Saturday, October 13, 2018

মুম্বাইয়ের শারদোৎসব - অণু-প্রবন্ধ

মুম্বাইয়ের শারদোৎসব 
( অণু-প্রবন্ধ)


     মিলেনিয়ামের গোড়াতে বাংলার শিল্প-শিক্ষাক্ষেত্রের সংকোচনের ফলে বাঙালি মেধাবী-বুদ্ধিজীবির দল ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বাংলার বাইরেমুম্বাইকেও একেকসময় মনে হয় বৃহত্তর পশ্চিমবঙ্গের অংশপূর্ব আন্ধেরীর যে মহাকালী-গুহা অঞ্চলে পাহাড়-জঙ্গলের মাঝে কেউ থাকতে চাইত না, তা এখন জমজমাট। সাকি-বিহারজেভিএলআরওয়েস্টার্ণ হাইওয়ে আর আন্ধেরি-কুর্লা রোড দিয়ে ঘেরা এই অঞ্চলে এত বাঙালী, অথচ পুজো নেই। ফলস্বরূপ ২০০১-এ প্রতিষ্ঠিত হল 'মহাকালী সার্বজনীন দুর্গোৎসব সেবা সমিতিবা MSDSSততদিনে বৃহত্তর মুম্বাইয়ে ছোটবড় মিলিয়ে দুর্গাপুজোর সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে আর তার মাঝে এই পুজোও নিজের স্থান করে নিয়েছে।

আমাদের শারদোৎসব শুরু হয়  দেবীপক্ষের সূচনায়  শারদপ্রভাতের পুণ্যলগ্নে মঙ্গলশঙ্খধ্বনির সাথে পুজোমণ্ডপে  একত্রিত হয়ে রেডিওতে 'মহিষাসুরমর্দিনীশুনে, সঙ্গে গরম চা-সিঙ্গাড়া-জিলিপি। চতুর্থীর সকালে সত্যনারায়ণ পুজো, সেদিনই দেবীমূর্তি এনে স্থাপন করা হয় পূজামণ্ডপে। পঞ্চমীতে আনন্দমেলা- সদস্যরা কিছু মুখরোচক রান্না করে নিয়ে আসেনতা বিক্রী হয়- লাভ নয়নিছক আনন্দলাভের জন্যে। মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী পুজো হয় বিধিমত শুদ্ধাচারে, ত্রেতাযুগের রামচন্দ্রের অকালবোধনের রীতি যথাসাধ্য মেনে। জানিনা মানসে নীলপদ্ম এখনও ফোটে কিনাতবে এখনও ১০৮টি শতদলে সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয় এখানে। বিজয়াদশমীতে ঘট বিসর্জনদধিকর্মা, সিঁদুর খেলা হয় দেখবার মততারপর প্রতিমা বিসর্জিত হয় জুহুর সমুদ্রে। ফিরে আসার পর শান্তিজলবন্ধুদের মধ্যে কোলাকুলিশেষপাতে থাকে সবার জন্যে মিষ্টি।

