুরে বুঝিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, অতুল, দ্বিজেন, রজনীকান্ত আর নজরুল- লয় আর যন্ত্রানুষঙ্গে এক নতুন আঙ্গিক যোগ করলেন সলিল চৌধুরি। আমি শুরু করেছিলাম সলিলের একটি জনপ্রিয় গানের কথা দিয়ে, প্রসঙ্গক্রমে এসে পড়ল আরো নানাকথা, সলিল-সমাধি ঘটেছে এমন কিছু গুণী ব্যক্তির সংযোজন, তর্ক-বিতর্ক ক্রমে সমৃদ্ধ করে তুলল এই সূত্রটি। ভাগ্যক্রমে ফেসবুক সব কিছুই ধরে রাখে, মানে এ পর্যন্ত রেখেছে। তবে আমার পোস্টের চেয়েও যে সমৃদ্ধতর এই আলোচনাচক্র, আর তা যাতে হারিয়ে না যায় তাই সবকিছুকে সংকলিত করে উপস্থাপনা করছি বন্ধুদের জন্যে। আশা করি অদূর ভবিষ্যতে আরো কিছু তথ্য-সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে এই রচনা।


ভূমিকা।।
আমাদের দেশের সংগীতে গানের কথার ভাব বা বিষয় অনুসারে গানের স্বভাব, গতি আর মেজাজ নির্ভর করে, সে হিসাবে অধিকাংশ সময়ে রাগ, তাল আর লয় নির্ধারিত হয়। প্রাক্‌-রবীন্দ্র বা রবীন্দ্রোত্তর যুগেও এর খুব একটা অন্যথা হয় নি। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ নিজে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন এ ব্যাপারে, অতুলপ্রসাদ বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কখনও বা নজরুল চমক সৃষ্টি করেছেন মাঝে-সাঝে ব্যতিক্রমী সৃষ্টি দিয়ে। সে প্রসঙ্গে আসার আগে প্রচলিত ধারণা বা প্রয়োগ সম্বন্ধে একটু আলোচনা করে নিই।
হিন্দুস্থানী মার্গসংগীতের এক স্বনামধন্য পণ্ডিত তাঁর কিছু বিদেশী শিষ্যদের নিয়ে ভারতীয় রাগসংগীতের বৈচিত্র্য নিয়ে চর্চা করছেন। তিনি বাদ্যযন্ত্রে ভৈরবীর সুর বাজিয়ে জানতে চাইলেন তাঁদের কী মনে হল। উত্তর এল- কার জন্যে সারারাত অপেক্ষা করলাম, সে এল না। আশ্চর্য! সুরটা ছিল বিখ্যাত বন্দিশ 'কা করুঁ সজনি, আয়ে না বালমা'র। তার পরের সুর ভীমপলশ্রী- বিদেশী শিষ্যেরা একবাক্যে বললেন কে যেন প্রিয়মিলনের অভাবে দুঃখে-অভিমানে গুমরে কাঁদছে। সুর ছিল- 'যা যারে অপনে মন্দিরবা'। পুরনো দিনের এক প্রথিতযশা শিল্পী একদিন গল্পচ্ছলে রাগ বিহাগের সম্বন্ধে কিছু বলছিলেন। এটি বিলাওয়ল ঠাটে উড়ব-সম্পূর্ণ জাতির রাত্রি মধ্য-প্রহরে গেয় একটি সুন্দর রাগ, মনকে মোহাবিষ্ট করে ফেলতে এর জুড়ি নেই। দিনে গাইতে নিষেধ কেন? কথিত আছে এক মহিলা এক সকালে নিজের ঘরে মাছ কুটছিলেন, শিশু-সন্তান পাশে শুয়ে খেলা করছে। এমন সময় পাশের বাড়ির ওস্তাদ রাগ বিহাগ ধরলেন। মোহাচ্ছন্ন হয়ে মহিলা বুঝতে পারেননি কখন মাছের পরিবর্তে শিশুটিকে রেখেছেন বঁটিতে। খবর পেয়ে দেশের রাজা সেদিন থেকে দিনে বিহাগ গাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। তানসেনের দীপক রাগ গেয়ে আগুন জ্বালানো বা বৈজুর মেঘরাগে বৃষ্টি নামিয়ে তা নেভানো, এসব হয়ত গল্পকথা। তবে লক্ষ্য করেছি যে শ্রী-রাগে গীত দত্তাত্রেয় পলুস্করের ‘হরি কে চরণ-কমল নিশাদিন সুমরো রে’ শুনে মনে হত যেন শেষ দিনের ডাক শুনতে পেয়েছেন তিনি, কেমন যেন একটা বিদায়-ব্যথা-জড়িত ক্লান্তি তাঁর সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরে। সত্যি অসম্ভব গুণী মানুষটি বড় তাড়াতাড়ি যেন চলে গেলেন সংসারের মায়া ছেড়ে।
সংগীতের রাগ-রাগিনীর ব্যবহার নিয়ে এরকমই নানা গল্পকথা ছড়িয়ে আছে এ দেশের পথে প্রান্তরে। ওস্তাদ-পণ্ডিতদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা ছিল না গায়ক-সংগীতকারদের। হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত হিন্দি বলয়ের ওস্তাদদের হাতে এমনভাবে কুক্ষিগত ছিল যে খেয়াল-ঠুমরি-ধ্রুপদের বন্দিশ বাংলায় লেখার কথাও ভাবা যেত না। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শোরী মিঞা ঘরানার অনেক বিরোধিতা সহ্য আর উপেক্ষা করে রামনিধি গুপ্ত লিখলেন বাংলায় টপ্পা, রামমোহন রায় লিখলেন ধ্রুপদ। তারপর কিছুটা হলেও খুলে গেল বাংলা গানে উত্তর আর দক্ষিণ ভারতীয় রাগরাগিনীর সার্থক প্রয়োগ, রামপ্রসাদ-মদন-দাশু রায় ভক্তিগীতিতে যা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাতে যোগ করলেন বাংলার লোকগীতি, বিদেশী সুর, ভাঙলেন উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের যাবতীয় বেড়াজাল।
“সংগীতচিন্তা” বইয়ে রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে লিখছেন “আমাদের দেশে সংগীত এমনি শাস্ত্রগত, ব্যাকরণগত, অনুষ্ঠানগত হইয়া পড়িয়াছে, স্বাভাবিকতা হইতে এত দূরে চলিয়া গিয়াছে যে, অনুভবের সহিত সংগীতের বিচ্ছেদ হইয়া গিয়াছে, কেবল কতকগুলা সুরসৃষ্টির কর্দম এবং রাগরাগিণীর ছাঁদ ও কাঠামো অবশিষ্ট রহিয়াছে। সংগীত একটি মৃত্তিকাময়ী প্রতিমা হইয়া পড়িয়াছে।“ অন্যত্র আরো বলেছেন, “ক্লাসিক্যাল আমাদের কাছে দাবী করে নিখুঁত পুনরাবৃত্তি। তানসেন কী গেয়েছেন, জানি না, কিন্তু আজ তাঁর গানে আর-কেউ যদি পুলকিত হন, তবে বলব তিনি এখন জন্মেছেন কেন? আমরা তো তানসেনের সময়ের লোক নই, আমরা কি জড়পদার্থ? আমাদের কি কিছুমাত্র নূতনত্ব থাকবে না?” এর অর্থ কী? “আমার এ ঘর বহু যতন করে/ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।” আসলে সংগীত বা শিল্পসাহিত্য-ললিতকলা ততদিনই বেঁচে থাকে, যতদিন সে নিজেকে ঘষে মেজে নতুন করে নিতে পারছে। প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে পালটে নিতে পারছে। গোলমাল তখনই বাধে, যখন, এই ঘষামাজার কর্তবে নতুন সৃষ্টির ‘আনন্দের’ চাইতে, সে সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ব্যাকরণ লঙ্ঘন হল কিনা, সেই তর্কে প্রাজ্ঞ পিতামহ শ্বেত শ্মশ্রু দোলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইতিহাস সাক্ষী, যতবার শিল্পীর প্রতিভার খামতি দেখা দেয়, ততবারই ধ্বংসের ভয়ে ব্যাকরণ টিকিয়ে রাখার ব্রতে মগ্ন হয়ে পড়েন তাত্ত্বিক পণ্ডিত।



