Thursday, June 5, 2014

বাংলা অণু-গল্প ২৫- ইজ্জত

।। ইজ্জত ।।

'তুই লিবি আর দু-টান...আরে, উট কে বটে?' ধনঞ্জয় দেখতে পেয়েছে মেয়েটাকে । ক্ষয়াটে গড়নের একটি যুবতী, বয়স ষোল থেকে ছাব্বিশের মধ্যে, এর বেশী বোঝার উপায় নেই । একটা আদ্যিকালের ভাঙ্গা কুঁড়েঘরে একা বসে কাঁদছে আর শীতে কাঁপছে ঠক্‌ঠক্‌ করে । ধনঞ্জয় ও ঝন্টুচরণ অন্য গ্রাম থেকে বরযাত্রী এসেছে নিত্য ঘোষালের মেয়ের বিয়েতে । দলের গুরুজনদের এড়িয়ে বিড়ি ফুঁকতে একটু বাইরের দিকে অন্ধকারে এসে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় দেখতে পেয়েছে মেয়েটাকে । তাদের যা জানার কথা নয়, মেয়েটার নাম তক্‌লি । ঠাক্‌মা বুড়ীর সাথে থাকত ঐ ভাঙা ঘরে, তা সেই ঘরের একদিকটা চাপা পড়েই বুড়ীটা গেছে গত সপ্তাহে । এখন শীত আর খাবারের থেকেও তার বেশী চিন্তা গাঁয়ের ওই ক্ষুধার্ত নেকড়ের দঙ্গল থেকে নিজেকে বাঁচায় কিভাবে ।
'লে, লে, চাঁঢ়ে চ টান্যে লিয়ে...জাড় লাইগছে' ঝন্টু সরু গলায় চেঁচিয়ে উঠল । বিড়ি-টানা শেষ করে তার শিগ্‌গির বিয়ের আসরে ফেরার ইচ্ছে, লগ্নের সময় হয়ে আসছে ।

ওরা খেয়াল করেনি ওদের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ঐ গ্রামেরই কটা নেকড়ে, দুর্দান্ত মাঘের শীতকে পরোয়া না করে ।
'কি বে, ভিন্‌ গাঁয়ে আস্যে রস হয়েঁছে', ঝণ্টুর কলার চেপে ধরল একজন ।

'ক্যানে, কি হয়েঁছে, আমরা বরযাত্রী', ধনঞ্জয় বুঝতে চেষ্টা করল ভুলটা কি এবং কোথায় হল ।
'তবে আর কি, মাথাট কিনে লিয়েছিস্‌' একজন একটা চড় কষাল ধনার গালে, 'শালা, খালভরা, আমাদের গাঁয়ের বিটিছিলাকে টান্যে লিবি ! ই গাঁয়ের কি কুন ইজ্জত নাই ?'

ইতিমধ্যে গোলমালের খবর পেয়ে বরযাত্রীর দলও এসে পড়েছে । অনেক হৈ-চৈ হাঙ্গামার পরে দু-পক্ষই বুঝতে পেরেছে ভুলটা কার । কিন্তু উঠতি বড়লোক বলেই হোক বা সুন্দরী মেয়েকে ভিন্‌গাঁয়ে বিয়ে দিচ্ছে বলেই হোক, দেখা গেল নিত্য ঘোষালের শত্রুর অভাব নেই, গোলমালকারীরা কেউ আপসের ধার দিয়ে গেল না । ফলে মাঝরাত্রের কিছু পরে বরপক্ষ বর তুলে নিয়ে চলে গেল ।

খবরটা পাওয়া গেল সেই রাত্রেই ভোরের দিকে । দু-দিনের অভুক্ত হতভাগী তক্‌লি জ্বরতপ্ত অবহেলিত শরীরটাকে ভাঙা বাসাটাতে ফেলে রেখে রওনা দিয়েছে ওর ঠাক্‌মার কাছে ।

