Wednesday, October 30, 2019

পৌরাণিক ভাইফোঁটা। ছড়া

পৌরাণিক ভাইফোঁটা।

রাবণরাজার আর দুটো ভাই কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ-
তাদের যখন ভাইফোঁটা দিত সুর্পনখা সে একটি বোন,
ভেবনা তা সোজা, সে যে কি রে বোঝা, কুম্ভকর্ণ ভাঙাতে ঘুম,
তোমরা কি জানো দেওয়ালিতে কেন পটকা-বাজির এমন ধূম!
রাবণের ছিল দশখানা মাথা দশটা কপালে
পরাতে ফোঁটা
সুর্পনখার কড়ে আঙুলের বেজে যেত প্রায় পৌনে বারোটা।
তারপরে ধর দুঃশলা, সে যে একশো ভাইয়ের একটি বোন
কোন ভোর থেকে ফোঁটা নিতে থাকে দুর্যোধন আর দুঃশাসন।
আঙুলেতে ব্যথা, শেষ করে কথা ভাবছে এবার মিষ্টি খাই
দেখে এক কোনে বসে একসনে, পাণ্ডবদের পাঁচটি ভাই।
আমাদের বাবা, এমন সে হাবা, কেঁদে বলে দাদা যুধিষ্ঠির,
সবকটা ভাই, ভগ্নী যে নাই, আমাদেরও বোন খাওয়াস ক্ষীর!
সগর রাজার ষাটটি হাজার ছিল ছেলে, খুব ধুরন্ধর,
বোন ছিল কিনা? আর শুধিওনা, ভাবতেও গায়ে আসছে জ্বর!

Tuesday, October 29, 2019

অনুপ্রাসের চ্যবনপ্রাশ।। (ছড়া)


অনুপ্রাসের চ্যবনপ্রাশ।।

(ছড়া)


(১)

রামশর্মার ধর্মখুড়ো আর্মেনিয়া গেলেন
ঘর্মে নেয়ে সর্দিগর্মি- কর্ম সেরে এলেন!
চর্মরোগের নির্মমতায় ভির্মি খাবার পালা,
দর্মা-বেড়ার বর্ম পরে মর্মে হল জ্বালা।
দুর্মদ হার্মাদের মত সুর্মা এঁকে চোখে-
বর্মাতে ডার্মাটোলজিস্ট খোঁজেন দিবালোকে!
নর্মদাতে স্নানটি সেরে নির্মল মনপ্রাণ
নির্মূল হয় চর্মের রোগ নির্মাণ হয় গান।
(২)

তিন্তিড়ি খেয়ে হল নকুলের অম্বল,
দই-চিঁড়ে খাবে বলে খুঁজে ফেরে দম্বল।
ফিডিং বোতল হাতে ভীমের হাড়িম্ব
ঘটোৎকচেরে রস খাওয়ায় দাড়িম্বর .
হনুমান তাই দেখে বলে, ওগো রম্ভা,
খেতে পারি এক কাঁদি, আমি কিসে কম বা!
হুয়া হুয়া ডেকে বলে বিটকেল জম্বুক
আজ যে উসেন বোল্ট, কাল ছিল শম্বুক।
গো-জননী বাছুরের খোঁজে ডাকে 'হাম্বা',
জিরাফ ডাকবে কিরে? গলাটাই লম্বা !! (৩)
রন্ধনেরই গন্ধ পেয়ে স্কন্ধকাটা ভূত
সন্ধেবেলায় অন্ধকারে ছন্দে কী অদ্ভুত
নাচ জুড়েছে বন্ধঘরে, কবন্ধনাট্যম!
সন্ধি করে ইন্ধন দেয় ক্ষিতি-মরুৎ-ব্যোম,
পঞ্চভূতের তিনটি হাজির। বাকিদের সন্ধান
মিললে হবে রন্ধন, নিঃসন্দেহ মন-প্রাণ।
গান্ধারীর প্রবন্ধ পড়েই আনন্দে উচ্ছল-
বসুন্ধরায় অগ্নি আছে, সিন্ধুনদে জল!
(৪)

শুনে অনন্ত বেদ-বেদান্ত সাধুসন্তের দেশে
জন্তুর মত দন্তবিকশি সন্তু উঠেছে হেসে।
সীমন্তে নেই কুন্তল, তাই অন্তর হল কাবু,
তদন্তে সন্তান-হন্তার চিন্তিত কাকাবাবু।
কিন্তু হঠাৎ হন্তদন্ত আসেন শিবকুমার
সন্তুর নামে যন্তর হাতে অশান্ত বেদনার
ভারেতে ক্লান্ত, শ্রান্ত যেন রে বৃন্তচ্যুত ফুল,
কৃতান্তে আক্রান্ত হেন রে চিত্ত চিন্তাকুল।
অনন্তর কাকাবাবুকে দেখেই অন্তর্জ্বালা ভুলে
'রাজা' বলে ঝেড়ে সব সন্তাপ সন্তুর নেন তুলে।

(৫)

লঙ্কা-কূলে শঙ্কা ভুলে পঙ্ক সকল মাড়িয়ে আয়

শিবশঙ্কর ভয়ঙ্করের ডঙ্কাখানি বাজিয়ে আয়। আয় বধূরা সাজ কঙ্কন কুঙ্কুমে অলঙ্কারে। কিঙ্কিনী-রব তোলরে সবে ঝঙ্কারি বীণার তারে। অহঙ্কারের ঊর্ধ্বে গিয়ে ওই শুনি ওঙ্কারের তান
পদ্মনাভ ত্রিবঙ্কিম জলধি অঙ্কে ওই শয়ান।।

