এইয়ো, মুখ সামলে!
ডাক্তার কন, বলি যদি অরোরা বোরিয়ালিস্-
বুঝবে কিছু? মাথা নাড়াই,
লাভ কী মিছে করে লড়াই,
মোবাইলেই গুগল আছে, যৎসামান্য ফীস!
এইয়ো, মুখ সামলে!
প্রেতচক্র রহস্য।।
'প্ল্যাঞ্চেট নয়, ওর উচ্চারণ হবে 'প্লাঁশেৎ' ' - ইতু বলল। ও টেনিদার গল্পের খুব ভক্ত, নির্ঘাৎ ক্যাবলার রোল প্লে করছে এখন।
'আচ্ছা, মানছি। গল্পটা শুনতে দিবি এখন?' ঋতুদি স্পষ্টই বিরক্ত ছোট বোনের পাকামোতে।
এসেছি কলেজের বন্ধু দেবুর বিয়ের বউভাতে ওদের বাড়ি রাঁচিতে। খাওয়া-দাওয়া শেষে ওর ছোড়দি ঋতুদি, ছোট বোন ইতু আর তাদের বন্ধুরা প্ল্যান করছিল ফুলশয্যায় আড়ি পাতার। দেবুর এই ব্যাপারটা একেবারে অপছন্দ। তাই আমি আর আরেক পুরনো বন্ধু রবি মিলে দায়িত্ব নিয়েছি সবাইকে আটকাবার, অথচ বেশ কায়দা করে। কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই লোডশেডিং। জেনারেটার চললেও, সে তো এমার্জেন্সি সার্ভিস দিচ্ছে শুধু। এই টিমটিমে আলোয় আমি শুরু করলাম রাঁচির সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের হোস্টেলে আমাদের প্রেত-চর্চার গল্প। তারই সূত্র ধরে এল প্ল্যাঞ্চেটের প্রসঙ্গ। ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলি, যেখানে শুরু করেছিলাম তার পর থেকে।
আমরা সবাই তখন সদ্য কিশোর, ইন্টারমিডিয়েট পড়তে এসেছি ধানবাদ থেকে রাঁচিতে। তখনকার ফার্স্ট ইয়ারের হোস্টেলগুলো ছিল ঘোড়ার আস্তাবলের তুল্য, থ্রি-বেডের রুম একেকটা। জানলা নেই, তবে ওপর কিছুটা খোলা আর লম্বা টানা জাফরি আর গ্রিল দেওয়া বারান্দা। আমাদের রুমগুলো ছিল দোতলায়, নীচের তলায় আদিবাসী ছাত্রদের হোস্টেল। বাথরুম ছিল নিচের তলায়, হোস্টেলের বাইরের দিকে। রাত্রে যেতে হলে বাজে অবস্থা। তার চেয়েও বাজে ছিল মিশনারি কলেজের হোস্টেলের ডিসিপ্লিন। রাত্রি সাড়ে দশটায় মেন সুইচ অফ করে দেওয়া হত, অর্থাৎ ঘুমোও এবার। আরে ঘুমোব কী! হোমটাস্ক আছে না? ক্লাস-টেস্ট আছে না? সুপারিন্টেন্ডেন্ট ফাদার সুরিন সেসব বুঝতেন না, এখন ঘুমোও, ভোর পাঁচটায় উঠে পড়বে। ধুর, তাই হয় নাকি আবার! আমরা লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাত জেগে পড়তাম। রাঁচিতে গরমটা কম বলে ফ্যানের জন্যে কষ্ট হত না।
