Wednesday, November 28, 2018

হট-লাইন (অফিসের গল্প- ৭)

আপিসের গল্প
হট-লাইন।।

'তুমি এক কাজ কর, বুঝলে? কোশ্চেনগুলো নিয়ে সোজা ডা: সহায়ের কাছে চলে যাও' টি কে চক্রবর্তী ওরফে দাদা চক্কোত্তি আমাকে পরামর্শ দিলেন।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ডা: সহায় পার্সোন্যালের হেড, তিনি এসবের কী বুঝবেন!
'বুঝবে, বুঝবে। যাও, যা বলছি কর।'
আমি আর কথা বাড়ালাম না। দাদা চক্কোত্তির যেটুকু পরিচয় ইতিমধ্যে পেয়েছি, তাতে আর এসব কথায় এখন অবাক হই না। মনে আছে কদিন আগে বাঁশকান্দি ড্রিলসাইটের রাস্তা ভেঙে গেছে বলে গ্রামের লোকেরা ঝামেলা করছে- সে খবর ওনাকে দিতেই বলে উঠলেন- 'তা আমি কী করব? উকিলকে খবর দাও!'
আমি থ'! উকিল কী করবে এখানে? বরং পুলিশ কিছু করতে পারে। আমি তখন শিলচরের অফিসে নতুন। একে-ওকে জিগ্যেস করে জানা গেল মি: ভোকিল হলেন সিভিল সেক্শনের হেড। পার্শী ভদ্রলোক, বাংলায় তাঁর নামের উচ্চারণ উকিলই হয় বটে! সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করে আমি গেলাম ভদ্রসায়েবের পরামর্শ নিতে।

ভদ্রসাহেব খুব হেল্পফুল লোক। আমার সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাঙালি অফিসাররা যত অত্যাচার করেন সবই অধস্তন বাঙালিদের ওপর, আর প্রকাশ্যে বাঙালি কর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা বা অফিসে বাংলায় কথা- নৈব নৈব চ। তবে ভদ্র ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি অফিসে সর্বদা কিছু জুনিয়ার বাঙালি কর্মীদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে থাকতেন আর চোস্ত শান্তিপুরী বাংলায় আড্ডা দিয়ে আসর জমিয়ে রাখতেন। এবারও দেখি একই অবস্থা। ভদ্রস্যারকে ঘিরে বসে পাল-ভাওয়াল-ব্যানার্জী, গল্পের ফোয়ারা চলছে। আমাকে দেখেই উনি হৈ-হৈ করে উঠলেন- 'এই যে চাটুয্যে! দাদা চক্কোত্তির হাত থেকে নিস্তার পেলে তাহলে? পাল আরেকটা চা বলে দাও ত হে!'
'না স্যার, চা খাবনা', আমি কোনমতে বললাম। 'পার্লামেন্টারি কোশ্চেনেয়ার আছে'।
'ফোনটা কে ধরেছিল?' তিনি জানতে চান।
'আমিই। ঝর্ণা ম্যাডাম মেটার্নিটি লীভে।'
'ব্যস, ঠ্যালা সামলাও। দেখি, প্রশ্নপত্রটা, কী জানতে চেয়েছে।'
প্রশ্নগুলো ওঁকে দেখালাম। মিজোরামে কি খনিজ তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে? যদি হ্যাঁ, তবে কটা কূপ খোঁড়া হয়েছে এ পর্যন্ত? প্রগ্নস্টিকেটেড রিসার্ভ (এটার আর বাংলা পারলাম না) কত? কত তেল এযাবৎ বেরিয়েছে? মিজোরামের প্রতি কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে নাতো?
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোন মিজো সংসদ-সদস্যের কাজ। মিজোরাম যেহেতু আমাদের প্রজেক্টের আওতায় পড়ে আর ওখানকার রেংটে অঞ্চলে আমরা কিছু নিষ্ফল ড্রিলিং করে চলেছি তাই উত্তর আমাদিককেই দিতে হবে।