(৬) চঞ্চল-অঞ্চল উড়িছে ডানা মেলে যেন মালঞ্চের ছিন্নফুল, কাঞ্চন সঞ্চয় ওই বসনতলে ছাপিয়ে ওঠে যেন শ্বেত-দূকুল। সরগম পঞ্চম সুরে ধ্বনিয়া উঠে করিয়া বঞ্চনা বিহঙ্গে, কিঞ্চিৎ সিঞ্চন করিয়া বারিধারা পঞ্চশরে রাখে ভ্রূভঙ্গে। কেশদাম-কুঞ্চন সঘন-ঘনঘটা বুঝি গো সঞ্চারে কোলাহল, তঞ্চন স্বর্গের শিখর হতে দেখি প্রপঞ্চময় মায়া হলাহল। (৭) বঙ্গের রঙ্গিনী অঙ্গনা গো তুমি অঙ্গ ভাসাও তরঙ্গজলে, হেরি রঙ্গ-বিভঙ্গ হে সুরঙ্গমে আসঙ্গলিপ্সু অনঙ্গ জ্বলে। তুমি বিহঙ্গে সঙ্গীত দান কর, ঢাল গঙ্গার সঙ্গমে তীর্থবারি; অঙ্গার লয়ে কর আলিঙ্গন, সুমঙ্গলে তুমি বঙ্গনারী। (৮) আস্ত কাঁঠালগুলো মস্ত সাইজ স্তরে স্তরে কোয়া-ভরা বিস্তর বীজ। গাছখানা উঠেছিল প্রস্তর ফুঁড়ে আগাছা-ঘাসের স্তুপ আস্তানা জুড়ে। একদিন ওস্তাদ মস্তান মালি কাস্তেয় ঘাস কেটে বস্তায় ঢালি পোস্তায় গিয়ে দিল বেচে শস্তায়, বেঁটে দিল পোস্ত হামানদিস্তায়। মস্তান হস্তের দেখ রে কামাল, দস্তুরমত ফলে মস্ত কাঁঠাল! (৯) তিন পক্ষ ছুটি মজা লক্ষ লুটি আমবৃক্ষ পরে চড়ি দক্ষতার সাথে বুনো পক্ষী হাতে শিকার করে ঘর ফিরি। এক চক্ষু কানা নলিনাক্ষ জানা বড় বিচক্ষণ, আহা! অশিক্ষিত মানি, দক্ষ সে রাঁধুনি জানি বিলক্ষণ তাহা। ধান্য ক্ষেত মাঝে উনুনটি বিরাজে ক্ষীণতোয়া নদীর পাড়ে বক্ষে হাত রেখে মশলা দেখে চেখে, নলিনাক্ষ রাঁধে-বাড়ে। কী স্বাদ ভক্ষণে যে খায় সেই জানে, ক্ষণজন্মা তুমি ভাই, অক্ষমেরে ক্ষম, ক্ষমতা নাহি মম, বোঝাতে শব্দ না পাই। (১০) আজ্ঞে মশায়, অজ্ঞ আমি, যজ্ঞ-বিধির নেইক জ্ঞান, বিজ্ঞানের কী সংজ্ঞাটি, আর কারেই বা কয় বেদ-পুরাণ? বিজ্ঞাপনে লেখাই আছে কাব্যের নাম অভিজ্ঞান দুষ্যন্ত-শকুন্তলার অভিজ্ঞতার গল্পখান। কে কালিদাস, জিজ্ঞাসা মোর, জ্ঞানদাসের কি জ্ঞাতি হন? বিজ্ঞজনের এ অজ্ঞতা কেন আমায় বুঝিয়ে কন!

বিশেষজ্ঞের কী মতামত, রাজ্ঞী কি তার খবর পান? ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা শুনেই ব্রহ্মজ্ঞানী যে অজ্ঞান! (১১) তৃষ্ণা মোর একফোঁটা উষ্ণতার তরে, বিষ্ণুরে করিনু পূজা কৃষ্ণপক্ষ ধরে। জিষ্ণু আমি, সহিষ্ণুতা শিখিনিক কভু সুদেষ্ণার কক্ষে আজ কৃষ্ণা পশে তবু। বৈষ্ণব তূষ্ণীম্ভাব ধরেন যখন, বৃষ্ণিবংশ বর্তিষ্ণু লাগে যে তখন।

(১২)

চিন্তামাঝে মগ্ন ছিনু লগ্ন বয়ে গেল, রুগ্নদেহে ভগ্নমনে নিদ্রা চোখে এল। লগ্নী নাই অর্থাভাবে, বিলগ্ন সময়

অসংলগ্ন খাদ্য খেয়ে রুগ্ন অগ্ন্যাশয়।

নগ্নশিরে বস্ত্র নাই, ভগ্নীগণ দুখী অগ্নিহীন যজ্ঞ তবু জমদগ্নি সুখী।

(১৩)
নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে অখণ্ড বিশ্বাসে ঈশ্বর-নাম জীব লহ রে বিশ্ব যে জঙ্গল শ্বাপদ-সংকুল কেবা দেয় আশ্বাস কহ রে! আশ্বিনে সমাগতা সিংহবাহিনী মাতা অশ্ব-নৌকা-গজ বা দোলায় শ্বেত পুষ্প শোভে অলি জোটে মধুলোভে নশ্বর জীবেরে কে ভোলায়। পরশ্ব রজনীতে হেরিতে এ ধরণীতে অশ্বিনী-নক্ষত্র মহৎ জাগিবে বিশ্বে যারা পড়িবে রাত্রে তারা শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ।

