Friday, October 16, 2020

পুরুলিয়ায় মাইকেল- প্রবন্ধ।

পুরুলিয়ায় মাইকেল 


ভূমিকা।

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের (২৫শে জানুয়ারি, ১৮২৪ - ২৯শে জুন, ১৮৭৩) স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ি, কলকাতা, মাদ্রাজ, ফ্রান্স, ইংল্যাণ্ডের খবর অনেকেই রাখে, কিন্তু তাঁর হ্রস্ব জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় যে বাংলার স্বল্পখ্যাত, ব্রাত্যই বলা যায়, মানভূম-পুরুলিয়ায় কেটেছে তার বিস্তারিত বিবরণ অনেকেই হয়ত জানেন না। গুণীজনের জ্ঞাতার্থে পুরুলিয়া-বিশেষজ্ঞ ও গবেষক শ্রী দিলীপকুমার গোস্বামীর সাহায্য নিয়ে (তাঁর অনুমতিক্রমে) কিছু আলোচনা করছি।
পুরুলিয়ার পঞ্চকোট ভারতের অন্যতম প্রাচীনতম রাজবংশ। ৮০ খ্রীষ্টাব্দে মধ্যভারতের ধার রাজবংশের ভ্রমক্রমে পরিত্যক্ত ও মানভূমের ঝালদার কিছু আদিবাসী সর্দারদের হাতে পালিত সন্তান দামোদরশেখর বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে শিখর রাজবংশের পত্তন করেন। একসময় এই বংশের রাজারা 'সিংদেও' উপাধি গ্রহণ করেন। তারপর দীর্ঘ ১৮০০ বছরে সাতবার রাজধানী পরিবর্তন হয়ে পঞ্চকোটের রাজধানী কাশীপুরে স্থানান্তরিত হবার পর তৎকালীন মহারাজা নীলমনি সিংদেওএর আমন্ত্রণে মাইকেল মধুসূদন আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার হিসেবে এস্টেটের একটি মামলা লড়তে নিযুক্ত হন ও ১৮৭২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দুই সপ্তাহের জন্যে একবার, তারপর মার্চে এসে প্রায় সাড়ে-পাঁচ মাস কাল পুরুলিয়ায় অতিবাহিত করেন। এরপর কলকাতা ফিরে তিনি আর বেশিদিন বাঁচেন নি, ১৮৭৩এর ২৯শে জুন প্রয়াত হন।
আমার এই রচনার উদ্দেশ্য কিন্তু মহাকবির পুরুলিয়া-বাসের বিশদ বিবরণ জানানো নয়, তাঁর এই ছয়মাস পুরুলিয়াবাসের কাল বাংলা সাহিত্যকে কিভাবে আর কতটা পুষ্ট করেছে সেটুকুই আমাদের আলোচ্য এখানে। এই সময়কালে কবি মোট সাতটি চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট ও অন্য কবিতা লিখেছেন যা তাঁর একটি স্থানের উপরে লেখা সর্বাধিক। পুরুলিয়ার German Evangelic Lutheran Mission দ্বারা প্রতিষ্ঠিত GEL Church কবির প্রথম প্রবাসেই তাঁকে সম্মানিত করে ও খ্রীষ্টদাস নামে একটি যুবকের ধর্মান্তরণ বা ব্যাপ্টিজম অনুষ্ঠানে তাঁকে যুবকটির অন্যতম ধর্মপিতার (Godfather) দায়িত্ব নিতে বিশেষ অনুরোধ জানায়। এই সম্মানে অভিভূত হয়ে তিনি দু'টি কবিতা লেখেন- একটি পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে, অন্যটি সদ্য ধর্মান্তরিত ধর্মসন্তান খ্রীষ্টদাসের জন্য আশীর্বাণী-রূপে। এছাড়া 'পরেশনাথ গিরি' নামে তিনি একটি সনেট লেখেন যদিও পঞ্চকোট থেকে প্রায় ১০০ কিমি পশ্চিমে পরেশনাথ দূর থেকেও দৃশ্যমান হয় না, আর সেখানে যাত্রার কোন প্রামাণ্য তথ্যও পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়বার পুরুলিয়ার স্থতিকালে তিনি আরও চারটি সনেট লেখেন, সেগুলির সম্বন্ধে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।
(১)
পুরুলিয়া।
পাষাণময় যে দেশ, সে দেশে পড়িলে
বীজকুল, শস্য তথা কখন কি ফলে?
কিন্তু কত মনানন্দ তুমি মোরে দিলে,
হে পুরুল্যে! দেখাইয়া ভকত-মণ্ডলে!
শ্রীভ্রষ্ট সরস সম, হায়, তুমি ছিলে,
অজ্ঞান-তিমিরাচ্ছন্ন এ দূর জঙ্গলে;
এবে রাশি রাশি পদ্ম ফোটে তব জলে,
পরিমল-ধনে ধনী করিয়া অনিলে!
প্রভুর কী অনুগ্রহ! দেখ ভাবি মনে,
(কত ভাগ্যবান তুমি কব তা কাহারে?)
রাজাসন দিলা তিনি ভূপতিত জনে!
উজলিলা মুখ তব বঙ্গের সংসারে;
বাড়ুক সৌভাগ্য তব এ প্রার্থনা করি,
ভাসুক সভ্যতা-স্রোতে নিত্য তব তরী।
(* পুরুলিয়ার খ্রীষ্টান-মণ্ডলীকে লক্ষ্য করে লিখিত। কবি-রচিত চতুর্দশপদী কবিতাবলির এটি ১০৫ নং সনেট। পুরুলিয়ার German Evangelic Lutheran (G.E.L.) Mission সংস্থা প্রকাশিত ১৮৭২এর এপ্রিল সংখ্যা 'জ্যোতিরিঙ্গন' পত্রিকায় সনেটটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।)
১৮৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিভিল কোর্টে বাদীপক্ষের হয়ে একটি মামলা লড়তে কবি প্রথম পুরুলিয়া এসেছিলেন। সেই মাসেরই মাঝামাঝি পুরুলিয়ার খ্রীষ্টান সমাজ, যাঁরা মধুসূদনের কবি-খ্যাতি সম্বন্ধে বিশেষ সচেতন ছিলেন, কবিকে G.E.L. Church-এ একটি সম্বর্ধনা দেন। জীবনের গোধূলিবেলায় হতাশাগ্রস্ত জীবনে এই আশাতীত সম্মান কবির প্রাণে সঞ্জীবনী সুধার সঞ্চার করেছিল, কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে কবি সনেটটি রচনা করেছিলেন।
কবিতাটির ভাষা সরল, তবু কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। পুরুলিয়ার লৌকিক উচ্চারণ 'পুরুল্যা'। এই শব্দের সংস্কৃতকৃত সম্বোধনে 'পুরুল্যে' - এই লৌকিক শব্দটি এক অলৌকিক মর্যাদা পেয়েছে। বাংলা সাহিত্যের একমাত্র মহাকাব্য রচয়িতা কবি (হেমচন্দ্রের 'বৃত্রসংহার' নিয়ে বিতর্ক আছে) শ্রীমধুসূদন এই কবিতায় নিজেকে 'ভূপতিত জন' বলেছেন। অতি ব্যক্তিগত অনুভবের এই প্রকাশ বিস্ময়কর। কবিতাটিতে পুরুলিয়াবাসীর প্রতি অজস্রধারে কবির শুভেচ্ছা ও আশীর্বাণী বর্ষিত হয়েছে, যা স্মরণ করে আজকের পুরুলিয়াবাসী অবশ্যই রোমাঞ্চিত হবেন।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে পুরুলিয়া যাত্রার সামান্য পূর্বে ১৮৭১ সালের সেপ্টেম্বরে কবি একটি মামলার কাজে ঢাকা যান। এই সুযোগে ঢাকাবাসী সাহিত্যপ্রেমী মানুষ কবিকে সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন। খুশি হয়ে কবি লিখেছিলেন ঢাকাবাসীদের উদ্দেশ্যে একটি সনেট-
"নাহি পাই নাম তব বেদে কি পুরাণে
কিন্তু বঙ্গ-অলঙ্কার তুমি যে তা জানি
পূর্ব-বঙ্গে।......"
বঙ্গভূষণ কবির চরণধুলিতে ঢাকা শহর পবিত্র হয়েছিল। এবার বঙ্গের প্রত্যন্তপ্রদেশের অবহেলিত উপেক্ষিত পুরুলিয়া সেই গৌরবের অধিকারী হল।
(২)
'পরেশনাথ গিরি'
হেরি দূরে ঊর্দ্ধ্বশিরঃ তোমার গগনে, *
অচল, চিত্রিত পটে জীমূত যেমতি।
ব্যোমকেশ তুমি কি হে, (এই ভাবি মনে)
মজি তপে, ধরেছ ও পাষাণ মূরতি?
এ হেন ভীষণ কায়া কার বিশ্বজনে?
তবে যদি নহ তুমি দেব উমাপতি,
কহ, কোন্‌ রাজবীর তপোব্রতে ব্রতী-
খচিত শিলার বর্ম্মকুসুম-রতনে
তোমার? যে হর-শিরে শশীকলা হাসে,
সে হর কিরীটরূপে তব পুণ্য শিরে
চিরবাসী, যেন বাঁধা চিরপ্রেমপাশে!
হেরিলে তোমায় মনে পড়ে ফাল্গুনিরে
সেবিলে বীরেশ যবে পাশুপত আশে
ইন্দ্রকীল নীলচূড়ে দেব ধূর্জ্জটিরে।
(*- লক্ষ্যণীয় যে বাংলা বানান সংশোধনের আগে লেখা বলে প্রাচীন রীতি- যেমন ঊর্দ্ধ্ব, বর্ম্ম, ধূর্জ্জটি লেখা হয়েছে।)
অস্যর্থ- পটচিত্রে আঁকা মেঘমালার মত দূরে উচ্চশৃঙ্গ একটি পর্বত দেখলাম (কবি মধুসূদন ১৮৭২এর ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবার পুরুলিয়া আসেন বরাকর-পুরুলিয়া রোড ধরে। এই রাস্তা থেকে পরেশনাথ পর্বতের ন্যূনতম রৈখিক দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। আজকের দিনে আকাশ পরিষ্কার না থাকলে পর্বতশৃঙ্গ এতদূর থেকে দেখা যায় না, তবে সে যুগে এত ধুলো-ধোঁয়া বাড়ি-ঘর না থাকাতে হয়ত সেটা সম্ভব হয়েছিল। হয়ত ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য পাহাড়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই কবি এর সম্পর্কে এত আনুকূল্য় দেখিয়েছেন। কবির দেওয়া নাম 'পরেশনাথ গিরি' না হলে যে কোন পাহাড় সম্পর্কেই কবিতাটি প্রযোজ্য হতে পারত।)। তুমি কি মহাদেব, তপস্যার প্রভাবে পাষাণমূর্তি ধরেছ? এই পৃথিবীতে তোমার মত ভীষণমূর্তি আর কারো নেই। তুমি যদি শিব না হও, তবে তুমি কোন তপস্যারত রাজবীর? কুসুম-রতনে শোভিত তোমার অঙ্গে শিলার বর্ম কেন? শিবের মাথায় চন্দ্রকলা শোভা পায়, সেই মহেশ তোমার মস্তকে শোভিত হচ্ছেন। এ উভয়ের শাশ্বত বন্ধন। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন পাশুপত অস্ত্র লাভের জন্যে হিমালয়ের ইন্দ্রকীল গিরিশৃঙ্গে সাধনা করেছিলেন, তোমাকে দেখলে এই রূপটি স্মরণে আসে।
এটি কবির সনেটমালার ১০৬ সংখ্যক সনেট, সেক্সপীয়ারীয় ও পেত্রার্কীয় রীতির মিশ্রণে এটি গঠিত।