'হুঁ, দুরূহ প্রশ্ন। এর উত্তর এখানে একজনই দিতে পারে। এটা ডা: রামজী সহায়ের কাছে নিয়ে যাও'।
'সেটাই তো বুঝতে পারছি না স্যার, সহায়ের কাছে কেন? উনি তো এইচ-আরের হেড!'
'তা ঠিক। তবে ওঁর পি-এইচ-ডিটা জিওলজির, তা জান কী? উনি আগে রিজন অফিসে জিওলজির হেড ছিলেন।'
এইবার আমার মাথায় ঢুকল। ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে শুনতে পেলাম ভদ্রস্যারের মন্তব্য- 'এই চ্যাটার্জিটা আর মানুষ হলনা। হেডকোয়ার্টারের হটলাইন কেউ ধরে?' সঙ্গে সঙ্গে সমবেত অট্টহাস্য।      
না, ডা: সহায় আমাকে নিরাশ করেননি। কোলাসিব জেলায় অবস্থিত 'থিংডল' (Thingdawl) আর 'বিলখথলির' (Bilkhawthlir)- মিজোরামের তৈলখনি-অঞ্চলের এই অদ্ভুত নামদুটো জানিনা কিভাবে আজও মনে রেখেছি। সম্ভবত: সহায় সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধাবশতই। ফিরে আসার সময় তবু একটা অন্য প্রশ্ন সাহস করে করে ফেললাম- তিনি ভূগর্ভ-বিদ্যায় এত জ্ঞানের অধিকারী হয়েও নন-টেকনিক্যাল লাইনে চলে এলেন কেন?
জবাবে মৃদু হাসলেন ডা: সহায়। 'তুমি ক'বছর এই কোম্পানিতে আছ?'
'আট বছর, স্যার'- আমি বললাম।
'এই আটটা আঠারো হোক, তখন ঠিক বুঝতে পারবে। আমার কাছে দয়া করে এর বেশি কিছু জানতে চেয়ো না।'
একই দিনে দুবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলাম।

মুক্তি ও আনন্দ- একটি ছোট গীতি আলেখ্য


মুক্তি ও আনন্দ-  একটি ছোট গীতি আলেখ্য।


মুক্তি আর আনন্দ- এই দুটি মানসিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রচনায়, কবিতায়-গানে, তাঁর জীবনেও। জীবন থেকে, ভুবন থেকে, ঈশ্বরের সৃষ্ট বিশাল মহাবিশ্ব আর অগন্য জ্যোতিঃপুঞ্জের মাঝখান থেকে আনন্দ খুঁজে নিতে হবে, সেই আনন্দেরই সাগর থেকে মুক্তির বন্যা ছুটে আসবে, এই পার্থিব জগতের ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে।
‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’- ব্রহ্মসংগীতটি রচিত হয় ১৮৯৭ সালে, লচ্ছাসার-বিলাওল রাগে নিবদ্ধ তুলসীদাসের ধ্রুপদ ‘দুসহ দোখ-দুখদলনী’ থেকে ভেঙে।

গানঃ ‘বহে নিরন্তর অনন্ত.........ভক্তচিত বাক্যহারা।‘

আনন্দধারা বয়ে চলেছে ভুবনজুড়ে, মুক্তির জন্যে কোন অলক্ষ্য-লোকে ছুটে যেতে হবে? এই বিশ্ব যে বিশ্ববিধাতারই এক অপরূপ সৃষ্টি, এর বাইরে আর কী আছে? তাই আজ ‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে’- মুক্তি আসুক সুরের আলোয় আলোকিত গানের পথ ধরে, মুক্তি আসুক জীবনের চলার পথে জীবনের বিনিময়ে।

গানঃ ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়......দিই আহুতি মুক্তি আশে।‘
মুক্তি আর আনন্দ- এই দুটি মানসিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রচনায়, কবিতায়-গানে, তাঁর জীবনেও। জীবন থেকে, ভুবন থেকে, ঈশ্বরের সৃষ্ট বিশাল মহাবিশ্ব আর অগন্য জ্যোতিঃপুঞ্জের মাঝখান থেকে আনন্দ খুঁজে নিতে হবে, সেই আনন্দেরই সাগর থেকে মুক্তির বন্যা ছুটে আসবে, এই পার্থিব জগতের ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে।
‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’- ব্রহ্মসংগীতটি রচিত হয় ১৮৯৭ সালে, লচ্ছাসার-বিলাওল রাগে নিবদ্ধ তুলসীদাসের ধ্রুপদ ‘দুসহ দোখ-দুখদলনী’ থেকে ভেঙে।