প্রবাসের শহরগুলোতে আগে কেউ দেবী-মূর্তি বা তার সাজসজ্জা বা আলোকসজ্জা নিয়ে মাথা ঘামাত নাথীম নামক বস্তুটির কথা ত ছেড়েই দিলাম। সবাই মিলে আড্ডাখাওয়াখাওয়ানো আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- এই ছিল প্রধান। এখানে আমরা শুদ্ধসত্বাচারে পুজো করা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকাশন থেকে বাংলা বইপত্র এনে স্টল খুলে বসি শুধুমাত্র বাংলাভাষাপ্রেমীদের প্রবাসে মানসিক তৃপ্তিদানের খাতিরে, লাভ-লোকসানের হিসেব না রেখেএছাড়া বাঙ্গালি-রসনার তৃপ্তির জন্যে স্পনসর্ড ফুড-স্টল, আর থাকে কলকাতা-মুম্বাই থেকে নামী-দামী শিল্পীদের নিয়ে বাংলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানএছাড়া আর কিছু না-  প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং- জীবে প্রেম আর জিভে প্রেম। খাও আর ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে নির্বিচারে তিনদিন ধরে পেট পুরে মায়ের প্রসাদ খাওয়াওআমরা মায়ের ভক্ত একটি মানুষ বা মনুষ্যেতর প্রাণীকেও অভুক্ত রাখতে চাইনা পুজোর এই ক’দিন!
রসিকতা নয়আলোকসজ্জা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে খরচ করতে চাইলে কোটি টাকাও কমঅথচ মুম্বাইয়ের মত মহানগরের কেন্দ্রস্থলে আমরা দেখতে পাই প্রতি বছর অন্যুন ৩০% ছাত্রছাত্রী অনুদানবিহীন স্কুলগুলি ছেড়ে কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ছেদরিদ্র বাবা-মা পড়ার খরচ জোগাতে হিমসিম খাচ্ছেন। এদিকে আমরা সুখে আছিআমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল-কলেজে পড়ছেভাল কোচিং বা গাইডেন্স পাচ্ছে। কিন্তু 'যারে তুমি পিছে রাখ সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে'- সবাইকে একসাথে টেনে নিয়ে না চললে সত্যি কি এগোন যায়তাই তো আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার উদ্দেশ্যপূরণের জন্যে এই দুর্গোৎসব সমিতির শক্ত ভিতের উপর আমরা একদিন শুরু করেছিলাম 'শিক্ষা কি আশা', আশেপাশের আন-এইডেড স্কুলগুলিতে ড্রপ-আউট রুখতেমেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যেন শেষ পর্যন্ত তাদের যোগ্যতানুযায়ী পড়ার সুযোগ পায় আর বিশেষতঃ কোনও ছাত্রীকে যেন দারিদ্র্য বা অন্য কারণে পড়া না ছাড়তে হয় মাঝপথে, একথা মাথায় রেখে। আমাদের এই কার্যক্রম ২০০৯-তে শুরু হয়েছিল দুটি বিদ্যালয়ের দশটি ছাত্রকে অনুদান দিয়েএখন তার পরিধি প্রায় ৩০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য ও সহৃদয় বন্ধুদের একান্ত সহযোগিতায়। এসবের সঙ্গে হয়ত পূজার কোনও সম্বন্ধ নেইতবে মুম্বাই যে শুধুমাত্র 'বানিয়া'দের শহর নয়এর একটা হৃদয় আছে জানতে পারি, যখন আমাদের সাহায্য পেয়ে ছাত্রছাত্রীর অভিভাবক বা স্কুলের হেডমাস্টার এসে ধন্যবাদ জানিয়ে যায়। প্রত্ত্যুত্তরে তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে বলি মা আনন্দময়ীকে, বিদ্যাদায়িনী সরস্বতীকেতাঁর পুজো ত তখনই সার্থক হবে যখন কোনও কাঙালির মেয়ে মুষ্টিভিক্ষার জন্যে ধনীর দুয়ারে এসে আর দাঁড়াবে না।      

Sunday, April 15, 2018

অভিজ্ঞতা। (সনেট)

অভিজ্ঞতা।
(সনেট)


এতক্ষণে, দিদিমণি কহিলা হরষে,
বুঝিনু কেমনে জেতা যায় ভোট-রণে।
উন্নয়ন-শিল্পায়ন, যত বাজে কথা-
বাঙালী চাকুরি হ'তে সহস্র যোজনে...
দাঁড়ায়ে পাড়িবে গালি শিল্পপতি জনে,
বুর্জোয়া তারা তো সবে। এসেছে লুটিতে
এই বঙ্গপ্রদেশের মামাটিমানুষে।
শিল্প নয়, কাজ নয়, চায় যে জু্টিতে
বাইক-বাহিনী রূপে; কিম্বা সিণ্ডিকেটে।
দু-টাকায় চাল দাও, ক'টা সাইকেল
ক্লাবে দাও অনুদান দুই-চা্রি লাখ।
এই ছন্দে লিখে গেছে কবে মাইকেল!
কিবা 'পয়োজন' মোর এলিট ভাষায়?
স্ল্যাং মেরে কাজ্জোসিদ্ধি- যা বোঝে চাষায়!