(৩)
'কবির ধর্ম্মপুত্র' (শ্রীমান খ্রীষ্টদাস সিংহ)
হে পুত্র, পবিত্রতর জনম গৃহিলা
আজি তুমি, করি স্নান যর্দ্দনের নীরে
সুন্দর মন্দির এক আনন্দে নির্ম্মিলা
পবিত্রাত্মা বাস হেতু ও তব শরীরে;
সৌরভ কুসুমে যথা, আসে যবে ফিরে
বসন্ত, হিমান্তকালে। কি ধন পাইলা-
কি অমূল্য ধন বাছা, বুঝিবে অচিরে,
দৈববলে বলী তুমি, শুন হে, হইলা!
পরম সৌভাগ্য তব। ধর্ম্ম বর্ম্ম ধরি
পাপ-রূপ রিপু নাশো এ জীবন-স্থলে
বিজয়-পতাকা তুলি রথের উপরি;
বিজয় কুমার সেই, লোকে যারে বলে
খ্রীষ্টদাস, লভো নাম, আশীর্বাদ করি,
জনক জননী সহ, প্রেম কুতূহলে।
২৫শে ফেব্রুয়ারি ১৮৭২, G.E.L. Church-এ কবি মধুসূদন স্থানীয় কাঙালিচরণ সিংহের পুত্র কৃষ্ণদাসের ধর্মান্তরণ(baptism) অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে ধর্মপিতা(God Father) হিসাবে দায়িত্ব-পালনকালে এই সনেটটি উপহার দেন। কবির সাথে আরো একজন ধর্মপিতা ছিলেন ধর্মপ্রকাশ সাগর ও ধর্মমাতা কৃষ্টপ্রসন্ন সাগর। গির্জার রেকর্ড অনুযায়ী কৃষ্ণদাসের বাড়ি ছিল Chorea গ্রাম, সম্ভবতঃ সেটি পুরুলিয়া-সংলগ্ন ছড়রা হবে।
কবির নিজের জীবনে ধর্মান্তরণ মোটেই সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ও মাতা জাহ্নবী দেবীর জীবন এই ধর্মান্তরকরণের ফলে দুর্বিষহ হয়ে ছিল, সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যায়। তাঁরা উন্মাদবৎ হয়ে প্রয়াত হয়েছিলেন। তাই ধর্মপুত্র খ্রীষ্টদাসকে তিনি আশীর্বাদ দিচ্ছেন পিতামাতার সাথে প্রেমময় জীবন উপভোগ করার।
জেরুজালেম ও ইস্রায়েলে প্রবাহিত পবিত্র যর্দনের (জর্ডন নদীর) জলে প্রভু যিশুর জন দি ব্যাপ্টিস্ট দ্বারা ধর্মগ্রহণ হয়। তার পরবর্তী যে কেউ খ্রীষ্টকে গ্রহণ করতে চায় তাকে জর্ডনে স্নান বা তার পবিত্র জল শরীরে ছিটিয়ে ব্যাপ্টাইজ করা হয়। কবি খ্রীষ্টদাসের উদ্দেশ্যে লিখছেন যে তাকেও এভাবে খ্রীষ্টের সঙ্গে একাঙ্গীভূত করা হল। পবিত্র আত্মাকে ধারণের জন্যে সে যেন দেহমধ্যে এক মন্দির তৈরি করল, যেন শীতের শেষে ফুলের সৌরভ প্রকৃতিতে ফিরে এল। সৌভাগ্যক্রমে কী ধন সে পেয়েছে তা সে অচিরেই বুঝবে। তাকে কবি আশীর্বাদ করছেন যেন এই ধর্মের বর্ম পরে সে পাপ-রূপী রিপুর নাশ করে জীবনযুদ্ধে বিজয় লাভ করে পিতামাতা নিয়ে সুখে জীবন কাটায়।
সনেটটির ক্রম ১০৭, ১৮৭২ নভেম্বর সংখ্যা জ্যোতিরিঙ্গন পত্রিকায় এর প্রথম প্রকাশ।


(৪)
পঞ্চকোট গিরি
কাটিলা মহেন্দ্র মর্ত্ত্যে বজ্র প্রহরণে
পর্ব্বতকুলের পাখা; কিন্তু হীনগতি
সেজন্য নহ হে তুমি, জানি আমি মনে,
পঞ্চকোট ! রয়েছ যে,- লঙ্কায় যেমতি
কুম্ভকর্ণ,- রক্ষ, নর, বানরের রণে-
শূন্যপ্রাণ, শূন্যবল, তবু ভীমাকৃতি,-
রয়েছ যে পড়ে হেথা, অন্য সে কারণে।
কোথায় সে রাজলক্ষ্মী, যাঁর স্বর্ণ-জ্যোতি
উজ্জ্বলিত মুখ তব? যথা অস্তাচলে
দিনান্তে ভানুর কান্তি। তেয়াগি তোমায়
গিয়াছেন দূরে দেবী, তেঁই হে! এ স্থলে,
মনোদুঃখে মৌন ভাব তোমার; কে পারে
বুঝিতে কী শোকানল ও হৃদয়ে জ্বলে?
মণিহারা ফণী তুমি রয়েছ আঁধারে।
পঞ্চকোট পাহাড়ের তলদেশে শিখরবংশের তৃতীয় রাজধানী ৯৬২ খ্রীঃ থেকে ১৭৫০ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বছর ধরে বিরাজিত ছিল। তারপর আভ্যন্তরীণ গৃহবিবাদের ফলে রাজবংশ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়, বালক রাজপুত্র মণিলাল রাজভক্ত এক রাজকর্মচারীর সাহায্যে প্রাণে বাঁচেন। মণিলাল বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে রাজ্য পুনরুদ্ধার করে মহারাজনগর, রামবনি, কেশরগড় হয়ে ১৮৩২ সালে কাশীপুরে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৭২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পুরুলিয়ার সেশন কোর্টে একটি মামলা লড়তে বাদীপক্ষের আইনিজীবী হয়ে পুরুলিয়া আসেন। সেসময় মহারাজা নীলমণি সিংদেও কাশীপুরে শিখরবংশী শাসক ছিলেন। তিনি মাইকেলের সুখ্যাতি শুনে কলকাতায় লোক পাঠিয়ে তাঁর একটি মামলার পরামর্শ দিতে আইন-উপদেষ্টা করে কাশীপুরে আমন্ত্রণ জানান। কবি সেসময় ঋণভারে জর্জরিত, জীবনযুদ্ধে প্রায় পরাজিত হতোদ্যম। এই অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণে হতাশাগ্রস্ত কবির জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়, আর্থিক সমস্যারও সাময়িক সুরাহা হয়। তিনি ১৮৭২এর মার্চের মাঝামাঝি সময়ে কাশীপুর রাজসভায় এসে কাজে যোগদান করেন। অকস্মাৎ এই ভাগ্য পরিবর্তনে উচ্ছ্বসিত কবি এসেই পঞ্চকোট রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে অধ্যয়ন করলেন, আর এই রাজ্যের গৃহদেবতার বা রক্ষক-প্রহরীর মত শায়িত পঞ্চকোট গিরিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে এই সনেটটি লিখলেন। এটি ১০৮ নং সনেট, পুরুলিয়া বিষয়ে কবির চতুর্থ যদিও রচনার সঠিক তারিখের কোনও উল্লেখ নেই।
যদিও কবির হতাশ ভাব তখনও তাঁকে পশ্চাদ্ধাবন করে চলেছে, এই সনেটে তা প্রচ্ছন্ন, প্রকট নয়। তাঁর প্রতি কাব্যে, সাহিত্যে ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি তাঁর জ্ঞান আর আকর্ষণের প্রমাণ দেখা যায়। পুরাণের মতে পর্বতের এককালে পাখা থাকত, তারা উড়তে পারত। ইন্দ্রদেব তাই সব পর্বতের পাখা কেটে ফেলেন। রবীন্দ্রনাথের পংক্তি- 'পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ', হয়ত এখানে প্রাসঙ্গিক নয়, তবে হিমালয়-পুত্র মৈনাক যে সেই ভয়েই যে সমুদ্রের গর্ভে আশ্রয় নেয় তা পুরাণে আছে। তবে কি সুপ্ত কুম্ভকর্ণের মত বিশাল পঞ্চকোট সেই কারণেই হীনবল আজ? কবির বক্তব্য, তা সত্য নয়। পঞ্চকোট একদা রাজলক্ষ্মীর স্বর্ণজ্যোতিতে উজ্জ্বল হত। সেই লক্ষ্মী পঞ্চকোটকে পরিত্যাগ করেছে বলেই তার আজ এই ম্লান দশা, মনোদুঃখে সে মৌন হয়েছে, মণিহারা নাগের মত একাকী অন্ধকারে বিরাজ করছে। তার হৃদয়ের শোকানল প্রবল দহন সৃষ্টি করেছে, একথা কেউ বুঝতে পারছে না।


(৫)
পঞ্চকোটস্য রাজশ্রী
হেরিনু রমারে আমি নিশার স্বপনে;
হাঁটু গাড়ি হাতী দুটি শুঁড়ে শুঁড়ে ধরে-
পদ্মাসন উজলিত শতরত্ন-করে,
দুই মেঘরাশি-মাঝে, শোভিছে অম্বরে,
রবির পরিধি যেন। রূপের কিরণে
আলো করি দশ দিশ; হেরিনু নয়নে,
সে কমলাসন-মাঝে ভুলাতে শঙ্করে
রাজরাজেশ্বরী, যেন কৈলাশ-সদনে।
কহিলা বাগ্‌দেবী দাসে (জননী যেমতি
অবোধ শিশুরে দীক্ষা দেন প্রেমাদরে),
"বিবিধ আছিল পুণ্য তোর জন্মান্তরে,
তেঁই দেখা দিলা তোরে আজি হৈমবতী
যেরূপে করেন বাস চির রাজ-ঘরে
পঞ্চকোট;- পঞ্চকোট- ওই গিরিপতি।"
পঞ্চকোটের গৌরবময় ইতিহাসের কাহিনী শ্রীমধুসূদনের কবি মনে এক রোমান্টিসিজমে ঘেরা কল্পলোক তৈরি করেছিল। কাশীপুরের স্বল্পসময়ের বাসেও তিনি যেন শয়নে-জাগরণে স্বপ্নের মত সেই অতীতকে মনশ্চক্ষে প্রত্যক্ষ করতেন। এই সনেটের মধ্যেও একটি উৎকৃষ্ট কবিকল্পনা আছে। পঞ্চকোট রাজবংশের আরাধ্যা দেবী রাজরাজেশ্বরী কবিকে যেন রাজ্যের প্রাচীন গৌরবময় কোন এক মুহূর্তসহ দেখা দিয়েছেন।
কবি 'নিশার স্বপন' কথাটির এখানে উল্লেখ করেছেন। তবে আমার মনে হয় নব বর্ষার মেঘমালায় ঈষৎ আচ্ছন্ন পঞ্চকোট শীর্ষকে কাশীপুর বা তার নিকটবর্তী কোন স্থান থেকে প্রত্যক্ষ করে কবির মনে এই অদ্ভুত ভাবের সমাবেশ হয়। কালিদাসের 'মেঘদূতম্‌' কাব্যে বর্ণিত আছে এরকম একটি মুহূর্ত-
'আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং।
বপ্রক্রীড়া পরিণতং গজপ্রেক্ষনীয়ং দদর্শ।।'
এই বপ্রক্রীড়া সাধারণ মানুষের মনে তেমন কোন ভাবের সঞ্চার না করলেও, কবির রোমান্টিক মনে তার গভীর প্রভাব ফেলতেই পারে। শোনা যায় কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ থেকে আমাদের পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পর্যন্ত এধরণের অলৌকিক সৌন্দর্য দেখে ভাব-সমাহিত হতেন। আর মধু-কবি এই মেঘময় হস্তীযূথের শুঁড়ে শুঁড় মিলিয়ে খেলার মাঝে ভাববিভোর হয়ে প্রত্যক্ষ করলেন দেবী লক্ষ্মীকে। মহেশের রূপে সাক্ষাৎ মূর্ত গিরিপতি পঞ্চকোট পর্বতের কোলে তিনি বিরাজিত। মেঘরাশির মাঝে দূর আকাশে তাঁর রূপমাধুরী শোভা পাচ্ছে, তাঁর রূপে দশদিক আলোকিত। পঞ্চকোট-রাজ্যের আরাধ্যা দেবী রাজরাজেশ্বরী রূপ নিয়ে দেবী হৈমবতী ভোলানাথ শঙ্করের মনোলোভনের জন্যে যেন কৈলাসে উপস্থিত আর কবির জন্ম-জন্মান্তরের অর্জিত অসীম পুণ্যবলে তাঁর মানসপটে এই দৃশ্য আজ ধরা পড়েছে।
এই কবিতাটি ১১০ নং সনেটরূপে প্রকাশিত।