গানঃ ‘বহে নিরন্তর অনন্ত.........ভক্তচিত বাক্যহারা।‘

আনন্দধারা বয়ে চলেছে ভুবনজুড়ে, মুক্তির জন্যে কোন অলক্ষ্য-লোকে ছুটে যেতে হবে? এই বিশ্ব যে বিশ্ববিধাতারই এক অপরূপ সৃষ্টি, এর বাইরে আর কী আছে? তাই আজ ‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে’- মুক্তি আসুক সুরের আলোয় আলোকিত গানের পথ ধরে, মুক্তি আসুক জীবনের চলার পথে জীবনের বিনিময়ে।

গানঃ ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়......দিই আহুতি মুক্তি আশে।‘

Saturday, October 13, 2018

মুম্বাইয়ের শারদোৎসব - অণু-প্রবন্ধ

মুম্বাইয়ের শারদোৎসব 
( অণু-প্রবন্ধ)


     মিলেনিয়ামের গোড়াতে বাংলার শিল্প-শিক্ষাক্ষেত্রের সংকোচনের ফলে বাঙালি মেধাবী-বুদ্ধিজীবির দল ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বাংলার বাইরেমুম্বাইকেও একেকসময় মনে হয় বৃহত্তর পশ্চিমবঙ্গের অংশপূর্ব আন্ধেরীর যে মহাকালী-গুহা অঞ্চলে পাহাড়-জঙ্গলের মাঝে কেউ থাকতে চাইত না, তা এখন জমজমাট। সাকি-বিহারজেভিএলআরওয়েস্টার্ণ হাইওয়ে আর আন্ধেরি-কুর্লা রোড দিয়ে ঘেরা এই অঞ্চলে এত বাঙালী, অথচ পুজো নেই। ফলস্বরূপ ২০০১-এ প্রতিষ্ঠিত হল 'মহাকালী সার্বজনীন দুর্গোৎসব সেবা সমিতিবা MSDSSততদিনে বৃহত্তর মুম্বাইয়ে ছোটবড় মিলিয়ে দুর্গাপুজোর সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে আর তার মাঝে এই পুজোও নিজের স্থান করে নিয়েছে।

আমাদের শারদোৎসব শুরু হয়  দেবীপক্ষের সূচনায়  শারদপ্রভাতের পুণ্যলগ্নে মঙ্গলশঙ্খধ্বনির সাথে পুজোমণ্ডপে  একত্রিত হয়ে রেডিওতে 'মহিষাসুরমর্দিনীশুনে, সঙ্গে গরম চা-সিঙ্গাড়া-জিলিপি। চতুর্থীর সকালে সত্যনারায়ণ পুজো, সেদিনই দেবীমূর্তি এনে স্থাপন করা হয় পূজামণ্ডপে। পঞ্চমীতে আনন্দমেলা- সদস্যরা কিছু মুখরোচক রান্না করে নিয়ে আসেনতা বিক্রী হয়- লাভ নয়নিছক আনন্দলাভের জন্যে। মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী পুজো হয় বিধিমত শুদ্ধাচারে, ত্রেতাযুগের রামচন্দ্রের অকালবোধনের রীতি যথাসাধ্য মেনে। জানিনা মানসে নীলপদ্ম এখনও ফোটে কিনাতবে এখনও ১০৮টি শতদলে সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয় এখানে। বিজয়াদশমীতে ঘট বিসর্জনদধিকর্মা, সিঁদুর খেলা হয় দেখবার মততারপর প্রতিমা বিসর্জিত হয় জুহুর সমুদ্রে। ফিরে আসার পর শান্তিজলবন্ধুদের মধ্যে কোলাকুলিশেষপাতে থাকে সবার জন্যে মিষ্টি।

