Saturday, March 12, 2022

Sabari Chatterjee 
 ১) 
 আমার মায়ের সঙ্গে সর্বদাই ফিরত চারপাঁচটা রুমাল। প্রায় প্রতিটিরই চারটে কোনায় একটা করে গিঁট বাঁধা। কোনও জিনিস হারিয়ে গেলে- সে সাধারণ জিনিস হতে পারে বা জরুরী ডকুমেন্ট ধোপার হিসেবের খাতা বা ঠিকানা ফোন নাম্বার লেখা কোনো ডায়েরি- মাকে বললেই মা কি একটা বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে একটা গিঁট লাগাতেন। হারানো জিনিসটি ফিরে পাবার পর আবার মন্ত্র পড়ে গিঁট খুলতেন। সব সময়ই যে হারানো জিনিস পাওয়া যেতো তা নয় আবার অনেক সময়ই পাবার পরেও গিঁট খুলতে ভুলে যেতেন ফলে গিঁট থেকেই যেত। মা কিন্তু খুব উদার মনের মানুষ ছিলেন। বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে কালীঘাটের মন্দির হওয়া সত্বেও কোনও দিন মন্দিরে দেবীদর্শনে যাননি। শাঁখা পলা তো কোন দিনই পরেন নি। বাবার একবার অসুখ করায় "ঝামেলা মিটিয়ে রাখি"- বলে হাতের লোহা খুলে ফেলেছিলেন। বাবা,বলতে নেই, তারপরে আরও তিরিশ বছর বেঁচে ছিলেন। কুটকুট করে বলে বিয়ের চার বছর পরেই সিঁদুর পরা ছেড়ে দিয়েছিলেন। যদিও বাড়িতে কোনও পুজো হলে (লক্ষ্মী সরস্বতী সত্যনারায়ণ বা ইতু পুজো) খুব যত্ন করে পুজোর কাজ করতেন। মা চলে যাবার পর মায়ের আলমারি পরিস্কার করতে গিয়ে অনেক গুলো কোনে কোনে বাঁধা রুমাল পেলুম। কী খুঁজে পাবার জন্য গিঁট বেঁধে ছিলেন মা? তাঁর পাঁচ বছর বয়সে ভগবানের কাছে চলে যাওয়া মা? সাড়ে পাঁচ বছরে মায়ের পিছু পিছু স্বর্গে চলে যাওয়া বাবা? চল্লিশ বছরে চলে যাওয়া বড় আদরের বড় ভালোবাসার 'বড়দা'? নাকি একান্ত প্রিয় আরও দুজন মানুষকে?? কি জানি!!! 76 

 Bulan Chakraborty
 ২)
 উক্রেইন আর রাশিয়ার যুদ্ধের কথা সবারই জানা, নতুন ক'রে বলার কিছু নেই। যুদ্ধটা একটু থেমেও এসেছিল। আবার যুদ্ধ শুরু হয়েছে, কারনটা জানা আছে তোমাদের? আমি বলছি.......। চারিদিকে নানা রকম গোলা গুলির আওয়াজে একটা অন্তঃসত্ত্বা মুরগি দিনের পর দিন পালাতে গিয়ে হঠাৎই একটা premature ডিম প্রসব করে ফেললো। সেটাও কোন ব্যপার না, কিন্তু ঝামেলা অন্য যায়গায়। ডিমটা ভূমিষ্ঠ হয় ঠিক দুই দেশের সীমান্ত রেখায়। রাশিয়া বলে এ ডিম আমার, উক্রেইন বলে এ ডিম আমার। আবার যুদ্ধ। আসলে ডিমটা মুরগির। নিরর্থক যুদ্ধ। 81- VI 

 Apurva Boral
 ৩) 
 ঈশ্বরের ইচ্ছা শক্তি
 ......................... প্রথম হার্ট অ্যাটাক ধরা পড়ায় অ্যাপোলো থেকে ফিরে এলো। চিকিৎসা শুরু হল। প্রিয়তমার জিদে অভিভাবকরা অনিচ্ছায় বিয়ে দিল। সুস্থ। সুন্দর সংসার করছে গত তিন বৎসর ধরে। এতদিনে জানতে পারলাম... প্রতিদিন ভোর বেলায় একঘন্টা প্রাণায়াম, একঘন্টা বাথ টবে (40ডিগ্রী temp.) ডুবে থাকা, খাবার কেবল ফল ও মূল।। আর ঈশ্বরের উপর ভরসা। 76 

 Prabir Mukherjee 
 ৪)
 আতর 
 দাম মিটিয়ে বের হবার মুখে দোকানদার আমাকে হাত বাড়াতে বললেন। আমিও হাতটা বাড়ালাম। উনি আমার হাতের তালুতে ঘষে দিলেন খুব ছোট্ট একটা শিশির রোলিং মুখ। বললেন দুই হাতের তালু ঘষে নাকের সামনে এনে ঘ্রাণ নিতে। আমিও তাই করলাম। নাকের সামনে এনে ঘ্রাণ নিতেই মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। …চোখ বন্ধ হয়ে এলো, দূরে কোথায় যেন নুপুরের ছম ছম…… 80


 Bulan Chakraborty 
 ৫)
 বিহার, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগঢ় এর মতো আরও বেশ কিছু জায়গায় রাস্তায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কারন সবারই জানা। বৈদ্যুতিক গাড়ি। রাঙ্গামাটি জল ট্যাংকি থেকে চ্যাটার্জিস্যার এর ঘর পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ ঢালু। সেদিন আমাদের বন্ধু প্রদীপ মানে আমাদের সেই বাউন্ডুলে ধরনের "পদা" সাইকেলে করে ঢালুতে নেমেই চলেছে, রাস্তা কাটা গর্ত সামনে!!! ধূস...... ওরে পদা ব্রেক লাগা ব্রেক সামনে স্পিড ব্রেকার.......!!! দেখ কেমন পেরিয়ে এলাম দু দুটো বাধা।......... এবার ডিস্পেন্সারিটা পেরোলেই ডান দিকে ঘুরে বাঁ দিকে ঘুরলেই সোজা ল্যাংড়া পুল। ধড়াম........। একটা চার চাকা গাড়ি ধাক্কা মেরেছে পদার সাইকেলের পেছনের চাকায় আর ছিটকে পড়েছে পদা রাস্তার পাশে। মুহুর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনায় দুজনেই অবাক। রাম সিংজি নুতন একটা বিদ্যুত চালিত গাড়ি কিনেছেন, নম্বর প্লেট টা সবুজ রঙের। চলতে গিয়ে গাড়িটা কোন রকম শব্দ করেনা, তাই পদা বুঝতেই পারেনি যে ওর সাইকেলের পিছনে একটা গাড়ি আসছে। আর রাম সিংজি ও বুঝতে পারেননি যে হঠাৎ ক'রে পদা ডান দিকে ঘুরে যাবে। পদাতো চটপট উঠে পড়েছে। রামসিংজি ও গাড়ি থামিয়ে পদা কেমন আছে দেখছেন। পদা তো RML Typer ফুটবল ক্লাবের খেলোয়াড়। আর রাম সিংজি সেই ক্লাবের সম্পাদক। পদার সাইকেলের পেছনের চাকা তো আর গোল নেই একটা ত্রিমাত্রিক বাংলার ৪ এর আকার ধারণ করেছে। ঠেলে ঠেলে ও নিয়ে যাওয়ার মতো নেই। ওদিকে গাড়িটার ডান দিকে বেশ কিছুটা ঘষে যাওয়ার দাগ। ঈস্.... নতুন গাড়ি। 74

 Apurva Boral 
 ৬)
 বৌ স্নান করতে বাথরুমে ঢুকেছে সেই সুযোগে বউয়ের ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা সরিয়ে ড্রয়ারে রাখলাম। দু-দিন হয়ে গেছে, বউ ধরতে পারেনি। মনের আনন্দে ড্রয়ার খুললাম, টাকা গায়েব! 76 