(৬)
পঞ্চকোট-গিরি বিদায় সঙ্গীত।
হেরেছিনু, গিরিবর! নিশার স্বপনে,
অদ্ভূত দর্শন!
হাঁটু গাড়ি হাতী দুটি শুঁড়ে শুঁড়ে ধরে,
কনক-আসন এক, দীপ্ত রত্ন-করে
দ্বিতীয় তপন!
সেই রাজকুলখ্যাতি তুমি দিয়াছিলা,
সেই রাজকুললক্ষ্মী দাসে দেখা দিলা,
শোভি সে আসন!
হে সখে! পাষাণ তুমি, তবু তব মনে
ভাবরূপ উৎস, জানি উঠে সর্ব্বক্ষণে।
ভেবেছিনু, গিরিবর! রমার প্রসাদে,
তাঁর দয়াবলে,
ভাঙা গড় গড়াইব, জলপূর্ণ করি
জলশূন্য পরিখায়; ধনুর্ব্বাণ ধরি দ্বারিগণ
আবার রক্ষিবে দ্বার অতি কুতূহলে।
কাব্য বিচারে এটি সনেট নয়, সনেট-কল্প কবিতা।
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন পুরুলিয়ার কাশীপুরে পঞ্চকোট মহারাজার নীলমণি সিংদেওয়ের রাজসভায় সম্মাননীয় রাজকর্মচারী হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসকাল তিনি সেখানে অবস্থান করেন। এই সময় কবি অবসরকালে পঞ্চকোট ইতিহাসের সম্যক চর্চা করেন। পঞ্চকোটের গৌরবগাথা শুনে তাঁর মনে তৈরি হয় এক কল্পলোক। ইতিহাসের উজ্জ্বল কালের যে খণ্ডগুলি কবির মনে রেখে গেছে গভীর প্রভাব, শয়নে-স্বপনে সেই কল্পলোকের হাতছানি তাঁর মনোভূমে দোলা দেয়। এক নিশীথে অদ্ভূত এক দৃশ্যপট কবির সামনে মূর্ত হয়। পঞ্চকোট পর্বতের পশ্চাদ্‌পটে দুটি হাতি যেন শুঁড়ে শুঁড়ে ধরাধরি করে রাজসিংহাসনে উপবিষ্টা রাজলক্ষ্মীর সম্মুখে বসে রয়েছে, রাজ্যের কুললক্ষ্মী দেবী রাজরাজেশ্বরী যেন অসীম করুণা-বশে কবির মনশ্চক্ষে ধরা দিয়েছেন।
এই কয়েকমাসের মধ্যে এই পঞ্চকোট পাহাড়, এই রাজ্য কবির সঙ্গে যে সখ্যতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, কবির মনে তাদের সান্নিধ্য নানা ভাবের উৎস ছিল। তিনি আজ তাদের বিদায় জানাচ্ছেন। কবির স্বপ্ন ছিল পঞ্চকোটের গৌরবময় ইতিহাসকে আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করবেন। রাজগড় নতুন করে গড়াবেন, ১২ বর্গমাইল ব্যাপ্ত রাজধানীর তিনদিক ঘিরে যে পরিখা ছিল সেগুলিকে আবার জলপূর্ণ করবেন। রাজধানীতে চারধারে চারটি তোরণ ছিল- দুয়ারবাঁধ, বাজার মহল দুয়ার, খড়িবাড়ি দুয়ার আর আঁখ দুয়ার- তিনি কল্পনা করছেন ওই তোরণগুলির সামনে ধনুর্বাণ নিয়ে দ্বারীরা পাহারা দেবে।
কিন্তু বাস্তব অতি নির্মম। কঠিন বাস্তব এসে স্বপ্নকে আঘাত করে, কল্পলোক চুরমার হয়ে যায়। তবু কবির এই স্বল্পকালের প্রবাসে তিনি তিনটি কবিতায় পঞ্চকোটের কালজয়ী মহিমাকে কাব্যে অমর করে রেখেছেন, মহিমান্বিত করেছেন এখানকার মাটি, বাতাস, পাহাড়, জল, আকাশ ও মানুষকে। এই গৌরব পুরুলিয়ার, পঞ্চকোট রাজ্যের। এই ভূমিখণ্ড তাঁর লেখনীর জাদুস্পর্শে চিরজীবি হয়ে থাকে।


(৭)
হতাশা-পীড়িত হৃদয়ের দুঃখধ্বনি।
ভেবেছিনু মোর ভাগ্য, হে রমাসুন্দরি,
নিবাইবে সে রোষাগ্নি,-লোকে যাহা বলে,
হ্রাসিতে বাণীর রূপ তব মনে জ্বলে;-
ভেবেছিনু, হায়! দেখি, ভ্রান্তিভাব ধরি!
ডুবাইছ, দেখিতেছি, ক্রমে এই তরী
অদয়ে, অতল দুঃখ সাগরের জলে
ডুবিনু; কি যশঃ তব হবে বঙ্গ-স্থলে?
এটিও সনেট নয়, একটি সনেটকল্প কবিতা। এতে কবি মধুসূদনের বিড়ম্বিত জীবনের যন্ত্রনাময় ছবি প্রতিভাত হয়েছে। শেষ জীবনে প্রায় ঋণভারে জর্জরিত কপর্দকশূন্য অবস্থায় কবি কাশীপুর মহারাজা নীলমণি সিংদেওএর এস্টেটে আইন-উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। সেখানে একজন ব্যারিস্টার রূপে তাঁকে এস্টেটের জটিল মামলাগুলি দেখতে হত। এমনি একটি মামলায় মহারাজ কলকাতা হাইকোর্টে পরাজিত হন। আইনের চোখে রাজার তরফে কেসটি দুর্বল ছিল, তাই আপ্রাণ চেষ্টা করেও মধুসূদন মামলা জেতাতে পারেন না। এতে রাজার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে যার ফলস্বরূপ কবিকে চাকরি খুইয়ে পঞ্চকোট রাজ্য ছাড়তে হয়। এই চাকরিকে ঘিরে কবির অনেক প্রত্যাশা ছিল যে তিনি ঋণমুক্ত হয়ে আবার সম্মানের জীবনে ফিরে যেতে পারবেন। ভাগ্যদোষে সে স্বপ্ন তাঁর পূরণ হল না।
এই কবিতাটি সাত পংক্তির, আমার মনে হয় এটি অসম্পূর্ণ, কেমন যেন মধ্যখান থেকে শুরু হয়েছে। গঠনে এটি একেবারে সনেটের মত। হয়ত এটি একটি পরিপূর্ণ সনেট ছিল যার প্রথম সাতটি চরণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য কবির হতাশা অবশিষ্ট সাত পংক্তিতেই পরিস্ফুট। বেশ বোঝা যায় লক্ষ্মীর সঙ্গে বাণী অর্থাৎ সরস্বতীর বিবাদ নিয়ে কবিতার শুরু। কবি মনে করছেন, যেহেতু তিনি বাণীর সাধনা করেন মানে কাব্যরচনা করেন, ধনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রমা (লক্ষ্মী) তাঁর প্রতি চিরকাল রুষ্ট, জীবনে তিনি কোনদিনই লক্ষ্মীর কৃপা পান নি। তবে কাশীপুরের চাকরি আর রাজ-অনুগ্রহ পেয়ে তাঁর মনে আশা হয়েছিল এবার হয়ত সেই রোষ শান্ত হবে, ভাগ্যের অনুগ্রহে তাঁর জীবনজুড়ে নেমে আসা বিপর্যয়ের অন্ত হবে। কিন্তু তা হয়নি, কবির ভাগ্যতরী দুঃখের সাগরজলে নিমজ্জিত হল। এই বঙ্গভূমিতে যাঁর প্রাপ্য ছিল অসীম যশ ও মর্যাদা, সেই মহাকবির জীবনে ঘনিয়ে এল দুর্বিপাক। তিনি যশ তো পেলেন না, স্বস্তিও পেলেন না।
শেষ।

Saturday, August 22, 2020

ঈশ্বর-দর্শন। (বিশেষ রচনা)

ঈশ্বর-দর্শন।
(বিশেষ রচনা)

খ্যাতনামা রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও শিক্ষক সন্তোষ সেনগুপ্ত তাঁর ‘আমার সঙ্গীত ও আনুষঙ্গিক জীবন’ বইয়ে গ্রামোফোন কোম্পানির একজন বড়কর্তা হিসেবে লিখেছেন, "কমবয়সে দেবব্রত বিশ্বাসের গলা এমন একটা দরাজ, বিশাল আর সাংঘাতিক ব্যাপার ছিল যে গ্রামোফোন কোম্পানির বাপের সাধ্যি নেই তা রেকর্ডে ধরে রাখে।”

তাহলে তো লাইভ শুনতে হয়। আমাদের অল্পবয়সে দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন ঈশ্বরের অবতার। কিন্তু ঈশ্বরকে পাই কোথা? ভাবতাম কলকাতার বাসিন্দারা ভাগ্যবান, চাইলেই তাঁকে দেখতে পান। আমি থাকি অনেক দূরে, জানিনা ভগবানের ঠিকানা। তাছাড়া খবর পেয়েছি যে তিনি তখন ব্রাত্য, তাঁকে গান গাইতে দেওয়া হয় না, ১৯৭১ সাল থেকে তিনি আর রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করেন না, জলসায়-অনুষ্ঠানে যান না। ভাবতাম এটা কি ইংরেজ শাসনের প্রলম্বন, যে সম্ভাবনার কথা নজরুল লিখে গেছিলেন তাই কি সত্যি হল!
'হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান পরবে ফাঁসি, সর্বনাশী শেখায় এ হীন তথ্য কে রে?'
তাহলে? ১৯৭৮এ হঠাৎই সুযোগ হয়ে গেল শান্তিনিকেতনে পৌষ মেলা দেখতে যাওয়ার, আমাদের এক বন্ধুর হোস্টেলের অতিথি হয়ে। অজয়-ময়ূরাক্ষী-দামোদরের বন্যার বছর সেটা, বাসে ইলামবাজার পেরোবার সময় গাছের ডালে গরুর কংকাল ঝুলতে দেখে শিউরে উঠেছিলাম। সেদিন ৭ই পৌষ সন্ধ্যেয় মেলা তখনও জমে নি তেমন। ফেরার পথে স্টেট ব্যাঙ্কের দরজার মুখে সিঁড়িতে এক মাতালকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। বন্ধু বলল, প্রণাম কর, ইনি রামকিংকর বেইজ। সত্যি, কি নেশা আছে এখানকার জলে-হাওয়ায়-মাটিতে দুনিয়ার যত পাগল-মাতাল-নেশাখোর বলরামের চেলারা ভীড় করেছেন এখানে। আমাদের এই ভগবানও তো পাগল, বুঁদ হয়ে আছেন এক অনন্য নেশার বন্ধনে, তার নাম রবি ঠাকুরের গান।
সকালে পৌষালু শীতের কবল থেকে বেরোতে একটু সময় লেগে গেল। মেলার মুখে দেখি আরে, রবি ঠাকুর বেহালা নিয়ে বসে বাজাচ্ছেন- 'তোমার খোলা হাওয়া'। একটু কাছে যেতেই বুঝলাম, ইনি রবি ঠাকুর হতেও পারেন, আবার নাও হতে পারেন। ইনি হয়ত দাদাঠাকুর বা ধনঞ্জয় বৈরাগী বা 'অচলায়তন' ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া সেই গুরু। বিশ্বভারতীর স্টলে দূর থেকে দেখছি খুব ভীড়। একজন গেরুয়া পরা ভদ্রলোক খোলা গলায় গাইছেন-
"কারণ শুধায়ো না, অর্থ নাহি তার,
সুরের সংকেত জাগে পুঞ্জিত বেদনার।"
মনে হল এই শীতের সকালে যেন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। না, কাছে গিয়ে দেখি সুচিত্রা মিত্র আর অশোকতরু বসে আছেন। জানা গেল, দেবব্রত বিশ্বাস এইমাত্র স্টল থেকে বেরিয়ে কোথায় যেন চলে গেলেন। মনকে সান্ত্বনা দিলাম, ঈশ্বরকে পেতে যে সাধনার প্রয়োজন তা হয়ত আমার ছিল না।

Monday, August 17, 2020

সলিলের গানে দুঃখ-বিরহ। প্রবন্ধ ও আলোচনা

সলিলের গানে দুঃখ-বিরহ।

(প্রবন্ধ ও আলোচনা)