জয় বাবা ভোটনাথ- অণুগল্প

জয় বাবা ভোটনাথ!
অণুগল্প

'ভোট এস্যেছে। কাল গরুর গাড়ি লিয়ে আইসব, খুড়িমা-জ্যেঠিমারা সব ভোট দিতে যাবেন গো'- হাঁক দিল মটর, বাবুগাঁয়ের মটর দত্ত। এ সেই ছাপ্পান্ন, না না, বোধহয় সাতান্নর বাংলার নির্বাচন। ছাপ্পা-ভোট ছিল কিনা জানিনা, তবে কংগ্রেসেরই বোলবালা তখনও।
ভৈরব ঘোষালের বুড়ি বেধবা রাজেশ্বরী, যাঁকে গাঁয়ের ছেলে-ছোকরারা ডাকে রাজু-বুড়ি, সামনে অবশ্য রাজু-ঠাম্মা, তিনি মটরকে ডেকে ভোটের খবরাদি নিলেন। 'হ্যাঁরে, ভোট দিলে কি হয়?' তাঁর প্রশ্ন। 'পেরজাতন্ত্রে ভোট বড় যন্তর ঠাম্মা, নিজের রাজা নিজেই বাছো, ইচ্ছেমত কাজ করাবে তার পর।' এর বেশী কি মটর নিজেই জানে, ছাই? তবে বুড়ীর অত শোনার শখ নেই। গতমাসে তাঁর একমাত্র পুত্র সুদামের তিন নম্বর কন্যা জন্মাবার পর থেকেই ছেলের জন্যে পুন্নাম নরকের ভয় চেপে বসেছে বুড়ীর মনে, নানা জায়গায় মানত করে যাচ্ছেন তিনি ক্রমাগত।
যথাসময়ে গাঁয়ের বউ-ঝিরা রাজু-ঠাম্মার নেতৃত্বে সদলবলে এসে ভোটগাড়ি, থুড়ি, গরুর গাড়ির সওয়ার হলেন। পুরুষরা আগেই রওনা হয়ে গেছে হেঁটে বা সাইকেলে। গোবিন্দপুরের ইস্কুলে যখন পৌঁছল তারা, বেলা বেড়ে গেছে, সুয্যিমামা সওয়ার মাথার উপরে। না, মেয়ে-বউদের আলাদা লাইন হলেও বয়েসের সম্মানে ঠাম্মাকে লাইন দিতে হলনা, গদাই আর পটলা- কংগ্রেস আর জনসঙ্ঘের এজেন্ট, তখনও ছিপিম বা সিপিএম নামেনি মাঠে, ধরাধরি করে নিয়ে এল রাজুবুড়িকে পোলিং বুথের ভিতরে। 'ওটা কি মাখায় রে আঙ্গুলে? সিঁদুর লয় তো? আমি বেধবা মাগী, সিঁদুর পরাস নে যেন হতভাগা!' আঙ্গুলে টিপ পরার পর ঠাম্মা বাক্সের দিকে এগিয়ে গেলেন। আদ্রার পোস্টমাস্টার সেনবাবু, প্রিসাইডিং অফিসার, যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে বুড়ীকে ধরে ধরে নিয়ে গেলেন বাক্সর কাছে- 'মাসিমা, এই কাগজটায় আপনার পছন্দমত চিহ্নে ছাপ মেরে...হ্যাঁ, এভাবে মুড়ে বাক্সে ফেলবেন। আমরা বাইরেই আছি, কোনও দরকার হলে ডাকবেন।' ঠাম্মা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন বাক্সের দিকে।

