Wednesday, November 6, 2019

গণেশপুরী ও সিদ্ধপীঠ আশ্রম। ভ্রমণ/ প্রবন্ধ

গণেশপুরী ও সিদ্ধপীঠ আশ্রম।


(১)
তখন আমি ভারতের একটি বিখ্যাত খনিজ তেল কোম্পানীর মুম্বাই শাখায় কর্মরত। হঠাৎ একদিন একটা ট্রেনিংএর অফিস অর্ডার হাতে পেলাম, আমাকে আর আমার অফিসের এক বয়স্ক সহকর্মী যাদবজিকে যেতে হবে তিনদিনের এক যোগা ও মেডিটেশনের কোর্সের জন্যে মুম্বাই থেকে ষাট কিলোমিটার দূরের গণেশপুরীর গুরুদেব সিদ্ধপীঠ আশ্রমে। ব্যাপারটাকে কিভাবে নেব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, এটা শিখে বা অভ্যাস করে কোম্পানীর কী কাজে লাগাতে পারব, নাকি এটা ব্যক্তিগত বিকাশের জন্যে কর্মচারীদের প্রতি কোন সেবামূলক কার্যক্রম। যাকগে, কৌতূহল আর না বাড়িয়ে বিরার লোকাল ট্রেনে ভাসাই স্টেশনে নেমে দেখি যাদবজি আমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন। গণেশপুরী বা বজ্রেশ্বরী মন্দিরের কিম্বা তনসা হট স্প্রিং-এর বাস নিতে বলা হয়েছিল, ভাগ্যক্রমে গণেশপুরী আশ্রমেরই বাস পেয়ে উঠে পড়লাম দুজনে।
মুম্বাই শহরের উত্তরে থানে জেলায় তনসা নদীর উপত্যকায় গণেশপুরী জল-জঙ্গল-পাহাড় অধ্যুষিত এক মনোরম স্থান, অন্ততঃ একসময় তাই ছিল। তনসার তীরে আছে বেশ কয়েকটি উষ্ণ প্রস্রবণ বা গরম জলের কুণ্ড। এরই পাশে রাস্তার ধারে ভডভালি গ্রামে একটি টিলার মাথায় আছে দেবী বজ্রেশ্বরী যোগিনী মন্দির, খুব সম্ভবতঃ ওই অঞ্চলের ঘনঘন বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে এই দেবীর কল্পনা, অবশ্য এ অঞ্চলের অন্যান্য যোগিনী (যেমন মহাকালী, যোগেশ্বরী বা কানহেরি গুহা) মন্দিরগুলোর মত এর বৌদ্ধ উৎসের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর মূল মন্দিরটি নাকি আট কিলোমিটার দূরে গুঁজ গ্রামে ছিল, যেটা পর্তুগিজরা একসময় ধ্বংস করে দেওয়ায় এই বর্তমান মন্দিরটির স্থাপনা হয়।
এখান থেকে বিরারের পথে তিন-চার কিলোমিটার দূরে শুরু হচ্ছে পুণ্যভূমি গণেশপুরী। এসেই পড়েছি যখন এর ইতিহাসও খানিক জেনে নেওয়া যাক। কথিত আছে পুরাকালে এখানে একটি প্রাচীন গণেশমন্দির ছিল যেখানে ঋষি বশিষ্ঠ একসময় এক মহাযজ্ঞ করেছিলেন। ১৯২৩ সালে কালিকট থেকে স্বামী নিত্যানন্দ নামে এক সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী এখানে এসে একটি কুটির গড়ে সাধনা শুরু করেন। তাঁর তপোপ্রভাবে আশেপাশের আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলি থেকে দর্শনার্থী ভক্তরা তাঁর কাছে আসতে থাকেন। ধীরে ধীরে শিষ্যসংখ্যা বাড়তে থাকে আর তনসা তীরবর্তী তাঁর কুটিরটি আর সংলগ্ন উষ্ণ প্রস্রবণগুলিতে মানুষজনের ভীড় বাড়তে থাকে। বাবা নিত্যানন্দ সব ব্যাপারেই উদাসীন ছিলেন। কিন্তু শিষ্যদের মধ্যে স্বামী মুক্তানন্দ বাবার বাণী প্রচার করার উদ্দেশ্যে গ্রাম-সংলগ্ন হাইওয়ের ধারে প্রচুর জমি যোগাড় করে এক বিশাল আশ্রম খুলে বসেন, যার নাম এখন বিদেশী ভক্তশিষ্যদের কল্যাণে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে গুরুদেব সিদ্ধপীঠ আশ্রম নামে। নামেমাত্র একটি লেংটিধারী ভোলা সন্ন্যাসী নিত্যানন্দকে অবশ্য ভুলে যায়নি লোকে, তিনি দেহ রেখেছেন ১৯৬১ সালে। তাঁর কুটির এখন একটি বিখ্যাত মন্দির, যেখানে ট্রাস্টের আয়োজিত স্বল্পমূল্যে বাবার প্রসাদ বড়া-সম্ভর থেকে পূর্ণ ভোজন সবই পাওয়া যায়, যদিও ভীড় বেশি হয় গরম জলের কুণ্ডে পুণ্যস্নানার্থীদের জন্যে।
প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের বাসযাত্রার পরে আমরা গণেশপুরীর সিদ্ধপীঠ আশ্রমে এসে নামলাম।

(২)
গুরুদেব সিদ্ধপীঠ আশ্রমের অবস্থান গণেশপুরী গ্রামের পথে মোড় ঘুরতেই। মূল আশ্রম আর গাঁওদেবী মন্দির পড়ে বাঁপাশে আর তার উল্টোদিকে ডানপাশে জনসংযোগ ও রেজিস্ট্রেশন অফিস আর অতিথিশালা ও কর্মচারীদের জন্যে কলোনী। গাঁওদেবী মন্দির কী জানেন তো? ইনি কোন গ্রাম বা জনপদের রক্ষাকর্ত্রী ও ইষ্টদেবী, গ্রামে ঢোকার মুখে এঁর মন্দির থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে তা গ্রামের মধ্যে বা কোন পাহাড় বা টিলাতেও থাকে। এই গ্রামদেবীর অধিষ্ঠান আর কল্পন একসময় এ দেশের সর্বত্র ছিল, আজ দাক্ষিণাত্য আর উত্তর-পশ্চিম ভারতের কিছু অংশে এখনও রয়ে গেছে। বস্তুতঃ ধার্মিক কারণ ছাড়াও এই গাঁওদেবীর মন্দিরগুলি তৎকালীন হিন্দু রাজ্যসমূহের গ্রামগুলোতে একপ্রকারের সুরক্ষা বা পুলিশ আউট-পোস্টের কাজও করত।
এই গণেশপুরী গ্রামের গাঁওদেবীর মন্দির সেখানে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে ছিল, স্বামী মুক্তানন্দ সংলগ্ন প্রায় বিশ-ত্রিশ একর জমি নিয়ে আশ্রম তৈরি শুরু করার সময় ওই মন্দিরটির আমূল সংস্কার করে তার উপরেই আশ্রম, যজ্ঞশালা, গুরুদেবের মন্দির, উপাসনা-গৃহ, বিশ্রামালয় ইত্যাদি তৈরি হয়, সংলগ্ন ছবি দেখলেই তা বোঝা যাবে।

আমরা দুজন বাস থেকে নেমে খোঁজ নিয়ে আশ্রমের মুখোমুখি অফিসে গেলাম। সেখানে আমাদের পরিচয়, কাগজপত্র সব দেখে সাথে-সাথেই ছবি তুলে পরিচয়-পত্র বা আই-কার্ড তৈরি করে গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হল। তারপর একজন আমাদের সঙ্গে এসে গেস্ট-হাউসে আমাদের একটা দুই-কামরার ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে দিল, না তার কোন চাবি নেই, তার দরকারও হয় না।
সাড়ে পাঁচটা বাজছিল। ছ'টায় নৈশাহারের সময়, আমাদিগকে মেন গেট দিয়ে আশ্রমে যেতে বলা হল। আই-কার্ড গলায় ছিল, সুরক্ষা কর্মী কিছু বলল না। ভেতরে সারি সারি চেয়ার-টেবিল পাতা ভোজনালয়। সেলফ-সার্ভিস, যাঁদের পণ্ডিচেরি আশ্রম বা ইস্কনের মায়াপুর আশ্রমের অভিজ্ঞতা আছে তাঁরা কিছুটা বুঝবেন। কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে এসে বসলাম, রুটি, ভাত, ডাল, দুটো তরকারি, পাপড়ভাজা, মিষ্টি আর একবাটি দুধ। কোন ঝাল-মশলা নেই, খাঁটি ঘিয়ের একটা মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম শুধু। খুব খিদে পেয়েছিল, তৃপ্তি করে খেলাম। খাবার পর বাসন ধোওয়ার জায়গায় নিজেকেই নামিয়ে দিতে হচ্ছিল, খুব চমৎকার আর সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। আমাদের সঙ্গে খাচ্ছিলেন বেশ কিছু শ্বেতাঙ্গ বিদেশী-বিদেশিনী। পন্ডি আর মুম্বাইয়ের ইস্কন মন্দিরে এঁদেরকে দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে চোখ, তাই কিছু অস্বাভাবিক ঠেকল না তেমন। দুজন শ্বেতাঙ্গ সন্ন্যাসী বা যোগীকেও দেখলাম, পরে জেনেছিলাম ওঁরা মঠের 'যোগা অ্যাণ্ড রিট্রিট' শিক্ষক ও অধীক্ষক স্বামী শিবানন্দ ও স্বামী মহেশানন্দ। আজ বলে নয়, সেই কোন কালে রবীন্দ্রনাথও এরকমই কাউকে দেখে মজা করে লিখেছিলেন-
"টেরিটিবাজারে তাঁর সন্ধান পেনু
গোরা বোষ্টম-বাবা নাম দিল বিনু।"
পরে এই স্বামীজীদের সঙ্গে বেশ ভাল আলাপ হয়েছিল।

খাওয়া-দাওয়া শেষে দেখি উপাসনালয়ে সমবেতকণ্ঠে নামগান আর ভজন হচ্ছে। আমরাও গলা মেলালাম-
"সদ্‌গুরু জ্যোত সে জ্যোত জাগাও,
মেরা অন্তর তিমির মিটাও।
হে যোগেশ্বর, হে পরমেশ্বর,
হে জ্ঞানেশ্বর, হে সর্বেশ্বর,
নিজ কিরপা বরসাও।।"
মেন দরজা বন্ধ হয়ে গেছিল। স্বামী মুক্তানন্দের সমাধি-মন্দিরের পাশ দিয়ে গাঁওদেবী মন্দিরের ভেতর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে রাস্তা পেরিয়ে গেস্ট-হাউসে এসে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম আমি আর যাদবজি। এভাবেই একটা দিন, আশ্রমের প্রথম দিন শেষ হল।

(৩)
 পরদিন ঘুম থেকে উঠতে হল ভোর সাড়ে তিনটেয়।
প্রাতঃকৃত্য আর স্নান সেরে সোয়া চারটে নাগাদ এলাম প্রার্থনা সভায়। খোল-করতাল-করতালি-হারমোনিয়ম যোগে গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গুরু-গীতা, বিভিন্ন স্তোত্র আর নামগান হল। সাড়ে-পাঁচটায় ইনডোর কাফেটারিয়ামে গিয়ে চা-বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম সমবেত প্রাতঃভ্রমণে।

সিদ্ধপীঠ আশ্রমের ছবি দেখলে তার লে-আউট কিছুটা বুঝতে পারবেন। মেন-গেট দিয়ে ঢুকে ডানদিকে প্রথমেই পড়বে ক্যাফে যেখানে আমরা চা খেলাম। সেটা পেরিয়েই ডানদিকে রান্নাঘর ও ভোজনালয়। তারপর রাস্তা ডানদিকে ঘুরে মুক্তানন্দ স্বামীর সমাধি-মন্দির আর গুরুমাঈয়ের বিশ্রামালয়ের দিকে, তাদেরকে ডানদিকে রেখে বাঁয়ে ঘুরলেই পড়বে যোগাশ্রম, গুরুকুল, ক্লাসরুম, লাইব্রেরি ইত্যাদি, আরো এগিয়ে গেলে হোমকুণ্ড, হঠযোগাভ্যাস কেন্দ্র, প্রচুর গাছপালা, বাগান ইত্যাদি। ভোজনালয় থেকে সোজা এগিয়ে বাঁদিকে এক বিশাল মাঠ যার চারদিকে আমরা তখন হাঁটছি।
আমরা যেটাকে ভাবছিলাম প্রাতঃভ্রমণ বা মর্নিং-ওয়াক পরে বুঝলাম ঠিক তা নয়। গুরুকুলের এক ছাত্র ছিল আমাদের গাইড। সে বলল এর নাম মন্দির প্রদক্ষিণ। মন্দির? এ তো একটা ফাঁকা সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ! না, জানা গেল আশ্রম তৈরির খননকার্যের সময় এই মাঠেরই নীচে পাওয়া যায় প্রাচীন এক গণেশ মন্দির, যার নামে ঐ এলাকা ও গ্রামের নাম 'গণেশপুরী'। ভেতরে ক্যামেরা বা ক্যামেরা-যুক্ত মোবাইল আনা নিয়মবিরুদ্ধ, তাই কোন ছবি তোলা যায়নি ওই 'মন্দিরের'। তবে মন্দির-মাঠের চারপাশে দেখলাম প্রচুর ছোট বড় যত্ন করে পালন করা গাছ, প্রতি গাছের তলে একটা প্লেটে লেখা আছে সেই ভক্ত বা ছাত্রের নাম যাঁরা গাছটি দান করেছেন। অনেকে যাঁরা ওখানে এখনও আছেন তাঁরা গাছগুলির নিয়মিত পরিচর্যাও করেন, যদিও সব কিছুই করা হয় একটি নির্দিষ্ট সময় আর নিয়ম মেনে। পরিক্রমার পর আমরা আনীত হলাম চারদিক খোলা শেডের ক্লাসহলে, শুরু হল পরিচয়পর্ব। গুরু শিবানন্দ আশ্রমের রীতিনীতি-পদ্ধতি, যোগা ও ধ্যানের কোর্স, সময়-সারণী, গুরুকুলের আদর্শ, হিন্দুধর্মের আদর্শ ও ঐতিহ্য, প্রাচীন ভারতবর্ষের ধারাবাহিক ইতিহাস- সব বিষয়ে একটা ইন্টারেক্টিভ বক্তৃতা দিলেন, তারপর আটটায় ব্রেকফাস্ট, আবার আমরা উপস্থিত হলাম খাবার ঘরে, দুধ-পাঁউরুটি-কলা-মিষ্টি দিয়ে সারা হল প্রাতঃরাশ।

এবার আশ্রমের প্রশাসন আর কার্যপ্রণালী সম্বন্ধে কিছু আলোচনা কর যাক। আগেই বলেছি, গুরুদেব সিদ্ধপীঠ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ভগবান নিত্যানন্দের শিষ্য স্বামী মুক্তানন্দ। ১৯০৮ সালে মাঙ্গালোরের কাছে ধর্মস্থল গ্রামে তাঁর জন্ম। পনের বছর বয়সে গৃহত্যাগ করার পর সাধনার শেষভাগে তিনি বাবা নিত্যানন্দের সংস্পর্শে আসেন ও তাঁরই শিষ্যত্ব নিয়ে ১৯৫৬তে গণেশপুরীতে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। ১৯৬১তে নিত্যানন্দের মহাসমাধির পর তাঁর অন্তিম ইচ্ছানুসারে তিনি গণেশপুরীর গাঁওদেব মন্দির সংলগ্ন জলা-জঙ্গলের উপর আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। দেশবিদেশ থেকে বহু ভক্তসমাগম হতে থাকে, ক্রমে এই যোগাশ্রমের শাখা-প্রশাখা সিদ্ধযোগ ফাউন্ডেশনের নামে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
এই মুক্তানন্দের এক কন্নড় গৃহী ভক্ত পরিবার বোম্বাইয়ে থাকতেন, তাঁরা মাঝে মাঝেই গুরুসন্দর্শনে আসতেন শিশুকন্যাকে নিয়ে। পঞ্চবর্ষীয়া মালতী শেট্টি তখন কী বুঝত কে জানে, চুপ করে মুক্তানন্দের পায়ের কাছে বসে থাকত, তাঁর বাণী-প্রবচন বোঝার চেষ্টা করত। ইনি চৌদ্দ বছর বয়সে আধ্যাত্মিক শিক্ষামন্ত্র 'শক্তিপট'এ দীক্ষিত হন স্বামীজির দ্বারা, পরে কুড়ি বছর বয়স থেকে পাকাপাকিভাবে আশ্রমে এসে বিদেশী শিষ্যদের জন্যে স্বামীজির দোভাষীর কাজে লেগে পড়েন, ইতিমধ্যে যোগ-সাধনায় সিদ্ধিলাভও করেন। স্বামী মুক্তানন্দের ইনি শ্রেষ্ঠ শিষ্য ছিলেন। ১৯৮২তে মহানির্বানের কয়েকমাস আগে স্বামীজি তাঁকে গুরুমাঈ চিদ্‌বিলাসানন্দ নাম দিয়ে তাঁকে আর তাঁর ছোট ভাই নিত্যানন্দকে যুগ্মভাবে আশ্রম চালানোর দায়িত্ব দিয়ে যান। অবশ্য কিছু বিতর্কিত ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে ১৯৮৫তে নিত্যানন্দকে আশ্রম ছেড়ে যেতে হয়, আর তখন থেকেই গুরুমাঈ সিদ্ধপীঠ সমেত সমগ্র সিদ্ধযোগা ফাউন্ডেশনের সর্বেসর্বা।