 Bulan Chakraborty 
 ৭) 
 সরস্বতি পুজো ও আমার কুল খাওয়া। 
 সরস্বতি পুজোর আগে কুল খেতে নেই। খেলে পরীক্ষায় শূন্য। কিন্তু শামলাপুরের জঙ্গলের কুল গাছগুলোতো জানে না কবে পুজো। আজ ইস্কুল পালিয়েছি। ইস্কুলের জামা পরে শামলাপুর। হাফ প্যান্টের কোমোরের বোতাম আগেই ছিঁড়েছি, তাই বাঁ হাতটা সর্বদা প্যান্ট ধরে রাখতে ব্যস্ত, নতুবা মাধ্যকর্ষন শক্তি প্যান্টেই প্রয়োগ হয়। এক লাঠিতে অনেক কুল পড়েছে। আমি দু পা পুরো ছড়িয়ে ঝালনুন কুল খাচ্ছি, নতুবা আমার প্যান্ট মাধ্যাকর্ষন শক্তিতে সোজা গোড়ালিতে ঠেকবে। কুল গুলো পেকে কি সুন্দর টক্ ঝাল মিষ্টি। আহ্.......। 80 


 Debashis Das Mahapatra 
 ৮) 
 ডিভোর্স 
 "আমি যাবোনা.... যাবোনা কিছুতেই, না না আমি কিছুতেই যাবোনা তোমার সাথে.." বলতে বলতে হাতটা অনিমেষের হাত থেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। অনিমেষ নীলিমা কে কোলে তুলে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল, চোখেমুখে জলের ছিটে দিল। মুখটা মুছিয়ে দিল আলতো করে। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠলো। কেন সে অনিন্দিতার কথাটা জানালো নীলিমাকে? কিন্তু না জানিয়েও তো উপায় নেই! ডিভোর্সটা ওর চাই... নীলিমার জ্ঞান ফিরেছে, বিছানায় উঠে বসেছে, গলায় ঘৃণা বিদ্বেষ মেশানো কণ্ঠে বললো "যাও তোমায় আমি মুক্তি দিলাম" বলে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা ডিভোর্স পেপারটায় কাঁপা হাতে সই করে দিল। দোদোন দেরাদুনের আবাসিক স্কুল থেকে ছুটিতে বাড়ি এসেছে। মালা দেওয়া মাএর ছবিটার দিকে অপলক তাকিয়ে। দু চোখে অশ্রুবন্যা, নির্বাক..। 81- VI 


 ৯) দেবদর্শন 
 অনিমেষ ঘড়ি দেখলো, রাত দেড়টা, বাইরে অবিরাম বৃষ্টি, সদর দরজায় কেউ কড়া নেড়ে চলেছে। ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেল সে দরজার দিকে। শুধোল...কে? উত্তর এলো "আজ্ঞে একটু দরজাটা খুলুন না, একটু আশ্রয় নি? বাইরে যা দুর্যোগ। দূর্বাও উঠে এসেছে, হাতের ইশারায় শুধোল, কে? অনিমেষ দরজা টা খুলে দিল। দেখলো বাইরে কেউ নেই! "আরে ভাই কে ডাকছিলেন, কোথায় গেলেন?" কোনো সাড়া নেই। সে ভয় পেয়ে দরজাটা দুম করে বন্ধ করে দিল, হাত পা কাঁপছে, দরজায় আগল দিতেই পারছেনা.. দূর্বা আতঙ্কে জিজ্ঞেস করছে "কী গো কী হলো? তুমি ওরম করছো কেন?" নিজেকে সামলে নিয়ে কোনোরকমে বললো "বাইরে কেউ কড়া নেড়ে বললো একটু আশ্রয় দেবার কথা, কিন্তু বাইরে তো কেউ নেই".... ঘরের ভেতর থেকে কেউ গমগমে শব্দে বলে উঠলো "আমি ভেতরেই আছি"... বিস্ফরিত চোখে তারা যা দেখল! অবিশ্বাস্য!!! জটাজুট ধারী পিঙ্গল বস্ত্র পরিহিত, এক হাতে ত্রিশুল অন্য হাতে ডম্বরু, ত্রিনয়ন অর্ধ নিমিলিত...... ব্যাস আর কিছু মনে নেই। 77 


 Anjonn Gangopadhyay 
 ১০)
 সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে। 
 বন্ধুদের হোয়াটসএপ গ্রুপে সবাইকে নিয়ম করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই। অভ্যেসবসত ১২ই অক্টোবরও সকালে ম্যাসেজ পাঠাই, শুভ জন্মদিন চম্পক। মাঝরাতে হোয়াটসএপ আসে। দেখি লেখা "থ্যাংক ইউ, ভাল থাকিস"। অচেনা নম্বর, কোন ডিপি নেই। বুকটা কেন জানিনা ধড়াস করে উঠল, প্রত্যুত্তরে লিখি, কে আপনি? ম্যাসেজ ডেলিভার হয়না। পরদিন নম্বরটায় ফোন করি, ওপার থেকে সাড়া আসে, দিস নম্বর ডাস নট এক্সিস্ট। হঠাৎ কেমন যেন খটকা লাগে, শেষ চারটে সংখ্যা, ০৩০৩৩। রাতে পুরোনো টেলিফোন ডাইরিটা বার করি, নম্বরটা চম্পকের। ও মারা যাওয়ার মাস দুয়েক পরে ফোনের কনটাক্ট থেকে ডিলিট করে দিয়েছিলাম। 83- IV 



 Anupam Chatterjee
 ১১)
 বম্বিং 
-------- স্ত্রী ও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে একটা ভাড়া বাড়ীতে উঠেছে বিজয় ! হার্লে কনট্র্যক্ট লেবারের কাজে জয়েন করেছে সে ৷ আজ রাতে শুতে শুতে ওদের প্রায় 11টা বেজে গেল , টিভিতে " রুশ-ইউক্রেন " রোমাঞ্চকর ননস্টপ সিনেমা চলছে যে !! হঠাৎ ধড়াম করে বোমা ফাটার শব্দ !!! ধড়মড়িয়ে উঠলো বিজয় ! বেচারা বৌটা উঠতে গিয়ে..খাট থেকেই ধড়াম ! মেয়েটাও ঘাবড়ে গিয়ে শুরু করে দিয়েছে... ভ্যাঁএঁএঁএঁ ! তবে কি WW-3 শুরু হয়ে গেল ??? মিসাইল অ্যাটাক ??? লাইট জ্বালালেও প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলোনা বিজয় ! একটু পরে বুঝলো ... ..সাইকেলের ড্যামেজ চাকাটা বার্স্ট করেছে !!! 84- III 

 ১২)
 আতঙ্ক 
*******
 কয়েক মাস খুবই অশান্তির মধ্যে আছে তপন! পুরোনোটা ছেড়ে নতুন কম্পানী জয়েন করেছে সে! মায়ের শরীরটাও ঠিক নেই , ডাক্তার সোনোগ্রাফী করতে বলেছেন , তাছাড়া নিজেরও প্রোস্টেটের সমস্যা, PSA কাউন্ট 6.1 !! তাই ডাক্তার তাকে বায়োপ্সী করতে বলেছেন! বায়োপ্সী....!! আতঙ্কে তপনের ওজন 10কেজি কমে গেছে! আজ বিকেলে দুটো রিপোর্টই পেয়ে যাবে ! প্রচন্ড আতঙ্কের মধ্যে সে প্রথমে নিজের রিপোর্টাই খুললো! না...কোন ম্যালিগনেন্সী নেই! মাথার উপর থেকে যেন একটা ভারী বোঝা নেমে গেল! এরপর মায়ের USG রিপোর্টে দেখলো পেটে অ্যাসাইটিস ফ্লুইড জমেছে!!! 79 


 Apurva Boral 
 ১৩) 
 চোর
 --------- 
সিন্দ্রির ঐ ছোট্ট এল টাইপ ঘরে অঞ্জলী...শাশুড়ি আর দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে দিব্যি সুখে দুঃখে দিন কাটছিল। স্বামী কাজের সূত্রে প্রায় বাইরে। তিন মাস পর 10দিনের ছুটিতে আসেন.. দেখেন... বিজয়ী হয়ে যান। অঞ্জলীর শাশুড়ি রাতে ঘুমাতে পারেনা। অঞ্জলীকে মাথা টিপে দিতে বললো। দরজা খোলা পেয়ে চোর মাথা টিপে দিয়ে সব নিয়ে উধাও। সকালে অঞ্জলী...শাশুড়িকে, শাশুড়ি.... অঞ্জলীকে দোষারোপ করার ফলে স্বামীর প্রাইভেট চাকরিটাও Sag হয়ে গেলো।। 76 

 ১৪) 
 "সাসপেন্স" 

বাসায় কেউ নেই। বৌ, ছেলেমেয়েরা বাপের বাড়ি মৌতর গেছে।একা একা লাগছে। মোবাইল ফোনে একটা ভুতের সিনেমা দেখলাম। এখন আর একা লাগছেনা। মনে হচ্ছে রান্নাঘরে কেউ একজন আছে। গা ছমছম করে উঠলো। বিছানা থেকে নামতেই.... নাহ্ , বাকিটা সাসপেন্স ই থাক।। 81- VI 