(১৪)
অলখ নিরঞ্জন, মহাভয় ভঞ্জন মায়া মোহ অঞ্জন করে মনোরঞ্জন। গলায় গুঞ্জা মালা কুঞ্জে আসিল কালা, মুঞ্জরে গাছপালা ভ্রমর গুঞ্জরিলা। কুঞ্জর পিঞ্জরে সঞ্জীবনীর তরে খঞ্জের পঞ্জরে বিন্ধে সে খঞ্জরে। অলক্ত-রঞ্জিত কজ্জল-পুঞ্জিত শিঞ্জিনী-শিঞ্জিত ব্যঞ্জন ভুঞ্জিত। মঞ্জুল মঞ্জরী সুধামঞ্জুষা মরি! শান্ত প্রভঞ্জন, ভঞ্জিল শর্বরী।। -----
(১৫)

কপিলাবস্তুর বৃদ্ধ রাজা শুদ্ধোদন
তাঁর পুত্র সিদ্ধার্থ দয়ালু ভীষণ। দেবদত্ত হাঁসটিকে বিদ্ধ করে শরে সিদ্ধার্থ উদ্ধার করে প্রাণরক্ষা তরে। ক্রুদ্ধ দেবদত্ত গিয়ে তাহার বিরুদ্ধে সিদ্ধার্থকে আহ্বান করে দ্বন্দ্বযুদ্ধে। সেই রাজপুত্র হন প্রসিদ্ধ মহান সিদ্ধি লভি বুদ্ধ নামে করুণানিধান।
(১৬)
বৃশ্চিক দংশিলে পশ্চাদ্দেশে নিশ্চল হয়ে কিছুক্ষণ থেকো বসে। নিশ্চিত মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আসবেই, কশ্চিৎ যম যদি ঘেরে।

তা বলে রয়োনা নিশ্চেষ্টটি যেন, পশ্চিমে হাঁটা দিলে বাঁচবে, তা জেনো নিশ্চয়। আশ্চর্যে না যদি ঘুম আসে, শুয়ো ঘাসে নিশ্চিন্তে নিঝুম! পুনশ্চ বলি, মোর একটি কথাও কোরোনা বিশ্বাস, দুশ্চিন্তা হটাও!


(১৭) পম্পাসরোবর তীরে সম্পন্ন নগরী চম্পক বনেতে সেথা ভিড়ে এসে তরী সাম্পান-সদৃশ, হেরি কম্পন প্রবল ভয়ে লম্ফঝম্প করে লম্পটের দল- চম্পট দিয়েছে সবে। বৈশম্পায়ন ভাবে ভূমিকম্প বুঝি এমন গর্জন! শম্পার উজল-প্রভা সম্পাতে গরজি, বিদ্যুন্মালার জালে আলিম্পনে সাজি সম্পত্তি-সম্ভার নিয়ে রাজন দম্পতি চম্পারণ হ'তে তাঁরা এলেন সম্প্রতি ঋষি বৈশম্পায়নে দেখে দ্রুতগতি সম্প্রদান সম্পূর্ণ করেন ভূপতি। (১৮)


বাল্মীকি কঠোর তপে চতুর্মুখ তুষ্ট জপে হৃষ্ট হয়ে ব্রহ্মা দেন বর সে বরে আদিষ্ট হয়ে আর্যবীর গাথা গেয়ে সৃষ্টিমাঝে হবেন অমর।

রাম পুত্র ক্ষত্রিয়ের, অদৃষ্টের দেখ ফের,

বাল্মীকি দেখেন ইষ্টদেবে-
হেরিয়া আকুল হন চতুর্ভুজ নারায়ণ
মিষ্টস্বরে ভজেন কেশবে।
শরে দুষ্ট নিষাদের বধ ক্রৌঞ্চমিথুনের- বেদনায় কষ্ট পান মুনি,

ব্যাধের অশিষ্টাচার দেখে ভ্রষ্ট ব্যবহার রুষ্ট হয়ে শাপ দেন তিনি।

চেষ্টায় জড়ত্ব নষ্ট, শ্লোক হরে শোক-কষ্ট 

সৃষ্টি হয় ছন্দ অনুষ্টুপ, মিষ্টস্বরে রামায়ণ গায় সীতা-পুত্রগণ গুণিজন শোনো হয়ে চুপ!