প্রবাসের শহরগুলোতে আগে কেউ দেবী-মূর্তি বা তার সাজসজ্জা বা আলোকসজ্জা নিয়ে মাথা ঘামাত নাথীম নামক বস্তুটির কথা ত ছেড়েই দিলাম। সবাই মিলে আড্ডাখাওয়াখাওয়ানো আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- এই ছিল প্রধান। এখানে আমরা শুদ্ধসত্বাচারে পুজো করা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকাশন থেকে বাংলা বইপত্র এনে স্টল খুলে বসি শুধুমাত্র বাংলাভাষাপ্রেমীদের প্রবাসে মানসিক তৃপ্তিদানের খাতিরে, লাভ-লোকসানের হিসেব না রেখেএছাড়া বাঙ্গালি-রসনার তৃপ্তির জন্যে স্পনসর্ড ফুড-স্টল, আর থাকে কলকাতা-মুম্বাই থেকে নামী-দামী শিল্পীদের নিয়ে বাংলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানএছাড়া আর কিছু না-  প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং- জীবে প্রেম আর জিভে প্রেম। খাও আর ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে নির্বিচারে তিনদিন ধরে পেট পুরে মায়ের প্রসাদ খাওয়াওআমরা মায়ের ভক্ত একটি মানুষ বা মনুষ্যেতর প্রাণীকেও অভুক্ত রাখতে চাইনা পুজোর এই ক’দিন!
রসিকতা নয়আলোকসজ্জা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে খরচ করতে চাইলে কোটি টাকাও কমঅথচ মুম্বাইয়ের মত মহানগরের কেন্দ্রস্থলে আমরা দেখতে পাই প্রতি বছর অন্যুন ৩০% ছাত্রছাত্রী অনুদানবিহীন স্কুলগুলি ছেড়ে কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ছেদরিদ্র বাবা-মা পড়ার খরচ জোগাতে হিমসিম খাচ্ছেন। এদিকে আমরা সুখে আছিআমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল-কলেজে পড়ছেভাল কোচিং বা গাইডেন্স পাচ্ছে। কিন্তু 'যারে তুমি পিছে রাখ সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে'- সবাইকে একসাথে টেনে নিয়ে না চললে সত্যি কি এগোন যায়তাই তো আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার উদ্দেশ্যপূরণের জন্যে এই দুর্গোৎসব সমিতির শক্ত ভিতের উপর আমরা একদিন শুরু করেছিলাম 'শিক্ষা কি আশা', আশেপাশের আন-এইডেড স্কুলগুলিতে ড্রপ-আউট রুখতেমেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যেন শেষ পর্যন্ত তাদের যোগ্যতানুযায়ী পড়ার সুযোগ পায় আর বিশেষতঃ কোনও ছাত্রীকে যেন দারিদ্র্য বা অন্য কারণে পড়া না ছাড়তে হয় মাঝপথে, একথা মাথায় রেখে। আমাদের এই কার্যক্রম ২০০৯-তে শুরু হয়েছিল দুটি বিদ্যালয়ের দশটি ছাত্রকে অনুদান দিয়েএখন তার পরিধি প্রায় ৩০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য ও সহৃদয় বন্ধুদের একান্ত সহযোগিতায়। এসবের সঙ্গে হয়ত পূজার কোনও সম্বন্ধ নেইতবে মুম্বাই যে শুধুমাত্র 'বানিয়া'দের শহর নয়এর একটা হৃদয় আছে জানতে পারি, যখন আমাদের সাহায্য পেয়ে ছাত্রছাত্রীর অভিভাবক বা স্কুলের হেডমাস্টার এসে ধন্যবাদ জানিয়ে যায়। প্রত্ত্যুত্তরে তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে বলি মা আনন্দময়ীকে, বিদ্যাদায়িনী সরস্বতীকেতাঁর পুজো ত তখনই সার্থক হবে যখন কোনও কাঙালির মেয়ে মুষ্টিভিক্ষার জন্যে ধনীর দুয়ারে এসে আর দাঁড়াবে না।      

Sunday, April 15, 2018

অভিজ্ঞতা। (সনেট)

অভিজ্ঞতা।
(সনেট)


এতক্ষণে, দিদিমণি কহিলা হরষে,
বুঝিনু কেমনে জেতা যায় ভোট-রণে।
উন্নয়ন-শিল্পায়ন, যত বাজে কথা-
বাঙালী চাকুরি হ'তে সহস্র যোজনে...
দাঁড়ায়ে পাড়িবে গালি শিল্পপতি জনে,
বুর্জোয়া তারা তো সবে। এসেছে লুটিতে
এই বঙ্গপ্রদেশের মামাটিমানুষে।
শিল্প নয়, কাজ নয়, চায় যে জু্টিতে
বাইক-বাহিনী রূপে; কিম্বা সিণ্ডিকেটে।
দু-টাকায় চাল দাও, ক'টা সাইকেল
ক্লাবে দাও অনুদান দুই-চা্রি লাখ।
এই ছন্দে লিখে গেছে কবে মাইকেল!
কিবা 'পয়োজন' মোর এলিট ভাষায়?
স্ল্যাং মেরে কাজ্জোসিদ্ধি- যা বোঝে চাষায়!