(৪)
আমার সিদ্ধপীঠ আশ্রমে যে কার্যক্রমে যোগ দেওয়ার কথা তার নাম 'Retreat to Pilgrimage of Heart', বাংলায় বললে 'হৃদয়তীর্থে একান্তবাস'। রিট্রীট কথাটার অনেক অর্থ হয়, স্বামী শিবানন্দ, ইনি জন্মসূত্রে আমেরিকান, বোঝালেন। আমরা যেমন যেমন বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছি, বুদ্ধি, দৈহিক শক্তি, জ্ঞান, অর্থ এসব এসে হৃদয়বৃত্তিকে দূরে এককোনে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। বিশ্বে অনেক তীর্থস্থান আছে, অনেক দেবতা, অনেক দুর্গম যাত্রা, কিন্তু সেরা তীর্থ আপন হৃদয়। সে যা দেখায় তাই স্বচ্ছ, নির্মল, যা করায় তাই পুণ্যকর্ম, যা ভাবায় তাই অধ্যাত্মচেতনা। আগামী তিনদিন ধরে আমরা বর্তমান জীবন ভুলে ফিরে যাব হৃদয়ের তীর্থে, উপলব্ধি করার চেষ্টা করব শাশ্বত শুদ্ধাত্মাকে যাঁর বাস প্রতি মানুষের হৃদয়ে বা অন্তঃকরণে। কুলকুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করা অনেক বড় যোগসাধনার ব্যাপার। আমরা কর্মব্যস্ত মানুষ, সে সব বুঝি না, পারার প্রশ্নই নেই। কিন্তু দেহের এই ষড়চক্রের মাঝে যে অসীম মানসিক শক্তি লুকিয়ে আছে তার একটুকরো অনুভব- এটুকুও যদি পাওয়া যায়! আরো অনেক বিশাল বড় বড় জ্ঞানের কথা শুনেছিলাম সেদিন, অত বুঝি নি, আর কিছু মনেও নেই। এবার একটু আশ্রমবাসীদের প্রসঙ্গে আসি।

এখানে আসার পর থেকে বিভিন্ন ছোট-বড় কাজে রত যাদেরকে দেখছি চারপাশে, তারা কিন্তু একটু অন্যরকম, মানে ঠিক কাজের লোক বা মাইনে করা কর্মচারী বলে মনে হচ্ছিল না। কথিত আছে প্রাচীন ভারতে মণ্ডনমিশ্র নামে এক মহাপণ্ডিত ছিলেন যাঁর বাড়িত দাস-দাসীরাও শাস্ত্র আলোচনা করত, খাঁচার পাখিরাও উপনিষদের শ্লোক আবৃত্তি করত। প্রথমে তাই ভেবেছিলাম এঁরাও হয়ত পরিবেশ-সাহচর্যে যোগ ও অধ্যাত্ম-শাস্ত্রে পণ্ডিত হয়ে উঠেছে, মানসিক ভাবেও অনেক উন্নতিলাভ করেছে। তবে একজন ভদ্রলোক কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে পরিবেশন করছিলেন, জানালেন তাঁর নাম সমীর পারিখ, মুম্বাইয়ের একজন শিল্পপতি। রিসেপশনে যে ভদ্রমহিলা ছবি তুলে আর ফর্ম ভরিয়ে আমাদের রেজিস্ট্রেশন করালেন তিনি নাকি বাঙ্গালোরের একটি সফটোয়্যার কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার। বক্তৃতা-হলে যিনি চেয়ার সাজাচ্ছিলেন তিনি আই-আই-টি বোম্বের একজন অধ্যাপক! এঁরা সবাই আশ্রমে সেবাদান করছেন নিজের নিজের কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিয়ে। নিউ জার্সি থেকে আগত এক শ্বেতাঙ্গিনী নিত্যপূজার মালা গাঁথছিলেন, আর আমি তাঁকে দেখে অবাক হলাম না। তবে যা জেনে আশ্চর্য লাগল যে অন্ততঃ বেশ কয়েকমাস আশ্রমে যোগশিক্ষার ছাত্র হিসেবে না থাকলে আর দু-একটা রিট্রীটের কার্যক্রমে যোগদান না করলে সেবারও অধিকার নাকি পাওয়া যায় না। বোঝা গেল এঁরা প্রত্যেকেই হয় গুরুকুলের ছাত্র-ছাত্রী আছেন বা ছিলেন কিংবা স্বামী মুক্তানন্দ ও গুরুমাঈয়ের একান্ত ভক্ত।

পরিচয়পর্বের শেষে শুরু হল আশ্রম পরিক্রমণ। গণেশ মন্দিরের মাঠ আগেই ঘোরা হয়ে গেছে। এবার বাকিটুকু ঘুরে দেখলাম। পরিপাটি করে সাজানো ফুল-ফলের বাগান, মধ্যে মধ্যে বিভিন্ন সন্ত-তপস্বীর মর্মর মূর্তি চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। শঙ্করাচার্য, রামানুজ, মাধবাচার্য, তুলসী, জ্ঞানেশ্বর, নরসি মেহতা তুকারাম, জলারাম, রামকৃষ্ণ পরমহংস, তৈলঙ্গস্বামী, সুরদাস, মীরাবাঈ, শ্রীচৈতন্য, সাঁইবাবা- কে নেই সেই সভায়। সেখানে ধর্ম-জাতের ভেদ নেই, মুসলমান তাঁতী কবীর বা শুদ্র চর্মকার সন্ত রুইদাসও সসম্মানে বিরাজিত- একেবারে সশিষ্য। পুরাকালের ব্যাস-বাল্মীকি-বিশ্বামিত্র-গৌতম-যাজ্ঞবল্ক-মনুও বাদ যাননি, সপ্তর্ষিমণ্ডলের ঋষিরাও আছেন। হিন্দুধর্মের দিকপালরা ছাড়া অন্যান্য ধর্মগুরুরা যেমন নানক, খ্রীস্ট, বুদ্ধ, মহাবীরদের মূর্তিও ছিল, কেবল ইসলাম নবী হজরত নেই, থাকার কথাও নয়- তাঁরা মূর্তিপূজার বিরোধী। সবার সুবিধার জন্য মর্মর ফলকে সকলের নাম-পরিচয়-সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনীও লিপিবদ্ধ করা ছিল প্রতি মূর্তির সাথে। সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে হোমকুণ্ড, হঠযোগের অভ্যাস-স্থল, লাইব্রেরি, ধ্যান বা মেডিটেশন সেন্টার, সব ঘুরে দেখে রীতিমত অভিভূত হলাম।
এই করতে করতে সাড়ে এগারটা। লাঞ্চ-ব্রেক। একই নিয়মে মধ্যাহ্নভোজন সারলাম সবাই মিলে। এরপর শুরু হবে যোগাভ্যাসের ক্লাস।   

(৫)
আমাদের গ্রুপে আমি আর যাদবজীই আশ্রমজীবনে নতুন। বাকি সবাই বহুদিন ধরেই গুরুকুলছাত্র বা স্বামী মুক্তানন্দের বা গুরুমাঈয়ের ভক্ত, বহুদিন ধরে গণেশপুরী বা বিশ্বজুড়ে থাকা বিভিন্ন সিদ্ধযোগের শাখা আশ্রম বা কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত আছেন। ত্রিশজনের গ্রুপে অন্ততঃ অর্ধেকই তো শ্বেতাঙ্গ বিদেশী-বিদেশিনী। আমরা কর্পোরেট-সূত্রে প্রবেশাধিকার পেয়েছি, সুতরাং যোগাভ্যাস প্রণালী, এর রীতিনীতি সম্বন্ধে বিশেষ ভাবে অজ্ঞ। তবু স্বামী মহেশানন্দ যোগের ক্লাস গোড়া থেকেই শুরু করলেন।

যোগ কথার সোজা অর্থ আত্মার সঙ্গে পরমাত্মাকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া। প্রাণত্যাগ করলে জীবাত্মা আপনি তা পায়, কিন্তু জীবদ্দশায় তার অনুভব পেতে সাধনার প্রয়োজন, এই সাধনার অভ্যাসই যোগ। যোগের চারটি পদ্ধতি, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ আর রাজযোগ। প্রথম তিনটি পদ্ধতি মূলতঃ মানসিক। জ্ঞানযোগ শিক্ষার পথ। সাংখ্য, দর্শন, বেদান্ত ইত্যাদি শাস্ত্রপাঠ করে শ্রবণ, মনন আর নিদিধ্যাসনের মধ্য দিয়ে এই পথে এগিয়ে সিদ্ধিলাভ করা যায়। ভক্তিযোগের মূল হল দাস, সেবক, সখা বা প্রেমীরূপে ঈশ্বরের কাছে নিঃশর্ত আত্মনিবেদন। পূজা, প্রার্থনা, নামগান ও সংকীর্তন জাতীয় ক্রিয়াই ভক্তিযোগের পদ্ধতি বা প্রকরণ। কর্মযোগের কথা গীতাতে বিশেষভাবে উল্লিখিত আছে। ঈশ্বর, মানুষ, জীবজন্তু, প্রকৃতির প্রতি নিষ্কাম সেবা আর কর্মই এই সাধনার পদ্ধতি, 'মা ফলেষু কদাচন্‌'- ফলাফল ভগবানকে সমর্পণ করতে হবে।

এছাড়া ব্যক্তিসত্ত্বাকে বিকশিত করে আত্মোন্নতির মাধ্যমে পরামার্থপ্রাপ্তির যে সাধনা, যার কথা স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বক্তৃতার সময় বিশ্বকে জানান, তার নাম 'রাজযোগ'। অন্য পদ্ধতিগুলিতে মন আর হৃদয় ছিল মুখ্য, দেহের ভূমিকা ছিল গৌণ। রাজযোগে মনের সাথে সাথে দেহকেও যুক্ত করে হয় সাষ্টাঙ্গ-সাধনা, এর ফল হয় অনেক বেশি কার্যকর। এই রিট্রীটে রাজযোগের উপর আমাদের আকর্ষণকে কেন্দ্রিত করার কথা বললেন শ্বেতাঙ্গ স্বামী মহেশানন্দ। তিনি বোঝালেন রাজযোগের আটটি অঙ্গ- ১) যম (অহিংসা, সত্য, আস্তেয়, ব্রহ্মচর্য আর অপরিগ্রহ)- জৈনদর্শনে সম্যকচরিত্রের পাঁচটি মহাব্রতের নাম, বৌদ্ধধর্মে যা পঞ্চশীল ২) নিয়ম বা অনুশীলন- শৌচ (পরিচ্ছন্নতা), সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় আর ঈশ্বর প্রণিধান ৩) আসন বা দেহের ভঙ্গিমার দ্বারা বিভিন্ন শারীরিক প্রক্রিয়া আর ৪) প্রাণায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাস্থ্যকর বিধি- এই দুইয়ে মিলে বলা হয় হঠযোগ ৫) প্রত্যাহার বা বিধিসঙ্গত বিরাম, বিশ্রাম ৬) ধারণ বা মনঃসংযোগ ৭) ধ্যান বা একাগ্রচিত্তে পরমাত্মার প্রতি চিত্ত-নিয়োজন ও ৮) সমাধি অর্থাৎ বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে আত্মাকে বহিরঙ্গে পরমাত্মার মধ্যে প্রতিস্থাপন। এটি সাধনার উচ্চতম স্তর।

ধীরে ধীরে ঘরের আলো কমে এল। একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল হলঘরের মধ্যে। একটা মৃদু ওঙ্কারধ্বনি সুরে বেজে চলেছে। আমরা সকলে মাটিতে আসন পেতে বসেছিলাম। স্বামীজি বললেন মনঃসংযোগ করে চোখ বন্ধ করতে। এরপরে আদেশ হল ওঙ্কারধ্বনির প্রতি কান রেখে পারিপার্শ্বিক ভুলে একমনে বিশ্বের নিয়ন্ত্রক কোন শক্তির কথা ভাবতে। আমরা আজ্ঞা পালন করলাম। এভাবেই অন্ততঃ মিনিট পনের কেটে গেল। তারপর ধীরে ধীরে ওঙ্কাররব থেমে আলো আগের মত জ্বলে উঠল। স্বামী মহেশানন্দ বললেন, তোমরা কে কী দেখলে একে একে শেয়ার কর, আমরা শুনি।

(৬)
'আমি দেখলাম অন্ধকারে শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছি, হঠাৎ চারদিক আলোকিত হয়ে উঠল। কিছুই বুঝতে পারছিনা। এমন সময় আমার পাশে গুরুমাঈ এসে দাঁড়ালেন। আমি প্রণাম করতেই হাত ধরে টেনে তুলে আমাকে নিয়ে শূন্যে উড়ে চলতে লাগলেন। তারপর আর মনে নেই।'
একজনের বর্ণনা শেষ হতেই আরেকজন। 'আমি এক জ্যোতিঃসমুদ্রের মাঝে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছি। উল্টোদিক থেকে একে একে আসছেন সেই সব মহাপুরুষেরা যাঁদের মূর্তি আশ্রমের বাগানে সাজানো আছে।'
'আমি এই ঘর থেকে নড়িনি। কিন্তু চোখ বন্ধ করেও স্পষ্ট দেখলাম আমার সামনে স্বামী নিত্যানন্দ ধ্যানস্থ হয়ে আছেন আর স্বামী মুক্তানন্দ তাঁর পদসেবা করছেন।'

এবার আমার পালা। 'আমার ঠিক মনে পড়ছে না। ঘরের পরিবেশটা এত মায়াময় হয়ে উঠেছিল, বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।' আমার কথায় সবাই হেসে উঠলেন। মহেশানন্দ কিন্তু হাসলেন না। তিনি বললেন-'সেটাই স্বাভাবিক। প্রথম প্রথম ধ্যানে বসে ঘুম আসাটাই নর্ম্যাল। আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর অনেস্টি, মাই ফ্রেন্ড!' আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
'যাক, ধ্যানের একটা ফীল তোমরা পেলে', স্বামীজি বললেন। 'টী ব্রেকের পর লাইব্রেরিতে কিছুক্ষণ বসতে পার। তারপর আমরা যাব স্বামী নিত্যানন্দের সমাধি-মন্দির দর্শনে। ফিরে এসে ডিনার করে আজকের প্রোগ্রামের সমাপ্তি। কালকের দিনটির সম্বন্ধে একটি বিশেষ সূচনা। আগামীকাল এই রিট্রীটের সব ছাত্রের জন্য আছে মৌনব্রত। ক্লাসরুমের মধ্যে প্রয়োজনে কো-অর্ডিনেটার বা লেকচারারের সঙ্গে ছাড়া পারতপক্ষে কেউ কথা বলবে না সারা দিন।'
'আশ্রমের পথে যদি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে?'
'চা খেয়ে লাইব্রেরিতে এস। প্রত্যেককে একটা করে ব্যাজ দেওয়া হবে যেটা কাল সারাদিন তোমরা গলায় ঝুলিয়ে রাখবে। ব্যাজের একদিকে হিন্দিতে লেখা 'মৌন', অন্যপিঠে ইংরেজিতে 'Silent'. Do you know that listen and silent use the same letters, they are anagrams? To listen, to truly listen to someone, even to your inner core of the heart, where you are on a pilgrimage to, you must be silent—not only outwardly silent, but also inwardly. Silent লেখা ব্যাজ দেখলে এখানে কেউ তোমাদের প্রশ্ন করবে না, আশ্রমের সবাই এটা জানে।'

নিত্যানন্দের সমাধি আশ্রম থেকে মাইলখানেকের পথ। তনসা নদীর তীরে যেখানে মাটি খুঁড়লেই একটা স্তর থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বেরিয়ে আসে উষ্ণস্রোত, সেখানে এক শান্ত মনোরম পরিবেশে ভগবান নিত্যানন্দের সমাধি মন্দির। নিত্যানন্দ নির্জনে সাধনা করতেন, প্রচারের আলোয় কোনদিনই আসতে চাননি। তবে ১৯৬১তে তাঁর মহানির্বানের পরে শিষ্য মুক্তানন্দ আর এখন স্বামী চিদবিলাসানন্দ বা গুরুমাঈ দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর শিক্ষা জনমানসে প্রচার ও প্রসারে। সেখান থেকে ফিরে এসে ডিনার সেরে সান্ধ্য প্রার্থনায় যোগ দিলাম। তারপর প্রায় সাতটায় আমরা আবাসনে ফিরে এলাম। 'মৌন' লেখা ব্যাজ পেয়ে গেছি, কাল সারাদিন কথা বন্ধ। ভোর সাড়ে তিনটেয় উঠতে হবে, তাই সাড়ে আটটার মধ্যেই শুয়ে পড়লাম।  


(৭)
পরদিন আমরা 'মৌন' লেখা ব্যাজ বুকে ঝুলিয়ে আশ্রমে এলাম। প্রার্থনাসভায় বসে আধঘণ্টা নামগান আর ভজন শুনলাম, তবে গলা মেলাই নি। তারপর চা-বিস্কুট খেয়ে মন্দির পরিক্রমার নামে মর্নিং ওয়াক, ফিরে এসে শুরু হল যোগা-কেন্দ্রের হলে হঠযোগের অভ্যাস।
হঠযোগ রাজযোগের একটি অঙ্গ যাতে শরীরের সাধনায় মনের উপর নিয়ন্ত্রণ আনা হয়। এর শুরু হয় প্রাণায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঠিক পদ্ধতি আর অভ্যাস দিয়ে, যেটা বাবা রামদেবের টেলিভিশন আর সিডির কল্যাণে এখন সবার জানা। এর পরের স্টেজ আসন। পদ্মাসন থেকে শুরু, উষ্ট্রাসন, গোমুখাসন, হলাসন, শলভাসন, ময়ূরাসন, সর্বাঙ্গাসন আর সবার মাঝে মাঝে একবার করে শবাসনে কিছুক্ষণ করে বিশ্রাম। শবাসন জিনিসটা আমার মন্দ লাগে নি, এটা আমি রোজ ৬-৭ ঘন্টা করে থাকি, এখনও! তবে ভয় ছিল শীর্ষাসন নিয়ে, সঙ্গত কারণেই দু-দিনের অতিথিদের জন্যে সেটার শিক্ষাটা বাদ দেওয়া হয়েছিল, বাঁচলাম।