 ১৫) 
 ভালো লাগা আর রেগে যাওয়া হঠাৎ করে হয়। আমার কিন্তু ওদের শাশুড়িকে একটুও ভালো লাগেনি। আমার মতে শাশুড়িরা লুকিয়ে আছে সব বউদের অন্তরে.. নাহলে ৮ বছর প্রেম করে বিয়ের পর থেকে শাশুড়ি তিল তিল করে ওদের দুজনের মাঝে ভাঙ্গন ধরিয়ে এখন বলে.... ""তোমরা মিলে মিশে থাকো না কেনো?"" 83- IV 

 ১৬) 
 "জামাই" 
 সুন্দরী শহরে নিজেদের দুটি বাড়ি রেখেও অপু আজ শ্বশুর বাড়ি থাকে কারণ, স্ত্রী সোনালী একসময়তো নিজের "পাপা কি পরি" ছিলো । আর অপু.....? সেও তো রাজ্য হারা রাজপুত্র...! অনেকেরই মতে অপু কোনও রজ্যহারা রাজপুত্র তাজপূত্র লয়। বরং অন্ত্মসম্মানবোধহীন, মেরুদণ্ডহীন পুরুষ মাত্র... তাতে অপুর কিছু যায় আসে না।। গুপ্তধনতো আছে সোনালীর কাছে আর তার স্বাদ নিতে অপু ঘুরছে স্ত্রী সোনালীর পিছে... পিছে, চায় না হাত ছাড়া করতে।। 82- V

 ১৭) 
 আশংকা
 -------------- 
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সবাইকে জানাই আমার শুভেচ্ছা। ছোটভাই সপরিবারে ইংল্যান্ডে। আশংকায় থাকি ভাতিজা বাংলা শিখবে কি না! সেদিন ফোনে ভাতিজার কণ্ঠে,"" জ্যেঠু পণাম.... অমি হন্দল (হন্দলা ) বলছি বাবা বাথরুমে সিন্যাছে"" ..শুনে আবেগে আপ্লূত! জয় হোক আমার মাতৃ ভাষা 78 


 Purnima Chakraborty 
 ১৮) 
 অবিশ্বাস্য 
 পলাশ স্টেশনে বসে অপেক্ষায় আছে লোকাল ট্রেনের।বেলুড় যাবে ।এমন সময় তার বন্ধু অমল পিঠ চাপড়ে বলল--" তোকে কতদিন পর দেখলাম বলত? চল একটু গল্প করা যাক্ ।" পলাশ--"না রে ট্রেনে মিস করব।" অমল--" পরের ট্রেনে যাস।অনেক দিন পর দেখা হল, না বলিস না।" অনেক কথা হলো দুজনের ।পলাশের ফিরতে রাত হল।বাড়ি ফিরতেই জানতে পারলো অমল মারা গেছে কাল দিল্লিতে রোড অ্যাক্সিডেন্টে।" পলাশ অবাক হল।মনে মনে ভাবল --" একটু আগে যার সাথে সময় কাটালাম সে তবে কে ছিল?" 85- II 

 ১৯) 
 মাণিক 
 সাতসকালে বস্তির লোকেদের ঘুম ভাঙ্গলো কুকুরের ঘেউঘেউ চিৎকারে আর শিশুর কান্নায়। সবাই গিয়ে দেখে একটা শিশু কাপড়ে মোড়া, কাঁদছে । শিশুটিকে ঘরে এনে দুধ খাওয়াতে ঘুমিয়ে পড়ল ।বস্তিতেই আশ্রয় পেল ।তার নাম রাখল মাণিক ।দেখতে দেখতে বড় হল ।অসৎ সঙ্গে মিশে একটি পকেটমার তৈরি হল।একদিন এক পুলিশ অফিসার সিদ্ধার্থ মন্ডলের পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়ল।অফিসার তাকে নিয়ে গেলেন নিজের বাসায়।স্কুলে ভর্তি করলেন । সে বড় হতে লাগল ।আজ সেও একজন পুলিশ অফিসার মাণিক মন্ডল।তার জীবনটাই পাল্টে গেল। 84- III


 Tapas Chakraborty 
 ২০) 
 ধার
 আজ সুব্রতর ফোনটা পেয়ে মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। ও প্রমোশন পেয়ে কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে। ২০২০ তে করোনা কালে ওর চাকরিটা চলে যায়। প্রায় ৯ টা মাস বসে থাকতে হয়। অনেকগুলো দিনই প্রায় না খেয়ে কাটাতে হয়। খুব ভেঙে পড়ে ও। হঠাৎ একদিন আমার সাথে দেখা হয়ে যায়। বাড়িতে নিয়ে আসি ওকে। খাবার খেতে খেতে অনেক গল্প হয়। তারপর ওকে আর একলা ছাড়িনি। ইউটিউব এ অনেক মোটিভেশনাল ভিডিও দেখাতে থাকি ওকে। ওর প্রোডাক্ট লাইন এর ও অনেক ভিডিও দেখতে থাকে। মনের জোর অনেক টাই ফিরে পায়। আস্তে আস্তে চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়া শুরু করে। প্রথমে একটা ছোটো কোম্পানি তে তার পর আস্তে আস্তে বড় কোম্পানিতে চান্স পায়। ২০২২ এর ফেব্রুয়ারি তে প্রমোশন পেয়ে কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়ে যায়। কারুর অসময় এ টাকা পয়সা নয় একটু মনের জোর যদি ধার দেওয়া যায় তাহলেও কারুর জীবন বদলে দেওয়া যেতে পারে। 81- VI 


 Abhijit Sen 
 ২১)
 সুপর্না ভিনিৎসিয়া(ইউক্রেন) মেডিক্যালে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বাবা বোকারো ইস্পাতের কোক ওভেনে কর্মী। ছোট থেকে জিপ্রোকক্স (ইউক্রেন)নাম শুনেছে জ্ঞান বিজ্ঞানের দেশ। একমাস আগেও রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধটা হাসি ঠাট্টার বিষয় ছিল। হঠাৎ এক রাতে বোমার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। পরদিনই হুলুস্থুল কান্ড। ইউক্রেন ছেড়ে দেশে ফিরতে হবে। পরদিনই ব্যাগপত্র নিয়ে জনাপঞ্চাশ ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী বেরিয়ে পড়ল ভারতের উদ্দেশ্যে। কলেজের বাস ছেড়ে দিল রোমানিয়া বর্ডারে। আরো ১০ কিলোমিটার হেঁটে পার হতে হবে বর্ডার। কাঁধে বোঁচকা নিয়ে এগিয়ে গেল তারা। সঙ্গে বিস্কুট আর জল। হঠাৎ পথিমধ্যে ঘিরে ধরলো রুশ সেনা। মেয়েদের ছেড়ে দিল। কিন্তু ছেলেদের আটকে দিল। ছেলেরা হৈচৈ করতেই রাইফেলের বাট দিয়ে সজোরে মারধর শুরু। যথেষ্ট চোটপেয়ে ছেলেরা হাতে পায়ে ধরে আই কার্ড দেখিয়ে ছাড়া পেল। কিছু ইউক্রেন বাসী তারা চুপিচুপি দেশ ছেড়ে পালাচ্ছিল, ধরা পড়ে গেল। রুশ সেনা সবার চোখের সামনে তাদের দড়িতে বেঁধে মাটিতে শুইয়ে তাদের ওপর মিলিটারি ট্রাক চালিয়ে দিল। রক্তগঙ্গা বয়ে গেল। চোখের সামনে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হল সুপর্না ও সহপাঠীরা। পরে কোনরকমে দেশে মা-বাবার কাছে ফিরে আজও তার ঘুম আসেনা! সভ্য দেশের মানুষ এত নৃশংস হয়!!! (সত্য ঘটনা অবলম্বনে) 81- VI 