(২)
একটি গান, কিছু কথা।

তবু যেন কিছু বাকি ছিল। রবীন্দ্রোত্তর যুগে নজরুল এনেছিলেন আরবী সুর, বাংলায় লিখেছিলেন গজল, কাওয়ালি, কাজরি, ঠুমরি, দাদরা, ইসলামি সংগীত। বাকি ছিল ভাবের সঙ্গে সুর আর লয়ের সামঞ্জস্য। নজরুল কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও প্রচলিত প্রথা যেন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেললেন সলিল। সুরের বৈচিত্র্য তো বটেই, রাগাশ্রিত গানে বিবাদী সুরের মুন্সিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার, স্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারী-আভোগের প্রচলিত শৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসা, পলিফোনি, এমনকি ভোক্যাল হারমনাইজেশন নিয়ে আসা, একই গানের মধ্যে স্কেল বদল করার সাহস- পূর্বসূরীরা কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেও এ সবকিছুর প্রথম সার্থক প্রয়োগ করেন সলিল চৌধুরি। কথা-সুর-লয়-ছন্দের সামঞ্জস্য আর তার বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে গেল সলিলের একটি জনপ্রিয় গানের কথা-
'দূর নয় বেশী দূর ওই সাজানো সাজানো বকুল বনের ধারে
ওই বাঁধানো ঘাটের পারে।
যেথা অবহেলা সয়ে সয়ে কিছু ফুল শুকানো শুকানো হয়ে
পড়ে পড়ে আছে তার কিছু দূরে ঘাটের চাতাল ছাড়িয়ে-
ওখানে আমার মাতাল হৃদয় সেদিন গিয়েছে হারিয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
বহুশ্রুত গান, বলে দিতে হবে না নিশ্চয় যে কে গেয়েছেন। একে হৃদয়, তায় আবার মাতাল- যাক না হারিয়ে, ক্ষতি কী! তবু কবি থামেন না, অতএব গায়ক শ্যামল মিত্রকে ঠিক কী হারিয়েছে তার বর্ণনা দিতে হয়।
'শুক-সারীরা সেখানে কূজনে কূজনে দুজনে গাহিয়া যেত
ওই নদীটি বহিয়া যেত।
বনহরিণী চকিত চপল চরণে চমক লাগায়ে দিয়ে
তার চেয়ে ভাল চোখ দুটি দেখে যেখানে যেত সে দাঁড়িয়ে-
সেখানে আমার করুণ হৃদয় সেদিন গিয়েছে হারিয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
প্রথম পঙ্‌ক্তির মধ্যমিল আর তার পরে 'চ'এর অনুপ্রাস চোখে পড়ার মত, কবিগুরুর 'চলচপলার চকিত চমকে করিছে চরণ বিচরণ' মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তারও চেয়ে ভাল সেই চোখের বিবরণ যেখানে কবির চোখ পড়েছে, কিন্তু আমাদের এখনও পড়েনি। তাই অনায়াসে বলে উঠি, 'যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌' পরের স্তবকের আশায়।
'মোর মানসী কলস কাঁখেতে লইয়া ওখানে দাঁড়াত এসে,
মুখে মধুর মধুর হেসে।
তার তনুর তীরথে ডুবিয়া মরিতে নদীও উতলা হত
তার ঢেউএ ঢেউয়ে আরো দুটি ঢেউ যেখানে দিত সে বাড়িয়ে-
সেখানে আমার উতল হৃদয় সেদিন গিয়েছে হারিয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
এতক্ষনে অনঙ্গ যেন অঙ্গধারণ করলেন। সে মানসীর তনুর তীরথ কথাটা অবশ্য নতুন নয়, নজরুল আগেই লিখে ফেলেছেন- 'বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে'। তবে নারীর বক্ষসৌন্দর্য বর্ণনার জন্যে কোনও কুরুচিকর শব্দ বা আদিরসাত্মক বিতর্কে না গিয়ে কবি লিখে ফেললেন- 'তার ঢেউএ ঢেউয়ে আরো দুটি ঢেউ যেখানে দিত সে বাড়িয়ে' - এখানে সলিল চৌধুরি একজন ওস্তাদ শিল্পী।
'মোর দিবস রজনী হায় গো সজনী ভাবিয়া কাটিয়া যেত,
সবই স্বপ্ন যে মনে হত।
সেই মগন স্বপন সহসা কখন ভাঙিয়া ভাঙিয়া গেল
এই পথ দিয়ে বধূবেশে সেজে যেদিন গেল সে হারিয়ে
সেদিন আমার সজল হৃদয় দু'পায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
এইখানেই আসল ট্রাজেডি। কিন্তু ভগ্নহৃদয়ের হা-হুতাশের বদলে কবি লিখলেন কি- 'যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌'। গানটিতে দ্রুতলয়ের সাথে চটুল সুরের ব্যবহার কথার সাথে হয়ত খাপ খায় না, তবে এ ব্যাপারে সলিলের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন সলিল-বিশেষজ্ঞ তথাগত ভট্টাচার্য, সে কথায় পরে আসছি। এ পর্যন্ত আমরা সঙ্গীতের ভাব, সুর, রাগ, তাল ও লয়ের সমন্বয় নিয়ে যা যা শুনে এসেছি রবীন্দ্র যুগ পর্যন্ত, সবকিছু ধ্যান-ধারণা যেন এক-ঝটকায় বদলে গেল। অবশ্য নজরুলের দু-একটা কাওয়ালি জাতীয় গানে (যেমন- যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে) এধরণের একটু আভাস পাওয়া গেছে ইতিপূর্বে, তবে সেটা যেন অন্তরের অভিমানের বহিঃপ্রকাশ, কাওয়ালি বা গজলের তালবিহীন 'শায়রি'তে তার আসল রূপটা মেলে। কিন্তু এটাই সলিল 'দি অরিজিন্যাল'।
সলিল চৌধুরির হাত ধরে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা গান যেন সাবালকত্বে পা রাখল। বন্ধু ভাস্কর বসুকে কৃতজ্ঞতা জানাই সলিল-গীতির এই বিশেষ দিকটি আমার দৃষ্টিতে তুলে ধরার জন্যে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে আমরা পরের অংশে কিছুটা আলোচনা করতে চলেছি



(৩)
আলোচনা-পর্ব।।
"গানটিতে দ্রুতলয়ের সাথে চটুল সুরের ব্যবহার কথার সাথে হয়ত খাপ খায় না" – এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সলিল-বিশেষজ্ঞ তথাগত ভট্টাচার্য জানালেন- “শক্তিশালী গীতিকারের (কবি নয়) লেখনীতে সৃষ্ট গানে অনেক সময়েই কথার অতীত কোনো অন্তরাত্মার (spirit) সন্ধান পাওয়া যায়, যা কথাকে অতিক্রম করে যায়। এই অন্তরাত্মার সন্ধান পেলে অনেক সময়েই দেখা যায়, তা গানের নিছক কথার অতিরিক্ত কিছু তো বটেই, অনেক সময় গানের কথার আপাত-বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত! সুরকারের প্রতিভা গানের এই অন্তরাত্মাকেই ধরবার চেষ্টা করে - নিছক কথা কে নয়। এক্ষেত্রেও, সুরকার সলিলের অনন্য প্রতিভা তুলে ধরবার চেষ্টা করেছে গীতিকার সলিলের অমর সৃষ্টি এই গানের আসল spirit টিকে - যা কিনা ধরা আছে ওই পাঁচটি শব্দের বাক্যবন্ধে -"যাক যা গেছে তা যাক!" পুরোনো স্মৃতির অলস রোমান্টিকতা নিয়ে পড়ে থাকা নয়, সামনে দেখো! এই তো ছিল সলিলের জীবনের মূল মন্ত্র। শ্যামল মিত্রেরই গাওয়া সলিলের অপর এক সৃষ্টিতে দেখি,
"স্মৃতি নিয়ে কি হবে আর, মিছে পুতুল খেলার মোর সাধ নাই
মনে রাখো কি না রাখো, মনে মনে ভাবা মোর কাজ নাই.
এ জীবন মোর আঁধারে আঁধারে মিশে
আলোয় আলোয় মিলে মিশে থাক।"
"স্মৃতির রোমান্টিকতাকে সার্থক সৃষ্টির প্রেরণায় ব্যবহার করো, কিন্তু সেই স্মৃতিডোর যদি দুঃখের সাগরে নিমগ্ন করে পেছনে টেনে ধরে, তো তাকে ছিন্ন করো"- এই দৃপ্ত পৌরুষই এই গানের, এবং সলিলের অন্যতর বহু গানের, অন্তর্নিহিত সুর, আর সেই সুরই ফুটে উঠেছে "যাক যা গেছে তা যাক"এ প্রযুক্ত marching tune এ। তাই দ্রুতলয় আর চটুল সুরের ব্যবহার আমার মতে ব্যাথাময় অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলার সুর।“
আরেক গুণী বন্ধু আশুতোষ ভট্টাচার্য জানালেন তাঁর একটি সুন্দর উপলব্ধি। “সত্যি এই গানের কথা,ছন্দমিল,সুর,মেলোডি আর গায়কী মিলেমিশে অনন্য হয়ে উঠেছিল। 'সেদিন আমার সজল হৃদয় দুপায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে',দেখুন গুনগুন করে গেয়ে, মনে হবে যেন সিঁড়ির ধাপে ধাপে নামছেন আর সমতল পেয়েই 'যাক যা গেছে তা যাক' নিতান্ত অবজ্ঞাভরে, পাহাড়ি রাস্তার সর্পিল বাঁকগুলো সন্তর্পণে ধাপে ধাপে নেমে এসে সমতল পেয়েই গাড়ি যেমন নিশ্চিন্তে গতি বাড়িয়ে দেয়।“
বিশিষ্ট কবি পরাগ বরণ পাল জানালেন-
“এই গানটি নানান বিভিন্ন কারণে আমার মতে একটি cult song বাংলা গানের ইতিহাসে। অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন সঙ্গীতব্যক্তিত্ব তাঁর একটি লেখায় জানিয়েছেন গানটি নাকি গুরুচন্ডালি দোষে দুষ্ট। আমি আমার একটি লেখায় (আনন্দবাজারে প্রকাশিত) তার প্রতিবাদ করেছিলাম। সেই লেখাটির আরো অনেক পরিবর্ধিত রূপ পরে অন্যত্র প্রকাশিত। এখানে লিঙ্ক দিলাম।“
ভাস্কর বোস উত্তরে গুরুদেব ও গুরুচণ্ডালী সম্বন্ধে কিছুটা মজার ছলেই লিখলেন-
“গুরুচণ্ডালী কাব্যে ও গীতিকাব্যে অলৌকিকত্ব সৃষ্টি করে সেটা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই অপূর্ব গায়নরীতিতে যখন গাইছিলেন,
"দিন চলে গেছে খুঁজিতে খুঁজিতে।
শুভক্ষনে কাছে ডাকিলে,
লজ্জা আমার ঢাকিলে গো—
তোমারে সহজে পেরেছি বুঝিতে!" “
নতুন নতুন শব্দের ব্যবহারেও লিরিসিস্ট কবি হিসেবে সলিল অনবদ্য। সলিলের বিখ্যাত "আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা গানে দুটো নতুন শব্দ পাচ্ছি, 'চতুর্পাশে' আর ‘তুষারিত’ "- পরাগবাবু মনে করালেন।
“আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে
আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা।।“
ভাস্কর একবার 'মরি হায় গো হায়' গানে 'চৌদিকে' কথাটা নিয়ে লিখেছিলেন, শব্দের প্রয়োগটাও লক্ষ্যণীয় রবি ঠাকুরের 'চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি' র অনুসরণে।
তথাগতর কথার পরিপ্রেক্ষিতে ভাস্কর আরেকটি গানের উল্লেখ করলেন যাতে আছে সেই একই এগিয়ে চলার আপ্রাণ তাগিদ,
"জীবন বৃন্তের থেকে ঝরে
কত না স্বপ্ন না গেছে মরে।
তবুও পথ চলা কবে যে শেষ হবে জানি না"
সেখানে স্মৃতি ভার নয়, অনুপ্রেরণা। 'স্মৃতিরা যেন জোনাকির ঝিকিমিকি, ঝিকিমিকি।।'