একদিন হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি রুমমেট প্রিয়তোষের মশারি দাউদাউ করে জ্বলছে। ভাবলাম লণ্ঠনের থেকে আগুন লেগে গেছে হয়ত। তার ঠিক দু'দিন পরে মাঝরাতে বাথরুম গেছি। ফিরে এসে দেখি আমার সব ক'টা বই খাতা যত্ন করে বিছানায় সাজানো- টেবিলে একটাও নেই! বুঝেছি, ব্যাটা প্রিয় বা শিশিরের কাণ্ড, অথচ ওরা কিনা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আরো দু'দিন পরে বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে দেখি শিশিরের তোষক-বিছানা ধিকধিক করে জ্বলছে- বন্ধ ঘরে আগুন এল কোত্থেকে! পরদিন রবিবার ছিল। সকালে আমার স্টিলের ট্রাঙ্কে এক বাটি জল রেখেছিলাম, হঠাৎ আমার চোখের সামনে বাটিটা প্রায় ছ-ইঞ্চি লাফিয়ে নীচে পড়ে গেল, ঘর জলে জলময়। এবার মনে হল ভৌতিক কাণ্ডই বটে।
কথাটা চাউর হতেই কল্যাণ, জহর, প্রদীপ, অশোক সবাই জড়ো হল। অশোক বলল ও নাকি প্ল্যাঞ্চেট করে ভূত নামাতে পারে। আমি বাবার কাছে প্ল্যাঞ্চেটের গল্প শুনেছিলাম আর শরদিন্দুর বরদার গল্পও পড়া ছিল, তবে ব্যাপারটায় কৌতূহল থাকলেও বিশ্বাস তেমন ছিল না, তবু আমরা প্রাণের দায়ে মেনে নিলাম ওর প্রস্তাব। ঠিক হল পরদিন রাত্রি সাড়ে দশটায় আলো নিভলে অশোক ওর যন্ত্র পাতবে, আর হারুন রশিদ থাকবে রুমের বাইরে ফাদার সুরিন বা ডুংডুং এলে অ্যালার্ট করতে।
কথামত পরদিন অশোক ওর স্পেশ্যাল টেবল আর প্ল্যাঞ্চেটের বোর্ড নিয়ে এল। ঘরের এককোণে একটা লণ্ঠন জ্বালিয়ে বোর্ডে সাদা কাগজ পেতে একটা পেন্সিল দু-আঙুলে হাল্কা করে ধরলাম আমরা চারজনে- আমি, অশোক, কল্যাণ আর প্রিয়তোষ, শিশির আর প্রদীপ বসে আছে ঘরের এক কোণে, বাইরে হারুন। হঠাৎ একটা হাল্কা চন্দনের গন্ধ এল নাকে, সেই সঙ্গে দরজায় মৃদু করাঘাত। 'এসেছে'- অশোক ফিসফিস করে বলল। ও প্রশ্ন শুরু করল আর উত্তরে আমাদের আঙুলে ধরা পেন্সিল খসখস করে চলতে লাগল কাগজে।
'তুমি এসেছ?'- অশোক বলা মাত্র পেন্সিল নড়ে উঠল।
'কী নাম তোমার?'
'গোপাল।'- লেখা হল অস্পষ্ট অক্ষরে।
'কী চাও?'
'তুম সব কী মৌত!'
'কেন? কী ক্ষতি করেছি আমরা তোমার?'
'এই রুমে কেউ থাকবে না তোমরা।'
'কেউ না?'
'শুধু অশোক থাকবে।'
'কেন?'
'ও খুব ভাল ছেলে। ভূত বিশ্বাস করে।'
এটুকু লেখা হতেই কল্যাণের মাথা গরম হয়ে উঠল। 'ব্যাটা ভূত! অশোক একলা ভাল ছেলে! আর আমরা সব খারাপ? এ সব অশোকের আঙুলের কারসাজি। বল!'- বলেই অন্ধকারে অশোকের কলার চেপে ধরল। এই সুযোগে ভূত পালাল আর শিশির আলো বাড়িয়ে দিল। সবাই চেপে ধরায় অশোক স্বীকার করল যে সে কিছুটা মজা করেছে, তবে ওর উপরেও মনে হয় আরো কেউ কারসাজি করছিল, সেটা কে সেও জানে না।
আমরা বাইরে এলাম। দেখি হারুন বারান্দার এককোণে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। নাড়া দিতেই উঠে বলে- 'এই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।' কে জানে সেও ব্যাটা ঢপ দিচ্ছে কিনা!