কিন্তু, একি! বুড়ী আগে গিয়েই ভোটবাক্সকে সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ করলেন। তারপর আঁচলের গিঁঠ খুলে বের করলেন সওয়া পাঁচ আনা পয়সা, ফুল বেলপাতা, চারটি দুর্বাঘাস, সিঁদুর আর বাতাসা। ভাল করে ভোটবাক্সে সিঁদুর মাখিয়ে তিনি ছাপমারা কাগজটি বাক্সে ফেললেন। তারপর নমস্কার করে মানত করলেন- 'হেই ভোটবাবা, ভোট তো দিল্যম। দেখো বাবা ইবারে যেন আমার সুদামের একটি ব্যাটা হয়'।
বলা বাহুল্য, হতভম্ব সেনবাবু আরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন যখন যাবার আগে ঠাম্মা তাঁকে পুরুতের বরাদ্দ সোয়া-পাঁচ আনা দক্ষিণা হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলেন।

খেলা, আমি নেই।। কবিতা

খেলা।

পাখিটা বুনেছে বাসা গাছের কোটরে,
খড়কুটো, লতাগুল্ম এটা-ওটা ভরে
শিল্পশোভার কি অবাক নিদর্শন
দেখে মন শান্ত হয়ে থাকে কতক্ষণ?
...
চাকরকে পাঠালেম, গাছের উপরে
বাসাটা কোটর থেকে নিয়ে এল পেড়ে।
খানদুই ডিম ছিল, কী হবে তা দিয়ে!
দিই ফেলে, বাসাখানা যত্নে আসি নিয়ে।

বাবুই পাখির বাসা আমার দেয়ালে
শোভা পায়, আমি থাকি আপন খেয়ালে,
হরিণের ট্যাক্সিডার্মি, বাঘছাল খানা
আছে গজদন্ত বান্দীপুর হ'তে আনা।

এ খেলা সবাই খেলে সারা দুনিয়ায়
তোমার কষ্টে মোর কী বা আসে যায়!
তোমার প্রাণের চিন্তা, আমার দেয়ালা
চিরকাল ধরে চলে এ করুণ খেলা।


আমি নেই।

আমি নেই এ জগতে, ট্রামখানা চলে গেছে
চুকিয়ে তাহার ঋণ। কখন-
তা বলে তো থেমে নেই কিছু!
অবশ্য হয়েছে কিছু অদলবদল কিছু ইতরবিশেষ;
কার্তিক মাসের মাঠে মহীনের ঘোড়াগুলি
খেত ঘাস, আজ তারা নেই।
মহীন চালায় অটো উল্টোডাঙার রুটে-
ভুলে গেছে , আজকাল চেনে না আমাকে!
ধানসিঁড়ি কোথা কে বা জানে, মনে নেই,
জানি আছে ইছামতী-বিদ্যাধরী-হোগল-মাতলা।
শঙ্খচিল, সোনালি ডানার চিল-
নিশ্চিন্তে উড়ে করে এপার ওপার।
সন্ধ্যা নামে।
ডানায় রোদের গন্ধ মুছে ফেলে চিল।
খেটে খাওয়া মজুরের দল বর্ডারের সেপাইকে প্রণামীটা দিয়ে ফেরে ঘর কাঁটাতার পারে,
পাশে আজ নেই কেউ। তবু ভাবি সেকি বসে আছে
নাটোরের আত্রাই নদীর তীরে? সব ভুল-
কেউ বসে নেই!

