উকিল ও গামছা।
(স্মৃতিকথা)
আমার ঠাকুর্দা ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় পাবলিক প্রসিক্যুটার ছিলেন পুরুলিয়ার জাজেস কোর্টে। তাঁর পিতৃদেব পুলিশ সুপার তেজচন্দ্র সারাজীবনের উপার্জনে নিজের গ্রামে প্রচুর ভূ-সম্পত্তি কিনে জমিদার হয়েছিলেন। এই জমিদারি রক্ষা করার সুবিধের জন্যে তেজচন্দ্র তাঁর বড় ছেলে হরিপদকে পুলিশের চাকরি নিতে উৎসাহিত করেন। ভোলানাথের ঝোঁক ছিল সাহিত্য আর গানবাজনায়। এম-এ পাশও করেছিলেন। কিন্তু সম্পত্তি-রক্ষার জন্যে পরিবারে একজন উকিল চাই, তাই বাবা-দাদার চাপে আইন পাশ করে প্র্যাকটিস শুরু করেন। তাঁর বিয়েও হয় বর্ধমানের(পরে পুরুলিয়া-রঘুনাথপুর) উকিল বিনোদবিহারী চক্রবর্তীর মেয়ে প্রভাবতীর সঙ্গে। ভোলানাথের সরকারি উকিল হিসেবে খ্যাতি তখন তুঙ্গে, ৮০% জয় পিপি’র পক্ষে একটা রেকর্ড- এমতাবস্থায় বেনারসের সঙ্গীত-সমাজ তাঁর পাখোয়াজ শুনে ‘বাদ্য-বিদ্যাসাগর’ উপাধি দিয়ে বসল। সেইসাথে কাশীপুরের তৎকালীন মহারাজার সনির্বন্ধ অনুরোধে পুরুলিয়া জেলার ভাষা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস উদ্ধারের গবেষণার কাজে তিনি লেগে পড়লেন, ভাষাচার্য সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের সাহায্যে এই কাজে নিয়োজিত করলেন নিজেকে।
সঙ্গত কারণেই ওকালতি মাথায় উঠল। পি-পি’র চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে প্রাইভেট প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। সেখানেও বিপত্তি। দাদু আজ এখানে কাল সেখানে সংগীতচর্চা আর গবেষণার কাজে ছুটে বেড়ান আর মক্কেল বাসায় এসে অপেক্ষা করে ফিরে যায়। ফলে জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর নাম যত ছড়াতে থাকে, উকিল হিসেবে পসার তত পড়তে থাকে। ইতিমধ্যে তিনি ষাট বছরে পদার্পণ করলেন, বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে সম্বর্ধনা দেবার দিন ঘোষণা করলেন আর ওকালতি নয়, সব কাজ থেকে অবসর নিয়ে গবেষণা-পত্রগুলো এবার শেষ করবেন। ইতিমধ্যে হিন্দিতে তাঁর দুটি বই ‘মানভঞ্জন কাব্য’ আর ‘রাধাভিসার’ প্রকাশিত হয়েছে, বাংলায় ‘মানভঞ্জন’, ‘পঞ্চকন্যা’ আর ‘দানবীর’ প্রকাশের মুখে। ‘পুরুলিয়া জেলার গ্রাম্যভাষা-তত্ত্ব’, ‘সংগীতের তাল’ আর ‘মানভূমের ঝুমুর’ নিয়ে লেখালেখি আর গবেষণা চলছে।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্যত্র। আমাদের পুরুলিয়া (তখন ধানবাদকে নিয়ে মিলিত জেলা মানভূম) জেলা অনুন্নত, অবহেলিত। বিহার কয়লার লোভে ধানবাদকে কেড়ে নিয়েছে, পুরুলিয়া নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। ১৯১২ সাল থেকে ভাষা-আন্দোলন চলতে থাকলেও পশ্চিম বঙ্গও এ নিয়ে কোন আগ্রহ দেখায় না, বিধান রায়কে বাদ দিলে তাঁর মন্ত্রীমণ্ডলের অনেকে হয়ত জানেনই না যে মানভূম জেলার প্রায় ৭৩% বঙ্গভাষী আর ১৬% কুর্মি, আদিবাসী আর ওড়িয়া। বিহারী ১১%এর বেশী নয়, অথচ অবলীলাক্রমে জেলাটি দান করা হল বিহারকে। যাই হোক, ধানবাদ মহকুমায় তবু কয়লা আছে, পুরুলিয়ায় তাও নেই। একফসলি পাথুরে জমি, সেচের ব্যবস্থা নেই, পাঞ্চেত জলাধার তখনও নির্মীয়মান। তাই গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত চাষী আর কৃষিজীবি শ্রমিকদের পৌষ থেকে জৈষ্ঠ্য প্রায় কোন কাজই থাকে না, কুলিগিরি, বেগার খাটা আর রেল ওয়াগন থেকে কয়লা চুরিই তাদের জীবিকা হয়ে দাঁড়ায় সেই সময়টুকুতে। বর্গা-ভাগচাষ তখনও শুরু হয়নি। আমাদের জমিতে চাষ করে যে মজুর-মুনিষরা, তাদেরও একই অবস্থা। এরকম এক সময় রাতের অন্ধকারে রেল-ওয়াগন থেকে কয়লা চুরি করতে গিয়ে আমাদের এক হতদরিদ্র ক্ষেত-মজুর ধরা পড়ল। পুলিশ দেখে মাথার ঝুড়ি ফেলে পালাচ্ছিল, পুলিশ ছুটে গিয়ে তাকে বাড়ি পর্যন্ত তাড়া করে ধরে, পরদিন আদালতে হাজির করা হবে। মজুরটির পরিবার দাদুর কাছে এসে কেঁদে পড়ে, কিছু একটা করে যেন ছাড়ান হয় তাকে। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে দাদুর ফীস পাবার কোন প্রশ্নই নেই।