পরদিন ফাদার সুরিন ডাকলেন ওঁর রুমে। বলেন 'কাল তোমাদের রুমে অনেক রাত অব্ধি আলো জ্বলেছে, এনিথিং রং?'
'না ফাদার, একটা হোমটাস্ক বাকি ছিল, তাই চারজনে মিলে সল্ভ করছিলাম।'
'ইটস অলরাইট। তবে কি জানো? এই হোস্টেলের একটা রুমে অনেক বছর আগে একটা ছেলে ফ্যান থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে সুইসাইড করেছিল। তাই রাত্রে একটু সাবধানে থাকবে।'
আমার গলা শুকিয়ে আসছে। কোনমতে ঢোঁক গিলে বললাম, 'ফাদার, ছেলেটার নাম কী ছিল?'
'হোয়াই ডু ইউ ওয়ান্ট টু নো দ্যাট? আই থিঙ্ক, গোপাল। হ্যাঁ, গোপাল মহাপাত্র। দ্যাট কিউট ওড়িয়া বয়!'
হঠাৎ দপ করে আলো জ্বলে উঠল। 'শেষে তুইও ঢপ দিচ্ছিস'- পেছন থেকে কার গলা পেলাম। দেখি দেবু। কখন উঠে এসেছে ফুলশয্যা থেকে। 'আমি সেন্ট জেভিয়ার্সের হোস্টেলে থাকিনি কখনও, কিন্তু রুমগুলো তো দেখেছি। ফ্যান কোথায় আছে রে যে গলায় দড়ি দেবে!'
'শালা! যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর? ফুলশয্যাটা বিনা আড়ি-পাতায় উদ্ধার করে দিলাম, কোথায় একটা ধন্যবাদ দিবি!'
'দাদা, ঢপ হলেই বা ক্ষতি কী? গল্পটা কিন্তু হেব্বি জমেছিল।'- ইতু বলে।
ইতিমধ্যে দেবুর মাসতুতো দাদা বিক্রমদা কখন ঢুকেছে দেখিনি। ও সেই কলেজে আমাদের চার বছরের সিনিয়ার ছিল। একটা সিগারেট ধরিয়ে বলে- 'গোপালের গল্পটা মিথ্যে নয়। এই ঘটনার পরেই ঘাবড়ে গিয়ে প্রিন্সিপাল সব কটা ফ্যান খুলে ফেলেন। আংটাগুলো আছে, দেখিসনি?'
'তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল?' ঋতুদি যেন অকূলপাথারে।
'ভূত জিনিষটা এত রহস্যময়, তার গল্পে একটু রহস্য থাকবে না?' আমি গল্প শেষ করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
সিম্পলি ম্যাড।
এখনও পাগল হইনি বলেই বিশ্বাস করি, কিন্তু প্রায় হতে চলেছিলাম। কিভাবে? তাহলে সেই গল্পই বলি।
অনেক কাল আগের ঘটনা। তখন আমাদের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা হত ডিসেম্বর মাসে আর তার পরেই দিন পনেরর নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। পড়াশুনো নেই, গরমের দাপট নেই, যতখুশি ছোটাছুটি আর খেলাধূলা। শুধু সন্ধে হতেই বাড়ি ফিরতে হত, তারপর আবার খেলো, মানে ঘরে বসে ক্যারাম, চাইনিজ চেকার আর বড়দাদারা বাগানের লনে যেখানে আলো জ্বালিয়ে আর নেট টাঙিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলে সেখানে ঘুরঘুর করা, যদি কোন ফাঁকে একটু খেলার মাঝে ঢুকে পড়া যায়!
