Friday, August 22, 2014

কবিতা (সংকলিত) ।। কৃষ্ণের ফল খাওয়া ।।

কৃষ্ণের ফল খাওয়া ।।
দ্বিজহরি দাস

অবগতি শুন কিছু নিবেদন করি,
গোকুলে আনিল ফল এক মাগী বুড়ি
একটা ঝুড়ি হাতে ।
একটা ঝুড়ি হাতে, বসল পথে ফল গুচ্ছেক ঢেলে
ফল খাওসে, ফল খাওসে, ডাকে যত গোপের ছেলে

বাপু তোরা দৌড়ে আয়, বুড়ি তায় ডাকছে ঘনে ঘন-
শ্রীদাম বলে সুদাম ভায়া, বুড়ি ডাকছে কেন
কিছু তার বৃত্তান্ত -
কিছু তার বৃত্তান্ত বলে আনত, শোনরে গুণের ভাই,
বুড়ি কেন ডাকছে চল গুটি গুটি যাই,
চলিলেন সবে মিলে ।
চলিলেন সবে মিলে, গোপের ছেলে, মণ্ডা মুখের হাসি
পথের মাঝে ঝুড়ি হাতে যেথায় বুড়ি বসি
ধর গো ধর মুখে ।
ধর গো ধর মুখে, খাও সুখে, খেয়ে পাবে তার
মায়ের কাছে বুঝে আনবে ধার ।

চল মা আমার সাথে, ব্রজের পথে কিনে দিবি সে ফল,
দিবি কি না দিবি রানী তুই সত্যি করে বল
নতুবা তার উপায় করি -
নতুবা তার উপায় করি, ভাঙব হাঁড়ি, ভাঙব দুধের হালা
দুধ গড়িয়ে যাবে যখন তখন পাবি জ্বালা
এই বলে কাঁদেন হরি ।
এই বলে কাঁদেন হরি, দাও মা কড়ি, কাঁদেন যাদব রায়,
লোকের ছেলে মাকে বলে কত কিনে খায় ।

বাবা তুমি কেমন কথা বললে হেথা আমায় দিয়ে দোষ-
পাকা পাকা ফল আনিবেন ঘরকে আসুন ঘোষ,

আসুন নন্দ, কৃষ্ণচন্দ্র, ফল আনিবেন পাড়ি-
কেন বাবা গোপের ঘরের মজাইবে কড়ি ?
খাওসে ক্ষীরননী ।
খাও সে ক্ষীরননী, যাদুমণি, খেলি ডাক, সবে কর খেলা,
ঘর রইল, দুয়ার রইল, ধান রইল মেলা ।
আমি তো যাব জলে-
আমি তো যাব জলে, রানী বলে, কুম্ভ হাতে, যমুনাতে আনতে যাব জল-
দ্বিজহরি দাসে গাহে, ঠাকুর খাবেন ফল ।
* * *
লয়ে দুটি ধান্যকণা চলেন হরি যেথায় বুড়ির থান,
সন্তুষ্ট হল বুড়ি দেখে ভগবান ।
বাবা তুমি কাদের ছেলে, কাছে এলে এমন চাঁদের কণা,
যতগুলি ধান্য দিলে, সকলি হল সোনা ।
তুমি মানুষ নও, দেবতা হও, সকল দেবের সার,
পূর্ণব্রহ্ম গোপের ঘরে হলেন অবতার ।।

বাংলা কবিতা ।। গদি-কাহিনী ।।

গদি-কাহিনী ||


খিলখিল্লির মুল্লুকে আজ থাকত দু'খানা রাজগদি,
একখানা নিত কেজরিওয়ালা, আরেকখানায় ওই মোদী ।
তারপর এমন লাগত দুটোয়, তুই রাজা, না কি মুই রাজা !
দেশটা আমিই করব শাসন, তুই হোথা বসে ঢোল বাজা ।
সব ব্যাটাকেই হাড়ে হাড়ে চিনি, সবগুলো সেম, করাপ্টেড,
সব থানাতেই ঝুলছে তোদের নাম, নিচে লেখা 'ওয়ান্টেড' ।

