Friday, July 23, 2021

অফিসের গল্প -৮ । দাদা।।

অফিসের গল্প (৮) 


দাদা।


'উঃ, লম্বা লাইন ছিল টেলারের কাউন্টারে'- সিনহাদা বন্ধ ভিজে ছাতাটা অফিসের কোনায় খুলে শুকোতে দিয়ে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন। 'হাজার টাকা তুলতে হাজারটা ঝামেলা' বলে আরেকবার নোটের বান্ডিলটা পকেট থেকে বের করে দেখে আবার ঢুকিয়ে রাখলেন। আমি একবার তাকিয়ে দেখে আবার হাতের ফাইলে মনোনিবেশ করলাম।
আশির দশকের গল্প। এটিএম কথাটা শোনা গেলেও বস্তুটি ভারতীয়রা তখনও চোখে দেখেনি। ব্যাঙ্ক কর্মচারিরা তখন যথেষ্ট চাপে থাকতেন আর মাঝে মাঝে রোয়াবও দেখাতেন বেশ। 'আরে!' হঠাৎ সিন্‌হাদা বলে উঠলেন, 'মনে হল একশ'র বান্ডিল ঢোকালাম পকেটে। কী সর্বনাশ!'
'কী হল, দাদা', আমি শুধোলাম।
'এই, তোমার ছাতা আছে? যাবে আমার সাথে একবার ব্যাঙ্কে? দেরি করলে আবার ট্রান্স্যাকশান আওয়ার বন্ধ হয়ে যাবে।'
'কেন, গোলমাল হয়েছে কিছু?'
'গোলমাল বলে গোলমাল! দশের বদলে একশ'র নোটের বান্ডিল ধরিয়ে দিয়েছে মেয়েটা ভুল করে। বেচারা মারা পড়বে একেবারে।' অগত্যা ছাতা হাতে আমরা দুজন আবার ব্যাঙ্কের কাউন্টারে।
সিন্‌হাদা মাস দুই হল কলকাতা অফিস থেকে বদলি হয়ে এসেছেন বোম্বে অফিসে। মধ্যবয়সী মানুষ, ছেলেমেয়েরা কলকাতায় পড়াশুনা করে বলে আমাদের মেসবাড়ি আলো করে একাই থাকেন আর অবসর সময়ে ব্রিজ খেলেন আমাদের সাথে। হিন্দি এমনিতেই কম বোঝেন, মুম্বাইয়া হিন্দি তো আরো ভয়ংকর।
মেয়েটা প্রথমে কিছুই বোঝেনি ব্যাপারটা। সে তো শোনেই না কিছু- 'আপনি আগে নোট গুণে নেননি কেন, এখন আর কিছু করা সম্ভব নয়। হ্যাঁ হ্যাঁ, যান ম্যানেজারের কাছে, কোই পরোয়া নেহি!'
'আরে হাম বোলতা কম, তোম শুনতা বেশি।' দমদম-মার্কা অননুকরণীয় হিন্দিতে সিন্‌হাদা বোঝাতে গেলেন। 'তেমনি মাংতা কম, দেতা বেশি! এইঠো এক হাজার হ্যায় না দশ হাজার? তোমকো তিনমাসকা মাইনে কাটা জায়েগা ম্যানেজার কো বোলেগা তো!'
এইবার দাদার ওই ভাঙা হিন্দি বক্তব্য মরাঠি মেয়েটার মাথায় ঢুকল। না, ও কোন ধন্যবাদ দেয়নি পরিবর্তে। বরং কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে এসে সিন্‌হাদার পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল।