Related image
ক্ষিদে পেয়ে গেছিল। প্রাতঃরাশে দুধ দিয়ে আটার মোটা পাঁউরুটি হাফ-পাউন্ড মেরে দিলাম। তারপর অধ্যাত্ম-বিদ্যার শিক্ষা, ক্লাস নিলেন আই-আই-এম বাঙ্গালোরের একজন প্রফেসার, তিনি কন্নড় কিন্তু পদবীতে বাঙালি। তন্ত্রবিদ্যা দিয়ে শুরু করলেন দেহের ষট-চক্র সম্বন্ধে বক্তৃতা। আমি ঠিক বুঝলাম না, এটা আধ্যাত্মিক, না সত্যিকারের অ্যানাটমি না দুয়ের যোগ। মানুষের মস্তিষ্কের গঠনের একটা বিজ্ঞানসম্মত রূপ, কার্যকারিতা থাকলেও এর শক্তির সীমারেখা মনে হয় কোন অ্যানাটমির নিয়মের ধার ধারে না, আর তাই দেখেই আদিম-কাল থেকেই মানুষের যত কল্পনার উদ্ভব। কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হলে বা তৃতীয় নয়নের উন্মোচন হলে যে কী অঘটন ঘটতে পারে, কী আশ্চর্যজনক অনুভূতি জেগে ওঠে তা বলে বোঝানো যায় না, এদিকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কে দেয়! অগত্যা এমত পরিস্থিতিতে বিশ্বাসই শ্রেষ্ঠ পথ। সঙ্গের ছবিটি দেহের আনুমানিক ছ'টি চক্রের অধিষ্ঠান আর তাদের পরস্পরের সংযোগ-বিবরণ বোঝায়। এই ছয় চক্রের একটু বিশদ পরিচয় দিই, বিশ্বাস করা না করা ব্যক্তিগত বিবেচনা।

   


এটা ধরে নেওয়া হয়েছে যে মানুষের শরীরের সুষুম্না নাড়ির মধ্যে পদ্মের আকৃতির ৬টি চক্র আছে।ষট্‌চক্র গুপ্ত ও রহস্যজনক, বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, অলৌকিক এবং অতীন্দ্রিয়, যদিও বর্ণনায় শরীরভিত্তিক হিসাবে বর্ণিত। সংক্ষেপে এগুলো হল-
১। 'মূলাধার চক্র', প্রথম চক্র, মানুষের মূলশক্তি বা 'কুণ্ডলিনী শক্তি'-র আধার ! এর অবস্থান সুষুম্নার অধোমুখে, গুহ্যের অধোদেশে! মূলাধার চক্র দেখতে নাকি রক্তবর্ণ। ওখানকার পদ্ম চতুর্দল অর্থাৎ চারটি পাপড়িবিশিষ্ট! 
২। 'স্বাধিস্থান চক্র',   দ্বিতীয় চক্র। লিঙ্গমূলে অবস্থিত। সিঁদুরে লাল রং, যাকে বলে অরুণ ঊষা বর্ণ। যড়্‌দল অর্থাৎ পদ্মের পাপড়ি ছয়টি।
৩। 'মণিপূরক চক্র' অবস্থিত। সুনীল বা গাঢ় নীল বর্ণ। এর পদ্মের পাপড়ি দশটি।
৪। 'অনাহত চক্র'। এটি অবস্থিত ! পদ্মের কলি অর্থাৎ পদ্মের কুঁড়ির মতো লাল রং। পাপড়ি বারোটি মানে দ্বাদশ দল যুক্ত।
৫। 'বিশুদ্ধ চক্র' কৃষ্ণলোহিত বা কালচে লাল বর্ণ। পদ্মের ষোড়শ দলের সজ্জা অর্থাৎ পাপড়ি ষোলটি।৬। 'আজ্ঞা চক্র'। ষষ্ঠ ও শেষ চক্র। দুই ভ্রু-র মধ্যে অবস্থিত। চন্দ্রসদৃশ শুভ্র বর্ণের। পদ্ম দ্বিদল, পাপড়ি মাত্র দুটি।
তান্ত্রিক যোগী সাধনার মাধ্যমে ঐ যট্‌চক্রের ছয়টি চক্রকে ভেদ করে নিজের মূলাধারের কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগিয়ে তুলে  মস্তিষ্কের শীর্ষের সহস্রারপদ্মে শক্তিরূপে গমন করেন। সহস্রার শিরোমধ্যে আছে সহস্রদল পদ্ম। ওখানে পরম শিবের পবিত্র অধিস্থান! তান্ত্রিক যোগী সেখানে শিবের সাথে মিলিত হয়ে সহস্রার-ক্ষরিত অমৃতধারা পান করে অনির্বচনীয় পরমানন্দ উপভোগ করেন। সেটাই নাকি সাধনার সিদ্ধিলাভ। প্রয়োজনে তান্ত্রিক যোগী আবার ষট্‌চক্র ভেদ করেন ! আবার করেন। আবার করেন.....
তান্ত্রিক যোগী অনির্বচনীয় পরমানন্দ উপভোগ করেন! যোগী অনির্বচনীয় পরমানন্দ উপভোগ করেন! অনির্বচনীয় পরমানন্দ উপভোগ করেন! পরমানন্দ উপভোগ করেন!



(৮)
এতদূর পর্যন্ত ঠিক ছিল। ভাবছিলাম এর পরের পর্ব আর লিখব কিনা, কারণ তারপরেই শুরু হল এক পরস্পরবিরোধী সংলাপ আর কিছু রহস্যমোচন।

সেদিন মধ্যাহ্নভোজনের পরের পর্বে ভারতের আধ্যাত্মিক, যোগসাধনা আর ধর্ম-সংস্কৃতির ঐতিহ্য নিয়ে খানিক চর্চা হচ্ছিল। স্বামীজির উদ্দেশ্য ছিল উপস্থিত সবাইকে গুরুমাঈয়ের কৃপালাভের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করতে অনুপ্রেরিত করা। এখানে আমি একটা বেমক্কা প্রশ্ন করে ফেললাম- গুরুর কৃপায় আমার কী লাভ হবে? উত্তর পেলাম- ঈশ্বরকে পাবার পথ প্রশস্ত হবে। এইবার একটু হোঁচট খেলাম। আমি নাহয় চল্লিশের কোঠায় আছি, যাদবজি ষাটের কাছাকাছি হবেন। আমরা তবু ভগবদ্‌প্রাপ্তির সাধনা শুরু করতে পারি। কিন্তু এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষের বয়সই ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে, নিউজিল্যান্ড থেকে আগত এক সদ্যবিবাহিত দম্পতি আর দু-একজন তরুণ ছাত্রও আছেন তাদের মধ্যে। তারা হঠাৎ এই কাঁচা বয়সে ঈশ্বরপ্রাপ্তির সাধনায় মত্ত হয়ে উঠলেন কেন? আমি সেকথা শ্রীমহেশানন্দকে জানালাম। বললাম, আমি তো ঈশ্বরকে পাবার আশায় এখানে আসিনি।
- তাহলে কী জন্যে এসেছেন?
- কেন, সে তো প্রোগ্রামের নামেই রয়েছে- 'হৃদয়-তীর্থে ফিরে তাকানো', আমার ধারণা ছিল ধ্যান আর যোগের মাধ্যমে আত্মিক আর আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটানো ছিল এর উদ্দেশ্য।
- তা তো বটেই। তবে প্রকৃত উদ্দেশ্য তো নির্বাণ আর মোক্ষেরই সাধনার হাতেখড়ি! 

বুঝলাম, এঁদের ভাষণ আমাদের অর্থাৎ ভারতীয় হিন্দুদের তেমন কোন কাজেই আসবে না। পাশ্চাত্য উন্নত দেশগুলোতে কর্মব্যস্ত মানুষের কিছুটা শান্তি চাই, কাজ থেকে চাই সাময়িক মুক্তি আর তার চেয়েও বড় কথা অজস্র ডলারের আর ইউরোর বোঝা থেকেও খানিকটা মুক্তি, যে কাজটা আমাদের স্বামীজিরা ভালই বোঝেন। স্বামী বিবেকানন্দও বুঝেছিলেন, তবে তিনি সেটা স্বীকারও করেছিলেন। তাঁর বিভিন্ন রচনাতেই পরিস্ফুট হয়েছে যে পরাধীন দরিদ্র ভারতবর্ষের দুঃখমোচন করতে দরকার সুসংবদ্ধ আর সংহতিপূর্ণ, সুনিয়ন্ত্রিত, নিঃস্বার্থ সেবামূলক কাজের, আর তার জন্যে প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। আমেরিকা-ইউরোপ দেশের মানুষের অর্থ আছে, তারা ভারতের আত্মার সন্ধান পেতে চায়, সেবার ভাবনা তাদের মধ্যেও সংক্রমিত করা যায়, বিভিন্ন বক্তৃতা আর রচনার মাধ্যমে তিনি তাই করেছেন, মূলতঃ তারই ফলস্বরূপ গড়ে উঠেছে রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম সংঘ। তখন হিন্দুত্ব নামক বস্তুটির ধারণা ছিল না বিশ্বের দরবারে, ভারতের ছবি দারিদ্র, সাপুড়ে, কুসংস্কার আর কালা-জাদুর দেশ হিসেবে দেখানো হত পাশ্চাত্য দুনিয়ায়। সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ তুলে ধরলেন সনাতন ধর্মের উচ্চ আদর্শকে যা সর্বংসহা মনোভাবের বশবর্তী হয়ে হারতে হারতে আত্মবিশ্বাস খুইয়ে বসেছিল, তিনি তাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন এক অনন্য সম্মানের আসনে, পশ্চিম দুনিয়ার মনোযোগ আর শ্রদ্ধা আকর্ষণ করল অবহেলিত ভারতবর্ষ আর মানহারা, বিশ্বে প্রায় অপরিচিত সনাতন হিন্দুধর্ম। বিবেকানন্দের সাফল্য উৎসাহিত করল, কিছু ক্ষেত্রে লোভও দেখাল অনেক আধ্যাত্মিক সাধু, যোগী আর সেই সঙ্গে বেশ কিছু ভণ্ডকেও। তারপর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একে একে গড়ে উঠল স্বামী প্রণবানন্দের ভারত সেবাশ্রম সংঘ, চিন্ময় মিশন, স্বামী শিবানন্দ সরস্বতীর দিব্যজীবন সমাজ, শ্রীভক্তিবেদান্তের কৃষ্ণ-চেতনা সমাজ বা ইস্‌কন ও হাল-আমলের শ্রীশ্রীরবিশংকরের আর্ট-অফ-লিভিং ফাউন্ডেশন। এঁরা মানুষের উপকার করেননি তা নয়, তবে সংঘমূলক দু-একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া এঁদের কর্ণধাররা হয়েছেন অগাধ সম্পত্তির অধিকারি, গা ভাসিয়েছেন চরম বিলাসিতায়, অনেকে রীতিমতো বদনামও কুড়িয়েছেন দেশে বিদেশে। যাক, যে পর্যন্ত মানুষ স্বেচ্ছার অর্থ, সম্পত্তি বা শ্রমদান করেন কার কী বলার থাকতে পারে? তবে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে ভারতের প্রাচীন নির্লোভ আর অনাড়ম্বর জীবনযাপনের ঐতিহ্যের অবনমন হচ্ছে বই কি, তথাকথিত ধার্মিক নেতারা নানা বিতর্ক আর দুর্নামে জড়িয়ে পড়ে এ দেশের কষ্টার্জিত সম্মানহানিরও কারণ হয়েছেন মাঝে মধ্যেই- সে বিতর্ক নাহয় এখন থাক। আমি সামান্য মানুষ, বেশি কিছু বলার ক্ষমতা, বুদ্ধি বা সাহস কোনটাই আমার নেই, যুক্তি দিয়ে ঘটনাপ্রবাহ বোঝার চেষ্টা করি, আর কেউ ভয় দেখালে বা জোরাল গলায় (হোক সে অন্যায়) ধমক দিলে বাধ্য হয়ে চুপ করে থাকি।

যাকগে সে সব কথা, আমরা আদার ব্যাপারি, জাহাজের খোঁজের কী দরকার? তিনদিনের অনুষ্ঠান কিন্তু সত্যি খুবই উপভোগ করেছিলাম। আশ্রমের পরিবেশ, সাধারণ মানের জীবনযাত্রা আর অসাধারণ উচ্চমানের আধ্যাত্মিক আলোচনা- তুলনাহীন এই দুইয়ের সন্তুলন। আমার কাজে লাগুক বা না লাগুক, প্রাচীন ভারতের গুরুকুল-সংস্কৃতির কিছুটা হলেও আভাস পেলাম এই ক'দিনে, তার স্মৃতি নিয়েই চতুর্থ দিনে বাড়ি ফিরলাম।

(শেষ)

Friday, November 1, 2019

বিহার-বেঙ্গল সন্তরণ চ্যালেঞ্জ!! গল্প

বিহার-বেঙ্গল সন্তরণ চ্যালেঞ্জ!!গল্প

হাইস্কুলে পড়ার সময় সাঁতারটা মোটামুটি শেখার পর জল দেখলেই হাত-পা গুলো কেমন যেন উসখুস করত। ভাবতাম, যারা সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে যায় বা ভয়ে মরে তারা নিতান্তই বোকা। আমার পাড়ার বন্ধুরাও এ ব্যাপারে কেউ কম যেত না কিন্তু আমার মত আত্মবিশ্বাস বোধহয় কারো ছিল না।
একবার মার্চ মাসে আমরা দামোদরের ধারে পিকনিকে গেছি। এপারে আমাদের দিকটা বিহারে, ওপারটা বেঙ্গল। জল তখন অতটা ঠাণ্ডা নেই। অগত্যা আমাদের বন্ধুদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেছে সাঁতার কাটার জন্যে। তার মধ্যে তোতা বলে উঠল, বিহার থেকে বেঙ্গল গিয়ে ফিরে আসতে হবে, যে পারবে সে আজকের হিরো! এতটা কারো সাহস ছিল না, যদিও এটা সেই বিদ্যাসাগরের আমলের মেদিনীপুরের দামোদর নয়। তবু আমি কি ভেবে হাত তুলে দিলাম। অরে এই তো এতটুকু! লেকের জলে তো আমরা প্রতিদিন এর চেয়ে বেশি দূরত্বে দু-তিনবার এপার ওপর করি। তখন মরা নদী, স্রোতও তেমন ছিল না। 'তোদের সাহস হোক না হোক, আমি ঠিক পারব, দেখে নে।' সবাই হই হই করতেই আমি জলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
এদিকে আমি সাঁতার শুরু করতেই হয়েছে কি, ডিভিসির তেনুঘাট না কোথাকার যেন কোন ড্যামের জল ছেড়ে দিয়েছে। আমি বুঝতে পারছি নদীর মাঝখানে স্রোত বেড়ে গেছে, আমি কিন্তু অবলীলায় দু মিনিটের মধ্যেই মাঝনদীতে এসে পড়েছি। তারপর আর এগোতে পারি না, দম ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু মান-সম্মানের প্রশ্ন, হেরে গেলে চলবে না। লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।
হঠাৎ দেখি তীরের কাছে এসে পড়েছি। 'এই তো একটু, আরেকটু হলেই -', কারা যেন উৎসাহ দিচ্ছে। আমি উত্তেজনার বশে খেয়াল করিনি কখন হাঁটু জলে এসে পড়েছি। ঠাহর হতেই হাসতে হাসতে তীরে। এবার একটু দম নিয়ে ওপারে ফিরতে হবে।
হঠাৎ কারা যেন সাবাস সাবাস বলে উঠল। গলাগুলো খুব চেনা ঠেকল। ও মা, দেখি বন্ধুরা আমার আগেই সবাই এ পারে এসে গেছে। কি করে এল? ও হরি! আমি তো যে বিহারে ছিলাম সেই বিহারেই আছি! এতক্ষন তবে কি করলাম?
'এটা কেমন করে হলো?' আমি হতাশ হয় জিজ্ঞেস করলাম। 'এই জন্যেই বলি, বিজ্ঞানের বইগুলো শুধু মুখস্থ না করে তার মানেগুলো বোঝার চেষ্টা কর,' সদ্য হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা শেষ করা বাবলুদা হেসে বলল। আমি তবুও বুঝি না। 'ওরে গাধা, বার্নৌলির থিওরেম মনে কর। যখন ড্যামে জল ছাড়ে মাঝনদীতে জলের গতিবেগ বেড়ে যায় আর তার ফলে চাপ যায় কমে। ফলে তুই খুব সহজেই মাঝ নদীতে চলে গেলি, কিন্তু সেই একই কারণে পার হতে পারলি না।'
'তাহলে আমি ফিরে এলাম কি করে, বাবলুদা?'
'বুঝতে পারিস নি কখন ঘুরে গেছিস। আর খেয়াল করেছিস বোধহয় যে এ পাড়ে একটা ভেতরের দিকে বেন্ড আছে। তার ফলে এ প্রান্তে জলের বেগ বেশি, চাপ কম। যাক, এর বেশি বুঝতে চাস না, তাহলে আমার জ্ঞানে কুলোবে না।'
কি জানি বাবলুদা কতটা ঠিক বলেছিল, কোন ফিজিক্সের বইয়ে এরকম উদাহরণ জন্মে দেখিনি। তবে এ ও সত্যি যে, এরপর আর কোনোদিন আমি সাঁতরে নদী পারাপার করার সাহস দেখাই নি।

Thursday, October 31, 2019

ও শ্যামাদাস।। বিবিধ

ও শ্যামাদাস


(এই শিরোনামে জোর করে কিছু জ্ঞানদান করছি, আরও করব, যে পর্যন্ত না শ্যামাদাসরা দূর থেকে দেখেই পালায়)

'মামা মামা' ডাকছে কেন ঐ হুঁকো-মুখো হ্যাংলায়?
ও শ্যামাদাস, আয় না রে তুই, আয় না চলে এ বাংলায়।
তুই না এলে জ্ঞানগুলো সব মাথার মাঝে চরকি খায়;
বিশ্বকোষটা সোডার মতন পেটের ভেতর ভস্‌ভসায়।
কেই বা শোনে কাহার কথা, সবাইকে কি বলাও যায়?
ও শ্যামাদাস, সব বাঙালিই বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই।

(১)
"T'was brillig and the slithy toves
Did gyre and gimble on the wabe.
All mimsy were borogoves
And the mome raths outgrabe!"

-কিরে, কিছু বুঝলি?
-কিচ্ছু না।
-তাহলে?
-মনটা আনন্দে ভরে উঠল।
কি কাণ্ড! চারটে মাত্র লাইনের মধ্যে ১১টা শব্দ অভিধানের বাইরে, জানাল কম্প্যুটারের স্পেল আর গ্রামার চেক প্রোগ্রাম। তবু এ ছড়া অমর হয়ে আছে শিশুসাহিত্যে।
তবে বুঝলি শ্যামাদাস, আমাদের লুই ক্যারল নেই তো কি হয়েছে, সুকুমার ত আছেন! লীলা মজুমদার আছেন, সত্যজিৎ রায় আছেন। শুনবি ছড়াটা বাংলায়?