মুম্বাই, ৫ই জুন, ২০১৪ ।

বাংলা ছোটগল্প ।। বিবাহ-বার্ষিকী ।।

।। বিবাহ-বার্ষিকী ।।

বহুকাল পরে বাঁকুড়া এসেছি । না, উপলক্ষ্য কিছু নয়, ভগ্নীপতি এখানে বদলি হয়ে এসেছে এবং একটি মারুতি অল্টো কিনেছে । বোনের খুব ইচ্ছে একবার ওদের আস্তানাটা দেখে যাই । দোলের পরে কলকাতায় একটা কাজে এসে সময়ও হয়ে গেল, দুর্গাপুর ঘুরে টুক করে বাঁকুড়া চলে গেলাম । শহরটা বিশেষ বদলায়নি মনে হল, তবে রাস্তাঘাটে ভীড় অনেক বেড়েছে ।
'হ্যাঁরে, তোদের এখানে মাল্টিপ্লেক্স কালচার এসে পড়েছে না সেই পুরনো সিনেমাঘর গুলোই রয়ে গেছে ? সেই বীণাপাণি, চণ্ডীদাস...' আমি বোনকে শুধোলাম ।
'বাবা, তোর এখনো মনে আছে ? না, মাল্টিপ্লেক্স এখনও আসেনি, তবে এই এল বলে । পুরনো হলগুলোর খুব বাজে অবস্থা,' পাপিয়া বলল ।
'চন্ডীদাস আর কদিন পরে বোধহয় কোল্ড-স্টোরেজ হয়ে যাবে।' ভগ্নীপতির সরস মন্তব্য, 'তা দাদার কি কোনও সেন্টিমেন্টাল এটাচমেন্ট আছে নাকি......?'
'আছে বৈকি', আমি হাসলাম । ছুটিছাঁটাতে মাঝে মাঝেই পিসীর বাড়ি চলে আসতাম আর টো-টো করে ঘুরে বেড়াতাম প্রায় সমবয়সী দিদি শীলার সাথে, অবশ্য জন্মে কখনও ওকে দিদি বলি নি । পিসেমশাই ছিলেন এসিস্ট্যান্ট আর-টি-ও । একদিন দুজনে চন্ডিদাস থেকে সিনেমা দেখে ফিরে খুব বকুনি খেলাম । না বলে সিনেমা যাবার জন্যে নয়, হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম বলে । যত বোঝাই 'হিন্দুস্তান কি কসম' দেশভক্তির ছবি, পিসেমশাই তবু মানেননা, আমার ছেলেমেয়েরা শেষপর্যন্ত হিন্দি সিনেমা দেখছে...ছি, ছি, রুচি কোথায় নেমে গেছে !
'দাদা মনে হচ্ছে পুরনো দিনে হারিয়ে গেছে', অজিত আমার হুঁশ ফিরিয়ে আনল, 'আমি বলি কি, রঙ্গিন মুঘলে-আজম লেগেছে, গিয়ে দেখে এসো, আমার নতুন গাড়িটারও ট্রায়াল হয়ে যাক্‌ ।'
'ক'টা বাজে খেয়াল আছে?' পাপিয়া বলে, 'ইভনিং শো-এর আর টাইম নেই' ।
'নাইট শোই যাই না, তোরাও তৈরি হয়ে নে, একসাথেই বেরোনো যাবে ।' আমি বলি ।
'সে উপায় কি আছে? এখুনি একদল এজেন্ট আসবে, সেলসট্যাক্সের নতুন নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনার জন্যে। তারপর ছেলের স্কুল খুলছে, ওকে কাল ভোরে পুরুলিয়ার বাসে তুলে দিতে হবে । তুমি সে জন্যে ভেব না, রাস্তাঘাট যদি মনে আছে তাহলে নাইট শো কোনও সমস্যা নয়, এইত পাটপুর থেকে তিন কিলোমিটারেরও কম', অজিত বলল । ওদের ছেলে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে হস্টেলে থেকে পড়ে ।
সিনেমা তেমন ভাল লাগছে না, বাইরের লাউঞ্জে এসে একটা সিগারেট ধরিয়েছি । এখান থেকে দশ বারো কিলোমিটার দূরে ছাতনা গ্রামে বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাসের ভিটে ছিল, মা বাশুলির মন্দির এখনও আছে । তাকিয়ে দেখছি, মনে হচ্ছিল, এখানে তাঁর একটা আবক্ষ মূর্তি ছিল, নীচে লেখা থাকত, 'চন্ডীদাস চিত্র-মন্দির'; শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের করকমলে উদ্ঘাটিত, ও শেষে ১৩৩৪ সনের একটা তারিখ । নিজের মনেই ভাবছি কোথায় গেল সেটা, এমন সময় পাশ দিয়ে সাঁ করে একজন ওয়াশ-রুমে ঢুকে গেল । মুখটা খুব চেনা ঠেকল, কিন্তু চিনতে পারলাম না ।