(১৯)


"ল্ল"
ভল্ল হাতে মল্লরাজ জল্লাদকে ডেকে
বলে আন্ রসগোল্লা কেল্লা-হাট থেকে।
চুল্লি হতে তপ্ত তুলে দিল্লী যেতে হবে
নচেৎ করবে হল্লা মোল্লারা যে সবে!
আল্লা-আল্লা, খোদাতাল্লা- একি উপদ্রব,
বিল্লি ডাকে, ঝিল্লিতানে ওঠে কলরব।
তাদের করিতে শান্ত বিসমিল্লা খান
মিঞা কি মল্লার রাগে সানাই বাজান।
বল্লাল সেনের হৃদে উঠিল হিল্লোল
নেচে ওঠে মল্লিনাথ শুনে সে কল্লোল।।

Monday, October 28, 2019

নিতাই-গোরা।। (গল্প)

নিতাই-গোরা।।
(গল্প)



"ধূমপান করিনে আমি, গাঁজা খাই জয় বাবা বলে......"- হাওড়া স্টেশনের সাবওয়েতে সিঁড়ি ওঠার মুখে বেসুরো গলায় শ্যামাসঙ্গীতের প্যারডি শুনে থমকে দাঁড়ালাম। "ভোলে বাবা কে চরণোঁ মেঁ সেবা লাগে" বলে ছিলিমে একটা লম্বা টান দিতেই ফটাস্‌ করে আওয়াজ, শিবনেত্র হয়ে পড়লেন সাধুবাবা। আমার পেছনে একজন মধ্যবয়সী সুদর্শন ভদ্রলোক আসছিলেন, একটু মুচকি হেসে একটা পাঁচ-টাকার কয়েন ঠং করে ফেলে দিলেন সামনে রাখা থালাটাতে।
আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম। উনি এগিয়ে এসে শুধোলেন- 'কতদূর?'
'কাটোয়া' আমি বললাম, 'আটটার লোক্যালে।'
- 'আমি অগ্রদ্বীপ।'
- 'হুঁ, তুলসী-মালা গলায় দেখেই বুঝেছি', মৃদু হাসলাম আমি, 'গোপীনাথের মেলায় বুঝি?'
- 'না, বাড়ি ওখানে। ভালই হল গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।'
- 'বাঃ, ভালই তো হল, চলুন।'

ভদ্রলোক ডাক্তার। নাম নিত্যানন্দ সরখেল। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সের আধুনিক শিক্ষিত মানুষের সাথে এমন নাম একেবারেই মানায় না। সেটা বলায় উনি হাসলেন।
- 'আমাদের নবদ্বীপ অঞ্চলে নিতাই-গোরার ছড়াছড়ি, কী করবেন? আর বয়স বা শিক্ষা-দীক্ষা অনুযায়ী নাম তো আর বদলানো যায় না। তবে আইডিয়াটা মন্দ দেন নি। রবি ঠাকুরের এক গল্পের নায়কও তো আধুনিকতার দোহাই দিয়ে অভয়াচরণ থেকে অভীককুমার হয়েছিলেন।...... এই যে দাদা, মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে যে দুটো সিগারেট মেরে দিলেন, জানেন এতে কার ক্ষতি হচ্ছে?'- শেষের কথাটা অন্য এক সহযাত্রীকে বলা।
- 'নিজের পয়সায় খাচ্ছি মশায়, কারো বাপের পকেট মারিনি।' পালটা উত্তর আসে।
- 'তামাকের নিকোটিনের ক্ষতিকর দিকের কথা নাহয় ছেড়ে দিলাম, আপনার স্বাস্থ্য আপনি বুঝবেন। কিন্তু অন্যকে নিজের এঁটো ধোঁয়া খেতে বাধ্য করছেন বলেই বলছি।'
- 'আমি তো কাউকে খাওয়াচ্ছি না, আপনারা ইনহেল না করলেই হল।'
ঝগড়া ক্রমেই জমে উঠছে!
- 'দাদা বুঝি ডাক্তার?' প্রশ্ন করলেন এক সহযাত্রী। আমি ওঁর হয়ে উত্তর দিলাম- 'হ্যাঁ, অগ্রদ্বীপে ডাক্তারি করেন'।
- 'না না, আমার চেম্বার সাঁত্রাগাছিতে, অগ্রদ্বীপে বাড়ি।'
- 'তা কী বলছিলেন ডাক্তারবাবু, ধূমপানের ক্ষতির কথা?' কৌতূহলী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন একজন যাত্রী।
- 'আসলে সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারে অনেকগুলো ভুল ধারণা আছে। যেমন আমার পয়সায় খাচ্ছি, কার বাপের কী! লোকে বোঝে না অ্যাক্টিভ থেকে পাসিভ স্মোকিং আরো বেশি ক্ষতিকর, বিশেষতঃ বাচ্চা, রোগী আর গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে।'
- 'কী সাঙ্ঘাতিক!'
- 'তবে আর বলছি কী! আমার এক বন্ধুর দু-বছরের বাচ্চার কাশি আর সারে না। ভয় হচ্ছিল, ব্রঙ্কাইটিস বা টিবির দিকে না টার্ন নেয়। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করি বন্ধুটি বাচ্চা কোলে নিয়ে সিগারেট টানতে টানতে চলেছে। তাকে দাঁড় করিয়ে কড়া ধমক দিই।'
'তারপর?' এবার সেই চেন স্মোকার ভদ্রলোককেও দেখলাম শুনতে আগ্রহী। এদিকে দেখতে পাচ্ছি চারপাশের চোখগুলো বড়বড় হয়ে উঠেছে।
- 'ছেলের কাছে সিগারেট খাওয়া বন্ধ করাতে এখন ওর কাশি সেরেছে, সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে বউ পোয়াতি থাকতে ওর সামনে একটানা খেয়ে যেত, তার এফেক্ট কিছুটা রয়ে গেছে, বাচ্চাটার একটা অ্যাজমার টেন্ডেন্সি আছে।'
গল্প জমে উঠেছে। সিগারেট নেশা কিনা, গাঁজা আর সিগারেটে তফাৎ কী এবং কতটা, বিড়ি ভাল না সিগারেট, ধূমপানে সত্যিই ক্যানসার হয় কিনা, এধরণের নানা প্রশ্ন ছুটে আসতে থাকল চারপাশ থেকে। ফার্স্ট হ্যান্ড আর সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোকিং-এর কথা জানতাম, আজ থার্ড হ্যান্ড স্মোকিং বলে একটা নতুন কথাও শুনলাম। প্রশ্ন আসতে লাগল আর নিত্যানন্দবাবু সাধ্যমত তাদের উত্তর দিয়ে যেতে লাগলেন।
- 'আচ্ছা, আপনি ওই গাঁজাখোর সাধুবাবাকে ভিক্ষে দিলেন কেন? ওর কোন নৈতিক দায়িত্ব নেই বুঝি সমাজের ওপর?' প্রশ্নটা আমার তরফ থেকে এবার।
'এর জবাব আমি আলাদা করে দেব আপনাকে', হেসে বললেন নিত্যানন্দ। 'তবে একটা কথা জানাই, নিকোটিন তো বিষ বটেই, তবে তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর জিনিষ হল 'টার' বা আলকাতরার মত একধরণের চ্যাটচেটে পদার্থ, যেটা ট্র্যাকিয়া বা ফুসফুসের বায়ুপথের ফিল্টার সিলিয়ার ক্ষতি করে লাংস ইনফেকশান এমনকি ক্যান্সারও ঘটায় আর রক্তে মিশে ধমনীর প্রবাহের পথটাকে সরু বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে হৃদয়ে অক্সিজেন কমে গিয়ে হার্ট-অ্যাটাক হয়, ব্রেনে অক্সিজেন না পৌঁছে সেরিব্রাল অ্যাটাক হতে পারে বা হয়ত অ্যাঞ্জিওপ্লাস্ট বা বাই-পাস সার্জারিও করতে হতে পারে। এই 'টার' বেশি থাকে তামাকে আর সিগারেটের কাগজেও। সাধুবাবার গাঁজা মস্তিষ্কের পক্ষে বেশি ক্ষতিকর হলেও, টার কম থাকে ওতে, তাতে শরীরের ক্ষতি একটু কম হয়। অবশ্য তার মানে এই নয় যে সিগারেট ছেড়ে আপনারা গাঁজা খান।'