kabitaashram@gmail.com, Amit Saha Editor www.kabitaashram.com

অফিসের গল্প- ৯ লাঠি।।

 অফিসের গল্প-

লাঠি।।

পিনাকীদার লেখা পড়ে বন্ধুরা খনিজ তেলের অনুসন্ধান নিয়ে হয়ত কিছু জেনেছেন ইতিমধ্যে, না জেনে থাকলেও আমার এ বিষয়ে মুখ খোলার তেমন অধিকার নেই। আমি মাটি খোঁড়ার মিস্ত্রি, ভূগর্ভশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত মানুষেরা যে জায়গাটা দেখিয়ে দেন, সেখানে একটা পরিমাণ-মতো গর্ত খুঁড়ে তেল উৎপাদনের পথ তৈরি করে দিই মাত্র। এই খোঁড়াখুড়ি শুরু করার আগে ল্যান্ড একুইজিশন, সিভিল ও ইলেকট্রিক ইঞ্জিনীয়াররাও যথেষ্ট সাহায্য করেন আমাদের।
১৯৯৯ সালের একটা দিনে আমাদের কারাইকাল(পণ্ডিচেরি) অফিসের বাইরের দোকানে চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছি সিভিলের বন্ধু তন্ময় বাসুর সঙ্গে। এমন সময় একজন অন্ধ ভদ্রলোক লাঠিটা হাতড়ে আমাদের কাছে এসে প্রজেক্ট হেডের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। তামিল হলেও ইংরেজি বলেন ভালই, বললেন এক্সপ্লোরেশনের ব্যাপারে কথা বলতে চান। আমরা ভাবলাম, একটু মজা দেখা যাক, প্রোজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন না, ড্রিলিংএর হেড নাম্বুদ্রির কাছে নিয়ে এলাম ওঁকে।
সেখানে এসে ভদ্রলোক যা বললেন, শুনে তো আমাদের চোখ কপালে। ওঁর লাঠির সাহায্যে এক বিশেষ অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার বলে উনি নাকি মাটির নীচে জলের উপস্থিতির কথা বলে দিতে পারেন। এই ক্ষমতা জানার পর থেকে এলাকার গ্রামবাসীরা মাটির নীচে জলের সন্ধানের জন্যে ওঁকে নিয়ে যান, বলতে গেলে এটাই ওঁর পেশা। এখন উনি এই ক্ষমতা খনিজ তেলের সম্বন্ধে খাটে কিনা তা একটু পরখ করে দেখতে চান। এ ক্ষেত্রে তিনি কোন পারিশ্রমিক নেবেন না, শুধু সাহায্য চান। আমরা যেখানকার তথ্য জানি সেরকম কোন স্থানে যদি নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করার কোন সুযোগ দেওয়া হয়, খুব খুশি হতেন!
নাম্বুদ্রি সাহেব ঠিক বিশ্বাস করতে না পারলেও কৌতূহলী হলেন। আমি এধরণের কিছু আধিভৌতিক হাতুড়ে ওঝার কথা পড়েছিলাম জোনাথন ব্ল্যাকের 'অয়েল' উপন্যাসে, তবে এখানে তেমন কাউকে দেখতে পাব আশা করিনি। যাহোক মি: নাম্বুদ্রি ভদ্রলোককে নিরাশ করলেন না, হয়ত জিনিষটা সম্পর্কে তাঁর নিজেরও কিছুটা আগ্রহ ছিল। তাই তন্ময়কেই দায়িত্ব দিলেন গাড়িতে করে ওঁকে কোন তৈলকূপে নিয়ে যেতে। আমিও চললাম সঙ্গে।
'এই যে স্যার, কমলাপুরম এসে পড়েছি আমরা। নিন আপনার যন্তরটা বের করুন'- তন্ময় বলে। এখানে কদিন আগেই তেল পাওয়া গেছে, পরীক্ষার উপযুক্ত জায়গা। ভদ্রলোক ডাক শুনেই গাড়ি থেকে নেমে লাঠি হাতড়ে এগিয়ে চললেন। এ কি! উনি তো দেখছি রিগের দিকে যাচ্ছেনই না, সাইটের গেটে না ঢুকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে এগিয়ে চলেছেন। আমি ইশারায় তন্ময়কে চুপ করতে বলে ওনাকে ফলো করতে লাগলাম। প্রায় আধ কিলোমিটার হেঁটে একটা পুকুরের ধারে এসে থামলেন ভদ্রলোক। 'সামনে জল আছে মনে হচ্ছে, আর এগোতে পারছি না। তবে আমার যন্ত্র যা দেখাচ্ছে, তাতে মনে হয় সামনেই কোথাও মাটির নীচে তেলের ভাণ্ডার আছে। পুকুরের তলায় থাকাও বিচিত্র নয়।'
'হয়েছে, ওঝাগিরি শেষ', তন্ময় হেসে বলল, 'চল অফিস ফিরি- এনার মুরোদ জানা গেল।' আমরা ফেরার পথ ধরলাম।
'ভদ্রলোক কিন্তু একশ ভাগ ঠিক বলেছেন, তন্ময়', আমি গাড়িতে চেপে বাংলায় বললাম। কমলাপুরমে টেস্টিং-এ হাইড্রোকার্বন পাওয়া গেছে বটে, কিন্তু রিজার্ভয়েরের ট্র্যাপটা আসলে জলের তলেই। জলের উপর রিগ বসবে না বলে আমরা ডেভিয়েটেড ড্রিলিং করেছি।'
নাম্বুদ্রি সাহেব সব কথা শুনে ভদ্রলোককে চা আর ইডলি খাইয়ে বিদায় দিলেন। একটা বিজনেস কার্ড ধরিয়ে দিয়ে উনি বিদায় নিলেন। লোকটা চলে যেতেই নাম্বুদ্রি কার্ডখানা ছিঁড়ে ওয়েস্ট বিনে ফেলে দিলেন। 'কি করলেন, স্যার', তন্ময় হাঁ হাঁ করে উঠল, 'এরকম একটা প্রতিভা!'
'আমাদের এই কোম্পানীতে অন্তত: হাজারখানেক এক্সপ্লোরেশন জিওলজিস্ট আর জিওফিজিসিস্ট আছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মোটা মোটা বই পড়ে, অনেক খেটে-খুটে ডিগ্রী নিয়েছেন, তারপরেও ফীল্ডে পরিশ্রম করেছেন। তাদের সবাইকে কি তাহলে একটা করে লাঠি ধরিয়ে দেব বলতে চাও?' মুচকি হেসে কফিতে চুমুক দিলেন উনি।
আমরা দুজনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