(১)
প্রস্তাবনা।।
ফেসবুকেই সলিল চৌধুরির গানের কিছু বিশেষ দিক নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম একদিন। বিষয় ছিল সলিলের গানের গতিময়তা। না, গতিময়তা বলতে এক্ষেত্রে দ্রুতলয় বা চটুল-ছন্দ বা ভাষার লঘুতার কথা বলছি না, সলিল গানের প্রতিটা বিভাগে রেখেছেন নিজস্বতার স্বাক্ষর। জীবন যে চলার নাম, তা কখনও থেমে থাকে না, দুঃখ-মৃত্যু-বিরহ আসে দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়মেই এই জিনিষ কথায় আর সুরে বুঝিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, অতুল, দ্বিজেন, রজনীকান্ত আর নজরুল- লয় আর যন্ত্রানুষঙ্গে এক নতুন আঙ্গিক যোগ করলেন সলিল চৌধুরি। আমি শুরু করেছিলাম সলিলের একটি জনপ্রিয় গানের কথা দিয়ে, প্রসঙ্গক্রমে এসে পড়ল আরো নানাকথা, সলিল-সমাধি ঘটেছে এমন কিছু গুণী ব্যক্তির সংযোজন, তর্ক-বিতর্ক ক্রমে সমৃদ্ধ করে তুলল এই সূত্রটি। ভাগ্যক্রমে ফেসবুক সব কিছুই ধরে রাখে, মানে এ পর্যন্ত রেখেছে। তবে আমার পোস্টের চেয়েও যে সমৃদ্ধতর এই আলোচনাচক্র, আর তা যাতে হারিয়ে না যায় তাই সবকিছুকে সংকলিত করে উপস্থাপনা করছি বন্ধুদের জন্যে। আশা করি অদূর ভবিষ্যতে আরো কিছু তথ্য-সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে এই রচনা।


ভূমিকা।।
আমাদের দেশের সংগীতে গানের কথার ভাব বা বিষয় অনুসারে গানের স্বভাব, গতি আর মেজাজ নির্ভর করে, সে হিসাবে অধিকাংশ সময়ে রাগ, তাল আর লয় নির্ধারিত হয়। প্রাক্‌-রবীন্দ্র বা রবীন্দ্রোত্তর যুগেও এর খুব একটা অন্যথা হয় নি। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ নিজে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন এ ব্যাপারে, অতুলপ্রসাদ বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কখনও বা নজরুল চমক সৃষ্টি করেছেন মাঝে-সাঝে ব্যতিক্রমী সৃষ্টি দিয়ে। সে প্রসঙ্গে আসার আগে প্রচলিত ধারণা বা প্রয়োগ সম্বন্ধে একটু আলোচনা করে নিই।
হিন্দুস্থানী মার্গসংগীতের এক স্বনামধন্য পণ্ডিত তাঁর কিছু বিদেশী শিষ্যদের নিয়ে ভারতীয় রাগসংগীতের বৈচিত্র্য নিয়ে চর্চা করছেন। তিনি বাদ্যযন্ত্রে ভৈরবীর সুর বাজিয়ে জানতে চাইলেন তাঁদের কী মনে হল। উত্তর এল- কার জন্যে সারারাত অপেক্ষা করলাম, সে এল না। আশ্চর্য! সুরটা ছিল বিখ্যাত বন্দিশ 'কা করুঁ সজনি, আয়ে না বালমা'র। তার পরের সুর ভীমপলশ্রী- বিদেশী শিষ্যেরা একবাক্যে বললেন কে যেন প্রিয়মিলনের অভাবে দুঃখে-অভিমানে গুমরে কাঁদছে। সুর ছিল- 'যা যারে অপনে মন্দিরবা'। পুরনো দিনের এক প্রথিতযশা শিল্পী একদিন গল্পচ্ছলে রাগ বিহাগের সম্বন্ধে কিছু বলছিলেন। এটি বিলাওয়ল ঠাটে উড়ব-সম্পূর্ণ জাতির রাত্রি মধ্য-প্রহরে গেয় একটি সুন্দর রাগ, মনকে মোহাবিষ্ট করে ফেলতে এর জুড়ি নেই। দিনে গাইতে নিষেধ কেন? কথিত আছে এক মহিলা এক সকালে নিজের ঘরে মাছ কুটছিলেন, শিশু-সন্তান পাশে শুয়ে খেলা করছে। এমন সময় পাশের বাড়ির ওস্তাদ রাগ বিহাগ ধরলেন। মোহাচ্ছন্ন হয়ে মহিলা বুঝতে পারেননি কখন মাছের পরিবর্তে শিশুটিকে রেখেছেন বঁটিতে। খবর পেয়ে দেশের রাজা সেদিন থেকে দিনে বিহাগ গাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। তানসেনের দীপক রাগ গেয়ে আগুন জ্বালানো বা বৈজুর মেঘরাগে বৃষ্টি নামিয়ে তা নেভানো, এসব হয়ত গল্পকথা। তবে লক্ষ্য করেছি যে শ্রী-রাগে গীত দত্তাত্রেয় পলুস্করের ‘হরি কে চরণ-কমল নিশাদিন সুমরো রে’ শুনে মনে হত যেন শেষ দিনের ডাক শুনতে পেয়েছেন তিনি, কেমন যেন একটা বিদায়-ব্যথা-জড়িত ক্লান্তি তাঁর সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরে। সত্যি অসম্ভব গুণী মানুষটি বড় তাড়াতাড়ি যেন চলে গেলেন সংসারের মায়া ছেড়ে।
সংগীতের রাগ-রাগিনীর ব্যবহার নিয়ে এরকমই নানা গল্পকথা ছড়িয়ে আছে এ দেশের পথে প্রান্তরে। ওস্তাদ-পণ্ডিতদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা ছিল না গায়ক-সংগীতকারদের। হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত হিন্দি বলয়ের ওস্তাদদের হাতে এমনভাবে কুক্ষিগত ছিল যে খেয়াল-ঠুমরি-ধ্রুপদের বন্দিশ বাংলায় লেখার কথাও ভাবা যেত না। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শোরী মিঞা ঘরানার অনেক বিরোধিতা সহ্য আর উপেক্ষা করে রামনিধি গুপ্ত লিখলেন বাংলায় টপ্পা, রামমোহন রায় লিখলেন ধ্রুপদ। তারপর কিছুটা হলেও খুলে গেল বাংলা গানে উত্তর আর দক্ষিণ ভারতীয় রাগরাগিনীর সার্থক প্রয়োগ, রামপ্রসাদ-মদন-দাশু রায় ভক্তিগীতিতে যা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাতে যোগ করলেন বাংলার লোকগীতি, বিদেশী সুর, ভাঙলেন উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের যাবতীয় বেড়াজাল।
“সংগীতচিন্তা” বইয়ে রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে লিখছেন “আমাদের দেশে সংগীত এমনি শাস্ত্রগত, ব্যাকরণগত, অনুষ্ঠানগত হইয়া পড়িয়াছে, স্বাভাবিকতা হইতে এত দূরে চলিয়া গিয়াছে যে, অনুভবের সহিত সংগীতের বিচ্ছেদ হইয়া গিয়াছে, কেবল কতকগুলা সুরসৃষ্টির কর্দম এবং রাগরাগিণীর ছাঁদ ও কাঠামো অবশিষ্ট রহিয়াছে। সংগীত একটি মৃত্তিকাময়ী প্রতিমা হইয়া পড়িয়াছে।“ অন্যত্র আরো বলেছেন, “ক্লাসিক্যাল আমাদের কাছে দাবী করে নিখুঁত পুনরাবৃত্তি। তানসেন কী গেয়েছেন, জানি না, কিন্তু আজ তাঁর গানে আর-কেউ যদি পুলকিত হন, তবে বলব তিনি এখন জন্মেছেন কেন? আমরা তো তানসেনের সময়ের লোক নই, আমরা কি জড়পদার্থ? আমাদের কি কিছুমাত্র নূতনত্ব থাকবে না?” এর অর্থ কী? “আমার এ ঘর বহু যতন করে/ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।” আসলে সংগীত বা শিল্পসাহিত্য-ললিতকলা ততদিনই বেঁচে থাকে, যতদিন সে নিজেকে ঘষে মেজে নতুন করে নিতে পারছে। প্রতিমুহূর্তে সে নিজেকে পালটে নিতে পারছে। গোলমাল তখনই বাধে, যখন, এই ঘষামাজার কর্তবে নতুন সৃষ্টির ‘আনন্দের’ চাইতে, সে সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ব্যাকরণ লঙ্ঘন হল কিনা, সেই তর্কে প্রাজ্ঞ পিতামহ শ্বেত শ্মশ্রু দোলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইতিহাস সাক্ষী, যতবার শিল্পীর প্রতিভার খামতি দেখা দেয়, ততবারই ধ্বংসের ভয়ে ব্যাকরণ টিকিয়ে রাখার ব্রতে মগ্ন হয়ে পড়েন তাত্ত্বিক পণ্ডিত।



(২)
একটি গান, কিছু কথা।

তবু যেন কিছু বাকি ছিল। রবীন্দ্রোত্তর যুগে নজরুল এনেছিলেন আরবী সুর, বাংলায় লিখেছিলেন গজল, কাওয়ালি, কাজরি, ঠুমরি, দাদরা, ইসলামি সংগীত। বাকি ছিল ভাবের সঙ্গে সুর আর লয়ের সামঞ্জস্য। নজরুল কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও প্রচলিত প্রথা যেন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেললেন সলিল। সুরের বৈচিত্র্য তো বটেই, রাগাশ্রিত গানে বিবাদী সুরের মুন্সিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার, স্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারী-আভোগের প্রচলিত শৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসা, পলিফোনি, এমনকি ভোক্যাল হারমনাইজেশন নিয়ে আসা, একই গানের মধ্যে স্কেল বদল করার সাহস- পূর্বসূরীরা কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেও এ সবকিছুর প্রথম সার্থক প্রয়োগ করেন সলিল চৌধুরি। কথা-সুর-লয়-ছন্দের সামঞ্জস্য আর তার বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে গেল সলিলের একটি জনপ্রিয় গানের কথা-
'দূর নয় বেশী দূর ওই সাজানো সাজানো বকুল বনের ধারে
ওই বাঁধানো ঘাটের পারে।
যেথা অবহেলা সয়ে সয়ে কিছু ফুল শুকানো শুকানো হয়ে
পড়ে পড়ে আছে তার কিছু দূরে ঘাটের চাতাল ছাড়িয়ে-
ওখানে আমার মাতাল হৃদয় সেদিন গিয়েছে হারিয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
বহুশ্রুত গান, বলে দিতে হবে না নিশ্চয় যে কে গেয়েছেন। একে হৃদয়, তায় আবার মাতাল- যাক না হারিয়ে, ক্ষতি কী! তবু কবি থামেন না, অতএব গায়ক শ্যামল মিত্রকে ঠিক কী হারিয়েছে তার বর্ণনা দিতে হয়।
'শুক-সারীরা সেখানে কূজনে কূজনে দুজনে গাহিয়া যেত
ওই নদীটি বহিয়া যেত।
বনহরিণী চকিত চপল চরণে চমক লাগায়ে দিয়ে
তার চেয়ে ভাল চোখ দুটি দেখে যেখানে যেত সে দাঁড়িয়ে-
সেখানে আমার করুণ হৃদয় সেদিন গিয়েছে হারিয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
প্রথম পঙ্‌ক্তির মধ্যমিল আর তার পরে 'চ'এর অনুপ্রাস চোখে পড়ার মত, কবিগুরুর 'চলচপলার চকিত চমকে করিছে চরণ বিচরণ' মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তারও চেয়ে ভাল সেই চোখের বিবরণ যেখানে কবির চোখ পড়েছে, কিন্তু আমাদের এখনও পড়েনি। তাই অনায়াসে বলে উঠি, 'যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌' পরের স্তবকের আশায়।
'মোর মানসী কলস কাঁখেতে লইয়া ওখানে দাঁড়াত এসে,
মুখে মধুর মধুর হেসে।
তার তনুর তীরথে ডুবিয়া মরিতে নদীও উতলা হত
তার ঢেউএ ঢেউয়ে আরো দুটি ঢেউ যেখানে দিত সে বাড়িয়ে-
সেখানে আমার উতল হৃদয় সেদিন গিয়েছে হারিয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
এতক্ষনে অনঙ্গ যেন অঙ্গধারণ করলেন। সে মানসীর তনুর তীরথ কথাটা অবশ্য নতুন নয়, নজরুল আগেই লিখে ফেলেছেন- 'বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে'। তবে নারীর বক্ষসৌন্দর্য বর্ণনার জন্যে কোনও কুরুচিকর শব্দ বা আদিরসাত্মক বিতর্কে না গিয়ে কবি লিখে ফেললেন- 'তার ঢেউএ ঢেউয়ে আরো দুটি ঢেউ যেখানে দিত সে বাড়িয়ে' - এখানে সলিল চৌধুরি একজন ওস্তাদ শিল্পী।
'মোর দিবস রজনী হায় গো সজনী ভাবিয়া কাটিয়া যেত,
সবই স্বপ্ন যে মনে হত।
সেই মগন স্বপন সহসা কখন ভাঙিয়া ভাঙিয়া গেল
এই পথ দিয়ে বধূবেশে সেজে যেদিন গেল সে হারিয়ে
সেদিন আমার সজল হৃদয় দু'পায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে।।
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)
(যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্)'
এইখানেই আসল ট্রাজেডি। কিন্তু ভগ্নহৃদয়ের হা-হুতাশের বদলে কবি লিখলেন কি- 'যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌, যাক্‌, যা গেছে তা যাক্‌'। গানটিতে দ্রুতলয়ের সাথে চটুল সুরের ব্যবহার কথার সাথে হয়ত খাপ খায় না, তবে এ ব্যাপারে সলিলের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন সলিল-বিশেষজ্ঞ তথাগত ভট্টাচার্য, সে কথায় পরে আসছি। এ পর্যন্ত আমরা সঙ্গীতের ভাব, সুর, রাগ, তাল ও লয়ের সমন্বয় নিয়ে যা যা শুনে এসেছি রবীন্দ্র যুগ পর্যন্ত, সবকিছু ধ্যান-ধারণা যেন এক-ঝটকায় বদলে গেল। অবশ্য নজরুলের দু-একটা কাওয়ালি জাতীয় গানে (যেমন- যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে) এধরণের একটু আভাস পাওয়া গেছে ইতিপূর্বে, তবে সেটা যেন অন্তরের অভিমানের বহিঃপ্রকাশ, কাওয়ালি বা গজলের তালবিহীন 'শায়রি'তে তার আসল রূপটা মেলে। কিন্তু এটাই সলিল 'দি অরিজিন্যাল'।
সলিল চৌধুরির হাত ধরে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা গান যেন সাবালকত্বে পা রাখল। বন্ধু ভাস্কর বসুকে কৃতজ্ঞতা জানাই সলিল-গীতির এই বিশেষ দিকটি আমার দৃষ্টিতে তুলে ধরার জন্যে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে আমরা পরের অংশে কিছুটা আলোচনা করতে চলেছি