আরে যা যা, আর তুই কিরে ব্যাটা, সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকিস,
কে কবে কোথায় চড় মেরে বসে, তাই মাফলারে মুখ ঢাকিস -
আমি পালোয়ান, গায়ে আলোয়ান, স্বামীজি শিষ্য, চায়-ওলা,
ঝোল ধরে তুই রাহুলের কাছা, তখতে বসবে এই পোলা ।
তারপরে জোর ধাঁই-ধপাধপ, আঁচড়কামড়, গালি-গালাজ-
শেষে দেখি দুটো গদি আছে পড়ে, নেই একটাও রাজাধিরাজ !
১৪ই মে, ২০১৪ ।

বাংলা ছোট গল্প ।। ছাগল বাবা ।।

ছাগল-বাবা ।।
(ছোট গল্প)
মাটির নীচ থেকে ড্রিল করে কোল-বেড মিথেন উৎপাদন প্রজেক্টের কাজে এসেছি ঝাড়খন্ডের ধানবাদ জেলার নিরসাতে । ২নং ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে যে রাস্তা শালুকচাপরা গ্রামের ভিতর দিয়ে বালিয়াপুর গেছে তার থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রিগ-রোড বানানো হয়েছে । মোরাম ঢালা কাঁচা রাস্তা, ফাঁকাই পড়ে থাকার কথা । অথচ রুট সার্ভে করতে এসে আমার তো মাথায় হাত । দলে দলে গ্রাম্য লোকেরা চলেছে ওই পথ ধরে, অন্ততঃ শ-দেড়েক তো হবেই । এদের পাশ দিয়ে জীপ নিয়ে যেতে হলেই তো দিন কাবার ! একটু নেমে খোঁজ নিলাম । ওরা যাচ্ছে ছাগল-বাবার কাছে আশীর্বাদ নিতে । অদ্ভুত নাম তো! তিনি আবার নাকি সাক্ষাৎ অশ্বিনীকুমারের অবতার- একেবারে ধন্বন্তরী । সর্দি-জ্বর-ম্যালেরিয়া-টাইফয়েড হেন রোগ নেই যা তাঁর বশ মানে নি । বোঝ ব্যাপারখানা ! নিরীহ গ্রাম্য লোকগুলোকে ঠকিয়ে ভালই জোচ্চুরির ব্যবসা ফেঁদেছে দেখছি লোকটা।
যাক্‌গে আমাদের কাজ তো শুরু হল । কিন্তু শুরুতেই ইচ্ছের বিরুদ্ধে একটা কাজ করতে হল আমাকে । একদিন রাত্রে আমাদের একটি লেবারকে কামড়াল পাহাড়ী বিছায় । মেডিকটি নতুন, তার আছে শুধু ফার্স্ট-এড সার্টিফিকেট, আর রিগের সামান্য স্টকে তেমন ওষুধ-বিষুদও নেই । নিকটস্থ হাসপাতাল অন্ততঃ ৫০ কিমি দূরে । এই অবস্থায় লোকজনেরা বলল, নেই মামা থেকে কানা মামা ভাল; আপনি ওকে একটু ছাগল-বাবার কাছে নিয়ে যান না- এই তো জীপে মিনিট পনের ।
অগত্যা তাই সই । বাবার ছোট্ট কুঁড়েয় গিয়ে দেখি বাইরে দুজন শিষ্য হামান-দিস্তা নিয়ে ওষুধ তৈরী করছে, বাবা ভিতরে । একজন গিয়ে ডেকে আনতে একটি অদ্ভুত-দর্শন মানুষ বেরিয়ে এল, যার মুখখানা ছাগলের মত, অর্থাৎ ছাগ-মুখোশধারী । কোন কথা না বলে উনি রোগীকে নিয়ে পড়লেন । কিছুক্ষণ ধোওয়াধুয়ি আর ঘষাঘষির পর আমাকে অবাক করে দিয়ে উনি দুটো ইঞ্জেকশন দিয়ে বললেন- টিটেনাস আর এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিলাম । বিষটাও এনেস্থেটিক ব্লীচ দিয়ে ধুয়ে দিয়েছি । তবে মনে হচ্ছে বার্ক স্কর্পিওন, তাই ২৪ ঘন্টা কিছু বলা যাবে না । এখন ও ঘুমোক, সকালে একটা আইবুপ্রুফেন দিতে হবে । আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি আমাকে কুঁড়ের ভিতরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন । তারপর মুখোশটা সরিয়ে নিতেই আমি 'অজামিল' বলে চেঁচিয়ে উঠলাম । আমাদের বন্ধু ডাঃ অজামিল দত্ত । শুনে গেলাম তার বিস্তারিত উপাখ্যান, সব শেষে ও মন্তব্য করল-
-ভুল চিকিৎসা করে নেতার মেয়েকে মারার অপরাধে আমার মেডিক্যাল লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হল । অথচ ভুল যে আমি করিনি তা আর কাউকে বোঝাতে পারলাম না । তাই 'হিপোক্রিটিক ওথের' মান রাখতে এই পথ বেছে নিয়েছি । এদেশে বুক ফুলিয়ে বেআইনি কাজ করতে গেলে হয় সাধু নয় নেতা সাজতেই হবে ।
-আর 'অজামিল'এর সাথে মিল রাখতে 'অজ' অর্থাৎ ছাগলের মুখোশ, তাই তো ? আমি হাসলাম ।
- তা তো বটেই, আসলে identity হারাতে তো আমি চাইনি ।
সে এক যুগ ছিল, যখন মহাপাপী অজামিল বুদ্ধি করে ছেলের নাম রাখে নারায়ণ । মৃত্যুকালে ছেলেকে ডাকার ছলে সেই নারায়ণের নাম করেই সে বৈকুণ্ঠলাভ করেছিল । জানিনা আমাদের এযুগের অজামিল পাপ করছে না পুণ্য, সে কি নিজের কর্মবলে স্বর্গলাভ করবে, না ঈশ্বরও শেষে নামগানের ঘুষ চেয়ে বসবেন !
মুম্বাই, ৭ই জুন, ২০১৪ ।