Friday, June 18, 2021

ব্যাঙের ছাতা- ছড়া

 ব্যাঙের ছাতা


কহিল হবু, শোনগো গবু রায়
ব্যাঙেরা কাল ডেকেছে সারা রাত্র,
বুঝিবা তারা ভিজেছে খালি গায়
কালকে তুমি কিনিয়া দেহ ছত্র।
আমরা সবে আরামে ঘরে থাকি
প্রাণীর প্রতি নাহি মোদের দৃষ্টি,
রাত্রি-ভোর ব্যাঙেরা চলে ডাকি
মুষলধারে পড়িছে যবে বৃষ্টি।
রাজ্যে সবে বলিবে মোরে যা-তা,
শীঘ্র তুমি কিনিয়া দাও ছাতা।

মন্ত্রী ভাবে, এই না হলে রাজা?
ভেকের তরে কত না তাঁর চিন্তা
ঘর ডুবেছে, কাঁদছে কত প্রজা
দেখেন কভু? ভাবেন কোন দিন তা
পৌষে যবে ফসল আসে ঘরে
প্রজারা সুখে করিছে গান-বাজনা,
তহুশিলদার পৌঁছে যায় দ্বারে
ঠ্যাঙায়ে তারা আদায় করে খাজনা।
সেসব কথা মাথায় থাকে কার?
ভিজিছে ব্যাঙ কর রে প্রতিকার!

মন্ত্রী ভাবে রাত্রি জেগে জেগে 
রাজার কাজে কিছুই নাহি যুক্তি
বোঝাতে গেলে হঠাৎ যান রেগে
ঝামেলা থেকে কেমনে পাই মুক্তি!
ছাতা নাহয় কিনতে হবে মেলা
ব্যাঙের তরে সংখ্যা যত লাগে
কিন্তু কত? নয় তো ছেলেখেলা!
ব্যাঙ-গণনা করতে হবে আগে।
আদেশ পেয়ে হাজার কর্মচারি
পড়ল লেগে করতে ভেক-সুমারি।

ক'দিন পরে রাজসভাতে এসে
হবুচন্দ্র হেঁকে বলেন সবে, 
ব্যাঙের দল যদি হবুর দেশে
সর্দিজ্বরে মরিতে থাকে তবে।
পণ্ডিতেরে মাইনে কেন দেওয়া?
তাড়ায়ে দিব সবারে ঘাড় ধরে-
বন্ধ হলে ব্যাঙের পোকা খাওয়া
ফসল সব মরবে ক্ষেত জুড়ে।
রাজকোষেতে খাজনা যদি কমে
সবারে বেঁধে ভেট চড়াব যমে।

গবুচন্দ্র ভেকসুমারি শেষে
রাজসভাতে করিল পেশ অদ্য,
সতেরো লাখ ব্যাঙ রয়েছে দেশে,
পোকা-মাকড় খাইয়া বাঁচে সদ্য।
সতেরো লাখ ছাতা কিনিতে হবে,
রাজকোষেতে ফুরায়ে যাবে টাকা
কহেন রাজা, কর বাড়াও তবে
সহিব ক্ষতি এমন নহি বোকা!
মন্ত্রী তুমি হয়েছ কেন তবে?
পারিষদেরা নাড়িল মাথা সবে।

ব্যাঙের ছাতা কিনিতে বাড়ে ট্যাক্সো
এমন কথা শুনেছে কেউ কোথা?
মাথা পিছু যে লাগিবে টাকা এক শো
ভাবিয়া হল সবার মাথাব্যথা।
কাঁদিয়া প্রজা না পায় কেহ কুল,
ঘরে সবার বন্ধ হল রান্না,
পণ্ডিতেরা ছেঁড়ে মাথার চুল,
রাস্তাঘাটে উঠিল রোল কান্নার।
ভাবিনু কিছু, অনেক করি যত্ন
সভার মাঝে কহে তর্করত্ন।

পুকুরপাড়ে চলিল মিলি সবে
ফুটিয়া আছে কত ব্যাঙের ছাতা,
দেখুন গুনে, তার্কিক কন তবে 
প্রতি ব্যাঙের যাবেই ঢেকে মাথা!
একেকখানা ব্যাঙকে যদি ধরো
বসিয়ে দাও প্রতি ছাতার নীচে
নিরর্থক টাকা খরচ করো,
প্রজার কেন কষ্ট বাড়ে মিছে?
মন্ত্রী ভাবে, কাটমানির হিসেব
করেছিলাম, জলে গেল সবই সে! 