(৪)
সলিল চৌধুরী বিরহের গানেও তথাকথিত দুঃখের সুর লাগতে দেন নি। উদাহরণ - "নিশিদিন, নিশিদিন, বাজে স্মরণের দিন" বা "অন্তবিহীন, কাটে না আর যেন বিরহের দিন"!! এমনকি " ও বৌ কথা কও বলে পাখি আর ডাকিস না" - গানেও একটা অদ্ভুত রকমের উজ্জ্বল ঔদাসীন্য কাজ করে। ওনার দর্শনে সম্ভবতঃ দুঃখ পাওয়া মানে হেরে যাওয়া।
“এই শেষ কথাটা নিয়ে আমি এক সময় বেশ ভেবেছিলাম”, বিজ্ঞানী- সাহিত্যিক অমিতাভ প্রামাণিক জানালেন।“এগুলো কি ইচ্ছে করেই করা? সন্দেহ জাগে। বিদেশী সুরের আর বাজনার জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার প্রবল আকর্ষণ থেকে সলিল হয়ত বেরোতে পারেন নি। এই গানগুলো গাওয়ার সময় গায়কের (বা গায়িকার) গলায় সামান্যতম দুঃখের পরশ পাই না। যেন বিরহ কত আনন্দের জিনিস! অথচ 'বিরহ বড় ভালো লাগে'-তে কত্তা কি অসম্ভব মেদুরতা এনেছিলেন!”
ভাস্করের কিন্তু অন্য মত। “বিরহ কিন্তু প্রেমের এমন একটা দিক যেটা ছাড়া প্রেমকে ভাবা যায়না। কালিদাসের মেঘদূতের থেকেই হয়ত পরবর্তী কবিরা বিরহের সৃজনশীলতা কে স্বীকার করেছেন। "নিদ নাহি আঁখিপাতে" - কথাটা খুবই দুঃখের কিন্তু গানে সেইরকম দুঃখের প্রকাশ নেই। সেইরকমই "আমি তোমারই বিরহে রহিব বিলীন / তোমাতে করিব বাস । দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস" - এই বিরহীর কি অসাধারণ আত্মপ্রত্যয়, সুরে ও তা চিহ্নিত। এখানেও মনে হতে পারে - প্রেমিক যেন বিরহের প্রতীক্ষাতে। এমনকি মৃত্যুকেও সেইভাবে দেখা হয়নি, বরং ভাবা হয়েছে তা জীবনেরই এক রূপ- কর্মবাদী মানুষের দুঃখবিলাস সাজেনা - "মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় সে দুঃখের কূপ,/ তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ, আপনার পানে চাই"! সলিল ও তাই হয়ত একই ভাবে বলেছেন - "জীবন বৃন্তের থেকে ঝরে, কত যে স্বপ্ন গেছে মরে / তবু এ পথচলা কবে যে শেষ হবে জানিনা"!!
আমার মনে হয় কথাটা ঠিক। 'আর নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের' গানটি শুনে আগে খটকা লাগত, বোঝা মুস্কিল ছিল যে ওটা প্রেম নয়, তার মায়াজাল কাটিয়ে 'এবার ফেরাও মোরে'র আহ্বান। 'সাত ভাই চম্পা'র prelude শুনলে মনে হয় একটা রূপকথার গল্প শুনতে চলেছি। আবার 'না, মন লাগে না' গানে কিছুটা হলেও বিরহের অভিব্যক্তি আছে। অথচ 'রানার'এর কিছু অংশে সুরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবে 'গাঁয়ের বধু' গানের শেষ অংশে 'আজও যদি তুমি কোনো গাঁয়ে দেখো ভাঙ্গা কুটিরের সারি, জেনো সেইখানে সে গাঁয়ের বধুর আশা-স্বপনের সমাধি।' হেমন্ত বেশ মন-উদাস-করা ভাব এনেই অংশটি গেয়েছেন। জানিনা সলিলের অনুপস্থিতিতে গানটির রেকর্ডিং হয়েছিল বলে কিনা!
ভাস্কর বললেন, “এটা নিয়ে অনেকই বিতর্ক শুনেছি। "আজ নয় গুনগুন" এ যেহেতু আহ্বান টি প্রেমিকার তাই তার মধ্যে আর্তিটাই বেশী প্রাধান্য পেয়েছে। পরের অংশটি শুনলে বোঝা যায় - "তুমি হও একজন তাদেরই কাঁধে আজ তার ভার তুলে নাও, তুলে নাও!!” “
“এই গানটা কে বলা যেতে পারে দুটি ভাবের সংমিশ্রণ। মোহিনী চৌধুরীর একটি খুব বিখ্যাত গান ছিল - পুরুষকন্ঠে - "পৃথিবী আমারে চায়, রেখোনা বেঁধে আমায়, খুলে দাও প্রিয়, খুলে দাও বাহুডোর" - এখানে যেন নারী পুরুষটিকে উলটো ভাবে অনুপ্রাণিত করছে। এর সঙ্গে "প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, " বা "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়" এই দুটি ভাবকে ও রাখা হয়েছে বলে মনে হয়।“
হালকাভাবেই বলি, প্রেমের বন্ধন অনেক সময় পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে যদি প্রেমিক বলে- 'রোগের মতন বাঁধিব তোমায় দারুন আলিঙ্গনে'। তখন সেই যন্ত্রণার থেকে ছাড়া পেতে হয়ত প্রেমিকাকেও বলতে হয়- 'ওগো প্রিয় মোর, খোল বাহুডোর, পৃথিবী তোমাকে যে চায়'। কি জানি এটাও সেই কেস কিনা!
ঠাট্টা নয়, জনশ্রুতি আছে গোস্বামী তুলসীদাস এইরকম ভালবাসতেন স্ত্রীকে। স্ত্রী যেটা করলে লোকে পতিব্রতা বলে প্রশংসা করে, স্বামীদের ক্ষেত্রে একই অবস্থায় জোটে স্ত্রৈণ বলে লাঞ্ছনা। একদিন এমন অবস্থা দাঁড়াল যে স্ত্রী একবেলার জন্যে পিত্রালয় গেছেন, তুলসীদাস থাকতে না পেরে সেই রাত্রেই ছুটে এসেছেন শ্বশুরবাড়ি। লজ্জিতা, অপদস্থা তুলসী-পত্নী তখন ভর্ত্সনা করে তাঁর পতিকে যা বলেছিলেন, তুলসীদাসের লেখা থেকেই বলছি-
"লাজ না লাগত আপকো, দৌড়ে আয়হু সাথ
ধিক, ধিক, এইসে প্রেম কো, ক্যা কহুঁ ম্যয় নাথ।
অস্থি-চর্মময় দেহ মম, তামেই এয়্সী প্রীতি,
এইসা যো শ্রীরাম মে হো, ন হোতী তো ভবভীতি।"
ঘুরে গেল তুলসীর জীবনের মোড়। সংসার ছেড়ে গঙ্গাতীরে বসে তিনি রামচরিত নিয়ে পড়লেন, বাকিটা ইতিহাস।
"সলিল চৌধুরীকে চিনতে গেলে প্রচলিত সুরের ধারণাকে সরিয়ে দিতে হবে"- সাহিত্য-সেবী শ্যামা প্রসাদ সরকার মনে করালেন। "উনি একজন প্রকৃত সুরসাধক। তাই অক্লেশে নিজেই ব্যাকরণ বানিয়ে নেন আর সেটাই নিও ক্ল্যাসিকাল হয়ে যায়। গণসঙ্গীতকেও উনি মেলাতে পারেন প্রেমের সুরে!"
শেষে তাহলে একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। গণসঙ্গীত, সলিল চৌধুরি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র ও দেবব্রত বিশ্বাস।
ইতিমধ্যে একজন বন্ধু দেবব্রতের কণ্ঠে সলিল-সংগীত “যদি কিছু আমারে শুধাও” গানটির লিঙ্ক পাঠিয়েছিলেন, সেটা শোনার পর থেকে মোহাচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম, সম্পূর্ণ এক অন্য জগতে পৌঁছে গেছিলাম যেন।
IPTA র সময় থেকে দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী একসাথে কাজ করেছেন, সলিলের প্রযোজনায় প্রথম বাংলা চলচ্চিত্রে, তাছাড়াও অনেক গান দেবব্রত নিজের খেয়ালেই গেয়ে গেছেন, বিশেষ কোনো যন্ত্রানুসঙ্গ ছাড়াই। সলিলের দু'একটা গণনাট্যের গান যেগুলো হেমন্তের গলায় শুনে এতকাল মুগ্ধ হয়েছি আমরা, পরে শুনেছি দেবব্রতর গলায়। হেমন্তের সঙ্গে তুলনায় যাচ্ছি না, ঈশ্বরীয় কণ্ঠস্বর তাঁর, কিন্তু 'পথে এবার নামো সাথী' বলতে কী বোঝায়, তা দেবব্রতের গলায় সঠিক প্রতিফলিত হয়েছে।
"সবচেয়ে বেশি মনে হয়ে "অবাক পৃথিবী" গানে "এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম" এর উচ্চারণে"- ভাস্কর মনে করিয়ে দিলেন। "পদাঘাত, অবাক, সেলাম! কী অমোঘ, তীব্র উচ্চারণ দেবব্রতর গলাতে।"
এখন ভাবি, গাঁয়ের বধু, পাল্কীর গান, রানার এগুলোর মধ্যে বেশ খানিকটা রোমান্টিসিজম আছে যার জন্যে হেমন্ত বা শ্যামলের বিকল্প নেই, কিন্তু গণসংগীতগুলোর জন্যে বা সুকান্তের 'ঠিকানা', 'অবাক পৃথিবী' এসবের দেবব্রতের রেকর্ড রাখা উচিত ছিল।
এখন ভাবি, গাঁয়ের বধু, পাল্কী র গান, রানার এগুলোর মধ্যে বেশ খানিকটা রোমান্টিসিজম আছে যার জন্যে হেমন্ত বা শ্যামলের বিকল্প নেই, কিন্তু গণসংগীতগুলোর জন্যে বা সুকান্তের 'ঠিকানা', 'অবাক পৃথিবী' এসবের দেবব্রতের রেকর্ড রাখা উচিত ছিল।
ভাস্কর বললেন, ”আমাদের সলিল চৌধুরির ফোরামে এই দুটি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। আমার মত অনেকের মনে হয়েছিল, এই গানটি শ্যামলের গলাতেই বেশী খুলেছিল কারণ তাঁর কণ্ঠস্বরের তারুণ্যের ঝংকার, অন্তরা পর্যন্ত পারকাসন যন্ত্রের বর্জন, সুর আর ভাবের আশ্চর্য অভিনবত্ব- সব মিলিয়ে গানটিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। অনেকটা- "যাক যা গেছে তা যাক" বা " ঐ আঁকা বাঁকা পথ" যেরকম প্রেমের গান, এটিও সেইরকম একটি নিপাট প্রেমের গান। হয়ত ঠিক দেবব্রতর উপযোগী নয়। শুরুতেই "যদি কিছু আমারে শুধাও" এর মধ্যেই শ্যামলের গলায় একটি অদ্ভুত অনুরণন আছে! "তাসের দেশ" এ রাজপুত্রের গান শ্যামল কে দিয়ে গাওয়ানো হওয়ার ওইটিই মুখ্য কারণ। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেছিল - দেবব্রতর কন্ঠস্বর, বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও গাম্ভীর্য গানটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল।“
আমিও কথাটা সমর্থন করি। প্রেমের গান হিসেবে ধরলে এখানে কণ্ঠস্বরের তারুণ্য ও মাধুর্যের গুরুত্ব আছে, আর সেদিক থেকে শ্যামল নিঃসন্দেহে এগিয়ে থাকবেন। তবু যেন দেবব্রত বিশ্বাসের গলার কী যাদু, কী মোহ আছে, এই অংশটা যখন উনি শুধুমাত্র একটা কী-বোর্ড সহযোগে গাইছেন-
“তেমনি আমার বাণী, সৌরভে কানাকানি…” যেন তাঁর প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠের থেকে একঝলক সুগন্ধী হাওয়া ছুটে আসে।
সলিলকে নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের শেষ নেই, অপরিসীম প্রতিভা নিয়েও শুধুমাত্র আলস্যের কারণে তাঁর সৃষ্টি যতদূর যেতে পারত হয়ত আমরা তা পাইনি- এই অনুযোগ শুধু আমার নয়, সলিল-শিষ্য কবি গুলজারের। তাই এই আলোচনারও শেষ নেই, মৃত্যুর এতদিন পরেও সলিলের প্রতিভার নিত্য নতুন দিক উন্মোচিত হয়ে চলেছে, হতে থাকবে।
(আপাততঃ এইটুকু)