হঠাৎ লোডশেডিং । এ জিনিষটা মফঃস্বল শহরগুলোতে একটা চিরস্থায়ী সমস্যা । তবে এদের জেনারেটার আছে হয়ত, অন্ততঃ একটা এমার্জেন্সি আলো চট করে জ্বলে উঠল । সেই মুহূর্তে এক সুন্দরী মহিলা 'পালন, তুমি কোথায় গেলে, পালন' বলতে বলতে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন । আমার মাথায় কি এল, বলে বসলাম, 'আপনি কি পালন মুখার্জিকে খুঁজছেন ?'
'আপনি চেনেন তাকে, দেখেছেন ?'
'আমার স্কুলের বন্ধু । যাকে দেখলাম, যদি সেই হয়, তবে একটু আগে ওয়াশ-রুমের দিকে যেতে দেখলাম । ওই তো এসে পড়েছে ।'
'আরে সলিল না? উঃ, কুড়ি বছরের উপর হয়ে গেল...কোথায় আছিস? বাঃ, দিব্যি তো আমার বৌএর সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছিস । আগে থেকে চিনতিস নাকি?' নিজের রসিকতায় হা হা করে হেসে উঠল পালন।
'সব কথা পরে হবে ।' আমি বললাম, 'তোরা কি এই পচা বইটা পুরোটা দেখবি, না গল্প করবি এখন? আমার আর সিনেমায় ইন্টারেস্ট নেই । হলটার সাথে একটা নস্টালজিক ফীলিং জড়িয়ে ছিল, সেসব হয়ে গেছে ।'
'আমাদের তো সিনেমা দেখতেই হবে, বছরে একটা দিন । তবে এবার ফেরা যেতে পারে ।'
পালন গাড়ী বা স্কুটার আনেনি, বলল, স্কুটার আর চালায় না, আর গাড়ী কেনার পয়সা নেই । ও আর পলা, হ্যাঁ, ওর স্ত্রী, আমার গাড়ীর পিছনে বসল । পালন একটু আপত্তি করছিল, সেই প্রতাপবাগান নর্থে ওরা থাকে; ভজন জ্যেঠু, মানে লালনদা আর পালনের বাবা ওখানে সস্তায় জমি পেয়ে একখানা বাড়ি করে ফেলেছিলেন- আমি আপত্তিতে কান দিইনি, গাড়ী থাকলে প্রতাপবাগান-পাটপুর সব সমান ।
'আমার তো আর পড়াশোনা হল না, আই-টি-আই করে হলদিয়ায় ঢুকলাম এপ্রেন্টিস হয়ে । সেও প্রায় বাইশ বছর হয়ে গেল ।' নিজের জীবন-বৃত্তান্ত শুরু করল পালন ।
'কিন্তু তোকে দেখে কেউ বলবে না, চল্লিশ পার করেছিস । পলাকেও না । অন্ততঃ দশ বছর কম মনে হয় । ব্যাপারখানা কি?'
'আমাদের বয়স বাড়ার ঘড়িটা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি' বলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল পলা ।
'না রে সত্যি । দ্যাখ, সিগারেট খাই না, জীবনে একবারই খেয়েছিলাম...তাছাড়া আমরা দুজনেই স্পোর্টসম্যান ছিলাম । তবে তোকে একটা কথা বলা হয় নি, আমাদের আজ বারো নম্বর বিবাহ-বার্ষিকী । ছেলেপুলে নেই, এই দিনটা আমরা প্রতি বছর চন্ডীদাসে সেলিব্রেট করি ।'
'তাই নাকি ? তাহলে তো একটা স্পেশ্যাল অভিনন্দন তোদের পাওনা ।' আমি বললাম ।
কিন্তু ব্যাপার কি, পাঠকপাড়া ছাড়িয়ে বাই-পাসে ঢুকেছি অনেকক্ষণ হল । এখনও প্রতাপবাগান আসার নাম নেই । 'এই ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো', আমি পিছনে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম ।