কিন্তু কাজ এতই নাকি সোজা?
ধরতে ব্যাঙ প্রায় সতেরো লক্ষ
ডোবায়-বিলে ফেলতে হবে গো জাল
তিন হাজার ধীবর এল দক্ষ!
পুকুর-বিল হইল তোলপাড়,
মরিল কত মাছ আর জলজন্তু
কাদায় কাদা হইল চারিধার
ব্যাঙের দল দেয়না ধরা কিন্তু।
হেন সময় পথিক এল রাজ্যে
বিজ্ঞানী সে, এসেছে কোন কার্যে।

পথিক কহে, মুর্খ হলে রাজা
প্রজার মাথে বুদ্ধি থাকে বাকি?
বাস জলে যার তাহার জলে ভেজা!
গাছের থেকে পক্ষী পড়ে নাকি?  
শুনেছ কেউ মাছেরা জলে ডুবে
মরেছে কভু? তেমনি ব্যাঙ ভিজে? 
প্রজারা কহে, আমাদের কী হবে? 
রাজা এসব বুঝিবেন কি নিজে?
পথিক বলে, সে দায়িত্ব আমার
নেই প্রয়োজন কারোর মাথা ঘামার।

পরদিবসে বন্ধ ঘরে গিয়া
হবু-গবুর সঙ্গে সে বিজ্ঞানী
বকযন্ত্রে রসায়নী বিক্রিয়া   
ব্যাঙের ছাতা দিয়ে দেখান তিনি।
বোঝান সবে, ছত্রাক নয় ছাতা
প্রোটিন নামে খাদ্যসার তাতে,
ব্যাঙের নাহি রক্ষা করে মাথা
বুদ্ধি বাড়ে মাখিয়া খেলে ভাতে।
প্রোটিন খেলে শক্তি হবে আরো
কোন ক্ষতিই হবে না তাতে কারো।

ব্যাঙের ছাতা ব্যাঙের কিছু নয়!
এমনধারা নূতন কথা শুনি
প্রজাকূলের ভাঙিয়া গেল ভয়
অবাক হল সকল জ্ঞানীগুণী।
পরিবেশের রাখিতে ভারসাম্য
বিজ্ঞানী সকলকে দেন শিক্ষা
হোক সে জন শহুরে কিবা গ্রাম্য
পঞ্চভূতে করিতে হবে রক্ষা।
জলেতে করে মণ্ডূকেরা বাস
ডাঙার পরে ছত্রাকেরি চাষ!

প্রজার সুখে রাজার জয়কার
বিনা জুলুমে বাড়িয়া চলে খাজনা
খাদ্য লয়ে মিটিল হাহাকার
রাজ্যে বাজে আনন্দেরি বাজনা।
হবুচন্দ্র সভায় আসি কহে
মন্ত্রীসনে করেছি এক ফন্দি
বিজ্ঞানী এ রাজ্যে যাতে রহে
আজকে তারে করিতে হবে বন্দি
বাজিল কাড়া-নাকাড়া আর সানাই
বিজ্ঞানী আজ হল রাজার জামাই!   



   


Monday, June 7, 2021

 

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী।


গল্পকে গল্প বলে মনে করলে আর ঝামেলা থাকে না, কিন্তু জীবন গল্পের নিয়মে নয়, বরং বিজ্ঞানের নিয়মেই চলে। গল্পকথাকে জীবনে স্থান দেওয়ার মতো বিপজ্জনক বস্তু আর নেই।

Saturday, May 29, 2021

উকিল ও গামছা

 উকিল ও গামছা।

(স্মৃতিকথা)