মনের মণিকোঠা থেকে ।।৭।।


জানুয়ারী মাস। নতুন বছরের নতুন সেশন শুরু হয়েছে। স্কুলের টিফিনের পরের প্রথম পিরিয়ডের ঘন্টা বাজলো। অনেকে যারা ক্লাসরুমে বসেই টিফিন খাই, বা চ্যাঁচামেচি, গান-বাজনা, টেবিলঠোকা, হই-চৈ, গল্পগুজব করি, চালিয়ে যাচ্ছি যথারীতি। এমন সময় পান মুখে বাংলা শিক্ষক হরিদাস স্যারের আবির্ভাব। জোরালো চুম্বকের উপস্থিতিতে লোহার চূর্ণগুলো যেমন ছোটাছুটি করে মুহূর্তের মধ্যে একভাবে একদিকে মুখ করে সেজে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখেছি ফিজিক্স ল্যাবে, ঠিক সেইভাবে আমরা যে যার জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কয়েকজন বাইরে রোদ খাচ্ছিল, তারাও ছুটে এসে ক্লাসে ঢুকে পড়ল। স্যার একবার খুশি হয়ে সবদিকটা দেখে নিলেন, তারপর নিজে বসে সবাইকে বসতে বললেন।
'তারপর, বাইরের রোদটা বেশ আরামের তাইনা?' উনি শুরু করলেন, 'ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হয় তো! আমারও হয়'। বলতে বলতে 'আসব স্যার?', শংকর, জিতু, তপেনের দলটা দরজায় এসে দাঁড়ালো।
'আসুন স্যার, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন?' স্যারের তির্যক খোঁচাটুকু গায়ে না মেখেই ওরা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ক্লাসরুমে।
'হাঁ, তা কি যেন বলছিলাম? রোদ্দুরের আরামের কথা। বুঝলে, টিফিন শেষ করে একটা পান মুখে নিয়ে আর কি টিচার্স রুমে ঢুকতে ভালো লাগে। হলের বাইরে বাঁধানো গাছ্তলাটিতে কিছুক্ষণ গিয়ে বসতেই হয়। শিক্ষকদের আড্ডাটা আজকাল সেখানেই জমে কিনা! আহা নরম রোদ্দুরে বসে কি আরাম। তা করতে করতেই টিফিন শেষ হবার ঘন্টা বাজে।' এটুকু বলে আমাদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেন হরিদাস স্যার। আমরা আজ ওনার কথার কোনো খেই পাচ্ছি না।
'তারপর ঘন্টা বাজানেওলা দারোয়ানটাকে হাঁক দিই, ক্যা রে হরিয়া, ঘন্টি মারনে কা বহুত জলদি হ্যায় তুঝে!'
সর্বনাশ, এ কথাগুলো তো কাল জিতু বলছিল দারোয়ানকে। তাকিয়ে দেখি, জিতুর মুখ ভয়ে চুন হয়ে গেছে। স্যার কিন্তু নিজের গল্প বলেই চলেছেন। 'তারপর ভাবলাম, দূর, এত তাড়াতাড়ি ক্লাসে গিয়ে কি হবে, ছেলেগুলো খামোখা আমাকে দেখে বিরক্ত হবে। ভেবে একটা সিগারেট ধরাই। খবরদার, মাস্টারমশায়দের নকল করতে হয় কর, তা বলে এই অভ্যাসটুকু তোমরা ধরো না দয়া করে। তা তার খানিক পরেই দেখি প্রিন্সিপাল বেরোচ্ছেন রাউন্ড দিতে। অগত্যা সিগারেটটিতে একটা সুখটান দিয়ে ওটা ফেলে আসি ক্লাসরুমে। ততক্ষণে দশ মিনিট দেরী হয়ে গেছে।'
'কিন্তু স্যার, আপনি তো ঠিক সময়েই আসেন ক্লাসে, কখনো তো দেরী হয় না!' শ্রীমান শংকরের উক্তি। ও কেন জানিনা স্যরের কথাগুলোর মধ্যে একটা বিপদের গন্ধ পাচ্ছে।
'কিন্তু শ্রীমদশঙ্করাচার্য, সেকথা তোমার তো জানার কথা নয়!' এবার তিনি নিজের রূপে এলেন। 'তোমাদের তো তখন গুলিডান্ডা নয় পিট্টুখেলা চলছে। সময়ে ঘন্টা বাজানোর জন্যে দারোয়ানকে ধমকানো, বা পানদোকানের পেছনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানা, সে যেই করে থাকুক, আজ না হোক কাল প্রিন্সিপালের নজরে পড়বেই। এ শহরে, এই স্কুলে বাঙালিদের যেটুকু সুনাম আছে তাও কি থাকতে দিবিনা তোরা!'
উফ, এতক্ষণে স্যর 'তুমি' থেকে 'তুই' তে ফিরে এসেছেন। কি ভালই যে লাগলো শুনতে!