রাতের গাড়ি।। কবিতা

রাতের গাড়ি।।
পল্লব চট্টোপাধ্যায়

সশব্দে চলেছে রাতের গাড়ি
ঘুমিয়ে পড়া গ্রামগুলোর বুকের উপর দিয়ে,
নৈশ নিস্তব্ধতাকে খান খান করে।
মাঝে মাঝে কোন খালি প্লাটফর্মের ধারে...
দেখা যায় ছোট ছোট লাল ঘরবাড়ি,
জানি ওগুলোতে ইস্টিশনের বাবুরা থাকে
গার্ড-সায়েব, স্টেশন মাস্টার, টিকিট চেকার।
এখন ওগুলোকে দেখে মনটা খারাপ লাগছে,
ওদের পরিবার এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন
দেখল না তারা আজ রাতের জগতটাকে।

হঠাৎ আকাশ থেকে একটা তারা খসে পড়ে,
নাকি অজানা গ্রহের থেকে আসা উড়ন্ত পিরিচ;
হয়ত কিছু এলিয়েন আছে তার মধ্যে।
তারাও আজ দু-চোখ ভরে দেখছে
ঘুমন্ত এই গ্রহের নিষ্পাপ সৌন্দর্য।
ওরা বুঝি নিজের বিশ্বে ফিরে জানাবে অন্যদের
এই পৃথিবীতে কত শান্তি, কত আনন্দ।
আমি তাকিয়ে থাকি রেলগাড়ির জানলা দিয়ে
আকণ্ঠ পান করি নিবিড় একাকীত্বকে।

কাল সকাল হলেই আবার মানব-মিছিল,
কল-কারখানার জঙ্গী ধোঁয়া, বাজারের শোরগোল
তখন আর মনে থাকবে না, স্বপ্ন মনে হবে,
আজ রাতে যেসব কথা ভেবে চলেছিলাম-
চিন্তা করে নিজেরই হাসি পাবে তখন।

ব্লাইন্ড-স্পট (অণুগল্প)


ব্লাইন্ড-স্পট 
 (অণুগল্প)

পুলককে ঠিক ভুলোমনা বা তালকানা কোনটাই হয়ত বলা ঠিক হবে না। তবে ওর একটা ভয়ংকর বদ স্বভাব হল জিনিষপত্র কোথায় রেখেছে প্রায়ই তা ভুলে যাওয়া। ক্লাস থ্রি-তে পড়া কিশলয়ের কবিতা কণ্ঠস্থ, কিন্তু আর্বিট্রেশনের জন্যে কন্ট্রাক্ট পড়ার দু-ঘন্টার মধ্যে তার বিবাদাস্পদ ক্লজগুলো ভুলে যেতে তার জুড়ি নেই। পুলক কর্পোরেট ল-ইয়ার। তাই ক্লায়েন্টদের নাম-ঠিকানা-কন্ট্রাক্টের ডিটেল, আইনের ধারা- কিছুই তার ভুললে চলে না। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।

সঙ্গত কারণেই পুলকের বাড়ি তার অফিসেরই যেন এক্সটেন্সন। বাসায় ফিরে বিছানায় শুয়ে কন্ট্রাক্ট আর সংশ্লিষ্ট ফাইলগুলি পড়ে বুঝে রাখতে হয়, পরদিন সকালেই হয়ত থাকবে আরবিট্রেশনের কেস। তার কর্পোরেট আইনের জ্ঞান আর বিবাদের কারণগুলো বিশ্লেষণের ক্ষমতার ফলে সে এখন রুস্তম অ্যান্ড জিজিভয় সলিসিটার ফার্মের একজন সিনিয়ার কনসাল্ট্যান্ট। কিন্তু মোটা মোটা ফাইলগুলোর কোন পাতায় কি আছে তা মনে রাখার জন্যে তাকে প্রচুর পরিমাণে হলুদ কাগজের স্টিকিং নোট ব্যবহার করতে হয়। অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, এ কাজ সবাই করে থাকে।