কী মুশকিল! হাতেনাতে ধরা পড়েছে, তাকে ছাড়াতে হবে। দাদু তখন কোর্ট থেকে প্রায় পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছেন। অথচ গরিব মানুষটার জন্যে কিছু না করলেও নয়! অগত্যা কেসটা উনি নিলেন। সেদিন বিকেলের দিকে চিন্তিত মনে তিনি বাজারের দিকে গেলেন, তারপর হাজতে গিয়ে মজুরটির, যার নাম রবি বাউরি, সঙ্গে দেখা করে কিছু নির্দেশ দিলেন।
পরদিন কেস কোর্টে উঠল, রবি বাউরি বনাম বেঙ্গল-নাগপুর রেলওয়ে, আদ্রা ডিভিশন। রুকনি-আনাড়া রুটে রেলের ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াগন থেকে কয়লা চুরির অভিযোগ। রবিকে বিচারকক্ষে আনা হল, পরণে খাটো ধুতি, ময়লা গেঞ্জি, গলায় একটা লাল গামছা। ও ত শেখানো বুলি ধরে প্রথমেই সব অভিযোগ অস্বীকার করল। ‘হুজুর আমি ঘরে শুয়েছিলাম, পুলিশ এসে ধরল। কয়লা চুরির আমি কিছুই জানিনা ধম্মাবতার, আমার বাপও জম্মে কখনও চুরি করে নাই।‘ এদিকে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী কনেস্টবলটি হলফ করে বলছে তাকে ছুটে পালানোর সময় বাউরিপাড়ার একটি গলি থেকে ধরা হয়। ‘দেখুন হুজুর, আসামীর গায়ে এখনও কয়লা লেগে আছে।‘
এবার দাদুর সওয়ালের পালা। ‘আপনি কি নিশ্চিত যে এই সেই লোক যে কয়লা চুরি করছিল?’
- ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, দেখুন না, ওর গায়ে, কাপড়ে এখনও কয়লা লেগে আছে।‘
- ‘ধর্মাবতার, গরীব মানুষের জামাকাপড় নোংরা হয়েই থাকে। তার জন্যে কাউকে চোর বলে দাগানো যায় না।‘ এর পর পুলিশকে- ‘আচ্ছা, আপনারা যখন ওকে কয়লা চুরি করতে দ্যাখেন, এই গামছাটি কোথায় ছিল?’
- ‘কেন হুজুর, ওর মাথায়, পাগড়ির মত করে পরেছিল!’
দাদুর অনুরোধে পুলিশ থেকে বাকি দুজন প্রত্যক্ষদর্শী কনেস্টবলদেরও এজলাসে আনা হল একে একে। প্রতি সাক্ষীকে দাদু একই প্রশ্ন করলেন। উত্তরে একজন বলল, গামছাটা কোমরে জড়ানো ছিল; অন্যজন বলল- এরকম কোন গামছা ছিলই না আসামীর সঙ্গে। সাক্ষ্য শেষ হল।
এবার উকিল ভোলানাথের বক্তব্য বিচারকের প্রতি। ‘ধর্মাবতার, চুরি হয়েছে, পুলিশের কাজ চোর ধরা। রবি ঠাকুরের গানে আছে- ‘চোর চাই, যে করেই হোক, চোর চাই হোক না সে যে কোন লোক।‘ তাই তারা সঙ্গতকারণেই একজন নিরপরাধ গরীব মানুষকে তার বাসা থেকে চোর বলে আদালতে
এনে হাজির করেছে।‘
-‘আসামী পক্ষের ল'ইয়ার কিভাবে এতটা নিশ্চিত হলেন যে আসামী চোর নয়?’ সরকারি উকিল প্রতিবাদ করলেন। ‘কুলি-মজুর-ছিঁচকে চোরদের কাছে একটা গামছা থাকেই, ওর কাছেও ওই গামছাটি ছিল। এখন সেটা কোথায় কিভাবে ছিল, তা মনে রাখা কি এতই জরুরি?’
- ‘তাহলে স্বীকার করছেন যে গামছাটা ছিল? ধর্মাবতার, গামছাটা আমি গতকাল বিকেলে পুরুলিয়ার বাজার থেকে কিনে ওকে দিয়ে আসি, এই তার রশিদ। গামছাতে লেবেল এখনও আছে, তাতে দোকানের নাম আর দাম মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। অতএব প্রমাণ হচ্ছে যে রবি বাউরি নির্দোষ, রেল পুলিশের লোক অন্য কাউকে চুরি করতে দেখে তাড়া করে। তাকে অন্ধকারে চিনতে না পেরে আমার মক্কেলটিকে ধরে নিয়ে আসে।‘
নিশ্চিত তথ্যপ্রমাণের অভাবে রবি বাউরি বেকসুর খালাস পায়, তারপরে আজীবন সে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আমাদের জমিজমার তত্ত্বাবধান করেছে। তবে এই মামলার পরে দাদুর আর অবসর নেওয়া হয়নি তখন, এত গরীব মানুষের কেস আসতে শুরু করেছিল।
No comments:
Post a Comment