Sunday, July 19, 2020

পরমপুরুষ ও মহাপুরুষ।

পরমপুরুষ ও মহাপুরুষ।
(সংগৃহীত)
লেখক- শুভেন্দু দত্ত


(১)
শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মভূমি হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রাম আর ঈশ্বরচন্দ্রের বীরসিংহ গ্রাম। কামারপুকুর থেকে বীরসিংহ খুব দূরের পথ না। সেই জন্য বোধ হয় শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কাছের মানুষ বলে মনে করতেন। তবে সেই মনে হওয়া শুধুই মনে মনে । ঠাকুরের ইচ্ছা বীরসিংহ গ্রামের সিংহটির সাথে একবার অন্তত দেখা করার। তো সেই সুযোগও এলো। যখন ঠাকুরের পরম ভক্ত শ্রীম ওরফে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বিদ্যাসাগরের স্কুলে মাস্টারি করা শুরু করলেন। ঠাকুরই একদিন মাস্টারকে বললেন, "আমাকে বিদ্যাসাগর এর কাছে নিয়ে যাবে? আহা! দক্ষিণেশ্বর কালিবাড়িতে থাকতে থাকতে বিদ্যে আর দয়ার কত কথা শুনেছি! তিনি বিদ্যারও সাগর আবার দয়ারও সাগর।"
মহেন্দ্রগুপ্ত বিদ্যাসাগর কে বললেন," দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ আপনার সাথে দেখা করতে চান। ভারি ইচ্ছা তাঁর আপনার সাথে আলাপ করার।"
ঈশ্বরচন্দ্র হেসে বললেন, "তুমি তো জানো মাস্টার, আমি নাস্তিক মানুষ। ঈশ্বর সত্যি আছেন কিনা সেই বিষয়ে আমার গভীর সন্দেহ। সত্যি বলতে কি ভগবানের ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহই নেই। সুতরাং সাধু সন্ন্যাসী দের কাছ থেকেও আমি দূরে থাকি।"
মাস্টার বিদ্যাসাগরের কথা শুনে নীরব রইলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বুঝলেন তিনি মহেন্দ্রকে আঘাত করেছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, "বলত মাস্টার, তিনি কি রকম পরমহংস? তিনি কি গেরুয়া পরা সন্ন্যাসী?"
মাস্টার এবার ঈশ্বরচন্দ্রর চোখে চোখ রেখে কিঞ্চিৎ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আজ্ঞে না! লাল পেড়ে কাপড় পরেন,জামা পরেন, বার্নিশ করা চটি জুতো পরেন। রাসমনির কালিবাড়িতে একটি ঘরের ভিতরে বাস করেন। সেই ঘরে তক্তাপোষ পাতা আছে, বিছানা, মশারিও আছে। সেই বিছানায় তিনি শয়ন করেন। তিনি যে সন্ন্যাসী তার কোনো বাহ্যিক চিহ্ন নেই। তবে ঈশ্বর বই আর কিছু জানেন না, অহর্নিশি তারই চিন্তা করেন।"
বিদ্যাসাগর মহেন্দ্রনাথ এর কথায় হেসে ফেললেন, বললেন,"বেশ বেশ তাকে নিয়ে এসো একদিন।"
মহেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণকে বললেন,"বিদ্যাসাগর আপনার সাথে দেখা করতে চান।"
শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের মধ্যে ডুব দিলেন। চোখে মুখে ফুটে উঠলো দৈব উদ্ভাস। শ্রী ঠাকুর মধুর কণ্ঠে বললেন,"এই শনিবার ,সেদিন শ্রাবনের কৃষ্ণাষষ্ঠী, সাগর দর্শনের লগ্ন বিকাল ৪টে।" তখন বিদ্যাসাগরের বয়স ঠিক ৬২, রামকৃষ্ণ তার থেকে ১৬ বছরের ছোট, তার বয়স ৪৬। বিদ্যাসাগর এর প্রতি তার ভাব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ভরা।
বিকাল ঠিক ৪ টে। ঠিকা গাড়ি এসে দাঁড়াল। ঠাকুর ভাবে তন্ময় হয়ে আছেন। মহেন্দ্র বললেন,"এবার নামতে হবে, আমরা এসে গেছি।" ঠাকুর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন। মাস্টার পথ দেখিয়ে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। উঠোনে ফুল গাছ, ঠাকুর মুগ্ধ হয়ে বাড়ি টি দেখছেন, কি সুন্দর বাড়ি! শান্তির নীড়। সমস্ত বাড়িটি যেন ধ্যানের মন্দির- মনে হল ঠাকুরের। তিনি শুনেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র নাকি ভগবান-টগবানে বিশ্বাস করেন না। মৃদু হাসছেন ঠাকুর।
ঈশ্বর-বিশ্বাসহীন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাক্ষাৎ‍ হয়েছিল ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের। কেমন ছিল দুই কিংবদন্তির সাক্ষাৎকার জানতে ফিরে যেতে হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে।
বিদ্যাসাগর মহাপণ্ডিত। তিনি ষড়দর্শন পাঠ করেছেন। জানতে চেয়েছেন ঈশ্বরকে, আর এইটুকু বুঝতে পেরেছেন যে ঈশ্বরের বিষয়ে কিছুই জানা যায় না।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাকালেন বিদ্যাসাগরের দিকে। যেন বুঝতে পারলেন বিদ্যাসাগরের মনের কথা। বললেন, ব্রহ্মবিদ্যা ও অবিদ্যার পার| তিনি মায়াতীত।
মহাপণ্ডিত বিদ্যাসাগর শুনছেন মুগ্ধ বিস্ময়ে।
বলে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ -
এই জগতে বিদ্যামায়া-অবিদ্যামায়া দুই আছে। জ্ঞান-ভক্তি আছে।আবার কামিনীকাঞ্চনও আছে। সৎ আছে, আবার অসৎও আছে। ভাল আছে, আবার মন্দও আছে। কিন্তু ব্রহ্ম নির্লিপ্ত। ভাল-মন্দ, সৎ‍-অসৎ‍ জীবের ব্যাপার। ব্রহ্মের ওতে কিছু হয় না।

