একানড়ে।।
- দাদু গল্প বল।
- গল্প তো বলতেই হবে। স্বয়ং মিঠি দিদিভাই শুনতে চেয়েছে যে। তা কিসের গল্প বলি বল তো।
- ভূতের গল্প।
- দূর বোকা মেয়ে! ভূত-টুত সে সব আমাদের ছেলেবেলায় ছিল। সেসব কি আর আছে? কবে মরে মানুষ হয়ে গেছে।
- ভূতরা মরে বুঝি মানুষ হয়?
- তা নয়ত কী? এই যে চারদিকে দুষ্টু লোকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকের পকেট থেকে টাকা সরাচ্ছে, ভীড় থেকে বাচ্চা ছেলেমেয়ে চুরি করছে, কথায় কথায় মানুষ, জন্তু-জানোয়ার মারছে, তারা কি মানুষ! আগের জন্মে সব এক-একটি আস্ত একানড়ে ছিল।
- একানড়ে কী দাদু?
- সে একরকমের ভূত, একটি মাত্র পা ঝুলিয়ে তালগাছে বসে থাকে।
- আজ তাহলে একানড়ের গল্প হোক।
- ঠিক বলেছ দিদিভাই। একানড়ে যদিও আর দেখা যায়না এখন খুব একটা, একসময় তাদের খুবই দৌরাত্ম্য ছিল গ্রামেগঞ্জে। আমার ঠাম্মা আমাদের ছড়া শোনাতেন-
- ঠিক বলেছ দিদিভাই। একানড়ে যদিও আর দেখা যায়না এখন খুব একটা, একসময় তাদের খুবই দৌরাত্ম্য ছিল গ্রামেগঞ্জে। আমার ঠাম্মা আমাদের ছড়া শোনাতেন-
‘এক যে আছে একানড়ে,
সে থাকে তালগাছে চড়ে।
চোখদুটো তার ভাঁটার মত
লোমগুলো সব কাঁটার মত,
নখগুলো তার কুলো
দাঁতগুলো ঠিক মুলো।
তালগাছে থাকে সেটা মস্তবড় হাঁ।
একটা মোটে পা, সে কানকাটারির ছা!
মুখখানা তার হাঁড়ি,
কান কেটে, নুন ঘসে বেড়ায় বাড়ি বাড়ি।‘
- ওরে বাবা, ভয় করছে যে!
- দাঁড়া, এখনই শেষ নয়। আরো ভয়ের আছে তো।
‘যে ছেলেটা কাঁদে,
তাকে লেজে করে বাঁধে,
গাছের উপর চড়ে-
আর তুলে আছাড় মারে।‘
- আচ্ছা দাদু, একানড়ে অত কান নিয়ে কী করত? ভেজে খেত বুঝি?
- তা তো খেতই। তাছাড়া ওর কানের ব্যবসাও ছিল। আমরাও অতশত জানতাম না, তারপর সলিল চৌধুরি বলে একজন মস্ত মানুষ ছিলেন, তিনি একানড়েকে নিয়ে বিশাল একখানা গান লিখলেন। তাতে একানড়ের যা দুর্দশা হয় না শেষে, ভাবলেও হাসি পায়।
- ও দাদু, বলনা গো গল্পটা।
- বলছি। তবে তুই কতটা বুঝবি জানি না। আসলে ওটা একটা স্যাটায়ার তো।
স্যাটায়ার মানে মিঠি কিছু না বুঝলেও বিজ্ঞের মত ঘাড় নাড়ল।
- তা একানড়ে তো দুষ্টু ছেলেমেয়েদের কান কেটে, কাটা জায়গায় নুন ঘসে জ্বালা বাড়িয়ে দিয়ে মজা পায়। তার কাছে ঝুলিভর্তি কান, মাঝে মাঝে এক-আধটা ভেজে খায়ও নিশ্চয়। আবার ধর কারো কান চাই, তাকে কান বিক্রি করে। সেই সময় ইংরেজদের রাজত্ব চলছে, ডানকান বলে একজন মন্ত্রী একানড়ের কাছে এলেন, তাঁর বাঁ-কানটা চাই। এরপর ছড়াটা শোন-
‘দেশ তখনও হয়নি স্বাধীন, মন্ত্রী ছিলেন ডানকান,
একবার কানপুরে এলেন কিনতে তাঁহার বাঁ-কান।
একানড়ে বললে দেখুন, সময় দিতে হবে
মন্ত্রীর কান আনতে হলে দিল্লি যেতে হবে।‘
- কানপুর আর দিল্লি কেন গো?
- ও বলিনি বুঝি? আসলে কানপুরে একানড়ের বিশাল কানের দোকান তো!
‘কানপুরেতে একানড়ের মস্ত বড় মকান,
হরেকরকম কানের সেথা কানোহারী দোকান।
কান-পাতলা সেখানে যায় কিনতে মোটা কান,
কানে খাটো কিনে আনে লম্বা দেখে কান।‘
ত কান কিনতে ডানকানকে কানপুরে আসতেই হল। কিন্তু মন্ত্রীরা তো দিল্লিতে থাকে, ওখানে রাজধানী কিনা! তাই একানড়ে অ্যাডভান্স কিছু টাকা নিয়ে দিল্লি ছুটল মন্ত্রীর কান আনতে। এর পরেই হল আসল মজাটা।
‘এই না বলে একানড়ে দিল্লি দিল হাঁটা,
ছ’দিন পরে ফিরে এল চক্ষু ভাঁটা-ভাঁটা।
বললে কেঁদে, নিন ফিরিয়ে আপনার টাকাটা,
মন্ত্রী হবার পরে ওদের সবার দু’কান কাটা!'
- যাঃ! দাদুর যত সব বাজে গল্প। এরকম আবার হয় নাকি?
- হয় গো হয়। আট্টু বড় হও, তবেই বুঝবে। তার আগে দিদিভাই, দুষ্টুমিটা একটু কমাও। আর হ্যাঁ, বাইরে খেলতে যাবার আগে মাথায় একটা স্কার্ফ পরে নিও, কানদুটো ভাল করে ঢেকে।
- ইঁ ইঁ ইঁ ইঁ!
No comments:
Post a Comment