আমাদের এই ডাক্তার বন্ধুর লেকচারের প্রভাবেই হোক বা গন্তব্যস্থল এসে গেল বলেই কিনা, চেন স্মোকার বন্ধুটি অম্বিকা কালনা আসতেই তড়িঘড়ি করে নেমে গেল। গাড়ি এখন প্রায় ফাঁকা। আমাদের ডাক্তার বন্ধুটি দরজার পাশের খালি জায়গায় গিয়ে এবার পকেট থেকে বের করলেন উইলস ফিল্টারের একটা প্যাকেট আর দেশলাই। আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মত একটা হাসি দিলেন।
- 'কী করি মশায়, জ্ঞানপাপী। পুরনো অভ্যাস, কিছুতেই ছাড়তে পারি না। তাই সুযোগ পেলেই লোককে জ্ঞান দিই, যদি সেই সুযোগে নিজের কানেও কিছুটা যায়!'
গাড়ির স্পীড কমে আসছে। নিত্যানন্দ ডাক্তার বলে চলেছেন, 'সাধুবাবার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন না? তাহলে মশাই বলি। ওই সাধুবাবার নাম গৌরাঙ্গ দাস। আমার ছোটবেলাকার বন্ধু। ব্যাটা স্কুলে পড়তেই গাঁজা খেত, আমাকেও ধরায়। অনেক কষ্টে ছাড়তে পেরেছি, তাই আজ এই পার্থক্যটা দেখতে পাচ্ছেন। তবু তো ছেলেবেলার সঙ্গী বলে কথা!'
অগ্রদ্বীপ এসে পড়েছে। টুক করে নেমে গিয়ে ভদ্রলোক ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেলেন।

সীমন্ত ।। বাংলা অণু-গল্প

সীমন্ত ।।
(অণু-গল্প)

'একদিন আমার সাথে মহামায়া আশ্রমে চল, মহাগুরুকে তোর হাতটা দেখিয়ে আনি গে। একেবারে অব্যর্থ গণনা। তাছাড়া তাঁর আশীর্বাদের ফলও খুব ফলে। এই শনিবারেই চ' দেখি।'