 Kajal Chatterjee 
 ২২)
 হাতের লেখা 
 লেখিকা-কাজল চ্যাটার্জী 
 মীনা আর শ্যামলী নবম শ্রেণীর ছাত্রী ।বাংলার ক্লাস টেস্ট এ যতই ভাল লিখুক শ্যামলী মীনার চেয়ে কম নম্বর পায় , কারণ টা বুঝতে পারে না ।একদিন বলে - আমি মীনার চেয়ে খারাপ লিখি না,তবে কম নম্বর পাই কেন? দিদিমণি ছাত্রীর মুখপানে চেয়ে বললেন- ওর হাতের লেখা ভাল তাই বেশী নম্বর পায় । শ্যামলী হাতের লেখা নিয়ে যত্নশীল হয়ে পড়ল। কিছুদিন পর শ্যামলীর হাতের লেখা দেখে দিদিমণি অবাক হযে বললেন- আমার বিশ্বাস,তুমি স্কুল ফাইনাল এ খুব ভাল ভাবে উত্তীর্ণ হবে । 79 


 Sabari Chatterjee 
 ২৩) 
 ভাইঝির বিয়েতে পৌঁছে রিকশা থেকে নামতেই শাড়ির অনেকটা ছিঁড়ে গেল বুঝলেন সবিতা। বিয়ের সময়কার শাড়ি। বাবার অবস্থা ভালো ছিলো না। অতি জ্যালজেলে বেনারসী। স্বামীর অবস্থাও ভালো ছিলো না। ছেলেমেয়ে ছোট থাকতে থাকতেই মারা গেলেন। অনেকগুলো টিউশন করে হিসেব করে সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়েকে মানুষ করে তুললেন। আজ তারা দাঁড়িয়ে গিয়েছে। প্রয়োজন মত সব কিছুরই ব্যবস্থা করে। কিন্তু খুব দামী শাড়ির কথা ওঁর মনে হয়নি। ওদেরও খেয়াল হয়নি। শাড়ীটা কোনক্রমে জড়িয়ে বিয়েবাড়ি পৌঁছলেন। দাদার বিরাট ব্যবসা। কিন্তু সবিতার সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ রাখেন নি। সবিতাও চেষ্টা করে নি। বিয়ে বাড়ি ভর্তি চেনা শোনা আত্মীয়। কিন্তু কয়েকজন ছাড়া কেউই খুব একটা এগিয়ে এলো না। গরীব আত্মীয়কে সবাই এড়িয়ে চলে। এমনকি যারা চা কফি স্টার্টার দিচ্ছিল তারাও দু'একবার মাত্র ওঁকে অফার করল। ওরা জানে কাকে পাত্তা দিতে হয় না। একাই বসে আছেন। বিয়ে হচ্ছে। যখন সিঁদুর দানের সময় হল তখন ব্যাগ থেকে একটা হীরের আংটি বের করে বরের হাতে দিয়ে বললেন "আমার মামার বাড়ি ছিলো জমিদার বংশ। আমার মা'র বড় ইচ্ছে ছিলো এই আংটি দিয়ে যেন তাঁর নাতনি কে সিঁদুর পরানো হয়।" বলে বরের হাতে আংটি টা দিলেন। বরের হাতে পঞ্চাশ লাখ টাকার হীরের আংটি ঝিকমিক করতে লাগলো। 81 - VI 


 Anupam Chatterjee 
 ২৪) 
 স্ট্যান্ড !! কেউ খুব জোরে চিৎকার করে উঠলো রাস্তার পাস থেকে ! কিন্তু সদ্য কেনা নতুন স্পোর্টস বাইকটা এতটাই স্পীডে চালাচ্ছিলো রাহুল যে ঐ কথাটা তার কানেই গেলনা ! কিছুটা দুরে আরও একজন সাবধান করলো "স্ট্যান্ড উঠা লিজিয়ে " ! এবারেও কথাটা কান অবদি পৌছলোনা রাহুলের ! রাহুলের নজর স্পীডোমিটারে ! স্পীড 70 Kmh ! সামনের মোড়ে বাঁদিকে ঘুরতে হবে , তাই রাহুল একটু গতি কমিয়ে বাঁদিকে হ্যান্ডেলটা ঘোরালো ! ব্যাস !! রাস্তায় প্রচন্ড ভাবে নেমে থাকা সাইড স্যান্ডটা ধাক্কা খেল... ! এর পরের দৃশ্যটা অনুমান করার দায়িত্বটা ছেড়ে দিচ্ছি পাঠকের ওপরে !! 83- IV 


 Purnima Chakraborty 
 ২৫) 
 সরস্বতী পূজো । পূর্ণিমা চক্রবর্তী 

 প্রচলিত আছে সরস্বতী পূজোর দিন পড়তে নেই,সব বইখাতা ঠাকুরের কাছে রাখতে হয়।আমার পরশু অঙ্ক পরীক্ষা, ম্যাট্রিক ফাইনাল, না পড়লে পরীক্ষা দেব কিকরে? রাতে বই খুলে বসলাম ,সেই দেখে বোন বলল--"মা সরস্বতী রাগ করবেন, তুই নির্ঘাত ফেল করবি।" মনে মনে ভয় পেলাম, কিন্তু বসে যখন পড়েছি তখন যা হবার হবে । সে সময় নিউজ পেপার এ রেজাল্ট বেরোতো ।দেখলাম ফার্স্ট ডিভিশন এ পাশ করেছি।আমার বোন বলল--" এবার থেকে সেদিন আমি ও পড়ব।" 87-I 



 প্রথম- Purnima Chakraborty সরস্বতী পুজো ৮৭/১০০ দ্বিতীয়- Purnima Chakraborty অবিশ্বাস্য ৮৫/১০০ তৃতীয়- Anupam Chatterjee বম্বিং ৮৪/১০০ Purnima Chakraborty মাণিক চতুর্থ- Anjonn Gangopadhyay সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে ৮৩/১০০ Apurva Boral ভাল লাগা Anupam Chatterjee স্ট্যান্ড পঞ্চম- Apurva Boral জামাই ৮২/১০০ Bulan Chakraborty নিরর্থক যুদ্ধ। বিশেষ- Debashis Das Mahapatra ডিভোর্স ৮১/১০০ Apurva Boral সাসপেন্স Tapas Chakraborty ধার Abhijit Sen যুদ্ধের গল্প Sabari Chatterjee হীরের আংটি

Friday, July 23, 2021

অফিসের গল্প -৮ । দাদা।।

অফিসের গল্প (৮) 


দাদা।


'উঃ, লম্বা লাইন ছিল টেলারের কাউন্টারে'- সিনহাদা বন্ধ ভিজে ছাতাটা অফিসের কোনায় খুলে শুকোতে দিয়ে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন। 'হাজার টাকা তুলতে হাজারটা ঝামেলা' বলে আরেকবার নোটের বান্ডিলটা পকেট থেকে বের করে দেখে আবার ঢুকিয়ে রাখলেন। আমি একবার তাকিয়ে দেখে আবার হাতের ফাইলে মনোনিবেশ করলাম।
আশির দশকের গল্প। এটিএম কথাটা শোনা গেলেও বস্তুটি ভারতীয়রা তখনও চোখে দেখেনি। ব্যাঙ্ক কর্মচারিরা তখন যথেষ্ট চাপে থাকতেন আর মাঝে মাঝে রোয়াবও দেখাতেন বেশ। 'আরে!' হঠাৎ সিন্‌হাদা বলে উঠলেন, 'মনে হল একশ'র বান্ডিল ঢোকালাম পকেটে। কী সর্বনাশ!'
'কী হল, দাদা', আমি শুধোলাম।
'এই, তোমার ছাতা আছে? যাবে আমার সাথে একবার ব্যাঙ্কে? দেরি করলে আবার ট্রান্স্যাকশান আওয়ার বন্ধ হয়ে যাবে।'
'কেন, গোলমাল হয়েছে কিছু?'
'গোলমাল বলে গোলমাল! দশের বদলে একশ'র নোটের বান্ডিল ধরিয়ে দিয়েছে মেয়েটা ভুল করে। বেচারা মারা পড়বে একেবারে।' অগত্যা ছাতা হাতে আমরা দুজন আবার ব্যাঙ্কের কাউন্টারে।
সিন্‌হাদা মাস দুই হল কলকাতা অফিস থেকে বদলি হয়ে এসেছেন বোম্বে অফিসে। মধ্যবয়সী মানুষ, ছেলেমেয়েরা কলকাতায় পড়াশুনা করে বলে আমাদের মেসবাড়ি আলো করে একাই থাকেন আর অবসর সময়ে ব্রিজ খেলেন আমাদের সাথে। হিন্দি এমনিতেই কম বোঝেন, মুম্বাইয়া হিন্দি তো আরো ভয়ংকর।
মেয়েটা প্রথমে কিছুই বোঝেনি ব্যাপারটা। সে তো শোনেই না কিছু- 'আপনি আগে নোট গুণে নেননি কেন, এখন আর কিছু করা সম্ভব নয়। হ্যাঁ হ্যাঁ, যান ম্যানেজারের কাছে, কোই পরোয়া নেহি!'
'আরে হাম বোলতা কম, তোম শুনতা বেশি।' দমদম-মার্কা অননুকরণীয় হিন্দিতে সিন্‌হাদা বোঝাতে গেলেন। 'তেমনি মাংতা কম, দেতা বেশি! এইঠো এক হাজার হ্যায় না দশ হাজার? তোমকো তিনমাসকা মাইনে কাটা জায়েগা ম্যানেজার কো বোলেগা তো!'
এইবার দাদার ওই ভাঙা হিন্দি বক্তব্য মরাঠি মেয়েটার মাথায় ঢুকল। না, ও কোন ধন্যবাদ দেয়নি পরিবর্তে। বরং কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে এসে সিন্‌হাদার পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল।