কিন্তু সব কিছুই একসময় একঘেয়ে হয়ে যায়। পেয়ারাগাছে চাপা, ঢিল ছুঁড়ে কুল পাড়া, দিনভর গোবরডান্ডা আর গুলিডান্ডা খেলা, এমনকি ক্রিকেটও আর ভাল্লাগে না। নতুন কোন উত্তেজনার খোরাক চাই। ভাবতে ভাবতে চারজন অসমবয়সী বন্ধু, মানে আমি নাইনে পড়ি, শিং ভেঙে যাদের দলে ঢুকেছি সেই সুনীল সেভেনে, তোতন সিক্সে আর বালখিল্য হলেও শয়তানিতে আমাদের সবার গুরু আট বছরের খোকনা। সবার হাতে একটা করে সদ্য-বানানো গুলতি, জলার ধারে বেশ কিছু বক বসে আছে, শিকার করা যাবে।
তখন অত পরিযায়ী পাখি-টাখি বুঝতাম না, তাছাড়া ওরা বক না বালিহাঁস ছিল তাও জানতাম না। আমরা তিনজনে যখন কাদায় পা ডুবিয়ে হাঁস-ফাঁস করছি, খোকনা সত্যিকারের দুটো হাঁস না বক জানিনা কী, গুলতি ছুঁড়েই শিকার করে ফেলল। উরিব্বাস, কী আনন্দ! পাখিদুটোকে হাতে ঝুলিয়ে বিজয়ী-বীরের মত ফিরছি, আজ পিকনিক হবে আমাদের বাগানের পেছনে।
ভীড় জমে গেল রীতিমত। আমরা তিন ভাইবোন, তোতন একা, সুনীলরা দুই ভাই আর খোকনারা তিন ভাই আর এক বোন- সবাই জুটে গেল। খোকনার মেয়ে-সদস্য নিতে একটু আপত্তি ছিল, কিন্তু ওর দিদি থাকলে রান্নার সুবিধে হবে বলে আর ঝামেলা করল না। আমিও আমাদের চাকর বিভূতিকে ডেকে নিলাম, তাহলে আর মাংস-কাটাকুটি, উনুন জ্বালানো- এসব করতে সমস্যা হবেনা। ঠিক হল চাল, মশলা, আলু, পেঁয়াজ, লঙ্কা, রসুন, আদা- সবাই শেয়ার করবে, কয়লা আর মশলাপাতি আমাদের বাড়ির। খোকনা বলল ওর পাখি, তাই আর কিছু বাড়িতে চাইতে পারবে না। তবে ওদের বাগানে লুড়কি বেগুন আর টমাটো ফলেছে, তার কয়েকটা তুলে নিয়ে এল, ভাজা আর চাটনি হবে। আমাদের ওপরতলায় রুমু-ঝুমু দুটি বোন থাকে, তারাও লোভে লোভে এসেছিল নীচে। আমাদের আপত্তি ছিল না, তবে তাদের মা, মানে মিষ্টিকাকি কলকাতার কনভেন্টে পড়া সফিস্টিকেটেড মহিলা, তিনি নাক বেঁকিয়ে অদ্ভুত কায়দায় বললেন- 'রুমু-ঝুমু, তোমরা কি জানো, বকের মাংস খেলে কী হয়?' বলা বাহুল্য, এসব কথা রুমু-ঝুমুদের স্কুলের কোর্সে নেই, তাই ওরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
- 'না, অন্য কিছু হয় না, সিম্পলি ম্যাড হয়ে যায়। আমাদের ল্যান্সডাউনের পাড়ায় একটা ম্যাডম্যান ছিল, সে নাকি কখন......'