(৩)
আলোচনা-পর্ব।।
"গানটিতে দ্রুতলয়ের সাথে চটুল সুরের ব্যবহার কথার সাথে হয়ত খাপ খায় না" – এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সলিল-বিশেষজ্ঞ তথাগত ভট্টাচার্য জানালেন- “শক্তিশালী গীতিকারের (কবি নয়) লেখনীতে সৃষ্ট গানে অনেক সময়েই কথার অতীত কোনো অন্তরাত্মার (spirit) সন্ধান পাওয়া যায়, যা কথাকে অতিক্রম করে যায়। এই অন্তরাত্মার সন্ধান পেলে অনেক সময়েই দেখা যায়, তা গানের নিছক কথার অতিরিক্ত কিছু তো বটেই, অনেক সময় গানের কথার আপাত-বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত! সুরকারের প্রতিভা গানের এই অন্তরাত্মাকেই ধরবার চেষ্টা করে - নিছক কথা কে নয়। এক্ষেত্রেও, সুরকার সলিলের অনন্য প্রতিভা তুলে ধরবার চেষ্টা করেছে গীতিকার সলিলের অমর সৃষ্টি এই গানের আসল spirit টিকে - যা কিনা ধরা আছে ওই পাঁচটি শব্দের বাক্যবন্ধে -"যাক যা গেছে তা যাক!" পুরোনো স্মৃতির অলস রোমান্টিকতা নিয়ে পড়ে থাকা নয়, সামনে দেখো! এই তো ছিল সলিলের জীবনের মূল মন্ত্র। শ্যামল মিত্রেরই গাওয়া সলিলের অপর এক সৃষ্টিতে দেখি,
"স্মৃতি নিয়ে কি হবে আর, মিছে পুতুল খেলার মোর সাধ নাই
মনে রাখো কি না রাখো, মনে মনে ভাবা মোর কাজ নাই.
এ জীবন মোর আঁধারে আঁধারে মিশে
আলোয় আলোয় মিলে মিশে থাক।"
"স্মৃতির রোমান্টিকতাকে সার্থক সৃষ্টির প্রেরণায় ব্যবহার করো, কিন্তু সেই স্মৃতিডোর যদি দুঃখের সাগরে নিমগ্ন করে পেছনে টেনে ধরে, তো তাকে ছিন্ন করো"- এই দৃপ্ত পৌরুষই এই গানের, এবং সলিলের অন্যতর বহু গানের, অন্তর্নিহিত সুর, আর সেই সুরই ফুটে উঠেছে "যাক যা গেছে তা যাক"এ প্রযুক্ত marching tune এ। তাই দ্রুতলয় আর চটুল সুরের ব্যবহার আমার মতে ব্যাথাময় অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলার সুর।“
আরেক গুণী বন্ধু আশুতোষ ভট্টাচার্য জানালেন তাঁর একটি সুন্দর উপলব্ধি। “সত্যি এই গানের কথা,ছন্দমিল,সুর,মেলোডি আর গায়কী মিলেমিশে অনন্য হয়ে উঠেছিল। 'সেদিন আমার সজল হৃদয় দুপায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে',দেখুন গুনগুন করে গেয়ে, মনে হবে যেন সিঁড়ির ধাপে ধাপে নামছেন আর সমতল পেয়েই 'যাক যা গেছে তা যাক' নিতান্ত অবজ্ঞাভরে, পাহাড়ি রাস্তার সর্পিল বাঁকগুলো সন্তর্পণে ধাপে ধাপে নেমে এসে সমতল পেয়েই গাড়ি যেমন নিশ্চিন্তে গতি বাড়িয়ে দেয়।“
বিশিষ্ট কবি পরাগ বরণ পাল জানালেন-
“এই গানটি নানান বিভিন্ন কারণে আমার মতে একটি cult song বাংলা গানের ইতিহাসে। অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন সঙ্গীতব্যক্তিত্ব তাঁর একটি লেখায় জানিয়েছেন গানটি নাকি গুরুচন্ডালি দোষে দুষ্ট। আমি আমার একটি লেখায় (আনন্দবাজারে প্রকাশিত) তার প্রতিবাদ করেছিলাম। সেই লেখাটির আরো অনেক পরিবর্ধিত রূপ পরে অন্যত্র প্রকাশিত। এখানে লিঙ্ক দিলাম।“
ভাস্কর বোস উত্তরে গুরুদেব ও গুরুচণ্ডালী সম্বন্ধে কিছুটা মজার ছলেই লিখলেন-
“গুরুচণ্ডালী কাব্যে ও গীতিকাব্যে অলৌকিকত্ব সৃষ্টি করে সেটা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই অপূর্ব গায়নরীতিতে যখন গাইছিলেন,
"দিন চলে গেছে খুঁজিতে খুঁজিতে।
শুভক্ষনে কাছে ডাকিলে,
লজ্জা আমার ঢাকিলে গো—
তোমারে সহজে পেরেছি বুঝিতে!" “
নতুন নতুন শব্দের ব্যবহারেও লিরিসিস্ট কবি হিসেবে সলিল অনবদ্য। সলিলের বিখ্যাত "আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা গানে দুটো নতুন শব্দ পাচ্ছি, 'চতুর্পাশে' আর ‘তুষারিত’ "- পরাগবাবু মনে করালেন।
“আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে
আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা।।“
ভাস্কর একবার 'মরি হায় গো হায়' গানে 'চৌদিকে' কথাটা নিয়ে লিখেছিলেন, শব্দের প্রয়োগটাও লক্ষ্যণীয় রবি ঠাকুরের 'চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি' র অনুসরণে।
তথাগতর কথার পরিপ্রেক্ষিতে ভাস্কর আরেকটি গানের উল্লেখ করলেন যাতে আছে সেই একই এগিয়ে চলার আপ্রাণ তাগিদ,
"জীবন বৃন্তের থেকে ঝরে
কত না স্বপ্ন না গেছে মরে।
তবুও পথ চলা কবে যে শেষ হবে জানি না"
সেখানে স্মৃতি ভার নয়, অনুপ্রেরণা। 'স্মৃতিরা যেন জোনাকির ঝিকিমিকি, ঝিকিমিকি।।'