kabitaashram@gmail.com, Amit Saha Editor www.kabitaashram.com

অফিসের গল্প- ৯ লাঠি।।

 অফিসের গল্প-

লাঠি।।

পিনাকীদার লেখা পড়ে বন্ধুরা খনিজ তেলের অনুসন্ধান নিয়ে হয়ত কিছু জেনেছেন ইতিমধ্যে, না জেনে থাকলেও আমার এ বিষয়ে মুখ খোলার তেমন অধিকার নেই। আমি মাটি খোঁড়ার মিস্ত্রি, ভূগর্ভশাস্ত্রবিদ পণ্ডিত মানুষেরা যে জায়গাটা দেখিয়ে দেন, সেখানে একটা পরিমাণ-মতো গর্ত খুঁড়ে তেল উৎপাদনের পথ তৈরি করে দিই মাত্র। এই খোঁড়াখুড়ি শুরু করার আগে ল্যান্ড একুইজিশন, সিভিল ও ইলেকট্রিক ইঞ্জিনীয়াররাও যথেষ্ট সাহায্য করেন আমাদের।
১৯৯৯ সালের একটা দিনে আমাদের কারাইকাল(পণ্ডিচেরি) অফিসের বাইরের দোকানে চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছি সিভিলের বন্ধু তন্ময় বাসুর সঙ্গে। এমন সময় একজন অন্ধ ভদ্রলোক লাঠিটা হাতড়ে আমাদের কাছে এসে প্রজেক্ট হেডের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। তামিল হলেও ইংরেজি বলেন ভালই, বললেন এক্সপ্লোরেশনের ব্যাপারে কথা বলতে চান। আমরা ভাবলাম, একটু মজা দেখা যাক, প্রোজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন না, ড্রিলিংএর হেড নাম্বুদ্রির কাছে নিয়ে এলাম ওঁকে।
সেখানে এসে ভদ্রলোক যা বললেন, শুনে তো আমাদের চোখ কপালে। ওঁর লাঠির সাহায্যে এক বিশেষ অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার বলে উনি নাকি মাটির নীচে জলের উপস্থিতির কথা বলে দিতে পারেন। এই ক্ষমতা জানার পর থেকে এলাকার গ্রামবাসীরা মাটির নীচে জলের সন্ধানের জন্যে ওঁকে নিয়ে যান, বলতে গেলে এটাই ওঁর পেশা। এখন উনি এই ক্ষমতা খনিজ তেলের সম্বন্ধে খাটে কিনা তা একটু পরখ করে দেখতে চান। এ ক্ষেত্রে তিনি কোন পারিশ্রমিক নেবেন না, শুধু সাহায্য চান। আমরা যেখানকার তথ্য জানি সেরকম কোন স্থানে যদি নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করার কোন সুযোগ দেওয়া হয়, খুব খুশি হতেন!
নাম্বুদ্রি সাহেব ঠিক বিশ্বাস করতে না পারলেও কৌতূহলী হলেন। আমি এধরণের কিছু আধিভৌতিক হাতুড়ে ওঝার কথা পড়েছিলাম জোনাথন ব্ল্যাকের 'অয়েল' উপন্যাসে, তবে এখানে তেমন কাউকে দেখতে পাব আশা করিনি। যাহোক মি: নাম্বুদ্রি ভদ্রলোককে নিরাশ করলেন না, হয়ত জিনিষটা সম্পর্কে তাঁর নিজেরও কিছুটা আগ্রহ ছিল। তাই তন্ময়কেই দায়িত্ব দিলেন গাড়িতে করে ওঁকে কোন তৈলকূপে নিয়ে যেতে। আমিও চললাম সঙ্গে।
'এই যে স্যার, কমলাপুরম এসে পড়েছি আমরা। নিন আপনার যন্তরটা বের করুন'- তন্ময় বলে। এখানে কদিন আগেই তেল পাওয়া গেছে, পরীক্ষার উপযুক্ত জায়গা। ভদ্রলোক ডাক শুনেই গাড়ি থেকে নেমে লাঠি হাতড়ে এগিয়ে চললেন। এ কি! উনি তো দেখছি রিগের দিকে যাচ্ছেনই না, সাইটের গেটে না ঢুকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে এগিয়ে চলেছেন। আমি ইশারায় তন্ময়কে চুপ করতে বলে ওনাকে ফলো করতে লাগলাম। প্রায় আধ কিলোমিটার হেঁটে একটা পুকুরের ধারে এসে থামলেন ভদ্রলোক। 'সামনে জল আছে মনে হচ্ছে, আর এগোতে পারছি না। তবে আমার যন্ত্র যা দেখাচ্ছে, তাতে মনে হয় সামনেই কোথাও মাটির নীচে তেলের ভাণ্ডার আছে। পুকুরের তলায় থাকাও বিচিত্র নয়।'
'হয়েছে, ওঝাগিরি শেষ', তন্ময় হেসে বলল, 'চল অফিস ফিরি- এনার মুরোদ জানা গেল।' আমরা ফেরার পথ ধরলাম।
'ভদ্রলোক কিন্তু একশ ভাগ ঠিক বলেছেন, তন্ময়', আমি গাড়িতে চেপে বাংলায় বললাম। কমলাপুরমে টেস্টিং-এ হাইড্রোকার্বন পাওয়া গেছে বটে, কিন্তু রিজার্ভয়েরের ট্র্যাপটা আসলে জলের তলেই। জলের উপর রিগ বসবে না বলে আমরা ডেভিয়েটেড ড্রিলিং করেছি।'
নাম্বুদ্রি সাহেব সব কথা শুনে ভদ্রলোককে চা আর ইডলি খাইয়ে বিদায় দিলেন। একটা বিজনেস কার্ড ধরিয়ে দিয়ে উনি বিদায় নিলেন। লোকটা চলে যেতেই নাম্বুদ্রি কার্ডখানা ছিঁড়ে ওয়েস্ট বিনে ফেলে দিলেন। 'কি করলেন, স্যার', তন্ময় হাঁ হাঁ করে উঠল, 'এরকম একটা প্রতিভা!'
'আমাদের এই কোম্পানীতে অন্তত: হাজারখানেক এক্সপ্লোরেশন জিওলজিস্ট আর জিওফিজিসিস্ট আছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মোটা মোটা বই পড়ে, অনেক খেটে-খুটে ডিগ্রী নিয়েছেন, তারপরেও ফীল্ডে পরিশ্রম করেছেন। তাদের সবাইকে কি তাহলে একটা করে লাঠি ধরিয়ে দেব বলতে চাও?' মুচকি হেসে কফিতে চুমুক দিলেন উনি।
আমরা দুজনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

Friday, June 18, 2021

ব্যাঙের ছাতা- ছড়া

 ব্যাঙের ছাতা


কহিল হবু, শোনগো গবু রায়
ব্যাঙেরা কাল ডেকেছে সারা রাত্র,
বুঝিবা তারা ভিজেছে খালি গায়
কালকে তুমি কিনিয়া দেহ ছত্র।
আমরা সবে আরামে ঘরে থাকি
প্রাণীর প্রতি নাহি মোদের দৃষ্টি,
রাত্রি-ভোর ব্যাঙেরা চলে ডাকি
মুষলধারে পড়িছে যবে বৃষ্টি।
রাজ্যে সবে বলিবে মোরে যা-তা,
শীঘ্র তুমি কিনিয়া দাও ছাতা।

মন্ত্রী ভাবে, এই না হলে রাজা?
ভেকের তরে কত না তাঁর চিন্তা
ঘর ডুবেছে, কাঁদছে কত প্রজা
দেখেন কভু? ভাবেন কোন দিন তা
পৌষে যবে ফসল আসে ঘরে
প্রজারা সুখে করিছে গান-বাজনা,
তহুশিলদার পৌঁছে যায় দ্বারে
ঠ্যাঙায়ে তারা আদায় করে খাজনা।
সেসব কথা মাথায় থাকে কার?
ভিজিছে ব্যাঙ কর রে প্রতিকার!