- 'পাগলা ষাঁড় বলুন, কাকিমা, ম্যাড-অক্স।' উনি আবার কাকিমা বললে চটে যেতেন, আন্টি বলতে হতো, আর তাই আমরা আরো বেশি করে কাকিমা বলতাম, 'রুমু বলছিল ওদের মামাবাড়ি নাকি ম্যাডক্স স্কোয়ারের কাছে।' আমি এটুকু বলতেই কথার খেই হারিয়ে সফিস্টি... ইয়ে মানে মিষ্টিকাকি আমার দিকে কটমট করে একবার তাকিয়েই কেন জানিনা দুই মেয়েকে বগলদাবা করে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেলেন।
তারপর যা পিকনিক হল না! তখনকার দিনে ছেলেরা শখের রান্না একটু-আধটু করলেও, গেরস্থ বাড়ির একটু বড় মেয়েরা রান্নাবান্না গেরস্থালিতে ওস্তাদ হতো। কাক হোক আর বক, আচ্ছা করে ঝালমশলা দিয়ে খোকনার বেবিদি আর আমার বোন মিলে যা দুর্দান্ত একখানা রান্না নামালো, খোলা জায়গায় গাছপালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে তার গন্ধে চারপাশের বাড়ির জানলা খুলে সবাই উঁকিঝুকি মারতে লাগল। বিভূতি কলাপাতার অভাবে মানকচুর পাতা কেটে ধুয়ে আনল বেশ কিছু। 'হ্যাঁরে, গলা কুটকুট করবে না তো?' - আমি ভয়ে ভয়ে শুধোলাম। বিভূতি চাকর হলেও আমাদিগকে পাত্তা দিত না একদম, বলে- 'কী আর হবে তাহলে, তোমার খাবারটাও আমিই খেয়ে নেব অল্প কষ্ট করে!'
পরিষ্কার ঘাসের লনে আমরা খেতে বসেছি। ভাত, বাগানের বেগুন-ভাজা, আলুভাতে, চাটনি আর বালিহাঁসের রগরগে ঝাল ঝোল গরম গরম- হ্যাঁ, একফাঁকে খোকনার বাবা এসে দেখে ও দুটোকে বালিহাঁস বলেই সার্টিফাই করে গেছেন। এমন সময় দেখি মিষ্টিকাকি উপর থেকে লজ্জা-লজ্জা মুখ করে এসে দাঁড়িয়েছে, একাই। বললেন, 'না রে, যা গন্ধ পাচ্ছি ওপর থেকে, ভাবলাম একটু মাংস টেস্ট করেই যাই। রুমু-ঝুমুকে আর আনলাম না। আমার আর কী, এই বয়সে নাহয় ম্যাড হলামই।'
রুমু-ঝুমুর অশেষ সৌভাগ্যই বলতে হবে, ওদের মা-ও সে যাত্রা ম্যাড হতে হতে বেঁচে যায়।
হ্যালোইন
(গল্প)
গত বছরের ৩১শে অক্টোবর, বিকেল পাঁচটা। বেল শুনে দরজা খুলে দাঁড়াতেই প্রায় মুর্ছা খেলাম। এরা কারা? ভয়ানক-দর্শন পাঁচজন, তবে সাইজে ছোট, চার-সাড়েচার ফুট একেকজন। ওরা আমাকে ভয় পেতে দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠতেই মাথায় ঢুকল ব্যাপারটা। মুখোস পরা আর মুখে চোখে রঙকরে ভূত সাজা পাঁচটি বাচ্চা, পাড়ারই, নিশ্চয় দেখেছি নীচের মাঠে বা পার্কে খেলতে।
- 'আঙ্কল, ভয় পেয়েছে, ভয় পেয়েছে! হ্যালোইন, হ্যালোইন- চকোলেট খাওয়াও', ওরা আমাকে ঘিরে লাফাতে লাগল। ও মা, ওদের মধ্যে একজন আবার দেখি মাথায় একটা কুমড়োর খোল চাপিয়ে এসেছে, নাক-মুখ-চোখের জায়গায় ফুটো করা।