আমার ঠাকুর্দা ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় পাবলিক প্রসিক্যুটার ছিলেন পুরুলিয়ার জাজেস কোর্টে। তাঁর পিতৃদেব পুলিশ সুপার তেজচন্দ্র সারাজীবনের উপার্জনে নিজের গ্রামে প্রচুর ভূ-সম্পত্তি কিনে জমিদার হয়েছিলেন। এই জমিদারি রক্ষা করার সুবিধের জন্যে তেজচন্দ্র তাঁর বড় ছেলে হরিপদকে পুলিশের চাকরি নিতে উৎসাহিত করেন। ভোলানাথের ঝোঁক ছিল সাহিত্য আর গানবাজনায়। এম-এ পাশও করেছিলেন। কিন্তু সম্পত্তি-রক্ষার জন্যে পরিবারে একজন উকিল চাই, তাই বাবা-দাদার চাপে আইন পাশ করে প্র্যাকটিস শুরু করেন। তাঁর বিয়েও হয় বর্ধমানের(পরে পুরুলিয়া-রঘুনাথপুর) উকিল বিনোদবিহারী চক্রবর্তীর মেয়ে প্রভাবতীর সঙ্গে। ভোলানাথের সরকারি উকিল হিসেবে খ্যাতি তখন তুঙ্গে, ৮০% জয় পিপি’র পক্ষে একটা রেকর্ড- এমতাবস্থায় বেনারসের সঙ্গীত-সমাজ তাঁর পাখোয়াজ শুনে ‘বাদ্য-বিদ্যাসাগর’ উপাধি দিয়ে বসল। সেইসাথে কাশীপুরের তৎকালীন মহারাজার সনির্বন্ধ অনুরোধে পুরুলিয়া জেলার ভাষা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস উদ্ধারের গবেষণার কাজে তিনি লেগে পড়লেন, ভাষাচার্য সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের সাহায্যে এই কাজে নিয়োজিত করলেন নিজেকে।
সঙ্গত কারণেই ওকালতি মাথায় উঠল। পি-পি’র চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে প্রাইভেট প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। সেখানেও বিপত্তি। দাদু আজ এখানে কাল সেখানে সংগীতচর্চা আর গবেষণার কাজে ছুটে বেড়ান আর মক্কেল বাসায় এসে অপেক্ষা করে ফিরে যায়। ফলে জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর নাম যত ছড়াতে থাকে, উকিল হিসেবে পসার তত পড়তে থাকে। ইতিমধ্যে তিনি ষাট বছরে পদার্পণ করলেন, বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে সম্বর্ধনা দেবার দিন ঘোষণা করলেন আর ওকালতি নয়, সব কাজ থেকে অবসর নিয়ে গবেষণা-পত্রগুলো এবার শেষ করবেন। ইতিমধ্যে হিন্দিতে তাঁর দুটি বই ‘মানভঞ্জন কাব্য’ আর ‘রাধাভিসার’ প্রকাশিত হয়েছে, বাংলায় ‘মানভঞ্জন’, ‘পঞ্চকন্যা’ আর ‘দানবীর’ প্রকাশের মুখে। ‘পুরুলিয়া জেলার গ্রাম্যভাষা-তত্ত্ব’, ‘সংগীতের তাল’ আর ‘মানভূমের ঝুমুর’ নিয়ে লেখালেখি আর গবেষণা চলছে।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্যত্র। আমাদের পুরুলিয়া (তখন ধানবাদকে নিয়ে মিলিত জেলা মানভূম) জেলা অনুন্নত, অবহেলিত। বিহার কয়লার লোভে ধানবাদকে কেড়ে নিয়েছে, পুরুলিয়া নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। ১৯১২ সাল থেকে ভাষা-আন্দোলন চলতে থাকলেও পশ্চিম বঙ্গও এ নিয়ে কোন আগ্রহ দেখায় না, বিধান রায়কে বাদ দিলে তাঁর মন্ত্রীমণ্ডলের অনেকে হয়ত জানেনই না যে মানভূম জেলার প্রায় ৭৩% বঙ্গভাষী আর ১৬% কুর্মি, আদিবাসী আর ওড়িয়া। বিহারী ১১%এর বেশী নয়, অথচ অবলীলাক্রমে জেলাটি দান করা হল বিহারকে। যাই হোক, ধানবাদ মহকুমায় তবু কয়লা আছে, পুরুলিয়ায় তাও নেই। একফসলি পাথুরে জমি, সেচের ব্যবস্থা নেই, পাঞ্চেত জলাধার তখনও নির্মীয়মান। তাই গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত চাষী আর কৃষিজীবি শ্রমিকদের পৌষ থেকে জৈষ্ঠ্য প্রায় কোন কাজই থাকে না, কুলিগিরি, বেগার খাটা আর রেল ওয়াগন থেকে কয়লা চুরিই তাদের জীবিকা হয়ে দাঁড়ায় সেই সময়টুকুতে। বর্গা-ভাগচাষ তখনও শুরু হয়নি। আমাদের জমিতে চাষ করে যে মজুর-মুনিষরা, তাদেরও একই অবস্থা। এরকম এক সময় রাতের অন্ধকারে রেল-ওয়াগন থেকে কয়লা চুরি করতে গিয়ে আমাদের এক হতদরিদ্র ক্ষেত-মজুর ধরা পড়ল। পুলিশ দেখে মাথার ঝুড়ি ফেলে পালাচ্ছিল, পুলিশ ছুটে গিয়ে তাকে বাড়ি পর্যন্ত তাড়া করে ধরে, পরদিন আদালতে হাজির করা হবে। মজুরটির পরিবার দাদুর কাছে এসে কেঁদে পড়ে, কিছু একটা করে যেন ছাড়ান হয় তাকে। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে দাদুর ফীস পাবার কোন প্রশ্নই নেই।