(৪)
সলিল চৌধুরী বিরহের গানেও তথাকথিত দুঃখের সুর লাগতে দেন নি। উদাহরণ - "নিশিদিন, নিশিদিন, বাজে স্মরণের দিন" বা "অন্তবিহীন, কাটে না আর যেন বিরহের দিন"!! এমনকি " ও বৌ কথা কও বলে পাখি আর ডাকিস না" - গানেও একটা অদ্ভুত রকমের উজ্জ্বল ঔদাসীন্য কাজ করে। ওনার দর্শনে সম্ভবতঃ দুঃখ পাওয়া মানে হেরে যাওয়া।
“এই শেষ কথাটা নিয়ে আমি এক সময় বেশ ভেবেছিলাম”, বিজ্ঞানী- সাহিত্যিক অমিতাভ প্রামাণিক জানালেন।“এগুলো কি ইচ্ছে করেই করা? সন্দেহ জাগে। বিদেশী সুরের আর বাজনার জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার প্রবল আকর্ষণ থেকে সলিল হয়ত বেরোতে পারেন নি। এই গানগুলো গাওয়ার সময় গায়কের (বা গায়িকার) গলায় সামান্যতম দুঃখের পরশ পাই না। যেন বিরহ কত আনন্দের জিনিস! অথচ 'বিরহ বড় ভালো লাগে'-তে কত্তা কি অসম্ভব মেদুরতা এনেছিলেন!”
ভাস্করের কিন্তু অন্য মত। “বিরহ কিন্তু প্রেমের এমন একটা দিক যেটা ছাড়া প্রেমকে ভাবা যায়না। কালিদাসের মেঘদূতের থেকেই হয়ত পরবর্তী কবিরা বিরহের সৃজনশীলতা কে স্বীকার করেছেন। "নিদ নাহি আঁখিপাতে" - কথাটা খুবই দুঃখের কিন্তু গানে সেইরকম দুঃখের প্রকাশ নেই। সেইরকমই "আমি তোমারই বিরহে রহিব বিলীন / তোমাতে করিব বাস । দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস" - এই বিরহীর কি অসাধারণ আত্মপ্রত্যয়, সুরে ও তা চিহ্নিত। এখানেও মনে হতে পারে - প্রেমিক যেন বিরহের প্রতীক্ষাতে। এমনকি মৃত্যুকেও সেইভাবে দেখা হয়নি, বরং ভাবা হয়েছে তা জীবনেরই এক রূপ- কর্মবাদী মানুষের দুঃখবিলাস সাজেনা - "মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় সে দুঃখের কূপ,/ তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ, আপনার পানে চাই"! সলিল ও তাই হয়ত একই ভাবে বলেছেন - "জীবন বৃন্তের থেকে ঝরে, কত যে স্বপ্ন গেছে মরে / তবু এ পথচলা কবে যে শেষ হবে জানিনা"!!
আমার মনে হয় কথাটা ঠিক। 'আর নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের' গানটি শুনে আগে খটকা লাগত, বোঝা মুস্কিল ছিল যে ওটা প্রেম নয়, তার মায়াজাল কাটিয়ে 'এবার ফেরাও মোরে'র আহ্বান। 'সাত ভাই চম্পা'র prelude শুনলে মনে হয় একটা রূপকথার গল্প শুনতে চলেছি। আবার 'না, মন লাগে না' গানে কিছুটা হলেও বিরহের অভিব্যক্তি আছে। অথচ 'রানার'এর কিছু অংশে সুরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবে 'গাঁয়ের বধু' গানের শেষ অংশে 'আজও যদি তুমি কোনো গাঁয়ে দেখো ভাঙ্গা কুটিরের সারি, জেনো সেইখানে সে গাঁয়ের বধুর আশা-স্বপনের সমাধি।' হেমন্ত বেশ মন-উদাস-করা ভাব এনেই অংশটি গেয়েছেন। জানিনা সলিলের অনুপস্থিতিতে গানটির রেকর্ডিং হয়েছিল বলে কিনা!
ভাস্কর বললেন, “এটা নিয়ে অনেকই বিতর্ক শুনেছি। "আজ নয় গুনগুন" এ যেহেতু আহ্বান টি প্রেমিকার তাই তার মধ্যে আর্তিটাই বেশী প্রাধান্য পেয়েছে। পরের অংশটি শুনলে বোঝা যায় - "তুমি হও একজন তাদেরই কাঁধে আজ তার ভার তুলে নাও, তুলে নাও!!” “
“এই গানটা কে বলা যেতে পারে দুটি ভাবের সংমিশ্রণ। মোহিনী চৌধুরীর একটি খুব বিখ্যাত গান ছিল - পুরুষকন্ঠে - "পৃথিবী আমারে চায়, রেখোনা বেঁধে আমায়, খুলে দাও প্রিয়, খুলে দাও বাহুডোর" - এখানে যেন নারী পুরুষটিকে উলটো ভাবে অনুপ্রাণিত করছে। এর সঙ্গে "প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, " বা "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়" এই দুটি ভাবকে ও রাখা হয়েছে বলে মনে হয়।“
হালকাভাবেই বলি, প্রেমের বন্ধন অনেক সময় পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে যদি প্রেমিক বলে- 'রোগের মতন বাঁধিব তোমায় দারুন আলিঙ্গনে'। তখন সেই যন্ত্রণার থেকে ছাড়া পেতে হয়ত প্রেমিকাকেও বলতে হয়- 'ওগো প্রিয় মোর, খোল বাহুডোর, পৃথিবী তোমাকে যে চায়'। কি জানি এটাও সেই কেস কিনা!
ঠাট্টা নয়, জনশ্রুতি আছে গোস্বামী তুলসীদাস এইরকম ভালবাসতেন স্ত্রীকে। স্ত্রী যেটা করলে লোকে পতিব্রতা বলে প্রশংসা করে, স্বামীদের ক্ষেত্রে একই অবস্থায় জোটে স্ত্রৈণ বলে লাঞ্ছনা। একদিন এমন অবস্থা দাঁড়াল যে স্ত্রী একবেলার জন্যে পিত্রালয় গেছেন, তুলসীদাস থাকতে না পেরে সেই রাত্রেই ছুটে এসেছেন শ্বশুরবাড়ি। লজ্জিতা, অপদস্থা তুলসী-পত্নী তখন ভর্ত্সনা করে তাঁর পতিকে যা বলেছিলেন, তুলসীদাসের লেখা থেকেই বলছি-
"লাজ না লাগত আপকো, দৌড়ে আয়হু সাথ
ধিক, ধিক, এইসে প্রেম কো, ক্যা কহুঁ ম্যয় নাথ।
অস্থি-চর্মময় দেহ মম, তামেই এয়্সী প্রীতি,
এইসা যো শ্রীরাম মে হো, ন হোতী তো ভবভীতি।"
ঘুরে গেল তুলসীর জীবনের মোড়। সংসার ছেড়ে গঙ্গাতীরে বসে তিনি রামচরিত নিয়ে পড়লেন, বাকিটা ইতিহাস।
"সলিল চৌধুরীকে চিনতে গেলে প্রচলিত সুরের ধারণাকে সরিয়ে দিতে হবে"- সাহিত্য-সেবী শ্যামা প্রসাদ সরকার মনে করালেন। "উনি একজন প্রকৃত সুরসাধক। তাই অক্লেশে নিজেই ব্যাকরণ বানিয়ে নেন আর সেটাই নিও ক্ল্যাসিকাল হয়ে যায়। গণসঙ্গীতকেও উনি মেলাতে পারেন প্রেমের সুরে!"
শেষে তাহলে একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। গণসঙ্গীত, সলিল চৌধুরি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র ও দেবব্রত বিশ্বাস।
ইতিমধ্যে একজন বন্ধু দেবব্রতের কণ্ঠে সলিল-সংগীত “যদি কিছু আমারে শুধাও” গানটির লিঙ্ক পাঠিয়েছিলেন, সেটা শোনার পর থেকে মোহাচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম, সম্পূর্ণ এক অন্য জগতে পৌঁছে গেছিলাম যেন।
IPTA র সময় থেকে দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী একসাথে কাজ করেছেন, সলিলের প্রযোজনায় প্রথম বাংলা চলচ্চিত্রে, তাছাড়াও অনেক গান দেবব্রত নিজের খেয়ালেই গেয়ে গেছেন, বিশেষ কোনো যন্ত্রানুসঙ্গ ছাড়াই। সলিলের দু'একটা গণনাট্যের গান যেগুলো হেমন্তের গলায় শুনে এতকাল মুগ্ধ হয়েছি আমরা, পরে শুনেছি দেবব্রতর গলায়। হেমন্তের সঙ্গে তুলনায় যাচ্ছি না, ঈশ্বরীয় কণ্ঠস্বর তাঁর, কিন্তু 'পথে এবার নামো সাথী' বলতে কী বোঝায়, তা দেবব্রতের গলায় সঠিক প্রতিফলিত হয়েছে।
"সবচেয়ে বেশি মনে হয়ে "অবাক পৃথিবী" গানে "এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম" এর উচ্চারণে"- ভাস্কর মনে করিয়ে দিলেন। "পদাঘাত, অবাক, সেলাম! কী অমোঘ, তীব্র উচ্চারণ দেবব্রতর গলাতে।"
এখন ভাবি, গাঁয়ের বধু, পাল্কীর গান, রানার এগুলোর মধ্যে বেশ খানিকটা রোমান্টিসিজম আছে যার জন্যে হেমন্ত বা শ্যামলের বিকল্প নেই, কিন্তু গণসংগীতগুলোর জন্যে বা সুকান্তের 'ঠিকানা', 'অবাক পৃথিবী' এসবের দেবব্রতের রেকর্ড রাখা উচিত ছিল।
এখন ভাবি, গাঁয়ের বধু, পাল্কী র গান, রানার এগুলোর মধ্যে বেশ খানিকটা রোমান্টিসিজম আছে যার জন্যে হেমন্ত বা শ্যামলের বিকল্প নেই, কিন্তু গণসংগীতগুলোর জন্যে বা সুকান্তের 'ঠিকানা', 'অবাক পৃথিবী' এসবের দেবব্রতের রেকর্ড রাখা উচিত ছিল।
ভাস্কর বললেন, ”আমাদের সলিল চৌধুরির ফোরামে এই দুটি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। আমার মত অনেকের মনে হয়েছিল, এই গানটি শ্যামলের গলাতেই বেশী খুলেছিল কারণ তাঁর কণ্ঠস্বরের তারুণ্যের ঝংকার, অন্তরা পর্যন্ত পারকাসন যন্ত্রের বর্জন, সুর আর ভাবের আশ্চর্য অভিনবত্ব- সব মিলিয়ে গানটিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। অনেকটা- "যাক যা গেছে তা যাক" বা " ঐ আঁকা বাঁকা পথ" যেরকম প্রেমের গান, এটিও সেইরকম একটি নিপাট প্রেমের গান। হয়ত ঠিক দেবব্রতর উপযোগী নয়। শুরুতেই "যদি কিছু আমারে শুধাও" এর মধ্যেই শ্যামলের গলায় একটি অদ্ভুত অনুরণন আছে! "তাসের দেশ" এ রাজপুত্রের গান শ্যামল কে দিয়ে গাওয়ানো হওয়ার ওইটিই মুখ্য কারণ। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেছিল - দেবব্রতর কন্ঠস্বর, বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও গাম্ভীর্য গানটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল।“
আমিও কথাটা সমর্থন করি। প্রেমের গান হিসেবে ধরলে এখানে কণ্ঠস্বরের তারুণ্য ও মাধুর্যের গুরুত্ব আছে, আর সেদিক থেকে শ্যামল নিঃসন্দেহে এগিয়ে থাকবেন। তবু যেন দেবব্রত বিশ্বাসের গলার কী যাদু, কী মোহ আছে, এই অংশটা যখন উনি শুধুমাত্র একটা কী-বোর্ড সহযোগে গাইছেন-
“তেমনি আমার বাণী, সৌরভে কানাকানি…” যেন তাঁর প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠের থেকে একঝলক সুগন্ধী হাওয়া ছুটে আসে।
সলিলকে নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের শেষ নেই, অপরিসীম প্রতিভা নিয়েও শুধুমাত্র আলস্যের কারণে তাঁর সৃষ্টি যতদূর যেতে পারত হয়ত আমরা তা পাইনি- এই অনুযোগ শুধু আমার নয়, সলিল-শিষ্য কবি গুলজারের। তাই এই আলোচনারও শেষ নেই, মৃত্যুর এতদিন পরেও সলিলের প্রতিভার নিত্য নতুন দিক উন্মোচিত হয়ে চলেছে, হতে থাকবে।
(আপাততঃ এইটুকু)

Sunday, July 19, 2020

পরমপুরুষ ও মহাপুরুষ।

পরমপুরুষ ও মহাপুরুষ।
(সংগৃহীত)
লেখক- শুভেন্দু দত্ত


(১)
শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মভূমি হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রাম আর ঈশ্বরচন্দ্রের বীরসিংহ গ্রাম। কামারপুকুর থেকে বীরসিংহ খুব দূরের পথ না। সেই জন্য বোধ হয় শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কাছের মানুষ বলে মনে করতেন। তবে সেই মনে হওয়া শুধুই মনে মনে । ঠাকুরের ইচ্ছা বীরসিংহ গ্রামের সিংহটির সাথে একবার অন্তত দেখা করার। তো সেই সুযোগও এলো। যখন ঠাকুরের পরম ভক্ত শ্রীম ওরফে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বিদ্যাসাগরের স্কুলে মাস্টারি করা শুরু করলেন। ঠাকুরই একদিন মাস্টারকে বললেন, "আমাকে বিদ্যাসাগর এর কাছে নিয়ে যাবে? আহা! দক্ষিণেশ্বর কালিবাড়িতে থাকতে থাকতে বিদ্যে আর দয়ার কত কথা শুনেছি! তিনি বিদ্যারও সাগর আবার দয়ারও সাগর।"
মহেন্দ্রগুপ্ত বিদ্যাসাগর কে বললেন," দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ আপনার সাথে দেখা করতে চান। ভারি ইচ্ছা তাঁর আপনার সাথে আলাপ করার।"
ঈশ্বরচন্দ্র হেসে বললেন, "তুমি তো জানো মাস্টার, আমি নাস্তিক মানুষ। ঈশ্বর সত্যি আছেন কিনা সেই বিষয়ে আমার গভীর সন্দেহ। সত্যি বলতে কি ভগবানের ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহই নেই। সুতরাং সাধু সন্ন্যাসী দের কাছ থেকেও আমি দূরে থাকি।"
মাস্টার বিদ্যাসাগরের কথা শুনে নীরব রইলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বুঝলেন তিনি মহেন্দ্রকে আঘাত করেছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, "বলত মাস্টার, তিনি কি রকম পরমহংস? তিনি কি গেরুয়া পরা সন্ন্যাসী?"
মাস্টার এবার ঈশ্বরচন্দ্রর চোখে চোখ রেখে কিঞ্চিৎ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আজ্ঞে না! লাল পেড়ে কাপড় পরেন,জামা পরেন, বার্নিশ করা চটি জুতো পরেন। রাসমনির কালিবাড়িতে একটি ঘরের ভিতরে বাস করেন। সেই ঘরে তক্তাপোষ পাতা আছে, বিছানা, মশারিও আছে। সেই বিছানায় তিনি শয়ন করেন। তিনি যে সন্ন্যাসী তার কোনো বাহ্যিক চিহ্ন নেই। তবে ঈশ্বর বই আর কিছু জানেন না, অহর্নিশি তারই চিন্তা করেন।"
বিদ্যাসাগর মহেন্দ্রনাথ এর কথায় হেসে ফেললেন, বললেন,"বেশ বেশ তাকে নিয়ে এসো একদিন।"
মহেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণকে বললেন,"বিদ্যাসাগর আপনার সাথে দেখা করতে চান।"
শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের মধ্যে ডুব দিলেন। চোখে মুখে ফুটে উঠলো দৈব উদ্ভাস। শ্রী ঠাকুর মধুর কণ্ঠে বললেন,"এই শনিবার ,সেদিন শ্রাবনের কৃষ্ণাষষ্ঠী, সাগর দর্শনের লগ্ন বিকাল ৪টে।" তখন বিদ্যাসাগরের বয়স ঠিক ৬২, রামকৃষ্ণ তার থেকে ১৬ বছরের ছোট, তার বয়স ৪৬। বিদ্যাসাগর এর প্রতি তার ভাব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ভরা।
বিকাল ঠিক ৪ টে। ঠিকা গাড়ি এসে দাঁড়াল। ঠাকুর ভাবে তন্ময় হয়ে আছেন। মহেন্দ্র বললেন,"এবার নামতে হবে, আমরা এসে গেছি।" ঠাকুর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন। মাস্টার পথ দেখিয়ে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। উঠোনে ফুল গাছ, ঠাকুর মুগ্ধ হয়ে বাড়ি টি দেখছেন, কি সুন্দর বাড়ি! শান্তির নীড়। সমস্ত বাড়িটি যেন ধ্যানের মন্দির- মনে হল ঠাকুরের। তিনি শুনেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র নাকি ভগবান-টগবানে বিশ্বাস করেন না। মৃদু হাসছেন ঠাকুর।
ঈশ্বর-বিশ্বাসহীন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাক্ষাৎ‍ হয়েছিল ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের। কেমন ছিল দুই কিংবদন্তির সাক্ষাৎকার জানতে ফিরে যেতে হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে।
বিদ্যাসাগর মহাপণ্ডিত। তিনি ষড়দর্শন পাঠ করেছেন। জানতে চেয়েছেন ঈশ্বরকে, আর এইটুকু বুঝতে পেরেছেন যে ঈশ্বরের বিষয়ে কিছুই জানা যায় না।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাকালেন বিদ্যাসাগরের দিকে। যেন বুঝতে পারলেন বিদ্যাসাগরের মনের কথা। বললেন, ব্রহ্মবিদ্যা ও অবিদ্যার পার| তিনি মায়াতীত।
মহাপণ্ডিত বিদ্যাসাগর শুনছেন মুগ্ধ বিস্ময়ে।
বলে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ -
এই জগতে বিদ্যামায়া-অবিদ্যামায়া দুই আছে। জ্ঞান-ভক্তি আছে।আবার কামিনীকাঞ্চনও আছে। সৎ আছে, আবার অসৎও আছে। ভাল আছে, আবার মন্দও আছে। কিন্তু ব্রহ্ম নির্লিপ্ত। ভাল-মন্দ, সৎ‍-অসৎ‍ জীবের ব্যাপার। ব্রহ্মের ওতে কিছু হয় না।