বিদ্যাসাগর বললেন, একটু ব্যাখ্যা করে, আরও সহজ করে বুঝিয়ে দিন ।
শ্রীরামকৃষ্ণ সহজ সরল হাসি হেসে বললেন, প্রদীপ যেমন নির্লিপ্ত, ব্রহ্মও সেইরকম । প্রদীপের সামনে কেউ ভাগবত পড়ছে আর কেউ বা জাল করছে । প্রদীপের তাতে কিছু যায় আসে না । কোনও কাজটির সঙ্গেই প্রদীপ যুক্ত হচ্ছে না ।সে নির্লিপ্তভাবে শুধু জ্বলছে ।যদি বলো দুঃখ, পাপ, অশান্তি এ সকল তবে কী ?
তার উত্তর এই যে ওসব জীবের পক্ষে ।ব্রহ্ম নির্লিপ্ত ।যেমন ধরো সাপের মধ্যে বিষ আছে ।অন্যকে কামড়ালে মরে যায় ।সাপের কিন্তু কিছু হয় না ।
বিদ্যাসাগরের মুখে রা নেই । তিনি ক্রমে বুঝতে পারছেন, এক নিরক্ষর ব্রাহ্মণের মুখে বেদান্ত কী সহজ সরল ভাষায় উচ্চারিত হচ্ছে !
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ব্রহ্ম যে কী মুখে বলা যায় না |
সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে।
বেদ,পুরাণ, তন্ত্র, ষড়দর্শন, সব এঁটো |
(থামলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তাকালেন বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে।)
বিস্মিত বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন, এঁটো কেন ?
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে উত্তর দিলেন, মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে, তাই এঁটো হয়ে গেছে ।
কিন্তু একটি জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয়নি গো !
সেই জিনিসটি ব্রহ্ম ।
ব্রহ্ম যে কী, আজ পর্যন্ত কেউ মুখে বলতে পারেনি ।
বিদ্যাসাগরের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল।
আবেগে কাঁপছে তাঁর শরীর ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বয়েসে অনেক ছোট, তবু বিদ্যাসাগরের ইচ্ছে হল তাঁর কাছে নতজানু হওয়ার ।
তিনি শুধু কম্পিত কণ্ঠে বললেন, আজ একটি নতুন কথা শিখলাম।
ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হননি !
ঘরে তখন অনেক মানুষের ভিড় হয়ে গেছে।
সবাই শুনছে ঠাকুরের কথা ।
কী সহজ, কী প্রাণস্পর্শী, কী গভীর !
ঠাকুর কী অনায়াসে আড়াল সরিয়ে দিচ্ছেন !
ফুটে উঠছে নতুন আলো।
জাগ্রত হচ্ছে নব চেতনা ।
উদ্ঘাটিত হচ্ছে সত্যের মুখ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, এবার একটা গল্প বলছি, শোনো…
"এক বাপের দুটি ছেলে।
ব্রহ্মবিদ্যা শেখবার জন্যে ছেলে দুটোকে বাপ আচার্যের হাতে দিলেন ।
কয়েক বছর পরে তারা গুরুগৃহ থেকে ফিরে এল।
এসে বাপকে প্রণাম করলে।
বাপের এবার ইচ্ছে হল, এদের ব্রহ্মজ্ঞান কেমন হয়েছে একটু বাজিয়ে দেখবার।
বড় ছেলেকে জিগ্যেস করলেন, বাপ ! তুমি তো সব পড়েছো | ব্রহ্ম কীরূপ বলো দেখি ।
বড় ছেলেটি বেদ থেকে নানা শ্লোক বলে বলে ব্রহ্মের স্বরূপ বোঝাতে লাগল।
বাপ শুনলেন | কোনও কথা বললেন না | বড় ছেলে বাপের মনের ভাব বুঝতে পারল না।
এবার ছোট ছেলেকে বললেন, তুমি বলো দেখি ব্রহ্মের কী রূপ ?
ছোট ছেলের মুখে কোনও কথা নেই ।
সে হেঁট মুখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল ।
বাপ প্রসন্ন হয়ে ছোট ছেলেকে বললেন, বাপু, তুমি একটু বুঝেছো। ব্রহ্ম যে কী তা মুখে বলা যায় না ।"
শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ থামলেন। তিনি জানেন, সাধারণ মানুষকে তাঁর কথার মর্ম বুঝতে একটু সময় দিতে হয় ।
তারপর তাঁর গল্পের সূত্রটি ধরেই বললেন, মানুষ মনে করে আমরা তাঁকে জেনে ফেলেছি ।
কিন্তু সত্যি কি জানা যায় ?
জানা গেলেও কতটুকুই বা জানা যায় তাঁকে ?
বিদ্যাসাগর নিবিষ্ট হয়ে শুনছেন। আর অপলক তাকিয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে । আর কারও কথা শুনে কখনও এমন ঘোর লাগেনি তাঁর।
শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে তাকিয়েই বললেন, আর একটা গল্প বলছি শোনো…
"একটা পিঁপড়ে চিনির পাহাড়ে গিছলো।
এক দানা খেয়ে পেট ভরে গেল | আর এক দানা মুখে করে সে বাসার পথে চলেছে।
যাবার সময় ভাবল, এবার এসে সব পাহাড়টা নিয়ে যাব।
ক্ষুদ্র জীবেরা এইসব মনে করে ।
জানে না ব্রহ্ম বাক্যমনের অতীত !
যে যতই বড় হোক না কেন, তাঁকে জানা যায় না।
বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ বলে ফেললেন, কেন শুকদেব ? তিনি তো .
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে বললেন, শুকদেবাদি না হয় ডেঁও পিঁপড়ে।
চিনির আট-নটা দানা না হয় মুখে করেছে । তার বেশি নয়।
ঘরে এত মানুষ | তবু পিন পড়লে শব্দ পাওয়া যাবে ।
রোজ কত পণ্ডিত মানুষের আসা-যাওয়া বিদ্যাসাগরের বাড়িতে ।
কিন্তু এমন জীবন্ত বেদান্ত কখনও দেখিনি ! শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনছেন আর ভাবছেন বিদ্যাসাগর।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলতে লাগলেন, তবে বেদে পুরাণে যা বলেছে, সে কী রকম বলা জানো ?
বিদ্যাসাগর বুঝলেন, ঘরের মধ্যে আর কেউ না বুঝুক তিনি অন্তত ধারণা করতে পারলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে নতুনভাবে ব্যাখ্যাত হতে চলেছে বেদ ও পুরাণ !
তিনি উদগ্রীব হয়ে শুনছেন।
ঠাকুর বললেন, একজন সাগর দেখে এলে কেউ যদি জিগ্যেস করে, কেমন দেখলে, সে লোক মুখ হাঁ করে বলে, - ওহ ! কী দেখলুম ! কী হিল্লোল, কল্লোল।
ব্রহ্মের কথাও সেই রকম । বেদে আছে তিনি আনন্দস্বরূপ।সচ্চিদানন্দ।
বিস্মিত বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ বেদ পড়েছেন!
তিনি তো নিরক্ষর।
বিদ্যাসাগর কী ভাবছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ যেন বুঝতে পারলেন।
বললেন, শুকদেবাদি এই ব্রহ্মসাগর-তটে দাঁড়িয়ে দর্শন স্পর্শন করেছিলেন মাত্র।
তাঁরা কিন্তু ব্রহ্মসাগরে নামেননি । এ সাগরে নামলে আর ফেরবার জো নেই গো ।
ঠাকুরের কথায় চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর । এতো একেবারে নতুন কথা।
অথচ কী অবলীলায় কথাটি বললেন পরমহংস !
বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন তাহলে ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান হওয়ার উপায় ? ঠাকুর উত্তর দিলেন, সমাধিস্থ হলে ব্রহ্মজ্ঞান হয় ।
সেই অবস্থায় বিচার একেবারে বন্ধ হয়ে যায় ।
মানুষ চুপ হয়ে যায় ।
ব্রহ্ম কী বস্তু, মুখে বলবার শক্তি থাকে না ।
শ্রীরামকৃষ্ণ আর একটা গল্প বললেন--
নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিছলো। কত গভীর জল সেই খবরটা সে দিয়ে চেয়েছিল। কিন্তু খবর দেওয়া আর হল না। যেই নামল জলে অমনি গেল গলে ।কে আর খবর দেবে ? একজন প্রশ্ন করলেন, সমাধিস্থ ব্যক্তি যাঁর ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে তিনি কী আর কথা কন না ?
বিদ্যাসাগরকে চমকে দিল ঠাকুরের বিদ্যুতের মতো উত্তর
শঙ্করাচার্য লোকশিক্ষার জন্য বিদ্যার 'আমি' রেখেছিলেন ।বিদ্যাসাগর এই কথার গভীর অর্থটুকু বুঝতে পারলেন। আপাত অশিক্ষিত একটি মানুষের জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা দেখে তিনি স্তম্ভিত !
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার আরও সহজ করে তাঁর বক্তব্যের সারাৎসার তুলে ধরলেন--
ব্রহ্মদর্শন হলে মানুষ চুপ হয়ে যায় ।যতক্ষণ দর্শন না হয়, ততক্ষণই বিচার তেমনি সমাধিত পুরুষ--লোকশিক্ষা দেবার জন্য আবার নেমে আসে আবার কথা কয় ।
বিদ্যাসাগরের চোখে একইসঙ্গে ফুটে ওঠে মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা ।
তাঁর মন বলে ওঠে , শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস সেই পুরুষ তো তুমি নিজে । সমাধিস্থ হয়েও লোকশিক্ষার জন্য নেমে এসেছো, কথা বলছো !
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার ব্রহ্মজ্ঞানীর স্বরূপ অন্যভাবে ফুটিয়ে তোলেন্-
যতক্ষণ মৌমাছি ফুলে না বসে ততক্ষণ ভনভন করে, ফুলে বসে মধুপান করতে আরম্ভ করলে চুপ হয়ে যায়। মধুপান করে মাতাল হবার পরে আবার কখনও-কখনও গুনগুন করে।
পুকুরে কলসিতে জল ভরার সময় ভকভক শব্দ হয়। পূর্ণ হয়ে গেলে আর শব্দ নেই | তবে আর এক কলসিতে যদি ঢালাঢালি হয় তাহলে আবার শব্দ হয়।
একজন হঠাৎ বললেন,
ঋষিদের কি ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল ?
শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ হয়েছিল। বিষয়বুদ্ধির লেশমাত্র থাকলে এই ব্রহ্মজ্ঞান হয় না। ঋষিরা দেখা-শোনা-ছোঁয়া এসবের বিষয় থেকে মনকে আলাদা রাখত। সমস্ত দিন ধ্যান করে কাটত। তবে ব্রহ্মকে বোধে বোধ করত। এবার সরাসরি বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন ঠাকুর। বললেন, "কলিতে অন্নগত প্রাণ। দেহ বৃদ্ধি যায় না।যারা বিষয় ত্যাগ করতে পারে না, তাদের 'আমি' কোনওভাবে যায় না।
তাদের বরং 'আমি ব্রহ্ম' না বলে বলা উচিত আমি ভক্ত, আমি দাস।
এ অভিমান ভাল।
ভক্তিপথে থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায়।" বিদ্যাসাগরকে যেন সরাসরি বলছেন ঠাকুর--জ্ঞানীর পথও পথ ।আবার জ্ঞান-ভক্তির পথও পথ ।আবার ভক্তির পথও পথ।
জ্ঞানযোগও সত্য। ভক্তির পথও সত্য । সব পথ দিয়েই তাঁর কাছে যাওয়া যায়।
কিন্তু যতক্ষণ তিনি 'আমি' রেখেছেন আমাদের মধ্যে ততক্ষণ ভক্তিপথই সোজা।
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার যেন শুধু বিদ্যাসাগরকেই দেখছেন ।তিনি এই মহাপণ্ডিতকে বললেন, বিজ্ঞানী কী বলে ? বিজ্ঞানী বলে, যিনি ব্রহ্ম, তিনিই ভগবান।
অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছি।
ব্রহ্ম নির্গুণ ।তিনি গুণাতীত ।ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।
এই জীবজগত্‍, মন বুদ্ধি, বৈরাগ্য, জ্ঞান, এসব তাঁর ঐশ্বর্য ।
দেখো না এই জগত্‍ কী চমত্‍কার । কত রকম জিনিস, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র ।কত রকম জীব ।বড় ছোট ভালমন্দ কারু বেশি শক্তি, কারু কম শক্তি । ব্রহ্মই ভগবান হয়েছেন । যিনি নিরাকার, তিনিই সাকার।যিনি নির্গুণ তিনিই ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।
বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ প্রশ্ন করলেন তিনিই কি কাউকে বেশি শক্তি, কাউকে কম শক্তি দিয়েছেন ?
উত্তর দিলেন পরমহংস-তিনি বিভুরূপে সর্ব ভূতে আছেন ।বিভু মানেই তো পরমেশ্বর। আবার বিভু মানে সর্বব্যাপী ।
পিঁপড়ের মধ্যেও তিনি আছেন। আবার বিরাট পাহাড়ও তারই প্রকাশ ।সর্বত্র তিনি ।কিন্তু শক্তির তারতম্য তো আছেই ।ঠাকুর এবার বিদ্যাসাগরকেই বললেন--এই যেমন তুমি।
তোমাকেই বা সবাই মানে কেন ?
তোমার কি শিং বেরিয়েছে দুটো ?
তোমাকে মানে তার কারণ তোমার দয়া, তোমার বিদ্যে আছে অন্যের চেয়ে অনেক বেশি।
তুমি একথা মানো কি না ?
বিদ্যাসাগর লজ্জা পেলেন ।তিনি মৃদু মৃদু হাসছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে বললেন--একঘর লোকের সামনে বিদ্যাসাগরকে একথা বলার সাহস কারও হত না-- ঠাকুর বললেন শুধু পাণ্ডিত্যে কিছু হয় না ।মনে রেখো, তাঁকে জানবার জন্যেই বই পড়া ।তাঁকে জানাই একমাত্র জানা ।তাঁকে জানাই সব জানা আর সব অবিদ্যা।
এবার প্রশ্ন করলেন বিদ্যাসাগরকে, গীতার অর্থ কী ?
কী বলবেন বিদ্যাসাগর ? গীতার অর্থ এককথায় বলা যায়? চুপ করে থাকলেন বিদ্যাসাগর ।
বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, গীতার অর্থ দশবার 'গীতা' বলতে যা হয় তাই। দশবার 'গীতা' বলতে গেলে ত্যাগী হয়ে যায়।
গীতার শিক্ষা হল, হে জীব সব ত্যাগ করে ভগবানকে লাভ করার চেষ্টা করো।
সাধুই হও, আর সংসারী হও, মন থেকে সব আসক্তি ত্যাগ করতে হবে।
এবার বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।ঘরে যেন আর কেউ নেই ।বললেন, অনেক পড়লেই কিছু হয় না গো ।অন্তরের কথাটি বুঝতে হবে ।শুধু পাণ্ডিত্য নয় ।ভক্তি চাই ।তাঁকে ভালবাসতে হবে ।তোমাকে একটা গপ্পো বলছি ।গল্পটা বুঝতে পারলে সব হবে।
চৈতন্যদেব তখন দক্ষিণে তীর্থভ্রমণ করছিলেন । দেখলেন একজন গীতা পড়ছে আর একজন একটু দূরে বসে শুনছে আর কাঁদছে। কেঁদে চোখ ভেসে যাচ্ছে । চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন, তুমি এসব বুঝতে পারছো ? সে বললে, ঠাকুর, আমি এসব শ্লোক কিছুই বুঝতে পারছি না।
চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন তবে কাঁদছো কেন ?
ভক্তটি তখন বললে, আমি দেখেছি অর্জুনের রথ । আর তাঁর সামনে কৃষ্ণ ।আর অর্জুন কথা কচ্চেন।
তাই দেখে আমি কাঁদছি ।বিদ্যাসাগরের বুকের শিরায় টান ধরল ।তাঁর চোখ ভরে এল জলে ।মন ভরে গেল গভীর কৃতজ্ঞতায় ।নতুন চেতনায় উত্তীর্ণ হলেন তিনি !
বিদ্যাসাগরকে বলতে লাগলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।মনে মনে বিদ্যাসাগর নতজানু, করজোড় । শুনছেন তিনি ।নিষ্কম্প শিখার মতো ।ঠাকুর বলতে লাগলেন- তাঁকে কি শুকনো পাণ্ডিত্য দিয়ে বিচার করে জানা যায় গো ? তাঁর দাস হয়ে তাঁর শরণাগত হয়ে তাঁকে ডাকো |
মনে রেখো, 'আমি' ও 'আমার',এই দুটি অজ্ঞান ।
আমার বাড়ি, আমার টাকা,আমার বিদ্যা,আমার এইসব ঐশ্বর্য,এই যে ভাব, এটি অজ্ঞান থেকে হয় ।আর যদি ভাবো,হে ঈশ্বর,তুমিই কর্তা,এসব জিনিস তোমার,টাকাকড়ি, আমার বিদ্যা,আমার ঐশ্বর্য,আমার পরিবার,সব কিছুই তোমার,আমার বলতে কিছুই নেই--এই ভাব জ্ঞান থেকে হয় ।