কী মুশকিল! হাতেনাতে ধরা পড়েছে, তাকে ছাড়াতে হবে। দাদু তখন কোর্ট থেকে প্রায় পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছেন। অথচ গরিব মানুষটার জন্যে কিছু না করলেও নয়! অগত্যা কেসটা উনি নিলেন। সেদিন বিকেলের দিকে চিন্তিত মনে তিনি বাজারের দিকে গেলেন, তারপর হাজতে গিয়ে মজুরটির, যার নাম রবি বাউরি, সঙ্গে দেখা করে কিছু নির্দেশ দিলেন।
পরদিন কেস কোর্টে উঠল, রবি বাউরি বনাম বেঙ্গল-নাগপুর রেলওয়ে, আদ্রা ডিভিশন। রুকনি-আনাড়া রুটে রেলের ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াগন থেকে কয়লা চুরির অভিযোগ। রবিকে বিচারকক্ষে আনা হল, পরণে খাটো ধুতি, ময়লা গেঞ্জি, গলায় একটা লাল গামছা। ও ত শেখানো বুলি ধরে প্রথমেই সব অভিযোগ অস্বীকার করল। ‘হুজুর আমি ঘরে শুয়েছিলাম, পুলিশ এসে ধরল। কয়লা চুরির আমি কিছুই জানিনা ধম্মাবতার, আমার বাপও জম্মে কখনও চুরি করে নাই।‘ এদিকে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী কনেস্টবলটি হলফ করে বলছে তাকে ছুটে পালানোর সময় বাউরিপাড়ার একটি গলি থেকে ধরা হয়। ‘দেখুন হুজুর, আসামীর গায়ে এখনও কয়লা লেগে আছে।‘
এবার দাদুর সওয়ালের পালা। ‘আপনি কি নিশ্চিত যে এই সেই লোক যে কয়লা চুরি করছিল?’
- ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, দেখুন না, ওর গায়ে, কাপড়ে এখনও কয়লা লেগে আছে।‘
- ‘ধর্মাবতার, গরীব মানুষের জামাকাপড় নোংরা হয়েই থাকে। তার জন্যে কাউকে চোর বলে দাগানো যায় না।‘ এর পর পুলিশকে- ‘আচ্ছা, আপনারা যখন ওকে কয়লা চুরি করতে দ্যাখেন, এই গামছাটি কোথায় ছিল?’
- ‘কেন হুজুর, ওর মাথায়, পাগড়ির মত করে পরেছিল!’
দাদুর অনুরোধে পুলিশ থেকে বাকি দুজন প্রত্যক্ষদর্শী কনেস্টবলদেরও এজলাসে আনা হল একে একে। প্রতি সাক্ষীকে দাদু একই প্রশ্ন করলেন। উত্তরে একজন বলল, গামছাটা কোমরে জড়ানো ছিল; অন্যজন বলল- এরকম কোন গামছা ছিলই না আসামীর সঙ্গে। সাক্ষ্য শেষ হল।
এবার উকিল ভোলানাথের বক্তব্য বিচারকের প্রতি। ‘ধর্মাবতার, চুরি হয়েছে, পুলিশের কাজ চোর ধরা। রবি ঠাকুরের গানে আছে- ‘চোর চাই, যে করেই হোক, চোর চাই হোক না সে যে কোন লোক।‘ তাই তারা সঙ্গতকারণেই একজন নিরপরাধ গরীব মানুষকে তার বাসা থেকে চোর বলে আদালতে
এনে হাজির করেছে।‘
-‘আসামী পক্ষের ল'ইয়ার কিভাবে এতটা নিশ্চিত হলেন যে আসামী চোর নয়?’ সরকারি উকিল প্রতিবাদ করলেন। ‘কুলি-মজুর-ছিঁচকে চোরদের কাছে একটা গামছা থাকেই, ওর কাছেও ওই গামছাটি ছিল। এখন সেটা কোথায় কিভাবে ছিল, তা মনে রাখা কি এতই জরুরি?’
- ‘তাহলে স্বীকার করছেন যে গামছাটা ছিল? ধর্মাবতার, গামছাটা আমি গতকাল বিকেলে পুরুলিয়ার বাজার থেকে কিনে ওকে দিয়ে আসি, এই তার রশিদ। গামছাতে লেবেল এখনও আছে, তাতে দোকানের নাম আর দাম মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। অতএব প্রমাণ হচ্ছে যে রবি বাউরি নির্দোষ, রেল পুলিশের লোক অন্য কাউকে চুরি করতে দেখে তাড়া করে। তাকে অন্ধকারে চিনতে না পেরে আমার মক্কেলটিকে ধরে নিয়ে আসে।‘
নিশ্চিত তথ্যপ্রমাণের অভাবে রবি বাউরি বেকসুর খালাস পায়, তারপরে আজীবন সে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আমাদের জমিজমার তত্ত্বাবধান করেছে। তবে এই মামলার পরে দাদুর আর অবসর নেওয়া হয়নি তখন, এত গরীব মানুষের কেস আসতে শুরু করেছিল।