"বিরলিঙেতে আকাশ ভরা , শ্লিথিল টভরী-রা
ক্ষেভের মাঝে গায়রা দিয়ে গিম্‌গিমিয়ে ডাকে;
বরদ্গবের সব কটা আজ মিম্‌সিয়ে ব্যস্থিরা,
মৌমা বাতাস হুহুঙ্কারে হাত্রাসী হাঁক হাঁকে।"
(লীলা মজুমদার)

"বিল্লিগি আর শিঁথলে যত টোবে
গালুমগিরি করছে ভেউএর ধারে,
আর যত সব মিমসে বোরোগোবে
মোমতারাদের গেবগেবিয়ে মারে।"
(সত্যজিৎ রায়)

(২)
আজকাল ফেসবুকের দৌলতে সবার একটা করে ব্যক্তিগত দেয়াল আছে। আজ তাই নিয়ে একটু দেয়ালা করি। বল তো, প্রথম দেয়াল কে দিয়েছিল? জান না? - শেয়ালের বাপ। রূপকথার ছড়ায় আছে-
'এক যে ছিল শেয়াল
তার বাপ দিয়েছিল দেয়াল!'
সে দেয়ালে প্রথম লিখেছিল কে? কে আবার- কবি সুকান্ত!
'দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে লিখি কথা-
আমি যে বেকার, পেয়েছি লেখার স্বাধীনতা।' (দেয়ালিকা)

দেয়াল লিখন জিনিষটা বাম আমলের বাংলায় একটা শিল্পকলার উচ্চতায় পৌঁছে গেছিল। "তোমার নাম, আমার নাম- ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম" কিম্বা "গরুর জন্যে বিনোবা ভাবে/ মানুষের জন্যে কে ভাবে?" এসব আর কোথায় পাবেন? সব আমরা হারাতে বসেছি।

এখন থাকছে শুধু দেয়ালা। দেয়ালা বোঝেন তো? স্বপ্নের ঘোরে শিশু কখনও কাঁদে, কখনও হাসে। সবাই বলে, নাকি পূর্বজন্মের স্মৃতি মনে পড়ে তার। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন- তিনি বড় কবিও ছিলেন। লিখেছেন-
"শৈশবের আবছায়ে শিশুর দেয়ালা-
তেমনি অশোক তোর লালে লাল খেলা।" (অশোক)
শহরের দেয়াল জুড়ে একসময় লালে লাল খেলা হত, নীল, সবুজ- খেলা হয়েছে, এখন দেয়ালে গেরুয়া রঙও লেগেছে, কিন্তু গত শতাব্দীর সেই অপূর্ব দেয়ালিকাগুলি যেন কোন বিস্মৃতজন্মের ছায়ালোকের দেয়ালা বলেই মনে হয়।
(৩)
ঈশ্বর যা করেন সব মঙ্গলের জন্যে। ভাগ্যিস পৃথিবীর জন্যে কিছু করেন না, তাহলে পৃথিবীরও মঙ্গলের মত দশা হত!

(৪)
কেহ মরে বিল চেঁছে, কেহ খায় কই,
গেছোদাদা ঝোলে গাছে, নেপো মারে দই

(৫)
এই কথাটা ঢুকল না কি নিরেট তব মগজে-
'ভাল মন্দ যাহাই ঘটুক, সত্যেরে লও সহজে।'

(৬)

নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ।। (প্রবন্ধ)

নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ।।
(প্রবন্ধ)

(১)
কিছু কালোয়াতি ওস্তাদ আছেন যাঁরা সদাই নাক বেঁকিয়ে বলেন, নজরুলগীতির কাছে রবি ঠাকুরের গান কিছুই না। সে সুরের বৈচিত্র্য নেই, বড়ো সহজ, বড্ড একঘেয়ে। তাঁদেরকে যেমন দোষ দেব না, তেমনি কোনো তুলনাতেও যাব না, কারণ উক্ত দুজনের মধ্যে ছিল গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, স্নেহের বন্ধন ছিল অটুট।
রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে ছোট ভাইয়ের মতই ভালবাসতেন, ডাকতেন 'পাগল' বলে। আর নজরুল ডাকতেন 'গুরুদেব'। তখন নজরুল শুরু করতে চলেছেন তাঁর রাজনৈতিক পত্রিকা 'ধুমকেতু'। খুব ইচ্ছে গুরুদেব যদি দু'কলমের একটা আশীর্বাণী লিখে দেন। উনি তৎক্ষণাৎ লিখে দিলেন-
"আয় চলে আয় রে ধুমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন-
অলক্ষণের তিলকরেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।।"
নজরুল ত আশীর্বাণী পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। সাথে সাথে ঠিক হয়ে গেল যে গুরুদেবের হাতের লেখায় কবিতাটি এপিগ্রাফ হিসেবে প্রতি সংখ্যা 'ধুমকেতু'র মধ্যে থাকবে উজ্জ্বল হয়ে। তবে রাজরোষ ও তত্বাবধানের অভাবে পত্রিকাটি বছর দেড়েকের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ল।
নজরুলের কিছু প্রাণের বন্ধু ছিলেন শনিবারের চিঠি খ্যাত সজনীকান্ত দাস, অশোক চট্টোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার। তাঁদের প্রতিভাকে ছোট না করেই বলছি, আভিজাত্যপূর্ণ ঠাকুর ঘরানার সাথে নজরুলের এত দহরম-মহরমে তাঁদের বেশ ঈর্ষা হত, এবং সে জ্বালা ঝাড়া হত 'শনিবারের চিঠি'র সংখ্যাগুলিতে। ওঁরা বিদ্রোহী কবিতাটিকে ব্যঙ্গ করে লিখলেন-
'আমি ব্যাঙ
লম্বা আমার ঠ্যাঙ
ভৈরব রভসে বরষা আসিলে ডাকি সে
গ্যাঙোর গ্যাঙ
আমি ব্যাঙ
দুইটি মাত্র ঠ্যাঙ...'
এর প্রতিবাদ নজরুল করেন 'আমার কৈফিয়ত'এ-
'প্রতি শনিবারই চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন-'তুমি হাঁড়িচাঁচা!'

(২)
'শনিবারের চিঠি' যে নজরুলের কবিতারই শুধু প্যারডি করেছে তা নয় সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের বিভিন্ন কবিতার সৌন্দর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে নগ্নতাকেও তুলে এনেছে। কখনো 'সংবাদ সাহিত্যে'র নামে সংবাদ কটাক্ষের আমদানি করেছে। কখনো নিছক মজা করার জন্যই নজরুলকে লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করেছে। অনেক সময় মনে হয় কেবল নজরুল ইসলামকে জব্দ করার জন্যই যেন শনিবারের চিঠির আবির্ভাব ঘটেছিল বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে।
১৩৩৪-এর ভাদ্র সংখ্যায় 'শনিবারের চিঠি'তে মোহিত লাল মজুমদার শ্রী সত্যসুন্দর দাস ছদ্মনামে নজরুলের 'অনামিকা' শীর্ষক প্রেমের কবিতাটির একটি কালো সমালোচনা করেন।
১৩৩৪-এর পৌষ সংখ্যায় চিঠিতে শ্রী কেবলরাম গাজনদার (সজনীকান্ত দাস) কচি ও কাঁচা শিরোনামে নজরুলের বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল গানটির প্যারডি করেন। এতে সজনীকান্তর অমার্জিত ও অসুস্থ মনের চিত্রটিও অস্পষ্ট নয়।
'জানালায় টিকটিকি তুই টিকটিকিয়ে করিসনে আর দিক।
ও বাড়ির কলমি লতা কিসের ব্যথায় ফাঁক করেছে ঠিক।
বহুদিন তাহার লাগি রাত্রি জাগি গাইনু কত গান।
আজিকে কারে জানি নয়না হানি হাসল সে ফিকফিক।'
নজরুলের প্রতি 'শনিবারের চিঠি'র ভূমিকা নিয়ে ভাদ্র ১৩৬০ সংখ্যায় সজনীকান্ত লিখেছেন_
নজরুলকে শনিবারের চিঠি কম গালি দেয় নাই, সত্য কথা বলিতে গেলে 'শনিবারের চিঠি'র জন্মকাল হইতে সাহিত্যের ব্যাপারে একমাত্র নজরুলকে লক্ষ্য করিয়াই প্রথম উদ্যোক্তারা তাক করিতেন। ...তবে আমাদের ছিল স্রেফ খেলা, মোহিত লালের ছিল জীবন মরণ সমস্যা। মনে আছে নজরুলের ভাষায় 'খুন-খারাপি'র আতিশয্য দৃষ্টে পীড়িত হইয়া রবীন্দ্রনাথ 'প্রবাসী'র পৃষ্ঠায় একটু কঠোর অনুযোগ উপেক্ষা করিয়া সদম্ভে বলিয়াছিলেন,_
'শনিবারের চিঠি'র কৃপায় আমি, গালির গালিচার বাদশাহ্।'
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ কাব্যগ্রন্থটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেছিলেন। এ নিয়ে কবিগুরুর ভক্তদের অনেকেই খুশি হতে পারেননি। অনেকেই ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন-
‘বসন্ত দিল রবি
তাই তো হয়েছে কবি।‘
বস্তুত দুই কবির সম্পর্কে মানসিক টানাপোড়ন শুরু হয় বাঙলা ১৩৩৩ সালের পর থেকে। ‘শনিবারের চিঠি’তে নজরুল সমালোচনার একটি নতুন অধ্যায়ের জন্ম হয়। তবে কেবল নজরুলই নন, ‘কল্লোল’ ও ‘কালিকলম’ পত্রিকার আধুনিক সাহিত্যিকরাও ‘শনিবারের চিঠি’র লক্ষ্য হন। রবীন্দ্রনাথকে ধরেছেন মোহিতলাল সহ শনিবারের চিঠির দলের লোকেরা, সাহিত্যে আধুনিকতা নিয়ে একটা লেখা না নিয়ে তাঁরা ছাড়বেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি লিখলেন-
‘সম্প্রতি আমাদের সাহিত্যে বিদেশের আমদানিতে যে একটা আব্র্রুতা এসেছে সেটাকেও এখানকার কেউ কেউ মনে করেছেন নিত্য পদার্থ, ভুলে যান, যা নিত্য তা অতীতকে সম্পূর্ণ প্রতিবাদ করে না। এই ল্যাঙটপরা গুলি-পাকানো ধুলো মাখা আধুনিকতারই একটা স্বদেশীয় দৃষ্টান্ত দেখেছি হোলিখেলার দিনে চিৎপুর রোডে। মত্ততায় আত্মবিস্মৃতিতে এরকম উল্লাস হয়; কণ্ঠের অক্লান্ত উত্তেজনায় খুব একটা জোরও আছে, মাধুর্যহীন সেই রূঢ়তাকেই যদি শক্তির লক্ষণ বলে মানতে হয় তবে এই পালোয়ানির মাতামাতিতে বাহাদুরি দিতে হবে সে কথা স্বীকার করি। কিন্তু ততঃ কিম। ঐ পৌরুষ চিৎপুর রাস্তার, অমরপুরীর সাহিত্যকলার নয়।‘ (১৩৩৪ সালের শ্রাবণ সংখ্য়া ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত ‘সাহিত্যধর্ম’)