২৭শে জুন, ২০১৪

Thursday, June 5, 2014

বাংলা অণু-গল্প ২৫- ইজ্জত

।। ইজ্জত ।।

'তুই লিবি আর দু-টান...আরে, উট কে বটে?' ধনঞ্জয় দেখতে পেয়েছে মেয়েটাকে । ক্ষয়াটে গড়নের একটি যুবতী, বয়স ষোল থেকে ছাব্বিশের মধ্যে, এর বেশী বোঝার উপায় নেই । একটা আদ্যিকালের ভাঙ্গা কুঁড়েঘরে একা বসে কাঁদছে আর শীতে কাঁপছে ঠক্‌ঠক্‌ করে । ধনঞ্জয় ও ঝন্টুচরণ অন্য গ্রাম থেকে বরযাত্রী এসেছে নিত্য ঘোষালের মেয়ের বিয়েতে । দলের গুরুজনদের এড়িয়ে বিড়ি ফুঁকতে একটু বাইরের দিকে অন্ধকারে এসে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় দেখতে পেয়েছে মেয়েটাকে । তাদের যা জানার কথা নয়, মেয়েটার নাম তক্‌লি । ঠাক্‌মা বুড়ীর সাথে থাকত ঐ ভাঙা ঘরে, তা সেই ঘরের একদিকটা চাপা পড়েই বুড়ীটা গেছে গত সপ্তাহে । এখন শীত আর খাবারের থেকেও তার বেশী চিন্তা গাঁয়ের ওই ক্ষুধার্ত নেকড়ের দঙ্গল থেকে নিজেকে বাঁচায় কিভাবে ।
'লে, লে, চাঁঢ়ে চ টান্যে লিয়ে...জাড় লাইগছে' ঝন্টু সরু গলায় চেঁচিয়ে উঠল । বিড়ি-টানা শেষ করে তার শিগ্‌গির বিয়ের আসরে ফেরার ইচ্ছে, লগ্নের সময় হয়ে আসছে ।