নন্দিনী ও বিশুপাগলা

"নন্দিনী ও বিশুপাগলা"



আমার বয়েস তখন পাঁচ, বাড়িতে ভাড়াটে এল। মা অসুস্থ বলে দাদু-ঠাম্মার কাছে গ্রামেই থাকি, ক'দিন আগেই ভর্তি হয়েছি সেখানকার পাঠশালায়। দাদু মানে আমার ঠাকুরদা পুরুলিয়া জেলা আদালতে পাবলিক প্রসিক্যুটারের পোস্ট থেকে অবসর নেওয়ার পরেও ব্যক্তিগত ওকালতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে ইদানীং সে প্র্যাকটিশও প্রায় ছেড়ে গবেষণামূলক লেখালেখি শুরু করায় বাইরের ঘর-দুটো খালি পড়ে থাকে বলে ঠাকুমার জেদাজেদিতে তিনি ভাড়াটে বসাতে রাজী হয়েছেন।

মিহির আচার্য ও বাসন্তী, নববিবাহিত দম্পতি। মিহিরকাকু গ্রামের পোস্ট অফিসে সহকারী পোস্টমাস্টার। মিহিরকাকু স্ত্রীকে বাসন্তী নামেই ডাকেন, আমার দাদু- ঠাকুমাও তাই। খুব রূপসী না হলেও সুশ্রীই বলা যায় কাকীকে। আমাকে কিন্তু উনি প্রথমেই বলেছিলেন, 'এই, আমার নাম কিন্তু নন্দিনী, আর কাকুর নাম রঞ্জন।' আমি বলতাম, 'ধ্যেৎ, তুমি বাসন্তী।' আমার কী দোষ, এক তো আমি রক্তকরবী পড়ি নি, আর কারো এতগুলো নাম হতে পারে সেসব আমি কি করে বুঝব!  

কিন্তু দিনে দিনে কাকীর আরো অনেক গুণ প্রকাশ পেতে থাকল। গ্রামের মেয়েরা ওঁর কথাবার্তা চালচলনে, সাজসজ্জার আধুনিকতায় রীতিমত ফ্যান হয়ে পড়ল। একদিন কাকীর বাক্স থেকে বেরোল একটা রংচটা খাতা আর একটা সিংগল রীড হারমোনিয়ম। যেসব গান রেডিও ছাড়া কখনও শোনা যায় না- যেমন 'ওই সুরভরা দূর নীলিমায়', 'এই সুন্দর স্বর্নালি সন্ধ্যায়' এইসব অবলীলাক্রমে গেয়ে যেতেন। আবার দাদুর পায়ের শব্দ শুনতেই 'মহারাজ একি সাজে' ধরে ফেলতেও দ্বিধা করতেন না। মিহিরকাকু দিনভর কাজ করেন আর সন্ধ্যেয় দু-চারজনকে ট্যুশন পড়ান বাড়ির বারান্দায় বসে। অন্দরমহল থাকে আমার ও কাকীর দখলে। নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। দুঃখ দুটি, প্রেম বিবাহ, তাও অসবর্ণ (কাকী বিয়ের আগে ছিলেন গুপ্ত, ওঁর গানের খাতায় নাম লেখা দেখেছি) বলে কোন পক্ষই বাড়ি থেকে মানেনি, তার ফলে ওঁদের আত্মীয় স্বজন থেকেও ছিল না। আর বাসন্তী নামটা কাকীর পছন্দ ছিল কিনা জানিনা, কিন্তু জানিনা কেন কেউ ওঁকে নন্দিনী নামে ডাকত না, মিহিরকাকুও নয়। বাসন্তীকাকী আমাকে আবার বিশুপাগলা বলে একটা অদ্ভুত নামে ডাকতেন। আমার এসব ভাল লাগতনা, কিন্তু স্নেহের ডাক ভেবে মেনে নিয়েছিলাম। তখন ছোট ছিলাম বলে অনেক কিছুই বুঝতাম না, আজ ভাবতে বসলে মাথায় ঢোকে যে কাকীর একটা স্বপ্নবিলাসী মন ছিল, যাতে তিনি নিজের মধ্যেই যেন রক্তকরবীর অভিনয় করে যেতেন। মিহিরকাকু ছিলেন নির্বিরোধী ভালমানুষ, সেইসঙ্গে ভীতুর ডিম একটি। একবার একতলার ঘরে আরশুলা ঢুকেছে, ঠাকুমা চেঁচাচ্ছেন- 'মিহির, দেখছ কি, মারো ওটাকে!' আর কাকু তখন খাটের উপর দাঁড়িয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে বোঝাচ্ছেন- 'ভয় পাবেন না জ্যেঠিমা, ওনারা কামড়ান না।' শেষে কাকীই ওটাকে ঝাঁটাপেটা করে শেষ করল।

সহজেই বোঝা যায় যে মিহিরকাকু এই স্বপ্নবিলাসের কিছুই বুঝত না, আর বুঝলেও পাত্তা দিত না। এই নিয়ে বড় দুঃখ ছিল কাকীর। আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন, 'রঞ্জনটা বেরসিক, তুই আমাকে লাল করবী ফুল এনে দিতে পারবি রে বিশু?' আমি তো করবীই চিনি না তায় লাল! বাড়িতে জবা আর সন্ধ্যামণি ফুটত তাই এনে দিতাম- বাসন্তীকাকী তাতেই খুশী। 
 