'তুই ঠিক রাস্তায় আছিস, আমরাই রাস্তা ভুলে গেছিলাম', বলেই যুগল হাসি পেছনের সীট থেকে । রহস্যজনক সে হাসি আর থামতেই চায় না । কি সন্দেহ হওয়ায় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমের স্রোত নেমে গেল...পিছনে সীট তো ফাঁকা ! কোথায় কি করে নামল ওরা ! ভয়ে, আতঙ্কে আমি সজোরে ব্রেক কষলাম ।
একটু সম্বিত ফিরতেই দেখি গাড়ীর চারপাশে এত রাতেও একটা ভীড় জমা হয়েছে । এক টাকমাথা মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক দেখি সামনের বাসা থেকে গাড়ীর দিকে এগিয়ে আসছেন । পালন না? উঁহু, ওর আবার টাক কোথায়! এবার চিনতে পারলাম, লালনদা । তাঁকে এগিয়ে গিয়ে আমার কাহিনী শোনালাম ।
'হুঁ, ঠিকই আন্দাজ করেছি', লালনদা বললেন, 'তুমি নিশ্চয় বহুদিন পরে পালনকে দেখলে?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রায় বিশ বছর পরে । লাস্ট দেখেছিলাম ওর তখন কুড়ি-বাইশ হবে ।'
'কিন্তু ওর বয়স যে ত্রিশের বেশী এগোয়নি সেটা লক্ষ্য করোনি । যাক্‌, বড় দুঃখের সে গল্প । শুনতে চাও?'
'অবশ্যই, যদি আপনার কোনও আপত্তি না থাকে । ভজন জ্যেঠু বাড়ি নেই ?'
'না, তিনি গেছেন পাঁচ বছর হল, মা দশ বছর আগে । তার আগে বড় হাসিখুশি ছিল আমাদের পরিবার । পালনটা লেখাপড়া বেশী শেখে নি, কিন্তু ভাল খেলোয়াড় ছিল, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন দুটোই ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে খেলত ।'
'সে তো আমরা জানি, ওই সূত্রেই তো হলদিয়ায় সহজে চাকরিটা পায় ।'
'ঠিক । বার বছর আগে এই দিনে ওদের বিয়ে হয় । বৌমা এখানকারই মেয়ে । বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে পালন একটা সম্পূর্ন কোয়ার্টার পেয়ে ঠিক করে ওকে নিয়ে যাবে হলদিয়া । খুব ভাল কথা । আমি বললাম, এবার তোরা একটু ধুমধাম করে বিবাহবার্ষিকীটা কর, তারপর বৌমাকে সাথে করে নিয়ে যা । খাওয়াদাওয়া গল্পগুজব মিটল প্রায় সাড়ে আটটায় । ইতিমধ্যে এক বন্ধু হাতে গুঁজে দিয়েছে দুটো নাইট শো-এর টিকিট আর একজন একটা দামী সিগারেটের প্যাকেট । পালন কখনও স্মোক করেনা কিন্তু কি ভেবে একটা ধরিয়ে স্কুটার স্টার্ট দিতে গেছে, সাথে বউমা । কেন গাড়ী স্টার্ট নিচ্ছেনা দেখতে পালন পেট্রল ট্যাঙ্কের ঢাকা খুলে দেখতে গেছে তেল আছে কিনা । চরম বোকামি । সিগারেটটা ঠোঁট থেকে খসে সেই মুহূর্তে ট্যাঙ্কের ভিতর ।'
'তারপর?'
'তারপর আর কি ? বিরাট একটা বিস্ফোরণ । পালন তো অন দ্য স্পট শেষ । বৌমা হাসপাতালে চোখ বোজার আগে আমার স্ত্রীকে বলেছিল, দিদি, টিকিট দুটো আমি নষ্ট হতে দেব না, তুমি দেখো ।'
'তাহলে আমি চণ্ডীদাসে যাদের দেখলাম...'
'ওরাই। অনেকেই দেখেছে এখানে, শুধুমাত্র এই দিনটিতে । খবরের কাগজে বেরিয়েছিল ঘটনাটা, অবশ্য তুমি তো বাইরে বাইরেই আছো । যাক্‌গে, অনেক ধকল গেল, গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবে ত? তোমার বোনের বাড়িটি যেন কোথায় ? চা খাবে না কি আরেক কাপ? একদিন এসো এ বাসায় বোন-ভগ্নীপতিকে নিয়ে ...।'
লালনদা অনেক কিছু বলে যাচ্ছেন, বুঝতে পারছি ওনার ঠোঁট নড়া দেখে । আমার কানে কিন্তু আর কিছুই ঢুকছে না ।
মুম্বাই, ২০ মে, ২০১৪ ।