মন্ত্রী ভাবে রাত্রি জেগে জেগে 
রাজার কাজে কিছুই নাহি যুক্তি
বোঝাতে গেলে হঠাৎ যান রেগে
ঝামেলা থেকে কেমনে পাই মুক্তি!
ছাতা নাহয় কিনতে হবে মেলা
ব্যাঙের তরে সংখ্যা যত লাগে
কিন্তু কত? নয় তো ছেলেখেলা!
ব্যাঙ-গণনা করতে হবে আগে।
আদেশ পেয়ে হাজার কর্মচারি
পড়ল লেগে করতে ভেক-সুমারি।

ক'দিন পরে রাজসভাতে এসে
হবুচন্দ্র হেঁকে বলেন সবে, 
ব্যাঙের দল যদি হবুর দেশে
সর্দিজ্বরে মরিতে থাকে তবে।
পণ্ডিতেরে মাইনে কেন দেওয়া?
তাড়ায়ে দিব সবারে ঘাড় ধরে-
বন্ধ হলে ব্যাঙের পোকা খাওয়া
ফসল সব মরবে ক্ষেত জুড়ে।
রাজকোষেতে খাজনা যদি কমে
সবারে বেঁধে ভেট চড়াব যমে।

গবুচন্দ্র ভেকসুমারি শেষে
রাজসভাতে করিল পেশ অদ্য,
সতেরো লাখ ব্যাঙ রয়েছে দেশে,
পোকা-মাকড় খাইয়া বাঁচে সদ্য।
সতেরো লাখ ছাতা কিনিতে হবে,
রাজকোষেতে ফুরায়ে যাবে টাকা
কহেন রাজা, কর বাড়াও তবে
সহিব ক্ষতি এমন নহি বোকা!
মন্ত্রী তুমি হয়েছ কেন তবে?
পারিষদেরা নাড়িল মাথা সবে।

ব্যাঙের ছাতা কিনিতে বাড়ে ট্যাক্সো
এমন কথা শুনেছে কেউ কোথা?
মাথা পিছু যে লাগিবে টাকা এক শো
ভাবিয়া হল সবার মাথাব্যথা।
কাঁদিয়া প্রজা না পায় কেহ কুল,
ঘরে সবার বন্ধ হল রান্না,
পণ্ডিতেরা ছেঁড়ে মাথার চুল,
রাস্তাঘাটে উঠিল রোল কান্নার।
ভাবিনু কিছু, অনেক করি যত্ন
সভার মাঝে কহে তর্করত্ন।

পুকুরপাড়ে চলিল মিলি সবে
ফুটিয়া আছে কত ব্যাঙের ছাতা,
দেখুন গুনে, তার্কিক কন তবে 
প্রতি ব্যাঙের যাবেই ঢেকে মাথা!
একেকখানা ব্যাঙকে যদি ধরো
বসিয়ে দাও প্রতি ছাতার নীচে
নিরর্থক টাকা খরচ করো,
প্রজার কেন কষ্ট বাড়ে মিছে?
মন্ত্রী ভাবে, কাটমানির হিসেব
করেছিলাম, জলে গেল সবই সে! 

কিন্তু কাজ এতই নাকি সোজা?
ধরতে ব্যাঙ প্রায় সতেরো লক্ষ
ডোবায়-বিলে ফেলতে হবে গো জাল
তিন হাজার ধীবর এল দক্ষ!
পুকুর-বিল হইল তোলপাড়,
মরিল কত মাছ আর জলজন্তু
কাদায় কাদা হইল চারিধার
ব্যাঙের দল দেয়না ধরা কিন্তু।
হেন সময় পথিক এল রাজ্যে
বিজ্ঞানী সে, এসেছে কোন কার্যে।

পথিক কহে, মুর্খ হলে রাজা
প্রজার মাথে বুদ্ধি থাকে বাকি?
বাস জলে যার তাহার জলে ভেজা!
গাছের থেকে পক্ষী পড়ে নাকি?  
শুনেছ কেউ মাছেরা জলে ডুবে
মরেছে কভু? তেমনি ব্যাঙ ভিজে? 
প্রজারা কহে, আমাদের কী হবে? 
রাজা এসব বুঝিবেন কি নিজে?
পথিক বলে, সে দায়িত্ব আমার
নেই প্রয়োজন কারোর মাথা ঘামার।

পরদিবসে বন্ধ ঘরে গিয়া
হবু-গবুর সঙ্গে সে বিজ্ঞানী
বকযন্ত্রে রসায়নী বিক্রিয়া   
ব্যাঙের ছাতা দিয়ে দেখান তিনি।
বোঝান সবে, ছত্রাক নয় ছাতা
প্রোটিন নামে খাদ্যসার তাতে,
ব্যাঙের নাহি রক্ষা করে মাথা
বুদ্ধি বাড়ে মাখিয়া খেলে ভাতে।
প্রোটিন খেলে শক্তি হবে আরো
কোন ক্ষতিই হবে না তাতে কারো।

ব্যাঙের ছাতা ব্যাঙের কিছু নয়!
এমনধারা নূতন কথা শুনি
প্রজাকূলের ভাঙিয়া গেল ভয়
অবাক হল সকল জ্ঞানীগুণী।
পরিবেশের রাখিতে ভারসাম্য
বিজ্ঞানী সকলকে দেন শিক্ষা
হোক সে জন শহুরে কিবা গ্রাম্য
পঞ্চভূতে করিতে হবে রক্ষা।
জলেতে করে মণ্ডূকেরা বাস
ডাঙার পরে ছত্রাকেরি চাষ!

প্রজার সুখে রাজার জয়কার
বিনা জুলুমে বাড়িয়া চলে খাজনা
খাদ্য লয়ে মিটিল হাহাকার
রাজ্যে বাজে আনন্দেরি বাজনা।
হবুচন্দ্র সভায় আসি কহে
মন্ত্রীসনে করেছি এক ফন্দি
বিজ্ঞানী এ রাজ্যে যাতে রহে
আজকে তারে করিতে হবে বন্দি
বাজিল কাড়া-নাকাড়া আর সানাই
বিজ্ঞানী আজ হল রাজার জামাই!   



   


Monday, June 7, 2021

 

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী।


গল্পকে গল্প বলে মনে করলে আর ঝামেলা থাকে না, কিন্তু জীবন গল্পের নিয়মে নয়, বরং বিজ্ঞানের নিয়মেই চলে। গল্পকথাকে জীবনে স্থান দেওয়ার মতো বিপজ্জনক বস্তু আর নেই।

Saturday, May 29, 2021

উকিল ও গামছা

 উকিল ও গামছা।

(স্মৃতিকথা)