এই হয়েছে এক ঝামেলা। আজকালকার এদেশি বাচ্চারা সরস্বতী পূজো, মকর-সংক্রান্তি, ভূত-চতুর্দশীর কথা মনে রাখে না, কিন্তু ভ্যালেন্টাইন ডে, ঈস্টার, বক্সিং ডে, থ্যাঙ্কসগিভিং, ফ্রেন্ডশিপ ডে- সবকিছুর হিসেব রাখে। বছর কয়েক হল ইউরোপ-আমেরিকার খ্রীস্টান সমাজের দেখে অল সেন্টস ডের আগের সন্ধেয় প্রেতাত্মাদের মর্তে আসার উৎসব হ্যালোইন নিয়ে মেতেছে এরা। ওদের দেশে হেমন্ত বা fallএর এই সময়টা নাকি ভূতপ্রেতরা মুক্তি পাবার আগে একবার বাসায় ফেরে, ক'টা দিন সর্বত্র ভূতের উপদ্রব হয় বলে সবাই ঘরে আলো সাজায়, ক্যাম্প-ফায়ার করে। আসলে হয়ত এটা ফসল কাটার প্রস্তুতি হিসেবে একটা হার্ভেস্ট ফেস্টিভাল, বা অন্য কিছুও হতে পারে। আমরা তো চিরকালে নকলনবিশ, আমাদের বাচ্চারা তাই ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার কায়দায় কুমড়োর খোলে চোখ-মুখ এঁকে ভূত সাজানো, ঘরে বা ক্লাবে ভৌতিক আলো-আঁধারির পরিবেশ তৈরি- এসবে বেশ রপ্ত হয়ে, ঘর থেকে নিজেরাও ভূত সেজে এসে পাড়ার ছোট-বড়দের ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। ভয় পেলেই চকলেট খাওয়াও, না থাকলে পয়সা দাও কিনতে।
- 'ওরে দাঁড়া, দাঁড়া! বাড়িতে কি চকোলেট মজুত থাকে নাকি? আমাদের বাসায় কি ছোটছেলে আছে? ঘন্টাখানেক পরে আসিস, এনে রাখব।' ওরা চলে যেতেই গায়ে জামাটা গলিয়ে পাড়ার দোকান থেকে পাঁচখানা ক্যাডবেরির চকোলেট কিনে নিয়ে এলাম।
সন্ধের পর আটটা নাগাদ ওরা এল। আমি চকোলেটগুলো এনে দিতেই ওদের একজন বলে উঠল- 'আঙ্কল, পাঁচটা কেন? আমরা তো চারজন!'
- 'কেন ওই ছেলেটা কই, সেই যে পামকিন-হেড সেজেছিল মাথায় কুমড়ো পরে? সবচেয়ে বাচ্চা তো ওটাই ছিল!'
- 'আঙ্কল কী যে বলে না! সারা বিকেল আমরা চারজনেই ঘুরছি।' বলে একটা চকোলেট আমাকে ফেরৎ দিয়ে ওরা হৈচৈ করতে করতে চলে গেল। আমিও ক্যাডবেরিটা নিয়ে আর কী করব ভেবে ফ্রিজে রেখে দিলাম।
মাঝরাতে সেদিন কেন জানিনা খিদে পেয়ে গেল। আসলে আমিও একটা বুড়ো বাচ্চা তো! ফ্রিজে আস্ত একটা চকোলেটের বড় প্যাকেট রাখা আছে, সেটা আর ভুলে থাকতে পারছিলাম না। কিচেনে গিয়ে ফ্রিজ খুললাম। একি! চকোলেট তো নেই কোথাও।
শুধু ফ্রিজের হ্যান্ডেলে দেখতে পেলাম স্পষ্ট দুটো ছাপ, চকোলেট মাখানো ছোট ছোট দুটো হাতের।
পুরুলিয়ায় মাইকেল
ভূমিকা।