বিদ্যাসাগর বললেন, একটু ব্যাখ্যা করে, আরও সহজ করে বুঝিয়ে দিন ।
শ্রীরামকৃষ্ণ সহজ সরল হাসি হেসে বললেন, প্রদীপ যেমন নির্লিপ্ত, ব্রহ্মও সেইরকম । প্রদীপের সামনে কেউ ভাগবত পড়ছে আর কেউ বা জাল করছে । প্রদীপের তাতে কিছু যায় আসে না । কোনও কাজটির সঙ্গেই প্রদীপ যুক্ত হচ্ছে না ।সে নির্লিপ্তভাবে শুধু জ্বলছে ।যদি বলো দুঃখ, পাপ, অশান্তি এ সকল তবে কী ?
তার উত্তর এই যে ওসব জীবের পক্ষে ।ব্রহ্ম নির্লিপ্ত ।যেমন ধরো সাপের মধ্যে বিষ আছে ।অন্যকে কামড়ালে মরে যায় ।সাপের কিন্তু কিছু হয় না ।
বিদ্যাসাগরের মুখে রা নেই । তিনি ক্রমে বুঝতে পারছেন, এক নিরক্ষর ব্রাহ্মণের মুখে বেদান্ত কী সহজ সরল ভাষায় উচ্চারিত হচ্ছে !
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ব্রহ্ম যে কী মুখে বলা যায় না |
সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে।
বেদ,পুরাণ, তন্ত্র, ষড়দর্শন, সব এঁটো |
(থামলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তাকালেন বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে।)
বিস্মিত বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন, এঁটো কেন ?
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে উত্তর দিলেন, মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে, তাই এঁটো হয়ে গেছে ।
কিন্তু একটি জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয়নি গো !
সেই জিনিসটি ব্রহ্ম ।
ব্রহ্ম যে কী, আজ পর্যন্ত কেউ মুখে বলতে পারেনি ।
বিদ্যাসাগরের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল।
আবেগে কাঁপছে তাঁর শরীর ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বয়েসে অনেক ছোট, তবু বিদ্যাসাগরের ইচ্ছে হল তাঁর কাছে নতজানু হওয়ার ।
তিনি শুধু কম্পিত কণ্ঠে বললেন, আজ একটি নতুন কথা শিখলাম।
ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হননি !
ঘরে তখন অনেক মানুষের ভিড় হয়ে গেছে।
সবাই শুনছে ঠাকুরের কথা ।
কী সহজ, কী প্রাণস্পর্শী, কী গভীর !
ঠাকুর কী অনায়াসে আড়াল সরিয়ে দিচ্ছেন !
ফুটে উঠছে নতুন আলো।
জাগ্রত হচ্ছে নব চেতনা ।
উদ্ঘাটিত হচ্ছে সত্যের মুখ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, এবার একটা গল্প বলছি, শোনো…
"এক বাপের দুটি ছেলে।
ব্রহ্মবিদ্যা শেখবার জন্যে ছেলে দুটোকে বাপ আচার্যের হাতে দিলেন ।
কয়েক বছর পরে তারা গুরুগৃহ থেকে ফিরে এল।
এসে বাপকে প্রণাম করলে।
বাপের এবার ইচ্ছে হল, এদের ব্রহ্মজ্ঞান কেমন হয়েছে একটু বাজিয়ে দেখবার।
বড় ছেলেকে জিগ্যেস করলেন, বাপ ! তুমি তো সব পড়েছো | ব্রহ্ম কীরূপ বলো দেখি ।
বড় ছেলেটি বেদ থেকে নানা শ্লোক বলে বলে ব্রহ্মের স্বরূপ বোঝাতে লাগল।
বাপ শুনলেন | কোনও কথা বললেন না | বড় ছেলে বাপের মনের ভাব বুঝতে পারল না।
এবার ছোট ছেলেকে বললেন, তুমি বলো দেখি ব্রহ্মের কী রূপ ?
ছোট ছেলের মুখে কোনও কথা নেই ।
সে হেঁট মুখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল ।
বাপ প্রসন্ন হয়ে ছোট ছেলেকে বললেন, বাপু, তুমি একটু বুঝেছো। ব্রহ্ম যে কী তা মুখে বলা যায় না ।"
শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ থামলেন। তিনি জানেন, সাধারণ মানুষকে তাঁর কথার মর্ম বুঝতে একটু সময় দিতে হয় ।
তারপর তাঁর গল্পের সূত্রটি ধরেই বললেন, মানুষ মনে করে আমরা তাঁকে জেনে ফেলেছি ।
কিন্তু সত্যি কি জানা যায় ?
জানা গেলেও কতটুকুই বা জানা যায় তাঁকে ?
বিদ্যাসাগর নিবিষ্ট হয়ে শুনছেন। আর অপলক তাকিয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে । আর কারও কথা শুনে কখনও এমন ঘোর লাগেনি তাঁর।
শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে তাকিয়েই বললেন, আর একটা গল্প বলছি শোনো…
"একটা পিঁপড়ে চিনির পাহাড়ে গিছলো।
এক দানা খেয়ে পেট ভরে গেল | আর এক দানা মুখে করে সে বাসার পথে চলেছে।
যাবার সময় ভাবল, এবার এসে সব পাহাড়টা নিয়ে যাব।
ক্ষুদ্র জীবেরা এইসব মনে করে ।
জানে না ব্রহ্ম বাক্যমনের অতীত !
যে যতই বড় হোক না কেন, তাঁকে জানা যায় না।
বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ বলে ফেললেন, কেন শুকদেব ? তিনি তো .
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে বললেন, শুকদেবাদি না হয় ডেঁও পিঁপড়ে।
চিনির আট-নটা দানা না হয় মুখে করেছে । তার বেশি নয়।
ঘরে এত মানুষ | তবু পিন পড়লে শব্দ পাওয়া যাবে ।
রোজ কত পণ্ডিত মানুষের আসা-যাওয়া বিদ্যাসাগরের বাড়িতে ।
কিন্তু এমন জীবন্ত বেদান্ত কখনও দেখিনি ! শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনছেন আর ভাবছেন বিদ্যাসাগর।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলতে লাগলেন, তবে বেদে পুরাণে যা বলেছে, সে কী রকম বলা জানো ?
বিদ্যাসাগর বুঝলেন, ঘরের মধ্যে আর কেউ না বুঝুক তিনি অন্তত ধারণা করতে পারলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে নতুনভাবে ব্যাখ্যাত হতে চলেছে বেদ ও পুরাণ !
তিনি উদগ্রীব হয়ে শুনছেন।
ঠাকুর বললেন, একজন সাগর দেখে এলে কেউ যদি জিগ্যেস করে, কেমন দেখলে, সে লোক মুখ হাঁ করে বলে, - ওহ ! কী দেখলুম ! কী হিল্লোল, কল্লোল।
ব্রহ্মের কথাও সেই রকম । বেদে আছে তিনি আনন্দস্বরূপ।সচ্চিদানন্দ।
বিস্মিত বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ বেদ পড়েছেন!
তিনি তো নিরক্ষর।
বিদ্যাসাগর কী ভাবছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ যেন বুঝতে পারলেন।
বললেন, শুকদেবাদি এই ব্রহ্মসাগর-তটে দাঁড়িয়ে দর্শন স্পর্শন করেছিলেন মাত্র।
তাঁরা কিন্তু ব্রহ্মসাগরে নামেননি । এ সাগরে নামলে আর ফেরবার জো নেই গো ।
ঠাকুরের কথায় চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর । এতো একেবারে নতুন কথা।
অথচ কী অবলীলায় কথাটি বললেন পরমহংস !
বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন তাহলে ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান হওয়ার উপায় ? ঠাকুর উত্তর দিলেন, সমাধিস্থ হলে ব্রহ্মজ্ঞান হয় ।
সেই অবস্থায় বিচার একেবারে বন্ধ হয়ে যায় ।
মানুষ চুপ হয়ে যায় ।
ব্রহ্ম কী বস্তু, মুখে বলবার শক্তি থাকে না ।
শ্রীরামকৃষ্ণ আর একটা গল্প বললেন--
নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিছলো। কত গভীর জল সেই খবরটা সে দিয়ে চেয়েছিল। কিন্তু খবর দেওয়া আর হল না। যেই নামল জলে অমনি গেল গলে ।কে আর খবর দেবে ? একজন প্রশ্ন করলেন, সমাধিস্থ ব্যক্তি যাঁর ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে তিনি কী আর কথা কন না ?
বিদ্যাসাগরকে চমকে দিল ঠাকুরের বিদ্যুতের মতো উত্তর
শঙ্করাচার্য লোকশিক্ষার জন্য বিদ্যার 'আমি' রেখেছিলেন ।বিদ্যাসাগর এই কথার গভীর অর্থটুকু বুঝতে পারলেন। আপাত অশিক্ষিত একটি মানুষের জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা দেখে তিনি স্তম্ভিত !
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার আরও সহজ করে তাঁর বক্তব্যের সারাৎসার তুলে ধরলেন--
ব্রহ্মদর্শন হলে মানুষ চুপ হয়ে যায় ।যতক্ষণ দর্শন না হয়, ততক্ষণই বিচার তেমনি সমাধিত পুরুষ--লোকশিক্ষা দেবার জন্য আবার নেমে আসে আবার কথা কয় ।
বিদ্যাসাগরের চোখে একইসঙ্গে ফুটে ওঠে মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা ।
তাঁর মন বলে ওঠে , শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস সেই পুরুষ তো তুমি নিজে । সমাধিস্থ হয়েও লোকশিক্ষার জন্য নেমে এসেছো, কথা বলছো !
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার ব্রহ্মজ্ঞানীর স্বরূপ অন্যভাবে ফুটিয়ে তোলেন্-
যতক্ষণ মৌমাছি ফুলে না বসে ততক্ষণ ভনভন করে, ফুলে বসে মধুপান করতে আরম্ভ করলে চুপ হয়ে যায়। মধুপান করে মাতাল হবার পরে আবার কখনও-কখনও গুনগুন করে।
পুকুরে কলসিতে জল ভরার সময় ভকভক শব্দ হয়। পূর্ণ হয়ে গেলে আর শব্দ নেই | তবে আর এক কলসিতে যদি ঢালাঢালি হয় তাহলে আবার শব্দ হয়।
একজন হঠাৎ বললেন,
ঋষিদের কি ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল ?
শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ হয়েছিল। বিষয়বুদ্ধির লেশমাত্র থাকলে এই ব্রহ্মজ্ঞান হয় না। ঋষিরা দেখা-শোনা-ছোঁয়া এসবের বিষয় থেকে মনকে আলাদা রাখত। সমস্ত দিন ধ্যান করে কাটত। তবে ব্রহ্মকে বোধে বোধ করত। এবার সরাসরি বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন ঠাকুর। বললেন, "কলিতে অন্নগত প্রাণ। দেহ বৃদ্ধি যায় না।যারা বিষয় ত্যাগ করতে পারে না, তাদের 'আমি' কোনওভাবে যায় না।
তাদের বরং 'আমি ব্রহ্ম' না বলে বলা উচিত আমি ভক্ত, আমি দাস।
এ অভিমান ভাল।
ভক্তিপথে থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায়।" বিদ্যাসাগরকে যেন সরাসরি বলছেন ঠাকুর--জ্ঞানীর পথও পথ ।আবার জ্ঞান-ভক্তির পথও পথ ।আবার ভক্তির পথও পথ।
জ্ঞানযোগও সত্য। ভক্তির পথও সত্য । সব পথ দিয়েই তাঁর কাছে যাওয়া যায়।
কিন্তু যতক্ষণ তিনি 'আমি' রেখেছেন আমাদের মধ্যে ততক্ষণ ভক্তিপথই সোজা।
শ্রীরামকৃষ্ণ এবার যেন শুধু বিদ্যাসাগরকেই দেখছেন ।তিনি এই মহাপণ্ডিতকে বললেন, বিজ্ঞানী কী বলে ? বিজ্ঞানী বলে, যিনি ব্রহ্ম, তিনিই ভগবান।
অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছি।
ব্রহ্ম নির্গুণ ।তিনি গুণাতীত ।ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।
এই জীবজগত্‍, মন বুদ্ধি, বৈরাগ্য, জ্ঞান, এসব তাঁর ঐশ্বর্য ।
দেখো না এই জগত্‍ কী চমত্‍কার । কত রকম জিনিস, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র ।কত রকম জীব ।বড় ছোট ভালমন্দ কারু বেশি শক্তি, কারু কম শক্তি । ব্রহ্মই ভগবান হয়েছেন । যিনি নিরাকার, তিনিই সাকার।যিনি নির্গুণ তিনিই ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।
বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ প্রশ্ন করলেন তিনিই কি কাউকে বেশি শক্তি, কাউকে কম শক্তি দিয়েছেন ?
উত্তর দিলেন পরমহংস-তিনি বিভুরূপে সর্ব ভূতে আছেন ।বিভু মানেই তো পরমেশ্বর। আবার বিভু মানে সর্বব্যাপী ।
পিঁপড়ের মধ্যেও তিনি আছেন। আবার বিরাট পাহাড়ও তারই প্রকাশ ।সর্বত্র তিনি ।কিন্তু শক্তির তারতম্য তো আছেই ।ঠাকুর এবার বিদ্যাসাগরকেই বললেন--এই যেমন তুমি।
তোমাকেই বা সবাই মানে কেন ?
তোমার কি শিং বেরিয়েছে দুটো ?
তোমাকে মানে তার কারণ তোমার দয়া, তোমার বিদ্যে আছে অন্যের চেয়ে অনেক বেশি।
তুমি একথা মানো কি না ?
বিদ্যাসাগর লজ্জা পেলেন ।তিনি মৃদু মৃদু হাসছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে বললেন--একঘর লোকের সামনে বিদ্যাসাগরকে একথা বলার সাহস কারও হত না-- ঠাকুর বললেন শুধু পাণ্ডিত্যে কিছু হয় না ।মনে রেখো, তাঁকে জানবার জন্যেই বই পড়া ।তাঁকে জানাই একমাত্র জানা ।তাঁকে জানাই সব জানা আর সব অবিদ্যা।
এবার প্রশ্ন করলেন বিদ্যাসাগরকে, গীতার অর্থ কী ?
কী বলবেন বিদ্যাসাগর ? গীতার অর্থ এককথায় বলা যায়? চুপ করে থাকলেন বিদ্যাসাগর ।
বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, গীতার অর্থ দশবার 'গীতা' বলতে যা হয় তাই। দশবার 'গীতা' বলতে গেলে ত্যাগী হয়ে যায়।
গীতার শিক্ষা হল, হে জীব সব ত্যাগ করে ভগবানকে লাভ করার চেষ্টা করো।
সাধুই হও, আর সংসারী হও, মন থেকে সব আসক্তি ত্যাগ করতে হবে।
এবার বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।ঘরে যেন আর কেউ নেই ।বললেন, অনেক পড়লেই কিছু হয় না গো ।অন্তরের কথাটি বুঝতে হবে ।শুধু পাণ্ডিত্য নয় ।ভক্তি চাই ।তাঁকে ভালবাসতে হবে ।তোমাকে একটা গপ্পো বলছি ।গল্পটা বুঝতে পারলে সব হবে।
চৈতন্যদেব তখন দক্ষিণে তীর্থভ্রমণ করছিলেন । দেখলেন একজন গীতা পড়ছে আর একজন একটু দূরে বসে শুনছে আর কাঁদছে। কেঁদে চোখ ভেসে যাচ্ছে । চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন, তুমি এসব বুঝতে পারছো ? সে বললে, ঠাকুর, আমি এসব শ্লোক কিছুই বুঝতে পারছি না।
চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন তবে কাঁদছো কেন ?
ভক্তটি তখন বললে, আমি দেখেছি অর্জুনের রথ । আর তাঁর সামনে কৃষ্ণ ।আর অর্জুন কথা কচ্চেন।
তাই দেখে আমি কাঁদছি ।বিদ্যাসাগরের বুকের শিরায় টান ধরল ।তাঁর চোখ ভরে এল জলে ।মন ভরে গেল গভীর কৃতজ্ঞতায় ।নতুন চেতনায় উত্তীর্ণ হলেন তিনি !
বিদ্যাসাগরকে বলতে লাগলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।মনে মনে বিদ্যাসাগর নতজানু, করজোড় । শুনছেন তিনি ।নিষ্কম্প শিখার মতো ।ঠাকুর বলতে লাগলেন- তাঁকে কি শুকনো পাণ্ডিত্য দিয়ে বিচার করে জানা যায় গো ? তাঁর দাস হয়ে তাঁর শরণাগত হয়ে তাঁকে ডাকো |
মনে রেখো, 'আমি' ও 'আমার',এই দুটি অজ্ঞান ।
আমার বাড়ি, আমার টাকা,আমার বিদ্যা,আমার এইসব ঐশ্বর্য,এই যে ভাব, এটি অজ্ঞান থেকে হয় ।আর যদি ভাবো,হে ঈশ্বর,তুমিই কর্তা,এসব জিনিস তোমার,টাকাকড়ি, আমার বিদ্যা,আমার ঐশ্বর্য,আমার পরিবার,সব কিছুই তোমার,আমার বলতে কিছুই নেই--এই ভাব জ্ঞান থেকে হয় ।