মিষ্টুর ওই এক দোষ, কথা শুরু করলে আর থামতে চায় না, আর ওই গোঁ ধরলে তা করেই ছাড়বে। অবশ্য রীনার সমস্যাটা নিয়ে সে যে ভাবছে সেটা দেখেও ভাল লাগে ওর। প্রায় চার বছর হল রীনার বিয়ে হয়েছে সীমন্তের সাথে। ইতিমধ্যে বার দুয়েক তার সন্তান গর্ভে এসেও পাঁচ-ছ'মাসের মাথায় নষ্ট হয়েছে, মানে মিস্‌ক্যারেজ, আর কি। অবশ্য এবার ডাক্তার ভরসা দিয়েছেন পরের বার একটা শিরোদকার-স্টিচ দিয়ে দেবেন। তবু কি চিন্তা যায়! মিষ্টুর বর পার্থ সীমন্তের সহকর্মী, সেই হিসেবেই ওদের বন্ধুত্ব হলেও আজকাল সেটা সহোদরা বোনদের মতই হয়ে উঠেছে।
মহামায়া আশ্রমে শনিবার বেশ ভীড়। জন পাঁচ-ছয় ষণ্ডাগোছের চ্যালা দর্শনার্থীদের সামলাচ্ছে। ওরা চারজন পার্থের গাড়িতেই এসেছে, গাড়ির ব্র্যাণ্ড আর চাকচিক্য মহাগুরুর নজর এড়ায় নি বোঝা গেল, যখন শিগ্‌গিরই তাদের ডাক পড়ল। সীমন্ত একটু আগে নেমে গেছিল সিগারেট কিনতে, ও হেঁটে আশ্রমের বাইরে এসে সিগারেট ধরিয়েছে। দুই সখী এগিয়ে গিয়ে মহাগুরুকে প্রণাম করল, পার্থ আশ্রমের বাইরে গিয়ে সীমন্তের কাছ থেকে একটা সিগারেট নিল।
'তোমার ত দেখছি মা দাম্পত্য-জীবনে শুক্রের আধিপত্য। স্বামীভাগ্য খুব ভাল। তবে একটু চোখে চোখে রেখো, কখন কি ঘটে বলা যায় না।' মহাগুরু মিষ্টুর দিকে তাকিয়ে বললেন। মিষ্টু দেখা গেল ব্যাপারটাকে পাত্তাই দিল না। 'আমার কথা ছেড়ে দিন, গুরুদেব, আপনি আমার এই বোনটিকে একটু দেখুন। ওকে নিয়েই যত সমস্যা।'

মহাগুরুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে তিনি কিছু প্রশ্ন করেন না। করবেন কেন, তিনি ত অন্তর্যামী, সর্বজ্ঞ! তিনি রীনার মুখের দিকে তাকিয়ে 'সীমন্ত' কথাটা বার দুই অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন। তারপর চমৎকৃত রীনা কিছু বলার আগেই বলে উঠলেন-'হবে মা, হবে। তোমার বিয়ের ফুল খুব শিগগিরই ফুটবে!'
এদিকে ধূমপান শেষ করে সীমন্ত সেদিকেই আসছিল তখন, তার পেছনে পার্থ। মহাগুরুর শেষ কথাটা কানে যেতেই সীমন্ত তড়িঘড়ি সেদিকে এগিয়ে গেল। তারপর রীনাকে টেনে তুলে বলল, 'আমাদের এক্ষুনি ফিরতে হবে, একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে অফিসে।' মহাগুরুর দিকে তাকিয়ে বলল- 'নমস্কার গুরুদেব। আমি ওর হাসব্যাণ্ড। এবার তবে আসি'- বলে হতভম্ব মহাগুরুর দিকে আর না তাকিয়েই রীনাকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে বেরিয়ে এল।
'না হয় গুরুদেব একটু ভুল করেছেন। তাবলে এত তাড়াহুড়ো করে চলে আসার কি দরকার ছিল?' গাড়িতে বসে কৈফিয়ত তলব করল রীনা। 'জানো, উনি তোমার নামটা পর্যন্ত ঠিক-ঠিক বলে দিয়েছেন।'
'দোষটা ত তোমারই। কতবার বলেছি সিঁদুরটা একটু ভাল করে পর। এত ঘন চুল মাথার সামনের দিকে যে কিছু দেখাই যায় না! আর হ্যাঁ, সীমন্ত হল সিঁথি, ওটাই গুরুদেবের চোখে পড়েছে, আমা্র নামটা নয়! চালাক মানুষ, জিগ্যেস তো করতে পারেন না তাই সীমন্তে সিঁদুর খুঁজছিলেন, দেখতে পাননি যথারীতি। মহাগুরুর চ্যালাদেরকে দেখেছ, গুণ্ডা পালোয়ান একেকটা। গুরুদেবের কথা যাতে বিফল না হয় তার জন্যে ওরা তোমার এই মুহূর্তে একটা বিয়েও দিয়ে দিতে পারত।'
গাড়িতে গোটা রাস্তা কেউ আর কোনও কথা বলে না।

সবুজের স্বপ্ন। Bengali Essay

সবুজের স্বপ্ন।

''We don't inherit the earth from our ancestors; we borrow it from our children."
কথাটা আসলে কে বলেছিলেন তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। তবে ১৯৭১ সালে বিশ্বখ্যাত পরিবেশবিদ ওয়েন্ডেল বেরী (Wendell Berry) তাঁর লেখা “The Unforeseen Wilderness: An Essay on Kentucky’s Red River Gorge”.বইতে অনেকটা এ ধরণের একটা উক্তি করেন। সেই থেকে এটা তাঁর নামেই চলে আসছে।
তবে বেরীরও অনেক আগে বাংলারই এক কবি স্বপ্নটা দেখেছিলেন। অবশ্য তার পর নিষ্ঠুর পৃথিবী তাঁকে বেশীদিন বাঁচিয়ে রাখেনি। একটি নবজাতককে দেখে তিনি শপথ নিয়েছিলেন-

"যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।" (ছাড়পত্র)
তারপর এই সেদিন বাংলার এক গায়ক কবি লিখলেন একটি গান- তাঁর দুশ্চিন্তা তাঁদের সন্তান, এই প্রজন্মের শিশু কিসের আশায়, কী নিয়ে বাঁচবে, কী স্বপ্ন দেখবে ঘুমের মাঝে। সুকান্তের পরের অর্ধ-শতাব্দীতে আমরা কতটুকু এগিয়েছি? নচিকেতার আক্ষেপ-