আশ্চর্যের কথা হল এটাই যে স্টিকিং নোটের গুচ্ছটা কোথায় রাখা আছে মাঝে মাঝে পুলক সেটাই খুঁজে পায়না। ইনস্যুরেন্সের ধারাটাতে চোখ রাখতে হবে, দুটো ভাইটাল পয়েন্ট আছে, কিন্তু মার্ক করবে কি দিয়ে, ইয়েলো স্টিকারের গোছাটা কই? খোঁজ, খোঁজ......নাঃ, কোত্থাও নেই। প্রিন্টারের উপরে কাগজপত্র ডাঁই হয়ে আছে, অন্ততঃ চারবার তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল সব। ক্লায়েন্টের কন্ট্রাক্টারের বিজনেস কার্ডটা হারিয়ে যাওয়ায় আরেকটা চেয়ে নেবে ভাবছিল পরের মিটিং-এ, সেটা হঠাৎ পেয়ে গেল বিছানার এক কোনায়, কিন্তু স্টিকারগুলো নেই।

- 'বারোটা বেজে গেছে, এবার তো শুয়ে পড়', অঙ্গনা তাড়া দেওয়া শুরু করেছে। রাগ হয়ে গেল পুলকের- নির্ঘাৎ ওর কাজ, সকালে গুছিয়ে রাখতে গিয়ে কোথাও ঢুকিয়ে দিয়েছে।
- 'কোথায় রেখেছ বলত হলুদ স্টিকারগুলো, খুঁজে পাচ্ছিনা কোথাও?'- গজগজ করে উঠল পুলক।
- 'কোথায় আবার থাকবে, হয় ল্যাপটপের তলে, নয় প্রিন্টারের ওপরে- দেখেছ ওগুলো?'
- 'সব তিন-চারবার করে দেখা হয়ে গেছে'।
- 'তাহলে এটা কি?' বলতে বলতে প্রিন্টারের উপরে পুলকের চোখের সামনে থেকেই স্টিকারের গোছাটা উদ্ধার করে অঙ্গনা।

অপ্রতিভ পুলক। কিন্তু হার মানবার পাত্র নয় সে। ফিজিক্স পড়েছে স্কুলে। বলল, 'চোখের নার্ভগুলো যেখানে গোছা বেঁধে রেটিনার বাইরে বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়ে, সেই জায়গায় কোন কিছুর প্রতিবিম্ব পড়ে না। তাই সেটাকে বলে ব্লাইন্ড স্পট। ইয়েলো স্টিকারের গোছাটার ইমেজ নিশ্চয় আমার সেই ব্লাইন্ড স্পটে পড়েছিল, তাই দেখতে পাই নি।'
অঙ্গনা চুপ করে থাকল। কিছুক্ষণ পরে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল দুজনে।

আপাততঃ তর্কে জিতে গেলেও একটু পরেই অনুতাপবোধ শুরু হল পুলকের। ছিঃ, অঙ্গনা যদি জানতে পারে যে মানুষ দুই চোখ দিয়ে দেখলে ব্লাইন্ড স্পটের কোনও প্রভাব থাকে না, আর পুলক তো আর কানা নয়। ভাবল একবার অন্ততঃ মুখ ফুটে স্যরি বলে দিই।
- 'বুঝলে অঙ্গনা, কথাটা না বলে স্বস্তি পাচ্ছি না......'
- 'বুঝেছি, আর বলতে হবে না......তোমাকে ভগবান দুটো চোখ দিয়েছেন, মাথা একখানা আস্ত, আর......'
- 'আর কি?'
- 'হৃদয় মাত্র আধখানা।'
- 'তাহলে এসো, যদিদং হৃদয়ং তব-'
বাতি নিভে গেল। ওরা দুজনে ঘন হয়ে এল।

সকালে একটু দেরিতে ঘুম ভাঙল পুলকের। অঙ্গনা ঘরে ঢুকল। ওর এরই মধ্যে স্নান হয়ে গেছে, একটা বড় দেখে লাল টিপ পরেছে কপালে।
- 'অঙ্গনা', ডাকল পুলক।
- 'কি?'
- 'সত্যি হয় আমি অন্ধ ছিলাম, নয় আমি এক বিশাল ব্লাইন্ড স্পট নিয়ে জন্মেছিলাম। তাই জীবন-ভর এত আইনের বই দেখলাম, কন্ট্রাক্টের ফাইলের প্রতি পাতায় হলুদ কাগজ চেটালাম; শুধু-
- 'আবার কি?'