ওরা খেয়াল করেনি ওদের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ঐ গ্রামেরই কটা নেকড়ে, দুর্দান্ত মাঘের শীতকে পরোয়া না করে ।
'কি বে, ভিন্‌ গাঁয়ে আস্যে রস হয়েঁছে', ঝণ্টুর কলার চেপে ধরল একজন ।

'ক্যানে, কি হয়েঁছে, আমরা বরযাত্রী', ধনঞ্জয় বুঝতে চেষ্টা করল ভুলটা কি এবং কোথায় হল ।
'তবে আর কি, মাথাট কিনে লিয়েছিস্‌' একজন একটা চড় কষাল ধনার গালে, 'শালা, খালভরা, আমাদের গাঁয়ের বিটিছিলাকে টান্যে লিবি ! ই গাঁয়ের কি কুন ইজ্জত নাই ?'

ইতিমধ্যে গোলমালের খবর পেয়ে বরযাত্রীর দলও এসে পড়েছে । অনেক হৈ-চৈ হাঙ্গামার পরে দু-পক্ষই বুঝতে পেরেছে ভুলটা কার । কিন্তু উঠতি বড়লোক বলেই হোক বা সুন্দরী মেয়েকে ভিন্‌গাঁয়ে বিয়ে দিচ্ছে বলেই হোক, দেখা গেল নিত্য ঘোষালের শত্রুর অভাব নেই, গোলমালকারীরা কেউ আপসের ধার দিয়ে গেল না । ফলে মাঝরাত্রের কিছু পরে বরপক্ষ বর তুলে নিয়ে চলে গেল ।

খবরটা পাওয়া গেল সেই রাত্রেই ভোরের দিকে । দু-দিনের অভুক্ত হতভাগী তক্‌লি জ্বরতপ্ত অবহেলিত শরীরটাকে ভাঙা বাসাটাতে ফেলে রেখে রওনা দিয়েছে ওর ঠাক্‌মার কাছে ।