"চাঁদমামাই দেবে স্বপন, স্বপ্ন দিতে আমি কি আর পারি?
যে পৃথিবী গড়লাম আমি বাসযোগ্য হয়নি তা আমারই।"
এই পৃথিবীকে রক্ষার ব্রত মানুষ খুব বেশী দিন নেয়নি। আমরা এই প্রকৃতি থেকে নিয়েছি অনেক, এখনও নিয়েই চলেছি, দিচ্ছি কিন্তু অনেক কম। শিল্প-বিপ্লবের পরমুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত শুধু আগুন জ্বেলেছি- নিষ্ক্রান্ত গ্যাসগুলি, বর্জ্যপদার্থগুলি কোথায় গিয়ে কিসের ক্ষতি করছে তা জানিনি, জানবার চেষ্টা করিনি। মাটি খুঁড়েছি, পাহাড় ভেঙ্গেছি যত্রতত্র, সবুজকে নিঃশেষ করে জীবজগৎ করেছি ধ্বংস, ফিরে তাকাইনি পেছনে। আজ আমাদের জ্ঞান হয়েছে, জেগেছি, জেনেছি যে ভুলটা কোথায়, তার সংশোধনের পথ কী? 'যে পথে যেতে হবে, সে পথে তুমি একা' নও আর। এই পৃথিবীর প্রকৃতি, পরিবেশ, জল-মাটি-বায়ূমণ্ডল, মানুষ-জীবজন্তু-গাছপালা সব নিয়েই আমাদের জীবন, এদের কাউকে বাদ দিয়ে নয়। তাহলে কি মাটি খুঁড়ে খনিজ-উত্তোলন করব না? ঘরবাড়ি বানিয়ে থাকব না, ফলমূল-মাছমাংস না খেয়ে থাকব? ঘাসের ক্ষতি হবে বলে গরু-ভেড়া তাদের খাদ্য পাবে না? তা একেবারেই নয়। সবকিছুই চাই, সবকিছুই পাওয়া সম্ভব- তবে সঠিক পরিকল্পনা মাফিক এগোতে হবে পরিবেশের সাম্যের পরিস্থিতি বজায় রেখে। Food chain, ecological balance, global warming, deforestation, green-house effect ইত্যাদি অনেক গালভরা নাম দিয়ে আমরা ব্যাপারটাকে অযথা কঠিন করে তুলেছি- কিন্তু কাজ সিধে, উদ্দেশ্য একটাই-
'প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল'।
আমাদের এই সবুজ গ্রহের যে সৌন্দর্যীকরণ, তা কিন্তু আমাদের পাথেয়, ধ্যেয় নয়, উদ্দেশ্য এর অকালমৃত্যু রোধ করে একে সজীব রাখা। যদি সূর্য কোনদিন নিভে যায় বা হঠাৎ আছড়ে পড়ে কোন বিশাল উল্কা বা গ্রহাণু এর বুকে, তা রোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই, তবে এই গ্রহে পানীয় জলের সঞ্চয় ধরে রাখা, বায়ুমণ্ডলে প্রাণদায়ক অক্সিজেনের সঠিক অনুপাত বজায় রাখা, ওজোনস্তরকে অক্ষুণ্ন রেখে ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি আর উষ্ণায়ন থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা আর তৃণ-গুল্ম-বৃক্ষাদি দিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ করে বিশ্বে মরুর বিস্তারকে রোধ করা- এসবকিছু আছে মানুষেরই হাতে, এ আমাদের সবার দায়িত্ব।

ভূতের দুঃখ। Parody of Bengali song

ভূতের দুঃখ

আমরা তো আর বেঁচে নেই, আর বেঁচে নেই। যেখানেই যাব একথাই বলে রাখব।। তোমার মতন মানুষ কেন যে আসল, শুধু কাশল,
ভয় তো পেলনা, আমাদের দেখে হাসল, শুধু হাসল।
হেন অপমান কি করে যে ভুলে থাকব?
যেখানেই যাব একথাই বলে রাখব।।
আমরা তো আর বেঁচে নেই, আর বেঁচে নেই।
আর কারো দেহে আত্মাখানাকে যদি গুঁজে দিতে পারি
ভয় না পাওয়ার সাজাটা তোমায় না দিয়ে কি আর ছাড়ি?
দেহ ছাড়া ভূত কিছুই করতে পারে না, কিছু জানে না,
কংকাল সেজে নাকি কেঁদে কেঁদে ঘুরলেও কেউ মানে না
এবার আস্ত শরীরেতে ভর করব!
শুধু ভয় করি ওঝা এলে কোথা কাটব??
আমরা তো আর বেঁচে নেই, আর বেঁচে নেই।

(জয়-জয়ন্তী ছবির গান 'আমরা তো আর ছোট নেই'- এর সুরে গাইতে হবে।)