আমার ঠাকুর্দা ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় পাবলিক প্রসিক্যুটার ছিলেন পুরুলিয়ার জাজেস কোর্টে। তাঁর পিতৃদেব পুলিশ সুপার তেজচন্দ্র সারাজীবনের উপার্জনে নিজের গ্রামে প্রচুর ভূ-সম্পত্তি কিনে জমিদার হয়েছিলেন। এই জমিদারি রক্ষা করার সুবিধের জন্যে তেজচন্দ্র তাঁর বড় ছেলে হরিপদকে পুলিশের চাকরি নিতে উৎসাহিত করেন। ভোলানাথের ঝোঁক ছিল সাহিত্য আর গানবাজনায়। এম-এ পাশও করেছিলেন। কিন্তু সম্পত্তি-রক্ষার জন্যে পরিবারে একজন উকিল চাই, তাই বাবা-দাদার চাপে আইন পাশ করে প্র্যাকটিস শুরু করেন। তাঁর বিয়েও হয় বর্ধমানের(পরে পুরুলিয়া-রঘুনাথপুর) উকিল বিনোদবিহারী চক্রবর্তীর মেয়ে প্রভাবতীর সঙ্গে। ভোলানাথের সরকারি উকিল হিসেবে খ্যাতি তখন তুঙ্গে, ৮০% জয় পিপি’র পক্ষে একটা রেকর্ড- এমতাবস্থায় বেনারসের সঙ্গীত-সমাজ তাঁর পাখোয়াজ শুনে ‘বাদ্য-বিদ্যাসাগর’ উপাধি দিয়ে বসল। সেইসাথে কাশীপুরের তৎকালীন মহারাজার সনির্বন্ধ অনুরোধে পুরুলিয়া জেলার ভাষা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস উদ্ধারের গবেষণার কাজে তিনি লেগে পড়লেন, ভাষাচার্য সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের সাহায্যে এই কাজে নিয়োজিত করলেন নিজেকে।
সঙ্গত কারণেই ওকালতি মাথায় উঠল। পি-পি’র চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে প্রাইভেট প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। সেখানেও বিপত্তি। দাদু আজ এখানে কাল সেখানে সংগীতচর্চা আর গবেষণার কাজে ছুটে বেড়ান আর মক্কেল বাসায় এসে অপেক্ষা করে ফিরে যায়। ফলে জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর নাম যত ছড়াতে থাকে, উকিল হিসেবে পসার তত পড়তে থাকে। ইতিমধ্যে তিনি ষাট বছরে পদার্পণ করলেন, বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে সম্বর্ধনা দেবার দিন ঘোষণা করলেন আর ওকালতি নয়, সব কাজ থেকে অবসর নিয়ে গবেষণা-পত্রগুলো এবার শেষ করবেন। ইতিমধ্যে হিন্দিতে তাঁর দুটি বই ‘মানভঞ্জন কাব্য’ আর ‘রাধাভিসার’ প্রকাশিত হয়েছে, বাংলায় ‘মানভঞ্জন’, ‘পঞ্চকন্যা’ আর ‘দানবীর’ প্রকাশের মুখে। ‘পুরুলিয়া জেলার গ্রাম্যভাষা-তত্ত্ব’, ‘সংগীতের তাল’ আর ‘মানভূমের ঝুমুর’ নিয়ে লেখালেখি আর গবেষণা চলছে।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্যত্র। আমাদের পুরুলিয়া (তখন ধানবাদকে নিয়ে মিলিত জেলা মানভূম) জেলা অনুন্নত, অবহেলিত। বিহার কয়লার লোভে ধানবাদকে কেড়ে নিয়েছে, পুরুলিয়া নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। ১৯১২ সাল থেকে ভাষা-আন্দোলন চলতে থাকলেও পশ্চিম বঙ্গও এ নিয়ে কোন আগ্রহ দেখায় না, বিধান রায়কে বাদ দিলে তাঁর মন্ত্রীমণ্ডলের অনেকে হয়ত জানেনই না যে মানভূম জেলার প্রায় ৭৩% বঙ্গভাষী আর ১৬% কুর্মি, আদিবাসী আর ওড়িয়া। বিহারী ১১%এর বেশী নয়, অথচ অবলীলাক্রমে জেলাটি দান করা হল বিহারকে। যাই হোক, ধানবাদ মহকুমায় তবু কয়লা আছে, পুরুলিয়ায় তাও নেই। একফসলি পাথুরে জমি, সেচের ব্যবস্থা নেই, পাঞ্চেত জলাধার তখনও নির্মীয়মান। তাই গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত চাষী আর কৃষিজীবি শ্রমিকদের পৌষ থেকে জৈষ্ঠ্য প্রায় কোন কাজই থাকে না, কুলিগিরি, বেগার খাটা আর রেল ওয়াগন থেকে কয়লা চুরিই তাদের জীবিকা হয়ে দাঁড়ায় সেই সময়টুকুতে। বর্গা-ভাগচাষ তখনও শুরু হয়নি। আমাদের জমিতে চাষ করে যে মজুর-মুনিষরা, তাদেরও একই অবস্থা। এরকম এক সময় রাতের অন্ধকারে রেল-ওয়াগন থেকে কয়লা চুরি করতে গিয়ে আমাদের এক হতদরিদ্র ক্ষেত-মজুর ধরা পড়ল। পুলিশ দেখে মাথার ঝুড়ি ফেলে পালাচ্ছিল, পুলিশ ছুটে গিয়ে তাকে বাড়ি পর্যন্ত তাড়া করে ধরে, পরদিন আদালতে হাজির করা হবে। মজুরটির পরিবার দাদুর কাছে এসে কেঁদে পড়ে, কিছু একটা করে যেন ছাড়ান হয় তাকে। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে দাদুর ফীস পাবার কোন প্রশ্নই নেই।
কী মুশকিল! হাতেনাতে ধরা পড়েছে, তাকে ছাড়াতে হবে। দাদু তখন কোর্ট থেকে প্রায় পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছেন। অথচ গরিব মানুষটার জন্যে কিছু না করলেও নয়! অগত্যা কেসটা উনি নিলেন। সেদিন বিকেলের দিকে চিন্তিত মনে তিনি বাজারের দিকে গেলেন, তারপর হাজতে গিয়ে মজুরটির, যার নাম রবি বাউরি, সঙ্গে দেখা করে কিছু নির্দেশ দিলেন।
পরদিন কেস কোর্টে উঠল, রবি বাউরি বনাম বেঙ্গল-নাগপুর রেলওয়ে, আদ্রা ডিভিশন। রুকনি-আনাড়া রুটে রেলের ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াগন থেকে কয়লা চুরির অভিযোগ। রবিকে বিচারকক্ষে আনা হল, পরণে খাটো ধুতি, ময়লা গেঞ্জি, গলায় একটা লাল গামছা। ও ত শেখানো বুলি ধরে প্রথমেই সব অভিযোগ অস্বীকার করল। ‘হুজুর আমি ঘরে শুয়েছিলাম, পুলিশ এসে ধরল। কয়লা চুরির আমি কিছুই জানিনা ধম্মাবতার, আমার বাপও জম্মে কখনও চুরি করে নাই।‘ এদিকে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী কনেস্টবলটি হলফ করে বলছে তাকে ছুটে পালানোর সময় বাউরিপাড়ার একটি গলি থেকে ধরা হয়। ‘দেখুন হুজুর, আসামীর গায়ে এখনও কয়লা লেগে আছে।‘
এবার দাদুর সওয়ালের পালা। ‘আপনি কি নিশ্চিত যে এই সেই লোক যে কয়লা চুরি করছিল?’
- ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, দেখুন না, ওর গায়ে, কাপড়ে এখনও কয়লা লেগে আছে।‘
- ‘ধর্মাবতার, গরীব মানুষের জামাকাপড় নোংরা হয়েই থাকে। তার জন্যে কাউকে চোর বলে দাগানো যায় না।‘ এর পর পুলিশকে- ‘আচ্ছা, আপনারা যখন ওকে কয়লা চুরি করতে দ্যাখেন, এই গামছাটি কোথায় ছিল?’
- ‘কেন হুজুর, ওর মাথায়, পাগড়ির মত করে পরেছিল!’
দাদুর অনুরোধে পুলিশ থেকে বাকি দুজন প্রত্যক্ষদর্শী কনেস্টবলদেরও এজলাসে আনা হল একে একে। প্রতি সাক্ষীকে দাদু একই প্রশ্ন করলেন। উত্তরে একজন বলল, গামছাটা কোমরে জড়ানো ছিল; অন্যজন বলল- এরকম কোন গামছা ছিলই না আসামীর সঙ্গে। সাক্ষ্য শেষ হল।
এবার উকিল ভোলানাথের বক্তব্য বিচারকের প্রতি। ‘ধর্মাবতার, চুরি হয়েছে, পুলিশের কাজ চোর ধরা। রবি ঠাকুরের গানে আছে- ‘চোর চাই, যে করেই হোক, চোর চাই হোক না সে যে কোন লোক।‘ তাই তারা সঙ্গতকারণেই একজন নিরপরাধ গরীব মানুষকে তার বাসা থেকে চোর বলে আদালতে
এনে হাজির করেছে।‘
-‘আসামী পক্ষের ল'ইয়ার কিভাবে এতটা নিশ্চিত হলেন যে আসামী চোর নয়?’ সরকারি উকিল প্রতিবাদ করলেন। ‘কুলি-মজুর-ছিঁচকে চোরদের কাছে একটা গামছা থাকেই, ওর কাছেও ওই গামছাটি ছিল। এখন সেটা কোথায় কিভাবে ছিল, তা মনে রাখা কি এতই জরুরি?’
- ‘তাহলে স্বীকার করছেন যে গামছাটা ছিল? ধর্মাবতার, গামছাটা আমি গতকাল বিকেলে পুরুলিয়ার বাজার থেকে কিনে ওকে দিয়ে আসি, এই তার রশিদ। গামছাতে লেবেল এখনও আছে, তাতে দোকানের নাম আর দাম মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। অতএব প্রমাণ হচ্ছে যে রবি বাউরি নির্দোষ, রেল পুলিশের লোক অন্য কাউকে চুরি করতে দেখে তাড়া করে। তাকে অন্ধকারে চিনতে না পেরে আমার মক্কেলটিকে ধরে নিয়ে আসে।‘
নিশ্চিত তথ্যপ্রমাণের অভাবে রবি বাউরি বেকসুর খালাস পায়, তারপরে আজীবন সে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আমাদের জমিজমার তত্ত্বাবধান করেছে। তবে এই মামলার পরে দাদুর আর অবসর নেওয়া হয়নি তখন, এত গরীব মানুষের কেস আসতে শুরু করেছিল।