জয় বাবা ভোটনাথ- অণুগল্প

জয় বাবা ভোটনাথ!
অণুগল্প

'ভোট এস্যেছে। কাল গরুর গাড়ি লিয়ে আইসব, খুড়িমা-জ্যেঠিমারা সব ভোট দিতে যাবেন গো'- হাঁক দিল মটর, বাবুগাঁয়ের মটর দত্ত। এ সেই ছাপ্পান্ন, না না, বোধহয় সাতান্নর বাংলার নির্বাচন। ছাপ্পা-ভোট ছিল কিনা জানিনা, তবে কংগ্রেসেরই বোলবালা তখনও।
ভৈরব ঘোষালের বুড়ি বেধবা রাজেশ্বরী, যাঁকে গাঁয়ের ছেলে-ছোকরারা ডাকে রাজু-বুড়ি, সামনে অবশ্য রাজু-ঠাম্মা, তিনি মটরকে ডেকে ভোটের খবরাদি নিলেন। 'হ্যাঁরে, ভোট দিলে কি হয়?' তাঁর প্রশ্ন। 'পেরজাতন্ত্রে ভোট বড় যন্তর ঠাম্মা, নিজের রাজা নিজেই বাছো, ইচ্ছেমত কাজ করাবে তার পর।' এর বেশী কি মটর নিজেই জানে, ছাই? তবে বুড়ীর অত শোনার শখ নেই। গতমাসে তাঁর একমাত্র পুত্র সুদামের তিন নম্বর কন্যা জন্মাবার পর থেকেই ছেলের জন্যে পুন্নাম নরকের ভয় চেপে বসেছে বুড়ীর মনে, নানা জায়গায় মানত করে যাচ্ছেন তিনি ক্রমাগত।
যথাসময়ে গাঁয়ের বউ-ঝিরা রাজু-ঠাম্মার নেতৃত্বে সদলবলে এসে ভোটগাড়ি, থুড়ি, গরুর গাড়ির সওয়ার হলেন। পুরুষরা আগেই রওনা হয়ে গেছে হেঁটে বা সাইকেলে। গোবিন্দপুরের ইস্কুলে যখন পৌঁছল তারা, বেলা বেড়ে গেছে, সুয্যিমামা সওয়ার মাথার উপরে। না, মেয়ে-বউদের আলাদা লাইন হলেও বয়েসের সম্মানে ঠাম্মাকে লাইন দিতে হলনা, গদাই আর পটলা- কংগ্রেস আর জনসঙ্ঘের এজেন্ট, তখনও ছিপিম বা সিপিএম নামেনি মাঠে, ধরাধরি করে নিয়ে এল রাজুবুড়িকে পোলিং বুথের ভিতরে। 'ওটা কি মাখায় রে আঙ্গুলে? সিঁদুর লয় তো? আমি বেধবা মাগী, সিঁদুর পরাস নে যেন হতভাগা!' আঙ্গুলে টিপ পরার পর ঠাম্মা বাক্সের দিকে এগিয়ে গেলেন। আদ্রার পোস্টমাস্টার সেনবাবু, প্রিসাইডিং অফিসার, যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে বুড়ীকে ধরে ধরে নিয়ে গেলেন বাক্সর কাছে- 'মাসিমা, এই কাগজটায় আপনার পছন্দমত চিহ্নে ছাপ মেরে...হ্যাঁ, এভাবে মুড়ে বাক্সে ফেলবেন। আমরা বাইরেই আছি, কোনও দরকার হলে ডাকবেন।' ঠাম্মা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন বাক্সের দিকে।

কিন্তু, একি! বুড়ী আগে গিয়েই ভোটবাক্সকে সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ করলেন। তারপর আঁচলের গিঁঠ খুলে বের করলেন সওয়া পাঁচ আনা পয়সা, ফুল বেলপাতা, চারটি দুর্বাঘাস, সিঁদুর আর বাতাসা। ভাল করে ভোটবাক্সে সিঁদুর মাখিয়ে তিনি ছাপমারা কাগজটি বাক্সে ফেললেন। তারপর নমস্কার করে মানত করলেন- 'হেই ভোটবাবা, ভোট তো দিল্যম। দেখো বাবা ইবারে যেন আমার সুদামের একটি ব্যাটা হয়'।
বলা বাহুল্য, হতভম্ব সেনবাবু আরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন যখন যাবার আগে ঠাম্মা তাঁকে পুরুতের বরাদ্দ সোয়া-পাঁচ আনা দক্ষিণা হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলেন।