Sunday, April 13, 2014

Translated Poem - English to Bengali

"I Am Not Yours"
Tarun Ganguli


I am not yours, not lost in you,
Not lost, although I long to be
Lost as a candle lit at noon,
Lost as a snowflake in the sea.

You love me, and I find you still
A spirit beautiful and bright,
Yet I am I, who long to be
Lost as a light is lost in light.
Oh plunge me deep in love -- put out
My senses, leave me deaf and blind,
Swept by the tempest of your love,
A taper in a rushing wind.

তোমার নইক আমি

তোমার নইক আমি, তোমাতে হারাইনিক কভু
দিনের প্রদীপ-সম, রবির উজল আলো সেথা
ব্যর্থ করে অগ্নিশিখা, লুপ্ত হতে চেয়েছি যে তবু, 
অথবা সাগর জলে হারায় তুষার-কণা যেথা।

ভালবাস তুমি মোরে। তোমার অন্তরে আমি পাই
লাবণ্য-প্রতিমা এক, দীপ্তিময় সুন্দর মূরতি;
আমি শুধু তার মাঝে নিঃশেষে বিলুপ্ত হতে চাই,
জ্যোতিপুঞ্জ মাঝে দীপ আপনারে হারায় যেমতি।

তোমার নিবিড় প্রেমে ডুবাও্ হে লুপ্ত করে মম
চেতনার অনুভূতি, দাও করে অন্ধ বা বধির
তোমার প্রবল প্রেম উন্মত্ত ঝড়ের হাওয়া সম,
যেন করে আত্মসাৎ এ হিয়ার মলয়-সমীর।


April 12th, 2014.

বাংলা কবিতা ।। পুরোনো খাতা থেকেঃ বিচিত্র রস


পকেটমারের গান ।।

বাহা বাহা বেশ আছি ভাইরে,
পকেটে চালিয়ে হাত তোফা সুখে খাই রে ।
পরের পকেট কেটে এ জীবন যাবে কেটে
ভারী মজা, তা না না না তাই রে ।।

হাতে গিলোটিন ব্লেড, আরে না না, খুন-টুন করি নে,
হাত না ঢুকলে পরে কেটে ফেলি, ধরা-টরা পড়িনে ।
গুরু শ্রীশ্রী গাঁট্টা, গালে গালপাট্টা
নামী গাটকাট্টা, নমি তাঁর চরণে-
আমারে দেছেন ভার, শ্যালদা-শ্যামবাজার
পকেট বোঝাই যার বোঝা তার হরণে ।
মাঝে মাঝে ধরা পড়ি, মার-টার খাই রে,
স্যাঙাতেরা হাসে, ভারী বেজ্জত হয় রে !!

২রা জানুয়ারী, ১৯৭৭
(এটি একটি হাস্যরসের গান । কোনও পকেটমারকে ব্যক্তিগতভাবে বা জাতিগতভাবে defame করার উদ্দেশ্য করে লেখা নয় ।)

বাংলা কবিতা ।। পুরোনো খাতা থেকে

উদ্‌বাস্তুর গান ।।

উদ্‌বাস্তু মোরা, আ-হা-হা উদ্‌বাস্তু মোরা ।
নেইকো চাল, নেইকো চুলো,
রাস্তা-ধারেই তাম্বু-ওড়া ।।

কোথা হ'তে এলাম মোরা
কোন্‌খানে বা যাচ্ছি রে !
খাবার কি ছাই, তাও জানিনে,
খাচ্ছি, যাহা পাচ্ছি রে ।
এমনি করেই কাটছে রে দিন,
অবাস্তবিক বস্তু মোরা ।।
সইত্য বটে দ্যাস্‌ ছিল এক
ছিলেম মনের আনন্দেই,
পুকুর থেকে পদ্মার ইলিশ
ধরে খেতেম সানন্দেই ।
পদ্মপাতার ডিঙ্গি করে, যেতেম ভেসে সমুদ্দুরে,
এমনি ছিল বুকের পাটা,
দ্যাসডা ছিল সোনায় মোড়া ।।
হাসছ, বটে কষ্টে মোদের,
হাসো, দু-দিন বৈ তো নয়,
শহরডা আর দুদিন পরে
দেখবে, তখন কাদের হয় !
তোমার নাকের ডগা দিয়ে, চলব গাড়ীর ধূল-উড়িয়ে
কইবে কেডা, এককালেতে
ছিলাম যে উদ্‌বাস্তু মোরা ?।
১৩ই আগষ্ট, ১৯৭৬ ।

বাংলা কবিতা ঃ পুরনো খাতা থেকে

ইডেনে ক্রিকেট ৭৭-এ ।।

ধিন্‌ তিরি কিরি কেট্‌
খেলার রাজা ক্রিকেট
খেলার রাজা যে রাজার খেলা সে
তাই সে যে ভারী গ্রেট !