(৩)
তখন হাইস্কুলে পড়ি, কানে এল একটি বাড়ি থেকে একটি গান, মাস্টারমশায় ছাত্রীকে শেখাচ্ছেন-
“মাগো, চিন্ময়ী রূপ ধরে আয় ।
তোর মৃন্ময়ী রূপ পূজেছি মা দুর্গা, তাই
দুর্গতি আর ঘুচল না হায়।।“
রাগটা চেনা চেনা লাগছে, হ্যাঁ, বাগেশ্রীই তো। আগমনী বা শ্যামাসংগীত, যা খুশী বলা যায়, কিন্তু এ কি কথা? কোনও বেদ-বেদান্ত, গভীর জ্ঞানের কথা নেই, শুধু কবি মাকে মাটির মূর্তিরূপে না থেকে জীবন্ত হয়ে এসে দাঁড়াতে বলছেন। আমি পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু বেশীদূর যাবার আগেই কানে এল অন্তরার কথাগুলো-
“যে মহাশক্তির হয়না বিসর্জন
অন্তরে বাহিরে প্রকাশ যার অনুক্ষণ
মন্দিরে দুর্গে রহেনা যে বন্দী-
সেই দুর্গারে এই দেশ চায় !।“
কি সর্বনাশ ! এ কোন দুর্গা ? এ কেমনি বা শ্যামাসংগীত যেখানে মাকে দেশের জন্যে চাওয়া হচ্ছে ? এ কি বঙ্কিমের আনন্দমঠের সেই
“তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি
মন্দিরে মন্দিরে।
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিনী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী
নমামি ত্বাং।।“
তবে বঙ্কিম দেশকে মাতৃরূপে পূজা করিয়েছিলেন সন্তানদলের দ্বারা। এ তো তা নয়, এ যে আত্মার মাঝে শক্তি জাগানোর সাধনা। ভক্তি নয়, আত্মসমর্পণ নয়, আত্মবলিদানের মন্ত্র। এ ভাবে কেউ কখনও মাকে ডেকেছেন বলে তো শুনিনি। ইতিমধ্য়ে শোনা গেল গানের শেষ অংশ-
“এই পূজা বিলাস সংহার কর মা,
যদি পুত্র শক্তি নাহি পায়।।“
তবে আমাকে বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয় নি । চারদিন পরে স্কুল খুলতেই নতুন শ্রেনীর কবিতা পড়াতে শুরু করলেন বাংলার মাস্টার-মশাই, আবার নজরুলের ‘শক্তিরূপেন সংস্থিতা’ মাতৃ-আরাধনা-
“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল!
দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?”
এই কবিতাটির প্রসঙ্গে আরো বেশ কিছু তথ্য জানান বাংলার স্যার। রাজনৈতিক কবিতা হওয়ার অপরাধে ১৯২২ সালের ৮ ই নভেম্বর ইংরেজরা এটিকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। সেই বছরের ২৩ নভেম্বর তাঁর যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় ও তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯২৩ সালে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে জবানবন্দী দেন যা রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে খ্যাত।
তিনি বলেছেন, ‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত.....আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়,সত্যদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে।’
প্রহসনের বিচারে কবির বছরখানেকের সাজা হয়, তাকে এই সময়ে সমর্থন জানিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন।
রবীন্দ্রনাথের 'বসন্ত' উৎসর্গের পর, নজরুল আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বসে রচনা করেন -'আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে' অর্থাৎ 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা।
(৪)
কবি নজরুল ইসলাম সৈনিক হিসাবে চাকুরি করে ২১ বছর বয়সে কলকাতায় ফিরে আসেন ১৯২০-এর মার্চ মাসে। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিসে ওঠেন নজরুল। তখন তাঁর বাক্স-পেটরার মধ্যে ছিল কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি। কমরেড মোজাফ্ফর আহমেদ তাঁর স্মৃতি কথায় লিখেছেন, ‘নজরুল ইসলাম বহু রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। তিনি কি করে এত গান মুখস্থ রেখেছিলেন ভেবে অবাক হই।’
রবীন্দ্রনাথ যখন খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার শীর্ষে, সেই সময় নজরুলের লেখালেখিতে আসা। আবেগান্ধ ভক্ত ছিলেন তিনি রবীন্দ্রনাথের। একবার রবীন্দ্র বিরোধিতার জন্য একজনের প্রায় মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন।
সেই নজরুলের লেখা মোসলেম ভারতে পড়ে চমকে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘হঠাৎঝড়ের বুকে দামামা বাজিয়ে উড়ে আসা এ কোন নূতন কবি? কে এই বঙ্গসন্তান নজরুল? যেমন তাজা, তেমনি খাঁটি, তেমনি সুন্দর! কে এই সত্যাশ্রয়ী কবি?’
ড. অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘চোখে দেখার আগে বাঁশি শুনেই যেমন মুগ্ধতা ঘটে, তেমনটা নজরুল প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘটেছিল। নজরুলকে দেখার আগে যৌবনদীপ্ত বীর সৈনিকের রচনা পড়ে রবীন্দ্রনাথ নবীন কবির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয় না ঘটলেও কবিগুরুর প্রায় সব গানই নজরুলের ছিল মুখস্ত।’
নজরুল ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরিচিত হওয়ার কাহিনী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘চলমান জীবন’ দ্বিতীয় পর্বগ্রন্থে। সেখানে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বলেন,
‘তুমি ভাই, নতুন ঢেউ এনেছ। আমরা তো নগন্য, গুরুদেবকে পর্যন্ত বিস্মিত করেছ তুমি।’
বিহবল হয়ে প্রশ্ন করে কাজী,
‘গুরুদেব আমার কোনো লেখা পড়েছেন নাকি?সত্যি বলতেন কি?’
বললেন সত্যেন দা,
‘গুরুদেবই আমাকে একদিন নিজ থেকে প্রশ্ন করলেন, কাজী নজরুল ইসলামের কোনো কবিতা পড়েছি কি না।’ তাঁর মতে, ‘ভাবের সংস্কৃতি সমন্বয়ের সাধনার এই এক নতুন অবদান আনছ তুমি।’
আনন্দের আতিশয্যে মুখের কথা শেষ করতে পারে না নজরুল,
‘গুরুদেব বলেছেন!’
অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য একটি বিশেষ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর লেখায়। কলকাতায় এক পাবলিক সভা। রবীন্দ্রনাথের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে সংবর্ধনা। সভাপতি নাটোরের মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়, গান সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, আর্শীবচন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। কলকাতার সব মহা মহা পণ্ডিত ও খ্যাতিমান ধনাঢ্য ব্যক্তি ও কবিরা উপস্থিত। অনুষ্ঠান শুরু হবে। সভা মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ উপবিষ্ট। নজরুল সভাকক্ষে ঢুকেই সোজা মঞ্চে উঠে কবিকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। আশীর্বাদ নিয়ে মঞ্চ থেকে নামার মুখেই কবি খপ করে নজরুলের হাত ধরলেন। নজরুল বিস্ময়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে তাকালেন। রবীন্দ্রনাথ সভার কর্মকর্তাদের সামনেই বললেন, না নজরুল নিচে নয়, তুমি মঞ্চে আমার পাশের আসনে বসো। ‘নজরুলের প্রতি গুরুদেবের এই সম্মানে বঙ্গীয় কবি সমাজ হতচকিত। ষাট বছরের বিশ্বকবির পাশে বাইশ বছরের তরুণ কবি! মৃত্যুর আগের বছর সত্যেন দত্তকে এই দৃশ্য দেখে যেতে হলো, প্রত্যক্ষ করতে হলো করুণানিধান, কুমুদরঞ্জনদের। তখনও নজরুলের কোনো বই বেরোয়নি, হয়তো নজরুলকে তখনও অনেকে চেনেই না। অবাক চোখে তাঁরা দেখছেন কবিগুরুর পাশে এ কে! আর রবীন্দ্রনাথ অল্প পড়া অল্প দেখাতেই বুঝে নিয়েছিলেন—কে এ! বুঝেছিলেন বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভবিষ্যৎ আসন তাঁরই পার্শ্বে।’ প্রথম বই প্রকাশের আগেই রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে আবিষ্কার করেছিলেন। দিয়েছিলেন স্বীকৃতি। সত্যি অসামান্য অন্তরচোখ রবীন্দ্রনাথের।
১৯২১ সালের আগস্টে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে প্রথম এলেন নজরুল। সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধু পবিত্র সরকার। প্রথম দর্শনে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে দেখেই বুঝেছিলেন, কবিতার আকাশে নতুন জ্যোতিষ্কের উদয় হয়েছে।
তারপর আবার দেখা দু'মাস পরে শান্তিনিকেতনে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। বোলপুর স্টেশনে কাজী নজরুল এবং ড. শহীদুল্লাহকে অভ্যর্থনা জানান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সচিব কবি সুধাকান্ত রায় চৌধুরী। কবিগুরু বললেন, ‘আমি যে তোমার গান ও আবৃত্তি শোনবার জন্যে প্রতীক্ষা করে আছি, তাড়াতাড়ি শুরু করে দাও।’ নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন, অগ্নিবীণা’র ‘আগমনী’ কবিতাটি। এছাড়াও তিনি কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে শোনান। নজরুলের অনুরোধে সেদিন রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করে শোনান, ‘মাধবী হঠাৎ কোথা হতে, এল ফাগুন দিনের স্রোতে, এসে হেসেই বলে যাই যাই।’
১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবিতা রচনা করে নজরুল সরাসরি চলে যান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে থাকেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ কবিতাটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করে নজরুলকে জড়িয়ে ধরেন।
(৫)
আগেই জানিয়েছি যে দেশমাতৃকার উদ্দেশ্য়ে কবিতা লেখার
অভিযোগে নজরুলের দেশদ্রোহের অপরাধে কারাদণ্ড হয়।নজরুল তখন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে, রবীন্দ্রনাথ বসন্ত নাটকটি উৎসর্গ করলেন নজরুলকে। যাঁরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই এটি পছন্দ করলেন না। রবীন্দ্রনাথকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন তাঁরা। এর জবাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিতজনদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস তারা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করছে। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করেনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছে মাত্র।... কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এও তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি। আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও এই সুর বাজত।'
দুখানা ‘বসন্ত’ দিয়ে একখানায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম দস্তখত করে দিয়ে বলেন, ‘তাকে (নজরুলকে) বলো, আমি নিজের হাতে তাকে দিতে পারলাম না বলে সে যেন দুঃখ না করে। আমি তাকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অকুণ্ঠ আশীর্বাদ জানাচ্ছি। আর বলো কবিতা লেখা যেন কোন কারণেই সে বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা যোগাবার কবিও তো চাই।’
জাতির জীবনে বসন্ত এনেছেন নজরুল, তাই এ নাটকটি তাঁকেই উৎসর্গ করা হবে। জেলে যখন নজরুল রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরে নাটকটি হাতে হাতে পেয়েছিলেন, তাঁর জেলজীবনের যন্ত্রণা কমেছিল। পরে নজরুল সে কথা লিখেছিলেনও।
১৯২৩ সালে ১৪ এপ্রিল নজরুলকে হুগলী জেলে স্থানান্তর করা হয়। হুগলী জেলের সুপার মি: আর্সটান রাজবন্দীদের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করতেন, রাজবন্দীদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল জেলে ৪০ দিন অনশন করেছিলেন। জেলের ভিতরে অনশনরত নজরুলের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ডান্ডাবেড়ী, সেল কয়েদ, ফোর্সড ফিডিং-এর চেষ্টা চলে, ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়েন নজরুল। মুমূর্ষু কবিকে বাঁচানোর জন্য শিলং-এ চিঠি লেখা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, তিনি যেন নজরুলকে অনশন ভঙ্গ করতে অনুরোধ জানিয়ে পত্র লেখেন। রবীন্দ্রনাথ উত্তরে বিদ্রোহী-বিপ্লবী সৈনিক নজরুলের দৃঢ়তাকে সমর্থন জানিয়ে লেখেন: "আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বলা তাকে হত্যা করারই সামিল। অনশনে যদি কাজীর মূত্যুঘটে তা হলেও তার অন্তরে সত্য আদর্শ চিরদিন মহিমাময় হয়ে থাকবে।"
শেষ পর্যন্ত, স্নেহভাজন নজরুলের অনশনে বিচলিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে টেলিগ্রাম করেন: ““Give up hunger strike, our literature claims you”। অত্যন্ত বিস্ময়ের বিষয়, জেল কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম নজরুলকে না দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে লিখে পাঠালেন- “Addressee not found.” রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম ফেরত পেয়েই বুঝলেন এটি সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত ও হীনমন্যতা। অনশনের চল্লিশ দিনে বিরজাসুন্দরী দেবীর হাতের লেবুর রস পান করে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন।
১৯২২-এর ২৫ জুন কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঐ স্মরণসভায় নজরুলকে ডেকে পাশে বসিয়েছিলেন। নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন ‘সত্যকবি’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে নজরুলকে স্নেহ বন্ধনে আবদ্ধ করায় তখনও কবি-সাহিত্যিকরা ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন।
রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক পরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে কিন্তু দুই কবির শ্রদ্ধা ও স্নেহের মৌলিক সম্পর্ক কখনও বিচলিত হয়নি।
১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। নজরুল নতুন পত্রিকা ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের মুখপত্র’ ‘লাঙল’ বের করলেন। লাঙলের ললাট লিপিতে কিছু লিখবার জন্য আবার অনুরোধ নজরুলের। রবীন্দ্রনাথ লিখে দিলেন,
‘জাগো জাগো বলরাম
ধর তব মরুভাঙা হল।
বল দাও ফল দাও
স্তব্ধ কর ব্যর্থ কোলাহল।’
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিবাদ করেছিলেন। নজরুল তাঁর ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ কবিতায় লিখেছেন, ‘“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?’ আর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব / ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ’।
রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সৈনিক নজরুল শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের শারীরিক শিক্ষা দেবেন। কিন্তু অস্থির প্রকৃতির বিদ্রোহী নজরুল কোথাও এভাবে নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকতে চাননি।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের দার্জিলিংয়ে দেখা হয়। এ সময় নজরুল প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি তো ইতালি গেছেন সেখানে কবি দ্যনুনজিও’র সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না? রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন দেখা হবে কি করে তিনি যে তোমার চেয়েও পাগল।
(৬)
বসন্ত-দানের থেকে শুরু, তারপর প্রতিটি লেখা প্রকাশিত হতে, সভা
সমিতিতে, দেখা-সাক্ষাতের ফলস্বরূপ নজরুল আর তাঁর গুরুদেবের মধ্য়ে ঘনিষ্ঠতা যেমন বেড়ে চলে, ঈর্ষায় জ্বলতে থাকেন উভয়ের ঘনিষ্ঠ একদল কবি-লেখক বর্গ। তাদের মধ্য়ে সজনীকান্ত, মোহিতলাল তো নজরুলের একান্ত বন্ধু।
বস্তুত দুই কবির সম্পর্কে মানসিক টানাপোড়ন শুরু হয় বাঙলা ১৩৩৩(ইং:১৯২৬) সালের পর থেকে। তখনকার সাহিত্য-সমালোচনার পত্রিকা ‘শনিবারের চিঠি’তে নজরুল সমালোচনার একটি নতুন অধ্যায়ের জন্ম হয়। ১৩৩৩ সালের আষাঢ় থেকে ১৩৩৪ সালের কার্তিক পর্যন্ত ‘শনিবারের চিঠি’র বিভিন্ন সংখ্যায় নজরুলের বিভিন্ন রচনা ব্যঙ্গ করে অনেকগুলো প্যারোডি ছাপা হয়েছিলো। ভাদ্র সংখ্যায় নজরুলকে ‘বাংলার আধুনিক বরপুত্র নবযুগ ধুরন্ধর সাহিত্য সারথি’ আখ্যা দিয়ে তাঁর ‘অনামিকা’ কবিতার একটি প্যারোডি ছাপা হয় ‘বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ’ নামে, রচয়িতা আব্বাস বিটকেল। পরে সজনীকান্ত দাসকে নজরুলের ‘অনামিকা’, ‘মাধবী প্রলাপ’, ‘গোপন প্রিয়া’ কবিতা সম্বন্ধে অশ্লীলতার প্রশ্ন তুলে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ছুটোছুটি করতে দেখা যায়, তারই ভূমিকা এই প্যারোডি।
মাসিক ‘শনিবারের চিঠি’র প্রথম সংখ্যায় মধুকর কাঞ্জিলাল রচিত, ‘তোমাদের প্রতি’ নামে যে কবিতাটি ছাপা হয়, সেটিও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে ব্যঙ্গ করে লেখা। এসব রচনার উদ্দেশ্য ছিলো নজরুলের চরিত্র হনন, যার সূত্রপাত ঘটে প্রমীলাকে বিয়ে করার পর থেকে।
কাজী নজরুল ইসলামের অধিকাংশ কবিতা ও গানের প্যারোডি করেছেন সজনীকান্ত দাস। তিনি কেবল নজরুলকে ব্যঙ্গ করেই ক্ষান্ত হননি, আধুনিক বাঙলা সাহিত্য সম্বন্ধে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ১৩৩৩ সালের ২৩ ফাল্গুন একটি পত্র লেখেন। উদ্দেশ্য ছিলো, নতুন সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের সম্বন্ধে তাঁকে বাজিয়ে দেখা। তিনি লিখেছিলেন-
"সম্প্রতি কিছুকাল যাবত বাংলাদেশে এক ধরণের লেখা চলছে আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন। প্রধানত ‘কল্লোল’ ও ‘কালিকলম’ নামক দুটি কাগজে এগুলো স্থান পায়। যৌনতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব অথবা এই ধরনের কিছু দিয়ে এগুলি লিখিত হচ্ছে।.....আমরা কতকগুলি বিদ্রুপাত্মক কবিতা ও নাটকের সাহায্যে শনিবারের চিঠিতে এর বিরুদ্ধে লিখেছিলাম।.....কিন্তু এই প্রবল স্রোতের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ এত ক্ষীণ যে, কোন প্রবল পক্ষের তরফ থেকে এর প্রতিবাদ বের হওয়া একান্ত প্রয়োজন আছে। যিনি আজ পঞ্চাশ বছর ধরে বাঙলা সাহিত্যকে রূপে রসে পুষ্ট করে আসছেন তাঁর কাছেই আবেদন ছাড়া আমি অন্য পথ না দেখে আপনাকে বিরক্ত করছি। (আধুনিক বাংলা সাহিত্য, ‘শনিবারের চিঠি’ ভাদ্র, ১৩৩৪)
রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে পঁচিশ ফাল্গুন পত্রের উত্তর দিলেও সজনীকান্তের উত্থাপিত প্রসঙ্গ কৌশলে এড়িয়ে যান। অজুহাত দেন ‘কঠিন আঘাতে একটা আঙ্গুল সম্প্রতি পঙ্গু হওয়াতে সহজে লেখা সরচে না। ফলে বাক সংযম স্বতঃসিদ্ধ।’ তবে তিনি যা লেখেন তা ‘শনিবারের চিঠি’র ভাদ্র ১৩৩৪ সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয়।
".....আধুনিক সাহিত্য আমার চোখে পড়ে না। দৈবাৎ কখনো যেটুকু দেখি, দেখতে পাই, হঠাৎ কলমের আব্র্রু ঘুচে আছে। আমি সেটাকে সুশ্রী বলি এমন ভুল করো না। কেন করিনে তার সাহিত্যিক কারণ আছে, নৈতিক কারণ এ স্থলে গ্রাহ্য না হতেও পারে। এখন মনটা ক্লান্ত উদভ্রান্ত, পাপগ্রহের বক্র দৃষ্টির প্রভাব প্রবল- তাই এখন বাগবাত্যার দিগদিগন্তে ছড়াবার সখ একটুও নেই। সুসময় যদি আসে তখন আমার যা বলবার বলব।"
রবীন্দ্রনাথ ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও ‘শনিবারের চিঠি’র দল রবীন্দ্রনাথকে ছাড়েন নি, তাঁরা রবীন্দ্রনাথের কাছে ধরনা দিয়েছিলেন এব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ‘শনিবারের চিঠি’ওয়ালাদের অন্তরঙ্গতায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো ‘রবীন্দ্রজীবনী’র তৃতীয় খণ্ডে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তা উল্লেখ করেছেন-
"এই সময় একদিন ‘শনিবারের চিঠি’র দল কবির সহিত দেখা করিতে আসেন, বাহিরের লোক ভাবিল কবি এই দলে যোগ দিয়েছেন এবং সে সম্বন্ধে লোকে পত্র লিখিয়া কৈফিয়ৎ দাবি করিল।......"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ পর্যন্ত আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন ১৩৩৪ সালের শ্রাবণ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত ‘সাহিত্যধর্ম’ প্রবন্ধে যার কথা এই রচনার প্রথম অধ্য়ায়েই জানিয়েছি।
রবীন্দ্রনাথও তো মানুষ, ঈর্ষাকাতর বাঙালি বারবার তাঁর আলখাল্লা ধরে ঝুলে পড়ে, তাঁর অতীন্দ্রিয়লোকের কাব্যসত্তাকে মিছে প্রাসঙ্গিতার মোড়কে উপস্থাপনা করে , রবীন্দ্রনাথকে ক্লান্ত করে, ক্লান্ত করে...।
(৭)
আধুনিকতার তীব্র বোধের স্রোতে কেবল রবীন্দ্রনাথ নন, শরৎচন্দ্রও ভেসে গিয়েছিলেন- অনুভব করেছিলেন কি মুকুট হারাবার আতঙ্ক? সজনীকান্ত ও মোহিতলাল মজুমদারের মতো রবীন্দ্রপন্থীরা সে কৃত্রিম আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলবার জন্যে যথেষ্ঠ ছিলেন। সজনীকান্ত ‘শনিবারের চিঠি’তে লিখলেন-
“.....বাঙ্গলাদেশের শতকরা ৯৯ জনের জন্যে অপঠিত থাকিয়াই যদি রবীন্দ্রনাথের যুগ চলিয়া যায়, মাসিকের পাতায় থাকিতে থাকিতেই যদি শরৎচন্দ্রের যুগের অবসান হয়, রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের জীবিতাবস্থাতেই যদি নরেশচন্দ্র, দীনেশরঞ্জন, নজরুল ইসলাম সাহিত্য-যুগাবতার বলিয়া ঘোষিত হন (কয়েক মাস পূর্বে Forward পত্রিকায় শ্রীযুক্ত গিরিজা মুখোপাধ্যায় কর্তৃক রচিত একটি প্রবন্ধে এই মর্মে লিখিত হইয়াছে, যে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের যুগ শেষ হইয়াছে, নরেশচন্দ্র, দীনেশরঞ্জন প্রভৃতি নতুন যুগাবতারণা করিতেছে, কাজী নজরুল ইসলাম ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ইহার দুইটা উইং)। তাহা হইলে সমাপ্ত হউক এই সাহিত্যের। বটতলার দেশে সাহিত্য চলিবে না।“
ওদিকে ‘সাহিত্যধর্ম’ প্রবন্ধটি লিখে রবীন্দ্রনাথ মালয় চলে যান; এরপর (১৩৩৪ সালে) তিনি বেশ কয়েকবার বিদেশযাত্রা করেন। ‘সাহিত্যধর্ম’ প্রবন্ধের মাধ্যমে বিতর্কের জন্ম দিয়েই তিনি চলে যান, আর দেশে পত্র-পত্রিকায় চলতে থাকে তা নিয়ে নানা ধরণের দ্বন্দ্ব। রবীন্দ্রনাথের ‘পালোয়ানির মাতামাতি’ উক্তিটি কোন সাহিত্যিকের উদ্দেশে করেছিলেন সে সম্বন্ধে শরৎচন্দ্র তাঁর একটি প্রবন্ধে বলেন-
“......তবে এমনও হইতে পারে কবির লক্ষ্য নরেশচন্দ্র নহেন, আর কেহ। কিন্তু সেই কেহরও সব বই তাঁহার পড়িয়া দেখা উচিৎ বলে মনে করি।“ (সাহিত্যের রীতি ও নীতি, বঙ্গবাণী, ১৩৩৪, আশ্বিন সঙখ্যা)
এখন এই ‘আর কেহ’ যদি কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে থাকেন তাহলে নজরুল কাব্যের যৌবন বন্দনাকে ‘মত্ততার আত্মবিস্মৃতিতে মাধুর্যহীন রূঢ়তা বা পালোয়ানির মাতামাতি’ আখ্যাত করা ‘শনিবারের চিঠি’র পক্ষে শোভন হলেও, রবীন্দ্রনাথের জন্যে মোটেও শোভন নয়- কিন্তু তিনি তা-ই করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ১৯২৭ সালের আগস্ট মাসে ইন্দোনেশিয়া সফরে যাচ্ছিলেন, বালি দ্বীপের পথে প্লানসিইউ জাহাজে বসে ২৩ আগস্ট তিনি ‘যাত্রীর ডায়রী’ শিরোনামে ‘সাহিত্যে নবত্ব’ নামে আর একটি প্রবন্ধ লেখেন, যা ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হয় ১৩৩৪ সালের অগ্রহায়ণ মাসে। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের কোনো কোনো অংশে নজরুলের প্রতি খোঁচা ছিলো মনে হতে পারে। উক্ত প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মোহিতলাল মজুমদারের প্রশংসা করতে গিয়ে পক্ষান্তরে যেন নজরুলেরই সমালোচনা করেছেন।
"মোহিতলাল সাধারণের কাছে ইতিমধ্যেই খ্যাতিলাভ করেছেন। এই খ্যাতির কারণ তাঁর কাব্যের অকৃত্রিম পৌরুষ। অকৃত্রিম বলচি এই জন্য, তাঁর লেখায় তাল ঠোকা পাঁয়তারা মারা পালোয়ান নেই। যথার্থ যে বীর, সে সার্কাসের খেলোয়াড় হতে লজ্জা বোধ করে। পৌরুষের মধ্যে শক্তির আড়ম্বর নেই, শক্তির মর্যাদা আছে; বাহাদুরী নেই..... ।"
রবীন্দ্রনাথের এ ধরণের সমালোচনার পর নজরুলের গজল নিয়েও বেশ তিক্ত আলোচনা শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য সে বিষয়ে কোনো কথা বলেননি, তবে রবীন্দ্রানুসারীদের কণ্ঠে বিষের মতো প্যারোডি হতে থাকলো নজরুলের গজলগুলো। এ সময় নজরুলও খানিক অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন, এ বং সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের উপর অভিমানবশতই, রবীন্দ্রনাথ পর পর দুইবার খবর পাঠানোর পরও নজরুল দেখা করতে যাননি। এ প্রসঙ্গে ইব্রাহিম খাঁকে এক পত্রে বলেন-
“গুরুদেবকে শ্রদ্ধা করি, তবে তিনি পারলে, আমারও অভিমান করিবার জো আছে......সব সম্প্রদায় আক্রোশ দেখাতে পারেন, কিন্তু গুরুদেব পারেন না।“
এর পরেই যেন অভিমানবশত: লেখেন তিনি তাঁর বিখ্য়াত প্রবন্ধ- 'বড়র পীরিতি বালির বাঁধ', উজাড় করে দেন যত ক্ষোভ। কবিগুরুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রসঙ্গে অন্য়ান্য় কবিদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাতে লেখেন-
"আমি দেখছি, এ-গৌরবে আমার মুখ যত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কোন কোন নাম-করা কবির মুখে কে যেন তত কালি ঢেলে দিয়েছে। ক্রমে ক্রমে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরাই এমনি করে শত্র্রু হয়ে দাঁড়ালেন। আজ তিন-চার বছর ধরে এই ‘শুভানুধ্যায়ী’রা গালিগালাজ করেছে আমায়, তবু তাঁদের মনের ঝাল বা প্রাণের খেদ মিটল না। বাপরে বাপ! মানুষের গাল দেবার ভাষা ও তার এত কদর্যতাও থাকতে পারে, এ আমার জানা ছিল না।"
" ফি- শনিবারে চিঠি! এবং তাতে সে কী গাড়োয়ানি রসিকতা, আর সে মেছোহাটা থেকে টুকে-আনা গালি! এ গালির গালিচাতে বোধহয় আমি এ-কালের সর্বশ্রেষ্ঠ শাহানশাহ্ বাংলায় রেকর্ড’ হয়ে রইলো আমায়-দেওয়া এই গালির স্তূপ। কোথায় লাগে ধাপার মাঠ! ফি হপ্তায় মেল (ধাপা-মেলে) বোঝাই।"