পল্লীগ্রামের ছোট্ট পুকুরে ঢেউ উঠতে যেমন সময় নেয়না, তা মিলিয়ে যেতেও তেমনি দেরী হয়না। কিন্তু এবার প্রথম ঢেউয়ের ধাক্কা পাড়ে এসে লাগার আগেই আরেকটা বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল গ্রামের মাটিতে। বন-ভোজন! কাকী গ্রামের ছেলে-মেয়ে সবাইকে নাচিয়েছেন পৌষ-পয়লায় এবার হবে পৌষালু, ডিভিসির পরিত্যক্ত বাগানে। আমার ঠাকুমার ফুল সাপোর্ট। কিন্তু পঞ্চায়েতের মাথা মাথা লোকেদের মহা আপত্তি। ধাড়ি-ধাড়ি ছেলেমেয়েদের একসাথে ফূর্তি-আমোদ! সব এক কথায় নাকচ হয়ে গেল। কাকীও ছাড়ার পাত্রী নন, ছেলেছোকরাদের ভোট তাঁর দিকে। তবু সুবিধে হচ্ছে না। শেষে কী খেয়াল হওয়ায় আমি বললাম, 'কাকী, তুমি দাদুকে ধরো'। দাদু শুনে বললেন, 'এই কথা! তা এতে আপত্তির কি আছে?' দাদু গ্রামের নাম-কে-ওয়াস্তে জমিদার হলেও উকিল আর পণ্ডিত মানুষ বলে একটা আলাদা ওজন ছিল। পঞ্চায়েতের দল তাঁর যুক্তি-তর্কের সাথে পারবে কেন? আমি ছুটতে ছুটতে এসে কাকীকে জড়িয়ে ধরে বললাম, নন্দিনীকাকী, ওরা রাজী হয়েছে।

'সে আমি জানতাম। জ্যেঠামশায় যখন আছেন, ওরা রাজী হবেই। কিন্তু তুই আমাকে কি বললি আরেকবার বল।' আমি বুঝতে পেরে কেন জানিনা আরো লজ্জা পেয়ে গেলাম। 'আমার রঞ্জন আমাকে যে নামেই ডাকুক, তুই আমাকে এবার থেকে নন্দিনীকাকীই বলবি, কেমন,' বাসন্তীকাকী বললেন।
আমি এবার খুশী হয়ে ঘাড় নাড়লাম।

Sunday, May 9, 2021

भिक्षुक || सूर्यकांत त्रिपाठी निराला ||

 

वह आता-

दो टूक कलेजे के करता
पछताता पथ पर आता।
पेट-पीठ दोनों मिलकर हैं एक,
चल रहा लकुटिया टेक,
मुट्ठीभर दाने को, भूख मिटाने को,
मुँह फटी पुरानी झोली को फैलाता
दो टूक कलेजे के करता
पछताता पथ पर आता।

साथ दो बच्चे भी हैं सदा हाथ फैलाये,
बायें से वे मलते हुए पेट चलते हैं,
और दाहिना दयादृष्टि पाने की ओर बढ़ाये।

भूख से सूख होंठ जब जाते,
दाता-भाग्यविधाता से क्या पाते
घूँट-आँसुओं के पीकर रह जाते हैं,
चाट रहे जूठी पत्तल वे
कभी सङक पर खड़े हुए,
और झपट लेने को उनसे कुत्ते भी हैं अड़े हुए।

ठहरो, अहो है मेरे हृदय में,
अमृत में सींच दूँगा
अभिमन्यु जैसे को सकोगे तुम
तुम्हारे दुख मैं अपने हृदय में खींच लूँगा।


সে আসে।
অসহ দুঃখে-তাপে হৃদয় বিদীর্ণ করে 
পথ ধরে আসে।

পেটে-পিঠে হয়েছে সমান
ক্ষুধার জ্বালায় ম্রিয়মান।
ভর দিয়ে চলে লাঠি পরে 
একমুঠি ভিক্ষা তরে
শতছিন্ন ঝুলিখানা অগ্রে মেলে ধরে
অসহ দুঃখে-তাপে হৃদয় বিদীর্ণ করে  
পথ ধরে আসে।

সঙ্গে চলে দুটি শিশু সদা হাত মেলে
বাম হাত বুলায় জঠরে
দক্ষিণ বাড়িয়ে ধরে দয়াদৃষ্টি তরে।

খিদেয় শুকনো ঠোঁটে
অন্নদাতা বিধাতার দ্বারে কী বা জোটে?
খিদে-তেষ্টা সব কি গো মেটে আঁখিজলে!
আস্তাকুঁড়ে উচ্ছিষ্ট ঘাঁটে
কুড়িয়ে পাতা সে চাটে  
সেখানে কুকুর সাথে কাড়াকাড়ি চলে!

দাঁড়াও, অমৃত-সিঞ্চিত করি
আমার হৃদয়াধার হতে
একা অভিমন্যু সম 
হৃদয় নিঙাড়ি
তোমার সকল ক্লেশ 
বক্ষমাঝে শুষে নিতে পারি।