ক্রিকেটের রাজা এম-সি-সি
অন্ততঃ শুনি তাইত,
যদিও তাদের রাজকীয় খেলা
এখনও দেখি নাই তো ।
রানের বেলায় পুঁজিবাদী তারা
এদেশে যেমন শেঠ,
আপাততঃ তারা এসে ভারতের
মাথা করে গেল হেঁট ।
সেরা ব্যাটস্‌ম্যান গাভাসকার
যতই সুনাম থাক বা আছে,
ওল্ড, লেভারের একেকটি বলে
উইকেট ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে ।
ওয়ান ডাউনে মহিন্দর
বলেরে সে বলে, একটু সর,
সোজা এসে স্টাম্প ছিটকে দিলি,
আমি কি রে তোর এমনি পর ?
স্ট্রোকী ব্যাট্‌স্‌ম্যান বিশ্বনাথ
প্লেয়ার নাকি সে জন্মজাত,
সে নমুনা যদি একটু দেখাত
ভারত কি তবে হত অনাথ !
অতঃপর আসে এ মানকাদ,
তুলে গম্ভীর সিংহনাদ ।
আন্ডারউডের একটি বলে
ভেঙে গুঁড়ো হয় সব আহ্লাদ ।
তবু রুখে বলে ব্রিজেশ ভাই,
বোলারকে আমি থোড়ী ডরাই?
হোক লেগব্রেক, কিংবা স্যুয়িং
চারের উপরে চার পাঠাই ।
কিরমানি আর মদনলাল
আলালের ঘরে যেন দুলাল,
ভেসে গেল স্রোতে কুটোর মতন
এমনি তাদের মন্দ ভাল ।
ক্যাপ্টেন সে যে বিষেন বেদি
স্বভাব তাহার এমনি জেদী,
রানের রক্তে রাঙ্গিবে ইডেন
করেছিল যথা তৈমুর-লোদী ।
বেদি বা প্যাটেল যতই খটুক
ঠেকাতে না পারে রানের বেগ ।
দুই-শতাধিক রানেতে এগিয়ে,
ফলো-অন দেয় লম্বা গ্রেগ ।
পরের ঘটনা বলি সংক্ষেপে
ব্যাটস্‌ম্যান আসে, যায় ক্ষেপে ক্ষেপে
আণ্ডারউডের উল্লাস-ধ্বনি
ছড়ায় ইডেন প্রাঙ্গন ব্যেপে ।
বিষন্নতার ছায়া নেমে আসে
ইডেনের শ্যাম-সবুজ ঘাসে,
ইনিংসে নয়, দশ উইকেটে
সান্ত্বনা যেন কটাক্ষে হাসে ।
তবু মনে করে গ্রেগের ব্যাটিং
আর ব্রিজেশের দৃঢ় প্রত্যয়-
ক্রিকেটের ভাবমূর্তিটি যেন
থাকে অবিচল, পূত, অক্ষয় ।

বাংলা কবিতা

প্রবাসী ।।

সে কোন যুগের এক ঊষালগ্নে
মনে আছে জননী জন্মভূমি ?
ভূমিষ্ঠ হয়ে মাত্র আম্বিলিক্যাল কর্ডটাকে
দু-হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলে
দিয়েছিলেম ছুট -
আর কোনদিন ফিরব না বলে,
কোনদিনও ফিরব না ।

সেই থেকে আমরা ঘরছাড়া
মা-হারা সন্তানের দল ।
মাঝে মাঝে শুধু একটা নস্ট্যালজিয়ার ব্যথা
সিগারেটের রিং-এর ধোঁয়ার মত
মোচড় খেতে খেতে গুমরে ওঠে
আকাশপথে, দূরে, বহুদূরে -
আর কোনদিন ফিরবে না বলে,
কোনদিনও ফিরবে না ।
৬ই এপ্রিল, ২০১৪ ।