(৮)
রবীন্দ্রনাথ তখন ভয়ানক ব্য়স্ত মানুষ, আর একপক্ষ ক্রমাগতই তাঁকে ভুল বুঝিয়ে যাচ্ছে, তবু বলব 'বাংলা সাহিত্য়ে খুনের মামলা' প্রসঙ্গে তাঁর লক্ষ্য় ঠিক নজরুল ছিলেন না। তবে (অ)শুভানুধ্য়ায়ীরা নজরুলকে তাই বুঝিয়েছিলেন। ব্য়াপারটা কিরকম? নোংরা ঘাঁটা আমাদের উদ্দেশ্য় নয়, কিন্তু যে সম্পর্কের তিক্ততার পলি জমে বাংলা সাহিত্য়ের স্রোতস্বিনীর পথকে ব্য়াহত করেছিল এককালে, তা জানা থাকলে একালও সচেতন থাকবে তিল-তালের আপাত পার্থক্য় সম্বন্ধে।
'বড়র পিরীতি বালির বাঁধ' প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন :
"বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি, সকল হৃদয়-মন দিয়ে।.....কতদিন দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে। নিজের লেখা দু'চারটে কবিতা গানও শুনিয়েছি - অবশ্য কবির অনুরোধেই। এবং আমার অতি সৌভাগ্যবশতঃ তার অতি প্রশংসা লাভ করেছি কবির কাছ থেকে। সে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় কোনদিন এতটুকু প্রাণের দৈন্য বা মন-রাখা-ভালো বলবার চেষ্টা দেখিনি।"
নজরুল 'বড়র পিরীতি বালির বাঁধ' প্রবন্ধটি তাঁর সমালোচকদের উদ্দেশ্য় করে লিখেছিলেন, তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গও ছিল। তাঁর অভিযোগের তীর ঠিক কবিগুরুর দিকে না হলেও তাঁর নজরুলকে ভুল বোঝা নিয়ে বা কাব্য়ে উর্দু-ফার্সি শব্দ ব্য়বহার নিয়ে কবির করা মন্তব্য় ক্ষুন্ন করেছিল নজরুলকে, অভিমান হয়েছিল প্রিয় গুরুর বিরুদ্ধে। রক্ত অর্থে 'খুন' বা জল অর্থে 'পানি', তাছাড়া বাগীচা, সওগাত, কদম(পদক্ষেপ), নওরোজ, শরাব- এই শব্দগুলির ব্য়বহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিরুদ্ধে লিখেছেন এরকমই তাঁর মনে হয়েছিল, বা তাঁকে বোঝান হয়েছিল। অভিমান স্বাভাবিক, তিনি লিখলেন-
"বীণাই শোভা পায় যাঁর হাতে, তাঁকেও লাঠি ঘুরাতে দেখলে, দুঃখও হয়, হাসিও পায়। পালোয়ানি মাতামাতিতে কে যে কম যান, তা ত বলা দুষ্কর। ..... আজকের ‘বাঙ্গলার কথা’য় দেখলাম, যিনি অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্রের পক্ষ হয়ে পঞ্চপাণ্ডবকে লাঞ্ছিত করবার সৈনাপত্য গ্রহণ করেছেন, আমাদের উভয় পক্ষের পূজ্য পিতামহ ভীষ্ম-সম সেই মহারথী কবিগুরু এই অভিমুন্য-বধে সায় দিয়েছেন- এইটেই এ-যুগের পক্ষে সবচেয়ে পীড়াদায়ক।"
অবশেষে এই বিতর্ক অবসানের জন্য কলম ধরেন প্রমথ চৌধুরি। ১৯২৭ সালের ২০ মাঘ 'আত্মশক্তি' পত্রিকায় প্রমথ চৌধুরি 'বঙ্গ সাহিত্যে খুনের মামলা' প্রবন্ধে লিখেছেন :
"কাজী সাহেব বলেছেন যে, 'কবিগুরু বলেছেন কথায় কথায় রক্তকে খুন বলে অপরাধ করেছি।' কবিগুরু হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ যে কাজী সাহেবকে লক্ষ্য করে এ কথা বলেছেন - এ সন্দেহ আমার মনে উদয় হয়নি, যদিচ যে-সভায় তিনি ও-কথা বলেন সে সভায় আমি উপস্থিত ছিলুম। যতদূর মনে পড়ে, কোনও উদীয়মান তরুণ কবির নবীন ভাষার উদাহরণ-স্বরূপ তিনি 'খুনের' কথা বলেন। কোনও উদিত কবির প্রতি কটাক্ষ করেননি। ...বাংলা কবিতায় যে 'খুন' চলছে না এমন কথা আর যেই বলুন রবীন্দ্রনাথ বলতে পারেন না, কারণ কাজী সাহেব এ পৃথিবীতে আসবার বহু পূর্বে নাবালক ওরফে বালক রবীন্দ্রনাথ 'বাল্মীকি প্রতিভা' নামক যে কাব্য রচনা করেছিলেন, তার পাতা উল্টে গেলে 'খুনে'র সাক্ষাৎ পাবেন। কিন্তু এসব খুন এত বেমালুম খুন যে, হঠাৎ তা কারও চোখে পড়েনা।
...তারপর কাজী সাহেব এই বলে দুঃখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার অন্তরে আরবি ফারসি শব্দের প্রবেশের দ্বার রুদ্ধ করতে চান। কাজী সাহেবের এ বিলাপ মাত্র। কেননা, যদি তাঁর ওরকম কোনও কুমতলব থাকত তাহলে তিনি বহু পূর্বেই আমার ভাষার ওপর খড়গহস্ত হতেন।"
প্রমথ চৌধুরির মধ্যস্থতায় এই বিতর্কের অবসান হয়।

(৯)
১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হলো রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’। ছাত্রছাত্রীদের উপযোগী এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের তিনটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেন—সংকল্প, সিন্ধু ও পউষ।
রবীন্দ্রনাথের নজরুল-মমতা কিংবা নজরুলের রবীন্দ্র-ভক্তির মধ্যে কোনো বিচারেই কোনো খাদ ছিল না, তা পুরোপুরি আছে ইদানীংকার সমালোচক ও গবেষকদের মধ্যে। সেজন্যই এ কথা বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের সর্বাতিশায়ী প্রতিভার মধ্যে যে জাদুই থাকুক, নজরুল জানতেন রবীন্দ্রনাথের পথ আর তাঁর পথ এক নয়। ‘রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া ভাবাদর্শ ও উচ্চকোটির মানবতাবাদের উদগাতা’ আর নজরুল গণমানুষের কবি, নির্যাতিত শোষিত-বঞ্চিত-অবহেলিত মানুষের প্রতিনিধি। বিশিষ্ট সাহিত্যবিদ নারায়ণ চৌধুরীর লেখা দিয়ে বলা যায়-
"বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে প্রতিতুলনামূলক চিন্তা চর্চার অভ্যাস ভালো নয়, এরূপ শুনে থাকি। সেটা নাকি নিরর্থকও বটে। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসে কখনও কখনও এরূপ প্রতিতুলনা বোধ হয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। যেমন, রবীন্দ্র-নজরুলের বেলায় বর্তমানে হয়ে উঠেছে। আমাদের সমালোচনা-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের নামে ঢক্কা নিনাদের এত বেশী ঘনঘটা শোনা যায় আর সেই অনুপাতে নজরুলের ভাগে এত বেশী প্রচার কার্পণ্য যে, ওই তৌলদণ্ডের ওজনঘটিত অসমানতাকে কিছু পরিমাণে কমানোর জন্যেও ওই দুজনকে কেন্দ্র করে এমনতর প্রতিতুলনামূলক চিন্তা চর্চার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে অনেক বড় মাপের কবি, তা বলে নজরুলকে তার যথাপ্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতে হবে এটাও কোন কাজের কথা নয়। অন্ধ গুরুবাদের চর্চায় কিংবা মাত্রাতিরিক্ত পক্ষপাতী মনোভাবের অনুশীলনে কারও কোন মঙ্গল হয় না।’ (নজরুল চর্চা)
* * * * *
রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সৈনিক নজরুল শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের শারীরিক শিক্ষা দেবেন। কিন্তু অস্থির প্রকৃতির বিদ্রোহী নজরুল কোথায়ও এভাবে নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকতে চাননি।
নজরুল ১৯৩৫-এর জুন মাসে ‘নাগরিক’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চেয়ে চিঠি পাঠান। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৭৫ বছর। বেশ অসুস্থ। এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৬-এর ১ সেপ্টেম্বর লিখেছিলেন, ‘.....তুমি তরুণ কবি, এই প্রাচীন কবি তোমার কাছে আর কিছু না হোক করুণা দাবি করতে পারে। শুনেছি বর্ধমান অঞ্চলে তোমার জন্ম। আমরা থাকি পাশের জিলায় (বীরভুমে)। কখনো যদি ঐ সীমানা পেরিয়ে আমাদের এদিকে আসতে পারো খুশি হব।’
উক্ত চিঠির জবাবে নজরুল ‘নাগরিক’ পত্রিকায় লেখেন, কবিতা
‘হে কবি, হে ঋষি অন্তর্যামী আমারে করিও ক্ষমা।
পর্বত-সম শত দোষত্রুটিও চরণে হল জমা।....
তুমি স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ বিস্ময়-
তব গুণে-গানে ভাষা-সুর যেন সব হয়ে যায় লয়।....
প্রার্থণা মোর, যদি আরবার জন্মি এ ধরণীতে,
আসি যেন শুধু গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে।‘
রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ও নাটকে কোথাও কোথাও বৈপ্লবিক চেতনার একটি রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। তাঁর রথের রশি, ওরা কাজ করে, বাঁধ ভেঙে দাও’ ‘তাসের দেশ’ বা ‘রক্ত করবী’তে বিপ্লবীর বাণী তো আছেই। নজরুল এ থেকেও কিছুটা হলেও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এমন তো ভাবাই যায়।
মানুষ, মানবতা নিয়ে দুজনের ভাবনায় কোনো প্রভেদ নেই। নেই ধর্মপরিচয়ের বাইরে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখার। রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’। বলেন, মানবিক ধর্মের কথা যা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উর্ধ্বে। একইভাবে নজরুল বলেন, ‘আমি আজও মানুষের প্রতি আস্থা হারাইনি। মানুষকে আমি শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি। স্রষ্টাকে আমি দেখিনি কিন্তু মানুষকে আমি দেখেছি। এই ধূলিমাখা, অসহায়, দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।’
নজরুল লেখেন,
‘গাহি সাম্যের গান,
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
সেই চিরায়ত উপলব্ধি-‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’
সাম্য, মৈত্রী, মানবপ্রেম তথা মানবিকতার প্রকাশে যেমন রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে বাস্তবে অগ্রনায়ক, রাজনৈতিক বিষয়-সংলগ্ন হয়েও তেমনি নজরুল। রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধ বিরোধী, শান্তিবাদী, বিশ্বনাগরিক এবং মানবপ্রেমী। তাঁর বহু রচনায় এমন প্রমাণ মেলে। নজরুলের মানবিক চেতনা সাম্যবাদী চেতনার সঙ্গে এক হয়েছে তৃণমূল স্তরের সাধারণ মানুষের কল্যাণে।
কাজী নজরুল ইসলাম গুরু বলে মান্য করতেন রবীন্দ্রনাথকে। নিজের কাব্য চর্চা থেকে অন্যত্র মনোনিবেশ করায় রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুলকে বলেছিলেন, ‘তুমি নাকি এখন তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছো?’ নজরুল উত্তরে ‘আমার কৈফিয়ৎ’-এ লিখেছিলেন, "গুরু কন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা"।

(১০)
লালিত বা প্য়ারডি সাহিত্য়ও সাহিত্য়ের একটা অঙ্গ, অবশ্য় যদি তার মধ্য়ে হাস্য়রস- নিছক শ্লেষ বা ব্য়ঙ্গই থাকে, নোংরামি, পক্ষপাত বা অবমাননা নয়, তা কিন্তু যোগ্য় ব্য়ক্তির সমাদরই লাভ করে। নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের মধ্য়ে ছিল গুরু-শিষ্যের অম্ল-মধুর সম্পর্ক। অতএব তার মাঝে হাসি-ঠাট্টাও যে হতনা তা ত নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সব গানই মুখস্থ ছিল নজরুলের। সেগুলো নিয়ে তিনি অনেক মজার মজার প্যারডি বানিয়েছেন, তবে এর মধ্যে নিছক মজা ছিল, কোনও নোংরামি ছিল না। আলিপুর জেলে থাকতে সেখানকার জেলার শামসুল আলমকে নিয়ে নজরুল গান রচনা করেন-
'সরকারের শ্যাম তুমি, আমাদের শূল
(কবে) ভিটেয় চরবে ঘুঘু
(চোখে) দেখবে সর্ষেফুল!'
কখনও মনমেজাজ ভাল থাকলে হুগলি জেলের সুপারকে নিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের সুরে গান ধরতেন-
'তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে তুমি ধন্য ধন্য হে।
আমার এ গান তোমারই ধ্যান, তুমি ধন্য ধন্য হে।।
রেখেছ সান্ত্রী পাহারা দোরে, আঁধার কক্ষে জামাই-আদরে,
বেঁধেছ শিকল-প্রণয়-ডোরে, তুমি ধন্য ধন্য হে।।
আকাঁড়া চালের অন্ন-লবন, করেছ আমার রসনা-লোভন,
বুড়ো ডাঁটা-ঘাঁটা লপসী শোভন, তুমি ধন্য ধন্য হে
ধর ধর খুড়ো চপেটা মুষ্টি, খেয়ে গয়া পাবে সোজা স-গোষ্ঠি,
ওল ছোলা দেহ ধবল-কুষ্ঠি, তুমি ধন্য ধন্য হে।।'
রবীন্দ্রসংগীতের প্য়ারডি করে আরেকজন বিখ্য়াত হয়েছিলেন, হয়ত তিনি আর নজরুল ছিলেন এক্ষেত্রে পরস্পরের প্রেরণা। না, সজনীকান্ত নন, ইনি অরবিন্দ-শিষ্য় নলিনীকান্ত সরকার, লিখেছেন 'বিদূষক' দাদাঠাকুরের জীবনী। এই গানটি তিনি গেয়েওছিলেন 'দাদাঠাকুর' ছবিতে-
'কতই পাঁচন বাঁটলে তুমি নিদান তুলে
হে কবিরাজ, রুগী যে পটল ফেলল তুলে।।
গাঁদাল পাতার সুপ্তধারায়
মধুর সঙ্গে তুলসী মাড়ায়,
বুদ্বুদে তার তরঙ্গদল উঠল দুলে।।'