বিদ্যাসাগর, তোমার কোন ভাব গো?- হঠাৎ জানতে চাইলেন ঠাকুর।বিদ্যাসাগর কিছুটা অপ্রস্তুত। খুব মৃদু স্বরে বললেন, আপনাকে সেকথা একলা একদিন বলব। ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে এবার তাঁর অন্তরকথা,তাঁর নিজস্ব ভাবটি বলার জন্য গান ধরলেন --

"কে জানে কালী কেমন?
ষড়দর্শনে না পায় দরশন।
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন।
কালী পদ্মবনে হংস সনে,হংসী রূপে করে রমণ।।
আত্মরাগের আত্মাকালী প্রমাণ প্রণবের মতন।
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।।
মায়ের উদরে ব্রক্ষাণ্ডভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জান কেমন।
মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম অন্য কে বা জানে তেমন।
প্রসাদ ভাসে লোকে হাসে,সন্তরণে সিন্ধু তরন।
আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না ধরবে শশী হয়ে বামন।"

গান শেষ করে শুধু একটি কথা বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, ষড়দর্শনে না পায় দর্শন, পাণ্ডিত্যে তাঁকে পাওয়া যায় না গো। এরপর ঠাকুর কিছুক্ষণ সমাধিস্থ। চেতনায় ফিরে এসে জিগ্যেস করলেন,কটা বাজে গো? বিদ্যাসাগর বললেন, রাত ৯টা। এবার যে উঠতে হবে। ফিরতে হবে সেই দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীরামকৃষ্ণকে বিদায় দিতে মন চাইছে না বিদ্যাসাগরের। কেন তাঁর এমন হল? ঠাকুর লাবণ্যময় কণ্ঠে বিদ্যাসাগরকে বললেন, একবার বাগান দেখতে যেও। রাসমণির বাগান। ভারী চমৎকার জায়গা।

-যাবো বৈ কি! আপনি এলেন আর আমি যাব না?
-আমার কাছে! ছি ছি!
- সে কী! এমন কথা বললেন কেন? আমার বুঝিয়ে দিন।

শ্রীরামকৃষ্ণ(সহাস্যে)- আমরা জেলেডিঙ্গি। খালবিল, আবার বড় নদীতেও যেতে পারি। কিন্তু তুমি তো জাহাজ গো। কী জানি যেতে গিয়ে চড়ায় পাছে লেগে যায়। বিদ্যাসাগর চুপ। উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। শ্রীরামকৃষ্ণই এগিয়ে এলেন বিদ্যাসাগরকে উদ্ধার করতে।বললেন, তবে এই সময়ে জাহাজও যেতে পারে। বিদ্যাসাগর ইঙ্গিতটি ধরতে পারলেন। হেসে বললেন, হ্যাঁ, এটা বর্ষাকাল বটে। মহেন্দ্র গুপ্ত টিপ্পনি কাটলেন, এ তো নবানুরাগের বর্ষা। নবানুরাগের সময় মান-অপমান বোধ থাকে না বটে।

শ্রীরামকৃষ্ণ ইতিমধ্যে উঠে পড়েছেন। তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছেন, একজন ভক্তের হাত ধরে আছেন। বিদ্যাসাগর আগে আগে চলেছেন। বাতি হাতে পথ দেখাচ্ছেন তিনি।
শ্রাবণকৃষ্ণাষষ্ঠী। এখনও চাঁদ ওঠেনি। দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। বাতাস ভিজে ভিজে,মিঠে। বাতাসে ভেজা ঘাস-পাতা-মাটির সুবাস।তমসাবৃত উদ্যানভূমির মধ্যে দিয়ে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বাতির ক্ষীণালোক বহন করে ফটকের সামনে বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ ফটকে পৌঁছতেই সামনে এসে দাঁড়াল এক গৌরবর্ণ, শ্মশ্রুধারী, বাঙালি পোশাক-পরা যুবক। যুবক শ্রীরামকৃষ্ণের পায়ে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করল।

শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন,বলরাম! তুমি এখানে এত রাতে?
বলরাম- আমি অনেক্ষণ এসেছি। এখানেই দাঁড়িয়েছিলাম।
শ্রীরামকৃষ্ণ- ভেতরে যাওনি কেন?
বলরাম- আজ্ঞে, সকলে আপনার কথাবার্তা শুনছেন, সেখানে গিয়ে বিরক্ত করিনি।

শ্রীরামকৃষ্ণ এবার তার ভাড়া করা ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়লেন।বিদ্যাসাগর প্রায় চুপি চুপি মহেন্দ্রকে জিগ্যেস করলেন, ভাড়া কি দেব?
মহেন্দ্র বললেন, আজ্ঞে না। ও হয়ে গেছে। বিদ্যাসাগর ঘোড়ার গাড়ির দরজায় এগিয়ে গেলেন। তাঁর হাতে বাতিটি ধরা। বাতির ক্ষীণালোকে ঠাকুরের মুখটি দেখলেন। তাঁর সমস্ত অন্তর লুটিয়ে পড়ল শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রীচরণে এক দীর্ঘায়িত প্রণামে।

শ্রীরামকৃষ্ণের গাড়ি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বিদ্যাসাগরের দৃষ্টি থেকে । তিনি একা ঠাকুরের প্রস্থানের পথের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁর মনে হল, ভগবান এসেছিলেন। এক ঝলক দেখা দিয়ে চলে গেলেন। তাঁরই আশীর্বাদ হয়ে যেন স্বর্গ থেকে নেমে এল ঝিরঝিরে বৃষ্টি! বৃষ্টির জলে নিভে গেল বিদ্যাসাগরের হাতের বাতিটি। অন্ধকারে একা বিদ্যাসাগর।

রামকৃষ্ণ-ধারায় কতদিন পরে এমনভাবে প্রাণ জুড়াচ্ছে তাঁর।

জয় পরমহংস শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ।।

Sunday, July 12, 2020

স্মরেন্নিত্যং।। (পুরাণ- নতুন আলোয়)

স্মরেন্নিত্যং।।
(পুরাণ- নতুন আলোয়)

"নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার
কেন নাহি দিবে অধিকার, হে বিধাতা!"


নারী বিধাতাপুরুষের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। নারী-পুরুষের মিলনেই সৃষ্টিরক্ষা, নারী গর্ভধারণ করে বলেই সন্তান জন্মায়, অব্যাহত থাকে সৃষ্টির গতিশীলতা। কিন্তু কিসের তাগিদে পুরুষ জীবনসৃষ্টির খেলায় মাতবে, কোন প্ররোচনায় তার সমাগম হবে নারীতে? এই প্রশ্নের উত্তরে নারীতে আরোপিত হয়েছে রূপ, মানুষের মধ্যে গ্রথিত হয়েছে একান্ত জৈবিক যৌন আনন্দ। সুতরাং বিশ্বে নারীর প্রয়োজন আছে।

ব্যস, এইটুকুই? তাহলে বুঝি আর সভ্যতার এতগুলো ধাপ পেরিয়ে আসার মধ্যে মানবজাতির আর কোন সার্থকতা রইল না। নারী যদি শুধু যৌনতার একটা উপকরণ হয়, বা আরো একটু উন্নত চিন্তায় 'পুত্রার্থে ক্রীয়তে ভার্যা' বলে শুধুমাত্র প্রজননের একটা উপকরণ-মাত্র বলে চিহ্নিত করে রাখা হয়, তবে নারী নরকের দ্বার, পুরুষের বুকের একটি পাঁজর দিয়ে নারীর সৃষ্টি, নারীর আত্মা নেই- এসব কথা কিছুই অযৌক্তিক নয়।

অথচ আমাদের, অন্ততঃ হিন্দুপুরাণ আর ইতিহাস বলে অন্য কথা। নারীর রূপ বড় বিতর্কিত বস্তু, better half বা fairer sex বলে পশ্চিমীরা তাকে মহিমান্বিত করলেও রবীন্দ্রনাথ যদি বলে থাকেন 'আমি চোখ মেলে বললাম সুন্দর, সুন্দর হল সে', বা 'শুধু বিধাতার সৃষ্ট নহ তুমি নারী/ পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি"- হয়ত তা অতিরুক্তি নয়। যুগে যুগে কবিরা নারীর সৌন্দর্যের চুলচেরা বর্ণনা করে পাঠককে উত্তেজিত করেছে, কেউ কি জানতে চেয়েছে নারীর চোখে পুরুষ কতটা সুন্দর? বস্তুতঃ এর মধ্যে অপ্রাকৃতিক কিছুই নেই। জীবজগতে পুরুষ অধিক সুন্দর আর আকর্ষণীয়, যৌন তাড়নায় সে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হবার প্রার্থনা করে, নারী তখন তার কাছে কামক্ষুধা-শান্তির আর সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রবিশেষ। তার আগে যত স্তব-স্তুতি, আর তা ফুরিয়ে গেলে তুলসীদাসের ভাষায় বিধান দেয়-
"ঢোল, ব্যায়ল, শুদ্র, পশু, নারী-
ইয়ে সভি হ্যাঁয় তাড়ন কে অধিকারী।"
অর্থাৎ ঢোলক, বলদ ও অন্য পশু, শূদ্র আর নারীজাতিকে পেটানোই উচিত। হিন্দুশাস্ত্রে (প্রাচীন শাস্ত্রে নয়, পরবর্তীকালে সংযোজিত) নারীর বেদপাঠ নিষিদ্ধ, ইসলামে তার মসজিদে প্রবেশ মানা। তাহলে নারীজন্মের সার্থকতা কিসে? কেন, পুরুষের মনোরঞ্জনে, তার বিলাসের উপকরণ, সন্তানধারণ আর পালন, গার্হস্থ কর্ম আর সেবাধর্মে। আদিম কালে তবু 'বীরভোগ্যা' ছিল সে, পরে সুসংহত সমাজ গঠনের জন্যে বিবাহের প্রথা চালু হল, অর্থাৎ নারী এক পুরুষের স্ত্রী, দাসী বা ভোগ্যা হিসেবে চিহ্নিত হতে লাগল। তার চিহ্নস্বরূপ তাকে কোথাও পরানো হল সিঁদুর, মঙ্গলসূত্র, জেডরত্নের বলয়, শাঁখা-পলা বা অন্য কিছু।   

এতটা ভূমিকা দিলাম এইজন্যেই যে এর পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম নামের এক সমাজ-ব্যবস্থার রক্ষণ-যন্ত্র  জুডাস-গ্রীক-খ্রীস্টান-ইসলাম বা এমনকি হিন্দুশাস্ত্রেও   