মুম্বাই, ৫ই জুন, ২০১৪ ।

বাংলা ছোটগল্প ।। বিবাহ-বার্ষিকী ।।

।। বিবাহ-বার্ষিকী ।।

বহুকাল পরে বাঁকুড়া এসেছি । না, উপলক্ষ্য কিছু নয়, ভগ্নীপতি এখানে বদলি হয়ে এসেছে এবং একটি মারুতি অল্টো কিনেছে । বোনের খুব ইচ্ছে একবার ওদের আস্তানাটা দেখে যাই । দোলের পরে কলকাতায় একটা কাজে এসে সময়ও হয়ে গেল, দুর্গাপুর ঘুরে টুক করে বাঁকুড়া চলে গেলাম । শহরটা বিশেষ বদলায়নি মনে হল, তবে রাস্তাঘাটে ভীড় অনেক বেড়েছে ।
'হ্যাঁরে, তোদের এখানে মাল্টিপ্লেক্স কালচার এসে পড়েছে না সেই পুরনো সিনেমাঘর গুলোই রয়ে গেছে ? সেই বীণাপাণি, চণ্ডীদাস...' আমি বোনকে শুধোলাম ।
'বাবা, তোর এখনো মনে আছে ? না, মাল্টিপ্লেক্স এখনও আসেনি, তবে এই এল বলে । পুরনো হলগুলোর খুব বাজে অবস্থা,' পাপিয়া বলল ।
'চন্ডীদাস আর কদিন পরে বোধহয় কোল্ড-স্টোরেজ হয়ে যাবে।' ভগ্নীপতির সরস মন্তব্য, 'তা দাদার কি কোনও সেন্টিমেন্টাল এটাচমেন্ট আছে নাকি......?'
'আছে বৈকি', আমি হাসলাম । ছুটিছাঁটাতে মাঝে মাঝেই পিসীর বাড়ি চলে আসতাম আর টো-টো করে ঘুরে বেড়াতাম প্রায় সমবয়সী দিদি শীলার সাথে, অবশ্য জন্মে কখনও ওকে দিদি বলি নি । পিসেমশাই ছিলেন এসিস্ট্যান্ট আর-টি-ও । একদিন দুজনে চন্ডিদাস থেকে সিনেমা দেখে ফিরে খুব বকুনি খেলাম । না বলে সিনেমা যাবার জন্যে নয়, হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম বলে । যত বোঝাই 'হিন্দুস্তান কি কসম' দেশভক্তির ছবি, পিসেমশাই তবু মানেননা, আমার ছেলেমেয়েরা শেষপর্যন্ত হিন্দি সিনেমা দেখছে...ছি, ছি, রুচি কোথায় নেমে গেছে !
'দাদা মনে হচ্ছে পুরনো দিনে হারিয়ে গেছে', অজিত আমার হুঁশ ফিরিয়ে আনল, 'আমি বলি কি, রঙ্গিন মুঘলে-আজম লেগেছে, গিয়ে দেখে এসো, আমার নতুন গাড়িটারও ট্রায়াল হয়ে যাক্‌ ।'
'ক'টা বাজে খেয়াল আছে?' পাপিয়া বলে, 'ইভনিং শো-এর আর টাইম নেই' ।
'নাইট শোই যাই না, তোরাও তৈরি হয়ে নে, একসাথেই বেরোনো যাবে ।' আমি বলি ।
'সে উপায় কি আছে? এখুনি একদল এজেন্ট আসবে, সেলসট্যাক্সের নতুন নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনার জন্যে। তারপর ছেলের স্কুল খুলছে, ওকে কাল ভোরে পুরুলিয়ার বাসে তুলে দিতে হবে । তুমি সে জন্যে ভেব না, রাস্তাঘাট যদি মনে আছে তাহলে নাইট শো কোনও সমস্যা নয়, এইত পাটপুর থেকে তিন কিলোমিটারেরও কম', অজিত বলল । ওদের ছেলে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে হস্টেলে থেকে পড়ে ।
সিনেমা তেমন ভাল লাগছে না, বাইরের লাউঞ্জে এসে একটা সিগারেট ধরিয়েছি । এখান থেকে দশ বারো কিলোমিটার দূরে ছাতনা গ্রামে বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাসের ভিটে ছিল, মা বাশুলির মন্দির এখনও আছে । তাকিয়ে দেখছি, মনে হচ্ছিল, এখানে তাঁর একটা আবক্ষ মূর্তি ছিল, নীচে লেখা থাকত, 'চন্ডীদাস চিত্র-মন্দির'; শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের করকমলে উদ্ঘাটিত, ও শেষে ১৩৩৪ সনের একটা তারিখ । নিজের মনেই ভাবছি কোথায় গেল সেটা, এমন সময় পাশ দিয়ে সাঁ করে একজন ওয়াশ-রুমে ঢুকে গেল । মুখটা খুব চেনা ঠেকল, কিন্তু চিনতে পারলাম না ।
হঠাৎ লোডশেডিং । এ জিনিষটা মফঃস্বল শহরগুলোতে একটা চিরস্থায়ী সমস্যা । তবে এদের জেনারেটার আছে হয়ত, অন্ততঃ একটা এমার্জেন্সি আলো চট করে জ্বলে উঠল । সেই মুহূর্তে এক সুন্দরী মহিলা 'পালন, তুমি কোথায় গেলে, পালন' বলতে বলতে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন । আমার মাথায় কি এল, বলে বসলাম, 'আপনি কি পালন মুখার্জিকে খুঁজছেন ?'
'আপনি চেনেন তাকে, দেখেছেন ?'
'আমার স্কুলের বন্ধু । যাকে দেখলাম, যদি সেই হয়, তবে একটু আগে ওয়াশ-রুমের দিকে যেতে দেখলাম । ওই তো এসে পড়েছে ।'
'আরে সলিল না? উঃ, কুড়ি বছরের উপর হয়ে গেল...কোথায় আছিস? বাঃ, দিব্যি তো আমার বৌএর সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছিস । আগে থেকে চিনতিস নাকি?' নিজের রসিকতায় হা হা করে হেসে উঠল পালন।
'সব কথা পরে হবে ।' আমি বললাম, 'তোরা কি এই পচা বইটা পুরোটা দেখবি, না গল্প করবি এখন? আমার আর সিনেমায় ইন্টারেস্ট নেই । হলটার সাথে একটা নস্টালজিক ফীলিং জড়িয়ে ছিল, সেসব হয়ে গেছে ।'
'আমাদের তো সিনেমা দেখতেই হবে, বছরে একটা দিন । তবে এবার ফেরা যেতে পারে ।'
পালন গাড়ী বা স্কুটার আনেনি, বলল, স্কুটার আর চালায় না, আর গাড়ী কেনার পয়সা নেই । ও আর পলা, হ্যাঁ, ওর স্ত্রী, আমার গাড়ীর পিছনে বসল । পালন একটু আপত্তি করছিল, সেই প্রতাপবাগান নর্থে ওরা থাকে; ভজন জ্যেঠু, মানে লালনদা আর পালনের বাবা ওখানে সস্তায় জমি পেয়ে একখানা বাড়ি করে ফেলেছিলেন- আমি আপত্তিতে কান দিইনি, গাড়ী থাকলে প্রতাপবাগান-পাটপুর সব সমান ।