খেলা, আমি নেই।। কবিতা

খেলা।

পাখিটা বুনেছে বাসা গাছের কোটরে,
খড়কুটো, লতাগুল্ম এটা-ওটা ভরে
শিল্পশোভার কি অবাক নিদর্শন
দেখে মন শান্ত হয়ে থাকে কতক্ষণ?
...
চাকরকে পাঠালেম, গাছের উপরে
বাসাটা কোটর থেকে নিয়ে এল পেড়ে।
খানদুই ডিম ছিল, কী হবে তা দিয়ে!
দিই ফেলে, বাসাখানা যত্নে আসি নিয়ে।

বাবুই পাখির বাসা আমার দেয়ালে
শোভা পায়, আমি থাকি আপন খেয়ালে,
হরিণের ট্যাক্সিডার্মি, বাঘছাল খানা
আছে গজদন্ত বান্দীপুর হ'তে আনা।

এ খেলা সবাই খেলে সারা দুনিয়ায়
তোমার কষ্টে মোর কী বা আসে যায়!
তোমার প্রাণের চিন্তা, আমার দেয়ালা
চিরকাল ধরে চলে এ করুণ খেলা।


আমি নেই।

আমি নেই এ জগতে, ট্রামখানা চলে গেছে
চুকিয়ে তাহার ঋণ। কখন-
তা বলে তো থেমে নেই কিছু!
অবশ্য হয়েছে কিছু অদলবদল কিছু ইতরবিশেষ;
কার্তিক মাসের মাঠে মহীনের ঘোড়াগুলি
খেত ঘাস, আজ তারা নেই।
মহীন চালায় অটো উল্টোডাঙার রুটে-
ভুলে গেছে , আজকাল চেনে না আমাকে!
ধানসিঁড়ি কোথা কে বা জানে, মনে নেই,
জানি আছে ইছামতী-বিদ্যাধরী-হোগল-মাতলা।
শঙ্খচিল, সোনালি ডানার চিল-
নিশ্চিন্তে উড়ে করে এপার ওপার।
সন্ধ্যা নামে।
ডানায় রোদের গন্ধ মুছে ফেলে চিল।
খেটে খাওয়া মজুরের দল বর্ডারের সেপাইকে প্রণামীটা দিয়ে ফেরে ঘর কাঁটাতার পারে,
পাশে আজ নেই কেউ। তবু ভাবি সেকি বসে আছে
নাটোরের আত্রাই নদীর তীরে? সব ভুল-
কেউ বসে নেই!

রাতের গাড়ি।। কবিতা

রাতের গাড়ি।।
পল্লব চট্টোপাধ্যায়

সশব্দে চলেছে রাতের গাড়ি
ঘুমিয়ে পড়া গ্রামগুলোর বুকের উপর দিয়ে,
নৈশ নিস্তব্ধতাকে খান খান করে।
মাঝে মাঝে কোন খালি প্লাটফর্মের ধারে...
দেখা যায় ছোট ছোট লাল ঘরবাড়ি,
জানি ওগুলোতে ইস্টিশনের বাবুরা থাকে
গার্ড-সায়েব, স্টেশন মাস্টার, টিকিট চেকার।
এখন ওগুলোকে দেখে মনটা খারাপ লাগছে,
ওদের পরিবার এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন
দেখল না তারা আজ রাতের জগতটাকে।

হঠাৎ আকাশ থেকে একটা তারা খসে পড়ে,
নাকি অজানা গ্রহের থেকে আসা উড়ন্ত পিরিচ;
হয়ত কিছু এলিয়েন আছে তার মধ্যে।
তারাও আজ দু-চোখ ভরে দেখছে
ঘুমন্ত এই গ্রহের নিষ্পাপ সৌন্দর্য।
ওরা বুঝি নিজের বিশ্বে ফিরে জানাবে অন্যদের
এই পৃথিবীতে কত শান্তি, কত আনন্দ।
আমি তাকিয়ে থাকি রেলগাড়ির জানলা দিয়ে
আকণ্ঠ পান করি নিবিড় একাকীত্বকে।

কাল সকাল হলেই আবার মানব-মিছিল,
কল-কারখানার জঙ্গী ধোঁয়া, বাজারের শোরগোল
তখন আর মনে থাকবে না, স্বপ্ন মনে হবে,
আজ রাতে যেসব কথা ভেবে চলেছিলাম-
চিন্তা করে নিজেরই হাসি পাবে তখন।