অহল্যার অধিকার।
(পুরাণ- নতুন আলোয়)
-‘না দেবরাজ, তা হয় না। পতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলে নরকেও যে ঠাঁই হবে না আমার!’
-‘তুমি হাসালে অহল্যে! দেবরাজ ইন্দ্রকে বোঝাচ্ছ স্বর্গ-নরকের পরিভাষা? স্বর্গাধিপতি আমি, আমার রাজ্য দুর্গম হলেও কিন্তু কোন অলক্ষ্য-অলঙ্ঘ্য স্থান নয়। লঙ্কেশ রাবণ সসৈন্যে সেখানে এসে যুদ্ধ করে গেছে, তা জান? অগম্য হলে কি সে সম্ভব হত?’
-‘তবু…..ন্যায়-নীতি, পবিত্রতা, সামাজিক অনুশাসন বলে তো কিছু আছে। আর দেহসুখই কি সব?’
-‘তা আমি বলছি না। তবে ঋষি গৌতমের কোন অধিকার নেই তার বার্ধক্যের শাসনে বেঁধে তোমার প্রাপ্য সুখ থেকে তোমাকে বঞ্চিত করার।’
-‘আমি বঞ্চিত তা তোমাকে কে বলেছে? ঋষি আমাকে যথেষ্ট ভালবাসেন।’
-‘তবু তোমার মনে কি কখনও অজান্তে-অবচেতনেও সাধ হয়নি পরিপূর্ণতার তৃপ্তি পাবার? অন্ততঃ গোপনে, সত্য বল দেবারাধ্যে!’
-‘যে বস্তুর সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই, তার কথা বলে মনকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। তাছাড়া এ আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভব, তোমার কাছে তা প্রকাশ করা কি বাধ্যতামূলক?’
-‘আমি যে তোমাকে একান্তভাবে চাই বরাঙ্গিনি! তুমি তৃপ্ত হলে আমি যে পরিমাণ আনন্দ পাব তার কাছে স্বর্গরাজ্যের আধিপত্যসুখ তুচ্ছ। বল সুতনুকে, আমাকে দেখে কি তোমার মনে কখনও পূর্ণতা পাবার সাধ জাগেনি?’
অহল্যা উত্তর দিলেন না। শচীপতির ইঙ্গিত তিনি বুঝেছেন। বুঝেছেন যে তা অশোভন হলেও অযৌক্তিক নয়, অনৈতিক হলেও তাঁর অধিকার-বহির্ভূত নয়। একসময় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিজের দৈহিক-মানসিক চাহিদা প্রকাশ করতে পারত, তাতে পাপ ছিল না। তবে যৌনতা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সমাজে ক্রমশঃই ব্যভিচার বাড়তে থাকে, ফলে সমাজের শীর্ষে থাকা রাজন্যবৃন্দ ও আইনপ্রণেতা ঋষিগণ বিবাহবহির্ভূত যৌনাচারকে একসময় অসিদ্ধ, অনৈতিক ও অপরাধ বলে ঘোষণা করেন। এতে কিন্তু পুরুষতন্ত্রেরই জয় বলবৎ থাকে। কারণ ইন্দ্র, রাবণাদি পুরুষেরা যথেচ্ছাচার করে লম্পট আখ্যা পেয়ে থাকলেও তাদেরকে সমাজচ্যুত বা দণ্ডিত করার কথা ভাবতে পারেনি এই পুংশাসিত সমাজ। ঋষি পরাশর, জাবালি ইত্যাদি এই একদর্শী নিয়মের বিরোধিতা করেন। জাবালি, চারুবাক এঁরা নাস্তিক, তাই ঋষিসমাজে অপাংক্তেয়। তবে ঋষি জমদগ্নি ইতিমধ্যে চরম কঠোরতা প্রদর্শন করে নিরপরাধ স্ত্রী রেণুকাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে অনুতপ্ত- পুত্র ভৃগু ক্ষত্রিয়দ্বেষে কুঠার তুলে নিয়েছেন হাতে, পরশুরাম নাম গ্রহণ করে বিশ্বকে নিঃক্ষত্রিয় করার ব্রত নিয়ে। তাই তিনি ও পরাশর এক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় হয়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে নারীদের পতি ত্যাগ করে অন্য পতি বরণ করার বিধান দিলেও প্রভাবশালী চক্র, অর্থাৎ মনু, গৌতম, বিশ্বামিত্রদের চাপে তাঁদের প্রণীত বিধান সংহিতার শ্লোকবিশেষ হয়েই রয়ে যায়। তাই ভয় পাচ্ছেন গৌতম-পত্নী অহল্যা, চরম দণ্ডের বিভীষিকা ভাসছে চোখের সামনে, কিন্তু পতঙ্গ কি বহ্নিকে উপেক্ষা করতে পারে?
-‘বল অহল্যে, যদি জেগে থাকে, এই অবদমিত বাসনা কি গোপন সঙ্গমের তুলনীয় নয়?’
নীরবে মাথা নত করেন অহল্যা। মনের গোপন অভিলাষ তিনি অস্বীকার করেন কিভাবে? রতিশ্রান্ত লোলচর্ম শিথিলাঙ্গ ঘুমন্ত ঋষির পাশে জেগে একটি অতৃপ্ত নারীসত্ত্বা যে কাটিয়েছে রাতের পর রাত, কেমন করে ভোলেন তিনি সে কথা? তাঁর মানসিক দ্বিধার সুযোগ নিলেন ইন্দ্র। কথা হল, ঋষির অনুপস্থিতিতে সুযোগ বুঝে তাঁর অন্তঃপুরে তিনি আসবেন অভিসারে, ছদ্মবেশে। একাধারে আসন্ন সম্ভাব্য সুখের আনন্দ-উত্তেজনা আর তার পরিণতির আশঙ্কায় উদ্বেলিত-কম্পিত হয়ে উঠল অহল্যার হৃদয়।
* * * * *
পক্ষকাল পরের দৃশ্য। বরতনু অহল্যা উদাস হয়ে বসেছিলেন বাতায়নপ্রান্তে। তাঁর প্রতি কঠিন শাস্তি আরোপ করেছেন তাঁর পতি ঋষি গৌতম। প্রস্তররচিত কারাগারে তাঁকে থাকতে হবে যতদিন না স্বয়ং ঈশ্বর সে কারাগার ধ্বংস করে তাঁকে মুক্তি না দেন। তাঁর বিরুদ্ধে কলঙ্কের অভিযোগ, সঙ্গে দ্বিচারিতা, অসতীত্ব। অভিযোগ যে মিথ্যা নয় তা ঋষিও অনুমান করেন, যদিও তাঁর মনে বিশ্বাস যে এর জন্যে দেবরাজই একা দায়ী, গুরু গৌতমের ছদ্মবেশে......।
চমক ভাঙ্গল পরিচিত কণ্ঠস্বরে, তার নাম আহ্বান করছে কে যেন। ‘এ কি, বাসব তুমি! কী সাহসে আবার এসেছ এখানে? আর তোমার শরীরে সর্বত্র এত লোচন আঁকা কেন?’
- ‘ধীরে, অহল্যে, ধীরে। গুরুদেব এখন প্রস্তর-কারাগার নির্মানে ব্যস্ত, এ মুহূর্তে তাঁর এখানে আসার সম্ভাবনা নেই। আর এগুলো লোচন নয়, যোনি-চিহ্ন, গুরুদেবের অভিশাপ।’
- ‘তার মানে ঋষির শাপে ফল হয়েছে!’
- ‘পাগল!’ ইন্দ্র হাসলেন। ‘তোমার নারীত্বের অধিকারের মর্যাদা দিয়ে অপূর্ণ যৌবনের দাবী আমি মিটিয়েছি, করেছি পুরুষের কর্তব্য। আমি নিজেও ধন্য হয়েছি, তৃপ্ত হয়েছি এ কাজ করে। কিন্তু সমাজের চোখে আমি অপরাধী, নৈতিকতার দিক দিয়েও। ঋষির শাপের মর্যাদা করি, কিন্তু শাপে কি সত্যিই কাজ হয়? তাই ঋষির মান রাখতে ওগুলো শরীরে আমি নিজেই এঁকে নিয়েছি।’
-‘সে কি! তাহলে শাপ আর বর কী জন্যে?’
-‘হয়ত তা নিতান্তই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ আর ক্ষমতার দম্ভ-প্রদর্শন। তা নইলে কেন তপস্যায় তুষ্ট চতুর্মুখ ব্রহ্মা রাবণকে দেব-দানবের হাতে অবধ্য থাকার বর দেন, আবার কেনই বা যমলোকে দণ্ডপাণি যমরাজ যখন তাঁকে বধ করতে উদ্যত, তিনি ছুটে যান যমের কাছে, নিজের মানরক্ষার তাগিদে। তাঁর অনুনয়ে রাবণ-হত্যায় বিরত হন যমরাজ। এই ঋষিও সমাজের শীর্ষস্থানীয় একজন মানী ব্যক্তি, তাঁর মান-সম্মান যাতে অক্ষুণ্ন থাকে তা দেখাও তো আমার কর্তব্য।
- ‘তাহলে অন্য অভিশাপটি? শুক্রকোষ বন্ধ- সে তো প্রায় পুরুষত্ব হারানোরই সমান।’
- ‘সে আর কে বোঝে পোষাকের আড়ালে কী আছে, লোকে যেমন খুশী কল্পনা করে নেবে। তবে তোমার ধারণা ভুল। এতে পুরুষত্ব নয়, শুধু সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতাই নষ্ট হয়। তাতে আর কী আসে যায়? মেষের অণ্ডকোষের কাহিনী ইতিমধ্যে মর্ত্যলোকে প্রচারিত হয়ে গেছে। সে যাক, এখন বল অহল্যে, আমার প্রতি তোমার আর কোন অভিযোগ নেই তো?’
- ‘হে দেবরাজ, তুমি আমাকে পূর্ণ করেছ। দিয়েছ নারীর মর্যাদা। বিশ্বাসহনন আর চরিত্রহীনতার সমস্ত দায় তুলে নিয়েছ নিজের উপর। দোষ তো আমারও কম ছিল না। তোমার ঐ ছদ্মবেশ আমি মুহূর্তেই ধরে ফেলেছিলাম, তবু আসন্ন সুখের কামনায় রতিক্রীড়ায় লিপ্ত হয়েছি। শাস্তি তো আমার প্রাপ্য, তার বিরোধও করি না। সেখানে আর কী করতে পার তুমি?’
- ‘দেখ আমি দেবলোকের অধিপতি। স্বর্গমর্তের শৃংখলা রক্ষার ভার আমার উপরে, আর ঋষি গৌতমের হাতে আছে সমাজধর্ম রক্ষার দায়িত্ব। শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে। তাই আমি দেবর্ষিকে পাঠিয়েছি ঋষি বাল্মীকির কাছে। তিনি ইক্ষাকুকুলপতি রামের জীবনকাহিনী রচনা করবেন। আমার অনুরোধে তিনি ছদ্মবেশ চিনতে না পেরে তোমার এই পতিরূপে উপপতিসেবার বৃত্তান্তই উল্লেখ করবেন সেই কাব্যে।
‘তবে আমার ধারণা’, ইন্দ্র বলে চললেন, ‘বিশ্বের লোক একসময় নারীর চোখ দিয়ে সব কিছু বুঝতে সক্ষম হবে, তাই সেই সময়ের নিরিখে আমার প্রচেষ্টা বলবতী থাকবে এই উদ্দেশ্যে যে ভবিষ্যতের নারী যেন পুরুষের সম-অধিকার পায়, প্রয়োজনে আপন মানসিক ও শারীরিক চাহিদা যেন মুখ ফুটে বলতে পারে অথচ অসতীত্বের কালিমা তাকে স্পর্শ না করে। আমি শপথ করছি যে আগামী দিনগুলিতে আমি অহোরহ সেই প্রচেষ্টায় রত থাকব অন্ততঃ সতীত্বের বা দৈহিক পবিত্রতার পরিভাষা যেন স্ত্রী-পুরুষের ক্ষেত্রে পৃথক না হয়। ভবিষ্যতের কোন ঋষি হয়ত ইঙ্গিতে তোমার দৃষ্টান্ত দিয়ে সমগ্র নারীজাতির অধিকার রক্ষার সংগ্রামকে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি জানাবে কোন কাব্য বা শ্লোকের মাধ্যমে। ভাগ্য আর পুরুষতন্ত্রের হাতে ক্রীড়নক না হয়ে থেকে তাকে জয় করবার দাবী জানাবে বিধাতার কাছে, হয়ত সেই সূত্র ধরে কোনদিন ‘পৌরুষ’ বা ‘পুরুষকার’ শব্দদুটির লিঙ্গ-পরিবর্তনও সম্ভব হবে আগামীদিনের কোন বৈয়াকরণের হাতে।’
দেবরাজ ইন্দ্র বিদায় নিলেন। কখন কোন ঋষি তাঁকে পঞ্চকন্যার শীর্ষে স্থান দিয়ে নিত্যস্মরণীয় করে তুলবেন, অথবা সত্যদ্রষ্টা কোন কবি একদিন লিখবেন- ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার, কেন নাহি দিবে অধিকার, হে বিধাতা’- সে চিন্তা এখন নেই অহল্যার মনোজগতে। বরং ক্ষণপ্রভার ক্ষণিক ঔজ্জ্বল্যের মত দেবেন্দ্রের সঙ্গে কাটানো কিছু স্বর্গীয় মুহূর্তের সুখস্মৃতিতে বিভোর হলেন তিনি। ভবিষ্যৎ কারাগারের দিনগুলোকে সহনীয় করে তুলতে এই সুখস্মৃতিটুকুই যে তাঁর সঞ্চয়!