বিদ্যাসাগর, তোমার কোন ভাব গো?- হঠাৎ জানতে চাইলেন ঠাকুর।বিদ্যাসাগর কিছুটা অপ্রস্তুত। খুব মৃদু স্বরে বললেন, আপনাকে সেকথা একলা একদিন বলব। ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে এবার তাঁর অন্তরকথা,তাঁর নিজস্ব ভাবটি বলার জন্য গান ধরলেন --

"কে জানে কালী কেমন?
ষড়দর্শনে না পায় দরশন।
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন।
কালী পদ্মবনে হংস সনে,হংসী রূপে করে রমণ।।
আত্মরাগের আত্মাকালী প্রমাণ প্রণবের মতন।
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।।
মায়ের উদরে ব্রক্ষাণ্ডভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জান কেমন।
মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম অন্য কে বা জানে তেমন।
প্রসাদ ভাসে লোকে হাসে,সন্তরণে সিন্ধু তরন।
আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না ধরবে শশী হয়ে বামন।"

গান শেষ করে শুধু একটি কথা বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, ষড়দর্শনে না পায় দর্শন, পাণ্ডিত্যে তাঁকে পাওয়া যায় না গো। এরপর ঠাকুর কিছুক্ষণ সমাধিস্থ। চেতনায় ফিরে এসে জিগ্যেস করলেন,কটা বাজে গো? বিদ্যাসাগর বললেন, রাত ৯টা। এবার যে উঠতে হবে। ফিরতে হবে সেই দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীরামকৃষ্ণকে বিদায় দিতে মন চাইছে না বিদ্যাসাগরের। কেন তাঁর এমন হল? ঠাকুর লাবণ্যময় কণ্ঠে বিদ্যাসাগরকে বললেন, একবার বাগান দেখতে যেও। রাসমণির বাগান। ভারী চমৎকার জায়গা।

-যাবো বৈ কি! আপনি এলেন আর আমি যাব না?
-আমার কাছে! ছি ছি!
- সে কী! এমন কথা বললেন কেন? আমার বুঝিয়ে দিন।

শ্রীরামকৃষ্ণ(সহাস্যে)- আমরা জেলেডিঙ্গি। খালবিল, আবার বড় নদীতেও যেতে পারি। কিন্তু তুমি তো জাহাজ গো। কী জানি যেতে গিয়ে চড়ায় পাছে লেগে যায়। বিদ্যাসাগর চুপ। উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। শ্রীরামকৃষ্ণই এগিয়ে এলেন বিদ্যাসাগরকে উদ্ধার করতে।বললেন, তবে এই সময়ে জাহাজও যেতে পারে। বিদ্যাসাগর ইঙ্গিতটি ধরতে পারলেন। হেসে বললেন, হ্যাঁ, এটা বর্ষাকাল বটে। মহেন্দ্র গুপ্ত টিপ্পনি কাটলেন, এ তো নবানুরাগের বর্ষা। নবানুরাগের সময় মান-অপমান বোধ থাকে না বটে।

শ্রীরামকৃষ্ণ ইতিমধ্যে উঠে পড়েছেন। তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছেন, একজন ভক্তের হাত ধরে আছেন। বিদ্যাসাগর আগে আগে চলেছেন। বাতি হাতে পথ দেখাচ্ছেন তিনি।
শ্রাবণকৃষ্ণাষষ্ঠী। এখনও চাঁদ ওঠেনি। দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। বাতাস ভিজে ভিজে,মিঠে। বাতাসে ভেজা ঘাস-পাতা-মাটির সুবাস।তমসাবৃত উদ্যানভূমির মধ্যে দিয়ে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বাতির ক্ষীণালোক বহন করে ফটকের সামনে বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ ফটকে পৌঁছতেই সামনে এসে দাঁড়াল এক গৌরবর্ণ, শ্মশ্রুধারী, বাঙালি পোশাক-পরা যুবক। যুবক শ্রীরামকৃষ্ণের পায়ে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করল।

শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন,বলরাম! তুমি এখানে এত রাতে?
বলরাম- আমি অনেক্ষণ এসেছি। এখানেই দাঁড়িয়েছিলাম।
শ্রীরামকৃষ্ণ- ভেতরে যাওনি কেন?
বলরাম- আজ্ঞে, সকলে আপনার কথাবার্তা শুনছেন, সেখানে গিয়ে বিরক্ত করিনি।

শ্রীরামকৃষ্ণ এবার তার ভাড়া করা ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়লেন।বিদ্যাসাগর প্রায় চুপি চুপি মহেন্দ্রকে জিগ্যেস করলেন, ভাড়া কি দেব?
মহেন্দ্র বললেন, আজ্ঞে না। ও হয়ে গেছে। বিদ্যাসাগর ঘোড়ার গাড়ির দরজায় এগিয়ে গেলেন। তাঁর হাতে বাতিটি ধরা। বাতির ক্ষীণালোকে ঠাকুরের মুখটি দেখলেন। তাঁর সমস্ত অন্তর লুটিয়ে পড়ল শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রীচরণে এক দীর্ঘায়িত প্রণামে।

শ্রীরামকৃষ্ণের গাড়ি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বিদ্যাসাগরের দৃষ্টি থেকে । তিনি একা ঠাকুরের প্রস্থানের পথের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁর মনে হল, ভগবান এসেছিলেন। এক ঝলক দেখা দিয়ে চলে গেলেন। তাঁরই আশীর্বাদ হয়ে যেন স্বর্গ থেকে নেমে এল ঝিরঝিরে বৃষ্টি! বৃষ্টির জলে নিভে গেল বিদ্যাসাগরের হাতের বাতিটি। অন্ধকারে একা বিদ্যাসাগর।

রামকৃষ্ণ-ধারায় কতদিন পরে এমনভাবে প্রাণ জুড়াচ্ছে তাঁর।

জয় পরমহংস শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ।।