নন্দিনী ও বিশুপাগলা

"নন্দিনী ও বিশুপাগলা"



আমার বয়েস তখন পাঁচ, বাড়িতে ভাড়াটে এল। মা অসুস্থ বলে দাদু-ঠাম্মার কাছে গ্রামেই থাকি, ক'দিন আগেই ভর্তি হয়েছি সেখানকার পাঠশালায়। দাদু মানে আমার ঠাকুরদা পুরুলিয়া জেলা আদালতে পাবলিক প্রসিক্যুটারের পোস্ট থেকে অবসর নেওয়ার পরেও ব্যক্তিগত ওকালতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে ইদানীং সে প্র্যাকটিশও প্রায় ছেড়ে গবেষণামূলক লেখালেখি শুরু করায় বাইরের ঘর-দুটো খালি পড়ে থাকে বলে ঠাকুমার জেদাজেদিতে তিনি ভাড়াটে বসাতে রাজী হয়েছেন।

মিহির আচার্য ও বাসন্তী, নববিবাহিত দম্পতি। মিহিরকাকু গ্রামের পোস্ট অফিসে সহকারী পোস্টমাস্টার। মিহিরকাকু স্ত্রীকে বাসন্তী নামেই ডাকেন, আমার দাদু- ঠাকুমাও তাই। খুব রূপসী না হলেও সুশ্রীই বলা যায় কাকীকে। আমাকে কিন্তু উনি প্রথমেই বলেছিলেন, 'এই, আমার নাম কিন্তু নন্দিনী, আর কাকুর নাম রঞ্জন।' আমি বলতাম, 'ধ্যেৎ, তুমি বাসন্তী।' আমার কী দোষ, এক তো আমি রক্তকরবী পড়ি নি, আর কারো এতগুলো নাম হতে পারে সেসব আমি কি করে বুঝব!  

কিন্তু দিনে দিনে কাকীর আরো অনেক গুণ প্রকাশ পেতে থাকল। গ্রামের মেয়েরা ওঁর কথাবার্তা চালচলনে, সাজসজ্জার আধুনিকতায় রীতিমত ফ্যান হয়ে পড়ল। একদিন কাকীর বাক্স থেকে বেরোল একটা রংচটা খাতা আর একটা সিংগল রীড হারমোনিয়ম। যেসব গান রেডিও ছাড়া কখনও শোনা যায় না- যেমন 'ওই সুরভরা দূর নীলিমায়', 'এই সুন্দর স্বর্নালি সন্ধ্যায়' এইসব অবলীলাক্রমে গেয়ে যেতেন। আবার দাদুর পায়ের শব্দ শুনতেই 'মহারাজ একি সাজে' ধরে ফেলতেও দ্বিধা করতেন না। মিহিরকাকু দিনভর কাজ করেন আর সন্ধ্যেয় দু-চারজনকে ট্যুশন পড়ান বাড়ির বারান্দায় বসে। অন্দরমহল থাকে আমার ও কাকীর দখলে। নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। দুঃখ দুটি, প্রেম বিবাহ, তাও অসবর্ণ (কাকী বিয়ের আগে ছিলেন গুপ্ত, ওঁর গানের খাতায় নাম লেখা দেখেছি) বলে কোন পক্ষই বাড়ি থেকে মানেনি, তার ফলে ওঁদের আত্মীয় স্বজন থেকেও ছিল না। আর বাসন্তী নামটা কাকীর পছন্দ ছিল কিনা জানিনা, কিন্তু জানিনা কেন কেউ ওঁকে নন্দিনী নামে ডাকত না, মিহিরকাকুও নয়। বাসন্তীকাকী আমাকে আবার বিশুপাগলা বলে একটা অদ্ভুত নামে ডাকতেন। আমার এসব ভাল লাগতনা, কিন্তু স্নেহের ডাক ভেবে মেনে নিয়েছিলাম। তখন ছোট ছিলাম বলে অনেক কিছুই বুঝতাম না, আজ ভাবতে বসলে মাথায় ঢোকে যে কাকীর একটা স্বপ্নবিলাসী মন ছিল, যাতে তিনি নিজের মধ্যেই যেন রক্তকরবীর অভিনয় করে যেতেন। মিহিরকাকু ছিলেন নির্বিরোধী ভালমানুষ, সেইসঙ্গে ভীতুর ডিম একটি। একবার একতলার ঘরে আরশুলা ঢুকেছে, ঠাকুমা চেঁচাচ্ছেন- 'মিহির, দেখছ কি, মারো ওটাকে!' আর কাকু তখন খাটের উপর দাঁড়িয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে বোঝাচ্ছেন- 'ভয় পাবেন না জ্যেঠিমা, ওনারা কামড়ান না।' শেষে কাকীই ওটাকে ঝাঁটাপেটা করে শেষ করল।

সহজেই বোঝা যায় যে মিহিরকাকু এই স্বপ্নবিলাসের কিছুই বুঝত না, আর বুঝলেও পাত্তা দিত না। এই নিয়ে বড় দুঃখ ছিল কাকীর। আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন, 'রঞ্জনটা বেরসিক, তুই আমাকে লাল করবী ফুল এনে দিতে পারবি রে বিশু?' আমি তো করবীই চিনি না তায় লাল! বাড়িতে জবা আর সন্ধ্যামণি ফুটত তাই এনে দিতাম- বাসন্তীকাকী তাতেই খুশী। 
 
পল্লীগ্রামের ছোট্ট পুকুরে ঢেউ উঠতে যেমন সময় নেয়না, তা মিলিয়ে যেতেও তেমনি দেরী হয়না। কিন্তু এবার প্রথম ঢেউয়ের ধাক্কা পাড়ে এসে লাগার আগেই আরেকটা বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল গ্রামের মাটিতে। বন-ভোজন! কাকী গ্রামের ছেলে-মেয়ে সবাইকে নাচিয়েছেন পৌষ-পয়লায় এবার হবে পৌষালু, ডিভিসির পরিত্যক্ত বাগানে। আমার ঠাকুমার ফুল সাপোর্ট। কিন্তু পঞ্চায়েতের মাথা মাথা লোকেদের মহা আপত্তি। ধাড়ি-ধাড়ি ছেলেমেয়েদের একসাথে ফূর্তি-আমোদ! সব এক কথায় নাকচ হয়ে গেল। কাকীও ছাড়ার পাত্রী নন, ছেলেছোকরাদের ভোট তাঁর দিকে। তবু সুবিধে হচ্ছে না। শেষে কী খেয়াল হওয়ায় আমি বললাম, 'কাকী, তুমি দাদুকে ধরো'। দাদু শুনে বললেন, 'এই কথা! তা এতে আপত্তির কি আছে?' দাদু গ্রামের নাম-কে-ওয়াস্তে জমিদার হলেও উকিল আর পণ্ডিত মানুষ বলে একটা আলাদা ওজন ছিল। পঞ্চায়েতের দল তাঁর যুক্তি-তর্কের সাথে পারবে কেন? আমি ছুটতে ছুটতে এসে কাকীকে জড়িয়ে ধরে বললাম, নন্দিনীকাকী, ওরা রাজী হয়েছে।

'সে আমি জানতাম। জ্যেঠামশায় যখন আছেন, ওরা রাজী হবেই। কিন্তু তুই আমাকে কি বললি আরেকবার বল।' আমি বুঝতে পেরে কেন জানিনা আরো লজ্জা পেয়ে গেলাম। 'আমার রঞ্জন আমাকে যে নামেই ডাকুক, তুই আমাকে এবার থেকে নন্দিনীকাকীই বলবি, কেমন,' বাসন্তীকাকী বললেন।
আমি এবার খুশী হয়ে ঘাড় নাড়লাম।