- 'দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া-
 বিছানা হইতে দুই পা ফেলিয়া
একটি লজ্জা-অরুণ কপালে
একটি সিঁদুর বিন্দু।'

বইমেলার গপ্পো-সপ্পো ।। চার বছর আগে


বইমেলার গপ্পো-সপ্পো ।। চার বছর আগে

কিভাবে জানিনা রোব্‌বার দুপুরে পৌঁছে গেলাম কলকাতা বইমেলায় । সাথে ছোটভাই শংকর ও খুদে ভাইপো- 'দেব'এর চাঁদের পাহাড় কিনতে চায় । 'মিলন মেলা' স্টপে নেবে দেখি ধুন্ধুমার কাণ্ড, বাইপাস থেকে সায়েন্স সিটি পর্যন্ত অজস্র বইয়ের ভীড়, মিনি বইমেলা বল্লেও কম বলা হয়- একশো টাকায় রামায়ণ-মহাভারত-বঙ্কিম-শরৎ, ত্রিশ টাকায় দেব, সিংহ ও কিলিমাঞ্জারোর ছবিসহ চাঁদের পাহাড়, কি নেই ? যা হোক, ভীড়... ঠেলে কোনমতে ভেতরে ঢোকা গেল ।

আমরা, অর্থাৎ মুম্বাইয়ের লোকেরা কলকাতা বইমেলার ব্যাপারে রীতিমতো গাঁইয়া । শুনেছিলাম, 'আগামীকাল'এ আমাদের রঞ্জনদার অনুগল্প বেরিয়েছে, ভাবলাম, অভীক দত্তর নাম করলেই কেউ দেখিয়ে দেবে । কে চেনে কাকে! যাক, ম্যাপ দেখে মোটামুটি সব খুঁজে পেলাম । 'চলো যাই' পেলাম, ভেবেছিলাম, দোলনচাঁপাকেও দেখতে পাব, ছিল না । ব্যস্ত মানুষ, না থাকাই স্বাভাবিক । খুঁজে খুঁজে রামকৃষ্ণদার 'দোতালা বাস...', অমিতাভর 'হাফ সেঞ্চুরি...' ও দোয়েলপাখি সম্পাদিত 'রসাতল'ও পেয়ে গেলাম ও কিনে ফেললাম একটা করে । ক্রমে ব্যাগ ভরে উঠল বইপত্তরে । ভাই এবার ফেরার তাড়া দিতে শুরু করল ।

'সাহিত্যম্‌'এর স্টলে শংকরের লেখা নতুন বই 'অবিশ্বাস্য বিবেকানন্দ' এককপি নিয়ে বেরোচ্ছি, একজন দেখে বললেন, 'ও মশাই, লেখক বসে আছেন স্টলের এককোনায়, বইতে সই করিয়ে নিতে পারেন । আমি দেখলাম, ভাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে । ভাবি ওকে ডেকে জানিয়ে দি- শংকর, শংকর বলে ডাক দিলাম । হঠাৎ দেখি আমার প্রিয় সাহিত্যিক বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে- 'আমায় ডাকছেন ?'
কি লজ্জা, এটা তো ভাবি নি । একটা প্রণাম করে বইখানা এগিয়ে দিলাম । উনি মৃদু হেসে সই করে দিলেন । গতবার শ্রী বুদ্ধদেব গুহকে পেয়েছিলাম, এটাই ছিল এবারের মেলায় আমার বিশেষ পাওনা ।