একানড়ে।। Bengali story for children

একানড়ে।।



- দাদু গল্প বল।
- গল্প তো বলতেই হবে। স্বয়ং মিঠি দিদিভাই শুনতে চেয়েছে যে। তা কিসের গল্প বলি বল তো।
- ভূতের গল্প।
- দূর বোকা মেয়ে! ভূত-টুত সে সব আমাদের ছেলেবেলায় ছিল। সেসব কি আর আছে? কবে মরে মানুষ হয়ে গেছে।
- ভূতরা মরে বুঝি মানুষ হয়?
- তা নয়ত কী? এই যে চারদিকে দুষ্টু লোকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকের পকেট থেকে টাকা সরাচ্ছে, ভীড় থেকে বাচ্চা ছেলেমেয়ে চুরি করছে, কথায় কথায় মানুষ, জন্তু-জানোয়ার মারছে, তারা কি মানুষ! আগের জন্মে সব এক-একটি আস্ত একানড়ে ছিল।
- একানড়ে কী দাদু?
- সে একরকমের ভূত, একটি মাত্র পা ঝুলিয়ে তালগাছে বসে থাকে।
- আজ তাহলে একানড়ের গল্প হোক।

- ঠিক বলেছ দিদিভাই। একানড়ে যদিও আর দেখা যায়না এখন খুব একটা, একসময় তাদের খুবই দৌরাত্ম্য ছিল গ্রামেগঞ্জে। আমার ঠাম্মা আমাদের ছড়া শোনাতেন-

‘এক যে আছে একানড়ে,
সে থাকে তালগাছে চড়ে।
চোখদুটো তার ভাঁটার মত
লোমগুলো সব কাঁটার মত,
নখগুলো তার কুলো
দাঁতগুলো ঠিক মুলো।
তালগাছে থাকে সেটা মস্তবড় হাঁ।
একটা মোটে পা, সে কানকাটারির ছা!
মুখখানা তার হাঁড়ি,
কান কেটে, নুন ঘসে বেড়ায় বাড়ি বাড়ি।‘

- ওরে বাবা, ভয় করছে যে!
- দাঁড়া, এখনই শেষ নয়। আরো ভয়ের আছে তো।

‘যে ছেলেটা কাঁদে,
তাকে লেজে করে বাঁধে,
গাছের উপর চড়ে-
আর তুলে আছাড় মারে।‘

- আচ্ছা দাদু, একানড়ে অত কান নিয়ে কী করত? ভেজে খেত বুঝি?
- তা তো খেতই। তাছাড়া ওর কানের ব্যবসাও ছিল। আমরাও অতশত জানতাম না, তারপর সলিল চৌধুরি বলে একজন মস্ত মানুষ ছিলেন, তিনি একানড়েকে নিয়ে বিশাল একখানা গান লিখলেন। তাতে একানড়ের যা দুর্দশা হয় না শেষে, ভাবলেও হাসি পায়।
- ও দাদু, বলনা গো গল্পটা।
- বলছি। তবে তুই কতটা বুঝবি জানি না। আসলে ওটা একটা স্যাটায়ার তো।
স্যাটায়ার মানে মিঠি কিছু না বুঝলেও বিজ্ঞের মত ঘাড় নাড়ল।
- তা একানড়ে তো দুষ্টু ছেলেমেয়েদের কান কেটে, কাটা জায়গায় নুন ঘসে জ্বালা বাড়িয়ে দিয়ে মজা পায়। তার কাছে ঝুলিভর্তি কান, মাঝে মাঝে এক-আধটা ভেজে খায়ও নিশ্চয়। আবার ধর কারো কান চাই, তাকে কান বিক্রি করে। সেই সময় ইংরেজদের রাজত্ব চলছে, ডানকান বলে একজন মন্ত্রী একানড়ের কাছে এলেন, তাঁর বাঁ-কানটা চাই। এরপর ছড়াটা শোন-

‘দেশ তখনও হয়নি স্বাধীন, মন্ত্রী ছিলেন ডানকান,
একবার কানপুরে এলেন কিনতে তাঁহার বাঁ-কান।
একানড়ে বললে দেখুন, সময় দিতে হবে
মন্ত্রীর কান আনতে হলে দিল্লি যেতে হবে।‘

- কানপুর আর দিল্লি কেন গো?
- ও বলিনি বুঝি? আসলে কানপুরে একানড়ের বিশাল কানের দোকান তো!

‘কানপুরেতে একানড়ের মস্ত বড় মকান,
হরেকরকম কানের সেথা কানোহারী দোকান।
কান-পাতলা সেখানে যায় কিনতে মোটা কান,
কানে খাটো কিনে আনে লম্বা দেখে কান।‘

ত কান কিনতে ডানকানকে কানপুরে আসতেই হল। কিন্তু মন্ত্রীরা তো দিল্লিতে থাকে, ওখানে রাজধানী কিনা! তাই একানড়ে অ্যাডভান্স কিছু টাকা নিয়ে দিল্লি ছুটল মন্ত্রীর কান আনতে। এর পরেই হল আসল মজাটা।

‘এই না বলে একানড়ে দিল্লি দিল হাঁটা,
ছ’দিন পরে ফিরে এল চক্ষু ভাঁটা-ভাঁটা।
বললে কেঁদে, নিন ফিরিয়ে আপনার টাকাটা,
মন্ত্রী হবার পরে ওদের সবার দু’কান কাটা!'

- যাঃ! দাদুর যত সব বাজে গল্প। এরকম আবার হয় নাকি?
- হয় গো হয়। আট্টু বড় হও, তবেই বুঝবে। তার আগে দিদিভাই, দুষ্টুমিটা একটু কমাও। আর হ্যাঁ, বাইরে খেলতে যাবার আগে মাথায় একটা স্কার্ফ পরে নিও, কানদুটো ভাল করে ঢেকে।

- ইঁ ইঁ ইঁ ইঁ!