'আমার তো আর পড়াশোনা হল না, আই-টি-আই করে হলদিয়ায় ঢুকলাম এপ্রেন্টিস হয়ে । সেও প্রায় বাইশ বছর হয়ে গেল ।' নিজের জীবন-বৃত্তান্ত শুরু করল পালন ।
'কিন্তু তোকে দেখে কেউ বলবে না, চল্লিশ পার করেছিস । পলাকেও না । অন্ততঃ দশ বছর কম মনে হয় । ব্যাপারখানা কি?'
'আমাদের বয়স বাড়ার ঘড়িটা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি' বলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল পলা ।
'না রে সত্যি । দ্যাখ, সিগারেট খাই না, জীবনে একবারই খেয়েছিলাম...তাছাড়া আমরা দুজনেই স্পোর্টসম্যান ছিলাম । তবে তোকে একটা কথা বলা হয় নি, আমাদের আজ বারো নম্বর বিবাহ-বার্ষিকী । ছেলেপুলে নেই, এই দিনটা আমরা প্রতি বছর চন্ডীদাসে সেলিব্রেট করি ।'
'তাই নাকি ? তাহলে তো একটা স্পেশ্যাল অভিনন্দন তোদের পাওনা ।' আমি বললাম ।
কিন্তু ব্যাপার কি, পাঠকপাড়া ছাড়িয়ে বাই-পাসে ঢুকেছি অনেকক্ষণ হল । এখনও প্রতাপবাগান আসার নাম নেই । 'এই ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো', আমি পিছনে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম ।
'তুই ঠিক রাস্তায় আছিস, আমরাই রাস্তা ভুলে গেছিলাম', বলেই যুগল হাসি পেছনের সীট থেকে । রহস্যজনক সে হাসি আর থামতেই চায় না । কি সন্দেহ হওয়ায় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমের স্রোত নেমে গেল...পিছনে সীট তো ফাঁকা ! কোথায় কি করে নামল ওরা ! ভয়ে, আতঙ্কে আমি সজোরে ব্রেক কষলাম ।
একটু সম্বিত ফিরতেই দেখি গাড়ীর চারপাশে এত রাতেও একটা ভীড় জমা হয়েছে । এক টাকমাথা মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক দেখি সামনের বাসা থেকে গাড়ীর দিকে এগিয়ে আসছেন । পালন না? উঁহু, ওর আবার টাক কোথায়! এবার চিনতে পারলাম, লালনদা । তাঁকে এগিয়ে গিয়ে আমার কাহিনী শোনালাম ।
'হুঁ, ঠিকই আন্দাজ করেছি', লালনদা বললেন, 'তুমি নিশ্চয় বহুদিন পরে পালনকে দেখলে?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রায় বিশ বছর পরে । লাস্ট দেখেছিলাম ওর তখন কুড়ি-বাইশ হবে ।'
'কিন্তু ওর বয়স যে ত্রিশের বেশী এগোয়নি সেটা লক্ষ্য করোনি । যাক্‌, বড় দুঃখের সে গল্প । শুনতে চাও?'
'অবশ্যই, যদি আপনার কোনও আপত্তি না থাকে । ভজন জ্যেঠু বাড়ি নেই ?'
'না, তিনি গেছেন পাঁচ বছর হল, মা দশ বছর আগে । তার আগে বড় হাসিখুশি ছিল আমাদের পরিবার । পালনটা লেখাপড়া বেশী শেখে নি, কিন্তু ভাল খেলোয়াড় ছিল, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন দুটোই ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে খেলত ।'
'সে তো আমরা জানি, ওই সূত্রেই তো হলদিয়ায় সহজে চাকরিটা পায় ।'
'ঠিক । বার বছর আগে এই দিনে ওদের বিয়ে হয় । বৌমা এখানকারই মেয়ে । বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে পালন একটা সম্পূর্ন কোয়ার্টার পেয়ে ঠিক করে ওকে নিয়ে যাবে হলদিয়া । খুব ভাল কথা । আমি বললাম, এবার তোরা একটু ধুমধাম করে বিবাহবার্ষিকীটা কর, তারপর বৌমাকে সাথে করে নিয়ে যা । খাওয়াদাওয়া গল্পগুজব মিটল প্রায় সাড়ে আটটায় । ইতিমধ্যে এক বন্ধু হাতে গুঁজে দিয়েছে দুটো নাইট শো-এর টিকিট আর একজন একটা দামী সিগারেটের প্যাকেট । পালন কখনও স্মোক করেনা কিন্তু কি ভেবে একটা ধরিয়ে স্কুটার স্টার্ট দিতে গেছে, সাথে বউমা । কেন গাড়ী স্টার্ট নিচ্ছেনা দেখতে পালন পেট্রল ট্যাঙ্কের ঢাকা খুলে দেখতে গেছে তেল আছে কিনা । চরম বোকামি । সিগারেটটা ঠোঁট থেকে খসে সেই মুহূর্তে ট্যাঙ্কের ভিতর ।'
'তারপর?'
'তারপর আর কি ? বিরাট একটা বিস্ফোরণ । পালন তো অন দ্য স্পট শেষ । বৌমা হাসপাতালে চোখ বোজার আগে আমার স্ত্রীকে বলেছিল, দিদি, টিকিট দুটো আমি নষ্ট হতে দেব না, তুমি দেখো ।'
'তাহলে আমি চণ্ডীদাসে যাদের দেখলাম...'
'ওরাই। অনেকেই দেখেছে এখানে, শুধুমাত্র এই দিনটিতে । খবরের কাগজে বেরিয়েছিল ঘটনাটা, অবশ্য তুমি তো বাইরে বাইরেই আছো । যাক্‌গে, অনেক ধকল গেল, গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবে ত? তোমার বোনের বাড়িটি যেন কোথায় ? চা খাবে না কি আরেক কাপ? একদিন এসো এ বাসায় বোন-ভগ্নীপতিকে নিয়ে ...।'
লালনদা অনেক কিছু বলে যাচ্ছেন, বুঝতে পারছি ওনার ঠোঁট নড়া দেখে । আমার কানে কিন্তু আর কিছুই ঢুকছে না ।
মুম্বাই, ২০ মে, ২০১৪ ।