গানটা শুনতে চান? লিংক খুলুন-
https://www.youtube.com/watch?v=ECaitSL5rKA
নজরুল বা কম যান কিসে? 'আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো'র সুরে তিনি নামালেন একটি কৌতুক নাটিকা- 'কলির কেষ্ট'। পুরো নাটিকাটি পড়লে মজা পাবেন-
(বাঁশির সুর)
কেডা রে –? কেডা? উ– কেলিকদম্ব গাছের এই ডাল ওই ডাল কইরা লাফ দিয়া বেড়াইত্যাছে? ও– ঘোষ পাড়ার হেই বখাইটা পোলাটা না? উ – হুঁ,– আবার পিরুক পিরুক কইরা বাঁশি বাজান হইত্যাছে – নাইম্যা আইস – নাইম্যা আইস। ভদ্-দুপুর বেলা মাইয়াগো ছান ঘাটের কাছে – অ্যাঁ – হ্যাঁ-হ্যাঁ, আবার কেষ্ট সাজছেন? যিনি কেষ্ট সাজছেন, নামো শিগগির নামো – পোড়াকপাইল্যা নামো –
তুমি নামো হে নামো
শ্যাম হে শ্যাম।
কদম্ব-ডাল ছাইড়া নামো
দুপুরি রৌদ্রে বৃথাই ঘামো
ব্যস্ত রাধা কাজে
শ্যাম হে শ্যাম।
আ রে, তোমার ললিতা দেবী কী করতেয়াছে জাননি? তোমার ললিতা দেবী?
আরে ললিতা দেবী সলিতা পাকায়,
বিশাখা ঝোলে হিজল-শাখায়;
আর বৃন্দা দূতী কী করছে জান ? বৃন্দা দূতী ?
বৃন্দা দূতী পিন্ধা ধুতী
গোষ্ঠে গেছেন তোমার ‘পোস্ট’
সাজিয়া রাখাল সাজে
আর চন্দ্রা গেছেন অন্ধ্র দেশে
মান্দ্রাজি জাহাজে।
আবার ইতি উতি চাও ক্যা ? ইতি উতি চাইবার লাগছ ক্যা? অ্যাঁ?
আমি কমু না, কোনখানে তোমার যমুনা তা আমি কমু না?
আরে ইতি উতি চাও বৃথাই
আমি কমু না কোথায় তোমার যমুনা
কইলকাতা আর ঢাকা রমনার
লেকে পাবে তার নমুনা।
আরে, তোমার যমুনা ল্যাক হইয়া গ্যাছে গিয়া ! বুঝলা?
হালার যমুনা হইয়া গ্যাছে গিয়া
কলেজে ফিরিছে শ্রীদাম সুদাম
শ্রীদাম সুদাম কলেজে যাইত্যয়াছে আর তুমি এখানে বাজাইত্যাছ অ্যাঁ? পোরা কপাইল্যা –
কলেজে ফিরিছে শ্রীদাম-সুদাম
মেরে মাল-কোঁচা খুলিয়া বোতাম,
লাঙল ছাড়িয়া বলরাম
ডাম্বেল মুদ্‍গর ভাঁজে;
ওহে শ্যাম হে শ্যাম
আরে তুমি নামো
পোড়া কপাইল্যা নামো॥
(রঞ্জিত রায়ের গলায় শুনুন নজরুলের কলির কেষ্ট- হাসতে হাসতে খুন হবেন!)

https://www.saavn.com/.../Kolir-Kesto.../KTsTcDFYRR4


(১১)
কথা হচ্ছিল নজরুল ইসলাম আর রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে, মাঝে প্রসঙ্গক্রমে এসে পড়লেন নলিনীকান্ত সরকার। তা যখন এলেনই, তখন জানিয়ে দিই যে এই কবি-গায়ক প্রথম জীবনে অরবিন্দ-বারীন্দ্র শিষ্য় বিপ্লবী ছিলেন, তাই নজরুলের সাথে সখ্য় গড়ে উঠতেও সময় নেয়নি। নজরুলের 'বিদ্রোহী' নলিনীকান্ত-সম্পাদিত 'সাপ্তাহিক বিজলী' পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়। তিনি নজরুলের অনেক গানের স্বরলিপিও লেখেন। নজরুল তাঁর 'বাঁধন-হারা' উপন্য়াসটি নলিনীকান্তকে উৎসর্গ করেন। প্য়ারডি লেখার ব্য়াপারে নলিনীকান্তের স্বাভাবিক দক্ষতা ছিল হয়ত নজরুলকেও তা প্রভাবিত করেছিল। একটি বিখ্য়াত রবীন্দ্রসংগীতের উপর এই প্য়ারডি অল্পচর্চিত, কবে হারিয়ে যাবে, তাই এখানে উদ্ধৃত করলাম স্মৃতি থেকে-
"পরমায়ু যাবে বেড়ে রেশনের চাল যে রে
উঠে নেয়ে এরি ভাত খাইও।
মুখে পুরে এক গাল হও যদি নাজেহাল
হাঁই মারো মারো ঠেল হাঁইও হাঁইও হাঁইও।।
কঙ্কড়ে বারবার ঝঞ্ঝন-ঝংকার,
দন্তের দু'পাটিতে হরধনু-টংকার,
চর্বন-দুর্বার সহ্য় না হয় আর,
নড়বড় করে আজি তাই ও।।
গুণী-মানী-মহাজন, সুখে কর ভক্ষণ
বোলো না খাই কিনা খাই রে।
সংসার-পারাবার সন্তরি হবে পার,
স্বর্গেতে চোখ মেলো ভাই রে!
যদি রাতে রুটি খাও, উৎ-দাম আটাটাও
মিশ্রিত কাঁই-বীচি বাজরা ও ভুট্টাও,
হলে পরে লুণ্ঠিত, ভুলোনাকো, মাথা খাও,
রেশনের জয়গান গাইও।।"
বস্তুত: নজরুলপ্রতিভার বহুমুখী তীরে অবগাহন করেছিলেন সেযুগের বহুচর্চিত বহু বিখ্য়াত লোক, যেমন শৈলজানন্দ, দিলীপ রায়, মুজাফ্ফর হোসেন, পবিত্র গঙ্গোপাধ্য়ায়, দাদাঠাকুর, প্রতিভা(সোম) বসু ইত্য়াদি- তার মধ্য়ে বিষ্ণুপুর ঘরাণার গায়ক জ্ঞানেন্দ্র গোস্বামী ছিলেন একজন। তিনি রবীন্দ্রনাথেরও স্নেহধন্য় ছিলেন, কিন্তু কবিগুরু নিজের গান তাঁকে শেখান নি। এ নিয়ে একটা মজার গল্প আছে, সত্য়ি কিনা জানিনা। জ্ঞান গোঁসাই গুরুদেবকে ধরে পড়েছেন, তাঁর গান শেখাতে। তা উনি শেখালেন- 'অল্প লইয়া থাকি তাই, মোর যাহা যায় তাহা যায়' গানটি। শিখে যখন উনি স্বভাবসিদ্ধ কালোয়াতি মেজাজে গাইলেন, গুরুদেব ঘাড় নেড়ে বললেন-'হয়নি'।
'কোথায় হয়নি, দেখিয়ে দিন, গুরুদেব, সুর-তালে কি ভুল হচ্ছে?'
'ছায়ানট হয়েছে, একতালও হয়েছে, আমার গান হচ্ছেনা!' বারবার শুনেও উনি একই কথা বলেন। শেষে দূর ছাই বলে চলে আসেন জ্ঞান নজরুলের কাছে, ঘটনাটা তাঁকে খুলে বলেন। নজরুল বল্লেন, 'ও, এই কথা, তা গানটা শোনাও দেখি।'
গান শুনে বলেন, 'একটা গান লিখেছিলাম, সুর দেওয়া হয়নি, এই সুরটাই বসিয়ে ফেলি।' তারপর সুর দিয়ে বললেন, 'কই, জ্ঞান, এবার গাও দেখি'।
সেই গান জ্ঞান গোস্বামীর গলায় গড়ল ইতিহাস।
'শূন্য় এ বুকে পাখি মোর আয়, ফিরে আয়, ফিরে আয়!'
এটা কিন্তু প্য়ারডি নয়, এ হল সার্থক গান ভাঙ্গা, যা রবীন্দ্রনাথ বহু করেছেন, আর রবীন্দ্রনাথ থেকে ভেঙেছেন আরো অনেকে, যেমন 'দাঁড়াও আমার আঁখির আগে' থেকে ভাঙা রজনীকান্তের 'শুনাও তোমার অমৃত-বাণী' গানটি।


(১২)
কাজী নজরুলকে গান আর কবিতার জগতে এক অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে উৎসাহ জুগিয়েছেন। যার ফলে রবীন্দ্র জগতের বাইরে বাংলা সাহিত্যের আর একটি জগৎ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন নজরুল। বাংলা কবিতা ও সঙ্গীত জগতে নজরুলকে বাদ দিয়ে কিছু লেখা অসম্ভব। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত স্মৃতিচারণ ‘নজরুল স্মৃতি’তে একটি আখ্যান আছে যে একদিন সকাল সকাল নজরুল ছুটতে ছুটতে এসে হাজির জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার বাসনায়। এসেই হাঁকডাক শুরু করেছেন-‘গুরুদেব, আমি আপনাকে হত্যা করেছি, আমি আপনাকে হত্যা করেছি।‘ রবীন্দ্রনাথ নজরুলের এই স্বভাব জানতেন। তাই তিনি বিচলিত না হয়েই বললেন, ‘ভাই পাগল, সে নাহয় তুমি করলে। কিন্তু কেন আর কিভাবে আমায় হত্যা করলে খুলে বলবে?’ তখন নজরুল খুলে দেখালেন একটি পত্রিকার প্রতিবেদন, তাঁর রচিত গানের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে যেখানে গুরুদেব লিখেছেন সাকুল্যে আড়াই হাজারের মত গান। রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করলেন, সস্নেহে বললেন, ‘হ্যাঁ পাগল, তুমি যথার্থই আমাকে হত্যা করেছ’।
পাঠক, একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছেন? নজরুল নিশ্চয় মিথ্যে বলেননি, কিন্তু তাঁর রচিত গান দু-হাজারটির বেশী পাওয়া যায় না, তাও আবার হাজারটির বেশী গীত হয়নি। কোথায় গেল সেসব? তার কারণ কবির উদাসীন ছন্নছাড়া জীবনযাত্রা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে গড়া বিশ্বভারতী ছিল, নজরুল সেরকম কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেননি। তবু সুখের কথা, ১৯৭১এ স্বাধীনতার পর কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় কবির মর্যাদায়। কিছু বিদগ্ধজনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আর বাংলাদেশের সরকারি উদ্যোগে তাঁর পূর্ণাঙ্গ রচনাবলী, যথাসম্ভব, মানে যা পাওয়া যায় তাই নিয়ে প্রকাশিত হয়। উনি নিজে তখন মানসিক পক্ষাঘাতে জর্জর, কিছুই জানতে বা বুঝতে পারেন নি তার।
হ্যাঁ, নজরুল একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান হয়েও জাতি-ধর্মের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে হয়ে উঠেছিলেন দুই বাংলারই সমান-প্রিয় একজন খাঁটি মানুষ, একজন সত্যিকারের বাঙালি। তাই দেশভাগের বেদনা বুকে নিয়েও কবি অন্নদাশঙ্কর রায় লেখেন-
“ভুল হয়ে গেছে বিলকুল,
আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে,
ভাগ হয়নিক’ নজরুল।
এই ভুলটুকু বেঁচে থাক।
বাঙালি বলতে একজনই আছে
দুর্গতি তার ঘুচে যাক।“
নজরুল ৭৭ বছর বেঁচেছিলেন আর কবিগুরু ৮০ বছর। এ হিসেবে তাদের কারোরই অকাল জীবনবসান ঘটেনি। কিন্তু নজরুল মৃত্যুর ৩৫ বছর আগে হারিয়ে ফেলেন তার চেতনাবোধ। মাত্র ২০ বছর সাহিত্য রচনা করেছেন। এত অল্প সময়ের মধ্যেও সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রকে। এর পেছনেও কবিগুরুর অনেক উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল। ১৯২৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নজরুল তার একান্ত বন্ধু কাজী মোতাহার হোসনকে লিখেছিলেন-
“রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায় বলতেন, ‘দেখ উন্মাদ তোর জীবনে শেলীর মত, কিটসের মত খুব বড় একটা ট্র্যাজেডি আছে-তুই প্রস্তুত হ। জীবনের সেই ট্র্যাজেডি দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারণে অন্যের জীবনকে অশ্রুর বরষায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছি। কিন্তু আমারই জীবন রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত তপ্ত মেঘের ঊর্ধ্বে শূন্যের মতো কেবল হাসি কেবল গান কেবল বিদ্রোহ। আমার বেশ মনে পড়ছে একদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথা- আমার ছেলে মারা গেছে, আমার মন তীব্র পুত্রশোকে যখন ভেঙ্গে পড়ছে ঠিক সেই দিনই সেই সময়ে আমার বাড়ীতে হাস্নাহেনা ফুটেছে। আমি প্রানভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম। আমার কাব্য আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছে। যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকীত্বের পরম শূন্য থেকে অসময়ে নামতে হয় তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না আমি সেই নজরুল; সেই নজরুল অনেকদিন আগেই মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। মনে করবেন পূর্ণত্বের তৃষা নিয়ে যে একটি অশান্ত তরুন এই ধরায় এসেছিল অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল।“
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ ঘটে। কবিগুরুর মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নজরুল। এ উপলক্ষে তিনি লেখেন তাঁর ‘রবিহারা’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথের জীবিত অবস্থায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নজরুল চারটি কবিতা লিখেছিলেন। কিশোর রবি, ১৪০০ সাল, তীর্থ পথিক ও অশ্রু পুষ্পাঞ্জলি।
রবিহারা কবিতাটিতে নজরুল হৃদয়ের বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
'বিদায়ের বেলা চুম্বন লয়ে যাও
তব শ্রীচরণে,
যে লোকেই যাক, হতভাগ্য এ বাঙালিরে রেখো মনে।'
'ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’ গানটিও লিখেন রবি ঠাকুরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। পরে নজরুল নিজেই কলকাতা বেতারে রবিহারা কবিতাটি আবৃত্তি করেন। তাঁর গাওয়া গান প্রচারিত হয় ইথারে। তিনি শুধু রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে নিজের জীবনে প্রোথিত করেই ক্ষান্ত থাকেননি, কিশোরদের উদ্বুদ্ধ করেছেন তাঁর রচনা আর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে। লিখেছেন-
“রবীন্দ্রনাথ তোমাদের তরে নিত্য আছেন জাগি,
তরুণ, কিশোর, শিশুরা দুঃখ কোরোনা তাঁহার লাগি।
দেহ শুধু তাঁর গিয়াছে, যায়নি তাঁর স্নেহ ভালবাসা,
যখনি পড়িবে ভাষা তাঁর, প্রাণে জাগিবে বিপুল আশা।
নীরস জীবন রসায়িত হবে তাঁর কবিতায় সুরে,
তাঁহার অভয়বাণীতে সর্ব ভয় চলে যাবে দূরে।
যখনি শক্তি পাবে না, নিজেরে দুর্বল মনে হবে,
তাঁর লেখা পড়ে শক্তি-সাহসে নূতন জন্ম লবে।“
(মৃত্যুহীন রবীন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ, ভুঁইয়া ইকবাল)
কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের মাত্র ২১ মাস পরে ১৯৪২ সালে নজরুল বাক্‌শক্তি হারিয়ে ফেলেন।
রবীন্দ্র-নজরুল দুজনে দুজনের মূল্যায়ন করেছেন নানাভাবে আর এ ব্যাপারে কেউ কোনও কার্পণ্য করেননি। দুজনার মাঝে সম্পর্কও ছিল চোখে পড়ার মত ।আসলে রবীন্দ্র-নজরুল দুজনেই বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কবি। তাই কাউকে ছোট-বড় করতে গেলেই আখেরে তা ক্ষতি করবে বাংলা সাহিত্যেরই।

(১৩)
নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা আমার এই প্রবন্ধটি শেষ করার আগে জানিয়ে দিতে চাই যে ১৯২১ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত তাঁদের যুগ্মযাত্রার পথে ঘটেছে নানা ছোট-বড় ঘটনা, এসেছে ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলা নানা গৌরবময় থেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ মুহূর্ত। আরোপ-প্রত্যারোপের মধ্য দিয়ে একসময় উভয়েই হয়েছেন ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু তাতে তাঁদের সৃষ্টিশীলতার পথচলা ক্ষণিকের জন্যেও থেমে থাকেনি। এটা ঠিক যে গ্রহণের পাল্লাটা স্বাভাবিকভাবেই নজরুলের দিকেই ভারি, কিন্তু সজ্ঞানে-অবচেতনে কবি নজরুলের বিপ্লবী ভাবাদর্শ হয়ত কবিগুরুর রচনাকেও প্রভাবিত করেছিল, তিনি লিখেছেন অচলায়তন, তাসের দেশ, রক্তকরবীর মত গ্রন্থ যাতে ধ্বনিত হয়েছে নূতনের বানী, বিপ্লবের জয়ধ্বনি, গতানুগতিকতার বন্দীদশা থেকে মুক্তির আহ্বান। তাঁর অধিকাংশ রচনাই হয়ত নজরুলের পূর্বসূরী, তাই সেগুলোতে নজরুল-দর্শনের প্রভাবের কথা বললে হয়ত সবাই হাসবে। তবে চেতনে বা অবচেতনে সে উন্মত্ততার প্রভাব যে ঠেকান যায় না, তার কিছুটা নিদর্শন মেলে যখন তিনি ১৯২৩ সালে যখন ‘রক্তকরবী’ নাটকটি লিখতে শুরু করেন। মূল প্রেরণা ১৯১৭ র সোভিয়েত বলশেভিক আন্দোলন হলেও অধ্যাপক ডাঃ বিশ্বনাথ রায় পুরাণবাগীশ, চিকিৎসক ও বিশুপাগলার চরিত্রের মধ্যে যথাক্রমে দীনেশচন্দ্র সেন, ডাঃ বিধান রায় ও কারাগৃহে অনশনরত নজরুলকেই চিহ্নিত করেছেন। অনুমানটি সম্ভবতঃ বাতুলতা নয়। (তথ্যঃ রবিজীবনী ৯/পৃ ৭, প্রশান্ত পাল)
আরেকটি ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। নজরুল অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক সময় তাঁর গানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি সমসাময়িক পঞ্চকবির অন্য চার কবির বাইরে এসে একেবারে স্বতন্ত্র ধারায় সুর রচনা করেছিলেন। একবার রবীন্দ্রনাথের লেখা গানের সুরারোপ করতে গিয়ে বিভ্রাট বাঁধে। রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবিতে নজরুলকে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেন নরেশচন্দ্র মিত্র। তখন সুরকার হিসাবে নজরুলের জনপ্রিয়তা সবার উপরে। চলচ্চিত্রটি যখন মুক্তি পেতে যাচ্ছে, তখন বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড থেকে আপত্তি ওঠে যে বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে ছবিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত (৭টি রবীন্দ্র সঙ্গীত) ব্যবহার করা হয়েছে এবং সুরও যথাযথ নয়। অতএব ছবিটি মুক্তি পেতে পারে না। প্রযোজকের মাথায় হাত। নজরুল কালক্ষেপন না করে ফিল্মের প্রিন্ট ও প্রজেক্টোর নিয়ে ট্যাক্সি করে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের কাছে চলে গেলেন। সবশুনে রবীন্দ্রনাথ বললেন কি কাণ্ড বলতো? তুমি শিখিয়েছ আমার গান, আর ওরা কোন আক্কেলে তার দোষ ধরে? তোমার চেয়েও আমার গান কী তারা বেশি বুঝবে? আমার গানের মর্যাদা কী ওরা বেশী দিতে পারবে’? একথা বলে আগের থেকে লিখে রাখা অনুমতিপত্র নিয়ে তাতে সই ও তারিখ দিয়ে দিলেন।
সব শেষে একটু ব্যতিক্রমী আলোচনায় আসি, যা নিয়ে খুব কম সমালোচকই চর্চা করেছেন। আধুনিক বাংলা-সাহিত্যে, বিশেষতঃ কাব্য-সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে নামগুলি উচ্চারণ করলে সমগ্র কাব্যসাহিত্যের একটা নির্যাস বা একটা সম্পূর্ণ ছবি ফুটে ওঠে তাঁরা হলেন মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দ। এঁরা একে অপরের না বলা কথাকে সম্পূর্ণ করে যেন পরস্পরের পরিপূরক, যদিও নামগুলি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। মাইকেল আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক, ঈশ্বর গুপ্ত আছেন তাঁর পিছনে। রবীন্দ্রনাথ সেই সাহিত্যে এনেছেন নান্দনিকতা আর রেখেছেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর। তবু যেন তিনি জনসাধারণের কাছের মানুষ হয়ে ওঠা বা তাদের হৃদয়ের বাণীটি সঠিকভাবে উচ্চারণে সমর্থ হননি, হয়ত দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতার অভাবে। এই অভাবটি সেসময় পূর্ণ করেছেন নজরুল, কোন বিশেষ কষ্টকল্পনা না করেই জনসাধারণের অতি কাছে পৌঁছে গেছেন যেখানে- ‘জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!’ এসব যে নিছক কল্পনা নয়, বিপ্লবের করুণ দিকটাও তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাতে দ্বিধা করেননি-
“ক্ষুধাতুর শিশু চায়না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন,
বেলা পড়ে গেল খায়নিক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।“
আজন্ম স্বাধীনতাকামী হয়েও আমাদের জননেতাদের নির্লজ্জ লোভের ছবিটা তাঁর চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, লিখেছেন-
“বক্তৃতা দিয়ে কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লংকা পকেটেতে বোকা এইবেলা ঢোকা, এই তালে
নিস তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে...।“
এখানে একটা কথা বলার আছে। নজরুল ‘যুগের না হই হুজুগের কবি’ হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন কি বাধ্য হয়ে, স্বেচ্ছায় না সাধ্যের অভাবে? এই প্রশ্নেই মনে হয় আমাদের এই তুলনামূলক আলোচনার সার্থকতা। যদিও বহু সমালোচকদের মতে নজরুলের কবিতার ‘সীমাবদ্ধতা’ সম্পর্কে প্রচলিত মতগুলো নিম্নরূপ :
এক- নজরুল মূলত ‘টপিক্যাল’ কবি। তাঁর অধিকাংশ রচনাই সমসাময়িক উত্তেজনার ফল।
দুই- নজরুলের কাব্যপ্রয়াস বিবর্তনহীন।
তিন- তাঁর কবিতার বিষয় ও আঙ্গিক পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল নয়।
চার- কালোত্তরে টিকে থাকার মতো রচনা, মহত্ত্ব ও গভীর ভাব নজরুলের সাহিত্যে অতি সামান্য।

এসব মত খণ্ডন করেছেন কেউ কেউ। যেমন, আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশদভাবে দেখিয়েছেন, নজরুল একই সাথে কালজ এবং কালোত্তর (সৈয়দ ১৯৭৭, ১৯৮৭)। ‘যুগের হুযুগ’ কেটে যাওয়ার পরও বহুভাবে নজরুলের কবিতা ব্যবহৃত-চর্চিত-গ্রাহ্য হওয়ার প্রেক্ষাপটে বলা সম্ভব যে, নজরুল সমকালের কবি তো বটেই, একই সাথে অনাগত কালেরও কবিও।
আমার মতে নজরুল রবীন্দ্রোত্তর যুগটিকেই শুধু চিহ্নিত করেন না, তাকে স্বমহিমায় বিকশিত ও বিবর্তিতও করেছেন। তিনি সে অর্থে রবীন্দ্রনাথ থেকে বড়-ছোট বা নিছক উত্তরসূরী নন, বরং রবীন্দ্র-কাব্যের যা অস্ফুট অংশ, তারই পরিপূরক। এই পূর্ণতার দায়িত্ব নজরুল অজান্তেই নিয়ে ফেলেছেন, গুরুদেবের প্রতি শ্রদ্ধাবশে। সজ্ঞানে তিনি বলছেন “মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে”, অর্থাৎ রবি ঠাকুর চিরকেলে বাণী লিখে চলুন, তাঁর পক্ষে সেটাই যোগ্যতম কাজ, আর সেখানে নজরুল থাকবেন যুগের বা হুজুগের কবি হয়ে। তাহলে কি রবীন্দ্রনাথের অবর্তমানে নজরুলের মধ্যে ক্ষমতা ছিল শাশ্বতকালের কবি হয়ে ওঠার (তিনি যে তা আংশিকভাবে হয়ে উঠেছেন, তা মেনে নিয়েই বলছি)? বিয়াল্লিশে কবি মূক ও স্তব্ধতার আড়ালে চলে না গেলে কি হত কে জানে!

পরিশিষ্টঃ ১।।
বাংলা কাব্য-সাহিত্যে নজরুল ইসলামের সঠিক স্থানটি নির্ণয় করার চেষ্টা বহু সমালোচক যত্ন-সহকারে করে চলেছেন, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের গুণীজনদের কাজ যথেষ্ট আন্তরিক। যদিও তাঁদের অনেকেই সাম্প্রদায়িক কারণে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করতে পারেন নি, তবে ধর্মনিরপেক্ষভাবে আলোচনা করার মত বিদ্বদ্‌জনেরও অভাব নেই। আপাততঃ অন্তর্জাল ঘেঁটে যেটুকু পেলাম, সাহিত্যিক হিসেবে নজরুলের বিশেষত্বগুলো এইভাবে সূচিত করেছেন একজন সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ -
“একঃ সাধারণভাবে নজরুলকে চেনা হয় রোমান্টিক কবি হিসাবে। সেই রোমান্টিকতার এক পাশে বিদ্রোহ, অন্যদিকে প্রেম ও প্রকৃতি।
দুইঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তিরিশি কবিদের মধ্যবর্তী জায়গায় তাঁর স্থান। আর এই স্থানে সত্যেন দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার কিংবা যতীন সেনগুপ্তের তুলনায় তাঁর গুরুত্ব অনেক বেশি।
তিনঃ বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র-প্রভাব অতিক্রমে নজরুল খুব বড় ভূমিকা রেখেছেন ‘অলস শব্দসুষমা’র বিপরীতে বীরত্বব্যঞ্জক গতি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।
চারঃ নজরুল ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের কবি এবং ‘ঔপনিবেশিক সমাজে সংগ্রামী কবি’।
পাঁচঃ নজরুল নিম্নশ্রেণীর মানুষের প্রতি দরদি কবি-ব্যক্তিত্ব। বাংলা কবিতার সীমাকে তিনি এ দিক থেকে প্রসারিত করেছেন।
ছয়ঃ নজরুল গভীরভাবে মানবতাবাদী কবি; তাঁর সমগ্র উচ্চারণ এবং কর্মপ্রবাহ এক গভীর মানবতাবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত।
সাতঃ নজরুল বাংলা কাব্যের ধারায় একজন বড় কবি। বাংলা কবিতার শব্দমুদ্রায় ও ছন্দে তাঁর সুস্পষ্ট অবদান রয়েছে। তাঁর কাব্যস্বর পৃথক ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। উত্তরকালীন কবিতার অন্তত তিনটি প্রধান ধারায়— ইন্দ্রিয়জাগর উচ্চারণে, সাম্যবাদী-মার্কসবাদী কবিতায় এবং ইসলামচেতন কবিতায়— বিপুল প্রভাব তাঁর গুরুত্বকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।“
(মোঃ আজম, শিল্প-সাহিত্য, ডিসেম্বর ২০১৪)।

পরিশিষ্ট- ২।।
সজনীকান্ত দাস নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধুস্থানীয় ও রবীন্দ্র-অনুরাগী সাহিত্যিক-মণ্ডলীর অগ্রগন্য ছিলেন। বন্ধুত্বে বিরোধ বাধে নজরুল হঠাৎ করে প্রায় সবাইকে ডিঙ্গিয়ে কবিগুরুর নিকট সান্নিধ্যে এসে পড়ায়। সজনীকান্ত দ্বারা প্রকাশিত ও সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকা শনিবারের চিঠির মাধ্যমে তিনি দলবল-সমেত নানাভাবে নজরুলকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ সহযোগে উত্যক্ত করতে শুরু করেন আর কবিগুরুকে ভুল বুঝিয়ে পরস্পরের সম্পর্ক খারাপ করার কাজে উঠে পড়ে লাগেন। তিনি প্রতিভাবান কবি, ক্ষুরধার রসবোধ দিয়ে সে স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁর রচনায়। রুচিবোধের প্রশংসা করতে না পারলেও, তিনি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার যে প্যারডি করেছেন তাতে তাঁর রসবোধ আর কবিত্বশক্তিকে উপেক্ষা করা যায় না। এই প্রবন্ধের পরিসরে একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও উভয় কবিই রবীন্দ্র-বৃত্তের সীমায় ছিলেন বলে সমগ্র কবিতাটিই ‘শনিবারের চিঠি’র পুরনো সংখ্যা থেকে উদ্ধৃত করে দিচ্ছিঃ
" "অসমছন্দ"
সজনীকান্ত দাস (শনিবারের চিঠি, ১৮ আশ্বিন, ১৩৩১)
"বর্তমানে কামস্কাট্‌কীয় এই ছন্দের অত্যন্ত ব্যবহার হইতেছে। মিলহীন ও ছন্দহীন কবিদের এই ছন্দটি প্রায় panacea গোছ। অসমছন্দের দুটি একটি লাইন তুলিয়া দিলে কিছুই বুঝা যাইবে না।
আমি ব্যাঙ
লম্বা আমার ঠ্যাং,
ভৈরব রভসে বরষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং।
আমি ব্যাঙ,
আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ,
শ্রাবণী নিশায় পরশে আমার সাহসিকা অভিসারিকা
ডেকে ওঠে 'বাপ বাপ'।
আমি ডোবায় খানায় কাদায় ধূলায়
খাটিয়ার তলে, কিংবা ব্যবহারহীন চুলায়,
কদলি-বৃক্ষের খোলেও কখনও রহি;
ব্যাঙাচি রূপেতে বাঁদরের মতো লেজুড়ও আমি সহি।
আমি প্রাতে ও দুপুরে বিকালে ও সাঁঝে
যখন ঝিল্লী ঝাঁঝর কাননে কাননে বাজে
গেয়ে যাই গান
'আসমান'*
ফেড়ে ফেড়ে**
মিছে বলে লোক গলাটা আমার হেঁড়ে।
আমি 'শির' তুলে হেরি 'কেয়ার' করিনে কারেও
মোরে আটকাতে নারে কাঁটার বেড়ার তারেও
আমি কচুর বনের আড়ালেতে রহি মাঝে মাঝে দিই লাফ
গিন্নী মিছাই দেখায় যে ভয় 'সাপ ওগো ঐ সাপ'
আমি সাপেরে করিনে 'কেয়ার'
দাঁড়াওয়ালা যত ক্যাঁকড়ারা মোর 'এয়ার'।
আমি ব্যাঙ আমি বিদ্রোহী ব্যাঙ
আমি উল্লাসে কভু নেচে উঠি ড্যাং ড্যাং
আমি ব্যাঙ
দুইটা মাত্র ঠ্যাং।
আমি সাপ আমি ব্যাঙেরে ধরিয়া খাই
আমি বুক দিয়া হাঁটি ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই।
আমি ভীম ভুজঙ্গ ফণিনী দলিত ফণা
আমি ছোবল মারিলে নরের আয়ুর মিনিট যে যায় গোণা
আমি নাগশিশু আমি ফণীমনসার জঙ্গলে বাসা বাঁধি।
আমি 'বে অফ বিস্কে' 'সাইক্লোন' আমি মরু সাহারার আঁধি।
আমি বেদুয়ীন, আমি মহম্মদ ঘোরী,
আমি কিশোরী মেয়ের নাকের নোলক
ঢাকীদের আমি শখের ঢোলক
সৌখীন যত মডার্ণ ছেলের 'ওয়েস্ট এণ্ড' হাত ঘড়ি।
আমি বেন্দা কলুর ঘানি
আমি খোদার ষণ্ড, 'নিখিলের নীল খিলানে যে ক্ষুর হানি'
গলা 'ধাক্কার ধমক' আমি যে 'ঝরণার কুলকুচি'
'দাড়িম ফাটার' অসহ্য 'ক্ষুধা' পুঁটি মোদকের লুচি
আমি 'ঝড়' আমি 'কড় কড় কড়' K.M. Dasএর চটি
মেমসাহেবের Cero Pearl আমি মেছুনীর আঁশবঁটী।
আমি যুবতী মেয়ের গলার পুষ্পহার
আমি বাসর ঘরের মশক, আমি বাসক তোষকে ছার
আমি নবীন আমি যে কাঁচা,
আমি বাহির হয়েছি ভাঙ্গিয়া আপন খাঁচা।
আমি 'হে বিরাট নদী' বৈশাখ আমি রুদ্র
তারকেশ্বরে সত্যাগ্রহী আমি ভাইকম শূদ্র।
আমি 'এরোপ্লেন' আকাশের বুক চিরি
'ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট' আমি গান্ধী মার্কা বিড়ি
আমি KCN^ কত প্রেমিকের মান রাখি
বাঙালী ছেলের 'নোটবই' আমি একজামিনের ফাঁকি।
আমি ভাদ্রের বান পৌষের শীত
'ওরিয়েণ্টাল আর্ট' আমি; আমি কালোয়াতি গীত
কচি শিশুদের কচি দাঁত আমি প্রৌঢ়া নারীর চুল
আমি নন্দী, গায়ত্রী আমি ঘরের কোণের ঝুল।
চতুরঙ্গের আমি জ্যাঠা মহাশয়
জগদীশ্বর মানিনেক আমি করিনে কাহারে ভয়,
মেসের পেটেন্ট ইলিশের ঝোল পুই চচ্চড়ি আমি
আমি বেহারী চাকর সাবিত্রী ঝি নই আমি রামী বামী
আমি প্রণয়ীর প্রণয়ের লিপি 'shell' আমি 'ডিনামাইট'
ঘোর পুন্নাম নরক আমি যে আলোমাঝে 'সার্চলাইট্‌'
আমি ছুঁচ হয়ে হেথা সেথা ঢুকে ফাল হয়ে বাহিরাই
আমি হুঙ্কার করি প্রথমে কিন্তু শেষকালে চুমু খাই।#
আমি গান গাই
গান গেয়ে গেয়ে ছুটিয়া ছুটিয়া চলি
বিঘ্ন বিপদ শ্যাওলার মতো পদতলে যাই দলি
মাঝে মাঝে কভু পিছ্‌লিয়া পড়ি আমি
প্রেমিকার প্রেমপাশে ধরা পড়ে চলিতে চলিতে থামি
আমি থামিতে থামিতে ঘামি
কবে 'বেহেস্তে' পহুঁচিব তাই ভাবি যে দিবস যামি
আমার কোমল নারীর প্রাণ
নিমিষে নিমিষে পথে ঘাটে মাঠে
অকাতরে করি দান।
ওগো সুন্দরী
ওগো কিশোরী
বেলা শেষে ওগো অবেলায়
কটাক্ষ তুমি হেনো মোর পানে
আমি মাতি রব ছায়ানট গানে
কেলে হাঁড়ি মোর টাঙ্গায়ে রাখিব শ্যাওড়া গাছের তলায়।
ওগো প্রেয়সী করুণা কোরো,
আমার জটা পড়া চুল ছেঁটে দেবো তাই ধোরো,
তুমি থেকো গো 'আদুল' গায়
আমি আপনারে টেনে টেনে
'বহুত কোশিষ' মেনে
তোমারে লক্ষ্য করিয়া ছুটেছি ঠাঁই দিয়ো ফাটা পায়।
Note: * - মাঝে মাঝে বিদেশী শব্দ প্রয়োগ করা এই ছন্দের একটি রীতি
** - Trained কান না হইলে মাঝে মাঝে পড়িবার সময় বাধিতে পারে, কিন্তু এই কবিতার ছন্দ নিখুঁত, একেবারে কামস্কাটকীয়।
^ - পোটাসিয়াম সায়ানাইড। আমরা যতদূর জানি Chemical formula এই প্রথম বাংলা কবিতায় ব্যবহৃত হইল।
# - এই 'চুমু খাই' শব্দটি বন্ধুবর গাজী আব্বাস বিট্‌কেলের 'প্রলয়ের ফুলকি' নামক কবিতা হইতে অনুমতি অনুসারে গৃহীত।" 


(শেষ)