Sunday, April 13, 2014

Translated Poem - English to Bengali

"I Am Not Yours"
Tarun Ganguli


I am not yours, not lost in you,
Not lost, although I long to be
Lost as a candle lit at noon,
Lost as a snowflake in the sea.

You love me, and I find you still
A spirit beautiful and bright,
Yet I am I, who long to be
Lost as a light is lost in light.
Oh plunge me deep in love -- put out
My senses, leave me deaf and blind,
Swept by the tempest of your love,
A taper in a rushing wind.

তোমার নইক আমি

তোমার নইক আমি, তোমাতে হারাইনিক কভু
দিনের প্রদীপ-সম, রবির উজল আলো সেথা
ব্যর্থ করে অগ্নিশিখা, লুপ্ত হতে চেয়েছি যে তবু, 
অথবা সাগর জলে হারায় তুষার-কণা যেথা।

ভালবাস তুমি মোরে। তোমার অন্তরে আমি পাই
লাবণ্য-প্রতিমা এক, দীপ্তিময় সুন্দর মূরতি;
আমি শুধু তার মাঝে নিঃশেষে বিলুপ্ত হতে চাই,
জ্যোতিপুঞ্জ মাঝে দীপ আপনারে হারায় যেমতি।

তোমার নিবিড় প্রেমে ডুবাও্ হে লুপ্ত করে মম
চেতনার অনুভূতি, দাও করে অন্ধ বা বধির
তোমার প্রবল প্রেম উন্মত্ত ঝড়ের হাওয়া সম,
যেন করে আত্মসাৎ এ হিয়ার মলয়-সমীর।


April 12th, 2014.